মুর্তজা বশীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০১০ সালে গ্রিন রোডের এক হাসপাতালে। ভেতরে ডাক্তারদের চেম্বার। বাইরে রোগীদের বসার জন্য বিশাল ফ্লোরে সারিবদ্ধ লাল-সবুজ রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার। দেওয়ালে টেলিভিশন ঝুলছে। রোগী আর রিপোর্ট দেখাতে আসা অপেক্ষমাণ মানুষ ঝোলানো টিভিতে তখন অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটের জীবজন্তুদের বিচিত্র জীবন দেখছে। আমিও সেসব দেখছি। হঠাৎ সামনের সারিতে আমার চোখ গিয়ে পড়ল তাঁর দিকে। হাতে কাগজপত্র – দেখে মনে হলো রিপোর্ট। তাঁকে বেশ চিন্তিত এবং গম্ভীর দেখাচ্ছে। বন্ধুবান্ধবের কাছে শুনেছি, তিনি ভীষণ রাশভারী মানুষ। সবার সঙ্গে অত কথাটথা বলেন না। যাওবা বলেন তা নাকি ওই ‘হ্যাঁ, হুঁ, হা’ পর্যন্ত।
তিনি দেওয়ালে ঝোলানো টিভি স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বুঝি ইচ্ছের বিরুদ্ধে টিভি দেখছেন।
নয় বছর ইতালির মিলান শহরে থাকতে হয়েছিল জীবিকার তাগিদে। ফলে টুকটাক ইতালিয়ান ভাষা শেখা আছে আর ইতালির প্রতি প্রেমটা তো আছেই। সেই সন্ধ্যায় তাঁকে ওরকম কাছ থেকে দেখতে পেয়ে মনে মনে শিহরিত হলাম এই ভেবে, আমার সামনে বসে থাকা মানুষটা আমার জন্মেরও বারো বছর আগে ১৯৫৬ সালে ফ্লোরেন্সে গিয়েছিলেন এবং সেখানকার অ্যাকাদেমি দ্যেল্ বেল্লে আর্তিতে শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সেখানে দু-বছর ছিলেন। ব্যাপারটা আমাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছিল।
সন্ধ্যাবেলায় হাসপাতালে ওরকম চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখেও কেন যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে তারখাম্বার মতো অমন করে দাঁড়িয়ে যাওয়া দেখে তিনি চোখ ঈষৎ লাল করে তাকালেন। আমি হড়বড় করে বোকার মতো তাঁকে বললাম,
– সিনোরে, বুওনো ছেরা, কমে ভা? (জনাব, শুভ সন্ধ্যা, আপনি কেমন আছেন?)
আমার দ্রুত ভঙ্গিতে বলা কথা তিনি সম্ভবত বুঝে উঠতে পারলেন না।
বুঝবেনই বা কেমন করে!
কত বছর হয়ে গেল তিনি ইতালি ছেড়ে চলে এসেছেন দেশে। এত বছর পর তিনি হয়তো সেই ভাষাটা ঠিকমতো শুনতে পাননি। আর শুনতে পেলেও হয়তো ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি।
তিনি আমার দিকে চোখ তুলে ভালো করে তাকিয়ে বললেন,
– কী বললেন! বুওনো ছেরা!
– এজাতো – (ঠিক ধরেছেন)
– লিঙ্গুয়া ইতালিয়ানো! ততক্ষণে তাঁর মুখে স্বচ্ছ আভায় খানিক স্বস্তির রেখা।
পাশে বসতে বললেন। অনেক কথা হলো। তিনি জানালেন, তার স্ত্রীর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। তাকে নিয়ে এসেছেন। ডাক্তারের রুমে মেয়ে আর স্ত্রী। তিনি বাইরে অপেক্ষা করছেন। জানালেন, তিনিও নানা শারীরিক ঝামেলার মধ্যে আছেন।
তখনো তিনি আগের মতো গম্ভীর, আমার সঙ্গে ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলার কারণ?
একজন রাশভারী, গম্ভীর মানুষের মনোযোগ পাওয়ার জন্য কায়দা করে ইতালিয়ান ভাষায় বুওনো ছেরা বলা আর দীর্ঘকাল পর ইতালিয়ান শব্দ শুনে যদি তাঁর পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে যায়!
আমার সরল স্বীকারোক্তি শুনে তিনি গম্ভীরমুখে ঈষৎ হাসলেন। তাঁর হাসির ভেতর শিশুসুলভ সারল্য খুঁজে পেলাম। সাধারণত গম্ভীর চেহারার মানুষরা হাসলে তাদের খুব একটা সুন্দর দেখায় না। কিন্তু তাঁকে সুন্দর দেখাল। তিনি শিশুর মতো অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– তুমি নয় বছর ইতালিতে ছিলে! কেমন লেগেছে ইতালি! অনেক সুন্দর দেশ। আমি এখনো ইতালির প্রেমে পড়ে আছি। তারপর তিনি বললেন, যোগাযোগ রেখো।
এরপর পেশাগত কারণে নানা সময়ে তাঁর মনিপুরি রোডের বাসায় গিয়েছি। সাপ্তাহিক ২০০০, জনকণ্ঠ, কালি ও কলম, শিল্প ও শিল্পীর জন্য দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও নিয়েছি। কত গল্প, কত কথা, কত স্মৃতির কথা যে তিনি বলতেন। তবে যখনই তাঁর সঙ্গে কথা হতো ঘুরেফিরে চলে আসত ইতালির কথা। ফ্লোরেন্সের
কথা। ফ্লোরেন্সের কথা বলার সময় তিনি আবেগি হয়ে উঠতেন।
দুই
শৈশবের কথা জানতে চাইলে তিনি বলতেন, এসব কথা অনেকবার অনেক জায়গায় বলেছি, লিখেছিও। তোমাকে অল্প কথায় যা বলব তা হলো, বিখ্যাত বাবার সন্তান হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই আমি অন্যদের চেয়ে বেশ দুর্বিনীত স্বভাবের ছিলাম। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে বলেও আমার মধ্যে এক ধরনের বাড়তি অহংকার ছিল।
ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউট থেকে অষ্টম শ্রেণি পড়া শেষ করে ’৪৬ সালে বগুড়ায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম আমি। বগুড়া তখন ছোট শহর। কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাদের বেশি, ফলে শিক্ষা ও
সংস্কৃতির দিক থেকে তারা ছিল অনেক উন্নত। পিতার কল্যাণে স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকরা আমাকে আলাদা নজরে দেখতেন।
পিতার পরিচয়ে চলতাম। নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করতাম। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে মুকুল ফৌজের মেয়েরা
যে-পথ দিয়ে লাইন ধরে যায় তার ভেতর আমি আমার র্যালি সাইকেলটা চালিয়ে দিয়েছিলাম। একটি মেয়ে সাইকেলের ধাক্কা লেগে পড়ে গিয়ে আহত হলো। মেয়েটা উঠে আমাকে গালাগালি করে বলল, এটা কি তোমার বাবার রাস্তা!
আমি তখন মেয়েটাকে বলেছিলাম, এটা আমার বাবার রাস্তা না, তবে প্রয়োজন হলে করিয়ে নেব।
আরেকবার আমার দুরন্তপনার জন্য প্রধান শিক্ষক নরেন্দ্রমোহন চৌধুরীর কানে নালিশ যায়। তিনি আমাকে তাঁর রুমে ডেকে পাঠালেন। প্রধান শিক্ষকের ঘরে আগে থেকে ছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক ও আমাদের অঙ্কের মাস্টার নরেন্দ্রমোহন ঢোল। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আমি প্রধান শিক্ষকের সামনের টেবিলের ওপর দু-হাতে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। প্রধান শিক্ষক আমাকে ওরকম দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ঠিক হয়ে দাঁড়াও।
আমি তখনো বুঝতে পারিনি তার সামনে টেবিলে দু-হাত রেখে দাঁড়ানোটা যে বেয়াদবি। নরেন্দ্রমোহন ঢোল আমাকে বললেন, বশির, টেবিল থেকে হাত দুটো নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াও।
প্রধান শিক্ষক রাগত স্বরে বললেন, আমি তোমার পিতার কাছে নালিশ করবো। আমি তখন আমার অহমবোধ থেকে উত্তর দিলাম, আপনি হেডমাস্টার আর আমার পিতা অধ্যক্ষ। তাঁর সামনে যাওয়ার যোগ্যতা আপনার নেই।
আমার কথা শুনে তিনি ভয়ানক রকমের রেগে গেলেন। বাবার কাছে নালিশ গেল। ঘরে ফিরলে বাবা আমাকে বললেন, তোমার ক্লাসের ইংরেজি গ্রামার বইয়ে তুমি পড়েছো না, প্রিন্সিপাল – প্রিনসিপল, এমিন্যান্ট – ইমিন্যান্ট, নটোরিয়াস অ্যান্ড ফেমাস। তারপর তিনি কঠিন গলায় বললেন, ইউ আর মাই সান আইদার নটোরিয়াস অর ফেমাস, ডোন্ট বি মিডিওকার।
বাবার কথাগুলো সেই বয়সে আমার মাথার ভেতর ঢুকে গিয়েছিল এবং সেদিনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম এখন থেকে আমাকে কীভাবে চলতে হবে।
তিন
একদিন কথায় কথায় মুর্তজা বশীর স্যারকে বললাম, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়েছে ইতালির মেয়েরা আমাদের এই অঞ্চলের মেয়েদের মতোই আবেগি আর সবাইকে নিয়ে সামাজিক জীবনযাপনে বিশ্বাসী।
মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, আমিও দেখেছি। ওরা পরিবারকে অনেক মানে।
এরপর বললাম, ইতালিয়ান মেয়েরা নাকি খুব দ্রুত প্রেমে পড়ে। ফ্লোরেন্সে আপনি কি ইতালিয়ান কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন?
প্রেমে পড়েছি কি না তা বলার আগে যেটা বলা জরুরি সেটা হলো, ফ্লোরেন্সের প্রাণপ্রকৃতিতে আমি আসলেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সেখানকার সাধারণ মানুষদের নিত্যদিনের সাদাসিধে জীবন, তাদের আড্ডাবাজ স্বভাব আর তীব্র রসবোধ আমাকে ভীষণ টেনেছিল। খুব সরল তাদের জীবন। ফ্লোরেন্সের উফিজি আর্ট গ্যালারিতে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, টিসিয়ান, রুবেন্স, রাফায়েলসহ অনেকের শিল্পকর্ম দেখে বিস্মিত হলাম। এছাড়া প্রাক-রেনেসাঁসের শিল্পী দুচ্চো, সিমাব্যু, সিমন মার্টিনি, ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকো, জত্তোসহ অনেকের কাজ দেখলাম। তাঁদের কাজের প্রকৃতি, চিন্তা আর রঙের বহুমাত্রিক অথচ পরিমিত ব্যবহার আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করল।
এবার মুর্তজা বশীর খানিকটা চিন্তা করে বললেন, ইতালিয়ান মেয়েরা খুব দ্রুত প্রেমে পড়ে কি না তা আমার জানা নেই, তবে ফ্লোরেন্সে থাকার সময় একটি মেয়ের সঙ্গে আমার ভালোবাসার মতো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমরা দুজন ঘুরে বেড়াতাম। মেয়েটা আমার কাজে উৎসাহ দিত। আমরা বিয়েও করব ভেবেছিলাম, সেজন্য মেয়েটা অল্প অল্প বাংলাও শিখেছিল। বাইরে ঘোরাফেরার সময় আমরা যখন বাংলায় কথা বলতাম তখন আশপাশের মানুষজন অবাক হয়ে আমাদের তাকিয়ে দেখত। মেয়েটা শিল্পকলার সমঝদার ছিল আর দেখতেও বেশ সুন্দরী ছিল বলে আমার দিকে তাকিয়ে সমর্থন আদায়ের ভঙ্গিতে বললেন, আর তুমি তো নিজের চোখেই মিলানোতে দেখে এসেছ ইতালির মেয়েরা কেমনতর সুন্দর হয়। তিনি বলে যাচ্ছেন, নীলনয়না মেয়েটা ছিল স্বর্ণকেশী, গায়ের রং তামাটে ফর্সা। সে-তুলনায় আমার গায়ের রং তার ধারেকাছেও না। আমার চুল কুচকুচে কালো, তার ওপর হালকা ঢেউ খেলানো কোঁকড়া। চোখে চশমা। আমরা যখন বাইরে ঘুরতাম তখন ফ্লোরেন্সের অনেকেই আমাদের দেখে রসিকতা করে বলত, কাফে লাততে, কাফে লাততে।
ইতালিয়ান ভাষায় কাফে মানে কফি আর লাততে মানে হলো দুধ। কফির রং কালো আর দুধের রং সাদা। আরো পরিষ্কার করে বললে, কাফে মানে আমি আর লাততে মানে ও।
প্রথমদিকে কাফে আর লাততে নিয়ে আমার মধ্যে প্রচ্ছন্ন অস্বস্তির একটা বিষয় ছিল। বিষয়টা বুঝতে পেরে মেয়েটা আমাকে বলল, বাশীর, ইতালিয়ানরা তোমাদের গায়ের এই রংকে অসম্ভব পছন্দ করে, তাই ওরা আমার পাশে তোমাকে দেখে ঈর্ষা করে এসব বলে। তুমি এসব গায়ে মেখো না।
আমার দেশ কোথায় জিজ্ঞেস করলে মেয়েটা বলত, বাংলাদেশ। সে-সময় বাঙালি সম্পর্কে ইতালিয়ানদের খুব একটা ধারণা ছিল না। তারা বই পড়ে জেনেছে বাংলার বাঘের কথা। আমার কাছে অনেকে জানতে চাইত, তোমাদের দেশে কি আসলেই অনেক বাঘ আছে!
আমি তখন রসিকতা করে তাদের বলতাম, তোমরা যেমন ঘরে বিড়াল পালো, আমরাও তেমনি ঘরে বিড়ালের মতো করে বাঘ পালি।
চার
স্ত্রী আমিনা বশীরের মৃত্যুর পর তিনি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে প্রতি শুক্রবার প্রিয়তমা স্ত্রীর কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকতেন। হাত তুলে প্রার্থনা করতেন। ফেসবুকে সেই ছবি পোস্ট করতেন। মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে তাঁর খোঁজ নিই। ফেসবুকে তিনি আমার লেখায় লাইক দিতেন, কালেভদ্রে মন্তব্যও।
জন্মগত কারণে পুরান ঢাকার প্রতি আমার তীব্র ভালোবাসার কথা তিনি জানতেন। ২০২০ সালের এপ্রিলের ৭ তারিখে ফেসবুকে আমি লিখেছিলাম, ‘ট্যাডিবাবু সাইজ্যা এই মহল্লায় যদি তরে আর ‘খিল্লি’ মারতে দেখছি তাইলে তর নল্লিমল্লি ঝুলায়া দিমু আর হাড্ডি-মাংস দিয়া সুতলি কাবাব বানামু’ – ছোটবেলায় আমাদের বসুবাজার লেনে আসা পাশের মহল্লার এক সুদর্শনকে এলাকার ছেলেরা ধরে মারধর দেওয়ার পর এই কথা বলেছিল।
সেই বয়সে আমি বুঝতে পারিনি ট্যাডিবাবু আর খিল্লি শব্দের মানে কী …’
দুপুরের দিকে স্যার আমাকে ফোন দিয়েছেন। তাঁর ফোন দেখে একটু বিচলিত হলাম, অনেকদিন ধরে স্যারের শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। কয়েক দফায় হাসপাতালে থাকা হয়েছে। ভাবলাম, স্যারের শরীরটা খারাপ নয় তো!
– স্যার ভালো আছেন!
অন্য প্রান্ত থেকে বশীর স্যার বললেন,
– মাহবুব তুমি কেমন আছো? তোমার খোঁজ নিতেই ফোন করেছি –
আগে-পরেও এরকম অনেকবার হয়েছে। ছিয়াশি বছরের একজন মানুষ ফোন করে আমার খোঁজখবর নিচ্ছেন ভেবে লজ্জা পাই,
– স্যার আপনার শরীরটা কেমন?
– আমি আছি ভালোই; বলে স্যার বললেন, মাহবুব, আমি ফেসবুকে তোমার লেখা দেখি পড়ি। আজ সকালে তুমি তোমার ছোটবেলার যে-ঘটনার কথা লিখেছ সেটা পড়ে আমার জীবনের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেল – সেজন্যই তোমাকে ফোন করা। শোন, ‘খিল্লি’ শব্দের অর্থ এতদিন আমি জেনে এসেছি খিলি পান; কিন্তু তোমার লেখায় তুমি যে ‘খিল্লি’ লিখেছ সেটার মানে হলো হিরোইজম। ছোটবেলায় পুরান ঢাকায় আমরাও দেখতাম আমাদের এলাকার সুন্দরী মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আশপাশের এলাকা থেকে সুদর্শন যুবকরা সেজেগুজে আসত। তোমার লেখা পড়ে এখন বুঝলাম সেই দৃষ্টি আকর্ষণ করাকে আসলে বোঝায় খিল্লি –
– স্যার, আপনি আমার লেখা পড়েছেন এতেই আমি খুশি।
– আরেকটা জিনিস, তুমি লিখেছ মাহবুব, সেটা হলো ‘ট্যাডি বাবু’ – কথাটা বলে তিনি হাসলেন, তোমার এই ট্যাডি বাবু পড়ে আমার অনেকদিন আগের স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ছাপ্পান্ন সালে আমি বাবার অর্থায়নে পড়াশোনা করার জন্য দু-বছরের জন্য ইতালির ফ্লোরেন্সে চলে গেলাম। তখন আমাদের এখানে চল ছিল পায়জামার মতো ঢিলেঢালা একধরনের প্যান্টের। আমি সেরকম প্যান্ট পরতাম। ইতালিয়ানরা পরত ন্যারো প্যান্ট – মানে চাপা ধরনের। ফ্লোরেন্সের ইনস্টিটিউটে ক্লাসের মেয়েরা আমার দিকে যত না তাকাত তার চেয়ে বেশি তাকাত প্যান্টের দিকে। তারা হাসত আর বলত,
– বাশীর, তোমাদের দেশে কি খুব গরম!
স্যার বলে যাচ্ছেন, ষাটের দশকে তো এলো বিশ চব্বিশ ইঞ্চি ঢোলা বেলবটম স্টাইল। আমরা সেই প্যান্টকে বলতাম ঝাড়ু দেওয়া প্যান্ট। হাঁটার সময় সেই প্যান্ট ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করত।
ঊনষাট সালের কথা। আমি তখন দেশে ফিরে এসেছি। তখনো আমার চালচলন, বেশভূষায় একটা ইউরোপ-ইউরোপ ভাব। একদিন আমি বাসা থেকে বেরিয়ে রিকশায় যাচ্ছি। আমার রিকশা যখন কার্জন হলের কাছাকাছি, তখন দেখি ছাত্রদের একটা মিছিল যাচ্ছে। আমার রিকশাঅলা বারবার বেল বাজাচ্ছে দেখে মিছিল থেকে কয়েকজন ছাত্র এসে রিকশাটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আমাকে ভালো করে দেখতে লাগল। আমার পরনে ঢিলেঢালা বেলবটম, টাইট হাফহাতা গেঞ্জি, হাতে ঘড়ি।
আমাকে দেখে তাদের মনে হলো আমি বুঝি ট্যাডিবাবু। তারা আমাকে ঘিরে ধরে বলতে লাগল,
– এই দেখ, দেখ ট্যাডি যাচ্ছে – ট্যাডি যাচ্ছে। ওরে ধর –
মিছিলের অল্পবয়সী ছেলেগুলোকে একটু ক্ষিপ্ত মনে হলো। ওদেরকে শান্ত করতে আমি ওদের সামনেই রিকশাওলার ওপর রাগ দেখিয়ে বকাঝকা শুরু করলাম, এই, তোমার এত বেল বাজানোর কী দরকার ছিল?
আমার কথায় শান্ত হওয়ার কোনো নমুনা দেখি না। তারা প্রায় মারমুখী – পারে তো আমাকে আর রিকশাওলাকে তখনই উত্তমমধ্যম দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমি আশপাশের মানুষজনকে ডেকে আমার বাবা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পরিচয় দিয়ে বললাম, আমি একজন শিল্পী – বাবাকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সবাই মান্য করে। ফলে সেই যাত্রায় আমি বেঁচে গেলাম।
মিছিলের ছেলেদের মুখে ‘এই দেখ, দেখ ট্যাডি যাচ্ছে – ট্যাডি যাচ্ছে। ওকে ধর -’ কথাটা আমার মনে খুব দাগ কাটল। আমি তখন এটা নিয়ে একটা গানও লিখে ফেললাম, ‘আই অ্যাম এ ট্যাডি বয়, আই ডোন্ট হ্যাভ অ্যানি গার্ল, লাভ মি লাভ মি।’
সেই ঘটনার পর প্রায় সময়ই একা থাকলে, রাস্তায় বের হলে, ছবি আঁকার সময় নিজে নিজে গুনগুন করে গাইতাম বলে তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বাচ্চাদের মতো মোবাইলের অপর প্রান্তে গাইতে
থাকলেন,
আই অ্যাম এ ট্যাডি বয়,
আই ডোন্ট হ্যাভ অ্যানি গার্ল,
লাভ মি লাভ মি,
আই অ্যাম এ ট্যাডি বয়
লাভ মি লাভ মি –
আমি শুনতে থাকি মোবাইলের ওপাশ থেকে ভেসে আসছে মুর্তজা বশীরের সুরারোপিত গান। তিনি গান গাইতে গাইতে যেন ফিরে যাচ্ছেন অতীতে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.