আট
অমৃতা আর প্যারিসের কথায় একটা চিঠির কথাই বারবার মনে আসে| হাঙ্গেরি থেকে যেটা আমায় লিখেছিল ও|
চিঠিটা যেন আমাদের জীবনে এক নতুন গল্পের সূচনা| গল্প করেই বলি, যদিও ব্যাপারটা চিঠির|
সময়টা আগস্ট, ১৯৩৪-এর| যা পরিবারের পেনশন আসছিল ভারত থেকে তাতে সংসার চালাতে ঘাম ছুটে যাচ্ছিল মা’র| ফলে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দেশে ফিরে যাবার নকশা কষছিল বাবা| কেবল অমরি আর আশাকে ইউরোপে রেখে যাবার ভাবনা| ওর ছবি আঁকাআঁকি নিয়ে অমরি প্যারিসে, আর আমি হাঙ্গেরিতে| প্রয়োজনে আমরা জায়গা বদলাবদলিও করব| এটাই প্ল্যান|
অমরির চিঠিটা হাঙ্গেরি থেকে লেখা| বলল, বাবা ওকে চিঠি লিখে দেশে ফেরার কথা বলেছে| এও বলেছে যে, মা খুব ফেরার পক্ষপাতি নয়| কিন্তু টাকার টানাটানিটা আর সহ্য করা যাচ্ছে না|
এর পরে-পরেই মা’ও একটা চিঠি লিখেছে অমরিকে| বলেছে, তোমরা কোথায় থাকবে ঠিক করো| ইউরোপ, না ভারতে| তোমাদের যথেষ্ট বুদ্ধিসুদ্ধি ঘটে, তোমরাই ঠিক করো| আমরা নভে¤^রে ভারতে চললাম|
মা ওকে আরো কিছু কথা বলেছে যা আমার জীবন ও ভবিষ্যৎ জড়িয়ে|
মা আর বাবা দুজনেই চায় আমি আমার ফরাসি বন্ধু জেরোকে বিয়ে করি|
তাতে অবশ্য অমরির আপত্তি আছে| কারণ ও জানে যে, আমি জেরোকে খুব একটা পছন্দ করি না, ভালোবাসার কথা তো ওঠেই না|
জেরোর সঙ্গে মিশি ঠিকই, এবং খুব সহজ ভাবেও| কারণ ও নিজেও খুব সহজ এবং নরমও| বোধ হয় একটু বেশি নরমই, যেটা আমার মোটেই পছন্দ নয়| তার ওপর ওর আয়কড়িও সুবিধের না| যা নিয়ে অমরির দুশ্চিন্তা — ওই টাকায় তোদের কী করে চলবে বল তো? শেষে বাবাকেই জোগান দিয়ে যেতে হবে| আর কবে যে কী চাকরির উন্নতি হবে ওর ভগাই জানে!
ফলে অমরির উপদেশ : ইন্দু, দেশেই চল| দেশে কি ভালো পাত্রের সমস্যা? ঠিক জুটে যাবে| না হলে রাস্তা তো খোলাই আছে| ফের ইউরোপ ফিরে আসবি|
আমি কিন্তু যাচ্ছিই, লিখল অমরি|
আমার ইউরোপে থাকা বা না-থাকার সিদ্ধান্ত আমার ওপরই ছেড়ে দিলো অমরি, তবে ও নিজে যে ফিরছেই এটাও পরিষ্কার করে দিয়েছিল| যেটা আরো পরিষ্কার হলো পরের মাসে বাবা ও মা’কে লেখা ওর চিঠিতে| এই চিঠি থেকেই ওর জীবনটা যেন বদলে গেল| বাবার কাছ থেকে এই চিঠিটা নিয়ে ও পড়ে আমি তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম| এই আমাদের অমরি? যে লিখছে…
প্রিয় মা, প্রিয় বাবা,
তোমরা জান আমি ভারতে ফেরা মনস্থ করেছি| কেন, তার কারণগুলো শোনাই শোনো|
আমার ফিরতে চাওয়ার প্রধান কারণ আমার ˆশল্পিক সত্তার উন্নতি| আমার এখন নতুন উৎস প্রয়োজন অনুপ্রেরণার| আর বাবা, তোমার এটা খুব ভুল ধারণা যে, ভারতের শিল্প, সাহিত্য, মানুষজন ও ঐতিহ্য নিয়ে আমার কোনোই ঔৎসুক্য নেই| ওই বিষয়গুলোই তলিয়ে জানব বলেই দেশে ফেরার এত তোড়জোড় আমার| যা কিছুই এখন আমাকে গভীরভাবে টানে তার সন্ধান ভারতেই পাব বলে বিশ্বাস জন্মাচ্ছে| দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপে থেকে এই উপকারটা হলো — ভারতকে আবিষ্কার করলাম|
আধুনিক শিল্পকলা নিয়ে মেতে থেকেই ভারতের চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের বোঝদারি আর আদর বাড়ল আমার মধ্যে| শুনলে উদ্ভট লাগবে, তবু ঘটনা এটাই যে, ইউরোপ না এলে কোনো দিন ধারণাতেই আনতে পারতাম না কীভাবে অজন্তার একটা প্রাচীরচিত্র গোটা রেনেসাঁসের চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে| মোট কথা হলো, প্রিয় বাবা, আমি দেশে ফিরে নিজের মতো করে ভারতকে পেতে চাই|
আরেকটা কথা, খুবই গুরুত্বপূর্ণ| তুমি ভয় পাচ্ছ, আমরা দেেেশ ফিরলে তোমার ও পরিবারের সুনাম অক্ষুণ্ন থাকবে না| আচ্ছা, বাবা, আমাদের নিয়ে দুনিয়ার লোকের এত কথা চালাচালিতে কেন কান দাও বলো তো! বোকা এবং বদমায়েশরা তো বাজে বকে যাবেই, কারণ ওটাই ওদের কাজ| ভারতে আমি কীভাবে জীবন কাটাব সে তো আমার ব্যাপার; ওদের কথায় চলার মতো জীবন আমার নয়| তুমি অন্তত ওইসব ঘ্যানঘ্যানানিতে কান দিও না| তাহলে সেটা আমার দুঃখের কারণ হবে, দুচি| প্রিয় দুচি!
জীবন ও যৌনতা নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা চিরকালই খুব খোলামেলা| এটা আমার শিল্পকলার পক্ষেও জরুরি| এ নিয়ে তোমার নিজের যদি কোনো ভয়ভীতি থাকে তো সেটাও কাটিয়ে ওঠো, প্লিজ|
খুব ভালো হয়, প্রিয় মা ও বাবা, আমরা সবাই যদি দল করে ভারতে ফিরে যাই!
কাজেই, চলো ভারত!
তোমাদের প্রিয় অমরি
সেই কবে পড়া এ-চিঠি, কিন্তু মনে থেকেই গেল| বাবা, মা, অমরি দেশে ফিরল| আমি থেকে গেলাম| আজ আর অতটা পরিষ্কার নয় কিসের টানে| তবে ইউরোপে বসে দূর থেকে অমৃতাকে দেখাও একটা অন্য অভিজ্ঞতা| গায়ে-গায়ে থেকে ওর পুরো চেহারাটা ধরতে পারিনি হয়তো| দূরত্ব কি আমাদের কাছে আনল? জানি না|
দূরত্বের কথা উঠল বলে প্রধান সংকোচের কথাটাও বলি| এই এতসব বলতে-বলতে টের পাচ্ছি যে, অমৃতার জীবন নিয়ে বলার ঠিক লোক আমি অন্তত নই| সারাক্ষণ একসঙ্গে থেকেও ওকে দেখেছি বলতে গেলে হঠাৎ-হঠাৎ ঝলকে-ঝলকে| যেভাবে নিজেকেও আমরা দেখি ঝলকে-ঝলকে| নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজেকে দেখে যাওয়াটা স্নায়ুরোগের লক্ষণ| অমরি যেমন একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল প্যারিসে, আচ্ছা ইন্দু, আমি যেভাবে আমার সেলফ পোর্ট্রেটগুলো আঁকি, আমি কি সত্যি ওই রকমই দেখতে?
তাতে মজা করার জন্য বলেছিলাম, অনেকটা|
ও হেসে উঠে বলল, আর আয়নাতে যেমনটা দেখি?
বললাম, একেবারেই সেরকম না|
এটা শুনে ও কীরকম সিরিয়াস হয়ে গিয়ে কী একটা ভাবতে বসল| জিজ্ঞেস করলাম, কী ভাবতে বসলি?
ও বলল, বড় আজব একটা তত্ত্ব ধরিয়ে দিয়েছিস তুই|
— কী তত্ত্ব?
— অ্যাপিয়ারেন্স অ্যান্ড রিয়্যালিটি| দৃশ্য ও বাস্তব|
— কেন বলছিস?
— কারণ আয়নাটা দৃশ্য| আত্মপ্রতিকৃতি বাস্তব|
এই সব কথা মনে আসছে বলে দুর্ভাবনাটাও ˆতরি হচ্ছে| শুধু ঘটনা দিয়ে-দিয়ে অমরিকে ধরা খুব মুশকিল| অমরিকে বোঝার জন্য ওর আঁকা ছবিগুলো ব্যবহার করি আমি| মা আর বাবা ব্যবহার করে ওর লেখালিখি, চিঠিপত্তর| ভিক্টর মনে হয় ব্যবহার করে ওর নিঃশব্দ মুহূর্তগুলো, ওর অনুপস্থিতি আর অতীত স্মৃতি| ও কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারে না যে, বহুদিন আগে অমরির একবার চিকিৎসা করতে হয়েছিল যৌনরোগের| অমরির মৃত্যুর সময়ও নাকি সেই রোগটাই ফিরে এসেছিল|
তো যা বলছিলাম| শুধু ঘটনা সাজিয়ে অমরিকে ধরতে গেলে যে-একখানা জীবনী দাঁড়াবে তার থেকে অমরির আত্মা ও সত্তা অক্লেশে পালিয়ে যাবে| অমরি বলবে, জীবনের সব ঘটনাকেই অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, কিন্তু দেখতে হবে কল্পনার সঙ্গে| যেমন বাস্তবকে ছবিতে আঁকতে গেলে রং চাই| যেজন্য পল গোগ্যাঁ ওর এত পছন্দ ছিল| ওগুস্ত রনোয়ার মতো মহান শিল্পীরও ছবিতে রঙের চাপা, মেদুর ব্যবহার ওর পছন্দয় আসত না|
অথচ, হায়, সেভাবে অমৃতার জীবনকে রঙে-রসে-কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি কোথায়? যেভাবে রেখা ও রঙে জীবনকে বাঁধতে চেয়েছে| এতক্ষণ যা বলেছি তা তো জীবনীর আসবাবে জীবনের ঘর সাজানোর মতো| রং-তুলির কাহিনিমাত্রা যোগ না হলে অমৃতার মনে ধরবে কেন? জানি না অমৃতা কী বলবে|

নয়
না, মনে ধরবে না| জীবনী জিনিসটাই আমার পছন্দের তালিকায় আসেনি কখনো| যে-কারণে রোম্যাঁ রোলঁর লেখা জীবনীগুলোর ধার ধারিনি কখনো, কিন্তু ওঁর উপন্যাস ‘জ্যঁ ক্রিস্তফ’ ভালোবেসেছি| খাঁটি জীবনও যদি দেখতে চাই তো দেখব উপন্যাসের মন্থনে|
সেরা মন্থন আমি পাই দস্তয়েভস্কির উপন্যাসে| আহা, এই তো জীবন যা আমি খুঁজি| আর পাই ওঁর ‘দ্য পসেস&ড&’, ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ’ বা ‘দ্য ইডিয়টে’|
আর এখনকার লেখার মধ্যে পেয়েছি জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিসে’| কী জীবন! কী জীবন! আর কীভাবে উঠে আসছে ভাষায়! খুব সাহসের সঙ্গে সাঁতরে বেড়িয়েছি ওই ইংরেজি গদ্যে; কঠিন সাঁতার নিঃসন্দেহে, কিন্তু সমানে জীবনের মধ্যে ভাসছি|
আহা, এভাবেই তো ডুবতে পারি আত্মকাহিনিতে| যাতে কাহিনিও বাঁচে, আত্মাও রেহাই পায়| ‘ইউলিসিসে’র ওই দীর্ঘ বিছানাপর্ব আমি আজো ভুলতে পারিনি| মলি ব্লুমের শোবার ঘরের ওই গোপন অন্ধকার আমায় টানে| ও শুয়ে বিছানায়… ¯^ামী, বেচারা ¯^ামী, এসে নিঃশব্দে জুতো খুলে ঢুকে আসে…
ভিক্টর তো সবই জানে, ওই তো নিয়ে গিয়ে করাল গর্ভপাত| তারপর প্রথম রাতে ঘরের আলো নিবিয়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল ও, হয়তো ভাবছিল প্রথম কথাটা কী বলবে| আমি শুধু ভাবছিলাম বালিকা বয়সে ওর সামনে আমার সেই স্ট্রিপ টিজ| আশ্চর্য, হঠাৎ ও শুধু বলল, সেই স্ট্রিপ টিজটা আবার করো, আলো না জ্বালিয়ে|
বললাম, কী দেখবে তাহলে?
ও বলল, তোমাকে!
দেখলাম আমার শরীরে ওর কৌতূহল বিলকুল ডাক্তারি কেতায়| ছুঁয়ে-ছুঁয়ে আমার শরীর দেখছে যেন কোথায় কী অসুখ বুঝতে| অথচ ওই স্পর্শগুলো কী অপূর্ব লাগছে আমার, গায়ে জ্বর এনে দেবার মতো|
একসময় সত্যিই যেন একটা সুখের জ্বর ধরল আমায়| একটা কাঁপুনি এলো| আমি হিমেল ঠান্ডায় গায়ে ক¤^ল জড়ানোর মতো করে আপ্রাণ শক্তিতে জড়িয়ে ধরলাম ওকে আর বিষধর সাপের মতো ফোঁস-ফোঁস করতে লাগলাম| শুনলাম ও বলছে কানের কাছে মুখ এনে, ফিসফিস কওে, তোমাকে দুটো পছন্দ দিলাম| হয় আমাকে ময়াল সাপের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে পিষে মারো, নয়তো কেউটের মতো বিষাক্ত ছোবলে|
আমি ওকে আদর করতে-করতে বললাম, তার চেয়ে ডাক্তারবাবু, তুমি ঘুমের ইনজেকশনে আমাকে বেহুঁশ করে দাও|
বলতে-বলতে ভিক্টর আমার মধ্যে ঢুকে এলো…
ভিক্টরেরই বলা কথার একটা এটা| সেক্স ইজ আ গ্রেট ট্র্যাঙ্কুইলাইজার| যৌনতা এক সেরা ঘুমপাড়ানি|
কিন্তু আমরা তো ঘুমোবার জন্য যৌনতা নির্বাচন করি না| বেশি করে জেগে ওঠার জন্যই নয় কি? আমরা যৌনতা নির্বাচন করার কে? যৌনতাই তো আমাদের নির্বাচন করে| নাহলে আমার ভিক্টরকে এবং ভিক্টরের আমাকে বেছে নেবার সূত্র কোথায়?
ঘরটা খুবই অন্ধকার| কিছুই দেখা যায় না, তবু আমি দেখছি ভিক্টরকে এবং ও আমাকে| অন্ধকার সয়ে গেলে চোখের আলোয় দেখা যায় মনের জিনিসকে| নাকি মনের আলোয় ভেদ করা যায় চোখের অন্ধকারকে?
ভিক্টরের ভারী নিঃশ্বাস আমার ওপর পড়ছে| এক অদ্ভুত মসৃণ আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে দুজনের ওঠাপাড়ার মধ্যে| অন্ধকারে ভিক্টরকে দেখতে-দেখতে আমার মনের ক্যানভাসে আরো দুটো মুখ খেলে যাচ্ছে|
না, যারা শুধু আমার শরীর ভেদ করেছে, কিন্তু মনে বাসা বাঁধেনি তারা নয়| বরং সেই দুজন যারা মনের অ্যালবামে স্থায়ী চিত্রকর্ম হয়ে রয়ে গেল| যাদের নিয়ে ভিক্টরের সঙ্গে আমি খোলামেলা কথা বলতে পারি| ভিক্টর মৃদু হাসে, প্রশ্ন করে না|
একজন জওহরলাল| অন্যজন ম্যালকম| ম্যালকম মাগারিজ|
উফ&, আর কিছু মাথায় থাকছে না! শরীর চড়ে গেছে মনের ওপর| এই ঠান্ডাতেও আমরা ঘামছি, একে অন্যের শ্বাস টেনে নিচ্ছি, ফিরিয়ে দিচ্ছি, দুজন দুজকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলছি| বিবাহিত হচ্ছি|
ভিক্টর ওর মাতৃভাষা হাঙ্গেরিয়ানে বলছে, আমি তোমায় ভালোবাসি| আমি ফরাসিতে ফিরিয়ে দিচ্ছি, জ্যঁ তেম| জ্যঁ তেম| তোমায় ভালোবাসি| তোমায় ভালোবাসি|
কখন যে ভিক্টরের ওপর আমিই চড়ে বসেছি খেয়াল নেই| এই মাত্র একটা কাটা বটকাণ্ডের মতো হুড়মুড়িয়ে ওর ওপর ভেঙে পড়লাম| ও-ও নিথর হয়ে পড়ে আছে বদ্ধ জলার মতো, স্রোতহীন, অবসন্ন|
আমরা দুজন দুজনকে তিনবার আক্রমণ করেছি আজ রাতে| সঙ্গমটা নেশার মতো আমার কাছে, ওর কাছে চ্যালেঞ্জ| ও হারতে চায় না, আমি শেষ করতে অনিচ্ছুক|
কিন্তু একসময় আমরা দুজনই ফিরে যাই নিজের-নিজের ¯^প্নে| তারপর গভীর, নিঃ¯^প্ন ঘুমে|
কখন ঘুম কেটেছে জানি না, পাশ ফিরে দেখলাম ভিক্টর অকাতরে ঘুমোচ্ছে| খুব মায়া হলো ওর মুখটা দেখে| তবু কেন মনে পড়ল দুটো মুখ — জওহরলাল আর ম্যালকমের? ওদের স্মৃতি তো কোনো পাপবোধ বয়ে আনে না!
নাঃ, তাহলে নেহরু আর মাগারিজের গল্পগুলোই বলি| বুদাপেস্তের মৃদু আলোর সকালটাকে প্রেক্ষাপটে রেখে সদ্যবিবাহিতা আমি| অমৃতা, গল্প বলা শুরু করছি| কীরকম মার্সেল প্রুস্ত — মার্সেল প্রুস্ত মেজাজ| শিখতে চেয়েছি ওঁর ‘রিমেমব্রেন্স অফ টাইম পাস্ট’ থেকে| হারানো দিনের কথা…
হারানো দিন আর কী এমন, মোটে তো ছ-বছর ক-মাসের ঘটনা| মে মাসের সিমলার এক সান্ধ্য পার্টিতে সবকিছুর শুরু| হ্যাঁ, মাগারিজের ব্যাপারটাই বলছি| দুজনেই একেবারে অপ্রস্তুত ছিলাম, যা ঘটে গেল তার জন্য|
আবার অপ্রস্তুতই বা বলি কেন? দুজনেই বেশ ভালোরকম ক্লান্ত ছিলাম আশপাশের পরিবেশে| আমি তাও আমার আঁকাআঁকি আর সিমলার আকাশ-পাহাড় নিয়ে সরে থাকার মতো একটা জায়গা পাচ্ছিলাম| কিন্তু ম্যালকম?
বেচারা এক অসাধারণ ব্রিটিশ সাংবাদিক| চরম বুদ্ধিশীল এবং সম্পূর্ণ ঠোঁটকাটা, কলকাতার ‘স্টেটসম্যান’ কাগজে কাজ করতে এসে বুঝেছিল, যা তুমি দেখ তা তুমি বল না, যা বিশ্বাস কর তা লেখ না| সাংবাদিকতা এদেশে লেখালেখির চাকরি মাত্র| তার বেশি কিছু নয়| অভিপ্রায়, অভিব্যক্তির খুব বেশি জায়গা নেই| অনেকটা এখানকার শিল্পকলার মতো| যেটুকু যা শিখেছ সেটাই করো| না-হলে ভোগান্তি| আমার ছবির কাজ নিয়ে দিব্যি টের পাচ্ছিলাম|
কলকাতার ‘স্টেটসম্যানে’ অক্ষর টাইপ করতে-করতে ঠিক একই হাল হয়েছিল ম্যালকমের| কোনো অভিনবত্ব, অনুপ্রেরণা নেই, কেবল টাইপরাইটার নিয়ে বসে ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ ট্যাপ…
‘স্টেটসম্যান’-কর্তারা বিব্রত হচ্ছিলেন এই প্রতিভাটিকে নিয়ে| যেমন তাঁরাও অবসাদের কারণ হচ্ছিলেন ম্যালকমের| শেষে বিলিতি শাসকদের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী সিমলায় বদলি করা হলো ওঁকে| যে-জায়গায় শোভার অন্ত নেই, কিন্তু কাগজে রিপোর্ট করার মতো কী আছে? অতএব প্রতিবেদনের পরিবর্তে নিজের ডায়েরি লেখায় মন দিলো| যেজন্য কাজে আসত সন্ধেবেলার পার্টিগুলো, যেখানে নাচ-গান-মদের সঙ্গে পরচর্চার স্রোত বইত|
সেরকমই এক পার্টিতে ১৯৩৫-এর ২২ মে আমরা প্রথম দুজনকে দেখলাম| হায় নিয়তি! শেতাঙ্গ পুরুষ দেখে-দেখেই তো অ্যাদ্দিন বড় হলাম, কিন্তু এ কী সাহেব রে বাবা! সমানে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, যেন টেলিস্কোপ দিয়ে দেখছে| আমাকে? আমাকেই তো?
সিসিল হোটেলের সেই নাচ ভুলব কী করে আজো? ও একটা ব্র্যান্ডি শেষ করে আমার সঙ্গে ওয়ালজ নাচল| বুঝলাম না ওয়ালজ নাচছি, না ড্যানিউবের স্রোতে দুলছি| ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললাম, নেচে-নেচে কোনো দিন অজ্ঞান হইনি| আজ হতে চাই|
ও জিজ্ঞেস করল, তারপর?
বললাম, সেটা তোমার বিভাগ| আমি তো অচেতন|
হঠাৎ করেই আমরা একই সঙ্গে অদ্ভুত মুক্তির ¯^াদ পেলাম|
আমাকে নাচঘরের এক কোনায় নিয়ে বলল, টেলিফোন ন¤^র দাও|
মুখে-মুখে বললাম, ও শুনে-শুনে তুলে নিল|
জিজ্ঞেস করলাম, আর কী চাও?
ও বলল, তোমার পরনের অপরূপ শাড়িটা|
বললাম, কী করবে?
বলল — ছুড়ে ফেলে দেব|
— এখনই?
— না থাক| বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে| তাহলে এরাও আমাদের ছুড়ে বাইরে ফেলে দেবে|
— তা তো ওরা দিয়েই দিয়েছে| নাহলে এত কাছাকাছি হলাম কেন?
ফোন করেও চলে এসেছিল পরের বার| হালকা ছাই-ছাই স্যুট পরনে| নিচে উজ্জ্বল হলুদ শার্ট আর নীল টাই| আমার দেখেই ভালো লেগে গেল; সেটা বলেও দিলাম| ও বলল, যাক জানা থাকল| ভুলভাল কিছু করে বসলে এইটা পরে সামলে দোব|
বললাম, আমার এই শ্রমিকের পোশাক দেখে কিছু বললে না? তার ওপর এই রংটং লাগা অ্যাপ্রোন|
ও কিছু না বলে মুচকি-মুচকি হাসল| শেষে ওর ওই নাক-উঁচু, কটকটে ভাবটা ধরে রেখেই বলল, আমি তো ভেবেছিলাম তোমাকে স্টুডিওর আলো-অন্ধকারে জন্মদিনের পোশাকে পাব| মন দিয়ে নিজের ন্যুড পোর্ট্রেট আঁকছ|
আমি আমার ‘দুই নারী’ ছবিটা সন্তর্পণে ইজেল থেকে সরিয়ে ঘরের এক পাশে রেখে, ইজেলে নতুন ক্যানভাস চাপিয়ে হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলাম, হিয়ার উই গো! ছবির বিষয় ‘নতুন নগ্নিকা’|
ম্যালকম জানতে চাইল, নতুন কেন?
বললাম, কারণ সে নতুন কিছুর ¯^াদ পেয়েছে|
বলে পটপট করে আমার সমস্ত পরিধান বিসর্জনে ব্যস্ত হলাম| আর আশ্চর্য, সেটা করা শেষ হতেই দেখলাম ম্যালকম ওর স্যুট টাই বুট মোজা অন্তর্বাস সব ঝেড়েঝুড়ে মিকেলেঞ্জেলোর ডেভিড হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে| পুরুষের নগ্ন সৌন্দর্যেরও কি কোনো শেষ আছে? অথচ আমি কখনো নগ্ন পুরুষ আঁকার দিকে গেলাম না| ওই নগ্নতা আমি নিজের শরীরে গ্রহণ ও ধারণ করেছি|
ম্যালকমকে আমি শরীরে নিলাম|
যখন আবেগে, উত্তেজনায় শিৎকার ধ্বনি তুলছি শুনি আমার নতুন প্রেমিক বিড়বিড় করছে, এই শরীর যেমন নিটোল, মসৃণ এই মনটাও তেমনই কুমারী| কত পুরুষ, কত সঙ্গম, কিন্তু কেউ কোনো ছাপ রেখে যায়নি| আমি কিন্তু ছাপ রেখে যাব| যাকে বলে ক্ষত|
ম্যালকমই আমার প্রথম প্রেমিক যে সঙ্গমের আধ্যাত্মিক মূল্যমানের কথা বলেছিল| তাও সঙ্গমের সেই তুরীয় লগ্নে| আমাকে শরীরে ও মনে ক্ষতবিক্ষত করার যাবতীয় উপকরণ নিয়েই যেন ও এসেছে|