অদৃশ্যজগতেরসন্ধানে

আকাশের দিকে তাকানোর ব্যাপারটি আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। নগর-জীবনে ‘আকাশ’ শব্দটি ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে। অল্পজায়গায় অনেক মানুষকে জায়গা দেওয়ার জন্যে উঁচু উঁচু বিল্ডিং মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। সেগুলো ধীরে ধীরে আকাশকে আড়াল করে দিচ্ছে। তারপরও কেউ যদি আকাশের দিকে তাকায় দেখবে সেটি সৌন্দর্যহীন বিবর্ণ। শহরের ধুলোবালিতে ধূসর। রাতের বেলা সেই আকাশ আমাদের চোখে পড়ে না, শহরের লাখ লাখ আলোর বিচ্ছুরণে আকাশ ঢাকা পড়ে থাকে। আকাশে গোপনে প্রায় অপরাধীর মতো চাঁদ উঠে একসময় বড় হতে হতে পূর্ণিমা হয়, আবার ছোট হতে হতে অমাবস্যার অন্ধকারে ঢেকে যায়। শহরের মানুষ কি কখনো সেটি দেখেছে? অনুভব করেছে?

আকাশের মতো এত চমৎকার একটি জিনিস আমাদের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে – তার চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে? আমাদের কৃত্রিম-জীবনে আকাশকে নির্বাসন দিয়েছি, কিন্তু তবু সেটি আছে। কেউ যদি কখনো শহর থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি কোনো গ্রামে, বিদ্যুৎহীন কোনো বনে-বাদাড়ে, নদীতে, খোলা প্রান্তরে রাতের বেলা এসে হাজির হয়, এখনো সেই আকাশকে দেখতে পাবে। যদি আকাশে চাঁদ থাকে, সেটি আমাদের দৃষ্টির অনেকখানি দখল করে রাখবে। যদি চাঁদ না থাকে তাহলে আমরা আকাশের নক্ষত্র দেখে মুগ্ধ হবো। পরিষ্কার আকাশে ঝকঝকে নক্ষত্রের মতো অপূর্ব দৃশ্য আর কী আছে? কোনো নক্ষত্র উজ্জ্বল, কোনো নক্ষত্র অনুজ্জ্বল, কোনোটি মিটমিট করে জ্বলছে আর কোনোটি স্থির। কোনো কোনো নক্ষত্রের আলোতে হালকা কোনো একটি রঙের স্পর্শ। বছরের কোন সময়ে দেখছি তার ওপর নির্ভর করে আমরা আবিষ্কার করতে পারি আকাশজোড়া ছায়াপথ! সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে এই নক্ষত্ররাজিকে দেখে আসছে, দৃশ্যটির খুব পরিবর্তন হয়নি। আকাশের সেই নক্ষত্রকে দেখে প্রাচীনকালের গুহাবাসী মানুষের মনে যে-অনুভূতি হতো এখনো সেই অনুভূতিই হয়। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়, এখন আমরা এই রহস্যের খানিকটা বুঝতে পারি। হ্যাঁ, খানিকটা।

রাতের বেলা পরিষ্কার আকাশে আমরা কয়েক হাজার নক্ষত্র দেখতে পাই। মোটামুটি একটি বাইনোকুলার চোখে দিলে তার সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আবছা ধোঁয়ার মতো নক্ষত্ররাজি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বছরের ঠিক সময় ঠিক জায়গায় তাকাতে পারলে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিটিও দেখা যায়। বাইনোকুলার ব্যবহার না-করে ভালো টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে হঠাৎ চোখের সামনে অসংখ্য নতুন নক্ষত্রের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন গ্যালাক্সি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর আর কোনো শেষ নেই। মহাকাশের যত গভীরে দৃষ্টি দেওয়া যায় সেখানে তত নতুন নতুন গ্যালাক্সি, তত নক্ষত্রপুঞ্জ নেবুলা কোয়াজার।

আমরা এই নক্ষত্ররাজির কথা জানি, গ্যালাক্সির কথা জানি, কারণ আমরা সেগুলো দেখতে পাই। মানুষের চোখ নামে অপূর্ব একজোড়া সম্পদ রয়েছে, দেখা নামক অভূতপূর্ব এক ধরনের প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই চোখ আলোকে দেখতে পায় আর সেই আলো থেকে আমরা এই নক্ষত্ররাজি, এই গ্যালাক্সির কথা জানি। যদি নক্ষত্র থেকে আলো বের না হতো তাহলে আমরা এই নক্ষত্রদের দেখতে পেতাম না, হয়তো তাদের কথা এত সহজে জানতে পারতাম না।

বিজ্ঞানীরা এই নক্ষত্ররাজি এবং গ্যালাক্সিমণ্ডলীকে দেখে অনুমান করার চেষ্টা করেছেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আকার কত বড়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি সবকিছু মিলিয়ে তার ভর কত? সেটি করতে গিয়েই তারা আবিষ্কার করলেন যে, তাদের হিসাব মিলছে না। আমরা আমাদের চোখে যে-নক্ষত্ররাজি, যে-গ্যালাক্সি দেখছি, সেটুকু যথেষ্ট নয়। তার বাইরেও আরো বিশাল কিছু থাকতে হবে, যেগুলো আমরা দেখতে পাই না। যেটি দেখতে পাই না সেটি আছে কিংবা নেই – সেই প্রশ্নটিই আমরা করি কী করে?

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে আমরা বোঝাতে পারি, আমরা চাঁদের কথা ধরি। ধরা যাক, কোনো একটি কারণে চাঁদ আমাদের কাছে অদৃশ্য, আমরা চাঁদকে দেখতে পাই না। তাহলে পৃথিবীর মানুষ কি চাঁদের কথা জানতে পারত না? নিশ্চয়ই পারত এবং সেটি জানতে পারত নদী এবং সমুদ্রের পানিতে জোয়ারভাটা দেখে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরে পরে কেন সমুদ্রের পানিতে জোয়ার এবং ভাটা হয়, তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা অনুমান করতেন পৃথিবীর কাছাকাছি নিশ্চয়ই কোনো একটি উপগ্রহ রয়েছে, সেই উপগ্রহের আকর্ষণে সমুদ্রের পানি ফুলে ফেঁপে উঠে জোয়ারভাটার জন্ম দিচ্ছে। হিসাবপত্র করে তারা এই উপগ্রহের আকার-আকৃতি বের করে ফেলতে পারতেন, পৃথিবীটাকে কতদিন পরপর প্রদক্ষিণ করছে সেটিও অনুমান করে ফেলতে পারতেন।

ঠিক সে-রকম মহাজগতে নানা নক্ষত্র, নক্ষত্রপুঞ্জের গতি দেখে তারা অনুমান করার চেষ্টা করেন তাদের আশেপাশে যেসব মহাজাগতিক বস্তু আছে তাদের ভর কত? গত কয়েক দশকে তারা আবিষ্কার করেছেন যে, তাদের অনুমান মিলছে না। নক্ষত্র বা নক্ষত্রপুঞ্জ বা মহাজাগতিক গ্যাসের গতিবিধি দেখে আশেপাশে যে-ভর থাকা উচিত বলে অনুমান করা হচ্ছে, প্রকৃত ভর তার থেকে অনেক কম। তাদের মনে হচ্ছে, অদৃশ্য কোনো ভর লুকিয়ে আছে যেটি তারা দেখতে পাচ্ছেন না। 

আমাদের চোখ যে-আলোকে দেখতে পায় তার বাইরেও কিন্তু আলো রয়েছে। আলো হচ্ছে বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গের দৈর্ঘ্য যখন একটি নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে থাকে শুধুমাত্র তখন সেটি আমরা দেখতে পাই, তার বাইরে চলে গেলে আমরা সেটি দেখতে পাই না। বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের বিশাল ব্যাপ্তির মাঝে আমরা যেটুকু দেখতে পাই সেটি খুবই ছোট, ধর্তব্যের মাঝেই আনার কথা নয়! কাজেই আমরা যেটিকে দৃশ্যমান আলো বলছি তার বাইরেও অদৃশ্য আলোর একটি বিশাল জগৎ রয়েছে। অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রা ভায়োলেট রে সে-রকম আলো, এক্স-রে সে-রকম আলো। এই অদৃশ্য আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকে ছোট। ফাইবার অপটিক্সে তথ্য পাঠানোর জন্যে যে-আলো ব্যবহার করা হয়, সেটিও অদৃশ্য আলো। আমরা তাকে বলি ইনফ্রারেড বা অবলাল আলো। এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকে বেশি। মাইক্রোওয়েভ বা রেডিও, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল টেলিফোনে তথ্য আদান-প্রদান করার জন্যে আমরা যে-বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করি, সেগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যও দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকে অনেক বেশি।

আমরা যে-আলোকে দেখতে পাই তার বাইরেও বিশাল অদৃশ্য আলোর জগৎ রয়েছে জানার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে সেই জগৎটি কেমন? আকাশের যে-অংশ আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না, সেটি দেখার জন্যে বিজ্ঞানীরা নতুন ধরনের টেলিস্কোপ তৈরি করেছেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অনেক আলো শোষিত হয়ে যায় বলে মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠিয়েছেন। পৃথিবীর বিশাল এলাকা নিয়ে, অতিকায় রেডিও টেলিস্কোপ তৈরি করেছেন এবং মহাকাশকে তন্ন তন্ন করে পর্যবেক্ষণ করেছেন। দৃশ্যমান জগতের বাইরে বিশাল অদৃশ্য জগৎ তারা খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু আবার যখন হিসাব করতে বসেছেন তারা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন যে, এখনো হিসাব মিলছে না। এই মহাজগতে যে-পরিমাণ বস্তু থাকার কথা সেই পরিমাণ বস্তু দেখা যাচ্ছে না। তারা নিশ্চিতভাবেই বলছেন, এই মহাজগতে আমাদের চোখের কাছে, অদৃশ্য এক ধরনের বস্তু রয়ে গেছে। খালি চোখে বা বিশেষ টেলিস্কোপ ছাড়া কোনোভাবেই সেটি দেখা যায় না বলে এর নাম দিয়েছেন অন্ধকার বস্তু বা ইংরেজিতে ডার্ক ম্যাটার। বর্তমান বিজ্ঞানের যে-কয়টি রহস্য রয়েছে তার মাঝে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক রহস্যের একটি হচ্ছে এই ডার্ক ম্যাটার-রহস্য।

সৃষ্টিজগতের কতটুকু এই ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার বস্তু? শুনলে নিশ্চয়ই চমকে যাবার কথা যে, শতকরা ৯০ ভাগ আমাদের চোখে এখনো অদৃশ্য। আমরা যেটুকু দেখছি সেটি হচ্ছে মাত্র দশভাগ, বাকি অংশটুকু আমরা দেখছি না, সোজাসুজি দেখার কোনো উপায়ও নেই।

ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে তৈরি সেটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা দ্বিধাবিভক্ত। এক দলকে বলা যায় বেরিওনবাদী, তারা মনে করেন, এই ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত বেরিওন (নিউট্রন-প্রোটন) দিয়ে তৈরি। যেহেতু তাদের থেকে আলো বের হয় না তাই আমরা তাদের দেখতে পারি না; কিন্তু তারা আছে। সোজাসুজি না দেখলেও তাদের প্রভাবটুকু অনুভব করা যায়। তাদের প্রবল মাধ্যাকর্ষণের কারণে কখনো কখনো আলো বেঁকে যায়। কখনো বিশেষ অবস্থায় সেটি লেন্সের মতো কাজ করে, ম্লান কোনো আলোকে উজ্জ্বল আলো হিসেবে দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা আমাদের ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করে অনুমান করেছেন, ডার্ক ম্যাটারের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ এ-রকম। মৃত নক্ষত্র এবং আলোহীন নানা ধরনের গ্যাস বা পদার্থ দিয়ে এসব তৈরি।

ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে তৈরি – তার দ্বিতীয় দলের মানুষদের বলা যায় বৈচিত্র্যবাদী! তারা মনে করেন, বিশাল এই ডার্ক ম্যাটারের জগৎ আসলে আমাদের পরিচিত বেরিওন দিয়ে তৈরি নয়, সেগুলো তৈরি হয়েছে এমন কোনো বিচিত্র পদার্থ দিয়ে আমরা এখনো যার খোঁজ পাইনি। তারা সেটির একটি গালভরা নাম দিয়েছেন ডওগচ (ডবধপশষু ওহঃবৎধপঃরহম গধংংরাব চধৎঃরপষবং) এবং অনুমান করছেন, আমাদের চারপাশে এগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু যেহেতু এগুলো আমাদের পরিচিত কিছু নয় তাই আমরা সেগুলো দেখতে পাচ্ছি না। সেগুলো খোঁজার জন্যে বিশেষ ধরনের ডিটেক্টর তৈরি করা হয়েছে, চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা সিলিকনের সেই ডিটেক্টর এ-ধরনের বিচিত্র বস্তুর অস্তিত্ব নিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছে। যদি সত্যি সে-রকম কিছু খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে পদার্থবিজ্ঞানে সম্পূর্ণ নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোক আর পুরানো অধ্যায় দিয়েই ব্যাখ্যা করা হোক, মহাজগতের অদৃশ্য এই বিশাল ভর কোথা থেকে এসেছে সেটি জানার জন্যে বিজ্ঞানীরা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশাল এই জগতের কত ক্ষুদ্র অংশই না আমরা জানি এবং ভবিষ্যতের জন্যে আমাদের না জানি কত বিস্ময় লুকিয়ে আছে! য়সম্পদ রয়েছে, দেখা নামক অভূতপূর্ব এক ধরনের প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই চোখ আলোকে দেখতে পায় আর সেই আলো থেকে আমরা এই নক্ষত্ররাজি, এই গ্যালাক্সির কথা জানি। যদি নক্ষত্র থেকে আলো বের না হতো তাহলে আমরা এই নক্ষত্রদের দেখতে পেতাম না, হয়তো তাদের কথা এত সহজে জানতে পারতাম না।

বিজ্ঞানীরা এই নক্ষত্ররাজি এবং গ্যালাক্সিমণ্ডলীকে দেখে অনুমান করার চেষ্টা করেছেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আকার কত বড়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি সবকিছু মিলিয়ে তার ভর কত? সেটি করতে গিয়েই তারা আবিষ্কার করলেন যে, তাদের হিসাব মিলছে না। আমরা আমাদের চোখে যে-নক্ষত্ররাজি, যে-গ্যালাক্সি দেখছি, সেটুকু যথেষ্ট নয়। তার বাইরেও আরো বিশাল কিছু থাকতে হবে, যেগুলো আমরা দেখতে পাই না। যেটি দেখতে পাই না সেটি আছে কিংবা নেই – সেই প্রশ্নটিই আমরা করি কী করে?

একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে আমরা বোঝাতে পারি, আমরা চাঁদের কথা ধরি। ধরা যাক, কোনো একটি কারণে চাঁদ আমাদের কাছে অদৃশ্য, আমরা চাঁদকে দেখতে পাই না। তাহলে পৃথিবীর মানুষ কি চাঁদের কথা জানতে পারত না? নিশ্চয়ই পারত এবং সেটি জানতে পারত নদী এবং সমুদ্রের পানিতে জোয়ারভাটা দেখে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরে পরে কেন সমুদ্রের পানিতে জোয়ার এবং ভাটা হয়, তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা অনুমান করতেন পৃথিবীর কাছাকাছি নিশ্চয়ই কোনো একটি উপগ্রহ রয়েছে, সেই উপগ্রহের আকর্ষণে সমুদ্রের পানি ফুলে ফেঁপে উঠে জোয়ারভাটার জন্ম দিচ্ছে। হিসাবপত্র করে তারা এই উপগ্রহের আকার-আকৃতি বের করে ফেলতে পারতেন, পৃথিবীটাকে কতদিন পরপর প্রদক্ষিণ করছে সেটিও অনুমান করে ফেলতে পারতেন।

ঠিক সে-রকম মহাজগতে নানা নক্ষত্র, নক্ষত্রপুঞ্জের গতি দেখে তারা অনুমান করার চেষ্টা করেন তাদের আশেপাশে যেসব মহাজাগতিক বস্তু আছে তাদের ভর কত? গত কয়েক দশকে তারা আবিষ্কার করেছেন যে, তাদের অনুমান মিলছে না। নক্ষত্র বা নক্ষত্রপুঞ্জ বা মহাজাগতিক গ্যাসের গতিবিধি দেখে আশেপাশে যে-ভর থাকা উচিত বলে অনুমান করা হচ্ছে, প্রকৃত ভর তার থেকে অনেক কম। তাদের মনে হচ্ছে, অদৃশ্য কোনো ভর লুকিয়ে আছে যেটি তারা দেখতে পাচ্ছেন না। 

আমাদের চোখ যে-আলোকে দেখতে পায় তার বাইরেও কিন্তু আলো রয়েছে। আলো হচ্ছে বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গের দৈর্ঘ্য যখন একটি নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে থাকে শুধুমাত্র তখন সেটি আমরা দেখতে পাই, তার বাইরে চলে গেলে আমরা সেটি দেখতে পাই না। বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের বিশাল ব্যাপ্তির মাঝে আমরা যেটুকু দেখতে পাই সেটি খুবই ছোট, ধর্তব্যের মাঝেই আনার কথা নয়! কাজেই আমরা যেটিকে দৃশ্যমান আলো বলছি তার বাইরেও অদৃশ্য আলোর একটি বিশাল জগৎ রয়েছে। অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রা ভায়োলেট রে সে-রকম আলো, এক্স-রে সে-রকম আলো। এই অদৃশ্য আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকে ছোট। ফাইবার অপটিক্সে তথ্য পাঠানোর জন্যে যে-আলো ব্যবহার করা হয়, সেটিও অদৃশ্য আলো। আমরা তাকে বলি ইনফ্রারেড বা অবলাল আলো। এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকে বেশি। মাইক্রোওয়েভ বা রেডিও, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল টেলিফোনে তথ্য আদান-প্রদান করার জন্যে আমরা যে-বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করি, সেগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যও দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য থেকে অনেক বেশি।

আমরা যে-আলোকে দেখতে পাই তার বাইরেও বিশাল অদৃশ্য আলোর জগৎ রয়েছে জানার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে সেই জগৎটি কেমন? আকাশের যে-অংশ আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না, সেটি দেখার জন্যে বিজ্ঞানীরা নতুন ধরনের টেলিস্কোপ তৈরি করেছেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অনেক আলো শোষিত হয়ে যায় বলে মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠিয়েছেন। পৃথিবীর বিশাল এলাকা নিয়ে, অতিকায় রেডিও টেলিস্কোপ তৈরি করেছেন এবং মহাকাশকে তন্ন তন্ন করে পর্যবেক্ষণ করেছেন। দৃশ্যমান জগতের বাইরে বিশাল অদৃশ্য জগৎ তারা খুঁজে পেয়েছেন, কিন্তু আবার যখন হিসাব করতে বসেছেন তারা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন যে, এখনো হিসাব মিলছে না। এই মহাজগতে যে-পরিমাণ বস্তু থাকার কথা সেই পরিমাণ বস্তু দেখা যাচ্ছে না। তারা নিশ্চিতভাবেই বলছেন, এই মহাজগতে আমাদের চোখের কাছে, অদৃশ্য এক ধরনের বস্তু রয়ে গেছে। খালি চোখে বা বিশেষ টেলিস্কোপ ছাড়া কোনোভাবেই সেটি দেখা যায় না বলে এর নাম দিয়েছেন অন্ধকার বস্তু বা ইংরেজিতে ডার্ক ম্যাটার। বর্তমান বিজ্ঞানের যে-কয়টি রহস্য রয়েছে তার মাঝে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক রহস্যের একটি হচ্ছে এই ডার্ক ম্যাটার-রহস্য।

সৃষ্টিজগতের কতটুকু এই ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার বস্তু? শুনলে নিশ্চয়ই চমকে যাবার কথা যে, শতকরা ৯০ ভাগ আমাদের চোখে এখনো অদৃশ্য। আমরা যেটুকু দেখছি সেটি হচ্ছে মাত্র দশভাগ, বাকি অংশটুকু আমরা দেখছি না, সোজাসুজি দেখার কোনো উপায়ও নেই।

ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে তৈরি সেটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা দ্বিধাবিভক্ত। এক দলকে বলা যায় বেরিওনবাদী, তারা মনে করেন, এই ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত বেরিওন (নিউট্রন-প্রোটন) দিয়ে তৈরি। যেহেতু তাদের থেকে আলো বের হয় না তাই আমরা তাদের দেখতে পারি না; কিন্তু তারা আছে। সোজাসুজি না দেখলেও তাদের প্রভাবটুকু অনুভব করা যায়। তাদের প্রবল মাধ্যাকর্ষণের কারণে কখনো কখনো আলো বেঁকে যায়। কখনো বিশেষ অবস্থায় সেটি লেন্সের মতো কাজ করে, ম্লান কোনো আলোকে উজ্জ্বল আলো হিসেবে দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা আমাদের ছায়াপথ পর্যবেক্ষণ করে অনুমান করেছেন, ডার্ক ম্যাটারের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ এ-রকম। মৃত নক্ষত্র এবং আলোহীন নানা ধরনের গ্যাস বা পদার্থ দিয়ে এসব তৈরি।

ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে তৈরি – তার দ্বিতীয় দলের মানুষদের বলা যায় বৈচিত্র্যবাদী! তারা মনে করেন, বিশাল এই ডার্ক ম্যাটারের জগৎ আসলে আমাদের পরিচিত বেরিওন দিয়ে তৈরি নয়, সেগুলো তৈরি হয়েছে এমন কোনো বিচিত্র পদার্থ দিয়ে আমরা এখনো যার খোঁজ পাইনি। তারা সেটির একটি গালভরা নাম দিয়েছেন ডওগচ (ডবধপশষু ওহঃবৎধপঃরহম গধংংরাব চধৎঃরপষবং) এবং অনুমান করছেন, আমাদের চারপাশে এগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু যেহেতু এগুলো আমাদের পরিচিত কিছু নয় তাই আমরা সেগুলো দেখতে পাচ্ছি না। সেগুলো খোঁজার জন্যে বিশেষ ধরনের ডিটেক্টর তৈরি করা হয়েছে, চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা সিলিকনের সেই ডিটেক্টর এ-ধরনের বিচিত্র বস্তুর অস্তিত্ব নিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছে। যদি সত্যি সে-রকম কিছু খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে পদার্থবিজ্ঞানে সম্পূর্ণ নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।নতুন অধ্যায়ের সূচনা হোক আর পুরানো অধ্যায় দিয়েই ব্যাখ্যা করা হোক, মহাজগতের অদৃশ্য এই বিশাল ভর কোথা থেকে এসেছে সেটি জানার জন্যে বিজ্ঞানীরা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশাল এই জগতের কত ক্ষুদ্র অংশই না আমরা জানি এবং ভবিষ্যতের জন্যে আমাদের না জানি কত বিস্ময় লুকিয়ে আছে!