বিশ শতকের বাঙালি বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চা, জ্ঞান-অন্বেষা ও ভাবুকতার সঙ্গে যেসব বাঙালি মনস্বী পুরুষের সমবায়ী উদ্যমের কথা স্মরণ করা যায়, আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩) তাঁদের অন্যতম। শিক্ষা, সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি আবুল ফজল সমাজবিকাশের ক্ষেত্রে পালন করেছেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। আপন পশ্চাদ্পদ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯২৬) এবং তাদের মুখপত্র শিখাগোষ্ঠীর (১৯২৭) সঙ্গে। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল – নিষেধের বিড়ম্বনা ও আদেশের নিগ্রহে পতিত বাঙালি মুসলমানদেরকে যুগধর্মের সঙ্গে যুক্ত করা। সেই অর্থে শিখার বুদ্ধিবৃত্তিক স্ফুরণকে বাঙালি মুসলমানের বিলম্বিত রেনেসাঁস বলা যায় কিনা, সেটি ভিন্ন বিষয়। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র স্থায়িত্বকাল একদশক (১৯২৬-১৯৩৬), এর মধ্যে শিখা প্রকাশিত হয় পরপর পাঁচ বছরে (১৯২৭-১৯৩১) পাঁচটি সংখ্যা। পঞ্চম সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন আবুল ফজল। শিখা পত্রিকার সূচিপত্র দেখলেই তৎকালীন বাঙালি মননের পরিচয় পাওয়া যায়। শিখাগোষ্ঠীর ভাবুকেরা ধর্মকে আলোচনার বিষয়বস্তু মনে করেছেন এবং ইসলামের ইতিহাস ও টেক্স্টসমূহ তাঁরা অনুপুঙ্খ তদন্ত করেছেন। ধর্ম-বিষয়ে তাদের গভীর ব্যুৎপত্তি দেখে সমকালীন গোঁড়া মুসলমানরা শুধু ভীত-সন্ত্রস্তই হয়নি, অবাকও হয়েছে। যুক্তিবাদী ধর্মীয় ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব দিয়ে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন ধর্মীয় উদারতার স্বাস্থ্যকর আবহাওয়া। আবুল ফজল সেই রেনেসাঁস-স্নাত অগ্রণী পুরুষদের একজন, যিনি গল্প, উপন্যাস, নাটক, দিনলিপি, স্মৃতিকথার পাশাপাশি লিখেছেন সমকালীন সমাজ, সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, মানবকল্যাণ ও মানবমুক্তি-বিষয়ে মননশীল প্রবন্ধ। আবুল ফজলের এসব প্রবন্ধ ধারাবাহিকভাবে পড়লে মনে হয় তিনি ক্রমশ এক যুক্তিবাদী চিন্তানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সমকালীন সংকটের সমাধান খুঁজেছেন শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব ও মুক্তবুদ্ধির বিবেকী উত্থান থেকে।
প্রবন্ধ-সাহিত্যে আবুল ফজলের মনীষার সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটেছে। বিচিত্র ও বহুরকম বিষয়-আশয় নিয়ে তিনি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। প্রথম জীবনে তিনি প্রধানত সমাজের অসংগতি, ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরে এগুলোর সমাধানের কথা ভেবেছেন একজন সংস্কারকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। মধ্যপর্যায়ে আবুল ফজল সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা-বিষয়ে অধিক চিন্তা করেছেন এবং এসব বিষয়ে মননশীল প্রবন্ধ লিখেছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি মানবমুক্তি ও মানবকল্যাণের কথা ভেবেছেন, লিখেছেন মানবতন্ত্রের মতো বিখ্যাত গ্রন্থ। মনোযোগের সঙ্গে তাঁর এসব রচনা পড়লে বোঝা যায়, আবুল ফজল তাঁর চিন্তার ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে বিবেককে প্রাধান্য দিয়েছেন, তর্ক-বিতর্ক করেছেন যুক্তির তীক্ষèধার শৃঙ্খলায়, মতাদর্শ ও বক্তব্যপ্রকাশে সৎ ও সাহসী ছিলেন, সর্বোপরি তাঁর অভিমতের মধ্যে একজন দূরদর্শী, প্রজ্ঞাবান মনস্বীর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। বিশেষত, তাঁর সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধগুলোতে এমন সব বিবেচনা, বক্তব্য, অভিমত রয়েছে, যেগুলোর গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা সমকালের সীমানা পেরিয়ে চিরকালীনতায় অভিষিক্ত। আবুল ফজল তাঁর যুগের চেয়ে কতটা এগিয়ে ছিলেন, তাঁর সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধগুলো পড়লে তা সহজেই আন্দাজ করা যায়। তাঁর এসব প্রবন্ধকে সাহিত্য ও নন্দনতাত্ত্বিক বিচারের আলোয় আনবার অনেক কারণ ও যুক্তি আছে। আবুল ফজল তাঁর সময়ের সর্বাধিক সচেতন লেখকদের একজন, আলাদা নিজস্ব মতাদর্শের জনয়িতা; সংস্কারমুক্ত, উদার, মানবতাবাদী, যুক্তিশীল, বিবেকী লেখক। তাঁর সাহিত্য-বিবেচনা ও নান্দনিক-ভাবনার আলাদা গুরুত্ব অবশ্যই আছে এবং তার তাৎপর্য বিশ্লেষণেরও দাবি রাখে।
দুই
আবুল ফজলের সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ-গ্রন্থগুলো হচ্ছে – সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনা (১৯৬১), সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন (১৯৬৫), সমাজ সাহিত্য রাষ্ট্র (১৯৬৮), সাহিত্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (১৯৭৪), সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধাবলী (১৯৮০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (১৯৮১)। এছাড়া তাঁর অন্য শিরোনামে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যেও সাহিত্যবিষয়ক অনেক প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধাবলীতে আবুল ফজলের যে-নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা-চেতনার স্ফুরণ ঘটেছে, তা যুগের বিবেচনায় সত্যি বিস্ময়কর। সাহিত্যক্ষেত্রে তিনি সমকালীন সমস্যাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সমকালীন সাহিত্যসংকটের প্রত্যাশিত সমাধানের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর সেইসব অভিমত, সাহিত্যতাত্ত্বিক
মীমাংসা শুধু সমকালের দাবিই পূরণ করেনি, অনেক অভিমত যুগোত্তীর্ণ মহিমাও লাভ করেছে। যেমন, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’। এই যে একটি বাক্য যুগের প্রয়োজন মিটিয়ে হিমাদ্রির মতো জাতীয় বিবেকের বুকে অবস্থান নিয়েছে, বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতি যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে, তার কি কোনো ক্ষয় বা বিলোপ হবে? অবশ্যই না। বরং তার প্রাসঙ্গিকতা পুষ্পসৌরভের মতোই দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। যুগোত্তীর্ণ এই অমোঘ বাক্যের জন্য বেঁচে থাকবেন আবুল ফজল বাঙালি-হৃদয়ে। এরকম অগ্রসর মননের লেখক বিভাগোত্তর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক ধুয়া তুলে হাজার বছরের বাংলা ভাষার ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে উর্দু, ফারসি ভাষা এবং ভিন্ন ভূগোলের ঐতিহ্যের চাষ করছিলেন তখন আবুল ফজল তার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে লিখেছেন :
‘কালের ক্ষয় ও বিচার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যে সব সাহিত্য-শিল্প মানুষের চিরন্তন ঐতিহ্যে পরিণত, তা যে দেশের, যে জাতের, যে ভাষারই হোক না কেন সাহিত্যিকের কাছে তা কিছুতেই উপেক্ষণীয় হতে পারে না। ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নামে অথবা জাতি কি ভাষাগত কারণে সাহিত্য-শিল্পের স্মরণীয় ঐতিহ্য বিশেষকে উপেক্ষা করা মানে নিজের শিল্প-সাধনাকে খর্ব করা, ছোটর জন্য বড়কে ত্যাগ করা।’ (সাহিত্য-ঐতিহ্য)
স্পষ্টই বোঝা যায়, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভেদনীতির বিরুদ্ধে তাঁর অকুতোভয় অভিমত এবং তিনি বিবেকী উপলব্ধি আর শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব থেকে বলেছেন, ‘আমাদেরও আয়ত্ত করতে হবে সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি…’ ‘সাহিত্যিকের কাছে সত্যই বড় কথা। সত্যের সঙ্গে যদি জাতীয় আদর্শ, ধর্ম ও শাস্ত্রের বিরোধ ঘটে, নিঃসন্দেহে বিনা দ্বিধায় সাহিত্যিক সত্যের পক্ষাবলম্বন করবে।’ (সাহিত্য-ঐতিহ্য)
আবুল ফজলের এই অভিমতের মধ্যে একজন দূরদর্শী, সত্যানুসন্ধানী শিল্পীর পরিচয় ফুটে উঠেছে। পাকিস্তান-সৃষ্টির পর একশ্রেণির সুবিধাবাদী, জী-হুজুর সাহিত্যিক যখন বাংলার শ্যামল মাটির গৌরবকে অস্বীকার করে আরব, ইরানের কল্পলোকের চাষ শুরু করেন, আবুল ফজল তখন নির্দেশকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে লিখেছেন, ‘আমাদেরও সাহিত্যের প্রাণরস স্বদেশের মাটি থেকে সংগ্রহ করতে হবে। …পূর্ববঙ্গে পাঠকদের কাছে ফোরাত, দজলা, বসফোরাস অপেক্ষা পদ্মা, কর্ণফুলী, বুড়িগঙ্গা অনেক বেশি সত্য; আরাফাতের মাঠ থেকে রমনার মাঠ অনেক বেশি প্রত্যক্ষ’ (কথাসাহিত্যের কথা)।আবুল ফজল নিজেই একজন সৃজনশীল লেখক ছিলেন। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, ফোরাত, দজলা নয়, সাহিত্যের উপকরণের জন্য আমাদের পদ্মা, মেঘনা, কর্ণফুলীর তীরেই পানসি ভিড়াতে হবে। বাঙালি মুসলমান যে-স্বপ্ন-আকাক্সক্ষায় পাকিস্তান-আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাদের মোহমুক্তি ঘটেছিল। বিশেষত, রাষ্ট্রভাষা-প্রশ্ন তাদের দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে এবং বাঙালি মুসলমান আত্মপরিচয় বা আইডেনটিটি ক্রাইসিসের মুখোমুখি হয়।
এক. বাঙালি মুসলমানের ধর্ম যদি ইসলাম হয়, তার সংস্কৃতি কী?
দুই. বাঙালি মুসলমানের ঐতিহ্যের শিকড় মরুভূমিতে, না শ্যামল মাটিতে?
তিন. আরবি তাদের ধর্মের বাহন, উর্দু-ফারসি আভিজাত্যের প্রতীক, ইংরেজি হারাম ভাষা, বাংলা মাতৃভাষা – এতোগুলো ভাষাসমস্যায় বিভ্রান্ত বাঙালি।
এই প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করে দেয় একুশে ফেব্রুয়ারি। এবং একুশের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতায় তারা বুঝতে পারে, আমরা শুধু মুসলমান নই, একই সঙ্গে বাঙালিও। আবুল ফজল বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ এই চেতনাকেই পরিচর্যা করেন। তাই সাহিত্য তাঁর কাছে কোনো বিলাসের বস্তু ছিল না, তিনি বলেছেন :
‘সাহিত্যিকের কাজ শুধু সমাজ জীবনের রূপায়ণ নয়, মহৎ জীবনের মহৎ চিন্তা-ভাবনার রূপায়ণও। সমাজকে অর্থাৎ সমাজের মানুষকে সত্য, ন্যায়, কল্যাণ ও সৌন্দর্যের কথা সর্বাঙ্গীন সামঞ্জস্যের দিকে নিয়ে যাওয়া। এককথায়, সুদৃঢ় সামাজিক ভিত্তির উপর মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলাই সাহিত্যিকের ধর্ম।’ (সমাজ ও সাহিত্যিক)
এ-চেতনা, সময়লালিত অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত। আবুল ফজল এই চেতনারই পথিকৃৎ। যুগজিজ্ঞাসার প্রতিফলন তাঁর চিন্তা ও সৃজনকর্মে যুগপৎ, সমান্তরাল। সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের একজন তীক্ষè পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি নীরব থাকেননি, প্রতিবাদে মুখর হয়ে প্লেকার্ড হাতে নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন, কোনো নগদপ্রাপ্তির কাছে পরাজিত হননি। তাঁর এই বিবেকী বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকার কারণে অনেক বন্ধু শত্রুতে পরিণত হয়েছেন, দূরত্ব বেড়েছে অনেকের সঙ্গে, তিক্ত অভিজ্ঞতায় তিনি নিজেও সরে গেছেন, পদত্যাগ করেছেন, ব্যক্তিগতভাবে জলাঞ্জলি দিয়েছেন অনেক কিছুর, তবু দৃঢ়চেতা, সাহসী, অকপট আবুল ফজল জাতীয় চেতনাকে আমৃত্যু সততার সঙ্গে লালন করেছেন। ‘সমালোচনা’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সাহিত্যের সমালোচনা শাখা অত্যন্ত দরিদ্র, দুর্বল আর অবৈজ্ঞানিক।… সমালোচনা আমাদেশে শুধু যে বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটায় তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা শত্রুতায়ও হয় পরিণত।’
অপ্রিয় সত্যের মতো তিনি উচ্চারণ করেছেন আমাদের সাহিত্যের প্রধান একটি সমস্যার কথা। সমকালীন লেখকদের অসহিষ্ণুতাকেই তিনি এখানে চিহ্নিত করেছেন যেমন, তেমনি অন্তর্ভেদী প্রজ্ঞাবান, রূপদক্ষ সমালোচকের অভাবের কথাও বলেছেন, এ-প্রসঙ্গে সাহিত্য-সম্পাদকের দায়িত্বের কথাও উল্লেখ করেছেন। আবুল ফজলের সাহিত্যচিন্তার আরেকটি প্রান্ত হচ্ছে ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও অনুদার দৃষ্টিভঙ্গির দেয়ালে আঘাত করা। ‘পর্দাপ্রথায় সাহিত্যিক অসুবিধা’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘মুসলমান সাহিত্যিকের জন্য মুসলমান সমাজের কল্পলোকের রঙমহল আজ তালাবন্দি, তাই আমাদের দ্বারা যথার্থ সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে না।’
তাঁর মতে, নরনারীর রহস্যময় সম্পর্কই সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপকরণ, কিন্তু পর্দাপ্রথার কারণে নারীর অন্তর্জীবন সম্পর্কে সে-যুগের লেখকরা ছিলেন অজ্ঞ। এভাবে সমকালীন সাহিত্যের দুর্বলতা চিহ্নিত করে এসব অন্তরায় সম্পর্কে নিজস্ব অভিমত ও অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ধর্মাদর্শ ও সাংস্কৃতিক রূপায়ণ-প্রসঙ্গে আবুল ফজলের অভিমত – রামায়ণ, মহাভারত, জাতকের কথা নিয়ে অনেক সাহিত্য রচিত হয়েছে এবং মানুষ ধর্মের নিরাবেগ কাহিনীর চেয়ে ওইসব চরিত্র, কাহিনী অধিক মনে রেখেছে। কিন্তু ধর্মের কাহিনী নিয়ে সে-রকম সাহিত্যরচনার ধর্মীয় সহিষ্ণুতা মুসলমান সমাজের মধ্যে নেই। অথচ কারবালার কাহিনী নিয়ে রচিত পুঁথি ধর্মীয় আবেগ ছাড়াই মানুষের কাছে প্রিয়। অথচ এ-পাঠকপ্রিয়তা দেখেও বাঙালি মুসলমানের বোধোদয় ঘটেনি। আবুল ফজলের এ-ধরনের সাহসী ও প্রাগ্রসর চিন্তা তাঁকে সমকালীন প্রধান বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করেছিল। সমকালীন সাহিত্যসংকট-প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন :
‘এ যুগের সাহিত্যিক-শিল্পীরা কালের ও রাষ্ট্রের যূপকাষ্ঠে একরকম বলি বললেই চলে। …দেশ বা জাতির কোনো চেহারাই আজ আমাদের মানসপটে ফুটে ওঠে না। আবেগ ও প্রেরণার দেশগত ও জাতিগত ঐক্য-বোধ আজ নিশ্চিহ্ন। ফলে আমাদের বাইরে ও ভেতরে সর্বত্র এক নৈরাজ্য। এ-অবস্থা সাহিত্য-শিল্পের অনুকূল অবস্থা মোটেও নয় – না সাহিত্য-সৃষ্টির, না সাহিত্য-উপভোগের।’ (সাহিত্যের সঙ্কট)
আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে রচিত আবুল ফজলের এই প্রজ্ঞাবান অভিমত আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
আবুল ফজলের সাহিত্যচিন্তায় সুস্পষ্ট আদর্শ ছিল, নন্দনতত্ত্বের পরিভাষায় যাকে বলা যায় নৈয়ায়িক বা উপযোগবাদিতা। উদার দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবকল্যাণ-চেতনায় সর্বদা সক্রিয় ছিল। আবুল ফজলের সাহিত্যতত্ত্বকে তাই বলা যায় ইতিবাচক বা জীবনমুখী। এই অর্থে তাঁর সাহিত্যচিন্তা স্বতন্ত্র এবং সমকালীন অন্য লেখকদের থেকে আলাদা। ‘সাহিত্যের পথ ও পাথেয়’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট বলেছেন – ‘মানুষের জীবনের, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সাহিত্যের এক বিশেষ ভূমিকা আছে। সে ভূমিকা সম্বন্ধে আমি সচেতন ছিলাম। তাই দেশের মানুষ ও সমাজের সমস্যা বারবার আমার লেখায় ছায়াপাত করেছে। ভয়ে বা প্রলোভনে আমি কখনো আমার কথাকে সাহিত্যের পথ থেকে বিপথগামী হতে দেইনি।’বস্তুত, মুক্তবুদ্ধির লেখক আবুল ফজল তাঁর সমগ্রজীবনে ও সৃজনকর্মে সমাজপ্রগতির আলোকশিখা প্রজ্বলিত রেখেছিলেন। কারণ, একদিন তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের’ মুখপত্র শিখা হাতে করে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেছিলেন। সেই শিখা অনির্বাণ ছিল তাঁর সাহিত্যচিন্তায়, নান্দনিকবোধ ও সমস্ত কর্মতৎপরতায়।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.