কোনো জিনিস আকারে খুব বড় হলে সেটি সাধারণত আমাদের ভেতরে এক ধরনের মুগ্ধ বিস্ময়ের জন্ম দেয়। মাঝে মাঝে অবশ্য আমরা তার ব্যতিক্রম খুঁজে পাই, এমন কোনো জিনিস আমাদের চোখে পড়ে যার আকারটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিশাল এবং তার বিশালত্ব নিজের কাছে ক্ষতিকর, অনেক সময় দৃষ্টিকটু এবং এরকম জিনিসকে আমরা ডাইনোসর বলে উপহাস করি। তার কারণ পৃথিবীতে একসময় ডাইনোসর বলে এক ধরনের বিশাল সরীসৃপ রাজত্ব করত এবং আজ থেকে পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে টিকে থাকতে না পেরে তারা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কোনো প্রাণী যদি পৃথিবীতে টিকে থাকতে না পারে তাহলে আমরা সেটিকে তার সীমাবদ্ধতা মনে করে উপহাস করতেই পারি, আমাদের কারো কাছে সেটি মোটেও বিচিত্র মনে হয় না।
তবে যে-জিনিসটি আমরা একবারও চিন্তা করি না সেটি হচ্ছে ধ্বংস হয়ে যাবার আগে ডাইনোসর পৃথিবীর বুকে একশ তিরিশ মিলিয়ন বৎসর বেঁচেছিল। একশ তিরিশ মিলিয়ন বৎসর সুদীর্ঘ সময় তুলনা করার জন্যে, বলা যায়, পৃথিবীতে আমরা (হোমো স্যাপিয়েন্স) এসেছি মাত্র চল্লিশ হাজার বৎসর আগে। এই চল্লিশ হাজার বৎসরেই পৃথিবীটাকে আমরা এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে গেছি যে, আমাদের সন্তানদের কাছে এটি বাসযোগ্য রেখে যেতে পারব কী-না সেটি নিয়ে আমাদের নিজেদের ভেতরেই সন্দেহের জন্ম হয়েছে। যদি পরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস না করেও কোনোভাবে টিকে যেতে পারি তারপরেও পৃথিবীর যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রপতিরা লোভ এবং গোয়ার্তুমি করে পুরো পৃথিবীকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। পৃথিবীতে মানুষ এক লক্ষ বছর বেঁচে থাকবে কী-না আমরা জানি না – ডাইনোসর একশ তিরিশ মিলিয়ন বৎসর বেঁচে ছিল, যেটি এক লক্ষ থেকে একশ তিরিশ হাজার গুণ বেশি। কাজেই কেউ যদি ডাইনোসরকে পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকার অযোগ্য একটি প্রাণী ভেবে থাকে সে খুব বড় ভুল করবে।
তবে এটি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না, পৃথিবীর অত্যন্ত সফল একটি প্রাণী যারা দোর্দণ্ড প্রতাপে সারা পৃথিবীতে রাজত্ব করত, তারা বিস্ময়করভাবে আজ থেকে পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বৎসর আগে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে এটি ঘটেছে সেটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক চিন্তাভাবনা করে একটি ব্যাখ্যা বের করেছেন। সেটি এ-রকম :
আজ থেকে পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বৎসর আগে কোনো এক দিনে যখন পৃথিবীর বুকে বিশাল ডাইনোসররা গাছের মাথা থেকে পাতা ছিঁড়ে খাচ্ছে এবং আমাদের পূর্বপুরুষ ইঁদুরের মতো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী জঙ্গলের ফাঁক-ফোকরে ছোটাছুটি করছে তখন হঠাৎ আকাশ থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার বড় একটি গ্রহকণা পৃথিবীর বুকে ছুটে এসেছিল। সেই বিশাল গ্রহকণার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় একশ হাজার কিলোমিটার থেকে বেশি। সেই বিশাল গ্রহকণার গতিবেগ এত বেশি ছিল যে, বলা যেতে পারে, বায়ুমণ্ডলে একটি ফুটো তৈরি করে এটি মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপ এলাকায় এসে আঘাত করেছিল। সেই ভয়ংকর গতিবেগ ছিল অপ্রতিরোধ্য, সেটি সমুদ্রের তলদেশে আঘাত করেও কঠিন পাথর ভেঙে কয়েক কিলোমিটার ঢুকে গেল। এই ভয়ংকর আঘাতে যে-বিস্ফোরণ হলো সেটি পৃথিবীর সকল নিউক্লিয়ার বোমা থেকেও দশ হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। সমুদ্রের তলদেশে যে-গর্তের জন্ম হয়েছিল তার ব্যাস ছিল প্রায় দেড়শ কিলোমিটার। বিস্ফোরণের পাথর-ধুলো-বালি বায়ুমণ্ডলের সেই গর্তের ভিতর দিয়ে উপরে উঠে গেল এবং কিছু বোঝার আগে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। সমুদ্রে ভয়ংকর জলোচ্ছাসের জন্ম হলো। সেটি সমুদ্র-মহাসমুদ্র দিয়ে পৃথিবীর উপকূলে আছড়ে পড়ল। বিস্ফোরণের ধুলো-বালি-পাথর ধীরে ধীরে পৃথিবীতে পড়তে শুরু করে এবং দেখতে দেখতে সারা পৃথিবী কালো ধুলোবালিতে ঢেকে গেল। বায়ুমণ্ডলে যে-ধুলো-বালি ছড়িয়ে পড়েছে সেটি সূর্যের আলোকে ঢেকে দিল, সারা পৃথিবী তখন অন্ধকারে ডুবে গেল। মাসের পর মাস পৃথিবীতে ঘন অন্ধকার। তাপমাত্রা দেখতে দেখতে নিচে নেমে এলো। সারা পৃথিবীতে এক হিমশীতল পরিবেশ। বিস্ফোরণের সময় প্রচণ্ড তাপে যে-নাইট্রোজেন অক্সিজেনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে, পানির সঙ্গে মিশে সেটি ভয়ঙ্কর অ্যাসিডের জন্ম দিল, পুরো একটি মহাদেশ সেই অ্যাসিডের বৃষ্টিতে জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে গেল। বিস্ফোরণের প্রবল ধাক্কায় পৃথিবীর আনাচে- কানাচে ফাটলের জন্ম হয়ে শত শত আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাত শুরু করে। অন্ধকার, অ্যাসিড বৃষ্টি, শীত এবং অগ্ন্যুৎপাত সব মিলিয়ে পৃথিবীতে যে-নারকীয় পরিবেশের সৃষ্টি হলো সেটি সব ডাইনোসরকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিল। শুধু যে ডাইনোসর নিশ্চিহ্ন হলো তা নয়, সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনার ফলে পৃথিবীর সকল জীবিত প্রাণী, গাছপালা সবকিছুর দুই-তৃতীয়াংশ পৃথিবীর বুক থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
এই ঘটনাটি কি শুধু বিজ্ঞানীদের অনুমান নাকি তার পেছনে যুক্তি আছে, সেটি পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব। পৃথিবীর বুকে খোদাই করে পাথরের যে-স্তরটি পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বৎসর আগে জমা হয়েছিল সেখানে ইরিডিয়াম নামে একটি ধাতু দেখা গেছে। এই ধাতু পৃথিবীর ওপরে থাকার কথা নয়, মহাকাশ থেকে কোনো একটি গ্রহকণা পৃথিবীতে ভয়ংকর গতিবেগে আঘাত করলেই তার বিস্ফোরণে সারা পৃথিবীতে যে-ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়বে সেখানে এটি থাকবে। শুধু তাই নয়, মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপে সমুদ্রের নিচে গ্রহকণার সংঘাতে তৈরি প্রায় দেড়শ কিলোমিটার ব্যাসের গর্তটিকে খুঁজে পাওয়া গেছে। পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বৎসর আগের গাছপালার যে-ফসিল পাওয়া গেছে সেগুলো থেকেও প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সারা পৃথিবী হঠাৎ করে ভয়াবহভাবে শীতল হয়ে গিয়েছিল! বিজ্ঞানীরা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত, আজ থেকে পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বৎসর আগে সত্যি সত্যি এই পৃথিবীর বুকে মহাকাশ থেকে মৃত্যুদূতের মতো একটি গ্রহকণা নেমে এসেছিল।
যদি আমরা বিজ্ঞানীদের এই তত্ত্ব মেনে নিই, তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবে পরের প্রশ্নটি এসে যায়, আবার কী পৃথিবীর বুকে
এ-রকম সাক্ষাৎ মৃত্যু নেমে আসতে পারে? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ পারে। সত্যি কথা বলতে কী ইতোমধ্যেই এ-রকম আরো ঘটনা ঘটে গেছে। আজ থেকে মাত্র পনেরো থেকে চল্লিশ হাজার বৎসর আগে প্রায় পঁচিশ মিটার বড় একটি উল্কা এসে যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা অঙ্গরাজ্যকে আঘাত করেছিল, তার চিহ্ন হিসেবে সেখানে প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাস এবং দুইশ মিটার গভীর গর্তের চিহ্নটি এখনো রয়ে গেছে। অতি সাম্প্রতিক ঘটনাটি ঘটেছে ১৯০৮ সালের ৩০ জুন সাইবেরিয়ার তুঙ্গুসকাতে। সেদিন ভোররাতে আকাশের বুক চিরে একটি উল্কা পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছিল। তার ভয়ংকর বিস্ফোরণে প্রায় তিন হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় একটি পুরো বনাঞ্চলের সব গাছ মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, প্রায় একশ মিটার বড় একটি উল্কা মাটির কাছাকাছি পৌঁছে ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল। এই বিস্ফোরণে বায়ুমণ্ডলে যে-ধুলো-বালি জমা হয়েছিল সারা পৃথিবীর মানুষ সেটি দেখেছে। সৌভাগ্যক্রমে সাইবেরিয়াতে কোনো মানুষজন থাকে না তাই কোনো মানুষের জীবন নষ্ট হয়নি, কিন্তু ঘটনাটি যদি কোনো লোকালয়ে হতো তাহলে কী হতো? সেটি চিন্তা করে মানুষ এখনো আতঙ্কে শিউরে উঠে।
পৃথিবীর কক্ষপথ আর গ্রহাণুপুঞ্জের কক্ষপথ একটি আরেকটিকে ছেদ করে, তাই মাঝে মাঝেই এ-ধরনের ঘটনা ঘটবে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থাকার কারণে এই উল্কাগুলো মাটিতে পৌঁছানোর আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। উল্কাগুলোর আকার যদি বড় হয় তাহলে মাটিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পুড়ে শেষ হতে পারে না। বিজ্ঞানীদের হিসাবে প্রতি একশ বছরে একটি পঞ্চাশ থেকে ষাট মিটারের উল্কা পৃথিবীতে আঘাত করতে পারে। তবে তার বেশির ভাগই সমুদ্রে পড়বে, আমরা হয়তো বুঝতেই পারব না। প্রতি মিলিয়ন বছরে দশ কিলোমিটারের একটি সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত পৃথিবীতে নেমে আসতে পারে। সেটি যদি পৃথিবীকে আঘাত করে তার ফলাফল হবে ভয়ানক, পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর প্রাণিজগৎ সেটি টের পেয়েছিল। ১৯৭২ সালে এক হাজার টনের একটি উল্কা পৃথিবীর কাছাকাছি দিয়ে উড়ে গিয়েছিল, অল্পের জন্যে সেটি পৃথিবীকে আঘাত করেনি। ১৯৯১ সালে প্রায় দশ মিটার বড় একটি গ্রহকণা পৃথিবী এবং চাঁদের মাঝখান দিয়ে উড়ে গিয়েছিল।কাজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে, মহাজাগতিক এ-ধরনের সংঘর্ষ হওয়া এমন কিছু বিচিত্র নয়। রাতের আকাশে যখন হঠাৎ করে একটি উল্কাকে নীলাভ আলো ছড়িয়ে উড়ে যেতে দেখি তখন আমরা এক ধরনের বিস্ময় মেশানো আনন্দ অনুভব করি। কথিত আছে, তখন মনে মনে যে-ইচ্ছাটি করা হয় সেটিই পূরণ হয়! কিন্তু হঠাৎ করে এই উল্কাগুলো যদি কয়েক কিলোমিটার বড় হয়ে যায় তাহলে পৃথিবীর পুরো সভ্যতা এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। পৃথিবীর কিছু বড় বড় টেলিস্কোপকে আকাশমুখী করা হয়েছে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা বিভিন্ন গ্রহকণা খুঁজে বের করতে। এ-রকম একটি টেলিস্কোপ ছিল হাওয়াইয়ের মনা কিতে। সেটিই ১৯৯১ সালের দশ মিটার বড় গ্রহকণাটিকে খুঁজে বের করেছিল। স্পেস গার্ড নামে নতুন একটি প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। পঁচিশ বছরে পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার খরচ করে পৃথিবীর কাছাকাছি প্রায় এক কিলোমিটার আকৃতির সবগুলো গ্রহকণাকে খুঁজে বের করে তার তালিকা করা হচ্ছে। সেগুলোকে চোখে চোখে রাখা হবে। হঠাৎ করে কোনো একটি যদি পৃথিবীমুখী রওনা দেয় সেটিকে কীভাবে মহাকাশেই নিউক্লিয়ার বোমা দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে সেটি নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। এই মুহূর্তে আমাদের প্রযুক্তি হয়তো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি, কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে আমাদের প্রযুক্তির উন্নতি হচ্ছে, কাজেই তখন সেটি এমন কিছু অসম্ভব কাজ বলে মনে হবে না।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.