গল্পগুচ্ছে নারীরই প্রাধান্য, নারীরই কেন্দ্রীয় অধিষ্ঠান। ‘ভিখারিণী’র কমল থেকে ‘মুসলমানীর গল্পে’র কমলা পর্যন্ত অখণ্ড গল্পগুচ্ছের চুরানব্বইটি গল্পে বিষাদে-বেদনায়, আঘাতে-অপঘাতে, বিদ্রোহে-ব্যক্তিত্বে, প্রেমে-অপ্রেমে বিচিত্রধর্র্মী নারীমণ্ডলীর অবয়ব অঙ্কিত। নারী-প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সনাতনী ধারণা ক্রমে ক্রমে পরিবর্তিত হয়েছে এবং বিশ শতকের প্রারম্ভকাল থেকেই সম্ভবত তাঁর নারীভাবনা আধুনিক ইতিবাচক পথ খুঁজে নিয়েছে। সবুজপত্র-যুগের এবং অন্তঃপর্বের গল্পে মহিমময়ী নারীপ্রতিমা-সৃজনে স্বকালনিষ্ঠ রবীন্দ্রপ্রতিভা ভবিষ্যৎ-প্রসারী।
কিন্তু নারী-চরিত্রের তুলনায় পুরুষ-চরিত্র-সৃজনে রবীন্দ্রপ্রতিভার সাফল্য সমধিক নয়। হতে পারে নারীর তুলনায় পুরুষ-প্রসঙ্গে তাঁর বাস্তবিক অভিজ্ঞতার অবিমিশ্রতাই এ-ধারার চরিত্র-রূপায়ণে তাঁকে অধিকতর সমালোচনামুখর ও দায়িত্বশীল করে তুলেছে। বিদ্রƒপে-পরিহাসে, আঘাতে-সংঘাতে পুরুষকে জীবন্ময় করে তুলতে তাদের অসম্পূর্ণতা, ব্যক্তিত্বহীনতা আর স্ববিরোধিতাই শিল্পীচিত্তকে আকৃষ্ট করেছে বেশি। আর নারী তুলনাবিচারে বাস্তবিক অভিজ্ঞতা থেকে দূরবর্তী বলেই হয়তো, সৃজয়িতার মমতাহীনতার গ্লানিমুক্ত থেকে যেতে পেরেছে। দূরবর্তী বলেই সে বিষাদে-আনন্দে, ত্যাগে ও মহিমায় হয়ে উঠেছে মহিমময়ীর প্রতিমা। রবীন্দ্রগল্পে সৃজয়িতার বিশেষ আদর্শের বাহক প্রাতিস্বিক কিছু বালক-চরিত্র ব্যতীত পৌরুষে সমুন্নত পুরুষ-চরিত্র দুর্লভ। গল্পগুচ্ছের অধিকাংশ পুরুষই গল্পকারের আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির পীড়নে ভঙ্গুর, আয়রনির তীব্র আক্রমণে অন্তঃসারতুচ্ছ। দেশ-কাল, সমাজ-সংস্কার, বিদ্যা-বুদ্ধি, ধর্ম-অধর্ম ইত্যাদি বিচিত্র উৎসজাত বোধ ও বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের পুরুষ-ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে নিঃসন্দেহে। ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পের শশিভূষণই সম্ভবত গল্পগুচ্ছের বিরল-ব্যতিক্রম পুরুষ-চরিত্র, যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার শুভংকরী আইনের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। শশিভূষণের এম এ উপাধি তো ছিলই, অধিকন্তু আইন-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সনদও ছিল করায়ত্ত। ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির অধিকারী অধ্যয়নমনস্ক ও একাকিত্বপ্রিয় শশিভূষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দু-দুটি উপাধি অর্জন করেও কর্মজগতে প্রবেশের ছাড়পত্র অধিকার করতে পারেনি। অকর্মণ্য পুত্রকে পিতা তাই ‘বিষয়রক্ষাকার্যে’ নিযুক্ত করে গ্রামে পাঠিয়েছিলেন। এই পল্লীপটেই শশিভূষণের অন্তর্গূঢ় অসম প্রেম ও অসম বিদ্রোহের কথকতা বিকশিত হয়েছে। কিন্তু শশিভূষণের জীবনে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ-প্রতিরোধ নয়, জয়ী হয়েছে প্রেমই। যে-পৌরুষেয় সম্ভাবনায় তার বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ মুকুলিত হয়েছিল, ঔপনিবেশিক শাসন ও আইনের কানাগলির ধাঁধায় তা অচিরেই ঝরে গেছে। সুদীর্ঘ কারাবাসই অপ্রতিরোধ্য নিয়তি হয়ে শশিভূষণের জীবনবেদকে প্রতিহত করেছে। কিন্তু শশিভূষণের এই বিড়ম্বনা গল্পের চূড়ান্ত রসপরিণাম নয়। গল্পগুচ্ছে মিলন-পরিণতিসূচক হাতেগোনা যে-কয়টি গল্প আছে, ‘মেঘ ও রৌদ্র’ সেই সংক্ষিপ্ত তালিকারই অন্তর্ভূত। শশিভূষণের মধ্যকার অসামান্য সম্ভাবনার বিপরীতে গিরিবালার রোমান্সসুলভ প্রেমের ঔজ্জ্বল্য বুদ্ধদেব বসুর রসবোধকেও বিচলিত করেছিল। বুদ্ধদেব গল্পটিকে ‘চম্পূ’ অভিধায় চিহ্নিত করেছিলেন নির্দ্বিধায়।
দুই
শশিভূষণকে হিসেবের বাইরে রাখলে অখণ্ড গল্পগুচ্ছে পৌরুষদীপ্ত অস্তিত্বসচেতন জীবন্ময় পুরুষ-চরিত্র-সন্ধান দুরূহ হয়ে ওঠে। এই দুরূহতার পশ্চাতে বাংলা সাহিত্য-সমালোচনার মতবাদ-আশ্রয়ী একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিও কম দায়ী নয়। নারীর অন্তর্করণ, তার ত্যাগ ও মহিমা, বেদনা ও বিষাদ, অচরিতার্থতা ও যন্ত্রণার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপায়ণে বাংলা সাহিত্য যতটুকু সক্রিয় কিংবা নারীর বিশ্বলোক-বিশ্লেষণে সমালোচনা-সাহিত্য যতটুকু তৎপর, পুরুষের অন্তর্করণ, তার আত্মগ্লানি ও অস্তিত্বজিজ্ঞাসা, একাকিত্ব ও দুর্ভার যন্ত্রণা তুল্যমূল্যে স্থান পায়নি। গল্পগুচ্ছে এমন কিছু অসামান্য পুরুষ-চরিত্র রয়েছে, যারা সীমাহীন প্রতিকারহীন একাকিত্বের প্রকাশ বা অবভাস। এরা মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্বে প্রতিষ্ঠা পায়নি, এদের অবয়ব ও অবদান হয়তো-বা দৃষ্টান্তযোগ্যও নয়। তবু পোড়-খাওয়া রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ হিসেবে, উপায়হীন নৈঃসঙ্গ্যের প্রতিভূরূপে এরা করুণায় আর্দ্র করে পাঠকচিত্ত। সীমাহীন দুর্দশা ও দুর্ভোগ – এদেরকে স্থাপন করে মানববিশ্বের এমন এক প্রান্তদেশে, যেখানে তারা সঙ্গীহীন-উপায়হীন-আলোহীন এক-একটি মানব-অস্তিত্ব। রাইচরণ-দক্ষিণাচরণ-অদ্বৈতচরণ এবং এদের মধ্যবর্তী ‘নষ্টনীড়’ গল্পের ভূপতি এইসব ভগ্নপ্রাণ অথচ অস্তিত্বশীল নিঃসঙ্গ মানুষের পুরোধা।
তিন
রাইচরণ যে-গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সে-গল্পের নামকরণে রয়েছে এক অস্তিত্বশূন্য শিশুর সংস্কার-সাধিত জন্মান্তরের সংকেত। জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসের যে-দ্যোতনা গল্পটির কেন্দ্রীয় ভিত্তি প্রস্তুত করেছে, তাতে রাইচরণের সংস্কারবাহিত প্রবীণ মনোজগতেরই স্ফুরণ ঘটেছে। তবে জন্মান্তরে বিশ্বাস গল্পের বাঁক-পরিবর্তনে সহায়ক হলেও, এটি শেষ পর্যন্ত আর গল্পের রসপরিণতির নিয়ামক থাকেনি। রাইচরণের বিশ্বাস আর পাঠকের মানস-অবস্থানের দূরত্বের বস্তুগত পরিপ্রেক্ষিত সর্বজ্ঞ গল্পকার ফেল্নার জন্ম ও শৈশবের বিদ্রƒপশানিত বর্ণনায় পূর্বেই প্রস্তুত করে দিয়েছেন। ফলত রাইচরণের প্রত্যয় বদ্ধমূল হলেও, প্রৌঢ়বয়সে অকস্মাৎ পিতৃত্ব-অর্জনকারী এক মনস্তাপদীর্ণ বাধ্যগত পরিচারকের মনস্তত্ত্বই পাঠকের কাছে সত্যরূপে প্রতিভাত হয়। ফেল্নার প্রতি বিশ্বাসজাত নিষ্ঠায় রাইচরণ যতই নিবিড় হয়েছে, কিংবা পিতৃত্বের আসন থেকে স্বেচ্ছাবঞ্চিত হয়ে যতই সে দাসানুদাস হয়ে উঠেছে, নির্বোধ ও কৃতজ্ঞ মানুষটির মনস্তাপদীর্ণ অস্বাভাবিকতায় পাঠক ততই করুণা ও মমতায় আর্দ্র হয়েছে। জন্মান্তরের ধারণা ও সংস্কার রাইচরণের কাছে যত সত্যই হোক – প্রৌঢ়বয়সের পিতৃত্বের বিড়ম্বনা ততোধিক সত্যে পাঠকের মমতা ও সহানুভূতি-আকর্ষণে সমর্থ হয়। ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ (অগ্রহায়ণ ১২৯৮) গল্পে তাই প্রথম ও দ্বিতীয় ‘খোকাবাবু’ উপলক্ষই থেকে যায়, লক্ষ্য হয়ে ওঠে নির্বোধ-কৃতজ্ঞ রাইচরণ। বাৎসল্যের মানবমূর্তি রাইচরণের স্বেচ্ছাবঞ্চিত পিতৃত্বের অনিঃশেষ বেদনালোকেই গল্পটির অধিষ্ঠান। প্রথম খোকাবাবুর পদ্মাগ্রাসিত মৃত্যু কিংবা দ্বিতীয় খোকাবাবুর জন্ম ও পূর্বজ-এর পরিচয়ে প্রত্যাবর্তন-মুহূর্ত – এর কোনোটিই গল্পের ‘মহামুহূর্ত’ নয়, গল্পটির মহামুহূর্ত সৃজিত হলো তখনই, যখন – ‘রাইচরণ কোনো কথা না বলিয়া একবার পুত্রের মুখ নিরীক্ষণ করিল, সকলকে প্রণাম করিল; তাহার পর দ্বারের বাহির হইয়া পৃথিবীর অগণ্য লোকের মধ্যে মিশিয়া গেল।’ ‘হৃদয়বৃন্তে’ প্রস্ফুটিত ‘কুসুম’ বৃন্তচ্যুত হওয়া মাত্রই রাইচরণ পলকে পরিণত হলো এক না-মানুষে। ইতিপূর্বে রাজধানী কলিকাতার ছাত্রনিবাসের নতুনতর জীবন ফেল্নার স্বভাব, বেশভূষা ও মনোবৃত্তিকে আমূল পরিবর্তিত করে দিয়েছিল। ‘কেশবিন্যাসের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি’, ‘সুখী এবং সৌখিন’ মেজাজ – পিতার সঙ্গে তার মানস-দূরত্বের দ্যোতক হয়ে উঠছিল। সে ‘বাপকে ঠিক বাপের মতো মনে করিতে পারিত না। কারণ, রাইচরণ স্নেহে বাপ এবং সেবায় ভৃত্য ছিল, এবং তাহার আর-একটি দোষ ছিল – সে যে ফেল্নার বাপ এ-কথা সকলের কাছেই গোপন রাখিয়াছিল’। যশোরে ‘বাঙাল’ রাইচরণ তার অদ্ভুত আচরণের কারণেই ছাত্রাবাসের কৌতুক-পরিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। পিতার অনুপস্থিতিতে ফেল্নাও যে কৌতুক-পরিহাসে অংশগ্রহণ করত না, এমন নয়। তবু রাইচরণের প্রতি অনুগ্রহমিশ্রিত এক বিমিশ্র ভালোবাসা ছিল ফেল্নার। বিশ্বাস-সংস্কার এবং কৃতকর্মের জন্য মনস্তাপতাড়িত বৃদ্ধ রাইচরণ দীর্ঘ বারো বছর ভৃত্যবৎ সন্তান লালন করে পুত্রশোকাহত প্রভুর কাছে ফেল্নাকে সম্প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। জীবনের শেষ কটি দিন ভৃত্যের ভূমিকায় পুত্রসান্নিধ্যে থাকার প্রত্যাশা নিয়ে মুন্সেফ অনুকূলবাবুর কাছে মিথ্যা ‘আনুকৌলব’কে সম্প্রদান করে।
পুত্রকে ফিরে পাওয়ার প্রাক্-মুহূর্তে বিচারক অনুকূলবাবু প্রমাণ দাবি করলেও স্নেহসিক্তা গৃহিণীর আচরণ ও আবেগ প্রত্যক্ষ করে ‘প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা’ যে ‘সুযুক্তি’র পরিচায়ক নয় এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হন এবং কঠোর দণ্ড ঘোষণা করে বলেন – ‘কিন্তু রাইচরণ, তুই আর আমাদের ছায়া মাড়াইতে পাইবি না।’ কিন্তু উপায়হীন-গন্তব্যহীন বৃদ্ধ রাইচরণের বিপুলা পৃথিবীর বক্ষে কোথায় আছে প্রশান্তির একখণ্ড মৃত্তিকা? নবপরিচিত মুন্সেফ-সন্তান ফেল্নাও অপমানিত ও রাগান্বিত বোধ করল এই ভেবে যে, এই বৃদ্ধ তাকে চুরি করে নিজের ছেলে পরিচয় দিয়ে অন্যায় করেছে। ‘‘কিন্তু তথাপি উদারভাবে পিতাকে বলিল, ‘বাবা উহাকে মাপ করো। বাড়িতে থাকিতে না দাও, উহার মাসিক কিছু টাকা বরাদ্দ করিয়া দাও’।’’
গল্পের শেষ অনুচ্ছেদের শেষ দুটি বাক্যে রাইচরণের দেশের ঠিকানায় পাঠানো ‘কিঞ্চিৎ বৃত্তি’র টাকা ফেরত আসার এবং ‘সেখানে কোনো লোক’ না-থাকার নিগূঢ় তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে। আমরা পূর্বেই জেনেছি, ফেল্নার উপর্যুক্ত সংলাপ শোনামাত্রই রাইচরণ পুত্রের মুখ নিরীক্ষণ এবং ‘সকলে’র উদ্দেশে প্রণাম নিবেদন করে ‘পৃথিবীর অগণ্য লোকের মধ্যে’ মিশে গেছে। রাইচরণের এই নিরুদ্দেশ যাত্রার পূর্বেই ঘটে গেছে তার জীবনের প্রতিকারহীন বিপর্যয়। বিশ্বাস ও সংস্কার অতিরেক যে-হৃদয়মথিত বাৎসল্যে সে আত্মজকে লালন করেছে, সেই স্নেহের অকথিত দাবি যখন পরিবর্তিত-পুত্রের হৃদয়দ্বার থেকে প্রত্যাহত হয়ে ফিরে এসেছে – তখনই এক নিঃসীম শূন্যতায়, প্রতিকারহীন একাকিত্বে নিক্ষিপ্ত হয়েছে রাইচরণ। নিয়তিস্পৃষ্ট রাইচরণ পৃথিবীর অগণ্য মানুষের ভিড়ে মিশে গেলেও, – ‘বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী’ – এ-সত্য রাইচরণের জীবনের মহাসত্যে পরিণত হয়। মহাজন বলেছেন, পুত্রশোক এমন এক অনির্বাণ দাহশিখা, মহাকালও তাকে নির্বাপিত করতে পারে না। কিন্তু রাইচরণের এই শূন্যতা পুত্রশোকাতিরেক এক বেদনালোক প্রস্তুত করে তোলে, যা অনন্যোপায় ও দৃষ্টান্তবিরল। পুত্রশোকের কিংবা স্বেচ্ছায় পুত্রত্যাগের দৃষ্টান্ত জীবনে-সাহিত্যে অবিরল, কিন্তু পিতৃস্নেহ শনাক্তিকরণে বিফলতার এমন অনন্য-অভূতপূর্র্ব দণ্ড সম্ভবত রাইচরণ ব্যতীত পৃথিবীতে আর কেউ ভোগ করেনি। এই সূত্রেই গল্পগুচ্ছের দুর্ভার যন্ত্রণার সঙ্গী বিরল পুরুষদের প্রথম নাম রাইচরণ।
চার
‘নিশীথে’র (মাঘ ১৩১০) দক্ষিণাচরণ গল্পগুচ্ছের মনস্তাপদীর্ণ অস্তিত্ব-অনুভব-পীড়িত চরিত্রের অন্যতম পুরোধা। অপরাধবোধের নির্ঘুম যন্ত্রণা আর রাত্রির বিভ্রমে হতচকিত স্বীকারোক্তির শিল্পিত উপস্থাপনায় চরিত্রটি বিপন্নতার এমন এক জগৎ উন্মোচন করেছে, যেখান থেকে মুক্তির সম্ভাবনা অসম্ভব। স্বনিরূপিত অপরাধের গ্লানিবহ এই চরিত্রের দুর্ভোগের সঙ্গিনী অনন্ত অন্ধকার, নির্ঘুম ‘বিভাবরী’। দক্ষিণাচরণ নেখদ্যুলভ্-তুল্য পুনরুজ্জীবিত সত্তা নয়, রেজারেক্শান্ বা নবজন্ম ঘটেনি তার, তবু কৃতকর্ম এবং স্বকৃত আচরণের বৈপরীত্য আবিষ্কার করে আত্মজীবনে এক সীমাহীন শূন্যতাময় বিপন্নতাকে অনিবার্য করে তুলেছে সে। তার আত্মচেতনতাই তার অকপটত্ব, শুভবুদ্ধিসন্ধানী অন্তর্লোকের চুম্বক। আত্মবিরোধ মানুষিক বৈশিষ্ট্যেরই প্রকাশক, কিন্তু অন্তর্গত স্ববিরোধিতাকে শনাক্তকরণের ব্যর্থতা মানুষের সীমাবদ্ধতা ও অসম্পূর্ণতা। নৈতিক মানবিক ও আত্মিক অনিবার্যতায় যে-মানুষ স্ববিরোধকে আবিষ্কারে সমর্থ হয়, তার অবস্থান গড়মানুষের অনেক ঊর্ধ্বে। দক্ষিণাচরণ নিশ্চয়ই মহৎপ্রাণ কোনো ব্যক্তিত্ব নয়, উজ্জ্বল মহিমায় অবিসংবাদিত প্রতিষ্ঠা নয় তার, তবু দুর্বহ যন্ত্রণাকে বক্ষে ধারণ করে অকুণ্ঠ অবারিত কন্ফেশান্ তাকে অস্তিত্ব-অনুভবশীল এক বিদীর্ণচিত্ত মানবসত্তার মর্যাদায় ভূষিত করেছে। বিচিত্র অনুভবময়তার রসায়নে রুধিরাক্ত তার অন্তর্লোক – রক্তমাখা বেদনার সেই স্বীকারোক্তি-কথাই দক্ষিণাচরণের অলঙ্ঘ্য নেমেসিস।
দিনের সঙ্গে রাতের বিরোধে প্রতিরূপক কথকতা আমরা পড়েছি উত্তরকালে লেখা ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পে। ‘নিশীথে’ গল্পেও আছে দিবারাত্রির বিরোধের কথা। দিনের আলোকশুদ্ধতায় যে-দক্ষিণাচরণ লজ্জাবিনম্র স্বাভাবিক, রাতের অন্ধকারে নির্ঘুম জাগরণে সে-ই অপরাধবোধে জর্জরিত অস্তিত্ব-অনুভবক্ষম এক পীড়িত মানবাত্মা। নিজের কৃতকর্ম এবং আচরণ ও উচ্চারণের স্ববিরোধিতাই দক্ষিণাচরণের এই অস্বভাবী মনস্তত্ত্বের কারণ। আর এই আত্মবিরোধিতাকে শনাক্তকরণের শক্তিতেই দক্ষিণাচরণ করুণা ও সহমর্মিতার কাছে নিদারুণ এক শরণার্থী।
স্বামীর অন্তর্করণকে পাঠ করে নেওয়ার অসামান্য ক্ষমতা ছিল দক্ষিণাচরণের প্রথম স্ত্রীর। আয়রনি-দীপিত এক লক্ষ্যভেদী হাসিও ছিল তার স্বভাবগত। কিন্তু ‘ললিত কলাবিধি’র সমঝদার ছিল না এই নারী। অথবা, হয়তো অন্তর্করণ-পাঠের অসামান্য যোগ্যতাই দক্ষিণাচরণের ‘ললিত কলাবিধি’-চর্চার অন্তঃসারশূন্যতাকে অনুধাবনের শক্তি যুগিয়েছিল তাকে। বোঝা যায় প্রথম পক্ষের এই দাম্পত্যভিত্তি স্বামী-স্ত্রীর অসম যোগ্যতার ভারসাম্যহীনতায় শিথিল হয়ে পড়েছিল সূচনাতেই।
‘ওষ্ঠব্রণ’ ও ‘জ্বরবিকারে’ দক্ষিণাচরণ মরণাপন্ন হলে তার প্রথম স্ত্রীর ‘প্রাণপণ ব্যাকুলতায়’ যমদূতগুলোর সঙ্গে অনবরত যুদ্ধে ‘অযোগ্য প্রাণটাকে যেন বক্ষের শিশুর মতো দুই হস্তে’ ঢেকে রেখেছিল। ফলত, দক্ষিণাচরণ আরোগ্যলাভ করলেও ‘যম পরাহত ব্যাঘ্রের ন্যায়’ দক্ষিণাচরণকে পরিত্যাগ করে তার প্রথম স্ত্রীকে একটা ‘প্রবল থাবা’ মেরে যায়। অনতিকাল পরেই সন্তানসম্ভবা এই নারী একটি মৃতসন্তান প্রসব করে। এবং এর পর থেকেই নানারকম কঠিন রোগ এই মৃতবৎসাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। শয্যাশায়িনী এই নারীর চিকিৎসা ও শুশ্রƒষায় দক্ষিণাচরণের উদ্যম ও আন্তরিকতার অভাব ছিল না। মানসিক নৈকট্যের এক আবেগঘন মুহূর্তে গঙ্গাতীরের বাগানবাড়ির জ্যোৎস্না-বিকশিত পরিবেশে শ্বেতপাথরের বাঁধানো বেদিতে অর্ধশায়িত স্ত্রীর উদ্দেশে দক্ষিণাচরণ, ‘তোমার ভালোবাসা আমি কোনো কালে ভুলিব না।’ – এই হৃদয়জ সংলাপ উচ্চারণ করে। কিন্তু দক্ষিণাচরণের হৃদয়মথিত এই সংলাপের প্রতিক্রিয়ায় নিজের স্বভাবসুলভ হাসিতে ‘লজ্জা’, ‘সুখ’ এবং ‘কিঞ্চিৎ অবিশ্বাসে’র আয়রনি মিশিয়ে দেয় রোগক্লিষ্ট স্ত্রী। পরবর্তী সময়ে বায়ু-পরিবর্তনের প্রয়োজনে দক্ষিণাচরণ স্ত্রীকে নিয়ে যায় এলাহাবাদে। রোগিণীর দীর্ঘ পরিচর্যায় দক্ষিণাচরণ যে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল, সেখানকার হারান ডাক্তার ও তার পঞ্চদশী কন্যা মনোরমার মধুর সংস্পর্শে ক্রমে তা প্রকাশ পেতে শুরু করে। হারান ডাক্তারের প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রে এবং দক্ষিণাচরণের ইচ্ছাকৃত ঔদাসীন্যে আত্মঘাতী হতে বাধ্য হলো প্রথম স্ত্রী। কিছুকাল পর নববিবাহিত বধূ মনোরমাকে নিয়ে দেশে ফিরে এলো দক্ষিণাচরণ। এবারে গল্পের পট স্থানান্তরিত হলো গঙ্গা ছাড়িয়ে পদ্মাবক্ষে, পদ্মার বালুকাবিস্তৃত চরভূমে। জ্যোৎস্নাপ্লাবিত মনোময় প্রাকৃতিক পরিবেশে দ্বিতীয় স্ত্রী মনোরমাকে নিয়ে পরিভ্রমণরত দক্ষিণাচরণ হার্দিক মুহূর্তে উচ্চারণ করে সেই পূর্বকথিত সংলাপ – ‘…তোমাকে আমি ভালোবাসি। তোমাকে আমি কোনো কালে ভুলিতে পারিব না।’ সংলাপটি উচ্চারণমাত্র সচকিত হয়ে ওঠে দক্ষিণাচরণ, এই অভিন্ন সংলাপ প্রায় অনুরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রথমার উদ্দেশে উচ্চারণ করেছিল সে। মুহূর্তে অকপট দক্ষিণাচরণকে গ্রাস করে বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা, যার অনিবার্য পরিণাম উপায়হীন মনোবিকলন। ঘনায়মান সন্ধ্যায় রোগশয্যায় শায়িত প্রথমা স্ত্রী মনোরমাকে প্রথম দর্শনে রোগবিকারের প্রতিক্রিয়ায় চমকে উঠে বলেছিল, ‘ও কে? ও কে গো?’ এখন সিজোফ্রেনিয়া-আক্রান্ত দক্ষিণাচরণ সারিবদ্ধ উড্ডীন পাখির ডানার শব্দে, ঘড়ির কাঁটার বিরামহীন ধ্বনিতরঙ্গে প্রতিধ্বনিত হতে শোনে সেই হৃদয়চেরা সংলাপ ‘ও কে? ও কে গো?’ নিজের প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতির স্বকৃত লঙ্ঘনে দক্ষিণাচরণ এখন অপরাধবোধ-তারিত এক উন্মুল মানবসত্তা, যার অন্তর্গত গ্লানিবোধ হরণ করে নিয়েছে তার প্রতিটি রাত্রির সুষুপ্তি। গল্পে অনেকটা নিশি-পাওয়া বিভ্রান্ত মানুষের স্বরূপে দক্ষিণাচরণ কাঠামো-গল্পের ভাষ্যকার প্রতিবেশী ডাক্তারের কাছে উপস্থাপন করে তার জীবনের কথকতা – বিবেকী স্বীকারোক্তির অকপটতায় যা, পরিশুদ্ধ ও মর্মস্পর্শী।
দক্ষিণাচরণ জীবন্ময় চরিত্র এ-জন্য যে, দুর্ভার যন্ত্রণার সঙ্গী হয়েও সে অস্তিত্ব-অনুভবক্ষম শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তার গ্লানিবোধ, নির্ঘুম রাত্রির বিভ্রমে তার নিরাভরণ আত্ম-উন্মোচন – সপ্রাণ চরিত্রসত্তায় তাকে উত্তীর্ণ করে। তার স্বকৃত ও নিরূপিত অপরাধের স্মৃতি তার প্রতিরাত্রের অমোঘ নৈঃসঙ্গ্যের সঙ্গী। নিশীথের অন্ধকারে বিবেকের কারাগারে বন্দি এই মানুষটির মুক্তির পথ অবরুদ্ধ, অসম্ভব। দক্ষিণাচরণ এই অর্থেই করুণা ও সহানুভূতি-প্রত্যাশী গড়মানুষের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত সপ্রাণ বিবেকী সত্তা।
পাঁচ
সমগ্র গল্পগুচ্ছে অদ্বৈতচরণের তীব্র আত্ম-পরিহাসকারী চরিত্র বেশি নেই। নিজের পাণ্ডিত্যের অন্তঃসারশূন্যতাকে যেভাবে বিদ্রƒপ ও বৈহাসিকতায় সে উন্মোচন করেছে, তাতেই তার শূন্যতাময় অন্তহীন বেদনার জীবন অভিব্যঞ্জিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিহীন, প্রাতিষ্ঠানিক সনাতনী শিক্ষার রূঢ় সমালোচক এবং স্বনিরূপিত কৃতবিদ্য অদ্বৈতচরণের জীবনে প্রথম সূক্ষ¥ আঘাত এসেছে শ্বশুরের পক্ষ থেকে। মৃত্যুর পূর্বে শ্বশুর তার বিদ্যালয়গামী পুত্রের বিদ্যাশিক্ষার দায়িত্বটি জামাতা অদ্বৈতচরণকে না দিয়ে, কন্যা অনিলার হাতে সমর্পণ করেন এবং এ-সংক্রান্ত ব্যয়নির্বাহের জন্য প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকা প্রদান করেন। অতি-আধুনিক হিসেবে আত্মপ্রসাদ-অনুভবে অভ্যস্ত অদ্বৈতচরণ শ্বশুরের এই আচরণে মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং তাকে ‘ভিক্টোরীয় যুগের ফিলিস্টাইন’ অভিধায় চিহ্নিত করে এই নির্বুদ্ধিতার সান্ত্বনা খুঁজেছে।
তবে অদ্বৈতচরণের জীবনের চরম ব্যর্থতার সূত্র নিহিত রয়েছে আত্মগর্বী মানুষটির জাগতিক বুদ্ধি ও হার্দিক উপলব্ধির সীমাবদ্ধতায়। বিবিধ জ্ঞান ও বিদ্যার প্রভূত কেতাব নিয়ে তার এবং তার ‘দ্বৈতাদ্বৈত’ দলের সময় অতিবাহিত হলেও, স্ত্রী অনিলার অন্তঃকরণ-পাঠের অক্ষরজ্ঞান ছিল তার অনায়ত্ত। স্ত্রীর অন্তর্জগৎ-পাঠে নিরক্ষর অদ্বৈতচরণের মর্মভেদী আত্ম-আবিষ্কার এবং নিঃসঙ্গ জীবন-পরিণতিই ‘পয়লা ন¤¦র’ (আষাঢ় ১৩২৪) গল্পের রসবোধের ভিত্তি। স্ত্রী-কর্তৃক পরিত্যাজ্য স্বামী-চরিত্র গল্পগুচ্ছে আরো আছে, কিন্তু ‘পয়লা নম্বর’ এবং গল্পকথক নায়ক অদ্বৈতচরণ নিগূঢ় কারণে প্রাতিস্বিকতা-চিহ্নিত। অন্যান্য গল্পে সর্বজ্ঞ গল্পকার কিংবা গল্পকথক-নারীর প্রেক্ষণবিন্দু থেকে স্বামীর স্থূলতা-দীনতা এবং অসম্পূর্ণতা শিল্পরূপ পেয়েছে। কিন্তু ‘পয়লা ন¤¦রে’ পুুরুষের আত্মভাষ্যে পুরুষের অসম্পূর্ণতা ও অকিঞ্চিৎকরতা প্রতিভাত হয়েছে। ফলত পরিণামে ‘পয়লা ন¤¦র’ হয়ে উঠেছে নারী-বন্দনার গল্প। নারীর প্রেমময়ী সত্তাকে আবিষ্কারের অসামর্থ্যজনিত গ্লানিই অদ্বৈতচরণের জীবনের বিষাদমণ্ডিত পরিণতির কারণ।
গল্পটিতে উদ্বন্ধনে সহোদরের মৃত্যুর পর অনিলার স্বামীসঙ্গত্যাগ ও অন্তর্ধান অনিবার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। অদ্বৈতচরণের ভাষ্যসূত্রেই আমরা জেনেছি, অনিলা স্বামীসঙ্গ ত্যাগ করেছে ঠিকই, কিন্তু জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধন-সংস্কারকে অতিক্রম করতে পারেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর বা সবুজপত্র-যুগের গল্পে বাঙালি হিন্দু নারীর সামাজিক-রাষ্ট্রিক ভূগোলের পরিসরে ভিন্ন আচরণ কালানুসত্যেও অনুমোদন পেত না। তবে অনিলা-চরিত্রের ব্যতিক্রমতা নিহিত অন্যত্র। এই একটি গল্পেই আমরা পাই – অনিলা নাুী এক নারীর মূল্যায়নে দুই পুরুষের তুল্যমূল্য দণ্ড। অনিলা যেমন স্বামীসঙ্গ পরিত্যাগ করেছে, তেমনি তার ভেতরকার প্রেমময়ী সত্তার আবিষ্কারক প্রণয়ী সিতাংশুমৌলিকেও করেছে প্রত্যাখ্যান। অনিলা-অন্তর্ধানের দীর্ঘকাল পর বহুদিনকার নিশ্চেষ্ট অদ্বৈতচরণ স্ত্রীর দর্শন-প্রত্যাশায় যখন সিতাংশুমৌলির সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়েছে, তখনই সে জানতে পেরেছে অনিলা-প্রসঙ্গে তার সন্দেহ অমূলক। কারণ সিতাংশুমৌলি ‘এনামেল-করা সোনার কার্ড্-কেস’-এর ভেতর থেকে কাগজের যে-টুকরো তার সামনে মেলে ধরেছে, তাতে লেখা রয়েছে, ‘আমি চললুম, আমাকে খুঁজতে চেষ্টা করো না। করলেও খোঁজ পাবে না।’ – ‘সেই অক্ষর, সেই লেখা, সেই তারিখ, এবং যে নীলরঙের চিঠির কাগজের অর্ধেকখানা’ অদ্বৈতচরণের কাছে সংরক্ষিত ‘এই টুকরোটি তারই বাকি অর্ধেক’। গল্পগুচ্ছে অনিলা-চরিত্রের এ-ও এক ভিন্ন মাত্রা, যেখানে দুই পরিত্যাজ্য পুরুষের চিত্তে সে তুল্যমূল্যে অধিষ্ঠিতা। তবে সিতাংশুর রোমান্টিক প্রতীক্ষা ও অনুসন্ধান আর অদ্বৈতচরণের নিঃসঙ্গ আত্ম-গুহাবাস অভিন্ন পরিণতি ও রসব্যঞ্জক নয়। অন্তর্ধানের কিছুকাল পর দেরাজের ভেতরে সযত্নে রক্ষিত অনিলার কাছে সিতাংশুর একতরফা লেখা পঁচিশখানি চিঠি আবিষ্কার করে অদ্বৈতচরণ এই বোধে উপনীত হয়েছিল যে, সিতাংশু ‘যাকে ক্ষণকালের ফাঁক দিয়ে দেখেছে’, আট বছরের দাম্পত্য-ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও এই চিঠিগুলির ভেতর দিয়েই তাকে প্রথম দেখল সে। এই মর্মান্তিক জীবনসত্যের মুখোমুখি হয়ে অদ্বৈতচরণ শেষপর্যন্ত সিতাংশুমৌলির লেখা পঁচিশটি চিঠির অনিলা-বন্দনাকে নিজের ‘প্রাণের স্তবমন্ত্র’-স্বরূপ গ্রহণ করে নিয়েছে। ফলত অনিলাকে কেন্দ্রে রেখে ‘পয়লা ন¤¦র’ শেষ অবধি হয়ে উঠেছে অদ্বৈতচরণেরই বেদনাদগ্ধ জীবনকথা। অনিলার স্তবমন্ত্রের মধ্য দিয়ে এক ভিন্নমাত্রিক স্বীকারোক্তিই গল্পটির রসলোক প্রতিষ্ঠা করেছে। অনিলার স্বরূপ-আবিষ্কার যতটা অনিলার জন্য সত্য, ততোধিক সত্য অদ্বৈতেরআত্ম-আবিষ্কার। এই দুই আবিষ্কারের ব্যবধানগত শূন্যতাই – অদ্বৈতচরণের জীবনদণ্ড কিংবা মর্মবিদারী পুরস্কার।
ছয়
অশ্রুকুমার সিকদার ভূপতির পরিণতিকে দেখেছেন ‘যুগলের নিঃসঙ্গতা’র অংশ হিসেবে (দ্র. ‘যুগলের নিঃসঙ্গতা’ : আধুনিকতা ও বাংলা উপন্যাস)। সত্যজিৎ রায় ‘নষ্টনীড়’ গল্পের চলচ্চিত্রায়ণে ‘চারুলতা’ নামান্তরে চারুর বেদনালোককে প্রাধান্য দিয়ে তাকেই কেন্দ্রীয় কুশীলবের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠা-প্রয়াসী হয়েছেন। চলচ্চিত্রায়ণে সত্যজিতের পুনর্সৃষ্টিক্ষম প্রজ্ঞা বিশ্ববিশ্রুত। তবে, নারী ও পুরুষ কেন্দ্রীয়-চরিত্রকে গল্পের শিরোনামায় ধারণ করার, পুরুষের ক্ষেত্রে একটি এবং নারীর ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি দৃষ্টান্ত রবীন্দ্রগল্পে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এ-গল্পটিতে চারু ও ভূপতির বেদনালোককে মূল্য দিয়েও, চরিত্রনামকে গল্পের শিরোনামায় গ্রহণ করেননি, উভয়ের দাম্পত্য-নীড় বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিব্যঞ্জনাকেই ‘নষ্টনীড়’ অভিধায় প্রতিরূপকায়ণ করেছেন। কাজেই চারুলতা মাত্র নয়, যুগলের বেদনা ও নৈঃসঙ্গ্যই যে তাঁর শিল্পসৃজন-বেদনার মূলে সক্রিয় ছিল এমনটি ভাবাই স্বাভাবিক ও সংগত। তবু গল্পের ভেতরকার স্তরক্রম গভীর অভিনিবেশে পর্যবেক্ষণ করে সূচনা ও সমাপ্তিসহ ‘নষ্টনীড়’ গল্পের কেন্দ্রে, অসীম শূন্যতায় ভূপতিকেই দণ্ডায়মান দেখি অনিবারণীয় এক নৈঃসঙ্গ্যের সঙ্গীরূপে। এ-কারণেই মনে হয়, যুগলের ভ্রষ্ট-দাম্পত্যের গল্প হলেও মূলত ‘নষ্টনীড়’ নির্বোধ ভূপতিরই গল্প – তার বেদনার, যন্ত্রণার এবং নিরূপায় একাকিত্বের দুর্ভোগই গল্পটির চূড়ান্ত রসপরিণতি।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের অনুষঙ্গে-লেখা বাক্যের ক্রিয়াপদ ও সর্বনামপদে সম্মানার্থ যোগ করার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত রবীন্দ্রগল্পে খুব বেশি নেই। প্রসঙ্গত মনে পড়বে ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পের নন্দকিশোরের কথা। তার অপঘাত মৃত্যু সোহিনীর চিত্তে ভিন্ন রকমের সংবেদনা সৃষ্টি করলেও ওই মৃত্যু বিষাদবিস্তারী হয়ে গল্পটির রসপরিণতির নিয়ামক হয়ে ওঠেনি। কেননা ‘ল্যাবরেটরি’ নন্দকিশোরের গল্প নয়, অসামান্যা সোহিনীর স্বপ্ন ও কর্তব্যের কথকতা। তবু সোহিনীর স্বপ্নের ও কর্তব্যের আদর্শভিত্তি নন্দকিশোরই। সর্বজ্ঞ গল্পকার এজন্যই সম্ভবত নন্দকিশোর-সংশ্লিষ্ট বাক্যের ক্রিয়াপদ ও সর্বনামপদে সম্মানার্থ সংযোজনে ছিলেন পূর্বাপর দ্বিধাহীন। কিন্তু ‘নষ্টনীড়’ গল্পে ভূপতি-সংশ্লিষ্ট বাক্যের ক্রিয়াপদ ও সর্বনামপদে সম্মানার্থ যোজনায় রবীন্দ্রপ্রবণতা বিরল ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা গল্পে ক্রিয়াপদ ও সর্বনামপদ-ব্যবহারে এমন তারতম্য তথা বৈপরীত্য গল্পগুচ্ছের অন্যান্য গল্পে চোখে পড়ে না। গল্পটির প্রথম পরিচ্ছেদের প্রথম অনুচ্ছেদেই সর্বনামপদ ও ক্রিয়াপদে সম্মানার্থ যোগ করে সর্বজ্ঞ গল্পকার ভূপতির আংশিক পরিচয় দিয়েছেন। এই অংশের প্রথম চারটি অনুচ্ছেদে ভূপতি-প্রসঙ্গে বর্ণনায় ও তথ্য-উপস্থাপনায় গল্পকারের সূক্ষ¥ আয়রনির আঁচ অনুভব করা যায়। যাকে গল্পের কেন্দ্রে স্থাপন করে গল্পকার সৃজন করতে চলেছেন এক বিপন্ন মানুষের দুর্ভার একাকিত্বের কথকতা আয়রনির তাপে তাকে ঈষৎ-তপ্ত করে তোলায় সৃজয়িতার কোন মনস্তত্ত্ব ক্রিয়াশীল? মূলত ভূপতির বিপন্নতার উৎসমূল তার স্বভাব-ঔদাসীন্য, শর্তনিরপেক্ষ আস্থা ও বিশ্বাস। এই তিনটি কারণই দাম্পত্য-প্রাত্যহিকতায় অভ্যস্ত ভূপতিকে স্ত্রীর সৃজনীসত্তা-আবিষ্কারে সামর্থ্যহীন করেছে। ফলত সে স্বোপার্জিত কর্মব্যস্ততার ডামাডোলে বহুগুণিত করেছে স্ত্রীর কর্মহীন নৈঃসঙ্গ্যের মাত্রা।
বোধ করি এজন্যেই সূচনা পরিচ্ছেদে ক্রিয়াপদ ও সর্বনামপদে সম্মানার্থ প্রয়োগ করে আয়রনিক্যাল বাক্যে ভূপতি-চরিত্রের ছিদ্র এবং আসন্ন বিপর্যয়কে সংকেতিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। না-হলে প্রথম পরিচ্ছেদের পঞ্চম অনুচ্ছেদে এসে ভূপতি-সংশ্লিষ্ট বাক্যে কেন বদলে যাবে ক্রিয়াপদ ও সর্বনামপদ গঠনের ধরন? এমন বৈপরীত্য এবং তারতম্য গল্পগুচ্ছের অন্য সবিশেষ চরিত্রের ক্ষেত্রে ঘটেনি, ঘটেছে কেবল বিড়ম্বিত তভাগ্য ভূপতির ক্ষেত্রেই, যে নষ্টনীড়ের অন্যতম অংশীদার হয়েও বিপন্নতার মাত্রায় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত, বিবিক্ত, অনন্যসহায়।
‘নষ্টনীড়’ গল্পের শুরুতে ভূপতি, সমাপ্তিতে ভূপতি; তবে মধ্যস্তরে বিশাল অংশ জুড়ে আছে চারু ও অমল। অমলের বিয়ে ও প্রবাস-উত্তর চারুর একাকিত্ব গল্পটির আর-এক মাত্রা। চারু ও ভূপতির মধ্যকার মানস-ব্যবধানকে গল্পকার সূচনা-পর্বেই চিহ্নিত করেছেন। প্রারম্ভ পরিচ্ছেদেই লেখা হয়েছে :
‘…সময়ের দীর্ঘতার জন্য তাঁহাকে আর বিলাপ করিতে হয় নাই।’…
‘ছেলেবেলা হইতেই তাঁর ইংরাজি লিখিবার এবং বক্তৃতা দিবার সখ ছিল। কোনোপ্রকার প্রয়োজন না থাকিলেও ইংরাজি খবরের কাগজে তিনি চিঠি লিখিতেন, এবং বক্তব্য না থাকিলেও সভাস্থলে দু কথা না বলিয়া ছাড়িতেন না।’
‘অল্পবয়সে সম্পাদকি নেশা এবং রাজনৈতিক নেশা অত্যন্ত জোর করিয়া ধরে। ভূপতিকে মাতাইয়া তুলিবার লোকও ছিল অনেক।’
‘এই রূপে সে যতদিন কাগজ লইয়া ভোর হইয়া ছিল ততদিনে তাহার বালিকা বধূ চারুলতা ধীরে ধীরে যৌবনে পদার্পণ করিল। খবরের কাগজের সম্পাদক এই মস্ত খবরটি ভালো করিয়া টের পাইল না। ভারত-গবর্মেন্টের সীমান্তনীতি ক্রমশই স্ফীত হইয়া সংযমের বন্ধন বিদীর্ণ করিবার দিকে যাইতেছে, ইহাই তাহার প্রধান লক্ষের বিষয় ছিল।’
‘ধনীগৃহে চারুলতার কোনো কর্ম ছিল না। ফলপরিণামহীন ফুলের মতো পরিপূর্ণ অনাবশ্যকতার মধ্যে পরিস্ফুট হইয়া উঠাই তাহার দীর্ঘ দিনরাত্রির একমাত্র কাজ ছিল। তাহার কোনো অভাব ছিল না।’
‘…কাগজের আবরণ ভেদ করিয়া স্বামীকে অধিকার করা তাহার পক্ষে দুরূহ হইয়াছিল।’
চারু ও ভূপতির মানস-ব্যবধানের উপর্যুক্ত বস্তুগত পরিপ্রেক্ষিত অমল ও চারুর অবারিত ঘনিষ্ঠতার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। এবং এক্ষেত্রে অমলের সর্বাধিক কৃতিত্ব চারুর মধ্যকার সৃজনীশক্তি আবিষ্কার। চারুর সৃজনশীলতা যতই বিকশিত হয়েছে আত্ম-আবিষ্কারের গৌরবময় সংবেদনায় চারু ততই অমলকেও সতত আবিষ্কার করে চলেছে, তার সান্নিধ্যে আত্মবিস্মৃত হয়েছে। পক্ষান্তরে স্বোপার্জিত স্বভাব-ঔদাসীন্য, আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে ভূপতি এই ভেবে আত্মপ্রসাদ অনুভব করে বলেছে যে, ‘আমি সংসারের লোক, আমি মানুষ বুঝি।’ বস্তুত এই আত্মপ্রসাদসূচক বাক্যই ভূপতি-চরিত্র-বিশ্লেষণের অন্যতম নিয়ামক হতে পারে। কেননা ভূপতি হয়তো মানুষ চেনে, কিন্তু ‘মানুষ’ বোঝে না, মানুষের অন্তর্গত ব্যাকরণের ‘নিপাতন’ সম্পর্কে কৃতবিদ্য এই ব্যক্তিটি যে নিতান্তই অজ্ঞ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চারুও ভিন্ন প্রসঙ্গে ভূপতির উদ্দেশে এই অমোঘ সত্যটি উচ্চারণ করে বলেছে, ‘তুমি তো ঘরের খবর কিছুই রাখ না, কেবল বাইরের খবর কুড়িয়ে বেড়াও।’
চারু ও অমলের সৃজনলীলার চাপল্য যখন উত্তুঙ্গ পর্যায়ে পৌঁচেছে, শ্যালক উমাপদর জালিয়াতির শিকার হয়ে ভূপতি তখন দেউলিয়া হতে বসেছে। নিঃস্ব-রিক্ত ভূপতি বাইরের পৃথিবীর আঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে যখন চারুর অন্তর্লোকে প্রবেশের ছাড়পত্র-সন্ধানে এসেছে – ‘চারু তখন নিজের দুঃখে সন্ধ্যাদীপ নিবাইয়া জানালার কাছে অন্ধকারে বসিয়া’ – ভূপতির জীবনান্ধকারকে গভীরতর করে তুলেছে। জীবনের সর্বপ্রান্ত থেকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ভূপতি এই ভেবে চারুর শরণপ্রার্থনা করে অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছে যে – ‘আর যাই হোক, চারু তো আমাকে বঞ্চনা করিবে না।’ ‘…সেদিন ভূপতির নিজের কিছু দিবার বা কহিবার ছিল না। সে রিক্তহস্তে চারুর নিকটে প্রার্থী হইয়া আসিয়াছিল। চারুর কাছ হইতে আশঙ্কাধর্মী ভালোবাসার একটা-কোনো প্রশ্ন, একটা-কিছু আদর পাইলেই তাহার ক্ষত-যন্ত্রণায় ঔষধ পড়িত।’ কিন্তু অন্যাসক্তা চারু তখন বিপন্ন ভূপতির অন্তর্করণ-পাঠে শক্তিহীন। ফলত ‘উভয়ের সুকঠিন মৌনে ঘরের নীরবতা অত্যন্ত নিবিড়’ হয়ে উঠল অনিবার্যভাবেই।
ইতোমধ্যে অমলের বিয়ের প্রস্তাব এবং সহসা আত্মসচেতন অমলের সে-প্রস্তাবের নিঃশর্ত সম্মতির সূত্রে দ্রুত বিবাহ-অনুষ্ঠান এবং বিলাতযাত্রা – চারুর ব্যক্তিগত জীবনেও নিয়ে এসেছে শূন্যতাময় একাকিত্বের যন্ত্রণা। একদিকে নিঃস্ব-রিক্ত ভূপতি, অন্যদিকে অন্যাসক্তা নিঃসঙ্গ চারু – এই দুই চরিত্রের উন্মূলিত দাম্পত্যের সংকেতে-সংবেদনায় গল্পটির পরবর্তী অংশ শিল্পিত হয়ে উঠেছে।
প্রসঙ্গত চারু-অমল-সম্পর্কের রহস্য-আচ্ছাদিত নিগূঢ় স্বরূপ উন্মোচিত হওয়া আবশ্যক। গল্পে যে-সব সংকেত-সংলাপ ও অভিব্যক্তি এবং সর্বজ্ঞ গল্পকারের ভাষ্যে প্রদত্ত তথ্য ও বিবৃতি উপস্থাপিত হয়েছে – তাতে এই দুই নরনারীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয়ের মানস-অবস্থান তুল্যমূল্য নয়, এদের দুজনার সম্পর্কের মধ্যে কখনো-কখনো ঈর্ষা, সন্দেহ এবং অনুযোগ-প্রকাশের ঘটনাও ঘটেছে। তবে চারুর আচরণ ও অভিব্যক্তি যতটুকু একমুখী ও অমলকেন্দ্রিক – অমলের উচ্চারণ ও আচরণ ততটা সুস্পষ্ট নয়। অমল যেমন চারুর সৃজনীসত্তাকে আবিষ্কার করেছে, তেমনি তার মধ্যকার প্রণয়িনীসত্তার উদ্ভাসনকেও হার্দিক সংবেদনায় অনুধাবন করে চঞ্চল, হতবিহ্বল এবং পরিশেষে আত্মসচেতন ও কর্তব্যসচেতন হয়েছে। এককথায় বিয়েতে সম্মতি ও তড়িঘড়ি করে বিয়ের অনুষ্ঠান ও প্রবাস-যাত্রার মধ্যে অত্যাসন্ন বিপর্যয়কে যে সে ভবিষ্যৎ-দর্শন করেছে – তার ইঙ্গিত পাই। বিদায়কালে চারুর উদ্দেশে আভূমি নত হয়ে অমলের প্রণামে, বৌঠান সম্বোধনের সশ্রদ্ধ মাধুর্যে, এবং জাহাজ ও বিলেত থেকে ভূপতির কাছে লেখা সকল চিঠিতে বৌঠানের উদ্দেশে প্রণাম-নিবেদন-উল্লেখের সূক্ষ্ম তথ্যে কর্তব্য ও কৃতজ্ঞতায় মীমাংসিত অমলের মানস-অবস্থানের স্বরূপটি অনুভব করে নেওয়া যায়। কিন্তু চারুর ক্ষেত্রে অমলের অনুপস্থিতির প্রতিক্রিয়া হয়েছে মর্মান্তিক। অমলের স্মৃতিময় অস্তিত্ব যতই সরব হয়েছে চারুর অন্তর্লোকে – মরুময় একাকিত্বের শূন্যতায় ততই গ্রাসিত হয়েছে সে। তবে এই শূন্যতার যন্ত্রণা মর্মান্তিক হলেও তুলনাতীত নয়। কেননা, শূন্যতাময় এই জীবনে চারুর সুখস্মৃতি আছে অন্তত, কিন্তু ভূপতির কী রইল? যখন প্রিপেড টেলিগ্রামের রহস্যভেদশেষে চারুর চিত্তপরিচয় এতদিনকার নির্বোধ ভূপতির কাছে দিনের আলোর মতো সুস্পষ্টতা পেল – তখনই জীবনের কারবারে কপর্দকহীন দেউলিয়া হিসেবে আত্ম-আবিষ্কারে বিমূঢ় হলো ভূপতি। পৃথিবীতে দাঁড়াবার স্থান থাকল না তার – প্রতিকারহীন এই মনোবেদনাকে ধারণ করেই স্থানান্তরে নির্জনবাসের সিদ্ধান্ত নিল সে। কিন্তু, সম্পাদকের চাকরি নিয়ে মৈশুরে স্বেচ্ছাপলায়নের প্রাক্মুহূর্তেই অলঙ্ঘনীয় নিয়তির মতোই সামনে এসে দাঁড়াল অন্যাসক্তা চারুলতা, নিঃসঙ্গ এই নারী সঙ্গী হতে চাইল অনন্যসহায় ভূপতির। ভূপতির হৃদয়চেরা উত্তরহীন-অন্তহীন-লক্ষ্যহীন জিজ্ঞাসা প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে তার কাছেই, তার নিরুপায় বিপন্নতাকে মূর্ত করে তুলতে :
‘ভূপতি বুঝিল, অমলের বিচ্ছেদস্মৃতি যে বাড়িকে বেষ্টন করিয়া জ্বলিতেছে, চারু দাবানলগ্রস্ত হরিণীর মতো সে বাড়ি পরিত্যাগ করিয়া পালাইতে চায়।’ – ‘কিন্তু, আমার কথা সে একবার ভাবিয়া দেখিল না? আমি কোথায় পালাইব। যে স্ত্রী হৃদয়ের মধ্যে নিয়ত অন্যকে ধ্যান করিতেছে, বিদেশে গিয়াও তাহাকে ভুলিতে সময় পাইব না? নির্জন বন্ধুহীন প্রবাসে প্রত্যহ তাহাকে সঙ্গদান করিতে হইবে? সমস্ত দিন পরিশ্রম করিয়া সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফিরিব তখন নিস্তব্ধ শোকপরায়ণা নারীকে লইয়া সেই সন্ধ্যা কী ভয়ানক হইয়া উঠিবে। যাহার অন্তরের মধ্যে মৃতভার, তাহাকে বক্ষের কাছে ধরিয়া রাখা, সে আমি কতদিন পারিব। আরও কত বৎসর প্রত্যহ আমাকে এমনি করিয়া বাঁচিতে হইবে! যে আশ্রয় চূর্ণ হইয়া ভাঙিয়া গেছে তাহার ভাঙা ইঁটকাঠগুলা ফেলিয়া যাইতে পারিব না, কাঁধে করিয়া বেড়াইতে হইবে?’
গল্পের শেষে বিচ্ছিন্ন দূরন্বিত এই নরনারীর অনাহূত মিলন নয়, সত্য হয়েছে অনন্বয়ই। যদিও মৈশুরে যাওয়া-না-যাওয়া নিয়ে দুই পক্ষের অনিচ্ছাকৃত আপস-রফা ব্যর্থ হওয়ায় এই দুই নরনারীর অনন্বিত একাকিত্বময় জীবনের শূন্যতায় গল্পের যবনিকাপতন হয়েছে তবু এর প্রাক্লগ্নে ভূপতির উপরিদ্ধৃত আর্ত হাহাকার, প্রতিকারহীন সন্ধিৎসা, আমৃত্যু অনিঃশেষ দুর্বহ দণ্ডভোগের যে-মর্মভেদী হাহাকার প্রকাশিত হয়েছে – তাতে বিপন্ন ভূপতির এই মূর্তিটিই পাঠকহৃদয়কে আচ্ছন্ন করে চূড়ান্ত রসলোক প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন করে। প্রজ্ঞা বা ব্যক্তিত্ব, কোনোদিক দিয়েই অসামান্য নয় ভূপতি, কিন্তু তার বেদনার ব্যাপ্তিটুকু অসাধারণ, সহৃদয়হৃদয়সংবাদী। এই অর্থে ভূপতি বিশ শতকের সূচনালগ্নের প্রথম স্মরণীয় বিচ্ছিন্ন-নিঃসঙ্গ পুরুষ, হয়তো-বা নিরুপায় নায়কও।
সাতরমা বাইয়ের বক্তৃতার প্রতিক্রিয়ায় উনিশ শতকীয় রবীন্দ্রনাথ নারীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ফেমিনিজম তখনো বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা-অর্জনের পর্যায়ে উপনীত হয়নি বলে, রবীন্দ্র-প্রতিক্রিয়া ততোধিক সক্রিয় কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি। তবে রবীন্দ্রনাথ উনিশ শতকের উপান্তে এবং বিশ শতকের প্রারম্ভকাল থেকে স্পষ্টতই নারীর নবমূল্য-নিরূপণে আন্তরিক শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন। তাঁর উত্তরকালের সাহিত্য ফেমিনিস্টতুল্য না-হলেও, নারীর ব্যক্তিত্ব বিদ্রোহ ও মহিমা-প্রতিষ্ঠায় শিল্প-তৎপর থাকারই ইতিহাস। তবে বিরল ব্যতিক্রম গোরা এবং বিশেষ আদর্শবাহী প্রাতিস্বিক বালক ও কিশোর চরিত্রসমূহ ব্যতীত – পুরুষের চরিত্র-রূপায়ণে রবীন্দ্রনাথ পূর্বাপর সমালোচনামুখর, – বিদ্রুপ-ব্যঙ্গ-পরিহাসের শিল্পিত প্রহরণে তাঁর অধিকাংশ পুরুষ-চরিত্র আহত, আক্রান্ত। এই অর্থে কোনোভাবেই পুরুষের পক্ষাবল¤¦নকারীর কাতারে দাঁড় করানো যাবে না রবীন্দ্রনাথকে। তবু এই রবীন্দ্রনাথ গল্পগুচ্ছে (উত্তরকালে লেখা চতুরঙ্গের শ্রীবিলাসের কথা প্রসঙ্গত মনে পড়বে) রাইচরণ-দক্ষিণাচরণ-অদ্বৈতচরণ ও ভূপতি-চরিত্রের মাধ্যমে পুরুষের বেদনার জগৎকে শিল্পিত মমতায় রূপান্বিত করেছেন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.