বইপত্র

একুশ শতকের বাংলাদেশে রেনেসন্স-ভাবনা
স্বরোচিষ সরকার
পনেরো-ষোলো শতকের ইতালিতে যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটে, বিশেষভাবে ইতালিতে জীবন ও জগতের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে, ঐতিহাসিকগণ তাঁর নাম দিয়েছেন রেনেসন্স| পুনরায় জেগে ওঠা হিসেবে ব্যাখ্যাত এই রেনেসন্স ইতালিতে ঘটলেও সমগ্র ইউরোপের ঐতিহ্য হিসেবে তা বিবেচিত হয়| রেনেসন্সের আক্ষরিক অর্থও পুনর্জাগরণ| প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের গ্রিসে সমাজ-সংস্কৃতি-বুদ্ধিবৃত্তির যে-বিকাশ ঘটে, সেটাকে মনে করা হয় জাগরণ এবং সেই জাগরণকে ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে পনেরো শতকের ইতালির জাগরণকে মনে করা হয় পুনর্জাগরণ| ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় এই পুনর্জাগরণের একাধিক প্রতিশব্দ চালু আছে, যেমন ইতালিয়ানে রিনাসিতা, ফরাসিতে হ্রেনেসাঁস, বা ইংরেজিতে রেনেসন্স| গোলাম মুরশিদ তাঁর আলোচনায় ইংরেজি প্রতিশব্দটি গ্রহণ করেছেন| রেনেসন্স বলতে আসলে কী বোঝায়? কী কী ˆবশিষ্ট্যের জন্য ইতালির জাগরণকে রেনেসন্স বলা হয়েছিল? উনিশ শতকের বাংলার জাগরণের কী কী ˆবশিষ্ট্য ইতালির রেনেসন্সের সঙ্গে মিলে যায়? না মিললে কেন মেলে না? এসব নানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় গোলাম মুরশিদের রেনেসন্স বাংলার রেনেসন্স বইটিতে|
গোলাম মুরশিদ প্রথমেই একটি বিতর্কের অবতারণা করে মূল আলোচনায় প্রবেশের চেষ্টা করেন| তিনি জানান, এমন বহু ঐতিহাসিক রয়েছেন, যাঁরা বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত উপমহাদেশের বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে সরাসরি রেনেসন্সের সঙ্গে তুলনা করেছেন| আবার এমন ঐতিহাসিকও রয়েছেন, যাঁরা ইতালির রেনেসন্সের সঙ্গে বাংলার জাগরণের বিশেষ কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাননি| গোলাম মুরশিদ এই বিতর্কের পাশাপাশি আরো দু-একটি প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে আসেন| এর মধ্যে রয়েছে যেমন রেনেসন্সের সঙ্গে রিভাইভালের পার্থক্যের বিষয়, অন্যদিকে রয়েছে রেনেসন্সের সঙ্গে সেকুলারিজমের সম্পর্কের বিষয়| কিছু-কিছু ˆবশিষ্ট্য ভিত্তিহীনভাবেই ইতালির রেনেসন্সের ওপর আরোপিত, তাও গোলাম মুরশিদের চোখে পড়ে| কোনো-কোনো ˆবশিষ্ট্যে বাংলার জাগরণ ইতালির রেনেসন্সের থেকেও অগ্রগামী, আলোচনা প্রসঙ্গে গোলাম মুরশিদ সেদিকেও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন|
উনিশ শতকের বাংলার জাগরণ প্রতিফলিত হয় এমন বহু বিষয় নিয়ে গোলাম মুরশিদ দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন| ১৯৭০ সালে কাজ করেছেন বিদ্যাসাগরকে নিয়ে| রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করেছেন ১৯৭২ সালে| ১৯৭৪ সালে কাজ করেছেন উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলন নিয়ে| ১৯৭৭ সালে কাজ করেছেন উনিশ শতকের নারী জাগরণ বিষয়ে| নব্বইয়ের দশকে একে-একে কাজ করেছেন বাংলা ভাষার বিকাশ নিয়ে, মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে নিয়ে| দুহাজারের দশকে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ নিয়ে গবেষণা করেছেন, কাজ করেছেন উনিশ শতকীয় বাঙালির জঙ্গমতা নিয়ে| এভাবে গোলাম মুরশিদের বিদ্যাসাগর (১৯৭০), রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ (১৯৮৩), সংকোচের বিহ্বলতা : আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গরমণীর প্রতিক্রিয়া (১৯৮৩), সমাজ সংস্কার আন্দোলন ও বাংলা নাটক (১৯৮৩), কালান্তরে বাংলা গদ্য (১৯৯২), আশার ছলনে ভুলি (১৯৯৩), নারীপ্রগতির একশো বছর : রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া (১৯৯৩), হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি (২০০৬), কালাপানির হাতছানি (২০০৮) প্রভৃতি বইয়ে উনিশ শতকের জাগরণ-বিষয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আলোচিত হয়| বাংলার জাগরণ-সংশ্লিষ্ট এতগুলো বই লেখার পর যখন রেনেসন্স বাংলার রেনেসন্স বইটি লেখায় হাত দেন, তখন তিনি খুব সহজেই নিজের দেখা ও পরিচিত এলাকাগুলোতে আর একবার ঘুরে আসার সুযোগ পান| অন্যদিকে দীর্ঘকাল প্রবাসে থাকার ফলে রেনেসন্স দ্বারা আলোকিত সমাজকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেন| বইটি লেখার আগে ইতালিতে গিয়ে সরেজমিনে রেনেসন্সের তীর্থভূমিকে তিনি খুব কাছ থেকে একবার দেখে এসেছিলেন| এমন দীর্ঘদিনের ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে লেখা গোলাম মুরশিদের রেনেসন্স বাংলার রেনেসন্স| এভাবে এ-বইয়ের মধ্যে গোলাম মুরশিদের আজীবনের গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়|
ইতালীয় রেনেসন্সের সঙ্গে বাংলার জাগরণকে তুলনা করে দেখানোটাই এ-বইয়ের মূল লক্ষ্য| একানব্বইটি রঙিন ছবি ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এ-তুলনাকে চাক্ষুষ করার চেষ্টা করা হয়| গ্রিস ও রোমের ধ্রুপদী যুগের অবসানের পর কীভাবে মধ্যযুগের আবির্ভাব ঘটে, আবার সেই মধ্যযুগের অবসানে ইতালির ফ্লোরেন্সে কীভাবে রেনেসন্সের সূর্য উদিত হয়, তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় বইয়ের প্রথম ভাগে| দ্বিতীয় ভাগে দেখানো হয় উনিশ-বিশ শতকের বাংলা কীভাবে জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য-দর্শন,
শিল্পকলা-সংগীত, ব্যক্তি¯^াতন্ত্র্য-মানবতা, ভাষাবোধ-জাতীয়তা
প্রভৃতি দিক দিয়ে মধ্যযুগের বৃত্ত থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ নতুন যুগে প্রবেশ করে| বাংলার এই জাগরণ কোন-কোন দিক দিয়ে ইতালির রেনেসন্সের সঙ্গে তুলনীয় তাও তিনি একে-একে তুলে ধরার চেষ্টা করেন| রেনেসন্সের ইতালিতে ধর্ম সম্পর্কে মানুষের মনোভাব পরিবর্তিত হয়| উনিশ শতকের কলকাতায়ও তা হয়| প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাসী থেকেও ইতালির রেনেসন্সের ভাবুকদের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে মানবমুখী ও ইহজাগতিক হয়ে উঠেছিল, উদাহরণ সহযোগে তা তিনি আলোচনা করেন|
ইতালির রেনেসন্সে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের যে বিকাশ ঘটে, বাংলার জাগরণে তার তুলনা পাওয়া যায় না| আবার বাংলার জাগরণেও এমন কিছু ˆবশিষ্ট্য রয়েছে, যা ইতালীয় রেনেসন্সের থেকেও এগিয়ে থাকে; যেমন সাহিত্য| প্রসঙ্গত গোলাম মুরশিদ লেখেন, ‘যেখানটায় বঙ্গীয় রেনেসন্স সম্ভবত ইতালীয় রেনেসন্সকে পেছনে ফেলেছিলো, সে হলো সাহিত্য|’ প্রসঙ্গত তিনি বিদ্যাসাগর, মাইকেল, বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের উন্নত সাহিত্যকীর্তির উল্লেখ করেন|
বঙ্গীয় রেনেসন্স নিয়ে এ-পর্যন্ত যাঁরা আলোচনা করেছেন, তাঁরা সকলেই এই রেনেসন্সের সীমানা উনিশ শতকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন| কিন্তু গোলাম মুরশিদ তাঁর এই গ্রন্থে সেই সীমানা অতিক্রম করেছেন| চলে এসেছেন বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত| এর ফলে নজরুল ইসলাম বা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের অবদানই শুধু যুক্ত হয়েছে, তাই নয়, জগদীশচন্দ্র বসুর মতো বিজ্ঞানীর অবদানও যুক্ত হয়েছে| এর ফলে বাংলার জাগরণে ব্যক্তি¯^াতন্ত্র্যের প্রাবল্য, নারী¯^াধীনতা প্রসঙ্গ এবং পৃথিবীর জ্ঞানবিজ্ঞানে বাঙালির অবদানের বিষয়টি স্পষ্টতা পায়| এ ছাড়া বাংলার জাগরণ আলোচনায় এতদিন বাঙালি মুসলমান একেবারেই অনুচ্চারিত ছিল, সেই নীরবতারও অবসান ঘটে| লালন ফকিরকে এখানে জায়গা পেতে দেখা যায়| বিশেষভাবে যে প্রবল ব্যক্তি¯^াতন্ত্র্য ও মানবমুখিতা রেনেসন্সের অন্যতম ˆবশিষ্ট্য, সাহিত্যে তার প্রতিফলন দেখাতে গোলাম মুরশিদকে অপরিহার্যভাবেই কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা উদ্ধৃত করতে হয়|
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ¯^াধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হয়| প্রতিষ্ঠা করে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক একটি সমাজব্যবস্থা| সেই সমাজব্যবস্থা যে হঠাৎ করে পাওয়া নয়, তার পেছনেও যে বাংলাভাষী মানুষের গৌরবময় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য সক্রিয়ভাবে কাজ করে, সচেতন বাঙালিমাত্রেরই তা জানা থাকা দরকার| বারবার বলা দরকার, বাঙালির এই শ্রেষ্ঠ অর্জনের সঙ্গে উনিশ শতকে সূচিত জাগরণের সম্পর্ক রয়েছে| এই বোধ সৃষ্টি ও প্রচারের কাজে গোলাম মুরশিদের রেনেসন্স বাংলার রেনেসন্স বইটি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে|
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের আমন্ত্রণে গোলাম মুরশিদ ‘ইটালীয় রেনেসন্স ও বাংলার জাগরণ’ নামে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন| গ্রন্থটি সেই বক্তৃতাটিরই একটি সম্প্রসারিত রূপ| পরবর্তী সংস্করণের ভূমিকায় তথ্যটির উল্লেখ থাকতে পারে| বাংলাদেশের মানুষের শুভবুদ্ধি ও সুস্থ পরিচয় গঠনে এ-বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক, এ প্রত্যাশা|

অগ্নিস্নাত লক্ষ বর্ণমালা
দীপকরঞ্জন ভট্টাচার্য

পাতা উড়ছে| হাতের কাছে ওই যে একরত্তি বইটা অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় আছে, পাতা উড়ছে তার| পাতা উড়ে গেল আবারো, সাদার শূন্য বুক থেকে ফুটে উঠছে এবার অক্ষর — ‘ও মাঝি, সুন্দর মাঝি’| ‘সুন্দর মাঝি’| আহা! আমার যদি এমন এক মাঝি থাকত! ‘সুন্দর মাঝি’! আমার কি তাঁর সঙ্গে অনেককাল আগে,
আলো-বাতাসের অলিন্দে, অঝোরজোর বৃষ্টিধারায়, জোছনাসম্পাতে, অ-প্রকাশ্য, শিহরিত সব বেলা কেটেছে? দোলায়-দোলায়, এক-আকাশ তারার নিচে অথই জলের নাচনে ভাসতে-ভাসতে? ‘ও মাঝি, সুন্দর মাঝি’, বলে বুকের কাছে যেই না ডাক দিয়েছি, বেগুনি-নীলে রক্ত-আঁচড় কাটা প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে গাঙের গভীর, হয়ে উঠেছে শীর্ণ একপশলা আভামাখা ভোরের ছলাৎছল নাগরদোলা|
একটু আলাপ করে নিই পাঠক, আসুন আমার সঙ্গে| বইমেলা ২০১৪-য় ‘মনফকিরা’ থেকে এ-বইটা প্রকাশিত হয়; কবি গৌতম চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ উজানি কবিতা| পড়তে-পড়তে হঠাৎ কেন যেন গুনগুনিয়ে ওঠে, ‘অন্নপূর্ণা উত্তরিলা গাঙ্গিনীর তীরে|/ পার কর বলিয়া ডাকিলা পাটনীরে ॥/ সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটনী|/ ত্বরায় আনিল নৌকা বামা-র শুনি ॥’ — এসব লেখা কি ভোলার? কিংবা ওই পদটি : ‘চম্পক নগরে ঘর চাঁদ সদাগর|/ মনসা সহিত বাদ করে নিরন্তর ॥/ দেবীর কোপেতে তার ছয় পুত্র মরে|/ তথাচ দেবতা বলি না মানে তাঁহারে ॥’ প্রথম রচনাটি কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের অন্নদার ভবানন্দ ভবনে যাত্রার অংশ, দ্বিতীয় পদটি কেতকীদাস ক্ষেমানন্দ রচিত| ‘কেতকী’ মনসার নাম| ঈশ্বরী পাটনীর গল্প শোনেননি কিংবা বেহুলা-লখিন্দর আর চাঁদ সওদাগরের আখ্যান জানেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াই দায়| চাঁদ সদাগর লখিন্দরের সঙ্গে বেহুলার বিয়ে ঠিক করেছিলেন উজানিনগরে| তারপরের গল্প তো সবারই জানা| পুতুলনাচে, যাত্রায়, ছবিতে — রঙিন-হয়ে-থাকা ছোটবেলার সবটুকু জুড়ে উপকথার এসব চরিত্র|
অন্নদামঙ্গল আর মনসামঙ্গল| এই আখরগুলো তিনশো বছর উজান বেয়ে সময়ের কোন মহাসমুদ্র থেকে ভেসে আসে আজ? এই বইটির লেখাগুলো পড়তে-পড়তে ভেসে আসে — বলছিলাম না, একটু আগে? ‘আকাশ অনন্ত শূন্য পুণ্যবানে ধায়/ দূরে শ্যাম গ্রহখানি বান্ধিছে মায়ায়’ — এ যে সেই প্রাচীনা সুর, গায়ে কবেকার শ্যাওলা-ধরা, মাথা দুলিয়ে ঝিম হয়ে পড়ার মতো দুলকি চালের পঙ&ক্তিগুলো, মনে আসবে না| যেন সরল বালিকার মতো এর ¯^ভাব, মধ্য-তিনতালের কোনো বন্দিশের মতো এর স্পন্দন| তুমি উথালপাতাল চাও, তরুণ? আকাশ
ভেঙে-পড়া, বালিয়াড়ির হাওয়ার মতো, খড়কুটোর মতো দীর্ঘ উড়োঝুড়ো অক্ষরমালা চাও? তাহলে কবির অন্য আর এক কাব্যগ্রন্থের দরোজায় (আখেরি তামাশা, ছোঁয়া প্রকাশন, ২০১৩) আরেকদিন গিয়ে দাঁড়াবে, কেমন? দু-টি-তীরে ¯^চ্ছ বাঁধন দিয়ে, মনের দশতলা আঁধার-সুড়ঙ্গ থেকে তিরতিরে এক নিমগ্ন বিষাদকে মন্দাক্রান্তায় বইয়ে দেওয়ার জন্যই তো এই আয়োজন আজ; ওই যে বলেছেন তিনি : ‘বাক্যের আসল মজা তো তার বান্ধব/ সাঁটেসোঁটে ঠারেঠোরে কে কত ধারালো কইরা কইবার পারে’ (‘এশেকের আসমানিযান’, আখেরি তামাশা) … আজ সেই ঠারেঠোরে বলা|
এই বইটির তিনটি পর্ব : (১) ও মাঝি, সুন্দর মাঝি, (২) অপরিচয়ের ছায়ানট এবং (৩) চিদঙ্গ মৃদঙ্গ| আজ এই বইটির
কথাই বলব| আর মাঝেমধ্যে পেরিয়ে যাব এই বইটির প্রান্তর, এর ভাব বুঝে নিতে হয়তো আখেরি তামাশার জাফরিগুলোর ফাঁক দিয়ে একপলক ভেতরে তাকাব| উজানি কবিতার শুরুর বিভাব কবিতাটি একবার পড়ে নিই : ‘ছুঁইবার পারি নাই জাদু/ রাইন্ধাছি বি¯^াদু নানা ব্যঞ্জন/ তারাই পাত্রে পাত্রে/ ছড়ায় দিবস রাত্র নিজ গঞ্জন/ তবু ¯^ভাব মর্মে/ ঘনাই কৃতকর্মে অতিরঞ্জন/ কে দিবে যথা স¤^র/ ঘ্রাণে আকুল অ¤^র — মানভঞ্জন/ ˆহবে কি কভু শূন্যের/ অশ্রু পুরিবে পুণ্যে নীল অঞ্জন/ শিখাবে সে রন্ধন/ আছে এমন অন্ধ নিরঞ্জন?’| এর আগের কাব্যগ্রন্থ আখেরি তামাশার, ‘এশেকের আসমানিযান’ দীর্ঘ কবিতাটির একটা-দুটো পঙ&ক্তি হাওয়ায় উড়ে আসে না হঠাৎ? ‘শান্তি নাই, কুনু শান্তি নাই/ যদি বাক্য নাই, তবে শান্তি নাই’; উড়ে আসে না, ওই একই কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতাটির আরো দু-চারটি পঙ&ক্তি? ‘শূন্য ˆহতে শুরু ˆহল ভিক্ষুকের পরম প্রত্যুষ/ শূন্য না ˆহলে ভিক্ষা সম্ভবে না, সম্ভবে না হাহা আর্তরব/ রোদনধ্বনির মতো দোতারা বাইজা উঠে শূন্যতা নিগুড়ায়া/ জাগো শূন্য বাজো শূন্য শুরু করো গ্রামপরিক্রমা’| ‘মানভঞ্জন/ ˆহবে কি কভু শূন্যের’ — আবার পড়ি! ওই শূন্যে এই শূন্য মিশে যায়| ‘রাইন্ধাছি বি¯^াদু নানা ব্যঞ্জন’-এর গা-ঘেঁষে রাখি এই পদটিকে, ‘যদি বাক্য নাই, তবে শান্তি নাই’| বাক্যে-ব্যঞ্জনে ভেদ কোথায়! তবে কি শূন্যতার দিকে উত্থিত সব বাক্যের তৃষ্ণায়, না-পাওয়ার বেদনায়, আচার্যের সন্ধানে … ঘনঘোর প্রতিটি রাত্রি মিশে যায় কবির?
‘কালান্তক কেন মেল গ্রাস’ — কোনো এক অনাবিষ্কৃত বোধের নিরালা থেকে এ প্রশ্ন-ব্যাকুল পঙ&ক্তিটি আমাদের রক্ত তোলপাড় করে উঠে আসে; যত তার আকৃতি, ততই অনিবার্যতা যেন ডালপালা মেলে দেয়| কালান্তক — সে তো হঠাৎ একদিন সমূলে উৎখাত করবার প্রস্তুতি নেবেই, তৃণমূলের সমস্ত মাটি সঙ্গোপনে ঝরিয়ে দিয়ে বিশাল এক হাঁ বাড়াবেই| অনিবার্য বলেই তো, এই কবিতার শেষে, বিদায়ের জন্য প্রস্তুত কবিকে বলতে হয়, ‘মেলি ধর কালান্তক গ্রাস/ সে আমার অসহ্য উল্লাস’| কিন্তু বিদায়বেলায় আর তো তত ব্যথিত নন কবি! মহাকালের বুকে নশ্বরের একটি প্রার্থনা-পতাকা উড়িয়ে দিতে পেরেছেন যে তিনি| গহন আঁধার, তবু চোখে তাঁর মহাদৃশ্য, নক্ষত্রে ঝলমল করছে তাঁর মনের আকাশ! ‘অনন্ত সোপানরাশি শুনি কোন জাদুবাঁশি/ অতলান্তে গেছে ভাসি/ আন্ধারের গহন উদ্ভাস/ চক্ষে তবু মহাদৃশ্য শরশয্যাগত ভীষ্ম/ নাড়িতে চঞ্চল বিশ্ব/ শেষ বিন্দু পানের প্রয়াস|’
এই তো ¯^প্ন| আচ্ছা, ওই পঙ&ক্তিটা মনে আসে না : ‘তোমার দর্শনে শুধু পরম অন্ধতা, শুধু ঘনঘোর স্পর্শের ইন্দ্রিয়’ (আখেরি তামাশা)? অথবা, ‘চক্ষু দুটি বন্ধ করলি কেবলই দৃশ্যের ঢল নামে/ তবে কি দৃষ্টির ছায়াদৃশ্য আরও তীব্র সুগভীর (‘এশেকের আসমানিযান’, আখেরি তামাশা); কিংবা, ‘দৃষ্টি কুন কামে আসে মনের খবরে?/ তবে চক্ষু বন্ধ করো, লাফ দিয়া পড়ো সিধা ইন্দারার অনন্ত আন্ধারে’ (‘ঘুইরা ঘুইরা বুঝো মন’, পর্ব ৫, আখেরি তামাশা)| মগ্ন-স্থিরতার বুকে দৃশ্যের চলচ্চিত্র — এই তবে কবির অভিলাষ|
এর অধিক আর কী-বা পাওয়ার থাকে? তাঁর নিজের বয়ানে, রচনা তার অনিশ্চয়তার গভীরে ডুব দিয়েছে, কানাকড়িও মূল্য নেই তার| ‘আন্ধার’ পার হয়ে যাওয়ার আর কি উপায় আছে? পারানি কোথায়! শুধু আর্তি, স্পর্শভিক্ষা আর সমর্পণ, আর কিছু তো নেই|’ নক্ষত্র¯^রূপ থিকা বৃষ্টির লাহান কুনু ¯^প্নচুক্ষু ঝইরা পড়ব না/ তবু চায়া যাইতে ˆহব’ (‘আখেরি তামাশা-১’)| আছে, এক অদেখা বন্ধু| বোধের মর্মতলে সর্বক্ষণ জেগে আছে সে, জলসিঞ্চন করছে| পতিত হওয়ার এক গূঢ় নিরুপায়তা জাগানোই তার কাজ| আছড়ে পড়ার আগের শূন্যতায় ¯^প্নের কারুকাজ তার সহজাত|
সেই-যে বন্ধু, তাকে তো ছোঁয়া যায় না, কী তার উদ্দেশ্য তাও অজানা| তার সঙ্গে কখনো কি দেখা হবে না? মাঝরাতের তারারা জানে না তার পিপাসা? তার একান্ত দৃশ্যমিছিল, বোধের ‘বিরান’ প্রান্তর, রাত্রির অস্থিরতা — সমস্ত মিথ্যা? দ্বিধাথরথর আত্মপ্রশ্ন, প্রশ্নেই তার পথ-খোঁজা, ভেসে আসে প্রতিদিন, ‘তবে কি এ মনস্কামে নক্ষত্রেরা মধ্যযামে/ স্পর্শে নাই নিভৃত আহ্বান’ — কোন মনস্কাম? বোধহয়, এক ‘তুমি’ কে পাবার| কে সেই ‘তুমি’? যে ‘তুমি’র উপস্থিতিতে ‘সব পন্থা করি ভেদ কোরান পুরাণ বেদ/ আন্ধারে কী পুষ্প উঠে ফুটি’, এবং যে ‘তোমার আখর বিনা/ পত্রপাঠ দীনহীনা/ দশমীর বিষণ্ন দেউটি|’ সুনির্জন এক ‘বন্ধু’কে খুঁজছেন কবি — মহাজগতের ‘থিরিথিরি’ দৃশ্যময়-অদৃশ্যময় উদ্ভাসের চালচিত্রে বুভুক্ষু এক প্রাণ| যেন সুরেলা বাজনার দিকে শ্বেত-খরগোশের মতো অঝোর রক্তধারায় ভিজে-ওঠা তার পথ, ‘কাঁটাঝোপে ছুইটা যায় চান্দপানা ফক&ফকা খরগোশ/ গাও দিয়া ঝরে খুন, চক্ষু দিয়া ঝরে রক্তধারা/ তবুও ছুইটা যায় কাঁটাঝোপে/ যেন বা ওইখান ˆহতে বাইসা আসে কতগুলা সুরেলা বাজন/ কেবলই হাতছানি দেয়…’ (‘আখেরি তামাশা-৩’)|
কবি গৌতম চৌধুরীর অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে এক তান্ত্রিক গহনতা| অনেক অন্ধকার আর একঝলক আলো, অনেক দিশাহীনতা আর বন্ধ-চোখের আশ্চর্য দৃশ্যমালা, অনেক প্রশ্ন আর, হয়তো কখনো একবিন্দু উত্তর ‘আন্ধারের বক্ষ চিরি উঠিছে অরক্ষ্য সিঁড়ি/ গুপ্ত কক্ষে…’| উত্তরও আসলে উত্তর নয়, আবার শুরু হয় খোঁজ : কোথায় পথ, কী সত্য, অন্ধকার জাগিয়ে তোলার আলোই-বা কোথায়? আর সেই সুন্দর মাঝি, সেও তো ‘অপার’, শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের থেকেও সুদূর, ‘সপ্ত ঋষি ফেলে ছায়া/ ভাসে নৌকা মহামায়া/ সুন্দরিয়া মাঝিরে বোলাই/ ওগো মাঝি, ও অপার লুক্কায়িত কেন আর/ দেখা দাও, জ্বালো দিয়াশলাই’ — মহাকালের ভ্রূকুঞ্চন পেরিয়ে, অতলান্ত খাদ আর তুমুল গহ্বর পেরিয়ে, কোনো সুন্দর মাঝির দিকে শিশুর মতো টলোমলো পায়ে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন; ‘জিহ্বা লকলক কাঁপে শূন্যে ভাসমান স্তব্ধ বাক& রাশি লেহনের লাইগ্যা/ যেন& কোন আজম্মের পিপাসায় কণ্ঠ শুকাইয়া কাঠ’ (‘আখেরি তামাশা’, পর্ব-২)
এই সুন্দর মাঝিই কি সেই ‘তুমি’? যে ‘তোমার আখর বিনা/ পত্রপাঠ দীনহীনা/ দশমীর বিষণ্ন দেউটি’? মাঝি কি সুনির্জন সেই ‘বন্ধু’? ‘ও মাঝি, সুন্দর মাঝি, কেন রঙ্গ কর/… নাহি কি উপায়, যদি পুনঃ করি শুরু/ আনো বর্ণপরিচয় অমাবস্যায় চন্দ্রোদয়/ দিব গো দক্ষিণা চক্ষু, হও মোর গুরু’; সেই যে ‘অপার’ — তাঁর কাছে সমর্পণ, সমর্পণ এবং সমর্পণ! ‘করজোড়ে চাহি ভিক্ষা মান, আমার দেহ দীক্ষা/ দুর্জয় গণিতে’; — ‘ইচ্ছা করে বারংবার চন্দ্ররেখা স্পর্শিবার/ একান্ত নিভৃতে’| ‘মন’ তবে গুরু? ‘মাঝি’ গুরু? ‘বন্ধু’ গুরু? ‘চমকে উঠি বিজুরি নাইমা আসে বটঝুরি/ ভেদ করি স্তম্ভিতের হিয়া’ — তবে কি অপেক্ষারত কবির অপেক্ষার নিরসন হলো? কেননা, তাঁর মর্মতলে একটি প্রদীপশিখা জ্বলে উঠে পরিক্রমা শুরু করেছে, এ-কথা আমরা জানতে পারি, অনেক দীর্ঘশ্বাসের পর একটি প্রশ্বাসের শান্ত আওয়াজ শুনি যেন| কিন্তু সে শান্তি ক্ষণিকের| মহাসময়ের, মহাপৃথিবীর, ব্যক্তি অন্তর্গত রহস্যের সন্ধান কি সহজ| ‘একবার আলোয় অন্যবার আন্ধারে/ ঝলকায়া উঠে তোমার সুরত/ যেন& মস্ত এক কাপড়ের ফালির ভিত্রে/ একখান সুইয়ের মাথা/ একবার ঢুকতাছে আবার বাইর ˆহয়া আইতাছে’ (‘আখেরি তামাশা’, পর্ব ১০)
যুগ কীভাবে একজন কবিকে ধারণ করবে, এ-কথা বোঝা বড়োই কঠিন; কিন্তু প্রকৃত কবিতা প্রকৃত পাঠকের আকাশপথে উড়ে আসবে একদিন, মাটির গোপন থেকে উঠে আসবে, গুহালিপি থেকে উঠে আসবে, দিন-মাস বছর-শতক পেরিয়ে উঠে আসবে, এই আমাদের আশা| চর্যাপদ থেকে গেছে যেভাবে, তার গাঢ়তা এবং গূঢ়তা নিয়ে, এতগুলো শতক! কবি গৌতম চৌধুরীর এই গহন লেখাগুলি পাঠক কতদূর অবধি স্পর্শ করতে চেয়েছেন বা পেরেছেন আমাদের জানা নেই| কিন্তু বিপুল কবিপ্রতিভা নিয়ে, মাথা নত করে, মঞ্চ থেকে যোজন-যোজন দূরে, অন্ধকারে অগ্নিস্নাত লক্ষ বর্ণমালা জ্বেলে, একজন আত্মপিপাসু বেদনাহত ছদ্মবেশী দেবদূতের মতো নিঃশব্দে তিনি একের পর এক আশ্চর্য কবিতা লিখে চলেছেন!
জীবনভাবুক তিনি, সম্ভবত রাত্রি তাঁর ভারের সূতিকাগার| এখানেই যত নিরুত্তরের আর উদ্বোধনের প্রশ্নমালার জন্ম| তাঁর এই প্রশ্ন নিছক নিজের সঙ্গেই কথা হয়তো, এক গহন ‘তুমি’র সঙ্গে নিরন্তর স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার বিস্তার| তাঁর ¯^য়ং-নিয়োজিত আচার্যের ইঙ্গিতগুলো অনূদিত হয় এখানেই| জীবনের সঙ্গে কাব্যভাবনার সঙ্গে, বিশ্বজগতের সৃষ্টিরহস্যের সঙ্গে জড়িত আত্মপ্রশ্নগুলির উত্তর তাঁকে পেতেই হবে| নিজেকে অজস্র ক্ষয়ক্ষতিতে জড়িয়ে ¯^চ্ছভাবে বুঝে নিতে হবে অভিমুখ| বুঝে নিতে হবে, ‘কীভাবে জ্বালায় বীজ বৃক্ষে বৃক্ষে হিয়া’ … ’, কিংবা, ‘কীভাবে গহন গুহ্য বাক্যরাশি ঝলে’| সময় নেই, সময় নেই তাঁর; … রাত্রির বিশাল থানে ওস্তাগরি-না-জানা অসহায়তায় প্রতিদিন সেলাই করা হচ্ছে এক জাদু-উন্মোচনের আর্জি! প্রতিদিন তাঁর বন্ধুকে খুঁজে চলার অসহায়তা জমা হচ্ছে : ‘বাক্যের আড়ালে খুঁজি সে বন্ধুর গলিঘুঁজি/ পুরে না মনোরথ’ — তাহলে! মনোগহন থেকে প্রার্থিত সেই বাক্যের মাঝ-বরাবর আকাশ অবধি বেঁকে যাওয়া দীর্ঘ মিড়ের মতো সেই সেতু-পথ দিয়ে সে-বন্ধুর কাছে পৌঁছানোর পথ কি এখনও তমসায় ঢাকা ‘একটি মাত্র প্রজ্বলন’ — , একক এক সন্দীপনও তাঁর ভিক্ষালব্ধ নয়! ক্ষণিক এক গন্ধর্বজন্ম, তাঁর জন্য, গানের স্নিগ্ধতায় যিনি লিখতে পারেন এসব মর্মস্পর্শী কবিতা :

পাগল আমার নিদ্রাগত সর্ব অঙ্গে অঝোর ক্ষত
লহুতে ভাসে নিশি
দু’চক্ষু তাও ¯^প্নে আঁকা অমাবস্যায় গহন রাকা
প্রান্তরে নীল শিশির

বাতাস ভরা শীর্ণ পাঁজর উড্ডয়নে লাগল না জোর
আসমানে সাত ঋষি
তাকিয়ে আছেন ধ্যানস্তব্ধ কত না কাজ আজও আরব্ধ
যোজনব্যাপী কৃষি
পাগল আমার ঘুমায় ঘুমাক কপালে তার আধেক চুমা
দিও গো দশদিশি
জাগরণের মন্ত্রগুপ্তি ঘুচায় আমার সব সুষুপ্তি
সাগরে যায় মিশি

যুদ্ধদিনের রোজনামচা
জোহরা শিউলী

‘২৬ মার্চ| তখনো অন্ধকার| সূর্য ওঠার অনেক দেরি| দুমাসের শিশুর পাশে ঘুমিয়েছিলাম| হঠাৎ কানে এলো, পুরুষের ভাঙা কণ্ঠ¯^রে কারা যেন বাড়ির সামনের বড় রাস্তা দিয়ে মাইকে কিছু জানিয়ে যাচ্ছে| কী? নিশ্চয় বড় কোনো সংবাদ| তড়াক করে বিছানা ছেড়ে দৌড়ে ‘সাহিত্য নিকেতনে’র সামনের বারান্দায় ছুটে গেলাম| বাবা আবুল ফজল দাঁড়িয়ে দেখছেন ও শুনছেন দশ-বারোজন শ্রমিকের মতো মানুষের মুখে অমোঘ সেই ঘোষণা ‘…শেখ মুজিব বাংলাদেশের ¯^াধীনতা ঘোষণা করেছেন…!’ হালকা কুয়াশার চাদরে ওদের অশরীরী মনে হচ্ছিল| সর্বদেহ-মনে এক শিহরণ অনুভব করলাম| বাবা বললেন, ‘জহুর আহমদ চৌধুরীর লোক| তিনি কোনোভাবে খবর পেয়েছেন নিশ্চয়| তাঁর লোকদের দিয়ে আমাদের জানিয়ে দিলেন| তোর শরীর এখনো দুর্বল, শেষ রাতের বাতাসে ঠান্ডা লেগে যাবে, যা ভেতরে|’
বাবা-মেয়ের কথোপকথনে এভাবে বইটির শুরু| শুরু তো হলো, তারপর কি লেখক কাহিনি-লেখনীতে এমন চমক দিয়ে ধরে রাখতে পেরেছিলেন তাঁর পাঠককে? পুরো বইটি একনিঃশ্বাসে শেষ করার উৎসাহ জুগিয়েছিলেন কি? পাঠক হিসেবে আমার উত্তর — হ্যাঁ, শতভাগ হ্যাঁ| কেননা, একশ আটাশ পৃষ্ঠার বইটির প্রতিটি পরতে পাঠক পাবেন যুদ্ধদিনের কথা| সে-সময় মানুষের
ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবনের ভয়াবহতাও ফুটে উঠেছে সাবলীলভাবে| পাঠক, ভাবছেন কোথায় পেলাম এমন যুদ্ধদিনের কথা? এবার তাহলে আলোচনায় আসা যাক| বলছিলাম মমতাজ লতিফের যুদ্ধ ও আমি বইটির কথা|
লেখক বাবা আবুল ফজল কীভাবে সন্তানদের, তাঁর অনুজদের যুদ্ধদিনে দিয়েছেন নিরাপত্তার ছাতা — এ-বইয়ে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা রয়েছে|
তবে এবার আমরা একটু না-হয় জেনে নিই বিখ্যাত এই বাবার কন্যা যুদ্ধ ও আমি বইটির লেখক মমতাজ লতিফের কথা| মমতাজ লতিফ ১৯৪৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং পরে পেশাগত উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করেন এডিনবরা থেকে| মমতাজ লতিফ প্রধানত রাজনৈতিক কলাম-লেখক হিসেবে পরিচিত| গবেষণা করেছেন শিশুর বিকাশে মা-বাবা-শিক্ষকের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা বিষয়ে| ছাত্রজীবনে ছাত্ররাজনীতিতে গভীর আন্তরিকতা নিয়ে একটি ¯^াধীন মাতৃভূমির ¯^প্নের লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকায় ছিলেন — নেতা হিসেবে নয়, কর্মী হিসেবে| ওই ¯^প্নপূরণে একদিন যখন শত-শত, হাজার-হাজার, লাখ-লাখ তরুণ-তরুণী একাত্তরের যুদ্ধযাত্রায় শামিল হলেন, তখন তিনি অসহায় হয়ে দেখলেন দুই শিশু তাকে ওই ¯^প্নযাত্রার পথ রোধ করে দাঁড়াল! সূর্য সেন, চে গুয়েভারা যাঁর ¯^প্নপুরুষ, তিনি একা একালের চে গুয়েভারাদের সঙ্গে রাইফেল-হাতে যোগ দিতে পারলেন না, হয়ে থাকলেন অ-মুক্তিযোদ্ধা| তিনি মুক্তিযুদ্ধকে শুরু হয়ে শেষ হতে দেখেছেন, যা তিনি তাঁর জন্য দুর্লভ সৌভাগ্য হিসেবে গণ্য করেন| কেমন ছিল তাঁর শিশুসন্তান, ভাই, মা-বাবা, শিক্ষক, আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে একত্রে মুক্তিযুদ্ধের অগ্রযাত্রায় জীবনের অদেখা বদ্ধ দুয়ার? নানা দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে জীবনের মহৎ, শুভ-অশুভ চেহারাকে দেখার আনন্দ-বেদনার অভিজ্ঞতা, তা পাঠককে জানানোর এক দীর্ঘদিনের লালিত ইচ্ছা পূরণ করতে তিনি লিখেছেন এ-বই| মুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবরুদ্ধ ছিলেন তিনি| সে-সময়ের যে-যুদ্ধদৃশ্য অবলোকন করেছেন, শুনেছেন তারই বিশদ বর্ণনা যুদ্ধ ও আমি|
বইটিতে বাবা লেখক আবুল ফজলের দুর্দিনের দিনলিপি থেকে উদ্ধৃতিতে বর্ণিত হয়েছে নেতাদের দেশভাগের অযৌক্তিকতা, যা লেখকের নিজ জীবনে দেখা এক ভাবি ও এক আপার ’৭১-এ দুরকমের দুর্বিপাকে প্রতিফলিত হয়েছে| বইটিতে মাঝে-মাঝেই তিনি চলে যান অতীতে, আবার ফিরে আসেন যুদ্ধদিনের ঘটমান বর্তমানে| রচনাটির কলেবর ছোট কিন্তু এতে মা নারীনেত্রী উমরতুল ফজল এবং ভাইয়েরা; খালা, মামা, চাচাসহ অনেক ¯^জন, খানসেনা, মুক্তিযোদ্ধা নিজ-নিজ ভিন্নতা নিয়ে উপস্থিত| সবার ওপরে যুদ্ধ প্রধান নায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যার আবির্ভাবের জন্য মনে-মনে সে-সময়ের তরুণ-তরুণীরা অপেক্ষমাণ ছিলেন|
যুদ্ধদিনের খানসেনাদের ভয়ংকর যে-মূর্তি আমরা দেখি তার কিছু ছিন্ন ঘটনা হতবাক করে দেয় বইকি| যেমন লেখকের এক খালা যুদ্ধসময়ে চট্টগ্রামের দামপাড়া চট্টেশ্বরী রোডের ছোট বাঁশের বাড়িতে বাস করতেন| একসময়ে খানসেনাদের নজরে পড়ে বাড়িটি| সেই বাড়ির মেয়েদের দিকে নজর পড়ে তাদের| প্রথমদিন বাড়িতে হানা দেওয়ার সময় কিশোর ছেলেটি যখন পথ আগলে রাখে আগে তাকে গুলি করার জন্য, তখন বাঙালি এক খানসেনা ট্রানজিস্টার দামি বলে অন্য খানসেনাদের লোভ দেখিয়ে সেদিনের মতো তাদের বাড়ি থেকে বের করে নেন| আর লেখকের খালাদের হুঁশিয়ার করেন, ‘আর একমুহূর্ত দেরি না করে চলে যাবেন|’ এমন বিস্মিত হওয়ার অসংখ্য ঘটনা ছড়িয়ে ছিল একাত্তরে|

সাহিত্য সমাজের কর্মধারা
তপন বাগচী

কেবল সংগ্রহ ও সম্পাদনার মাধ্যমে যে বাংলা সাহিত্যে মৌলিক অবদান রাখা যায়, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পরে আবুল আহসান চৌধুরী তার বাস্তব প্রমাণ রাখলেন| পার্থক্য এই যে, সাহিত্যবিশারদ অপ্রকাশিত পুঁথি সংগ্রহ করেছেন আর চৌধুরী সংগ্রহ করছেন দুষ্প্রাপ্য, অপ্রকাশিত, অগ্রন্থিত আধুনিক সাহিত্যোপকরণ| সাহিত্যবিশারদের সম্পাদনামানকে ‘জার্মান পণ্ডিত’দের সম্পাদনাতুল্য বলে অভিহিত করা হয়েছে| চৌধুরীর সম্পাদনাকর্ম নিয়ে তেমন মূল্যায়ন করা হলে বিশ্ব প্রেক্ষাপটের উন্নত সম্পাদনাই বিবেচিত হবে| আবুল আহসান চৌধুরী মৌলিক গবেষণা এবং চিন্তাশীল প্রবন্ধ রচনার সমান্তরালে এই যে সংগ্রহ-সংকলন-সম্পাদনা জাতীয় কাজ করে চলেছেন, তা মৌলিক রচনার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চমূল্য বহন করে| তাঁর একটি কাজ আরো অজস্র কাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে| একজন বড় সম্পাদক হিসেবে তিনি এই যে দায় পালন করে চলছেন, তা আমাদের দেশে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পরে আহমদ শরীফ, আনিসুজ্জামান, শামসুজ্জামান খান ছাড়া আর কেউ করেছেন বলে সাহিত্যের বিচারে আমাদের নজরে আসেনি| আবুল আহসান চৌধুরীর সাম্প্রতিক কাজ মুসলিম সাহিত্য সমাজ : সভার সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী ১৯২৬-১৯৩৮ সামনে নিয়ে এই কথা মনে এলো|
আবুল আহসান চৌধুরী মীর মশাররফ হোসেনের সংগীত লহরী সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন| সুরশিল্পী কে. মল্লি­কের অসমাপ্ত আত্মজীবনী উদ্ধার ও সম্পাদনা করে জাতীয় জাদুঘর থেকে প্রকাশ করেছেন| শচীন দেববর্মনের সরগমের নিখাদ গ্রন্থটি তাঁর সংগ্রহ ও সম্পাদনার ফসল| তিনি কাঙাল হরিনাথ মজুমদার রচনাবলি, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার স্মারকগ্রন্থ, কাজী আবদুল ওদুদের পত্রাবলি, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ রচনাবলি, কাজী মোতাহার হোসেন রচনাবলি, ভাষা-আন্দোলনের দলিল, প্রসঙ্গ হাছন রাজা, লালন স্মারকগ্রন্থ, লালনসমগ্র প্রভৃতি গ্রন্থ সংকলন ও সম্পাদনাই কেবল নয়, এর অন্তর্ভুক্ত রচনা সংগ্রহ ও সংকলনের দায়িত্ব পালন করেছেন| যেনতেন প্রকরণে ভূমিকা লিখে সম্পাদনা-গ্রন্থ রচনার এই বাজারচলতি ধারায় আবুল আহসান চৌধুরী এক ব্যতিক্রমী
সাধক-গবেষকের নাম|
দুষ্প্রাপ্য দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাস-নির্মাণে আবুল আহসান চৌধুরীর অবদান দুই বাংলার বিবেচনাতেই তুলনারহিত| তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অপ্রকাশিত সাতটি চিঠি উদ্ধারের মতো বড় কাজ করেছেন| রবীন্দ্র-সংগৃহীত লালনের গানের পাণ্ডুলিপি উদ্ধার ও হুবহু প্রকাশ করে তিনি বাঙালির কাছে ধন্যবাদার্হ হয়েছেন|
মুসলিম সাহিত্য সমাজ : সভার সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী ১৯২৬-১৯৩৮-এর দিকে সাদামাটা দৃষ্টিতে তাকালে মনে হতে পারে, কী এমন কঠিন কাজ! কার্যবিবরণীর খাতা জোগাড় করে একটা ভূমিকা লিখে পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া কী এমন
কৃতিত্বের কাজ! কিন্তু বড় কথা হলো, মুসলিম সাহিত্য সমাজের কর্মকাণ্ড এবং এর কর্ণধারদের জীবনকর্ম নিয়ে বেশ কয়েকটি পিএইচ.ডি অভিসন্দর্ভ রচিত হলেও এই কার্যবিবরণীর মতো মৌলিক উপকরণ অনেকের কাছেই ছিল অদৃষ্টপূর্ব| কেবল গবেষণা-উপকরণের জন্যই নয়, এই কার্যবিবরণীর ‘আর্কাইভাল ভ্যালু’র জন্যও এর প্রকাশনা খুব জরুরি ছিল| পাঠ করে তো বটেই, দেখেও চোখের সুখ হয়| এই বিষয়টি বিবেচনা করে প্রকাশক সাহিদুল ইসলাম বিজু এর প্রতিলিপি সংস্করণ প্রকাশ করেছেন উন্নত কাগজে এবং কার্যবিবরণী লেখার খাতার আকার অক্ষুণ্ন রেখে| এতে উৎপাদনমূল্য যত বেড়েছে, সংগ্রহোপযোগিতা বেড়েছে আরো বেশি|
বইটির তিনটি অংশ — নিবেদন, ভূমিকা ও সভার কার্যবিবরণী| নিবেদন অংশে এই বিবরণী প্রকাশের প্রেরণা ও প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন| সম্পাদক জানিয়েছেন, এই খাতা কাজী আবদুল ওদুদের হাত থেকে তাঁর জামাতা শামসুল হুদার হাতে আসে| শামসুল হুদাও ছিলেন মুসলিম সমাজের একজন সক্রিয় সদস্য| আবুল আহসান চৌধুরী পেয়েছেন কাজী আবদুল ওদুদের দৌহিত্র ও শামসুল হুদার পুত্র এনায়েত আকবর যিশুর কাছ থেকে| তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক আহমদ নূরুল ইসলাম এর আগে খাতাটি ফটোকপি করে নেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের মুখপত্র পাণ্ডুলিপিতে তা মুদ্রিত হয়| কিন্তু আবুল আহসান চৌধুরী এবার গ্রন্থাকারে প্রকাশ করলেন সেই খাতার প্রতিলিপি| সম্পাদক জানিয়েছেন, এই কাজে তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিলেন অধ্যাপক ডক্টর আহমদ শরীফ| পরে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, আহমদ নূরুল ইসলাম, ভূঁইয়া ইকবাল, খোন্দকার সিরাজুল হক প্রমুখের সহযোগিতা ও সমর্থনে কাজটি বাস্তবায়িত হয়| সম্পাদক মনে করেন, ‘কার্যবিবরণীর খাতাটি প্রকাশের ফলে হয়তো অনেকেই মুক্তবুদ্ধিচর্চার এই সংগঠনটি সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে উঠতে পারেন এবং সেইসঙ্গে এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা-গবেষণার জন্যে তথ্যের জোগান পেয়ে উপকৃত হবেন কেউ কেউ — সেখানেই এই প্রকাশনা-উদ&যোগের বিশেষ গুরুত্ব ও প্রকৃত সার্থকতা|’
ভূমিকাংশে সম্পাদক তুলে ধরেছেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের কথা, শিখা পত্রিকাকেন্দ্রিক শিখাগোষ্ঠীর কথা, সাহিত্য সমাজের অধিবেশনে অংশগ্রহণকারীর কথা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য| বলা বাহুল্য, মৌলিক উৎস থেকে তথ্য গ্রহণ করেছেন বলে আবুল আহসান চৌধুরী পূর্বপ্রকাশিত অনেক তথ্যবিকৃতি ও তথ্যঘাটতি পূরণ করতে পেরেছেন| একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে| এতদিন সকলের কাছে জ্ঞাত ছিল, মুসলিম সাহিত্য সমাজের কার্যকাল ছিল দশ বছর| রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ডক্টর খোন্দকার সিরাজুল হক তাঁর পিএইচ.ডি অভিসন্দর্ভভিত্তিক মুসলিম সাহিত্য-সমাজ : সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম (১৯৮৪) গ্রন্থে বলেছেন, ‘এই সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান বাঙালি মুসলমান সমাজের জাগরণ আনয়নের জন্য সমষ্টিগতভাবে দশ বছর ধরে (১৯২৬-৩৬) একাগ্র চেষ্টা চালিয়েছেন|’ জাতীয় অধ্যাপক
মুস্তাফা নূরউল ইসলামের শিখাসমগ্র (২০০৩) গ্রন্থের প্রথম ফ্ল্যাপে
লেখা হয়েছে, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ টিকে ছিল এক দশক
(১৯২৬-১৯৩৬)’| এই ভুলটিই সমাজে প্রচলিত| আবুল আহসান চৌধুরী মুসলিম সমাজের মূল খাতা উদ্ধার করে দেখালেন যে, এই সংগঠনের কার্যকাল ছিল তেরো বছর| তবে মাঝখানে ১৯৩৭ সালে এই সংগঠনের কোনো বিবরণী পাওয়া যায়নি|
মুসলিম সমাজের কার্যবিবরণীর লেখা ছিল নীল কালিতে| লাল কালিতে কিছু সংশোধন ও সংযোজন-বিয়োজন রয়েছে| সেগুলোকে শনাক্ত করে সম্পাদক যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন| কোন পঙ&ক্তি কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, সম্পাদক তা খুঁটিয়ে দেখিয়েছেন| বিবরণীর লেখক অনেক সময় ব্যক্তিনাম ভুল বানানে লিখেছেন, সম্পাদক তাঁর ভূমিকায় তা চিহ্নিত করে ঠিক বানানটি তুলে ধরেছেন| তিনি বলেন, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র আনুপূর্বিক প্রামাণ্য ইতিহাস রচনা বাঙালির সামজিক চিন্তা-চেতনার
পরিচয়-গ্রহণের জন্যে অত্যন্ত জরুরি| বাংলাভাষী শিক্ষিত মুসলমান সম্প্রদায়ের মনের খবর শিখাগোষ্ঠীর লেখক-ভাবুকদের মাধ্যমে যতোখানি ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল, তার গুরুত্ব ঐতিহাসিকভাবে সামান্য নয়| এক-অর্থে এই সামাজিক-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন বাংলার প্রগতিচিন্তার ধারাবাহিকতারই ফসল| বাঙালি বিদ্বৎসমাজ অজ্ঞতা কিংবা অনীহা কিংবা গুরুত্ব অনুধাবনে অক্ষমতা কিংবা উন্নাসিকতার কারণে এক মহৎ ভাবান্দোলনের বিষয়ে নীরব, এ বড় বেদনা ও আফসোসের কথা|’ আমরা আশা করতে পারি যে, এ-গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে সেই বেদনা লাঘব আর আফসোস মেটানোর সুযোগ ˆতরি হলো|
গ্রন্থের তৃতীয় অংশে রয়েছে ‘সভার কার্যবিবরণী’| এই বিবরণী থেকে আমরা সাহিত্য সমাজের কর্মকাণ্ডের দালিলিক প্রমাণ পাই| বিভিন্ন অধিবেশনে যাঁরা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁরা হলেন — চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, খানসাহেব মৌলানা আবদুর রহমান খাঁ, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ&, মৌলানা তোসাদ্দক আহমদ, রমেশচন্দ্র মজুমদার, উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, সুরেন্দ্রনাথ ˆমত্র, মৌলভী হাকিম হাবিবুর রহমান, মাহবুব উল আলম প্রমুখ| বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তা হিসেবে ছিলেন আবুল হুসেন, হেমন্তকুমার সরকার, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল ফজল, আনোয়ারুল কাদির, কাজী মোতাহার হোসেন, সুরেন্দ্রনাথ ˆমত্র প্রমুখ| প্রতিটি অধিবেশনে সংগীতের আয়োজনও চলত| কাজী নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ হোসেন খসরু, অর্ধেন্দুভূষণ মুখোপাধ্যায়, যূথিকা রায়, প্রতিভা সোম, রমা নাগ প্রমুখ| এই আন্দোলনে নারীদের সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা ছিল| তাই আমরা দেখি, ফজিলাতুন নেসা, ফাতেমা খানম, বেগম শামস&উন নাহার, সুজাতা রায়, করুণাকণা গুপ্তা, খুরশীদ জাঁহা বেগম, সুজাতা রায়ের নাম| প্রকাশ্য সভায় মুসলিম মেয়েদের সংগীত-পরিবেশনাও এক বিপ্ল­বাত্মক ঘটনা বইকি! সার্বিক অর্থেই তাঁদের আন্দোলন ছিল প্রগতিশীল রেনেসাঁস| সব শেষে বলার, এই সম্পাদনার মৌলিকতাই আবুল আহসান চৌধুরীকে বাংলা ভাষার গবেষকদের সারিতে শীর্ষ আসন দিতে চায়!

দুঃস্বপ্নের চরিত্ররা
সুব্রত সেনগুপ্ত

এক সময় ‘মহিলা লেখক’ কথাটা প্রচলিত ছিল| এই নামকরণের পেছনে থাকত কিছুটা স্নেহ এবং তারও বেশি অনুকম্পা| একবার এক প্রতিষ্ঠিত পুরুষ-লেখক মহিলাদের উদ্দেশে লিখেছিলেন —, তাঁদের মেয়েলি সমস্যা-টমস্যা, ঘরকন্নার নানাদিক, মেয়েদের মেয়ে হিসেবে চেনাজানা বিষয় নিয়েই লেখা উচিত|
লিখেছিলেন এবং সে-সময়ের জনপ্রিয় এক লেখিকার বিরাগভাজন ও ভর্ৎসিত হয়েছিলেন| পরবর্তীকালে বাণী রায়, মহাশ্বেতা দেবী, কবিতা সিংহরা এই ‘অপমানজনক’ তকমা অবহেলার সঙ্গে ছুড়ে ফেলে দেন| বা সাহিত্যক্ষেত্রের বাইরেও এরকম মনোভাবের উদাহরণ হিসেবে আমি এক মহিলা আইপিএস অফিসারের কথা বলতে পারি| তিনি ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করলে বিরক্ত হন|
এখন পুরুষপক্ষের অনেকেরও মনের পরিবর্তন হয়েছে| রাজ্যসভার প্রধানের পদ, যেহেতু অনেক সময় মহিলারাও অলংকৃত করেন, এই গুরুত্বপূর্ণ পদকে তাই চেয়ারম্যান না-বলে বলা হয় চেয়ারপারসন|
পম্পা বিশ্বাসের গল্পের বিষয় ও আঙ্গিক পেলবতা, মসৃণতা, কোমল ভাব, এসব যে নেই, তা বলা বাহুল্য| বরং তাঁর লেখায় আছে এক ধরনের রুক্ষতা বা তার চাইতেও কিছু বেশি| আবেগ ও মন্তব্যহীন ভাষায় পাঠককে প্রস্তুত হতে একটুও সময় দিতে নারাজ লেখিকা সরাসরি কোনো ভয়ংকর দৃশ্য বা ঘটনার কথা বলেন| তাঁর গল্প পড়তে-পড়তে চমকে ওঠারও যেন সুযোগ নেই| তাঁর মেদহীন, দৃঢ় ভাষা ও ভঙ্গি এবং বর্ণিত বিষয় শুধু তীরের মতোই বিদ্ধ করে না পাঠককে, বরং ক্ষত-বিক্ষত করে, ছিন্নভিন্ন করার ধারালো কোনো অস্ত্রে| এর মধ্যে যেন অমোঘ অশুভ কোনো শক্তি কাজ করে| লেখিকা কিন্তু কোনো মুহূর্তে আবেগতাড়িত নন| তাঁর ভাবখানা, হ্যাঁ, এরকম ঘটেছিল| নির্বিকার এবং নির্লিপ্ত থেকে তিনি এসব ঘটনা পাঠককে জানাতে থাকেন| কিন্তু পড়তে-পড়তে, একেকটি গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ে পাঠক ক্রমশ মূল চরিত্রের ভেতরের আর্তনাদ-চিৎকার শুনতে পান| লেখিকার একটি গল্পের নাম ‘ওরা’| এই ওরা হলো টিকটিকি, যে-প্রাণীর কথা শুনলেই আমাদের অনেকের অ¯^স্তি হয়| মূল চরিত্র বলছেন, ‘ওদের শরীরের মসৃণতায় আমার ঘেন্না, ওদের তড়িদ&গতিতে আমার আতঙ্ক, ওদের সর্বজ্ঞ টিকটিক ঘোষণায় আমার বিতৃষ্ণা| আমি জানি, ওদের ছোঁয়া গায়ে লাগলে আমার মৃত্যু তাড়াতাড়ি আসবে| তাই ওদের স্পর্শ বাঁচিয়ে অতি সাবধানে আমি বাঁচতে চাই|’
লেখিকা গোটা গল্পে কোথাও টিকটিকি নামটি ব্যবহার করেননি| আমি বরাবর নিজেকে — বক্তাকে প্রচ্ছন্নে রেখে গল্পকে গল্পের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে দেওয়ার পক্ষপাতী| প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়| উদাহরণ পেশ করে কথিত বাক্যের সমর্থনে উল্লেখ করছি, গত শতকের ষাটের দশকে প্রকাশিত আমার দুটো গল্পের কথা : ‘তীর্থযাত্রা’ এবং ‘সুব্রত সেনগুপ্ত ৯’|
প্রথম গল্প এক অন্ধকে নিয়ে| কিন্তু গল্পে কোথাও ‘অন্ধ’, ‘দৃষ্টিহীন’ ইত্যাদি শব্দ নেই| দ্বিতীয়টি একটি ট্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া নিয়ে, কিন্তু কোথাও ‘ট্রাম’ বা গাড়ি জাতীয় কোনো শব্দ নেই| পাঠক বুঝতে পারে তবু|
যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি, এই টিকটিকি বা ওরা ক্রমশ আমি চরিত্রের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে| পালাতে তিনি একটি বাড়িতে চিলেকোঠা ভাড়া নিলেন| কিন্তু সেখানে বড় নিঃসঙ্গতা| একদিন চারকোল কিনে এনে দেয়াল ভরে মানুষ আঁকলেন তিনি| ‘ঘরটা বেশ অনেক লোকজনে ভরে গেল … সপ্তাহখানেক পরে একদিন … চক্ষুস্থির| … আমার চারকোলে আঁকা মানুষদের ওপর দিয়ে অসংখ্য ছোটো-ছোটো পায়ের আনাগোনার দাগ সারা দেয়াল জুড়ে| … পায়ের ছাপগুলো ধীরে ধীরে আমার মাথার ভিতরেও আঁকা হয়ে যাচ্ছে|’ ‘ওরা’ যদি একরকম দুঃ¯^প্নের গল্প হয় আরো অসহ্য দুঃ¯^প্নের গল্প ‘রোরো’| নিজের মা সম্পর্কে একটি ছোট ছেলের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি : ‘কিছুদিন ধরেই মাকে নজরে রাখাটা রোরোর একটা কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে|’ ‘মা সিঁড়ি থেকে একলাফে নেমে হাঁটুর উপর ম্যাক্সি তুলে ধপধপিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল … অদ্ভুত এক হাসি| এই দেখে বুকের মধ্যে কাঁপুনি … হৃদপিণ্ডটা ফেটে পড়তে চাইছে … মা কি তবে ডাইনি? নাকি রাক্ষসী? … চেহারা তো মানুষের মতোই| তফাৎ শুধু লোভে, রক্ত চুষে খাবার ইচ্ছায়…’
তার মা যে রক্তচোষা, রোরোর এই সন্দেহ ক্রমশ বিশ্বাসের দিকে এগোতে থাকে| রোরোর মা, দত্ত কাকু এবং রোরো নিজে যেন সব দুঃ¯^প্নের চরিত্র| এরকম আরো অনেক-অনেক গল্পে| মধুচন্দ্রিমা করতে যাওয়া এক পুরুষের অভিজ্ঞতাও এইরকম| সদ্য বিয়ে করা তার স্ত্রী — সেই নারী ক্রমশ আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছে| … এরকম … এরকমই বিভিন্ন গল্পের চরিত্ররা| যেন সবই ত্রস্ত| যেন অশুভ কোনো শক্তি কাজ করছে অহরহ|
পম্পার পূর্বসূরি হিসেবে কাঁদের নাম বলব? বলব, বলতে হবে| কারণ সাহিত্যে কোনো কিছু আচমকা আকাশ থেকে পতিত হয় না| আমরা জানি, সাহিত্য ধারাবাহিকতার ইতিহাস| তাহলে ভাবে-ভাষায়, কাঠিন্যে অমঙ্গলজনক অশুভ শক্তির উপস্থিতি মনে রেখে কী বলব, বলব কি, জগদীশ গুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়রা এই লেখিকার পূর্বসূরি? কোনো গল্পের বিষয় নির্বাচনে প্রেমেন্দ্র মিত্রের নামও হঠাৎ মনে পড়তে পারে| এখানে অবশ্যই বলতে হবে, আমি মোটেও প্রভাবিত হওয়া, অনুসরণ করার কথা বলছি না| বলছি এক লেখিকার মনের গঠন বুঝে নিতে, যা পম্পার গদ্য-বিষয়কে সার্থকভাবে বহন করেছে| পুষ্পহীন, প্রায় পত্রহীন গাছের — ছোট্ট গাছের বা গাছের অংশের ছবি নিয়ে উপস্থিত প্রচ্ছদও অর্থপূর্ণ, যে-প্রচ্ছদপট নিজেরই আঁকা|

অশেষ জনযুদ্ধের এক বিশেষ স্মৃতি-আলেখ্য
হামীম কামরুল হক

মুস্তাফা পান্না বাংলাদেশের বিশিষ্ট ছোটগল্প লেখক| তাঁর গল্পগ্রন্থের ভেতরে লোকসকল, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ, মঘা আশ্লেষা বোদ্ধা পাঠকের কাছে বিশেষভাবে আদৃত হয়েছে| এছাড়া তিনি শিশুসাহিত্য ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে থাকেন| তাঁর আরেকটি পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা| ১৯৭১ সালে বর্তমান বরগুনা জেলার বামনা-পাথরঘাটা ও মঠবাড়িয়া অঞ্চলে প্রগতিশীল তরুণদের নিয়ে যে গেরিলা বাহিনী গড়ে উঠছিল, তিনি ছিলেন এর অন্যতম সংগঠক| মুক্তিযুদ্ধের সে-অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি লিখেছেন এক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা| একজন সাহিত্যিক হওয়ার জন্য এ-বইয়ের গদ্য, বর্ণনা এবং পর্যবেক্ষণে এমন মেজাজ আছে, যাতে এ-রচনাটি একটি স্মৃতিকথা হলেও যেন উপন্যাস পড়ার ¯^াদ দেয়| কেবল তাই নয়, মাঝে মাঝে মনে হয় ছোট ছোট সত্যিকারের যেসব গল্পের সমাহার তিনি এখানে ঘটিয়েছেন, তাতে সেই বিখ্যাত প্রবাদটি মনে না পড়ে পারে না — ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন|
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের প্রকাশনাজগতের জন্য অশেষ কিন্তু বিশেষ একটি ব্যাপার| এদেশের প্রকাশনার একটি বর্গই হয়ে উঠেছে ‘মুক্তিযুদ্ধের বই’| প্রবন্ধমূলক বই রক্তাক্ত বাংলা এবং আনোয়ার পাশার উপন্যাস রাইফেল রোটি আওরাত একেবারে একাত্তরের যুদ্ধের সময়ে লেখা দুটো উল্লেখযোগ্য বই| আদতে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গবেষণাসহ বহুবিচিত্র বইপত্র প্রকাশিত হয়ে আসছে| মুস্তাফা পান্নার এ-বইটি সে-ধারারই একটি সাম্প্রতিকতম প্রকাশনা|
¯^ীকার করতেই হয়, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিপুল পরিমাণ বইপত্র ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে| নানা দৃষ্টিকোণ থেকে একে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে এবং হচ্ছে| মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে সামরিক ও অসামরিক ব্যক্তিবর্গের লেখা বইপত্রও কম নেই| সেখানে মুস্তাফা পান্নার এই ছোট বইটি, মাত্র ৬৪ পৃষ্ঠার, নতুন কীই-বা যোগ করতে পারে? এই প্রশ্ন উঠলে উত্তরটা এ-বই পড়তে শুরু করলেই পাঠক পেতে শুরু করবেন| সেটি হলো, মুক্তিযুদ্ধের একটা মূলধারা তো আছে, সেইসঙ্গে আছে নানা শাখা-প্রশাখা| সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধটারও একটা ধারাগতি আছে| কী করে মানুষের ভেতরে প্রতিরোধের প্রেরণা এলো, পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যায় যে-যুদ্ধ এদেশের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো, তার পেছনের প্রেক্ষাপটও সুদীর্ঘ|
আমরা জানি, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর অনেকেই ভারতে পাড়ি দিয়েছিলেন, অনেকেই ভারতে বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন| কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের একটি অংশ ছিল যারা ভারতে না গিয়ে নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের মতো সংগঠিত হয়েছেন, প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করেছেন — মুস্তাফা পান্না হলেন সেই মুক্তিযোদ্ধাদেরই একজন|
এক গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বইটি বিন্দু-বিন্দু ঘটনাপঞ্জিতে সাজানো; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মতো মহাসিন্ধুতুল্য ঘটনার সার বিষয়গুলির প্রায় প্রতিটি দিক এতে উপস্থাপিত| ‘কথার আগের কথা’ শিরোনাম দিয়ে শুরু করে তিনি যখন এ-বইয়ের ইতি টানেন ‘শেষ কথা নয়’ শিরোনামে, এতে বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধের বিপুল অভিজ্ঞতার সার বিষয়গুলি এ-বইয়ে হাজির করলেও, যে-অসংখ্য ছোট ছোট বিষয় ওই সময় ঘটেছিল, তার কোনোটিই অসার নয়| সেই ক্ষুদ্র ঘটনাগুলির তাৎপর্যের প্রায় সব আভাস এ-বইয়ে আছে|
মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ পটভূমি তো আছেই, সেইসঙ্গে আছে এর সংক্ষিপ্ত পটভূমি| ১৯৭০-এর নির্বাচন তার একটি| সেইসঙ্গে যুক্ত ওই বছরের নভে¤^রে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় এবং বিপুল পরিমাণ মানুষের মৃত্যু| পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের মনোভাব ওই দুটো ঘটনার ভেতর দিয়ে আরো স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়| একদিকে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক চেহারা, অন্যদিকে ‘দুই অর্থনীতি’-র তত্ত্বের বাস্তবতা প্রকট হয়ে ওঠে| বদরুদ্দীন উমর ও রেহমান সোবহান যথাক্রমে ওই দুটো বিষয়কে বোদ্ধামহল ও রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তিদের কাছে তুলে ধরতে স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে অনেকেই মনে করেন| এরই সঙ্গে এদেশের প্রায় সর্বত্র যে প্রতিরোধ সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলন থেকে যার প্রকৃত সূচনা, তাতে নানান জায়গায় যে অসংখ্য তরুণ, বলতে গেলে কিশোর বয়সীদের পুলিশি নির্যাতন ও জেলবাস ঘটেছিল, মুস্তাফা পান্না ছিলেন তাদেরই একজন| বহু লোকের বিরুদ্ধে সামরিক আইনে মামলা এবং হুলিয়া জারি হয়েছিল যে ১৯৭০ সালে, তারও দুর্ভোগের শিকার ছিলেন পান্না| ফলে মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই তাঁর মতো ব্যক্তি যে সংগ্রামী পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেই পথেরই একটি পর্যায়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন এবং নিজের এলাকার তরুণ-যুবক-কিশোরদের সংগঠিত হতে ভূমিকা পালন করবেন, সেটাই তো ¯^াভাবিক ছিল|
যুদ্ধের একটি দেশীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে থাকে এতে অংশ নেওয়ার প্রতিটি ব্যক্তির নিজ¯^ প্রেক্ষাপট| মুস্তাফা পান্নার বইয়ে সে-প্রেক্ষাপটটি এসেছে ‘একটু পেছন ফেরা, আমরা কথা’ শিরোনামে, আর সেটি এসেছে যখন, ততদিনে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলির সূচনা হয়ে গেছে, সেইসঙ্গে শুরু হয়ে গেছে প্রতিরোধের লড়াইও| আমরা দেখি, নিজের ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপটের আগে তিনি দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের কথাই আগে হাজির করেছেন, কারণ মুক্তিযুদ্ধ যদি সমুদ্রতুল্য হয়, তাহলে ব্যক্তির প্রেক্ষাপট সেখানে একবিন্দু জল| আমরা তো সমুদ্রের সামনে গেলে আগে সমুদ্রটাকেই দেখি, তারপর হাতে তুলে নিই এক আঁজলা জল| মুস্তাফা পান্না বইটিতে তাই নিজের প্রেক্ষাপটটির কথা বলেছেন দেশের সামগ্রিক অবস্থাটি আগে বলে নিয়ে| ‘কথার আগে কথা’, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ যেভাবে শুনেছিলাম’, ‘আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে’, ‘পতপত করে উড়ছে ¯^াধীন বাংলাদেশের পতাকা’, ‘ট্রেনিং শুরু’, ‘ঢাকায় গণহত্যা’, ‘মেজর জিয়া বলছি’, ‘আমাদের এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের প্রথম আক্রমণ’ — এসব ঘটনার পরই আসে পান্নার নিজের প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা অংশটি ‘একটু পেছন ফেরা, আমার কথা’| — ‘আমি ও আমার চাচাতভাই আফজাল বরিশাল এ. কে. স্কুলে ভর্তি হই নবম শ্রেণিতে ১৯৬৭ সালে| থাকতাম বেল ইসলামিয়া হোস্টেলে| ১৯৬৯ সালে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম| ছাত্র ও গণআন্দোলন শুরু হলে তাতে যোগ দেই| মিছিলে যাই| সবার সাথে স্লোগান দেই, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা — তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি| চালের মণ দশ টাকা চাই| আমরা বাঙালি ভুট্টা খাবো না, গম খাবো না| আইয়ুবের কালো হাত গুঁড়িয়ে দাও ভেঙে দাও, আইয়ুবের গদিতে লাথি মার একসাথে|’ মিছিল-মিটিংয়ে যাওয়ার অপরাধে হোস্টেল সুপার আমাকে হোস্টেল থেকে বের করে দেন|’ (পৃ ১৭) এখানে লক্ষণীয়, এই বাঙালির একটি অংশ যেমন প্রতিরোধ লড়াইয়ে নেমেছে, তেমনি আরেকটি অংশ সক্রিয় ছিল এতে নানান অসহযোগিতা করার| যেমন পান্নার ওই হোস্টেল সুপার| পান্না যদিও উল্লেখ করেননি তিনি বাঙালি না অবাঙালি ছিলেন, কিন্তু আমরা বুঝে নিতে পারি বরিশালের মতো শহরে সে-সময়ে কোনো হোস্টেল সুপার হিসেবে কোনো পাকিস্তানি উর্দুভাষী অন্তত কাজ করছিলেন না, তিনি বাঙালিই হবেন; কিন্তু তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আইনের ভয়ে বা চাকরি রক্ষায় এ-অসহযোগিতাটি করেছেন| — এভাবেই পান্না বলার আড়ালে ঢেকে দিয়েছেন অনেকানেক না বলা
কথা| আবার যেমন বামনার উত্তর কাকচিড়া বাজারে বিভিন্ন চায়ের দোকানে রেডিও শোনা, এলাকায় রেডিও কেনার হিড়িক পড়ে যাওয়া, হাটের দিন সভা করা, সেখানে স্লোগান তোলা, এবং পরে স্কুলে-স্কুলে পাকিস্তানি জাতীয় সংগীতের বদলে ‘আমার সোনার বাংলা’ বা ‘ধনধান্যপুষ্পভরা’ গান চালু করার মতো ঘটনাগুলি এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যে, পাঠকের চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মতো ভেসে উঠবে প্রতিটি দৃশ্য| প্রতিটি মুহূর্তের উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগকে এত সংক্ষিপ্তভাবে কিন্তু অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পান্না বর্ণনা করছেন তার ¯^াদু, প্রাঞ্জল, সরল ও স্পষ্ট গদ্যে|
মুস্তাফা পান্নার মুক্তিযুদ্ধের মূল দিক হলো নিজের এলাকার লোকজন সংগঠিত করে নিজেরাই নিজেদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পরবর্তীকালে হানাদারদের আক্রমণ প্রতিহত করতে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করা| এর সঙ্গে আরো একটি বিষয় এখানে আসে — সেটি হলো সিরাজ শিকদারের হাতে যে বাহিনী ˆতরি হয়েছিল, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের ভেতর দিয়ে নতুন মাত্রা যোগ হয় পান্নাদের অভিজ্ঞতায়| একদিকে পাকিস্তানি ও রাজাকারদের লুটতরাজ, গণডাকাতি আর হত্যা-ধর্ষণ, অন্যদিকে প্রশিক্ষণ নিয়েও কোনো পথের দিশা পান্না এবং তার সহযোগীরা যখন পাচ্ছিলেন না, একরকম হতাশায় ভুগছিলেন, তখন পাশের গ্রাম গোলককাশির সুখরঞ্জন বিশ্বাসের মাধ্যমে আলোচনা হয় শিশির, সুবীর, অমূল্যসহ পাঁচ তরুণের সঙ্গে, যারা ঝালকাঠির আটঘর কুড়িয়ানার পেয়ারাবাগানে সিরাজ শিকদারের সহযোগী হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছে| তাদের সঙ্গে শলাপরামর্শ ও ˆবঠকের মাধ্যমেই ঠিক হয়, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে প্রথাগত যুদ্ধ করে পেরে ওঠা যাবে না| এর জন্য চাই গেরিলাযুদ্ধ| অতঃপর শুরু হয় পরিকল্পনা| গ্রামের আরো কিছুর লোকের সঙ্গে পরামর্শ করে কৌশল নির্ধারণ করা হয়| পান্না এখানে সেসব কৌশলের ষোলোটি বিধিবিধানের উল্লেখ করেছেন| এরপর লোক সংগ্রহ এবং পরপরই অস্ত্র সংগ্রহ| জুনের মধ্যে তাদের সঙ্গে শতাধিক যোদ্ধা যোগ দেয়| আর কিছুদিনের ভেতরে ৫০টির মতো একনলা ও দোনলা বন্দুক সংগ্রহ করা হয়| ˆতরি করা হয় প্রচুর হাতবোমা| সব যোদ্ধা
পাঁচ-ছয়টি দলে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করে|
নদী ও সমুদ্রঘেরা অঞ্চল পটুয়াখালী ও বরগুনায় পান্নাদের দলটিকে বিপুল সমস্যায় পড়তে হয়েছিল যাতায়াত নিয়ে| মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগ সময় হেঁটে নয়তো নৌকায় চলাচল করতে হয়েছে| এসময় তাদের সহযোগিতা করেছেন এলাকার মাঝিরা| লেখক এর ভেতরে মফিজ মাঝির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন| কারণ যুদ্ধের পুরোটা সময় মফিজ মাঝি তার একমাল্লাই নৌকা নিয়ে তাদের সঙ্গে ছিলেন| তারা সামরিক লোকজনের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন| ক্যাপ্টেন মেহেদি, সুন্দরবনে ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়| জিয়াউদ্দিন তাদের ২৪টি অস্ত্র আর কয়েকজন যোদ্ধাও দেন| চলে যুদ্ধের প্রস্তুতি আর অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা চরমে ওঠে| ভয় দেখিয়ে অনেক হিন্দুকে মুসলমান হতে বাধ্য করা হয়, এজন্য এফিডেভিট ফরমও ছাড়া হয়, যার বিক্রি সে-সময় দশ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল| ওই অঞ্চলে কোনো কোনো বাজার ও গ্রামে মন্দির ভেঙে মসজিদ ˆতরি করা হয়, সেইসঙ্গে উল্লেখ্য, ১৯৭১ সাল জুড়ে ওই অঞ্চলে কোথাও কোনো ধরনের পূজা হয়নি, কোনো আশ্রম-আখড়ায় হরিসভা কিংবা কীর্তন হয়নি, কোনো বাড়িতে কাঁসার ঘণ্টা, শাঁখ এবং ঢোল বাজেনি| উলুধ্বনি শোনা যায়নি| — অতি অল্পকথায় এ-পরিস্থিতির বর্ণনা করেছেন লেখক; কিন্তু যে ভয়াবহ আতঙ্ক আর চাপের ভেতর দিয়ে তখন জীবন অতিবাহিত হচ্ছিল, সেটি এতটুকু আড়ালে পড়েনি| হিন্দু সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগগুলিও প্রসঙ্গত বর্ণিত হয়েছে| ‘শরণার্থী পারাপারে সহযোগিতা’, ‘ইয়ে মুসলিমকা মাকান’সহ বহু স্থানে এর উল্লেখ আছে|
মুক্তিযুদ্ধের ভেতরেই আবার ‘দুই কুকুরের লড়াইয়ের’ তত্ত্ব নিয়ে ˆতরি হয় যুদ্ধের নতুন অভিমুখ| সর্বহারাদের এই তত্ত্বতে ভিন্নরকমের এক বিভেদ ˆতরি হয়| পান্নার ‘গণআদালত’, ‘নিজেদের মধ্যে লড়াই’ অংশদুটি সে-অবস্থার নিদারুণ বর্ণনা|
এ বইয়ের পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষযুদ্ধের একটি হলো ঝাঁটিবুনিয়ার যুদ্ধ| একেবারে সাহিত্যিকের দক্ষতায় কিন্তু অলংকারহীনভাবে সে-যুদ্ধের বর্ণনা পড়লে যে-কোনো পাঠক সহজেই সেটি কল্পনা করতে পারবেন| পান্না এভাবে প্রায় সর্বত্র সমস্ত দৃশ্য ও ঘটনাকে ভাসিয়ে তুলেছেন|
ঝাঁটিবুনিয়ার যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের সম্পূর্ণ পরাস্ত করে দেওয়ার পর ধারণা করা হয় যে, বিপুল শক্তি নিয়ে পাকবাহিনী ফিরে আসবে| ফলে নিজেদের সুরক্ষা করতে এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ নিতে পান্নাদের দল সুন্দরবনের ভেতরে দিয়ে ভারতে যায়|
আমরা দেখেছি, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই পান্না ও তার সহযোগীরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন| তারা প্রায় সবাই তক্ষুনি ভারতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ নেতারাও ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন| কিন্তু পান্নারা ভারতে না গিয়ে প্রথমে নিজেরাই যুদ্ধের জন্য ˆতরি হয়েছিলেন| মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে একটি জনযুদ্ধ বা ‘পিপলস ওয়ার’ হয়ে উঠেছিল, তা পান্নার এ-বই থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়|
পান্নারা ভারতের কলকাতা হয়ে গিয়েছিলেন আসাম| সেখানেই তাদের প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল| কিন্তু প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে যুদ্ধ করার আগেই এসে পড়ে ষোলোই ডিসে¤^র| বিজয় অর্জিত হয় বাঙালিদের| ‘ভারতের মাটিতে’, ‘আমরা চলেছি অজানায়’, ‘পাহাড়ঘেরা তেজপুর-সালোনবাড়ি’, ‘মুক্ত ¯^াধীন দেশের খবর’, ‘সবাই যায় ¯^াধীন বাংলায়’, ‘¯^াধীন বাংলাদেশে মায়ের কাছে যাচ্ছি’ শিরোনাম দেওয়া অংশে পান্নাদের ভারতে যাওয়া ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর দেশে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে| এর পরই বইয়ের ‘শেষ কথা নয়’ ছোট্ট শিরোনামে পান্না বিনীতভাবে ¯^ীকার করেছেন তার ভূমিকার কথা, তিনি কেবল এক সামান্য সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছিলেন মাত্র| মুক্তিযুদ্ধের মূল কৃতিত্ব সাধারণ মানুষ, খেটে-খাওয়া শ্রমিক-কৃষক, যুবক-যুবতী এবং ছাত্রছাত্রীদের|
বইয়ের একবারে শেষে প্রথমে কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম-পরিচয় দেওয়া হয়েছে, সর্বশেষে দেওয়া হয়েছে সেখানকার ‘কয়েকজন কুখ্যাত ¯^াধীনতাবিরোধী’র নাম ও পরিচয়|
বিস্তৃত বর্ণনার বদলে অসংখ্য ঘটনার বিন্দু-বিন্দু জলে তিনি এমন অশেষ এক মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ-বিশেষ দিক যেভাবে হাজির করেছেন তাতে তার দক্ষতাকে প্রশংসা করতেই হয়| আমাদের মনে হয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের নদীবিধৌত ও উপকূলীয় অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই বইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন| বইটি পড়লে যে-কোনো পাঠক বোধ করি আমাদের সঙ্গে একমত হবেন|

Published :