আর সেবার বসন্তের মাঝামাঝিতেই সেই তীব্র গরমে আমের গুটিগুলো পুষ্ট হতে পারেনি তেমন। কতক ঝরে পড়েছিল কাজলা, বিনোদপুর, মেহেরচণ্ডি, শিরোইল আর বালিয়াপুকুরের ধুলোওড়া বালি-বালি মাটির উপরে, কতক গাছে গাছে ঝলসে গিয়েছিল। ঝলসে যাওয়া সেসব গুটি গাছের ডালেই দিব্যি কালো হয়ে কেমন বেগুনপোড়া রূপ নিয়ে লটকে ছিল। সে এমন গরম, সকাল বোঝা যেত না। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলত, রাজশাহীতে শুধু দুপুর আর রাত আছে, কোনো সকাল কিংবা বিকেল নেই। ভোরের আলো ধুলো-ধূসর আম, কাঁঠাল আর লিচুর প্রায় শুকিয়ে আসা পাতা ভেদ করে ঘরের কার্নিশ ছুঁতে না ছুঁতেই আর আলো থাকত না, তাতানো আগুন হয়ে যেত। হুড়োহুড়ি পড়ে যেত দরজা-জানালা বন্ধ করার। এটি যে শুধু সেবারই হয়েছিল রাজশাহীতে, বিষয়টি নিশ্চয়ই এমন না, তবে সেবারের তীব্রতা আর বছরগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল বোধকরি। মাছ মরে মরে ভেসে উঠেছিল পুকুরে-নদীতে। অনেক মাছের গায়ে ঘা। দুপুরে নেহাত জরুরি কাজ ছাড়া কেই-বা বের হতে চায়? রিকশাওয়ালাদের মুখে গামছা আর সাইকেল আরোহীদের সাদা কাপড়ে বাঁধা মুখ দেখে সৌদি আরবিয়দের পোশাক-ডিজাইনের অনন্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকে না। দুপুরে, খাঁখাঁ দুপুরে, মাঝে মাঝে মিউনিসিপ্যালিটির বৈদ্যুতিক তারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাকদের অলস কা-কা ডাকা দুপুরে, মিউনিসিপ্যালিটির শানবাঁধানো পুকুরে ঘামাচি-ওঠা কালো কুচকুচে গায়ে সাদা খড়খড়ি-ওঠা শিশুদের জলের মধ্যে হল্লা করা দুপুরে, এসব কালো কালো হাড় জিরজিরে শিশুদের মায়েদের বড় ব্যস্ততা। গরম বাড়ার সাথে সাথে ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ার অনিবার্য সম্পর্ক কলস কাঁখে এদের দাঁড় করায় রাস্তার পাশের কলতলায়। ইলেকট্রিসিটি নেই তো রিজার্ভ ট্যাঙ্ক থেকে জল তোলার ব্যবস্থা নেই। জল তুলে দিতে হয় কাজের বাড়ির তিনতলা, দোতলা কখনো-বা চারতলায়। এ-এক জ্বালা, ‘শালার মামুগের বউ-বিটিগুলান সব আইলসে হয়্যা গিলচে’, মামানিদের হাঁড়ির খবর এই জল তোলার ফাঁকে ফাঁকে তলায়-তলায়, এবাড়ি-ওবাড়ি দ্রুতই পৌঁছে যায়।
এহেন দুপুরেও নাহারকে বের হতে হয়েছে, তিন্নিদের বাড়ি পাহারা দিতে হবে রাত আটটা
পর্যন্ত। খালাম্মার উৎকণ্ঠা মেশানো অনুরোধ না হলে নাকি ঘরের জানালা-দরজাসুদ্ধ চুরি হয়ে যাবে নতুনবুয়ার কল্যাণে। দিন তিনেক আগে বুয়াকে দুই টুকরা মাছের পোটলাসহ হাতে-নাতে ধরা হয়েছে; কিন্তু সময় খারাপ, তিন্নি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, আর চোর হলেও বুয়ার কাজ নাকি ভালো, কাজেই উপযুক্ত আরেকজন না পেয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া এই দুঃসময়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। খালাম্মা সতর্ক করে দিয়েছেন, বুয়া যদিও বেশি কথা বলে না, কিন্তু কয়েকদিন ধরে তার আচরণ সন্দেহজনক, প্রায়ই আপনমনে কথা বলে, এমনকি ‘সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল’ গানও করে যখন তখন। খালাম্মার পরামর্শ, ‘বেতাল দেখলে কইষা ধমক দেবা বিটিরে আর মোটে চোখের আড়াল করবা না।’ রিকশা শিরোইল পার হয়ে বালিয়াপুকুরের দিকে ঘুরতে গিয়ে ব্রেক কষে দাঁড়ায় ঢোপকলের সামনের জটলায়, সারি সারি কলস-বালতি-গামলা আর কোলাহল। শুভ্র বলে, এই ঢোপকলগুলো দেখলে তার মন খারাপ হয়ে যায়, মনে হয় কলগুলো খুললেই অতীত থেকে মানুষ বেরিয়ে আসবে অথবা তারা আসে, কাজ-টাজ শেষ করে আবার ঢোপকলে ঢুকে যায় চুপিচুপি। কী যে সব কথা! সত্যি নাহারও কিন্তু কোনোদিন এই ঢোপকল থেকে কাউকে জল নিতে দেখেনি, কলস বালতিই দেখেছে আশেপাশে। বলতে গেলে আজই প্রথম কলস-বালতি-গামলার পাশাপাশি উৎকণ্ঠিত মহিলাদের প্রবল উপস্থিতি চোখে পড়ে নাহারের। অন্তত জনাদশেক মহিলা জড়ো হয়েছে জল নেওয়ার জন্য, কার আগে কে কলস-বালতি এগিয়ে দেবে এ-নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতা, এই প্রতিযোগিতায় কোনো পুরুষ নেই তবে হাড়গিলে চেহারার এক পুরুষ আগায় দুটি পাতাসহ হাতখানেক লম্বা এক বাঁশের কঞ্চি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিচালনা করছে গোটা জল-নেওয়া মহাকর্ম, ‘কামালের মা, ঠ্যাসা হয়্যা খাড়া আছ ক্যান, সরাও, বালতি সরাও ব্যুলছি…।’
বুয়া আর নাহার একসাথেই ঘরে ঢোকে, বুয়া দরজায় অপেক্ষা করছিল। ঘরে ঢুকেই, নাহার লক্ষ করে, বেশ পরিপাটি করে বুয়া দুটি গামলায় জল নেয়, বটিটি সুন্দর করে ধুয়ে একটি ছালা কয়েক ভাঁজ করে তার উপর বসে নিবিষ্টমনে একটি চিচিঙ্গা তুলে নেয় শব্জির ঝুড়ি থেকে। দেখে দুর্ধর্ষ চোর বলে মানা শক্ত, কিন্তু চোখে চোখেই যখন রাখতে হবে অন্তত নামটি তো জানা যাক, নাহার ভাবে, বুয়া ডাকটি আদরের অথচ ব্যবহারের ফেরে মনে হয় যেন এক আলাদা জীব!
– আমার নাম? অচ্চণা…(জিভ কেটে) হীরা বেগম। ক্যান যে আজ-কাইল এতো ভুল হয়!
ভুল শুধরে নেবার তাগিদেই কিনা ফ্যাকাশে মুখে হীরা বেগম কোমর অবধি তার পিঠ-ছাওয়া কালো ভেজা চুল দ্রুত ঢেকে নেয় শাড়ির আঁচলে। লিকলিকে সাদা দুই হাতে দুই দুই চার গাছা বিবর্ণ প্লাস্টিকের চুড়ি শব্দহীন দুলতে থাকে চিচিঙ্গার ত্বক-ছাড়ানোর নিপুণতায়। লিকলিকে হাত-পা, কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে আসা বড় বড় চোখের গালভাঙা হীরা বেগমের চুল বিস¥য়কর, আঁচলের নিচ দিয়ে চুলের আগা প্রায় মাটি ছুঁই-ছুঁই। যেন-বা চুলের স্বাস্থ্য অটুট রাখতেই স্বাস্থ্যহীন হয়েছে গোটা অবয়ব।
– আমি হিন্দু ছেলাম তো, ফিসফিসিয়ে বলে হীরা বেগম, আমার আগের নাম ছেল অচ্চণা।
কী বলা উচিত এ-ধরনের পরিস্থিতিতে বুঝে উঠতে না পারার জন্যেই হোক কিংবা আদৌ এ-কথার কোনো তাৎপর্য আছে কিনা সে-মীমাংসায় পৌঁছাতে না-পারার জন্যই হোক, নাহার চুপ। চিচিঙ্গার ত্বক-ছাড়ানো শেষ হলে হীরা বেগম মনোযোগী হয় চিচিঙ্গা কুঁচানোতে। মাথার উপর ফ্যানের ক্রমাগত ঘ্যাঁচোর-ঘ্যাঁচোর-ঘ্যাঁচ, ঘ্যাঁচোর-ঘ্যাঁচোর-ঘ্যাঁচ শব্দ বিদ্যুতের অবস্থিতি জানান দিচ্ছে, এই কতো বাতাস দিতে হবে, এমন দিব্যি তো কেউ দেয়নি, নাহার বেশ আমোদ বোধ করে, গরমে কেমন ঘুম ঘুম অবশ অবশ লাগে।
– সাতপাড়, জলির পাড়, বেন্নাবাড়ির নাম শোনছেন? জলির পাড়ে যে গিজজা, তারই কোলের ’পার ছেল আমাগো বাড়ি। নোমোগো বাড়ি সব। বিলের ’পার বিল, বষ্যাকালে চান্দার বিল, বাইগঘার বিল হইত সমুদ্দর, তয় ঠাউম্মার কাছে শুনছি, সমুদ্দরে নাইল নাই, কচুরি নাই, কচুরি ফুল নাই। আমাগো বিলগুলানে যে কতো পদের নাইল ছেল, তা গুইনা সারা যাইত না। সাদা নাইল, বেগুনি নাইল, হইলদা নাইল, সাদা-বেগুনি-হইলদা ছিটা দেওয়া নাইল, তা বাদে নাল নাইল, নিলা নিলা নাইল, পেউচা নাইল, সন্ধি নাইল, সারা বিল নাইলে নাইলে পুন্নিমা হইয়া থাকত। নাইল খাইছেন তো খালা? খাইছেন খাইছেন, হাপলা কইলেই চেনবেন নে। আষার-ছেরাবন মাসে পেট মোটা মোটা সব পুঠি মাছ, কালা কালা চোক, পুঠি মাছ দিয়া মা নাইল রান্ধত কাঁচা নংকা আর এট্টু রান্ধুনী সোমবার দিয়া – কী তার স্বাদ!
হীরা বেগমের চোখ চকচক করে – নাইলের সৌন্দর্যে নাকি নাইলের স্বাদে, বোঝা মুশকিল, হতে পারে দুকারণেই। নাহারের ঝটিতি মনে পড়ে একটি বিজ্ঞাপনের শ্লোগান, জীবন বাঁচাতে, জীবন সাজাতে স্কয়ার। স্কয়ার কী? আশ্চর্য, কেন মনে পড়ল এই বিজ্ঞাপন? ‘বাতাসের চেয়ে দ্রুতগামী কে?’, ধর্মের এই প্রশ্নের উত্তরে যুধিষ্ঠিরের জবাব, যদি ‘মন’ না হতো তাহলেও কি সবাই জানত বাতাসের চেয়ে দ্রুতগামী আসলে মানুষের মন? ধ্যাত, কী সব চিন্তা! গরমে ধরেছে নির্ঘাত। ভালো কথা, সন্ধ্যাকে মহাভারতটা ফেরত দিতে হবে।
– আমার কুট্টি বুন্ডি নক্ষি? মা পাতে নাইলের তরকারি দেলেই কইত, ‘আরেট্টু দ্যাও’, মা হাতা দিয়া ওর পাতে দেতে দেতে কইত, ‘আরেট্টু আরেট্টু কইরো না, আমার তো সবার পাতেই ইট্টু ইট্টু দেওয়া নাগবে, নাকি!’ মার কী দোষ! আমরা তিন বুন, তিন ভাই। বাবার এট্টা ছোট্ট দোহান, দাদারা স্কুলে যাইত, আমিও যাইতাম। আমার দিদি সরস্বতির বিয়া হইছেল এক দোজবরের সাথে, বেটা ভারি বদ ছেল, খালি মারত দিদিরে। দিদির সতিন, সতিনের বড় মাইয়া অমলা পেরায় দিদিরই বয়াসী, সবাই দিদিরে ভারি কষ্ট দেছে, খাইতে দেত না ঠিক সোমায়মতো, খালি কাম করাইত। বেশি মাইর খাইলে দিদি তার দুই মাইয়া নইয়া আমাগো বাড়ি আইসা হত্তা দিয়া পড়ত, তাগো সব খরচ দেত কেরা? বাবাই তো। দিদিরও কোপাল, দিদির বড় মাইয়া সরোজিনীর পর যে গরভো হইছেল সেইডা ছোয়াল ছেল। কিন্তু পেরায় ভরা পেটে কাটি কাটি হাত-পা নইয়া দিদি ঘরের ডোয়া নেপার সময় মাথা ঘুইরা ফিট পড়ল উঠোনে, রোক্ত কী বাবা! বাবা আর বড়দ্দা খবর পাইয়াই নইয়া গেল জলির পাড় মিশনের হাসপাতালে, দিদি বাঁচল কিন্তু ওর পেটের ছোয়ালডা মইরা গেছেল। দিদির কী কান্দা, দিদির চাইয়াও বেশি কান্দছেল মা। তো যা কচ্ছিলাম, সেই দুই মাইয়া নইয়া দিদি পেরায় সোমায়ই আমাগো বাড়িতে থাহে তহন। মানুষ কয়জন হয় তা হইলে? তিন আর তিন ছয়, মা-বাবা দুইজন আটজন আর দুই বুনঝি দশজন। দশ মুখ ছাই দিয়া ভরাও তো কঠিন মার পোক্ষে। আমি মারে দোষ দেতে পারব না। আমার সেই ছোট্ট বুন্ডি নক্ষি কলো মরছে বিলে নাইল তোলতে যাইয়াই। সে খুব দুক্ষের খালা –
পুরো এক গামলা চিচিঙ্গা কাটা শেষ করে সরিষার তেল হাতে মাখে হীরা বেগম কলার থোর কাটার প্রস্তুতি নেবার জন্য।
– হইছে কী, নক্ষি গেইছে নাইল তোলতে, বিলের ধার ঘেঁইষা হেলেঞ্চা শাক, মালঞ্চ শাক, কমলি শাক, কুট্টি মানুষ কাদায় পা হড়কাইয়া দামের ভেতার পইড়া গেছে… তা অসুবিধা ছেল না, ও সাঁতার জানত আর আমরা জলে কত ছোঁয়াছুঁয়ি, পলাপলি খেলছি! কিন্তু, আমাগো মাইজা জেঠার ছোট ছোয়াল নেতাইদা? সিনি তহন কোচ দিয়া মাছ ধরতিছেল, নক্ষি দামের ভেতার পড়ছে যে দেহে নাই, কুট্টি এট্টু দেহ তো। তয় নেতাইদার হুঁশও এট্টু কোমই ছেল। নেতাইদা যহন কোচ মারতিছে নক্ষি তহন মুখ উঁচা কইরা দাম দিয়া ওঠতে নেছে, কোচ গিয়া পড়ছে ওর কচি মুহে, রোক্তে নাল হইয়া গেছেল সব জল… সাত বচ্ছরের বুন্ডি আমার দ্যাড় দিন এক রাইত তামাইত কষ্ট পাইছে, পরের রাইতে সোম্ভাব একটু চেতন আইছেল, শেষ চেতন, কয়, ‘মা, তোমার রান্ধা নাইলের চাইয়াও কলো বেশি স্বাদ নাইলের ঢ্যাপে।’ খালা, বেশ খানিকটা সময় নিয়ে আস্তে আস্তে বলে হীরা বেগম, নক্ষির খরচেও নাইল রান্ধা হইছেল, নোমোরা তো আর রুই মাছ দেতে পারে না খরচে, নাইল, কচুর ঘোন্ট এইসব দিয়াই পদ বাড়াইতে হয় –
মমতায় ভরে ওঠে হীরা বেগমের প্রতিটা শব্দ, আলাদা আলাদা শব্দগুলো যেন একাকার হয়ে নামহারা এক ভরা বিলের পাশে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ঘুরতে থাকে, আর গরমে পোড়া রুক্ষ বালিয়া পুকুরের এক চারতলা ফ্ল্যাটের নিচতলা যেন-বা এক ছলছলে কালচে সবুজ বিল, এতোদিন পরেও।
– তবুও কলো আমরা গেরস্তই ছেলাম পোড়াপুড়ির বছর তামাইত। আমাগো গ্রামের কয়েক নোমো ঘর খিস্টান হইতে শুরু করলেও আমাগো তেতো কষ্ট ছেল না। আমার বড়দ্দাও তেতদিনে স্কুলের ফাহে ফাহে বাবার সাথে দোহানে বসে। তয় পোড়াপুড়ির বোচ্ছরডা যদি না আসত!
বড়, খুব বড় একটি দীর্ঘশ্ব^াস ছাড়ে হীরা বেগম। ফ্যানের ঘ্যাঁচোর-ঘ্যাঁচোর-ঘ্যাঁচ শব্দ সে-দীর্ঘশ্ব^াসকে দীর্ঘতর করে তোলে।
– মেলেটারিগো মেলা আকোরোশ ছেল আমাগো এলাকার ওপর, সব তো নোমোগো গেরাম। মুজিবরের বাড়িও তো আমাগো ওইদিহে, কোটালি পাড়া, বেশি দূরে না। দিনে দুইবার মিছিল হয়, ‘ভুট্টার গুদে নাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ আমার বয়স তহন, মিথ্যা কবো না, প্রায় বারো বচ্ছর, তিন-চাইরবার রক্ত হইয়া গেছে। সবাই পলাচ্ছে সেই সোমায়, সারা রাইত চিড়া কোটে আর অন্ধকার থাকতি থাকতি সেই চিড়ার পোঁটলা নইয়া গেরাম ছাড়ে বডার পাছ করবার নাইগা। বাবার কোনো উজ্জাগ নাই, মাও চিড়া কোটতে চায়, বাবা কয়, ‘থামো দেহি, কোথায় যাবো?’ তো যেদিন ফুলবাড়ি, কদমবাড়ি আগুন দেলো, সেইদিন সবাই পাটক্ষেতে গলা তামাইত জলে সোমস্তদিন ডুইবা থাকলাম আর পরদিন বেহানে আমরাও মেলা করলাম। না সাথে কোনো চিড়া, না কোনো গুড়, এহাবারে খালি হাতে শুধু আমরা কয়ডা প্রাণী। রওনা করার আগে আরেক খ্যাঁচ বাঁধল – মাইজাদ্দারে আর পাওয়া যায় না, খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ… কিন্তু পাবো ক্যাম্বায়? মাইজাদ্দা তহন নাইনে পড়ে। সে তো মাঝ রাইতেই জয় বাংলায় যোগ দেতে হাইডা গেছে বেন্নাবাড়ি, কলিগ্রাম, সাতপাড় আর আমাগো গেরামে একযোগাইলা যারা ছেল তাগো সাতে। সে যে কী দিন গেছে খালা, খয়রামারি ক্যাম্পে মা মাইজাদ্দা আর বুন্ডি নক্ষির কথা মনে কইরা কান্দতে কান্দতে কেমন ঝিম মাইরা বইসা থাকত সোমস্তদিন, আর রাইতের কালে পা চাবানিতে চেঁচাইত। আরাক সোমস্যা ছেল রিলিফের ছাতু মোটে খাইতে চাইত না মা। তহন আমরা মাছ-ভাত পাবো কোহানে? ক্যাম্বায় ক্যাম্বায় মোনে নাই এট্টা শলক শেকছেলাম, মানে ওইপারের নোকজন কইত, ‘জয় বাংলার নোক/ গোল্লা গোল্লা চোক/ ভাতের বেলায় যেমন তেমন মাছের বেলায় নোভ’। কথা খাঁটি খালা, মারে দোষ দিয়া কী হবে, ছাতু খাইতে খাইতে মুহে চরা পইরা গেছেল। মাছ তো দূরের কথা, এট্টু ভাতের নাইগা পরানডা খটখটাইত। তা স্বাধীনের তিন-চাইরদিন আগে মা আর চেঁচালো না এক রাইতে, পরদিন বেহানবেলা বড়দ্দা শলায় আগুন ধরাইয়া মার মুহে এট্টু ধরল আর ক্যাম্পের নোকজোন চাটাইয়ে মুড়াইয়া মারে নইয়া গেল কারেন্টের শোশানে।
কলার সাদা থোর কুঁচি কুঁচি করে হীরা বেগম গামলার জলে ফেলছে আর সে-জল কালো কুচকুচে হয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। জলের চেয়েও কালো হয়ে উঠছে তার হাত, সরিষার তেল বুঝি আসলে ততটা কাজের না। যাক, রক্তশূন্যতায় ভোগা তিন্নির জন্য এ-থোর ভালোই উপকারে আসবে মনে হচ্ছে, ভাবে নাহার, কিছু একটা ভাবার জন্যই বোধকরি। হীরা বেগমের গল্পে মজে যাচ্ছে কি?
– দেশে ফিরা আমরা খালি পোড়া মাটিটুকই পাইলাম খালা, দোকান-ঘর-বাড়ি কিচ্ছুই নাই। বাবা আর বড়দ্দা গেল ভ্যান টানতে, ছোটদ্দা গেল জোন খাটার কামে। মাইজাদ্দার খোঁজ কেঊ ঠিকমতো দেতে পারল না। আমলিগের সোলতান কাহা কইল স্বাধীনের মাস দুই আগে শেষ তারে দেখছে কুমার নদী পার হইতে ছেকান্দার কমান্ডার সমেত আরো কয়জোনের সাতে, খুব কাবু দেহাচ্ছেল। আর ধীরেনদা, খিতিশদা, চিত্তদা, মিণালকা মানে একযোগাইলা যারা জয় বাংলায় গেছাল তাগো মধ্যি যারা ফেরতে পারছে, ওনরা সবাই কইল স্বাধীনের তিন-চাইরদিন আগে সোমাদ্দার বিরিজের সামনাসামনি নরাইয়ে মরছে মাইজাদ্দা, কিন্তু তার দেহের কী হইছে সঠিক জানে না। বাবা কয়দিন নামে নামে খুঁইজা ছাড়ান দেল, খালি এট্টা ছোট্ট কাগজের জয় বাংলার পোতাকা গুঁইজা থোলো আমাগো নতুন তোলা ঘরের পাটকাঠির বেড়ায়। বাবা তহনো বুড়া হইছেল না, তেবুও ভ্যান টানার কামে সবাই বড়দ্দারে চায়, বাবারে না। বাবার আয় কোমতেই থাকল, আর বচ্ছর ঘোনাইতেই বড়দ্দা মাঝি বাড়ির এক গাউছা পেত্নি আশালতারে বিয়া কইরা ঘরে তোলল – তা সোংসার আনন্দময়, যার মোনে যা নয়।
– কী কবো, ভাই-বৌয়ের অভাবের সোংসারে মা-খাকি আবিয়াইতা নোনোদ আমি, শতাক দোষ আমার… টেকতে পারলাম না, সে-ম্যালা কথা। একদিন অসহ্য নাগায় পলাইয়া গিয়া ওঠলাম গোপালগঞ্জে, সুধীর বাবুর যাত্রাদলে। আমাগো ওইদিহে গেরামের ’পার গেরাম নোমো মাইয়ারা তহন যাত্রাদলে নাম লেহাতিছে অভাবে। বয়াস আমার তেরো পারাইছে তেতদিনে, কিন্তু হইলে কী হবে, বুক-মুক কিচ্ছু আমার তেমন ওঠছেল না। তা কাজ পাইলাম কিন্তু যাত্রাপালায় না, জায়গা হইল নাচনার দলে। যাত্রাপালা শুরু হওয়ার আগে, তা বাদে ছিনের ভেতার ভেতার নাচ হইত। ভারি সুন্দার সুন্দার গানের সাথে নাচ শিহোয়ছেল। পূর্ব দিগন্তে, সূর্য উঠেছে রোক্ত নাল, রোক্ত নাল, রোক্ত নাল, আর একটা গান ছেল, মোরা একটি ফুলরে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি – আরো অনেক গান ছেল, তয় এই দুইডাই বেশি ভালো ঠ্যাকতাম। দ্যাহেন খালা দ্যাহেন এহনো আমার নোমা খাড়া হইয়া ওঠে, দ্যাহেন আমার হাত। বোঝছেন খালা, নাল পাইড়া সবুজ শাড়ি আর পন্চ নাগাইনা নাল ব্লাউজ পইরা, সাজনা-কাজনা নিয়া যহন নাচতাম কী যে ভালো ঠ্যাকত! নাচের মাস্টার হীরালাল বাবু শিহোয়ছেলেন যহন তিনবার রোক্ত নাল, রোক্ত নাল, রোক্ত নাল গাওয়া হবে, এইটারে কয় তেহাই। তেহাইয়ের সোমায় শাড়ির আঁচল উঁচা কইরা পোতাকার মোতো দোলাইতে হবে। আমরা বারোজন মাইয়া তাই করতাম, ওডেনচ্ হাততালি দেত আর আমার নিজেরে মোনে হইত রানি আর মোরা একটি ফুলরে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি তেহাইয়ের সোমায় মাঝেমধ্যি দেকতাম, এহাবারে পরিষ্কার দেকতাম খালা মিথ্যা না, বুঝি মাইজাদ্দার হাতে নাডাই আর আমার হাতে গুরি, নাল আর সবুজ রোঙের। গান হইত ফুল বাঁচাইনার আর আমি দেকতাম অগঘরান-পৌষ মাসে ধান কাটা হইয়া গেলে যে খালি ভুঁই য্যান্ সেইহানে আমরা দুই ভাই-বুন। মাইজাদ্দা কচ্ছে, ‘আরেট্টু যা বুন্ডি, হইল না আরেট্টু যা, বুন্ডি আমার ভা-লো, এইবার র্ধ মাথার উপার, আরেট্টু উঁচা কর, এইবার ছাড়, ছাড়’, ‘দেখ দেখ আমাগো জয় বাংলার পোতাকা কত উপারে ওঠছে, সবা-ই-র উপারে জয় বাংলার পোতাকা’।
কাটলেন তো হাত! আর গল্পের দরকার নাই, কাজ করেন।
এইটুক কাটায় কিছু হয় না খালা, আমাগো জয় বাংলার সুতায় মাঞ্জা দেতাম ক্যাম্বায় জানেন? আটা জ্বাল দিয়া আঠা বানাইতাম, ফের কাচ বাইটা মিহি কইরা সেই গুঁড়া মিশাইতাম ওই আঠার সাতে, সেইয়া দিয়া সুতায় মাঞ্জা দেওয়ার সোমায় কতবার হাত কাটছে, হাত কাটার সেই শুরু, তয় সেইডা ছেল সুহের হাত কাটা…
ট্যাপের নিচে আঙুল পেতে হীরা বেগম বাঁ-হাত বাড়ায় রান্নাঘরের নোংরা ন্যাকড়ার দিকে।
আরে করেন কী, পাগল নাকি! দাঁড়ান, দাঁড়ান।
নাহার ছোটে ডেটলের খোঁজে, পেয়েও যায় তিন্নির বাথরুমে।
খালা কি মুনসুর মেয়া নি হি! হি হি, রোক্ত নাল, রোক্ত নাল, রোক্ত নাল, কেমন নাল দ্যাহেন –
হীরা বেগম হাসিতে কুটি কুটি, বাঁ-হাত দিয়ে খানিকটা বাটা হলুদ রাখে নোংরা ন্যাকড়াটার উপরে আর চোখের পলকে সেটা জড়িয়ে ফেলে ডান হাতের কাটা তর্জনিতে, চমৎকার একটি গিঁটও দিয়ে ফেলে।
রাগ হইয়েন না খালা…
স্টোভ ধরাতে ধরাতে আবারও হাসে হীরা বেগম।
এত হাসির কী হলো? স্পষ্ট বিরক্তি নাহারের গলায়।
মুনসুর মেয়ার কথা মনে হইল, হি হি… হইছে কী, যাত্রাদলে পাট না দেলেও খাওয়া দেত ভালো, মিথ্যা কবো না। আট-নোয় মাস না হইতেই শোরীর যেন ফাইটা পড়তে নাগল, দুফারবেলায় তো সুধীর কাহার পা টেপতামই, মাঝে মধ্যে রাইতের কালেও ডাক পড়ে তহন হাত-পা টেপার কামে, শুধু হাত-পা-ই টেপতাম, কিন্তু মধুবালাদি মানে আমাগো পাটির নাইকা মোটে সহ্য করতে পারত না, আমারে সে তহন অশৈল্যি ঠেহে। আগে আমি তার চুলেও সিঁতি-পাটি কইরা দেতাম দুফারবেলায় মাঝে মধ্যে, কিন্তু এহন সে আমারে মোটে দেকতেই পারে না। দলের মেন নাইকা যদি আমাগো মোতন নাচনীগো খারাপ চোহে দেহে, তা হইলে তার কোনো জায়গা নাই দলে। সবাই খা-লি দোষ ধরে, এক মুনসুর মেয়া ছাড়া। মুনসুর মেয়া ভিনদেশি অবস্থাপন্ন ঘরের ছোয়াল, যাত্রা করার শখ দেইখা দলে নাম নেহাইছে কিন্তু সেও পাট পায় না। সুধীর কা’ কয়, ‘মুনসুর, যাত্রাপালা সবাইর জন্যি না, ঘরের ছেলে ঘরে যাও।’ মাঝে মধ্যে কয়, ‘তোমার মোতলবটা কী, কওতো মুনসুর মিয়া?’ কিন্তু সে-কথা কেউ কানে নইলে তো! আমারে মাঝে মধ্যি এডা-ওডা কিনা দেয় গোপনে। এরি ভেতার একদিন ক্যাম্বায় ক্যাম্বায় মোনে নাই খবর পাইলাম বাবার অসুক। সুধীর কা’রে ধইরা তিন দিনের ছুটি নেলাম আর নেলাম কুড়ি টেকা। মধুমতি নদীতে তহনো লন্চ চলে, দুই হালি কোমলা কিনা বাড়ি গেলাম। গ্রামের বউ-ঝি সবাই ঝাঁকাইয়া আইলো, কত কী যে বাত্তা নইলো, কেউ কেউ গান গাইতে ক’লো, যেন-বা আমি এক আজাব জীব, অচ্চণা না । বাবারে এট্টু খুশিই মনে হইল খালা, কিন্তু এট্টা জিনিস লোক্ষ করলাম, বাবা কলো আমার নেয়া কোমলা খাইল না। তা আমি তেতো এট্টা আমল দেলাম না। আশালতার তহন গরভো, এহন-তহন অবস্থা, বেশি এট্টা কথাবার্তা ক’লো না, কিন্তু দোক্ষ-যগ্য শুরু হইল দুফারশেষে বড়দ্দা ভাত খাওয়ার নাইগা বাসায় ফেরলে। বড়দ্দার সাফ কথা, ‘বুন হও আর যেই হও, কোনো যাত্রাদলের মাগীর গেরস্তঘরে জায়গা হবে না।’ কান্দাকাটি, মান-অভিমেন মেলাই হইল কিন্তু চইলা আমার আসাই নাগল, পেছন পেছন কতদূর তামাইত আসলো সুচিত্রা, কল্পনা, চোঞ্চলা, কোমলা… মাটি ছাইড়া আসা যে কী কষ্ট খালা… আমার সই কল্পনা আর চোঞ্চলা খুব কান্দছেল, আমি কান্দি নাই…
চোখ ছলছল হয়ে ওঠে হীরা বেগমের। কোনো কথা খুঁজে পায় না নাহার, বরং হীরা বেগম কেমন কাটা হাত নিয়েই কলার থোর কুঁচিয়ে চলে অবিরাম তাই অশেষ কৌতূহলে লক্ষ করে।
– ফিরা আসলাম দলে সেই রাইতেই, কেউ খুশি হইছে মোনে হইল না। খালি মুনসুর মেয়া পরদিন বিহালে দুইডা বিলাতি গাব নইয়া আইসা দেল আমারে গোপনে। দুইদিন বাদে দুফারবেলায় সুধীর কাহা ডাইকা পাঠাইল পা টেপতে। দলে তহন দেশোপ্রেমিক নবাব সেরাজ-উদ-দুলা পালার কাজ শুরু অবে। কাহা কইল, পরদিন আমি কেমন পড়তি পারি দেইখা আমারে পাট দেবে, মধুদি করবে আলেয়া আর আমারে দেবে সিরাজের বউয়ের পাট, যদি পড়তি পারি ঠিক মোতোন। আমার খুশি দেহে কেরা, চোহে জল আসলো, কাহার পায়ে সেবা দিয়া বাইরাইতেই মধুদি তার হাতে যে-সুপারি কাটার যাঁতি ছেল সেইডা ছুইরা মারল আমার মুহের পারা। ভাইগ্য ভালো, যাঁতি খালি কোপালের একপাশে এট্টু কাইটা বেঁধল গিয়া বাঁশের বেড়ায়, রোক্ত বেশি পড়ে নাই, কিন্তু ভয়ে পেরায় বেবোধ হইয়া গেছালাম। সেই সোমায় কোথা দিয়া জানি না মুনসুর মেয়া একমুঠ গান্দা ফুলির পাতা নইয়া আইসা হাতের তাউলায় ডইলারস বানাইয়া ধরল আমার কাটা কোপালে। কোপাল আমার কোপাল রে, কাটা কোপাল, হি হি আর সেইদিনই ভোর রাইতে মুনসুর মেয়ার হাত ধইরা যাত্রাদল ছাড়লাম। ও খালা, সৌষ্যার তেলের বোতলডা এট্টু দ্যান না, হাত-হোত আঠা আঠা হইয়া গেছে আবার… গরম কড়াইতে
শুকনা মরিচ আর কালিজিরার ফোঁড়ন দিতে দিতে বলে হীরা বেগম।
মুনসুর মেয়া আমারে নইয়া আসলো পরদিন নোগরবাড়ি, তা বেলা তহন প্রায় দেড়ডা-দুইডা তো হবেই। সারি সারি ভাতের দোহান নোগরবাড়ি ফেরিঘাটে। ঝাল ঝাল নাল ইলিশ মাছের ঝোল দিয়া ভাত খাওয়াইল পেটচুক্তি আর তা’ বাদে নিয়া গেল এক পীরের থানে। ওইহানেই আমার নতুন নাম হইল হীরা বেগম। একখান নাল মালা শাড়ি কেনল আর কেনল একটা বোরকা। সেই মালা শাড়ি পইরা আর বোরকা গায়ে দিয়া ভাদ্র মাসের পেচপেচা গরমে সেদ্ধ হইতে হইতে পেথ্থম রিকশা, পরে ভ্যান আর শেষে পায়ে মাইল দুয়েক হাইডা, দুই মাইলের এট্টু কোম-বেশিও হইতে পারে, গেরামে যহন ঢোকলাম তহন রাইত আটটার মোতো হবে সোম্ভাব। সে যে কী যাত্রাপালা খালা! তার আগের বউ সুফিয়া কান্দতে কান্দতে ফিট পড়ল, পরীর নাহাইল ফুটফুইটা দুইডা মাইয়া সোলেকা আর জোলেকা বোরকা সরাইয়া সরাইয়া আমারে নিরেকখন করতে নাগল পিদ্দুম উঁচা কইরা আর আমার শাউড়ি বিলেপ জোড়ল। সেই ফিট আর বিলেপের ভেতারেই পরদিন আমাগো দুতি বিয়া হইল। শরিক-শারাক সগগলডিই মাইনা নইলো মোনে হয়, আর আমার খুড় শাউড়ি? ভারি মায়া ছেল তার শরীলে। কয়দিনেই উনি আমারে নামাজ-কালাম সব শিহোয় দেল, পদ্দা শিহোতি থাকল আর সোলেকা-জোলেকার সাথেও ভাব হইল। কিন্তু সোমাস্যা হইল আমার সতিনরে নইয়া, সে খালি ফিট পড়ে আর আমার শাউড়িও আমার হাতের কিচ্ছু মুহে তোলে না, বিনবিনাইয়া কান্দে সোমস্তদিন, বাকি সোমায় কবে কেডা কী জানি বিড়বিড় করে। মুনসুর মেয়া পেরথম কয় রাইত আমার সতিনের বান্ধে থাকল, তার বাদে কী মোনে কইরা আমাগো দুইজনের সাথে এক বেছানায় শোয়া পাতল, ঘিন্না। তা সহ্য করলাম কিন্তু আমার সতিনের কান্দাকাটি, ফিট পড়া আর শাপ-মন্যি তো কোমে না বরং বাড়তেই নাগল।
নাহার সরিষার তেলের শিশির মুখ খুলে হীরা বেগমের সামনে ধরতেই হীরা বেগম আবার হাসিতে কুটোপাটি, খালার সাথে দেহি মুনসুর মেয়ার সত্যই মিল আছে, খালা কিছু হন না হি মুনসুর মেয়ার? হি হি… খালা রাগ হইয়েন না। মুনসুর মেয়াও আমারে ম্যালা খাতির করত তো… হি হি… হি হি… হি হি… খালা রাগ হইয়েন না… হি হি… হি হি…
– তো খালা, এরই ভেতার দুফারবেলা কইরা সোলেকা-জোলেকা আমার গলা ধইরা ঘুমায়, আমার বুন্ডি নক্ষিও এইভাবে গলাডা জড়াইয়া ঘুমাইত। একদিন গরমে আমরা তিনডা প্রাণী ঘুমাচ্ছেলাম দক্ষিণের বান্ধে, হঠাৎ কান্দা-কাটি, হুলুস্থুল… কী ব্যাপার, না আমার সতিন আবার ফিট পড়ছে সেইডা ঘোটনা না, ঘোটনা হইল এক কালা পানা পেট উঁচা বিটি কী জানি কোচ্ছে আর আমার শাউড়ি কোচ্ছে, ‘ব্যারা, ব্যারা আমার বাড়ি থ্যাকা’… তা সে কান্দা-কাটি, হৈচৈ তো আর থামেই না। পরে আমার খুড় শাউড়ির মাইয়া বিলকিছের কাছে শুনি ওই বিটির নাম রাবিয়া, মুনসুর মেয়া তারে নামে নামে বিয়া করছেল, পেটও বাঁধাইছে কিন্তু আমার শাউড়ি তারে খেদাইছে। হইছে কি আমার সতিন সুফিয়া? সে ছেল আমার শাউড়ির আপন বুনের মাইয়া। মুনসুর মিয়া তারেই পেথ্থম বিয়া করছে। কিন্তু ও বেটা বোছরে-দুই বোছরে কোথা দিয়া কোথা দিয়া নতুন নতুন মাইয়া নইয়া আসে, নিকা করে আর তা বাদে শাউড়ির বিলেপ আর আমার সতিনের ফিটের ব্যারাম যহন খুব বাড়ে তহন তাগো তালাক দিয়া খ্যাদায় দেয়। শুনছি এগো মধ্যি একজন লাইনেও নাম নেহাইছে, সত্যি-মিথ্যা কইতে পারব না। রাবিয়ারেও খ্যাদাইছে কিন্তু এর তো তহন পেট, আর আমার শাউড়ি বাঁইচা থাকতে সে এই বাড়িতে খালাস হইতে পারবে না বেবাকেই জানে। সোলেকা-জোলেকার মা এহন দিনে চাইর-পাঁচবার কইরা ফিট পড়ে, রোঙ হচ্ছে কেউ কিন্তু মুনসুর মেয়ারে কিচ্ছুই কয় না, সে নির্বেকার – খায়-দায় আর হলুদ-নীলা ডোরা কাটা নুঙ্গি পইরা হাইডা বেড়ায় গ্রামের মুড়া তামাইত ডাঙ্গর মাইয়াগো বুনি দেহার জন্যি। এইসব নানা ক্যাচালে মোনডা ভার হইয়া থাহে। নক্ষি বুন্ডির কথা মোনে পড়ে, মোনে পড়ে মার আগুনপোড়া মুক, বাবা, মাইজাদ্দা, দিদি, বড়দ্দার খাবড়াইনা মুকও মনে পড়ে, তয় সবচে’ বেশি পেট পোড়ে যাত্রাদলের নাইগাই, কইলে তো বিশ্বাস যাবেননানে। হ্যাজাক নাইটের তলে যে আর রোক্ত নাল নাচা হবে না, সেই কথা মোনে কইরাই কান্দি পেরায় দিন তহন। এইসব হোট্টগোলের ভেতারেই একদিন রাইতে মুনসুর মেয়া দুইডা শাড়ি আইনা দেল আমাগো দুই সতিনরে আর আমার সতিন পেচ্ছাপ করতে বাইরে গেলে কইল পরদিন আমারে ছিনামা দেহাইতে নিয়া যাবে টাউনে।
– আবার সেই নোগরবাড়ি, নাল নাল ঝোল মাইখা পেট ভইরা ভাত খাইয়া ছিনামা দেকতে গেলাম। এইবার ইলিশ মাছ না, খাইলাম পাবদা মাছ। ছবির নাম ছেল রোঙবাজ এহনো পস্ট মোনে আছে। কবরীরে কলো বোচা বোচা চোক-নাহে ভারি ছিরিমান দেহাইত। মোত্ত হইয়া ছিনেমা দেকতিছেলাম। ছবি শেষ হইল, কিন্তু মুনসুর মেয়ারে তো আর পাই্ না… পাই না, পাই না, পাই না… তো পাই-ই না… কোথাও পাইলাম না… ‘সে যে ক্যানো এলো না, কিচ্ছু ভালো লাগে না… এবার আসুক তারে আমি মজা দেহাবো…’ হি হি… হি হি… হি হি…
গানের পাশাপাশি হীরা বেগমের হাসি তীক্ষ্ম হতে থাকে, পাগল হয়ে যাবে নাকি?
– দিন যায়, কথা থাহে খালা…
কেমন যে মন খারাপ করা হীরা বেগমের গলা! হীরা বেগম কি তার মনসুর মিয়াকে তবে এখনো ভুলতে পারেনি?
– সে ম্যা-লা যাত্রা। খালা, জেবন কোন মুনসুর মেয়ার জন্যেই থাইমা থাহে না। ওই রাইতেই সখিবুর সাথে পোরিচয়। সখিবু হইল আমার আলামিনের বড় ফুপু, উনি ওই ছিনেমা হলেই আয়ার কাম করত। রাইতের শো শেষ হইলে বাসায় ফেরার সোমায় গেটের কাছে আমারে কান্দতে দেইখা দাঁড়াইল, আমার মুহের পারা চাইল খানিক কী বোঝল কেরা কবে তারপর দেল এক চড় গালে, কইলো, ‘নাঙ পাল্যাছে আর তুমি কান্দতিছ? চুপ মাগী! চড় দিয়া দাঁত সব ফ্যালা দেবো’। নইয়া গেল আমারে তার বাসায়, সখিবুর স্বামী ছেল না – মানে সখিবু বাঁজা ছেল তো, ওনার স্বামী ওনারে ফ্যালায় থুইয়া চইলা গেছেল ওনারই সইর সাথে। মুরগির যহন ছাও ফোটে, দ্যাখছেন কোন সোমায়? দ্যাখছেন মা মুরগি ক্যাম্বায় আগলায় রাহে তার ছাগুলান? আমারেও উনি আগলাইয়া রাখল কয়দিন সেইভাবে, তারপর কাম দেল সেই নোগরবাড়ি ফেরিঘাটেরই এক ভাতের দোহানে। তয় বেশিদিন কাম করি নাই সেহানে, সখিবুর মেয়াভাইর সাথে আমার ফের নিকা হইয়া গেল বোচ্ছর না ঘোনাইতেই। হইছে কী, ওনার আগের পোক্ষ মরছে তহন পেরায় দুই তিন বোচ্ছর। ভাত-জল আগাইয়া দেওয়ার জন্যিও তো একটা মাইয়ানোক দরকার তার তহন। সখিবু মাইয়া বিছরাচ্ছেল কিন্তু মিথ্যা কইলে পাপ হবে, উনি আমারে জোর করছেল না। আলামিনের আব্বার বয়স আমার চাইয়া তা এক কুড়ি বচ্ছর বেশি তো হবেই, ওনার আগের পোক্ষের এট্টা মোটে মাইয়া ছেলিনার বিয়া হইয়া গেছে তেতদিনে, কিন্তু মোত দেলাম নানা কথা ভাইবা। ভাতের দোহানে ম্যালা নোক পেছনে নাগছেল আর তার চাইয়াও বড় কথা ওই বদমাইশের নাইগা তহনো পেট পোড়ায়, পাগোল পাগোল ঠ্যাহে। ভাবলাম পুরুষ মাইনষের আবার বয়াস কী? আর রোঙের নাগরও তো দ্যাহা সাড়া। আলামিনের আব্বা আমারে বিয়া কইরা নাটোর নইয়া আসলো পেথ্থম, ওইহানে চিনির মিলের নেবার ছেল সেই সোমায়। উনি লোক ভালো, আমারে কোনোদিন কোনো মাইর-ধইর করা বা কষ্ট দেওয়া বা এট্টা কটু কথা কওয়া, তার বাদে ধরেন বাজাইরা মাইয়ানোকের কাছে যাওয়া এইসব কিচ্ছু কোনোদিন করে নাই। আমার আলামিন হইল, তার বাদে আলাদ্দিন। মিল দিয়া বাদ পড়ার আগে তামাইত আমাগো কোনো কষ্ট ছেল না। মিলের কাজ দিয়া বাদ পড়ার পর ম্যালাদিন ঘুইরা-ঘাইরা এই রাজশায়ি নইয়া আসলো, অভাব থাকলিও খালা তার স্বভাব-চরিত্তর নিয়া আমার কোনো বিবাদ নাই… আমি সুহেই আছি… হ সুহেই তো আছি…
একটা কথা জিজ্ঞাসা করি? এর মধ্যে আপনার বাবা-ভাই কারো সাথে যোগাযোগ হয় নাই?
ইশ, খালা যে কী কয়! হবে না ক্যান? আমার বাবা তো আমার সাথেই থাহে। অভাবের থাইকা বড় বেধি আর নাই খালা। আমার বড়দ্দার পর পর তিন মাইয়া আর ছোটদ্দা তো নিজের সোংসার চালাইতেই জেরবার, বষ্যাকালে বউ-ছোয়াল নইয়া মাঝে মধ্যেই উপাস দেতে হয়। বাবা অসুক-বিসুহে ঝাঁঝরা হইয়া পেরাই-ই আমাগো কাছে আইসা আচ্ছরোয় নইত। কাম কইরা খাওয়ার দশা তার নাই মেলাদিনই হইছে। দেশের বাড়ি ভিক্কা করতেও নজ্জা আর ভিক্কা পাওয়াও যাবে না, সবাই গরিব। কেরা কারে ভিক্কা দেয়? আলামিনের আব্বা কোনোদিন অযোত্ন তো করেই নাই বরং কইছে আমার আলামিন-আলাদ্দিনের একবেলা ভাত জোটলে তারও জোটপে। সত্যি কথা খালা, আমার যদি একসোন্ধ্যা আলুসেদ্ধ-ভাত জোটে তয় বাবা না খাইয়া থাকপে না। গত শীতে বাবা এহাবারে বেশি কাবু হইয়া আমাগো কাছে আইলে আলামিনের আব্বা কইল, তোমার আব্বা তোমার কাছে থাকপে তাতে তো কোনো অসুবিধা নাই, কিন্তু কিছু এট্টা এদিক-ওদিক হয়্যা গেলে ফ্যালাবে কেরা? আমাগো তো একটা সোমাজ আছে। ওনারে মোছলমান হইতে কও। খালা, অনেক ভাইবা দেখলাম কথা ঠিকই, যুক্তি আছে। এট্টা কথা খালা, আমার আলামিনের আব্বা ফালতু কথা কয় না, তার পেত্তেক কথার ওজন আছে, ল্যাহাপড়া বেশি না জানলেও গ্যান-বুদ্ধি রাহে।
– বাবা যেদিন মোছলমান হইল, সেইদিন বাবারে বাবা ম্যালা মানুষ আইছেল… বাবা তিনডা নুঙ্গি পাইছে, দুইডা নতুন জামা, দুইডা গেঞ্জি, এট্টা বদনা, এট্টা জায়নামাজ, এট্টা কোরান শরীফ, এট্টা ছাতি, নগদ দুইশো পোয়ষট্টি টেকা, তা’ বাদে ছুটকা-ছাটকা আরো ম্যালা জিনিস পাইছে। হারুন মেম্বার একলাই দুইশো টেকা দেছে। বাপ তো খালা আসলে সোন্তানের মোতোই, আমার আলামিন-আলাদ্দিনের সাথে মিশাইয়া বাবার নাম থুইছে সালাদ্দিন। বাবারে রোজ আলামিনের আব্বা বেহানবেলা বান্ধের উপার থুইয়া আসে ভিক্কা করতে, সাইঝের কালে আলামিন না হইলে আলাদ্দিন যাইয়া নইয়া আসে। মিথ্যা কবো না, বাবা মোছলমান হওয়ার পর কলো খালা আমরা ভালো আছি, আগের চাইয়া অনেক ভালো আছি। বাবা ভালো ভিক্কা পায়। তয় খালা, ধরা নিচু গলায় বলে হীরা বেগম, বাবার শরীলডা ভালো নাই, কিচ্ছু খাইতে পারে না, মুহে কোনো রুচি নাই। মোছলমানির ঘাও এহনো শুহোয়নি তো, সোম্ভব আরো বাড়তিছে পেত্যেকদিন, গায়ে সবসোমায় জ্বর থাহে, সবচাইয়া বড় হইল খাওয়ার রুচি মাত্রে নাই। মোনে হয় বেশিদিন বাঁচপে না। কাইল রাইতে আলু সেদ্ধ মাইখা দেছালাম সৌষ্যার ত্যাল আর শুকনা মরিচ পোড়াইয়া মুহে এট্টু রুচি যদি ফেরে, কিন্তু তাও খাইতে পারে নাই, আইজ বেহানেও কিচ্ছু মুহে না দিয়া আলামিনের আব্বার সাথে বান্ধে গেছে ভিক্কা করতে। আমি নেষাধ করছেলাম। আলামিনের আব্বা কইল, এহন নগদ নগদ পেত্থমদিহে যে ভিক্ষা পাবে, কয়দিন পর পুরান হইয়া গেলে আর তেত পাবে না। তা আলামিনের আব্বার খেয়াল আছে খুব, দেইখা-শুইনা রাখফেনে। খালা, আমারও গলা দিয়া কিচ্ছু নামতে চায় না, ক্যান যে পেট পোড়ায় খালা কইতে পারব না, ক্যামোন জানি ডাইন ডাইন ঠ্যাহে নিজেরে…
– কিন্তু আমার কী দোষ খালা? গলা চড়তে থাকে হীরা বেগমের, আপনিই কন? মাথার ওপর আল্লা আছে, আল্লার ইচ্ছা ছাড়া গাছের এট্টা পাতাও তো নড়ে না। নড়ে কন? আল্লা জানে আমি বাবার যোত্ন-আত্তির কোনো তুরটি করি না, আমার সোংসারে আমার আলামিন-আলাদ্দিনের যে যোত্ন, বাবারও সোমানই যোত্ন… কিন্তু আমি তো আর চুরি কইরা তারে নিত্যি মাছ-মাংস যোগাইতে পারব না…
হীরা বেগমের হঠাৎ উত্তেজিত গলা আস্তে আস্তে কান্নায় নিস্তেজ হতে থাকে –
– আমার আলামিন-আলাদ্দিনের যদি একসোন্ধ্যা ভাত জোটে, আমার বাবাও না খাইয়া থাকপে না, খালা আর কেউ না জানুক আল্লা জানে, আল্লা দ্যাহে, আল্লার চোকরে তো কেউ ফাহি দেতে পারে না…
– ও খালা, এতো গরম ক্যান? সেদ্ধ হইয়া গেলাম তো! এহনি এরম কুহুরের জেবভা বাইরাইনা গরম পড়লে বাঁচপো ক্যাম্বায়? অস্থিরভাবে ডুকরে ওঠে হীরা বেগম।
এডিনবরা, ২৩ আগস্ট ২০০৪

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.