সাক্ষাৎকার গ্রহণ : সুদেষ্ণা বসু
বাংলাভাষার একজন প্রধান সাহিত্যিকের মর্যাদায় বহু আগেই অভিষিক্ত হয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। তাঁর কবিতায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়, প্রবন্ধে মননশীলতার সঙ্গে ভাষার প্রসাদগুণের যোগ, সমকালের চিত্রণে বিশ্বস্ততা ও মনোহারিত্বের পাশাপাশি অবস্থান। সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ও রবীন্দ্র-পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন তিনি, সম্প্রতি হয়েছেন সাহিত্য অকাদেমির ফেলো। রবীন্দ্রনাথের কবিতার নতুন সংকলন সূর্যাবর্ত সম্পাদনার দায়িত্ব তাঁকে দিয়ে বিশ্বভারতী দেখিয়েছে যথোচিত সম্মান। এই সাক্ষাৎকারে শঙ্খ ঘোষ বিবৃত করেছেন সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর আবির্ভাবের ঘটনা, তাঁর যৌবনকালের সাংস্কৃতিক জীবনধারার বিষয় এবং মানুষের প্রতি তাঁর বিশ্বাসের কথা।
সুদেষ্ণা বসু : ১৬ থেকে ৩২ বছর, এই সময়টা আপনি কী করেছেন ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে।
শঙ্খ ঘোষ : এ-তো একটা প্রকাণ্ড বড় সময়। কী করেছি? কত কিছুই তো করেছি। তোমরা কি বিশেষ কিছু জানতে চাইছ? কোনো বিশেষ প্রসঙ্গে, কোনো বিশেষ কথা?
সুদেষ্ণা বসু : কোনোটাই বিশেষ নয়, কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে তো একটা জিনিস দাঁড়ায়! যেমন ধরুন, আপনি যখন কলেজে ভর্তি হলেন, তখনকার অ্যাটমস্ফিয়ার, কলেজে থাকতে কে আপনাকে ইনস্পায়ার করল, বা পড়াশুনো থেকে খেলাধুলো ও সিনেমা – সবকিছু মিলিয়ে আর কী!শঙ্খ ঘোষ : সবকিছু মিলিয়ে একসঙ্গে বলাটা একটু মুশকিল। তাহলেও বলি, আমি পনেরো বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে কলকাতায় এলাম। একেবারে আক্ষরিক অর্থে পদ্মার ওপর জীবন কাটিয়েছি অনেকদিন। আমার ছোটবেলাটা, স্কুলজীবনটা সেখানেই কেটেছে। কলেজে আসা, কলকাতায় আসা আর স্বাধীনতা – এগুলো আমার জীবনে একেবারে একসঙ্গে ঘটে গেল। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে কলকাতায় আসার যে-অভিজ্ঞতাটা, সেটা আমার কাছে খুব রোমাঞ্চকর হলো নানা কারণে। যৌবনে পৌঁছনোর একটা অভিজ্ঞতা আছে তো! সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে গেল এই বিরাট কলকাতা শহর, যেটা আমার কাছে অবশ্য নতুন। অবশ্য সম্পূর্ণ নতুনও নয়, একটা সময়ে ছোটবেলায় কলকাতায় ছিলাম কিছুদিন। কিন্তু সেটা অন্যচোখে দেখা, অন্যরকম কলকাতা। যৌবনের দেখার একটু ভিন্ন ধরন আছেই। তখন কলকাতার রাস্তাঘাট, স্ট্র্যান্ড রোড দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, সেটাও খুব বিরাট অভিজ্ঞতার বলে মনে হতো, সেটা এখনকার ছেলেমেয়েদের হয়তো মনে হবে না। প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলাম যখন, তখন সেটা একই সঙ্গে যেমন খুব আনন্দের অভিজ্ঞতা ছিল, তেমনি খুব ভয়েরও ব্যাপার ছিল আমার পক্ষে। একেবারে মফস্বলের ছেলে, ওই বিরাট বাড়ি, গম্ভীর মাস্টারমশায়রা সমস্ত, নামকরা পণ্ডিত মাস্টারমশায়, তাঁরা পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, গা ছমছম করত। তার ফলে কলেজে ঢুকেই প্রথম অভিজ্ঞতা যেটা, সেটা হলো ক্লাস পালানোর অভিজ্ঞতা। যেটা আমি স্কুলজীবনে কল্পনাও করতে পারতাম না। আর কলেজজীবনে ক্লাস করছি এটা কল্পনা করাই বেশ শক্ত ছিল। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে যখন পড়তাম তখন একা একা ঘুরে বেড়াতাম রাস্তায় রাস্তায়। বি এ পড়ছি যখন, তখন বেশ-একটা বন্ধুদল জুটে গেল। তাদের সঙ্গে চলে যেতাম, নানারকম সিনেমা দেখে সময় কাটাতাম। কফি হাউস, সিনেমা। কফি হাউসে একসঙ্গে আট ঘণ্টা বসে আড্ডা দিচ্ছি, সেটাও হয়েছে। একদিন পরপর শো-তে সিনেমা দেখেছি, প্রথমে ম্যাটিনি, তারপর ইভ্নিং, তারপর নাইট শো – এরকমও হয়েছে। একটা ইচ্ছে ছিল, চারটে শো পরপর দেখব। সেটা আর হয়নি। মর্নিং-শো থেকে শুরু করলে সেটাও করা যেত। এইসব করতাম। আর এটাও ঠিক যে, বি এ পড়ছি যখন, তখন এমন কিছু মাস্টারমশায়ের কাছে পড়েছিলাম, যেটা ভুলবার উপায় নেই কখনো। ইতিহাস আমার বিষয় ছিল না, কিন্তু সুশোভন সরকারের ক্লাসে গিয়ে বসে থাকতাম, ক্লাস করবার জন্য। তারকনাথ সেনের ক্লাসে ইংরেজি, গোপীনাথ ভট্টাচার্যের ক্লাসে দর্শন পড়া, গৌরীনাথ শাস্ত্রীর কাছে সংস্কৃত পড়া, এগুলো অনেকদিন মনে থাকবে। আরো অনেকে ছিলেন, কিন্তু এঁদের কথাই বিশেষ করে মনে পড়ে। এঁদের ক্লাস করার উত্তেজনাটা এখনো ভুলতে পারি না। এইসব করে বেড়াতাম। ক্লাসের ব্যাপারটা ছিল এই। ইউনিভার্সিটিতে যখন গেলাম, তখন অবশ্য ক্লাসে যাওয়া প্রায় বন্ধই হয়ে গেল। তখন রাস্তাঘাটই বড় ক্লাস হয়ে দাঁড়াল।
সুদেষ্ণা বসু : কলেজে অ্যাডজাস্ট করতে অসুবিধা হয়নি? ওই পদ্মার পার থেকে এসে?
শঙ্খ ঘোষ : খুবই অসুবিধে হয়েছিল। না, ভাষার জন্যে আমার খুব একটা অসুবিধে হয়নি, আমার যেটা অসুবিধে হয়েছিল সেটা হলো, একটা সাংস্কৃতিক দূরত্ব। মানে, আমার এখনো মনে পড়ে, প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম কয়েকদিন পিছনের বেঞ্চে খুব ভয়ে ভয়ে চুপ করে বসে থাকতাম। আর ক্লাস-পালানোর ব্যাপারটা, সেটা কিন্তু ওই কারণেই। এই ভয় থেকেই। কিছুতেই ঠিকমতো মেলাতে পারছিলাম না। বন্ধুও তখন তেমন কিছু হয়নি নতুন ক্লাসে। তার ফলে সরে সরে যেতাম। কলকাতায়, বিশেষ করে, প্রেসিডেন্সি কলেজে যারা পড়তে আসত, আজকাল খুব বেড়ে গেছে জিনিসটা, তখন ততটা ছিল না, কিন্তু তা হলেও ছিল খানিকটা, একটু অন্য সমাজের মানুষ তারা, তাদের সঙ্গে কীভাবে মিলব, কীভাবে কথা বলব, কোন ভাষায় কথা বলব, এটা ইংরিজি-বাংলার কথা নয়, কারণ তখনো পর্যন্ত এই রীতিটা প্রচলিত হয়নি যে, সকলে ইংরিজিতে কথা বলছে। কিন্তু তাদের চালচলন, তাদের চমক-দীপ্তি এমন ছিল যে, নিজেকে খুব হতভাগ্য মনে হতো, দীনাতিদীন মনে হতো। এদের সঙ্গে আমি কী করে থাকব, এটা মনে হতো। তারই মধ্যে মনে আছে, বন্ধুদেরই একজন একদিন পিছন বেঞ্চ থেকে টেনে সামনের বেঞ্চে নিয়ে এসেছিল। এইখানে বসতে হবে, এইখানে বসতে হবে – এইসব বলত। আমার সেই বন্ধুটি এখন নেই। পরে সে খুব বিখ্যাত দর্শনের অধ্যাপক হয়েছিল, শচীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। এদের মধ্য দিয়েই কলকাতার জীবনে আস্তে আস্তে ঢুকেছি।
সুদেষ্ণা বসু : থাকতেন কোথায় তখন?
শঙ্খ ঘোষ : একেবারে প্রথমে ছিলাম একটা রামকৃষ্ণ মিশন স্টুডেন্টস্ হোমে, মানিকতলায়। ইন্টারমিডিয়েটের সময়ে। তারপর বি এ, এম এ যখন পড়েছি, তখন কলেজ স্ট্রিটেই আমাদের একটা আস্তানা হয়েছিল নিজেদের থাকার মতো। আমার দাদা রেলে কাজ করতেন, একটা কোয়ার্টার্স পেয়েছিলেন সেখানে। সেখানেই থাকতাম। দাদা তখন লিখতেন পূর্বাশা পত্রিকায়। পূর্বাশার বন্ধুবান্ধবরা আসতেন। ওঁরা বারান্দায় বসে সাহিত্যের আড্ডা দিতেন, আর আমি আড়াল থেকে সেগুলো শুনবার চেষ্টা করতাম। এই ছিল তখনকার সময়।
সুদেষ্ণা বসু : আচ্ছা কলেজে যেদিন প্রথম ঢুকলেন, র্যাগিং বা এই জাতীয় কোনো খারাপ…
শঙ্খ ঘোষ : না, সেটা তখন একেবারেই ছিল না। মানে, আমরা বস্তুত এই শব্দটার সঙ্গে তখন পরিচিতই ছিলাম না। বরং উল্টোটাই বলব। আমি তো বললাম, বেশ ভয়ে ভয়ে ছিলাম, মেলাতে পারছিলাম না, কিন্তু কলকাতার বন্ধু যারা, যারা স্কুল থেকে ছোটবেলা থেকে কলকাতায় পড়েছে, তারা চেষ্টা করেছিল। যেমন শচীনের কথা বললাম। ও কলকাতারই ছেলে, এরা বরং চেষ্টা করেছে কী করে সাহায্য করা যায়। উঁচু ক্লাসের ছেলে যারা, তারা ভাবতও না আমদের নিয়ে, বা ভালো অর্থে ভাবত। কীভাবে তাদের বিতর্কের মধ্যে, আলোচনার মধ্যে সাহিত্যসভার মধ্যে টেনে নেওয়া যায়, সেই চেষ্টাই তারা করত। র্যাগিং ব্যাপারটাই অনেক পরে এসেছে।
সুদেষ্ণা বসু : আপনি বাংলা পড়তে এলেন কেন? আপনি কি আগেই ঠিক করে নিয়েছিলেন বাংলা পড়বেন?
শঙ্খ ঘোষ : হ্যাঁ, অনেক আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম। যখন স্কুলে পড়ি, তখন থেকেই আমি প্রায় জানি যে বাংলা পড়ব। তার একটা কারণ হয়তো আমার বাবা। আমার বাবা বাংলা পড়েছিলেন, সাহিত্য ভালোবাসতন, খুব রবীন্দ্রভক্ত মানুষ। প্রত্যক্ষ উৎসাহ যে তিনি কখনো দিয়েছিলেন, এটা বলব না। বাবার একটা ধরন যে, নিজের ইচ্ছে কখনোই কারো ওপর চাপাতে চাননি। ফলে কখনোই এটা বলেননি যে, এটা পড়বে বা এটা করো। সবসময়ে ভাবতে পেরেছি যে, এটা নিজের ইচ্ছেমতো করছি। কিন্তু বুঝতে পারতাম যে, এটাই বাবার ইচ্ছে। এটা করলেই বাবা পছন্দ করবেন। আসলে আমি যখন স্কুলে পড়ি, চোদ্দ বছর বয়স, তখনই বিশ্বভারতীর লোকশিক্ষা সংসদের একটা পরীক্ষা দিয়েছি। শান্তিনিকেতনে না গিয়েই, কলকাতায় না এসেই, যে-কোনো জায়গায় বসেই এই পরীক্ষা দেওয়া যায়। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতার বই রীতিমতো পড়াশোনার মতো করেই পড়েছি। তার মধ্যে চৈতালি, উৎসর্গ, পলাতকা, কাহিনী এসব ছিল। বাংলাভাষা-পরিচয়-এর মতো ভারি বই ছিল। জীবনস্মৃতি, ছেলেবেলা-র মতো বই ছিল। মানে, স্কুল থেকেই খানিকটা ঠিক হয়ে গিয়েছিল কোন পথে যাবে ব্যাপারটা। ফলে ধরেই নিয়েছিলাম যে, বাংলা পড়ব। যদিও যাঁরা অন্য অর্থে হিতৈষী – পারিবারিক সামাজিক হিতৈষী কিছু থাকেনই – তাঁরা বারে বারেই চেষ্টা করেছিলেন যাতে ওটা না পড়ি। এ কী অন্যায় হচ্ছে। তাঁরা বাবাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন, তবে কাজ হয়নি।
সুদেষ্ণা বসু : লেখালেখি শুরু করেছেন কবে থেকে?
শঙ্খ ঘোষ : বারো বছর বয়স থেকে। আর ধারাবাহিকভাবে আমার লেখা ছাপা হচ্ছে সতেরো-আঠারো বছর বয়স থেকে। কিন্তু কখনোই – সতেরো থেকে আজ পর্যন্ত – আমার লেখা খুব বেশি ছাপা হয়নি। অল্পই ছাপা হয়। আজকাল অল্প লিখি, সেটাও একটা ব্যাপার। কিন্তু একটা সময় ছিল প্রায় প্রতিদিনই লিখতাম। এখন ভাবলে অবাক লাগে, কী করে লিখতাম। বারো বছর বয়স থেকে প্রায় বাইশ-তেইশ বছর বয়স পর্যন্ত বিস্তর লিখেছি। এবং তার মধ্যে বেশির ভাগ লেখাই ছাপিনি কখনো।
সুদেষ্ণা বসু : পাঠাননি?
শঙ্খ ঘোষ : না, পাঠাইনি। মানে পাঠানোর ব্যাপারটায় আমার একটা আতঙ্ক তখনো ছিল। এখনো আছে। আমি কখনোই ঠিক সেভাবে পাঠাতে পারতাম না। এটা বুঝতেই পারছ, একটু ভয় ভয় ভাব চেপে বসেছে চরিত্রের মধ্যে। এটা ছোটবেলা থেকেই ছিল। ভয় হতো, পরিচিত অনেক গল্প আছে যে, লেখা পাঠালে ফেরত আসে, সেটা যদি হয়, এই ভয়ে কোথাও পাঠাতে পারতাম না। তার ফলে…
সুদেষ্ণা বসু : প্রথম লেখা ছাপা হয় কোথায়?
শঙ্খ ঘোষ : এটা একটা প্রশ্ন যে, লেখা ছাপা হতো কী করে? হয়েছে তো, লেখা ছাপা তো হয়েছে। এমনিতে আমার খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ছিলেন, যাঁরা প্রায় কেউই কিন্তু নিজেরা লেখেন না। এটা একটা মজার ব্যাপার যে, সেই সময়ে তো বটেই, আজও পর্যন্ত (এই অল্প কিছুদিন হলো একটু ব্যতিক্রম হয়েছে, তা নইলে) আমার দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আমার যাঁরা বন্ধুবান্ধব তাঁরা কেউই লেখার জগতের মানুষ নন। যখন সবচেয়ে বেশি লিখেছি এবং ছাপা হচ্ছে, কিছুটা লোকে জানেও আমার বিষয়ে, তখন আমার কাছাকাছি যাঁরা বন্ধু, তাঁরা কেউই লেখক নন। সেটা আমার কাছে একটু স্বস্তিজনক বলে মনে হতো। লেখকদের গোষ্ঠীর মধ্যে যেতে আমার বরাবরই একটু ভয় করে। কিন্তু স্বার্থহীন, অন্তরঙ্গ, ভালোবাসায় ভরপুর বন্ধু প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু থাকে। আমারও ছিল। তাঁরা জোর করে এখানে ওখানে দিয়ে দিত লেখা। কখনো ছাপা হয়েও যেত। একটু আগে যে-দাদার বন্ধুদের কথা বলছিলাম, দাদার একজন বন্ধু, তখনো ছিলেন বিখ্যাত, সবাই চেনেন তাঁকে, বীরেন চট্টোপাধ্যায়। উনি এসে নিজে খাতা থেকে কবিতা তুলে নিয়ে কখন চলে গেছেন, কোনো পত্রিকায় দিয়ে দিয়েছেন, ছাপা পত্রিকা এনে আমাকে দিচ্ছেন। এসব ব্যাপারে আমরা খুব ভাগ্যবান ছিলাম। দু-একটা সময়ে এটা হতো, যেটা হয়তো বন্ধুরা কেউ দেখল না বা দাদার বন্ধুরাও দেখলেন না, অথচ আমার মনে হচ্ছে, বোধহয় লেখাটা কিছু হয়েছে, কিন্তু কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারছি না ভয়ে, কী করা যায়? একবার কী করেছিলাম, লিখে আমার টেবিলের ওপর খুলে রেখে দিয়েছিলাম যে, দাদার কখনো চোখে পড়লেও পড়তে পারে। যদি ভালো হয় তাহলে দাদা বলবে, আর যদি না কিছু বলে, তাহলে বুঝব, হলো না। এই একটা পরীক্ষা করবার জন্যে রেখে দিয়েছিলাম। সেটা দাদার চোখেই পড়ল না। তারপরে ওটা নিয়ে কী করি ভাবছি, এমন সময়ে আমার আর-এক বন্ধু সেটা নিয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে গেল, তারপর তা নিয়ে অনেক কাণ্ডকারখানা হলো। নাম ‘যমুনাবতী’। একটা উত্তেজনা নিয়ে লিখেছিলাম। কিছুদিন পরে তার একটা পরীক্ষা হলো আর কী। এইভাবেই হয়েছে। আর ওই একটু আগে জিজ্ঞেস করছিলে যে, ফেরত আসবার অভিজ্ঞতা কী রকম, তারপর এখন তার প্রতিশোধ নিতে পেরেছি বলে মনে হচ্ছে কিনা। সেটা খুব বেশি হয়নি।
একটা খুব ভালো অভিজ্ঞতা আছে, আমার আঠারো বছর বয়সে, কবিতা পত্রিকায় (বুদ্ধদেব বসুর)। সেখানে আমার একটা কবিতা ছাপা হয়েছিল। সেই প্রথম, সেই শেষ। আমার এক বন্ধু হীরেন চক্রবর্তী (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাই, ইতিহাসের লোক), সে আমাকে কিছুদিন ধরে ভয় দেখাচ্ছিল, তুমি যদি নিজে বুদ্ধদেবের কাছে না যাও, তাহলে আমি খাতাটা নিয়ে দিয়ে আসব। ও তখন বুদ্ধদেবের বাড়িতে প্রায়ইযেত। আমার ভয় হলো যে, প্রত্যাখ্যাত তো হবেই। সেটা ও জেনে যাবে, সেটা আরো লজ্জার ব্যাপার হবে। কাজেই আমি ওকে কথা দিলাম যে, আমি যাবো। নিজেই যাবো, তুমি যেও না। তারপর ভয়ে ভয়ে একদিন চলে গিয়েছিলাম। আজকালকার ছেলেদের এটা হয় কিনা তা বুঝতে পারি না আমি। বুদ্ধদেবের বাড়িতে যাচ্ছি। গোটা পথের ছবিটা আমার মনে পড়ে। কী রকম রোমাঞ্চিত হতে হতে যাচ্ছি যে, উনি কি আমার সঙ্গে কথা বলবেন? ওঁকে কি আমি সামনে থেকে দেখতে পাবো? তারপর গেলাম, দরজা খুলে দিলেন। কথা বললেন, বসালেন। তারপর মনে হলো, আমি হাওয়ায় ভাসছি প্রায়। এ-রকম ভাবা যায় না। উনি বললেন একটা কবিতা দেখিয়ে, এটা ছাপব। ভীষণ খুশি। কিছুদিন পরে এক বন্ধু চিঠিতে লিখল, কবিতায় তোর কবিতা বেরিয়েছে। আমি তখন ছিলাম খড়গপুরে। সঙ্গে সঙ্গে চলে এলাম কলকাতায়। কবিতায় কবিতা দেখতে হবে। স্টলে এসে দাঁড়ালাম। পাতিরামের স্টলে। দেখলাম, ওপরে নাম। তাড়াতাড়ি ভেতরটা খুললাম, কবিতাটা পড়লাম। পড়ে সঙ্গে সঙ্গে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। কেননা, কবিতাটা ছাপা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কয়েকটি শব্দ বুদ্ধদেব পাল্টে দিয়েছেন। তাতে এমন একটা রাগ হলো যে, আমি ঠিক করলাম, এই পত্রিকায় আর কোনোদিন লিখব না। লিখিওনি অবশ্য। পরে বুঝতে পারি, তখনো এটা বুঝেছিলাম যে, আমি যা লিখেছিলাম তার থেকে ভালো কবিতা ওটা। কিন্তু তখন মনে হয়েছিল, আমি যা লিখেছিলাম সেটা আমার লেখা। সেটাকে ভালো করবার তো দরকার ছিল না। হয় তিনি সেটা ছাপবেন, নয় ছাপবেন না। পরে মনে হয়েছে, সবে যারা লিখতে শুরু করেছে, তাদের লেখা একটু-আধটু এদিক-ওদিক করে দেওয়াটা অন্যায় নয় কিছু। তবে, সেই লেখাটির বিষয়ে এখনো আমি ঠিক মনস্থির করতে পারি না এইজন্য যে, ওটা ঠিক একটু-আধটু এদিক-ওদিক করে দেওয়া নয়। আমার মনে হয়েছিল, কয়েকটা শব্দের বদলে চরিত্রটাই পাল্টে গেল। মানে, গোটা কবিতাটার যে মূল চরিত্র ছিল, সেই চরিত্রটাই পাল্টে গেল। এই একটা হয়েছিল, তাছাড়া প্রকাশ নিয়ে বড় দুর্যোগের কিছু হয়নি। হ্যাঁ, একেবারে শেষ দিকে কয়েকটা দুর্যোগ হলো, ওই জরুরি অবস্থার সময়ে। সেই সময়ে আমার লেখা নিয়ে একটু গোলমাল হয়েছে। যদিও শেষ অবধি ছাপা হয়েছিল।
সুদেষ্ণা বসু : কবিতা থেকে এবার আপনার প্রবন্ধের প্রসঙ্গে আসি। প্রবন্ধ লিখতে শুরু করলেন কবে থেকে?
শঙ্খ ঘোষ : প্রবন্ধ একটু-আধটু লিখেছি ছাত্রবয়সেও। কিন্তু ঠিকঠাক শুরু বলতে রবীন্দ্রশতবর্ষে। একষট্টি সালের পর থেকে লিখেছি। প্রত্যেকটা প্রবন্ধ লিখবার সময়ে খুব ভেতর থেকে এটা ভেবেছি এ-ই শেষ, জীবনে আর প্রবন্ধ লিখব না। একটা প্রবন্ধও নিজের ইচ্ছেয় লিখিনি। লোকের ভয়ে, তাড়া খেয়ে লিখেছি। একটামাত্র ব্যতিক্রম আছে। নিঃশব্দের তর্জনী বইয়ের প্রথমে একটা প্রবন্ধ আছে, বোধহয় পৃষ্ঠা তিন-চারের। সেইটা একমাত্র লেখা, যেটা কেউ আমার কাছে চায়নি। নিজে থেকেই লিখেছিলাম। পরে একজন চেয়েছে, তাকে দিয়েছি, এই পর্যন্ত। কিন্তু গদ্য লেখা আর একটাও নেই, যেটা নিজে লিখেছি তারপর কাউকে দিয়েছি। ওই তাড়ায়, চাপে পড়ে, পালাতে পালাতে আর পারা যাবে না, শেষ মুহূর্তে যখন বুঝতে পেরেছি, তখন লিখে দিয়েছি।
সুদেষ্ণা বসু : কোনটা বেশি ভালো লাগে, কবিতা লিখতে না গদ্য লিখতে?
শঙ্খ ঘোষ : এর পরও কি সেটা বলতে হবে? কবিতা লিখতে পারলে তার চেয়ে আনন্দ আর কিছুতেই হয় না। লিখতে পারি না, এটা একটা মুশকিল হয়, কিন্তু লিখতে পারলে ভালো লাগে।
সুদেষ্ণা বসু : আপনি যে-আনন্দটা পান, কবিতা যাঁরা ভালবাসেন, তাঁরাও সেটা শেয়ার করেন। কিন্তু ইদানীং একটা জিনিস লক্ষ করা যাচ্ছে যে, অত্যধিক কবিতা লেখা হচ্ছে। এবং বলা হচ্ছে কবিতার মানও অনেক নেমে যাচ্ছে। এর মধ্যে দাঁড়িয়ে আজকের কবিতা সম্পর্কে আপনার কী মনে হয়? কবিতার যে-অবক্ষয়ের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আপনি কবিতাকে কীভাবে দেখবেন?
শঙ্খ ঘোষ : অন্যের বিষয়ে তো?
সুদেষ্ণা বসু : আপনার নিজের লেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে যদি বলেন?
শঙ্খ ঘোষ : এই যে কবিতার অবক্ষয় বলছ, বা বিস্তর লেখা হচ্ছে চারদিকে বলছ, একটা মজার ব্যাপার কী যে, এই কথাটা প্রায় সবসময়েই বলা হয়। অর্থাৎ আমরা যখন অল্পবয়সী, আমরা যখন লিখছি, তখনো কিন্তু এই কথাটা বলা হয়েছে, এমন কী ছাপার অক্ষরে। এই যে বুদ্ধদেব বসুর কথা বলছিলাম, বুদ্ধদেব বসুরই লেখায় আছে, দুঃখ করে লিখছেন যে, এখন আজেবাজে লেখায় ভরে গেল, সকলেই লিখছে। এলোমেলো লেখা বড্ড হচ্ছে। কবিদের ভাবতে হয় না। আমি পুরনো পত্রিকার পাতা ওলটাতে ওলটাতে হঠাৎ একদিন দেখেছিলাম, ১৮৯০ সালের এ-রকম একটা বিলাপ যে, চতুর্দিকে এত লেখা হচ্ছে এবং সকলেই এত কবি যে বড় মুশকিলে পড়া গেছে। বিদেশে ছিলাম কিছুদিন। আইওয়া শহরে একটা ছোট স্থানীয় পত্রিকায় একদিন পড়লাম, সেই পত্রিকার প্রথম পাতায় লেখা আছে, আপনি যদি এই শহরে নতুন এসে থাকেন, তাহলে খুব সাবধান থাকবেন। কারণ এই শহরের প্রতি দুজন লোকের মধ্যে একজন কিন্তু কবি। এই ব্যাপারটা আছে। বছর দশেক আগে একজন জার্মান অধ্যাপক এসেছিলেন এখানে। অধ্যাপক এবং কবিও। তিনি কিছুদিন ঘোরাঘুরি করছেন, একদিন আমার ঘরে বসে গল্পগুজব করছেন, এমন সময়ে আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তাঁর স্ত্রী এলেন। আলাপ করিয়ে দিলাম। প্রথমে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে। আমি বললাম, উনি কবিতা লেখেন। তারপর আমার বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। উনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই কবি?’ আমার বন্ধু একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘না, আমি কোনোদিন লিখিনি, লিখি না।’ সেই বিরাট স্বাস্থ্যবান জার্মান ভদ্রলোক হঠাৎ একটা বিরাট লাফ দিয়ে উঠলেন। সেই বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কলকাতা শহরে এই প্রথম একজনকে দেখছি যে কবিতা লেখে না।’ যাই হোক, এ-ঘটনাটা সত্যি যে, প্রায় সবসময়েই সমসাময়িক এই আক্ষেপটা চলতে থাকে, বড় বেশি কবিতা লেখা হচ্ছে চারদিকে। আমার বন্ধু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ঠাট্টা করে একটা কথা সবসময়েইবলতেন যে, আমাদের বাঙালি কবি আছেন সব মিলিয়ে আড়াই হাজারের কিছু বেশি। এ-সমস্ত ঠাট্টা-বিদ্রƒপ সবসময়েই চলে, বিস্তর বাজে লেখা সবসময়েই হয়। এখনো হচ্ছে, আগেও হতো। এটা নিয়ে যে খুব আলাদাভাবে চিন্তিত হবার দরকার আছে, আমার সেটা মনে হয় না।
সুদেষ্ণা বসু : না, আলাদাভাবে এই কারণে বলছি যে, সম্প্রতি একজন বিদেশি ভদ্রলোক (ওঁর নামটা ঠিক মনে আসছে না এই মুহূর্তে), উনি এ-রকম একটা লিখেছেন যে, পোয়েট্রি ইজ ডায়িং এবং তাঁর এই মতবাদটা কিন্তু আরো বিভিন্ন সাহিত্যের, বিভিন্ন মাধ্যমের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁরাও ঠিক এ ভাবে না বললেও, অন্যভাবে বলার চেষ্টা করেছেন। হয়তো এরকমও আছেন যে, এককালে তাঁরা কবিতা লিখতেন, এখন লেখেন না। আপনি নিজে কবি হয়ে কি এই ব্যাপারটা স্বীকার করেন?
শঙ্খ ঘোষ : না, আমি এটা স্বীকার করি না। এই যেটা বললে, এটাও কিন্তু ইউরোপে পঁচিশ বছর আগে বলা হয়েছে। মানে কিছু কিছু লেখক ছিলেন যাঁরা বলেছেন, শব্দ আর কোনো কাজ করতে পারবে না। ফলে, শব্দকে ছেড়ে দিতে হবে। এটা ঠিকই যে, গোটা পৃথিবী জুড়েই লিখিত শব্দের বিরুদ্ধে একটা ভাবনাচিন্তা অনেকদিন ধরেই চলছে। যে-কারণে ফিল্মটাকে অনেকে খুব বড় মাধ্যম বলে মনে করছেন। একটা নতুন কথা এসেছে ‘মিক্সড মিডিয়া’। মানে, অনেক কিছু একসঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে। শুধু শব্দ আর কিছু করতে পারবে না। এই ভাবনাচিন্তাগুলো যে আসছে, সেটা স্বাভাবিক। তার কারণ, আমাদের সামাজিক নানা কারণে শব্দকে খুব অর্থহীনভাবে ব্যবহার করতে করতে এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে করতে শব্দের সমস্ত ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। খুব বেশি এক্সপোজড্ হয়ে যাচ্ছে এবং যে-কোনো কথাকেই তার পরের দিন মিথ্যে করে দেওয়া হচ্ছে নানারকম বাণিজ্যিকতার কল্যাণে। কিন্তু আমার কাছে যেটা মনে হয়, সেটা এই যে, এটাই একজন কবির কাছে আরো বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু এটা করা হয়েছে, সেইজন্যেই তাকে দেখতে হবে, এই শব্দের মধ্য দিয়েই, এই সমস্ত মিথ্যের মধ্য দিয়েই, তাকে বাঁচিয়ে তুলবার কোনো পথ তিনি তৈরি করতে পারেন কিনা। এবং সেইজন্যই তাঁর সতর্ক থাকবার দরকার আরো বেশি। হ্যাঁ, তোমার প্রশ্নটা ঠিক কী?
সুদেষ্ণা বসু : না, আমি বলছিলাম কী, এটা তো নিশ্চয়ই ঠিক যে, কবিতা বিষয়গতভাবে কোনোদিনও হারিয়ে যাবে না। অন্য কোনোভাবে, অন্য কোনো মাধ্যমে হলেও কবিতার যে-বিষয়গত দিক, সেটা থেকেই যাবে। কিন্তু ফর্ম হিসেবে, মানে, আঙ্গিকের দিক থেকে কবিতাকে কতখানি টিকিয়ে রাখা সম্ভব, আজকে যখন ফিল্ম এরকম দাপটের সঙ্গে চলছে, ছোটগল্প তার দাপট দেখাচ্ছে, প্রবন্ধ ও ফিচারের যুগ চলে আসছে, তার পাশে ফর্ম হিসেবে কবিতা কতটা জায়গা করে নিতে পারবে?
শঙ্খ ঘোষ : ফর্ম হয়তো পাল্টাবে, তবে কবিতা থেকে যাবে। আশা করি থেকে যাবে।
সুদেষ্ণা বসু : গদ্য ধাঁচের কবিতাকে ধরে নিয়েই, মানে এখনকার কবিতা তো মোটামুটি গদ্যকবিতাই হয়ে গেছে, সেটা ধরে নিয়েই বলছেন?
শঙ্খ ঘোষ : সত্যি সত্যি ভবিষ্যদ্বাণী করা খুব মুশকিল। অনেকদিন আগেই একজন বলেছিলেন, সেই উনিশ শতকের ব্যাপার যে, কবিতা টিকবে না। সভ্যতা যত এগোবে, কবিতা তত নষ্ট হয়ে যাবে। সে তো অনেক পুরনো কথা। কিন্তু তা সত্ত্বেও তো শতাব্দীজুড়ে কবিতা আছে। ঘটনাটা এই যে, কবিতা-বিষয়ে যে-ধারণাটা একসময়ে ছিল, সেই ধারণাটার হয়তো বদল হবে। যেটাকে তুমি বিষয় বলছ, সেই বিষয়টা ঠিক ওই অর্থে বিষয় না-ও থাকতে পারে। রূপের অনেক নতুন পরীক্ষা অনবরত হতেই থাকবে, কিন্তু শব্দকে নিয়ে যে-চ্যালেঞ্জটা, যেটা কবির কাছেও বড় চ্যালেঞ্জ, সেটা ফুরিয়ে যাবে, এটা আমার অন্তত মনে হয় না। মানে, আমার বেঁচে থাকবার গরজেই সেটাকে অবিশ্বাস করতে হবে। আরেকটা কথা, সবই যে এখন গদ্যকবিতা হয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়।
সুদেষ্ণা বসু : সাহিত্যকে বাদ দিয়ে এই সময়ে আর কী করেছেন? আপনি যখন কলকাতায় তখন তো আই পি টি এ গ্রুপ বলুন, ভালো ছবি বলুন, মানে চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন সালটা, সেই সময়টা কী করেছেন?
শঙ্খ ঘোষ : আমি যখন কলকাতায় এসেছি, তখন খুব উত্তেজক সময় ছিল সত্যি। আই পি টি এ-টা প্রায় ভেঙে যাওয়ার সময়। কিন্তু তার থেকে নতুন শাখা তৈরি হচ্ছে। যেমন ‘বহুরূপী’ হচ্ছে তখন। ‘বহুরূপী’র প্রায় শুরু, আমারও কলকাতায় আসা। পার্ক সার্কাস ময়দানে শান্তির বিরাট সভা। তার মধ্য দিয়ে গ্রামের ও শহরের সমস্ত সংস্কৃতিকে মেলানোর একটা চেষ্টা চলছে। গানে, নাটকে, ফিল্মে নতুন পথ খোঁজবার চেষ্টা চলছে। আমাদের চোখের সামনে সেগুলো ঘটছে। অন্যদিকে আলাউদ্দিন, রবিশঙ্কর এঁদের বাজনার আসরগুলো নতুনভাবে ধরছে সমস্ত শ্রোতাদের। সত্যি বলতে কী, পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্নর এই যে-সময়টা, প্রায় প্রতিদিনই আমাদের মনে হতো, একটা নতুন উত্তেজনা নিয়ে আসছে। চোখের সামনে শম্ভু মিত্রের এক-একটা বিরাট প্রযোজনা ঘটছে। রক্তকরবীর মতো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটছে। অবশ্য সেটারও আগে যেটা আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখেছি সেই সময়ে, সেটা হলো বিভাব। আমরা যখন কলেজে পড়ি সেই সময়ে বিভাব-এর শুরু। ছেঁড়াতার বলে যে-নাটকটা, সেটা তখন আমাদের সবচেয়ে বড় তারিফের ব্যাপার ছিল। তার থেকে পুতুলখেলা, রক্তকরবী, সেইখানে এসে পৌঁছলাম।
সুদেষ্ণা বসু : তখন মনে হয়নি নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই? মানে নাটক লিখি?
শঙ্খ ঘোষ : না, সেটা মনে হয়নি।
সুদেষ্ণা বসু : আপনার কবিতার ক্ষেত্রে কতখানি নাটক নিয়ে ইনস্পায়ারড হয়েছিলেন বা কীভাবে হয়েছিলেন?
শঙ্খ ঘোষ : নাটক দেখতে গিয়ে নাটকের সঙ্গে যে গোটা জীবনের যোগ, সেইটুকুই অনুপ্রাণিত করেছে। এটা নয় যে, নাটকের রূপ থেকে আমি কবিতার মধ্যে অন্যকিছু আনতে পারছি বা চাইছিও। তবে এটা হয়েছে কিন্তু – প্রশ্নটা একদিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ – আমার কবিতার জন্যে নয়, আমার সময়ের জন্যে। আমার সময়ে যাঁরা লিখেছেন, তাঁরা অনেকেই এই প্রত্যক্ষ নাট্য-আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের কিছুটা পরিমাণে সম্পৃক্ত রেখেই হয়তো কাব্যনাট্যের একটা নতুন জগৎ তৈরি করে তুলেছিলেন। এই একটা সময়, যখন বেশ কিছু কাব্যনাট্য লেখা হয়েছিল। আমি অবশ্য – এটা বলে নেওয়া ভালো – তার কোনো রচনাকেই, মানে সেইসব লেখকের প্রতি আমার সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে – কিন্তু আমি মনে করি যে, কাব্যনাট্য বলতে যা বোঝায়, সেটা এঁরা প্রায় কেউই লিখতে পারেননি। চেষ্টা করেছিলেন অনেকে। ফিল্মের যে-জগৎ সেটার সঙ্গেও কবিতার একটা যোগ হয়েছিল। পথের পাঁচালী বা ওই সময়ে প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিগুলো দেখেছি। আর কবিতায় তখন, সিদ্ধেশ্বর সেনের কবিতায়, এই ফিল্মের জগৎটা ফর্মের দিক থেকে অনেকটা ব্যবহৃত হয়েছে। যেভাবে এই মন্তাজ রীতি সেটা, বা খানিকটা ‘জাম্প-কাট’ করে দেওয়ার যে-ধরন, ঝাঁপ দিয়ে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা, এগুলোকে খুব সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন সিদ্ধেশ্বর সেন তাঁর কবিতার ফর্মের মধ্যে। ফলে এই পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে কবিতার পরীক্ষা মিলে যাচ্ছিল অনেক সময়ে। কে কী ভাবে নিচ্ছেন সেটা আলাদা, কিন্তু প্রভাব অবশ্যই পড়েছিল।
সুদেষ্ণা বসু : আচ্ছা, আপনি লেখার বিষয় হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে বেছে নিলেন কেন?
শঙ্খ ঘোষ : বেছে নেওয়া নয়। এটা প্রায় অনিবার্যভাবে ঘটে যাওয়া। খুব ছোটবেলা থেকে রবীন্দ্রনাথ হয়তো একটু বিশেষভাবে পড়েছি। একটু আগে বললাম না? আমার বাবা খুব রবীন্দ্রভক্ত মানুষ। আমাদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের বইপত্র, তাঁর সম্পর্কিত আলোচনা, তাঁর গান এসব নিয়ে একটা আবহাওয়া ছিল। ফলে আমার লেখা, ভাবনাচিন্তা, প্রায় সবটাই তৈরি হয়েছে রবীন্দ্রনাথ থেকে। যখন স্কুলে পড়ি, তখন এই আধুনিক সাহিত্যের জগৎটার বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না। থাকবার কথাও নয় এক হিসেবে, বয়সও অল্প। কলকাতায় আসবার সঙ্গে সঙ্গে সেটা ঘটল, আর তখনই রবীন্দ্রজগৎ যেটা, তার সঙ্গে আধুনিক জগৎটাকে মিলিয়ে ধরবার চেষ্টা করলাম। বুঝতে পারলাম, বুঝতে চাইলাম কোথায় কী ঘটছে। কিন্তু একটা ভালোবাসা, শুধু ভালোবাসা নয়, এটা অস্তিত্বের ব্যাপার আমার কাছে, রবীন্দ্রনাথের লেখা অস্তিত্বের মধ্যে মিশে আছে। এখন লিখবার সময়ে, প্রথম লিখেছিলাম, সেটা অবশ্য ঠিকই যে রবীন্দ্রশতবর্ষের জন্যে, সে-অর্থে একটা আনুষ্ঠানিক লেখা। এটারও প্রথম ভাবনাটা এসেছিল কবিদের মধ্যেই। কৃত্তিবাস কবিগোষ্ঠী বলতে যাঁদের বোঝানো হতো, তাঁরা একদিন একটা ছোট আলোচনা করেছিলেন, সেটা ১৯৬০ সাল, যে পরের বছর রবীন্দ্রশতবর্ষ উদ্যাপনের জন্যে আমরা কী করতে পারি! ভাবনাচিন্তা হলো, কিন্তু কাজ হলো না। অর্থাৎ ১৯৬১ সালে কবিরা যে বিশেষভাবে কিছু করলেন, তা কিন্তু না। সেই সময়ে অলোকরঞ্জন আর আমি, আমরা দুজনে কয়েকটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। তারপর থেকে যে-প্রশ্নটা এসে দাঁড়াল, সেটা একটু অন্যরকম। অন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ বলা যায়। প্রশ্নটা এই, কৃত্তিবাসের এই কবিদল বলে যাঁদের প্রধানত বোঝানো হয়, তাঁরা বলতে চাইলেন যে, রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের কোথাও স্পর্শ করেননি। অনেকে আন্তরিকভাবেই বলতেন বলে আমার ধারণা। আমার তখন এটা বুঝতে ইচ্ছে হয়েছিল যে, এটা তো আমি লুকোতে পারব না যে, আমাকে রবীন্দ্রনাথ স্পর্শ করেন। আর এটাও ঠিক যে, আমি আধুনিক জগৎটার মধ্যে থাকতে পছন্দ করছি। আমার মনকে একরকম আধুনিকতায় আমি দেখতে পাই, অন্যে স্বীকার করুক বা নাই করুক। তাহলে আধুনিকতার সঙ্গে এই রবীন্দ্রনাথের সত্যিই কি কোনো বিরোধ আছে? যদি সত্যি বিরোধ থাকে, তাহলে আমার মধ্যে কোনো গোলমাল হচ্ছে। ফলে আমার নিজের গরজেই মনে হয়েছে, আমি কেন রবীন্দ্রনাথকে পড়তে পারছি, কেন ভালোবাসছি? কেন আমার অস্তিত্বের একটা খুব বড় শক্তি বলে মনে করছি? এটা বুঝবার কারণেই, যখনই লিখবার প্রসঙ্গ এসেছে, তখনই হয় রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে, নয় রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে লিখেছি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে আমি কম লিখেছি। আমি বেছে নিয়েছিলাম প্রধানত, প্রথমে নাটক এবং পরে রবীন্দ্রনাথের গান। সেটা খানিকটা এই কারণে যে, এখনো আমার মনে হয়, এই প্রসঙ্গগুলোতে তাঁর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কম। রবীন্দ্রনাথের নাটক নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই যে একটু আগে বলছিলাম – পঞ্চাশের গোড়ায় নাট্য-আন্দোলন, শম্ভু মিত্রের নাটকের আন্দোলন, সত্যজিৎ রায়ের ফিল্মের আন্দোলন, এগুলোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগ কোথায়? আছে না নেই? আমরা যে ইউরোপীয় নতুন নাটক পড়ি, ব্রেশট পড়ি, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নাটকের যোগ আছে না নেই? আমি সেই দিক থেকে বুঝবার চেষ্টা করেছিলাম। ফলে, আমার মনে হতো, রবীন্দ্রনাথের নাটককে ভাবনার দিক থেকে বিশ্লেষণ করতে পারলে রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে পারব, বা সেটার চেয়েও বড় কথা, আমরা এই সময়টাকে বুঝতে পারব অনেক বেশি। আমাদের নাটক কোথা থেকে নিতে পারে, সেটা বুঝতে পারব এবং হয়েছেও তাই। একটা সময় ছিল, যখন রবীন্দ্রনাথের নাটককে কেউ ভাববার যোগ্য বলে গণ্য করতেন না। অ্যাকাডেমিক আলোচনায় কথাবার্তা হতো যে, তিনি বড় কবি। তিনি নাটকও লিখেছেন, এইরকমভাবে আলোচনা হতো, কিন্তু এই আলোচনাটা হতো না যে, নাটকের নিজস্ব ফর্মের দিক থেকে এর গুরুত্ব সত্যিই কতটা, কতটা আধুনিক। অনেকে বর্জন করেছিলেন। কিন্তু, বলা যায় ১৯৬৫ সাল থেকে, বাদল সরকারের এবং ইন্দ্রজিৎ ১৯৬৫ সালে বেরোল, সেই সময় থেকে যে বাংলা নতুন নাটক লেখার একটা নতুন ধারা তৈরি হলো, সেইখানে আস্তে আস্তে বোঝা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলোর গুরুত্ব কী ছিল। কিন্তু এঁরা, এই বাদল সরকার, অনেক সময়ে বলেছেন, যে তাঁরা রবীন্দ্রনাথের নাটক পড়ে শুরু করেছিলেন, এমন নয়। একটা সময়ে বাদলবাবু এটাও বলেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের নাটক তিনি পছন্দ করেন না, ভালো করে পড়েননি। তাঁরা কোথায় পাচ্ছেন ফর্মটা? ইউরোপের কাছে। ইউরোপের যে-জায়গায়, যাঁদের কাছে তাঁরা এটা পাচ্ছেন, এই ভাঙচুর করবার চেহারাটা, তাঁরা কিন্তু সেটা পেয়েছেন প্রাচ্য জগৎ থেকে। অর্থাৎ পশ্চিমি নাটকের এমন একটা সময় এসেছিল, যখন তাঁরা নিজেদের নাটক সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পূর্বজগতে মুখ ফিরিয়েছিলেন। জাপান, চীন, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ, ভারতবর্ষেও আসতে চেয়েছেন। এইসব জগৎ থেকে তাঁরা ফর্ম নিয়ে ভেঙেছেন। তারপরে যে-ভাঙচুরটা হয়েছে, সেটা দেখে এখন আমরা নিজেদের ভাঙছি। এইখানে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্বটা বোঝা যায়। এই জায়গা থেকে আমি বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম। বুঝতে পেরেছি তা নয়। কিন্তু চেষ্টা করেছিলাম এইখান থেকে। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে বিস্তর বই আছে, কিন্তু সেটা প্রধানত তার সুর নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে। কিন্তু আমার একটা কৌতূহল ছিল যে, গানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে-ভাবনার জগৎ, যে-মনটা তৈরি হয়ে উঠেছে সেটাকে যে ততখানি আজও পর্যন্ত দেখা হয়েছে, এটা আমার মনে হয় না। অথচ সেইখানে তো রবীন্দ্রনাথের একটা আধুনিক মন কাজ করেছে। এই যে একটু আগে কৃত্তিবাসের কবিদের কথা বলছিলাম, এঁরা যাঁরা বলেন যে, রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা প্রত্যাখ্যান করেন, এঁরা প্রায় সকলেই কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানের খুব অনুরক্ত এবং অনেকে বেশ ভালো গান করেনও। যেমন শক্তি, সুনীল এঁরা রবীন্দ্রনাথের গান খুব ভালো করতেন বা করেন। যখন এটার মধ্যে তাঁরা মজে যান, কী জন্যে মজে যান? কিছু একটা ব্যাপার নিশ্চয়ই ঘটে, সেটা কোথায়, সেটাই আমি বুঝবার চেষ্টা করেছিলাম বলে, লিখতে গেলেই রবীন্দ্রনাথের কথা এসে পড়ে।
সুদেষ্ণা বসু : যখন আপনি চাকরি-জীবনে এলেন, মানে যখন পড়াশোনা ছেড়ে দিলেন (পাঠক্রমের), তখন একটা পরিবর্তন এলো আপনার মধ্যে, মানে যখন ছাত্রজীবনটা অতিক্রম করে গেলেন –
শঙ্খ ঘোষ : এর মধ্যে অবশ্য পড়াশোনা ছেড়েটেড়ে দিয়ে কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটাই তো হওয়ার কথা যে, অধ্যাপক হলে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হবে! তাই না?
সুদেষ্ণা বসু : তখন কতটা পাল্টে গেলেন?
শঙ্খ ঘোষ : পাল্টে হয়তো খুব আস্তে আস্তে গিয়েছি। খুব যে হঠাৎ কিছু পাল্টেছি, তা তো বুঝতে পারি না। তবে পড়ানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, নতুন নতুন ছেলেমেয়েদের সংস্পর্শে আসবার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটা মানুষ তো বাড়তে থাকে। সেই অর্থে নিশ্চয়ই পাল্টে গিয়েছি আমি। সেটা সচেতনভাবে নয়। তবে বিশেষ একটা পরিবর্তন যাতে না হয়, সেই চেষ্টাটা খুব করেছি। আমার একজন খুব শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশায় ছিলেন, আমি ইচ্ছে করেই তাঁর নামটা বলব না, চাকরিতে ঢুকবার মুহূর্তে তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, ডান-হাতে পড়াশোনা করবে, লেখা লিখবে। আর বাঁ-হাতে পড়াবে। তা নইলে লেখাপড়া হয় না। শুনে আমার খুব ধাক্কা লেগেছিল একটা। কষ্ট হয়েছিল খুব। আমি মনে মনে তখনই ভেবেছিলাম যে, মাস্টারমশায়ের এই আদেশটা মানবো না। চেষ্টা করি আজও পর্যন্ত সেটা না মানতে। একটা লেখার জন্যে যতখানি মন দিতে পারি, প্রত্যেকটা ক্লাসের জন্য ততখানি মন যদি আমি না দিতে পারি, তাহলে আমার কাছে সেটা অসম্ভব অন্যায়, অনাচার বলে মনে হয়। অনেকসময় পারি না হয়তো, সেটা আলাদা কথা। তবে, চেষ্টা করি। ফলে, লেখা আর অধ্যাপনার জীবন আমার কাছে খুব আলাদা জীবন নয়।
সুদেষ্ণা বসু : আপনাকে শুধু কবি হিসেবে না ভেবে, একজন মননশীল মানুষ হিসেবে দেখতে চাইছি। আপনি সাহিত্যের মাধ্যমে, সে কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প যেখানেই নিজেকে ব্যাপ্ত রেখেছেন, সেখানে নিশ্চয়ই আপনার মানুষের মঙ্গলকামনাই হোক কিংবা একটা পারফেকশানে পৌঁছানো, যে-কোনো একটা কিছু আছে। সেটা কী?
শঙ্খ ঘোষ : এগুলো এমন ধরনের কথা যে, বলতে একটু সংকোচ হয়। অর্থাৎ যে-ধরনের কথা শুনতে বড্ড বড় শোনায়। অথচ জিজ্ঞেস করলে বলেও ফেলতে হয়। বিশ্বের সব মানুষ ভালো থাকছে, ভালো থাকবে, এর চেয়ে বড় স্বপ্ন তো আর কিছু নেই। এই ভালো থাকার প্রথম মানে তো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার রসদটুকু পাওয়া, বেঁচে থাকার সম্মানটুকু। কিন্তু তারও পরে একটা কথা হলো, পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি করে বাঁচা। মানুষের সঙ্গে, মাটিজলের সঙ্গে, গ্রহ-তারার সঙ্গে সম্পর্ক। এই সম্পর্কের নামই ভালোবাসা। নিজেকে নিজের থেকে বের করে এনে এই-যে ভালোবাসা, এর চেয়ে বড়ো স্বপ্ন আর হতে পারে না। পৃথিবীটা যতই নষ্ট হবার দিকে এগোচ্ছে, ততই বেশি করে সত্য হয়ে উঠছে এই কথাটা যে, পুরোপুরি রসাতলে যাবার আগে ওইখানেই ফিরতে হবে মানুষকে, ওই ভালোবাসার কাছে। আমার খুব বিশ্বাস হয়, তা সে ফিরবে একদিন। ধ্বংসটাকেই পরম বলে মানতে আমার ইচ্ছে হয় না।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.