॥৯॥
বটু আর কাজলের সঙ্গে আমি একবার নতুন বাবার আশ্রমে গিয়েছিলাম। নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসে উঠেছিলাম, খুবই ভিড়ে ঠাসা বাস, গন্তব্যস্থানটির নাম মনে নেই। সরাইল হতে পারে কি?
কেন গিয়েছিলাম? নিছক কৌতূহল। বটুর মতন একজন তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এবং প্রতিভাবান লেখক, সে কী করে একজন ধর্মগুরুর ভক্ত হয়, এটা আমার বোধগম্য হচ্ছিল না। তাহলে কি সেই ধর্মগুরুটির কোনো অলৌকিক শক্তি আছে? অলৌকিক শক্তি বলেই কি কিছু আছে? বাস থেকে নেমে একটু দূরে গেলেই সেই বাবার ডেরা। আশ্রমের বদলে আখড়াও বলা যেতেপারে। সেটা অনেকখানি ছড়ানো, ছোট ছোট ঘর, উঠোন, আবার ঘর। আবার উঠোন, অনেক ভক্তও রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো একেবারের ভেতরের দিকের একটা ঘরে।
মানুষটির বয়েস কম নয়, পঁয়ষট্টি-সত্তরের কাছাকাছি, ছিপছিপে মেদহীন শরীর। একটা লুঙ্গি গিঁট দিয়ে পরা, খালি গা, শ্যামবর্ণ। ভক্তরা সেই ঘরে এসে তাঁর পা ছুঁয়ে কদমবুচি করছে, তিনি তাদের মাথায় হাত ছুঁইয়ে অনুচ্চস্বরে বলছেন কিছু। আর মাঝে মাঝে ওপরের দিকে তাকিয়ে হুংকারের মতন বলছেন, আমি ঐ! আমি ঐ!
আগে আমি নিজে বাবা-মা এবং নিতান্ত গুরুজন ছাড়া আর কারুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করার ঘোরবিরোধী ছিলাম। কোনো শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে অন্যরা প্রণাম করছে, আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতাম তেড়িয়ার মতন । এখন অনেকটা নরম হয়েছি, এখন মনে হয়, আলাদাভাবে দ্রষ্টব্য না হয়ে কোনোমতে একটা পেন্নাম ঠুকে দিলে ক্ষতি কী?
আমি তাঁর পদস্পর্শ করার পর তিনি আমার পরিচয় জানতে চাইলেন ।
আমার নাম শুনলে মনে হয় হিন্দু, তাই তিনি আমার সঙ্গে রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ে কিছু বলতে লাগলেন। আমি তাতে যোগ দিতে খুব-একটা উৎসাহ বোধ করলাম না। হিন্দু দেব-দেবী বা ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে আমার আগ্রহ একেবারেই অ্যাকাডেমিক। রামায়ণ-মহাভারত, বেদ-উপনিষদ, বাইবেল, কোরান, হাদিস, বিষাদসিন্ধু একাধিক বার পড়েছি, শুধুই সাহিত্যরস খোঁজার জন্যে, পেয়েছিও অনেক। আমার মনে বিন্দুমাত্র ভক্তিভাব নেই। রাধা আর কৃষ্ণ আমার কাছে কাব্যের নায়িকা আর নায়ক, তার বেশি কিছু নয়। ইনি অবশ্য কাব্যের ধার ধারেননি!
জনে জনে সকলের সঙ্গেই কিছু কিছু কথা বলছিলেন, মাঝে মাঝে হঠাৎ থেমে গিয়ে তিনি বলছিলেন, দাঁড়াও, দাঁড়াও, দাউদকান্দিতে খুব
ঝড় উঠেছে, একটা নৌকা খুব বিপদে পড়েছে, দেখি যদি কিছু করা
যায়।
তিনি ঊর্ধ্বনেত্রে যেন ধ্যানস্থ হয়ে রইলেন একটুক্ষণ ।
সত্যিই কি ওঁর দিব্যদৃষ্টি আছে? উনি দেখতে পাচ্ছেন দাউদকান্দি পর্যন্ত? সেখানে কোনো নৌকো ঝড়-বাদলে বিপদে পড়লে এতদূর থেকে তাদের রক্ষা করার ক্ষমতা কোনো মানুষের থাকতে পারে ?
আমি তা মানতে পারবো না, তবে যারা বিশ্বাসী তাদের কথা আলাদা। শুনেছি, বিশ্বাসের জোর থাকলে অনেক কিছু সম্ভব হয়ে ওঠে। আবার অবিশ্বাসেরও জোর কম নয়।
মানুষটির প্রবল ব্যক্তিত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু রাগী নন, সবসময়ে হাসিমুখে থাকেন। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, ইনি কি তান্ত্রিক, না ফকির, না সুফি সাধক?
সেখানে আর একটি বিচিত্র ব্যাপার ঘটছিল।
ওঁর ভক্তরা অনেকেই হাতে করে ওঁর জন্য কিছু না কিছু প্রণামী আনছিল, ফলমূল, মিষ্টির বাক্স এবং মদের বোতল। নানারকম মদ, হুইস্কি, ব্র্যান্ডি, রাম, বিয়ার ইত্যাদি। একটা বেশ বড় ড্রামে সবকটা বোতলের ছিপি খুলে ঢেলে দেওয়া হচ্ছিল। তার থেকে ছোট গেলাসে তুলে তুলে দেওয়া হচ্ছিল ইচ্ছুক ভক্তদের। একসঙ্গে অত রকম মদের মিশ্রণ আমি আগে দেখিনি বা চাখিনি। বিপজ্জনক হতেই পারে, কিন্তু আমরা কমল মজুমদারের চ্যালা, বাংলা মদে হাতেখড়ি, আমাদের আবার ভয় কী? নতুন বাবা নিজেও একটু একটু চুমুক দিচ্ছেন গেলাস থেকে, আমি যতক্ষণ ছিলাম, ততক্ষণে ওঁর বয়েসি কোনো লোকের বেশ নেশা হয়ে যাবার কথা, কিন্তু ঠিক সোজা হয়ে রইলেন। উপস্থিত অনেকেই এক গেলাসের বেশি পান করেনি ।
মোটকথা সন্ধেটা বেশ ভালোই কাটলো।
কোনোরকম ধর্মীয় গোঁড়ামির কথা শুনতে হয়নি। নতুন বাবা মাঝে মাঝে সহজ-সরল ভাষায় কিছু কিছু উপদেশ দিচ্ছিলেন, আর হঠাৎ হঠাৎ থেমে গিয়ে দূরবর্তী কোনো বিপন্ন ভক্তকে উদ্ধার করছিলেন ধ্যানযোগে। আর এক-একবার হুংকার দিচ্ছিলেন, আমি ঐ !
নতুন বাবা আমার মনের মধ্যে একটা ছাপ ফেলে দিয়েছিলেন ঠিকই। সেই একবারই মাত্র দেখেছি, কিন্তু এখনো মনে আছে তাঁর চেহারা। তাঁর হুংকার, ‘আমি ঐ’, এটাও আমার কানে ধ্বনিত হয়েছে অনেকদিন। ঠিক কী অর্থে তিনি ওটা বলছিলেন, তা আমি বুঝিনি, জিজ্ঞেসও করিনি । সবকিছু বোঝার দরকারই বা কী? ধ্বনি-ঝংকারটাই আসল ।
বছরখানেক পরে আমি একটি গল্পে অনেকটা নতুন বাবা- সদৃশ একটা চরিত্র এবং তার মুখে ‘আমি ঐ’ ধ্বনিটা ব্যবহার করেছিলাম।
কিন্তু আমার তো নতুন বাবার ভক্ত হবার ইচ্ছে হয়নি। একজন বেশ আকর্ষণীয় মানুষ, তাঁর কাছে মাঝে মাঝে গিয়ে গল্প করতে ভালো লাগতে পারে, কিন্তু আর সবকিছু ছেড়েছুড়ে তাঁর কাছে আত্মসমৰ্পণ করার যুক্তি কী? বটু আর কাজল দুজনেই মেতে উঠেছিল এই বাবাকে নিয়ে। বায়তুল মোকাররমের কাছে বটুদের একটা সোনার গয়নার দোকান ছিল, শুনেছি, বটুর অমনোযোগে সে-ব্যবসা ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর সে লেখাও বন্ধ করে দিয়েছে একেবারে।
সোনার দোকান নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, কিন্তু মাহমুদুল হকের মতন একজন শক্তিশালী লেখক যদি সাহিত্যজগৎ থেকে বিদায় নেয়, আমার মতে, সেটা একটা দারুণ ক্ষতি।
বটুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল বেলাল আর রফিক আজাদ। প্রথম দিকে ঢাকা শহরে গিয়ে ওদের তিনজনকে সবসময়ে দেখতাম একসঙ্গে, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, আমি গিয়ে পড়লে চতুর্থজন। আমি ওদের থেকে বয়েসে বড়, তাই সমানভাবে মিশতেও পারি, আবার মাঝে মাঝে প্রয়োজন হলে বকুনিও দিতে পারি। বেলাল আর রফিক আস্তে আস্তে বটুর কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। কাজল আমাকে অনেকবার বলেছে, সুনীলদা, আপনি বটুরে বুঝায়ে বলেন, কেন সে আর ল্যাখে না?
বটুকে আমি এ-বিষয়ে অনেকবার প্রশ্ন করেও সঠিক কোনো উত্তর পাইনি । ও হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, লিখবো লিখবো। আবার যখন ইচ্ছে হবে । আমার মতন একজন লেখক আর কিছু না লিখলেই বা কী আসে যায়?
একবার সে আমাকে সুদীর্ঘ একটা চিঠি লিখেছিল। তার ভাষা চমৎকার। কিন্তু বক্তব্য আমার বোধগম্য হয়নি। মোটকথা, সে বলতে চেয়েছিল, লিখতে গেলে সে মনের জোর হারিয়ে ফেলছে, তাই সে আত্মানুসন্ধান করছে, সে-ব্যাপারে একমাত্র সাহায্য করতে পারেন তাঁর গুরু।
সব লেখকেরই মাঝে মাঝে এমন একটা সময় আসে, যখন মনে হয়, কিছুই যেন ঠিক হচ্ছে না। রাইটার্স ব্লক। সেটা নিজেকেই আবার কাটিয়ে উঠতে হয় । আত্মনির্ভরতা ছাড়া অন্য কারুর ওপর নির্ভর করাটা তো আরো বেশি দুর্বল হবার লক্ষণ!
বটু আর কাজলের সঙ্গে ঢাকা থেকে ফেরার পথে অনেকদিন পর আবার দেখা হলো বলেই এসব মনে পড়লো। ওদের বলেছিলাম, একদিন আমাদের বাড়িতে আসতে, খুব সম্ভবত সময় পায়নি।
জীবনে যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়, তাদের মধ্যে অল্প কিছুজনের সঙ্গেই হয় অন্তরঙ্গতা। সে-রকম অন্তরঙ্গ কারুকে জীবিত অবস্থাতেই বিনা কারণে হারাতে হলে বুকের ভেতরটা টনটন করে।
এক বিকেলে একজন অপরিচিত মহিলা ফোন করে বললেন, আপনার বন্ধু ওবায়দুল্লাহ কলকাতায় এসেছেন। আপনার সঙ্গে আজ সন্ধেবেলা দেখা করতে চান।
ওবায়দুল্লাহকে ঢাকায় সবাই বলে সেন্টুভাই। সে যেন বহুরূপী । বিরাট বিরাট চাকরি করে, কিন্তু কখন কোনটা বদলায়, তা বুঝতে পারি না। কখনো শুনি সে বাংলাদেশের একজন মন্ত্রী, কখনো শুনি আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত, কখনো বিশ্ব ব্যাংকের কী যেন। যদিও তার প্রধান পরিচয়, সে একজন কবি। অন্তত শুধু সেই পরিচয়েই সে আমাদের নঙ্গে মেশে। সে অত্যন্ত সুপুরুষ এবং বদমেজাজি।
ইদানীং সে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার বড় কর্তা হয়েছে, তার ঘাঁটি ব্যাংকক, প্রায়ই অফিসের কাজে কলকাতা শহরে আসে। তবে আসে ঘূর্ণিঝড়ের মতন, একবেলা-দেড়বেলা থেকেই চলে যায়।
আমি ভদ্রমহিলাকে বললুম, আজ তো আমি দেখা করতে পারছি না । আজ সন্ধেবেলা আমার একটা জরুরি কাজ আছে।
ভদ্রমহিলা বললেন, দেখুন, আপনাকে হঠাৎ এরকমভাবে বলা হয়তো আমার পক্ষে উচিত না, কিন্তু উনি আমাদের বস্, আর জানেনই তো, উনি কী রকম মেজাজি মানুষ! উনি কাল ভোরবেলার ফ্লাইটে ফিরে যাবেন, আমাকে বললেন, আজ সন্ধেবেলা আমার জন্য কোনো কাজ রাখবে না, আজ শুধু সুনীলের সঙ্গে আড্ডা দেবো, সুনীলকে আনাবার ব্যবস্থা করো। গাড়ি পাঠাও। উনি উঠেছেন টলি ক্লাবে ।
আমি বললাম, আজ সন্ধেবেলা আমাকে একটা পার্টিতে যেতেই হবে, কথা দিয়ে ফেলেছি। ওবায়দুল্লাহকে বলুন, এবার না হয়, পরেরবার দেখা হবে। ও তো আবার শিগগিরই আসবে নিশ্চয়ই! ভদ্রমহিলা এর পরেও কাকুতি-মিনতি করছিলেন, আমাকে একটু কঠোর হতেই হলো ।
সন্ধে সাতটার সময় পোশাক বদলে বেরুবার উদ্যোগ করছি, দরজায় বেল। স্বাতী বাথরুমে, উৎপল বাইরে গেছে, এই সময় আমাকেই দরজা খুলতে হয়, ফোনও ধরতে হয়।
ফোনটা কানে নিয়ে দরজা খোলার পর দেখি মূর্তিমান সেন্টু আর তার পাশে এক মহিলা ।
চোখ কটমট করে সেন্টু বললো, কী এমন রাজকার্য আছে যে, বন্ধুর সঙ্গে দেখা না করে সেখানে যেতে হবে?
আমি কথা শুনছি টেলিফোনে, তাই হাত তুলে তাকে একটু অপেক্ষা করতে বললাম ।
সেন্টু হুকুমের সুরে বললো, কথা শেষ করো! শেষ করো! আমরা কি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি?
সেন্টু এমন ভাব করে, যেন আমরা সবাই তার অধঃস্তন কর্মচারী অবশ্য উলটে একটা ধমক দিলে সে চুপসে যায় !
আমি ইঙ্গিতে তাদের ভেতরে এসে বসতে বললাম ।
ফোন শেষ করে আমি সেন্টুকে বললাম, কলকাতায় আসবার আগে একটা খবর দাও না কেন? একটা চিঠি… কিংবা ব্যাংককে বুঝি টেলিফোন নেই?
সেন্টু বললো, তোমার মতন শুধু কবিতা লিখে তো আমরা সংসার চালাতে পারি না, আমাদের প্রচুর খাটতে হয়। অনেক জায়গায় ঘুরতে হয়, কখন কোথায় যাই, ঠিক থাকে না।
শুধু কবিতা লিখে সংসার চালানো? হায়রে! গদ্য লিখতে লিখতে হাড় মাস কালি হয়ে গেল!
খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে বললাম, সেন্টু, আজ যে আমাকে এক জায়গায় যেতেই হবে। বাদ দেবার কোনো উপায় নেই! তুমি কালকের দিনটা থেকে যাও, কাল সারাদিন আমি তোমার সঙ্গে কাটাবো!
সেন্টু বললো, কোথায় যেতে হবে, শুনি?
আমি বললাম, শুনলে তুমি নিশ্চয়ই হাসবে। কিন্তু এটা ক্যানসেল করা যাবে না । কমিট করে ফেলেছি। এইমাত্র ফোন করলো, ওরা গাড়ি পাঠাচ্ছে। টেলিগ্রাফ পত্রিকা আর লাক্স সাবান কম্পানি মিলে একটা মেয়েদের সৌন্দর্য-প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করেছে, তাজ বেঙ্গল হোটেলে, আমি তার একজন জাজ! টেলিগ্রাফের সম্পাদককে তুমি চেনো? এম জে আকবর, সে তোমারই মতন মেজাজি, আমি যদি আজ না যাই, সে রক্ষে রাখবে না!
সঙ্গের মহিলাটি বললো, ও হ্যাঁ, আজকের কামড়ে পড়েছি। মহিলাটির নাম ইন্দিরা চক্রবর্তী, আগে দু-একবার দেখেছি, অনেকের মধ্যে চোখে পড়বার মতন চেহারা। যেমন বিদুষী, তেমনই আকর্ষণীয় ব্যবহার।
সেন্টু বললো, বিউটি কনটেস্ট? তোমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলে কি সুন্দরী মেয়ে আছে নাকি? এপর্যন্ত একজনও তো দেখলাম না। বাংলাদেশের মেয়েদের সঙ্গে তুলনাই চলে না! কী ঠিক বলছি কি না । তারপরই ইন্দিরার দিকে ফিরে বললো, অফ কোর্স ইউ আর অ্যান একসেপশান!
ইন্দিরা হাসলো ।
আমি বললাম, বাংলাদেশের মেয়েদের সঙ্গে তুমি যা বললে, তা প্রায় নাইনটি পারসেন্ট সত্যি! ঢাকায় গেলে এক-একজন সুন্দরী মেয়েকে দেখলে মাথা ঘুরে যায়। আবার পশ্চিম বাংলায় অন্তত টেন পারসেন্ট মেয়ে আছে, তারা প্রায় অপ্সরীর মতন। তারা অবশ্য আমাদের মতন সামান্য মানুষদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
ইন্দিরার দিকে ফিরে বললাম, সেই টেন পারসেন্টের মধ্যে তুমি একজন!
ইন্দিরা হেসে বললো, পাশে কেউ বসে থাকলে তার সম্পর্কে এরকম বলতেই হয় ।
সেন্টু বললো, সেই টেন পারসেন্টের মধ্যে আর একজন নিশ্চয়ই স্বাতী দেবী! তিনি কোথায়?
স্বাতী তৈরি হচ্ছে। সে অবশ্য ওখানে যেতে চায় না। সে যাবে আর একটা পার্টিতে!
সেন্টু জিজ্ঞেস করলো, তোমাকে যেতেই হবে? ওয়েল! সেখানে আমি যেতে পারি না তোমার সঙ্গে? কোনো রেসট্রিকশান আছে?
আমি বললাম, তুমি অবশ্যই যেতে পারো! তাহলে তো ভালোই হয় । তোমাকে আর সন্ধেটা একা কাটাতে হবে না!
সেন্টু এবার দাপটের সঙ্গে বললো, একা মানে? তুমি কি ভেবেছো, কলকাতায় তুমি ছাড়া আমার অন্যকোনো বন্ধু নেই? অনেক আছে। ফার মোর ইমপোরট্যান্ট দ্যান ইউ! আমার সময় কাটাবার কোনো প্রবলেম নেই। শুধু তোমার সঙ্গে সন্ধেটা কাটাবো বলে আগে ঠিক করেছিলাম –
স্বাতী বেরিয়ে এলো তৈরি হয়ে।
সেন্টু ভদ্রতা করে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, এই যে ম্যাডাম, আপনার বাড়িতে এলে আপনার সঙ্গে দেখাই হয় না। আপনি সুনীলের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় আর ব্যস্ত, তাই না! আপনার এই হাজব্যান্ডটিকে আপনি বিউটি কনটেস্টের জাজ হতে দিতে রাজি হলেন? ও কি সৌন্দর্যের কিছু বোঝে?
স্বাতী বললো, ঠিক বলেছেন! বি বি সি-তে একটি মেয়ে খবর পড়ে, ওর মতে সে নাকি খুব সুন্দরী! আমার তো তাকে কাঠ-কাঠ মনে হয় । রং সম্পর্কেও ওর কোনো ধারণা নেই। মেয়েদের পোশাক কিছু বোঝে না । আগে প্রায়ই কোনো ফ্যাশনেবল মেয়ের শাড়ির রং লিখতো হালকা মেরুন! আচ্ছা বলুন তো, হাল্‌কা মেরুন বলে কোনো রং হয়? আমি বকে বকে সেটা বন্ধ করেছি।
আমি বললাম, ‘হালকা মেরুন’ শুনতে ভালো নয়?
স্বাতী বললো, শাড়ি কি শোনার জিনিস, না দেখার জিনিস? সেন্টুর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কী খাবেন ? আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, স্বাতী, এখন আর একদম সময় নেই । সাড়ে সাতটার সময় আরম্ভ। ওবায়দুল্লাহকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি!
সেন্টু জিজ্ঞেস করলো ওখানে খাদ্য-পানীয় কিছু থাকবে তো? নাকি শুধু খেঁদি পেঁচিদের পুরা পান করতে হবে?
আমি বললাম, সেখান অঢেল থাকবে। কোনো চিন্তা নেই । ইন্দিরা নিজে থেকেই বললো, আমি তবে নিশ্চিন্ত। আমার অন্য কাজ আছে!
গাড়িতে ওঠার পর সেন্টু বললো, তোমার কাছে এমনি এমনি আসিনি। সামনের মাসে একটা বেশ বড় প্রতিনিধিদল আসবে কলকাতায় । একটা সেমিনার হবে। তাতে তোমাকেও থাকতে হবে। আমি বললাম, সেমিনার? শুনলেই ভয় হয়। সমস্ত সেমিনারই তো শুধু কথার ফুলঝরি । এই সেমিনারটা কী বিষয়ে?
সেন্টু বললো, স্ট্রিট ফুড। এ-শহরের রাস্তায় অনেকরকম খাবার বিক্রি হয়। ঘুগনি থেকে চাওমিন, কিছুই বাদ যায় না। দুপুরবেলা রাইটার্স বিল্ডিংয়ের কাছে গিয়ে দেখেছি, হাজার হাজার লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নানারকম রোগ হতে পারে। আমরা বিশ্ব খাদ্য সংস্থা থেকে ঠিক করেছি, এগুলো তো বন্ধ করা যাবে না, অনেক লোকের জীবিকাও এর সঙ্গে জড়িত, তাই এগুলো রান্না আর পরিবেশন যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যসম্মত করা যায়, তার ওপর জোর দেওয়া। তুমি এসব খাবার কখনো খেয়েছো?
আমি বললাম, খাবো না কেন? ফুচকা আর আলু কাবলি আমার খুব প্রিয় খাবার। এখনো মাঝে মাঝে খাই। খালাসিটোলায় মদের দোকানের বাইরে ফুটপাথে শর্ষের তেল দিয়ে হাঁসের ডিমের ওমলেট বানায়। একসময় তা তিনচারটে করেও খেয়েছি, এখনও দেখলে লোভ হয়। কিন্তু খেতে ভয় করে!
সেন্টু বললো, ঢাকাতেও ওসব আছে। কিন্তু ঢাকায় আমার পক্ষে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এসব খাওয়া সম্ভব নয়। এখানে আমায় কেউ চেনে না । দু-এক জায়গায় চেখে দেখলাম, খুবই টেস্টি, যদি হাইজিনিকভাবে সার্ভ করা যায়… গরিব মানুষদের জন্য এরকম শস্তার খাবার তো রাখতেই হবে।
আমি বললাম, এখন আমরা একটা পাঁচতারা হোটেলে যাচ্ছি। ওখানে একটা ওমলেটের দাম দুশো আড়াইশো টাকা। ফুটপাথে
পাঁচ টাকা। এ-ই তো আমাদের দেশ।
কথা ঘুরিয়ে সেন্টু বললো, তুমি সুন্দরী মেয়েদের বিচার করবে কী করে? একজন সুন্দরীর থেকে আর একজনকে কী বেসিসে কম-বেশি সুন্দর বলা যায়? মিস ওয়ার্লড বিউটি কনটেস্টে যে একসঙ্গে দশ- বারোজন প্রায় ল্যাংটো মেয়ের ছবি ছাপা হয়, তখন তো আমার সবাইকেই একইরকম মনে হয়! তুমি এসব কিছু বোঝো?
আমি বললাম, না। মেয়েদের কোমরের মাপ, বুকের মাপ, নিতম্বের মাপ দেখে রূপের তারতম্য বিচার করার ক্ষমতা আমার নেই। এর আগে আমি আর একবার মাত্র এই ধরনের বিউটি কনটেস্টের জাজ হয়েছিলাম। বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে, তাদের কারুকেই আমার নিরাশ করতে ইচ্ছে হয় না। তাই আমি সবাইকেই বেশি বেশি নম্বর দিয়েছিলাম। আরও তো দুজন জাজ থাকে। তাদের নম্বরগুলোও যোগ দিয়ে অ্যাভারেজ করা হয়। তাই শেষ পর্যন্ত আমার কোনো দায়িত্ব থাকে না।
সেন্টু বললো, ক্যাট ওয়াকের সময় সব মেয়েই যেন চলন্ত পুতুল। এক-একটি মেয়েকে এক-এক রকম দেখায় ভিন্ন পরিবেশে। মনে করো জানলার সামনে একা দাঁড়িয়ে আছে, তখন একরকম, আবার বিয়ে বাড়িতে সাজগোজ করে এসেছে, তখন আরেকরকম, এর মধ্যে কোন অবস্থাটা বেশি সুন্দর? তুমি শামিমের বউ আনোয়ারাকে চিনতে? জানো, মেয়েটি হয়তো ফাটাফাটি রকমের সুন্দর না, কিন্তু একদিন আমি ওদের বাড়িতে যাচ্ছি, দেখি দোতলার জানালায় আনোয়ারা দাঁড়িয়ে আছে, একটা ডুরে শাড়ি পরে, তার মুখখানা দেখে আমি এমন চমকে উঠেছিলাম! মাই গড! সেই মুখে বেদনা, অভিমান, বঞ্চনা, এই সবকিছু মিশে এমন একটা রং হয়েছে, যেন জীবনে ওরকম রূপ আমি আর কখনো দেখিনি। সেই মুহূর্তে তার মুখের সঙ্গে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরীরও তুলনা চলে না। মেয়েদের হাসিখুশি মুখের চেয়েও গভীর বিষাদমাখা মুখ বেশি মনে থাকে; তাই না? আই স্টিল রিমেমবার দ্যাট ইভনিং। ইস্, নিজের দোষে মেয়েটা কী সর্বনাশ করলো নিজের!
আমি প্রথমে খুবই চমকে উঠেছিলাম। তারপর আস্তে আস্তে বললাম, হ্যাঁ, আমি চিনতাম আনোয়ারাকে। কিন্তু তার সর্বনাশ হবে কেন? সে তো ওখানে ভালোই আছে শুনেছি।
ভালো আছে? কে বললো তোমাকে?
কে যেন বললো? সম্ভবত বটুর বউ কাজল। সে তার বড়বোনকে দু হাজার ডলার পাঠিয়েছে।
সেন্টু রাগের ঝাঁঝালো গলায় বললো, দু হাজার ডলার! দ্যাট্স নট আ জোক। রাবিশ! কারা ওসব রটায় জানো? যারা মেয়ে পাচার করে আরব দেশে। এইসব গুজব রটিয়ে বোঝাতে চায়, ওইসব জায়গায় গিয়ে এইসব মেয়েরা কীরকম স্বর্গসুখে আছে! আনোয়ারার বড়বোন তো রাবেয়া, তাকে আমি চিনি, সে এই গুজব ডিনাই করেছে! আমার দৃঢ় ধারণা, আনোয়ারা নষ্ট হয়ে গেছে। সি ইজ লস্ট ফর এভার ! আমি বললাম, ও কথা বলো না। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না যে, আনোয়ারার কোনো ক্ষতি হয়েছে!
সেন্টু বললো, তোমারও বুঝি ওর সম্পর্কে সফ্ট স্পট আছে? গাড়ি এসে থামলো তাজ বেঙ্গল হোটেলের সামনে।
হঠাৎ আমার মনে হলো, একটু বাদেই আমাদের সামনে থাকবে দামি বিদেশি পানীয় আর নানারকম সুস্বাদু, মূল্যবান খাবার, যার যত ইচ্ছে। অথচ আসার পথে আমরা আলোচনা করছিলাম, রাস্তার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গরিব মানুষদের শস্তা খাবারের কথা।
আর সৌন্দর্য-প্রতিযোগিতা মানে তো উচ্চবিত্ত পরিবারের সুখী সুখী, নরম, আদুরে মেয়েদের শরীর ও পোশাকের প্রদর্শনী । হাল্কা আমোদ- আহ্লাদ ।
তার আগে হঠাৎ সেন্টু মনে করিয়ে দিল অভিমানিনী হঠকারী আনোয়ারার কথা ।
জীবন তো এরকমই বৈপরীত্যে ভরা। (ক্রমশ)