নির্বাচিত কবিতা
পিয়াস মজিদ – পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস
– ঢাকা, ২০২৫ – ৬০০ টাকা
পিয়াস মজিদের কবিতায় শব্দ, বোধ ও বোধগম্যতা অস্থির সম্পর্কসেতু নির্মাণ করে।
তাঁর কবিতায় কখনো বিমূর্ত উপলব্ধি, কখনো সুররিয়াল চিত্রকল্প-সম্ভার গতি ও জড়তার যুগপৎ প্রবহমানতায় বক্তব্যের
প্রত্যক্ষ স্বচ্ছতা অপেক্ষা ঘনীভূত জীবনাভিজ্ঞতাকে শব্দের ভাস্কর্যশক্তিতে রসময় করে তোলে। কবিতা তাঁর কাছে কেবল আবেগ প্রকাশের মাধ্যম নয়, বরং এটি শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের এক জটিল রসায়ন। তাঁর নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থটি কবির প্রায় কুড়িটি মৌলিক কবিতার বই থেকে বাছাইকৃত কবিতার সংকলন, যা তাঁর নাতিদীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন কাব্যসাধনার প্রতিফলন। এই সংকলনটি কবির সময় অধ্যয়নের রূপরেখা। নির্বাচিত কবিতা সংকলনের কবিকে বিচার করা যেতে পারে তাঁর ভাষা ও চিত্রকল্প প্রয়োগকৌশলের ধারাবাহিকতায়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের গভীরতায়, শিল্পকৌতূহল চালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এবং সম্ভাব্য পাঠকের কাছে বহুস্বরিক
শিল্প-আবেদন সঞ্চারের সামর্থ্য। বর্তমান আলাপে এই মাপকাঠিগুলোর কোনো কোনোটি নিয়ে আলোকপাত করার সুযোগ মিলবে। পিয়াস মজিদের প্রতিনিধি-কবিতাগুলিকে শব্দব্যবহারের সৌধপ্রতিম কৌশল, সুররিয়াল ইমেজারি ও গদ্যধর্মিতার আলোকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ বিদ্যমান। আলো ফেলে দেখা দরকার তাঁর বারংবার নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া সংস্কৃতিসত্তা ও অন্তর-অভিমুখী বিমূর্ততায় মোড়া কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো কীভাবে তাঁর নন্দনবোধকে নির্মাণ করে, এবং একইসঙ্গে কী ধরনের দুর্বলতা তৈরি করে। একটি নির্বাচিত সংকলনে সাধারণত কবির কয়েক দশকের লেখক জীবনের নানা পর্যায়ের কবিতা, ভাষা ও ফর্মের বিকাশ, থিমের অভিনবত্ব ও পুনরাবৃত্তি এবং আত্ম-অতিক্রমী বহুস্বরকে একসঙ্গে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়। পিয়াস মজিদের কবিতার ক্ষেত্রে এই বহুব্যাখ্যা-সম্ভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁর কবিতার চিত্রকল্প, শব্দযূথ এবং শিল্পসঞ্জাত বাগর্থিক শব্দদূরত্ব এমনভাবে নির্মিত যে, এক পাঠক যে-অর্থ খুঁজে পান, অন্য পাঠকের পাঠে তা অনেকখানি সরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়।
পিয়াসের কবিতায় প্রায়শ একটি শব্দকে তার স্বাভাবিক প্রেক্ষাপট থেকে সরিয়ে একেবারে অপ্রত্যাশিত প্রসঙ্গে বসানো হয়, ফলে শব্দটি নতুন অর্থ ও অভিঘাত পায়। অর্থগতভাবে অনেক দূরের শব্দ-উপাদানের মধ্যে ইচ্ছাকৃত ব্যবধান রেখে এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যা প্রথমে অসম্ভব মনে হলেও কবিতার ভেতরে একধরনের অলৌকিক সংযোগ সৃষ্টি করে।
এই শব্দযৌগ, শব্দান্তর ও দূরান্বয়ের সম্মিলিত প্রয়োগ পিয়াস মজিদের এক বিশেষ শিল্পপ্রকাশে ব্যাপ্ত করে, যেখানে পাঠক একই সঙ্গে আকুল ও বিভ্রান্ত বোধ করে, এবং এই দ্বৈত-অভিজ্ঞতাই মূল নন্দনগত লক্ষ্য হিসেবে সামনে আসে।
ফর্মের দিক থেকে পিয়াস মজিদের কবিতা মিল খোঁজার প্রাণান্তকর চেষ্টায় লিপ্ত হয় না। প্রচলিত অনুপ্রাসের শাসন মেনে চলার চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা গদ্যধর্মী ভাঙা বাক্য, অসম দৈর্ঘ্যরে পঙ্ক্তি এবং শব্দ-ধ্বনির অভ্যন্তরীণ বিন্যাস তাঁকে সহজ পথ দেখায়। শব্দের শক্তিতে গদ্যময় জীবনের ভিন্ন ভিন্ন মাত্রাকে পরখ করে দেখার প্রাণতা পিয়াসকে উদ্বুদ্ধ করে। হঠাৎ কোনো শব্দযূথ কিংবা চিত্রকল্প বাক্যের গতিকে থামিয়ে নতুন বাঁক তৈরি করে। প্রোজ-পোয়েমের আপাত গদ্যময়, ভাঙাচোরা ও পরীক্ষামূলক ভাষা তাঁর কবিতার ফর্ম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আন্তরপাঠকৃতি তথা ইন্টারটেক্সচুয়ালিটির যুগলবন্দি। বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের বহু চরিত্র, কবি ও তাত্ত্বিক ধারণা, এমনকি বিজ্ঞানের পরিভাষাও তাঁর কবিতায় এসে বসেছে; বঙ্কিমচন্দ্র থেকে কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, র্যাঁবো থেকে বোদলেয়ার, লোরকা থেকে সমকালীন সিনেমা – বিবিধ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ এখানে সক্রিয় থাকে। একদিকে এই আন্তর-পাঠকৃতি পাঠকের সামনে বিস্তৃত সাংস্কৃতিক মানচিত্র তুলে ধরে, অন্যদিকে প্রস্তুত-পাঠকের ভূমিকা হয়ে ওঠে অপরিহার্য। একই সঙ্গে তিনি শিল্পের দায় মিটিয়ে বাংলা-ইংরেজি সংহিতা বদলের শব্দখেলায় নিয়োজিত হন। বিশ^ায়িত বোধ ও অনুভব পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে ট্রান্সল্যাঙ্গুয়েজিং-প্রতিম যোগাযোগ কৌশল তিনি ব্যবহার করেন অনায়াসে; অভিজ্ঞতার নন্দনগত প্রতিফলন-দক্ষতায়, যেখানে বাংলা ও ইংরেজি পরস্পরকে পরিপূরণ করে।
পিয়াস মজিদ ইতিহাসকে শুধু তথ্য হিসেবে ব্যবহার করেন না, বরং বর্তমানের সংকটের সঙ্গে মিলিয়ে সেখানে এক নতুন মিথ গড়ে তোলেন। অতীতের সুলতানি আমল, মোগল স্থাপত্য কিংবা বাংলার লৌকিক ইতিহাস তাঁর কবিতায় এসে আধুনিক নাগরিক যন্ত্রণার সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়, ফলে ইতিহাস হয়ে ওঠে সমকালকে বোঝার এক সতর্ক সংকেত ও প্রতীকী ভুবন। এইভাবে তিনি পাঠককে নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডি থেকে সরিয়ে এক নিরবচ্ছিন্ন সময়রেখায় দাঁড় করান, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একই বয়নকাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। ঢাকার যান্ত্রিক ও মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের ভিড়ের মধ্যকার গভীর একাকিত্ব তাঁর কবিতায় এক বিমূর্ত কিন্তু তীক্ষ্ম বাস্তবতা হিসেবে উঠে আসে। শহর এখানে কেবল কংক্রিটের স্থাপনা নয়, বরং এক অদৃশ্য সত্তা, যা ধীরে ধীরে মানুষকে গ্রাস করে; ট্রাফিক জ্যাম, ক্লান্তি, যান্ত্রিকতার রূঢ়তা – সব মিলিয়ে একটি অস্তিত্ববাদী হাহাকার তৈরি হয়। ব্যক্তিগত দুঃখ বা সংকটকে তিনি একক অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সামষ্টিক পরিচয়-সংকটের প্রতীকে রূপ দেন, যেখানে পরিচয় মুছে যাওয়ার আতঙ্ক আধুনিক অস্তিত্ববাদের একটি কেন্দ্রীয় চিহ্ন হয়ে ওঠে।
পিয়াস মজিদের কবিতায় মৃত্যু এক বীভৎস বা ভীতিকর উপাদান নয়, বরং শান্ত ও নান্দনিক অভিজ্ঞতার অংশ। জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের সূক্ষ্ম পর্দা নিয়ে তাঁর কৌতূহল পরলৌকিক ও দার্শনিক প্রশ্নকে এগিয়ে আনে, যেখানে মৃত্যু জীবনকে নস্যাৎ না করে তাকে পরিপূরক করে। মৃত্যু ও প্রতিনিধিত্বশীল বিভিন্ন দ্যোতক তাঁর কবিতায় এক চিরন্তন আবর্তন ও পুনর্জন্ম-ধারণার নান্দনিক রূপ ধারণ করে। চিত্রকল্প নির্মাণে এই কবি দৃশ্যমানের পাশাপাশি স্পর্শ, ঘ্রাণ ও অনুভূতির বহু ইন্দ্রিয়কে সক্রিয় করেন। প্রকৃতি ও মানবজীবন তাঁর কবিতায় মিলেমিশে এমন এক পরাবাস্তব জগৎ তৈরি করে, যেখানে সবকিছুই অদ্ভুত, অনন্য উপমার মাধ্যমে নতুন রূপ পায়। বিমূর্ত ধারণা ও অনুভূতিকে তিনি সুস্পষ্ট দৃশ্য ও প্রতীকে রূপান্তর করে পাঠককে দীর্ঘক্ষণ মানসিকভাবে আচ্ছন্ন রাখেন।
নারী ও প্রেম বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত আবেগ ও খাঁটি দেহজ কামনার সীমা ছাড়িয়ে এক ধরনের আধ্যাত্মিক আর্তি ও পরস্পর শ্রদ্ধাবোধের দিকে যায়। নারী তাঁর কবিতায় কেবল রক্ত-মাংসের মানুষ নন, বরং এক রহস্যময় প্রকৃতি, কখনো অধরা কবিতা, কখনো শব্দ ও ব্যাকরণের আশ্রয়দাত্রী সত্তা। ফলে প্রেম তাঁর কাছে কেবল বিরহময় বেদনাই নয়, বরং প্রাপ্তি, বিচ্ছেদের দীর্ঘ প্রভাব এবং সৃষ্টিশীলতা – এই সবকিছুর সম্মিলিত এক জটিল অভিজ্ঞতা।
পিয়াস মজিদ কেবল কবি নন, একজন গদ্যকার ও গবেষক হিসেবেও স্বীকৃত। এই বহুমুখী সত্তা তাঁর কবিতায় এক ধরনের বৌদ্ধিক ঋজুতা এনে দেয়। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা ঘরানার কবি হয়ে ওঠেননি, বরং নিজস্ব ধারা গড়ে তুলেছেন। সহজ ভাষায় গভীর দর্শন, ইতিহাস ও মিথ-চেতনা, নাগরিক একাকিত্ব, মৃত্যু-দর্শন, অণুকবিতার তীব্র সংহতি এবং শব্দ-ব্যবহারের মিতব্যয়িতার মধ্য দিয়ে তাঁর নির্বাচিত কবিতা এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উল্লিখিত কবির কবিতা যান্ত্রিক ক্লান্তির ভেতর থেকে পাঠককে সাময়িকভাবে উদ্ধার করে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও চিরকালীন সময়বোধের অভিজ্ঞতা এনে দেয়; সময়ের জবানবন্দি হয়ে থেকেও সেই জবানবন্দি সময় অতিক্রম করে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। ভিন্ন দৃষ্টিকোণে বলা চলে যে, অনেক পাঠক পিয়াস মজিদের কবিতা পড়তে গিয়ে ভাষা, চিত্রকল্প এবং অবিরাম বিমূর্ততার ফলে এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি অনুভব করেন – যেন মস্তিষ্ক সবসময়ই কঠিন কোনো ধাঁধা সমাধানের মধ্যে আটকে আছে, বিশ্রামের সুযোগ নেই। কবিতার ক্ষেত্রে এ-ধরনের দুর্ভোগ অস্বাভাবিক নয়; তাই এখানে প্রশ্ন দাঁড়ায় – এটি কি কবিতার দুর্বলতা, নাকি সচেতন নন্দনগত ঝুঁকি? একই বৈশিষ্ট্য একদিকে শক্তি, অন্যদিকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে কাজ করতে পারে – এই দ্বান্দ্বিক অবস্থান উন্মুক্ত রাখাই যুক্তিযুক্ত। পিয়াস মজিদের কবিতা এই দুই প্রান্তের মাঝামাঝি অবস্থানে দাঁড়িয়ে এমন ভাষা নির্মাণ করে, যা সাধারণ পাঠকের জন্য আপাতদুরূহ হলেও চূড়ান্ত বিবেচনায় তীব্র উপভোগ্য।
পিয়াস মজিদের নির্বাচিত কবিতার এই সংকলনকে কবির আত্মজীবনবিকাশী একটি নাতিদীর্ঘ কাব্যবিশ্ব হিসেবে পাঠ করার সুযোগ বিদ্যমান, যা সচেতন পাঠকের জন্য একটি টেক্সচুয়াল স্ট্র্যাটেজিও বটে। এখানে প্রতিটি কবিতা একা নয়, বরং অন্য কবিতার সঙ্গে পারস্পরিক শিল্প ও নন্দনতাত্ত্বিক সম্পর্কে যুক্ত। নাচপ্রতিমার লাশ থেকে গোধূলিগুচ্ছ, ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী থেকে রূপকথার রাস্তাঘাট – এই নামগুলোর ক্রম এক ধরনের অদৃশ্য ন্যারেটিভ ট্রাজেক্টরি তৈরি করে, যেখানে শহর, প্রেম, স্মৃতি ও রাজনীতি বারবার ফিরে আসে, বদলে যায়, আবার নতুন কনটেক্সটে প্রতিধ্বনিত হয়। একটি টেক্সট নিজেকে ধারাবাহিকভাবে অন্য টেক্সটের – ফিল্ম, গান, রাজনৈতিক স্মৃতিকথা, আর্ট ওয়ার্কের – সঙ্গে জুড়ে দেয়। এই ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি কেবল নাম বা রেফারেন্স ড্রপিং নয়; বরং পাঠককে বাধ্য করে একাধিক সাংস্কৃতিক আর্কাইভ একসঙ্গে খোলার জন্য – বাংলা কবিতার ধারাবাহিকতা, বৈশ্বিক পপ-সংস্কৃতি, বিপ্লবের ইতিহাস, সুফি ঐতিহ্য, এমনকি ডিজিটাল যুগের মিম-সংস্কৃতিও এখানে টেক্সটের ভেতর ঢুকে পড়ে। ফলে পিয়াস মজিদের কবিতা-টেক্সট সর্বদাই ‘খোলা’ – এটি নিজেকে কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে দাবি করে না; বরং অন্য টেক্সট, অন্য কণ্ঠ ও অন্য ইতিহাসের সঙ্গে অন্তহীন সংলাপের মধ্যেই নিজস্ব অর্থ নির্মাণ করে।
কবি প্রায়শই প্রচলিত গল্প বলাকে ভেঙে দিয়ে ভৎধমসবহঃ-ভিত্তিক, কোলাজধর্মী ন্যারেটিভ ব্যবহার করেন। নাচপ্রতিমার লাশ-এ যেমন গদ্য-ফ্রেমের ভেতরে কবিতার খণ্ড-ইমেজ ঢুকে পড়ে, তেমনি সমাধিবিতান-এ ভাঙা লাইন আর শব্দ-বিচ্ছেদ একটি বিচ্ছিন্ন কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে সুশৃঙ্খল দৃশ্যবিন্যাস তৈরি করে – যেখানে দৃশ্যমান প্লটের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানসিক ও ভাষাগত ঝুলে থাকা। ‘হে আমি’র মতো কবিতায় আবার দেখা যায়, ক্ল্যাসিক আত্মজীবনীমূলক ‘আমি’-বয়ানকে ভেঙে দিয়ে বহু-আমি, বহু-ভাষিক, বহু-রেজিস্টারের শিল্পবর্ণনা তৈরি হয় : কর্পোরেট-আমি, টিকটকার-আমি, পাবজি-খেলোয়াড়-আমি, এবং ‘চেপেচুপে মরে থাকা’ আমি – সবগুলো মিলেই এক বহুস্বরিক ন্যারেটিভ বিকশিত হয়। ব্যক্তিসত্তার বহুত্ব ও সমকালীন পরিচয়-রাজনীতির আরেক উজ্জ্বল কবিতা ‘হে আমি’। এখানে কবি সরাসরি প্রশ্ন করেন, তাঁর ভেতরে কয়টা ‘আমি’ বাস করে। এই প্রশ্নের মাধ্যমে সত্তাকে একক, স্থির, স্বচ্ছ সত্তা হিসেবে না দেখে, বরং বহুধাবিভক্ত, শ্রেণি, পোশাক, সংস্কৃতি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অব্যক্ত আকাক্সক্ষা-গঠিত একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। ‘সুট-কোট-বুটের আমি’, জাতীয় পঙ্ক্তি মধ্যবিত্ত, করপোরেট, সাজানোগোছানো সত্তাকে সামনে আনে। আবার ‘টিকটকার’, ‘প্লেয়ার অব পাবজি’ – এই উল্লেখ ডিজিটাল যুগের ভার্চুয়াল আত্মপরিচয়ের জগৎকে কবিতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দৃশ্যত সামান্য, কিন্তু গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এই কবিতা দেখায়, কীভাবে ব্যক্তির প্রকাশিত সত্তার চেয়ে ‘চেপেচুপে মরে থাকা’ সত্তা বেশি শক্তিশালী, এবং সেই চাপা সত্তা আসলে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকে। এতে দৃশ্য, স্মৃতি, ইমেজ ও সেøাগানের সমান্তরাল বিন্যাসের মাধ্যমে শিল্পী এমন এক ‘broken narrative’ তৈরি করেন, যা বচন ও নির্বচন, প্রকাশ ও অপ্রকাশের মধ্য দিয়ে নিজেই ন্যারেটিভ-ডিভাইস হয়ে দাঁড়ায়।
ফলত, পিয়াস মজিদের কবিতা হয়ে ওঠে একদিকে আত্মজীবনের টুকরো টুকরো নোট, অন্যদিকে সমকালীন শহর, বিশ^রাজনীতি ও ডিজিটাল সংস্কৃতির এক বহু ইন্দ্রিয় আখ্যান। তাঁর কবিতায় ক্ষমতা, পরিচয় ও প্রতিরোধের ভাষা একে অপরের সমীপবর্তী হয়। এই কাব্যজগতের একটি মূল স্তম্ভ নাচপ্রতিমার লাশ শীর্ষক অংশ। এখানে আমরা দেহ, নৃত্য ও মৃত্যুকে বহুমাত্রিক রূপকে দেখতে পাই। কবিতার আগে যে-গদ্যাংশে নাচের আসরে নর্তকীদের দেহভঙ্গি ও চাঁদের প্রতিক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে, সেখানে দেহকে শুধুু যৌনতার উপকরণ হিসেবে নয়, বরং উর্বরতা ও অস্তিত্ব টিকে থাকার প্রতীকে পাঠ করা যায়। নর্তকীদের ‘উর্বর মধ্যভাগ’-এর দৃশ্যমানতা চাঁদের কাছে উর্বরতা ভিক্ষার ইঙ্গিত তৈরি করে; আর চাঁদের সরে যাওয়া, নাচের আসর থেকে বেরিয়ে আসা, পুরুষদৃষ্টির নৈতিক সংকট ও ভীত হয়ে সরে যাওয়ার রূপক হিসেবেও দেখা যায়। কবিতা অংশে ছোট ছোট খণ্ড-ইমেজ, তারকা চিহ্ন, টুকরো পঙ্ক্তি – এসব এক ধরনের কোলাজধর্মী আধুনিকতাকে সামনে আনে। ‘নাচের দেবী শীতনিদ্রায়/ রাতটা তার ঘুমন্ত মুদ্রার পাহারাদার’ – এই ধরনের পঙ্ক্তিতে দেবী, রাত ও নৃত্য একসঙ্গে মিথিক, শারীরিক এবং অন্তর্জাগতিক স্তরে কাজ করে। শেষের দিকে ‘আমি/ নাচপ্রতিমার/ রেশমি লাশ’ – এই আত্মঘোষণা কবিকে জীবন্ত নর্তকী না রেখে সৌন্দর্যমণ্ডিত, তবু মৃত, এক ধরনের শিল্প-উপলব্ধিতে রূপান্তরিত করে। নাচের এই দ্বন্দ্বময়তা – একই সঙ্গে শরীরের মুক্তি ও মৃত্যুর মায়াজাল – পিয়াস মজিদের কবিতার গভীর নন্দনতত্ত্বের পাঠসূত্র হয়ে দাঁড়ায়।
‘নাচপ্রতিমার লাশ’-এ দেহ ও নৃত্যকে যেভাবে দেখা হয়, তাতে পিতৃতান্ত্রিক ‘পুরুষ-দৃষ্টি’র পাশাপাশি নারীর দেহকে উর্বরতা ও অস্তিত্ব টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয়; চাঁদের সরে যাওয়া, নাচের দেবীর শীতনিদ্রা, ‘রেশমি লাশ’-এ পরিণত হওয়া – সবই দেহ-ডিসকোর্সকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অন্যদিকে ‘ভাইসব, বোনসকল…’ কবিতায় ধর্মীয় ইমেজারি – রক্ত, গীতবিতান, সমুদ্র, আকাশ, কবর – এর মাঝখানে হঠাৎ ‘তুমি কে?/ স্ট্রেট না ট্রান্স/ গে/ লেস/বাই?’ – এই প্রশ্ন সমকালীন অনিবার্য নন-বাইনারি জেন্ডার ও যৌনতা-রাজনীতিকে সরাসরি কবিতার টেক্সটে টেনে আনে; এখানে কবিতা একটি নিরাপদ নন্দনশাস্ত্রিক জায়গা নয়, বরং কুইয়ার ও প্রান্তিক পরিচয়ের আদ্যোপ্রান্ত আবিষ্কারের দ্বন্দ্বময় প্রকাশক্ষেত্র। একই সঙ্গে ‘মিখাইল গর্বাচেভের ০১টা ব্যর্থতা’তে রাস্তার ভাষা, গালি, আড্ডার জারগন ব্যবহার করে তিনি রাষ্ট্র-রাজনীতি, সমাজতন্ত্র ও সমতার ডিসকোর্সকে বিদ্রূপের ভেতর দিয়ে পুনর্গঠন করেন। এখানে মৃত্যুই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত ‘সমতা’-বক্তব্য, যা বড় বড় আইডিওলজির বাহারি ভাষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়।
‘আমাকে বর্ণনা করতে গেলে/ ভাষা শুধু তার সীমা প্রকাশ করে’ – এই স্বীকারোক্তি পিয়াস মজিদের কবিতাকে এক ধরনের মেটাডিসকোর্সের কেন্দ্রে নিয়ে আসে, যেখানে ভাষা নিজেই আলোচ্য বিষয়। তিনি একদিকে উচ্চ সাহিত্যিক বাংলা, সংস্কৃতঘেঁষা শব্দভাণ্ডার ও মরমি টোন ব্যবহার করেন; অন্যদিকে কথ্য, লোকভাষা, ইংরেজি সø্যাং, ডিজিটাল টার্ম, গালাগালি – সব মিলিয়ে ভাষার রেজিস্টার-মিশ্রণ ঘটান। ফলে কবিতা নিজেই একটি ভাষাগত যুদ্ধক্ষেত্র : কোন শব্দ কোথা থেকে এসেছে, কার কণ্ঠ এটি বহন করছে, কোন শ্রেণি ও সংস্কৃতির প্রতিনিধি – এসব প্রশ্ন অদৃশ্যভাবে কাজ করতে থাকে। এই ভাষাগত অস্থিরতা ‘ত্রিশঙ্কু’ অবস্থার সঙ্গে মিল খায়; যেমন ‘ঝু/ লে/ থাকি/ ত্রিশঙ্কু’ – এই ভাঙা লাইন বিন্যাস শুধু দৃশ্যগত এক্সপেরিমেন্ট নয়, বরং ভাষার ভেতরে ঝুলে থাকা, অনির্ণেয়তা ও সংশয়ের ডিসকোর্সকে একসঙ্গে দৃশ্যমান করে। এখানে কবিতা একদিকে নিজের ভাষার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে, অন্যদিকে ঠিক সেই সীমা ভাঙার জন্যই বহু-রেজিস্টার, বহুভাষিক, বহুধ্বনিক এক ভঙ্গিতে নিজেকে লিখে যেতে থাকে।
সংকলনের সূচিতে যেসব কাব্যগ্রন্থের নাম দেখা যায় – যেমন নাচপ্রতিমার লাশ, মারবেল ফলের মৌসুম, গোধূলিগুচ্ছ, কুয়াশা ক্যাফে, নিঝুম মল্লার, ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী, বসন্ত, কোকিলের কর্তব্য, বেঁচে থাকার বসন্তবাগান, এইসব মকারি, রূপকথার রাস্তাঘাট – এগুলো আলাদা আলাদা সময়, ভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার প্রতিনিধি। আবার একই সূচিতে ‘ডেড পোয়েটস সোসাইটি’, ‘স্টারি নাইট’, ‘ইন দ্য মুড ফর লাভ’, ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’, ‘নভেম্বর রেইন’, ‘মিখাইল গর্বাচেভের ০১টা ব্যর্থতা’-এর মতো শিরোনাম দেখা যায়, যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর কবিতা স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে বিশ্বরাজনীতি ও বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে এক অবিচ্ছিন্ন কথোপকথনে স্থাপন করে। এইভাবে পিয়াস মজিদের কবিতা একদিকে শহুরে, বাংলাদেশের নির্দিষ্ট সময়বোধে প্রোথিত, অন্যদিকে সিনেমা, সংগীত, বিশ^রাজনীতি, সুফি ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্য-সমালোচনার সঙ্গে সমান্তরাল আলাপ রচনা করে।
পিয়াস মজিদের কবিতায় নন্দনতত্ত্বের ব্যতিক্রমী বিস্তার লাভ করেছে গোধূলিগুচ্ছ-এর কবিতাগুলিতে। সমাধিবিতান-এ কবি যে ‘মাঝখানের’ অবস্থান কল্পনা করেন, তা নিছক নৈতিক সমঝোতা নয়; বরং রাজনৈতিক ও দার্শনিক এক দ্বৈত-সমালোচনার জায়গা। তিনি একদিকে স্বীকার করেন, সমাজ সাধারণত পক্ষ-নির্বাচনেই অভ্যস্ত, অন্যদিকে নিজেকে এমন এক মানুষের জায়গায় স্থাপন করেন, যে নিজের শত্রুকেও গোপনে সমর্থন করতে পারে। এই ধারণা বোর্হেস-স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি নিজের আত্মপরিচয়কে জটিল করে তোলেন।
গোধূলি সময়ে আঁধার-আলো মিলনের মতোই তাঁর স্মৃতি-প্রতিমা কখনো স্নিগ্ধ, কখনো বহ্নিজল। স্মৃতি এখানে আর নস্টালজিয়ার কোমল অবকাশ নয়; বরং শাস্তি, ক্লান্তি ও মানসিক অসুস্থতার জটিল গঠন। রূপকথা, স্যানাটোরিয়াম, রাঁচি, হেমায়তপুর – এইসব ইমেজ মানসিক স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বদ্ধতা ও সম্ভাব্য মুক্তির কথা টেনে আনে; একই সঙ্গে শৈশব ও পরিণত বয়সের মধ্যকার অদৃশ্য সীমানা নির্দেশ করে।
যে-সমকালীনতা ‘হে আমি’তে নীরবে কাজ করে, তা আরো সরাসরি, স্পষ্ট ও ঝাঁঝালো হয়ে ওঠে ‘ভাইসব, বোনসকল…’ কবিতায়। এখানে কবি একদিকে গীতবিতানের রক্ত, কবর, সমুদ্র, আকাশ, সতর্কসংকেতের মাধ্যমে একটি অভূতপূর্ব বোধপুঞ্জ নির্মাণ করেন। জন্মদিনের ঢেউ থেকে কবরের তীর, ভালোবাসার খয়েরি স্বর্ণের ফাঁস, আর শেষে যৌন পরিচয়ের প্রশ্ন – এই গঠন আমাদের সময়ের জীবন্ত দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে : আনন্দ ও মৃত্যু, আত্মা ও দেহ, সামাজিক স্বীকৃতি ও প্রান্তিক পরিচয়ের একসঙ্গে উপস্থিতি। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও বিশ্ব-ইতিহাসের পরোক্ষ পুনঃপাঠ পিয়াস মজিদের কবিতার আরেকটি ঘরানা। ‘মিখাইল গর্বাচেভের ০১টা ব্যর্থতা’ কবিতায় এই ঘরানার উৎকৃষ্ট উদাহরণ দেখা যায়।
গদ্য-কবিতার ঢঙে লেখা এই টেক্সটে সাম্যবাদ, সমতা, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ব্যক্তিগত মৃত্যুর অভিজ্ঞতা একসঙ্গে এসে যায়। গর্বাচেভ ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা যখন সমতাকে অসম্ভব বলে প্রচার করেন, তখন কবিতা শেষে দেখায়, মৃত্যুর সামনে সব সমান – ধনী-গরিব, মার্কস-অ্যাঙ্গেলস-লেনিন, এমনকি গর্বাচেভ নিজেও।
অন্যদিকে, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পসচেতনতার সম্মিলিত রূপ দেখা যায় ‘আমি ও জালালুদ্দিন রুমি’ কবিতায়। শুরুতেই রুমির উদ্ধৃতি ‘যেখানে কথা ছাড়াই কথা বলা যায়’ – এই আকাঙ্ক্ষা কবিতার অন্তর্নিহিত নীরবতার তত্ত্বকে খুলে দেয়। স্থানীয় ও বিশ্বভূগোল এখানে একসূত্রে বাঁধা : কুমিল্লা থেকে কোনিয়া যাত্রা, নালা ও সমুদ্র, দামাস্কাস ও তাবরেজ, বসফরাস-রাত ও ভোরের দরবেশ – সব মিলিয়ে এক সুফি-নকশা তৈরি হয়; কিন্তু তা নিছক অনুকরণ নয়; বরং বাংলাভাষী, সমকালীন, রাজনৈতিকভাবে সজাগ একজন কবির নিজের ভাষায় পুনর্লিখন। ‘আমাকে মুক্ত করো প্রভু/ আমাকে বন্দি করো প্রভু’ – এই দ্বৈত আর্তি মরমি সাহিত্যের ঐতিহ্য বহন করলেও, এখানে তা শিল্প ও বিপ্লবের অনুরাগের সঙ্গে যুক্ত হয়। কবি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি চান জন্ম ও বিনাশের এই পুনরাবৃত্তিতে ‘শিশ্নে ও বিপ্লবে’ উত্থান অনুভূত হোক। প্রেম, শিল্পচর্চা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন – তিনটি এখানে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটিই ধারাবাহিক আকাঙ্ক্ষা।
এই সব উদাহরণ মিলিয়ে পিয়াস মজিদের কবিতা সম্পর্কে কিছু সামষ্টিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়। প্রথমত, তাঁর কবিতায় আন্তরপাঠকৃতির নিবিড় ব্যবহার – রুমি, বোর্হেস, জয় গোস্বামী, সিলভিয়া প্লাথ, উৎপল বসু থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র, সংগীত, বিশ্বরাজনীতি – সবই তাঁর কবিতার ভিতরে প্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত, ভাষার
রেজিস্টার-মিশ্রণ; তিনি একসঙ্গে উচ্চ সাহিত্যিক বাংলা, কথ্য, লোকভাষা, ইংরেজি শব্দ, স্ল্যাং, ডিজিটাল যুগের টার্ম ব্যবহার করেন। তৃতীয়ত, ফর্মাল এক্সপেরিমেন্টেশন; লাইনের ভাঙন, শব্দ ভেঙে লেখা, তারকা চিহ্ন, গদ্য-কবিতার কাঠামো, কোলাজ-সদৃশ ইমেজ নির্মাণ – এসব তাঁর কবিতাকে দৃশ্যগত ও ধ্বনিগত পরীক্ষার জায়গায় দাঁড় করায়। চতুর্থত, থিমের স্তর-বহুলতা; স্মৃতি, মৃত্যু, মানসিক স্বাস্থ্য, ত্রিশঙ্কু অবস্থা; প্রেম, দেহ ও যৌনতা; শহর ও গ্লোবাল রাজনীতি; ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, সুফি ঐতিহ্য – এই সবই সমান্তরালভাবে সক্রিয় থাকে।
পিয়াস মজিদের কবিতা একরৈখিক কোনো ‘ইজম’-এর মধ্যে আটকে থাকে না। তাঁর কবিতা একদিকে আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক কোলাজ-মানসিকতা ধারণ করে; অন্যদিকে মরমি ও লোকভাষার ঐতিহ্যের সঙ্গেও সংলাপ চালু রাখে। তাঁর কবিতার পাঠককে শুধু শব্দের সৌন্দর্য উপভোগ করলেই হয় না; তাকে একই সঙ্গে ভাবতে হয় স্মৃতি ও মানসিক স্বাস্থ্য, যৌনতা ও পরিচয়-রাজনীতি, বিশ্ব-ইতিহাসের বৈপরীত্য এবং ভাষার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা নিয়ে। পিয়াস মজিদের কবিতা তাই বর্তমান বাংলা কবিতায় এক জটিল কিন্তু গভীরভাবে প্রয়োজনীয় উপস্থিতি। সব মিলিয়ে, এই কবির কবিতাকে একটি একক কণ্ঠের, একরৈখিক আত্মপ্রকাশের জায়গা হিসেবে না দেখে, বরং এক বহুস্বরিক টেক্সটফিল্ড হিসেবে পড়া জরুরি। এতে টেক্সট কখনো শেষ হয় না; প্রতিটি নতুন পাঠ, নতুন পরিপ্রেক্ষিত, নতুন আন্তঃপাঠভিত্তিক সংযোগ আবারো এই কবিতাগুলিকে অন্তহীন পুনর্লিখনের জন্য প্রস্তুত রাখে।
পিয়াস মজিদের কবিতায় ভাষার মিতব্যয়িতা ও শব্দ-স্থাপত্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়; তিনি শব্দের অপচয় না করে নিপুণ ভাস্করের মতো কাব্যদেহে ঋজু অবয়ব প্রদান করেন। ভারী শব্দের গাম্ভীর্য আর লোকজ ও যান্ত্রিক জীবনের রূঢ় শব্দ একসঙ্গে এসে তাঁর কবিতায় দ্বিবাচনিক টান তৈরি করে। অনেক সময় উহ্য ক্রিয়া কবিতাকে এক ধরনের ধ্রুপদী স্থিতির অনুভূতি দেয়। পিয়াস মজিদের কবিতা পড়লে স্পষ্ট হয়, আধুনিক বাংলা কবিতায় ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং শব্দ, ইমেজ ও নীরবতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ জগৎ। তাঁর চিন্তা অভিজ্ঞতা এবং শব্দ-প্রয়োগ-ভাবনা মিলে কবিতাকে এমন এক অলৌকিক ভাষিক ভাস্কর্যে রূপান্তরিত করে, যা কখনো ঝলমলে, কখনো অন্ধকার, কখনো স্মিত হাস্যরসপূর্ণ, আবার কখনো গভীরভাবে নিঃসঙ্গ। আবার কখনো আবার তাঁর কবিতা পটভূমি নিরপেক্ষ, বিমূর্ততায় শীর্ষস্পর্শী – যা প্রকারান্তরে আপাত একঘেয়ে শৈল্পিক সমান্তরলতা যুক্ত করে। পিয়াসের কাব্যভুবনে বাগর্থের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কাব্য-অভিজ্ঞতা; বয়ান নিয়ন্ত্রণ করে সৌধপ্রতিম শব্দগুচ্ছ। পাঠকের সঙ্গে সরল যোগাযোগের চেয়ে বহুব্যাখ্যাসম্ভব বাগর্থ-রহস্য তৈরি করে চলে তাঁর কবিতা।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.