১১ শিল্পীর চোখে রূপলাবণ্যে বাংলাদেশ

নদীমাতৃক বাংলার শ্যামল নিসর্গ, রাঢ়বঙ্গের ঊষর জমিন, বঙ্গোপসাগরের কোল ছুঁয়ে যাওয়া অপরূপ সৌন্দর্য আর পাহাড়বেষ্টিত অফুরান সবুজের দেশ বাংলাদেশ। মাত্র সাড়ে পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ছোট ভূখণ্ডে যেন সুন্দরের সব আয়োজনই উপস্থিত। এই বৈচিত্র্যময় নিসর্গের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবন আর জীবনের জয়গান, আনন্দ-বেদনার উপাখ্যান, আশাপূরণ আর আশাভঙ্গের পদাবলি।

স্বদেশ-নিসর্গের অপার সৌন্দর্য নিয়ে যেমন অসংখ্য কবিতা লেখা হয় যুগে যুগে, তেমনি ছবি আঁকেন শিল্পীরা। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বাংলার প্রকৃতির নিবিড় বর্ণনা যেমন আমরা ছবির মতো উপভোগ করি, তেমনি ব্রিটিশ চিত্রকর জন কনস্টেবলের আঁকা তাঁর স্বদেশের নিসর্গের ছবি যেন কাব্য-রসাস্বাদনের মতোই অনবদ্য সুখদ।

ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রক প্রতিবছর আয়োজন করে বাংলাদেশের নিসর্গ-চিত্রনির্ভর এক বিশেষ প্রদর্শনীর, যার শিরোনাম : ‘রূপলাবণ্যে বাংলাদেশ’। এবারের আয়োজন অনুষ্ঠিত হলো গত ৩ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত।

আমাদের দেশের প্রায় সব প্রধান শিল্পীই এঁকেছেন প্রকৃতিনির্ভর ছবি। প্রকৃতি ও জীবনসংগ্রাম উঠে এসেছে জয়নুল, সুলতানদের চিত্রপটে। বাংলা-প্রকৃতিকে রমণীয় লালিত্যে উপস্থাপন করেছেন কামরুল, রশিদ, কাইয়ুম প্রমুখরা। এঁদের পরবর্তী প্রজন্মের          শিল্পী হাশেম খান, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলামের চিত্রকলাও বাংলা-নিসর্গে পরিপুষ্ট। এই ধারাবাহিকতায় আমাদের সত্তর ও          আশির দশকের শিল্পীদের চিত্রপটে বাংলার রূপলাবণ্যের বন্দনা দেখা যায়।

এই পর্যায়েরই কয়েকজন শিল্পীর নিসর্গ-বন্দনা নিয়ে গ্যালারি চিত্রকের ‘রূপলাবণ্যের বাংলাদেশ’ শীর্ষক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন। এতে অংশ নিয়েছেন শিল্পী অলকেশ ঘোষ, জামাল আহমেদ, নাসরীন বেগম, সামসুদ্দোহা, রেজাউন নবী, নিসার হোসেন, শেখ আফজাল, শিশির ভট্টাচার্য, মো: মনিরুজ্জামান, আহমেদ নাজির ও ওপার বাংলার শিল্পী লালা। উপরোক্তরাই বেশি বেশি নিসর্গ আঁকেন – এমন নয়। সমসাময়িকদের মধ্যে পাহাড়ি নিসর্গ ও মানুষদের ছবি আঁকায় দক্ষ কনকচাঁপা চাকমাসহ আরো কজন শক্তিমান শিল্পী আছেন – তাঁদেরকে এই গ্রুপে সন্নিবেশিত করলে প্রদর্শনীটি অধিক প্রতিনিধিত্বশীল হতো। আবার এই যূথবদ্ধ আয়োজনে এমন দুজন শিল্পী আছেন, যাঁরা এখন ঠিক নিসর্গনির্ভর ছবি না আঁকলেও, নতুন কাজ নিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাঁদের নিসর্গচিত্র দেখে দর্শকরা চমকিত ও পুলকিত বোধ করেছেন। উল্লেখ্য, প্রত্যেক শিল্পী ছটি করে চিত্রকর্ম প্রদর্শনীতে দিয়েছেন।

নিসর্গ-চিত্রকলা – চিত্রকলার একটি জনপ্রিয় ধারা। চিত্রকলা ধর্মীয় ঘেরাটোপ থেকে বের হয়ে যখন সেক্যুলার হতে শুরু করে, তখন থেকেই ক্রমান্বয়ে নিসর্গকেন্দ্রিক চিত্রকলার চর্চা শুরু হয় এবং ক্রমান্বয়ে এটি জনপ্রিয়তা পায় অষ্টাদশ শতকে এসে। নিসর্গচিত্রে চেনা-অচেনা প্রকৃতির প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী অনুবাদ দর্শককে সহজেই মুগ্ধ করে বলে এই ধারাটি জনপ্রিয়। আমাদের দেশের চিত্রকলা-বিপণনের পরিসংখ্যান করলেও দেখা যাবে বিক্রীত চিত্রকর্মের অধিকাংশ অবশ্যই নিসর্গনির্ভর। গ্যালারি চিত্রক-কর্তৃপক্ষ এই বিক্রয়-বাণিজ্য ভালো বোঝেন বলেই ‘রূপলাবণ্যের বাংলাদেশ’-এর নিয়মিত আয়োজক। এবং তাদের তালিকাভুক্ত শিল্পীদের অধিকাংশই রূপলাবণ্যের সফল অনুবাদক এবং লক্ষ্মীযশও কম নয়।

শিল্পী অলকেশ ঘোষের বয়স এখন তেপ্পান্ন। বাংলার নানা প্রান্তের অজস্র নিসর্গচিত্র এঁকেছেন সারাজীবন। জলরং-কাজে তিনি বিশেষ দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন চিত্রকলা-চর্চার শুরু থেকেই, সেই বিদ্যে এখন অনেক পরিণত তাঁর হাতে। রং আর তুলি যেন তাঁর হাতের জাদুতে নিয়ন্ত্রিত। তাঁর সাম্প্রতিক চিত্রকর্মে দেশের সাম্প্রতিক বন্যার ধ্বংসযজ্ঞ, অসহায় মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। অবশ্য তাঁর এসব কাজে জীবনের হাহাকার তেমন নয়, বরং প্রকৃতির রুদ্ররোষের সৌন্দর্যই যেন প্রতিফলিত হয়েছে।

শিল্পী জামাল আহমেদ দীর্ঘকাল ধরেই স্বদেশের নিসর্গচিত্র আঁকছেন। নদীমাতৃক বাংলা, নদীতীরবর্তী জীবন, আদিগন্তবিস্তৃত ফসলি মাঠ, দূরে গৃহ ও বৃক্ষাদির আভাস, জমির আল ধরে মানুষের চলাচল – এসব বিষয়কে প্রাঞ্জলভাবে অথচ দক্ষতা ও আধুনিক কলাকৌশলে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে তিনি দারুণ পারঙ্গম। আঁকেন কাগজে বা ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে। এই মাধ্যমকে এমনভাবে প্রয়োগ করেন যাতে জলরঙের মাধুর্য যেমন আসে তেমনি তেলরঙের গভীরতাও আসে। সব মিলিয়ে তাঁর নিসর্গ-অনুবাদ হয়ে ওঠে সার্থক ও দৃষ্টিসুখকর।

শিল্পী নাসরীন বেগম প্রাচ্যরীতির জলরঙে এদেশের একজন উল্লেখযোগ্য শিল্পী। তাঁর আঁকা নারীর স্খলিত বসে থাকা অবয়বে এমন এক প্রতীক্ষার আকুলতা, যা আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করে। তাঁর শরৎ, শীত কিংবা বসন্ত-নিসর্গে পাতাঝরার শব্দ শুনি, ফুল ফোটার স্নিগ্ধতা অবলোকন করি কিংবা শীতের বিবর্ণ আলোর মাধুর্য উপলব্ধি করি। ঋতুচক্রের পরিবর্তনে প্রকৃতির পরিবর্তনকে তিনি চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন কতগুলো সাধারণ সূত্রে।

শিল্পী সামসুদ্দোহা আমাদের নিসর্গ আঁকেন খুব ডিটেইল করে, যেন এক নামী আলোকচিত্রীর অসাধারণ দক্ষতাকে ধারণ করে। ‘সুন্দরবন’ নিয়ে তাঁর আঁকা দুটি ভিন্ন ভিন্ন চিত্রে ভিন্ন সময় ও প্রেক্ষাপট। গোধূলিলগ্নে সোনারং উড়ুক্কু মেঘ, নিচে দিগন্তরেখায় ঘনায়মান অন্ধকার, সবুজ জমিনের আভাস পেরিয়ে নিচে মাটির পরত। অন্য চিত্রে বর্ষামেদুর দুপুরের আভাস। সুন্দরবনের খালে দুটি ট্রলার যেন রোদ তাপাচ্ছে, জনমানবহীন পরিবেশে। তেল প্যাস্টেলে আঁকা দারুণ ডিটেইল কাজ দর্শক-চোখে চমক লাগায়।

সাঁওতাল পল্লীর ছবি এঁকেছেন শিল্পী রেজাউন নবী। তাঁর পৈতৃক নিবাস চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আশেপাশের সাঁওতালদের জীবনযাপন, কৃষ্টি দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তারই ঘনিষ্ঠ চিত্র তাঁর কাজে। জলরঙে মাটির ঘরের ক্ষয়ে যাওয়া, বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া রূপ চমৎকার

ফুটিয়ে তুলেছেন।

শিল্পী নিসার হোসেন তাঁর শিক্ষার্থীজীবনে অ্যাকাডেমিক কাজে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। স্বীকৃতিও পেয়েছেন। অ্যাকাডেমিক কাজের শ্রেষ্ঠতম জয়নুল পুরস্কারও পেয়েছেন ১৯৮১ সালে। তাঁর সাম্প্রতিক চিত্রকর্মে দেশ, সমাজ ও পৃথিবীজুড়ে নিত্যদিন যে-অজস্র অন্যায় ঘটে যাচ্ছে তার প্রতিফলন ও প্রতিবাদ অবলোকন করি আমরা। তাঁর আঁকা নিসর্গচিত্র তাঁর শিক্ষাজীবনকালের দক্ষতাকে আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিল। সুন্দরবনের ঘন জঙ্গল ও আলো-আঁধারি নিয়ে তিনি এঁকেছেন ‘নীরবতার সৌন্দর্য’। এও যেন আমাদের চলমান জীবনের আলো-আঁধারির সঙ্গে তুলনীয়। জলরং-মাধ্যমে এঁকেছেন অন্ধকার বনানীর বৃক্ষাদি ও লতাগুল্মের আলোকস্নিগ্ধতা।

ওপার বাংলার শিল্পী লালার ল্যান্ডস্কেপে রাঢ়বঙ্গের রুক্ষমাটি ও পরিবেশ উঠে এসেছে। ছনআবৃত মাটির ঘর, বিষণ্ন বৃক্ষাদি যেন বিমর্ষ একঘেয়ে জীবনেরই প্রতিফলন।

শিল্পী শেখ আফজাল জলরং-নিসর্গচিত্রের আরেক দক্ষ চিত্রকর। তাঁর গ্রামীণ আবহের নিসর্গচিত্রে কিছু মরমি আভাস পাই আমরা,

দেখি লোকায়ত বাংলার জনজীবনকে। তাঁর সাম্প্রতিক জলরং-চিত্রে বান্দরবান ও সুন্দরবনের দৃশ্যের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। জাপানি

সুমো রঙের সঙ্গে প্রচলিত জলরঙের মিশেলে তিনি আঁকছেন এখন। সুমো রঙে গভীরতা ভালো আসে, তার সঙ্গে আলোকিত

অংশটুকু জলরঙে করলে দুটি বর্ণের ভিন্ন আলিম্পন চিত্রকে আরো

সুন্দর করে তোলে।

শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য সমাজবাস্তবতা নিয়ে তির্যক ছবি

আঁকেন। একজন সফল জনপ্রিয় কার্টুন আঁকিয়ে হিসেবেও তাঁর দারুণ খ্যাতি। খুব ধরে ধরে তিনি এঁকেছেন মণিপুর টি এস্টেটের আলোছায়াঘেরা স্নিগ্ধ সুন্দর ছবি। জলরঙে সবুজের এমন ভিন্ন ভিন্ন টোন প্রয়োগ – শিল্পীর দক্ষতাকেই তুলে ধরে। শিল্পী মো: মনিরুজ্জামান এঁকেছেন মরা নদীর বাঁকের চরে পাতাহীন গাছের ডালে বসা সারস, দোয়েল, ফিঙের বাস্তবানুগ ছবি। আরেকটি চিত্রপটে স্বচ্ছ ওয়াশ নিয়ে ঘর ও গাছের আবহ এনেছেন প্রতীকীভাবে। অপেক্ষাকৃত তরুণ শিল্পী আহমেদ নাজির মিশ্র মাধ্যমে ‘ইমেজ অব নেচার’ শিরোনামে দুটি ছবি প্রদর্শনীতে দিয়েছেন। অনেকটা ছাপাই ছবির বিন্যাসে কাজ করেছেন তিনি। তুলে ধরেছেন সুন্দরবন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ইমেজ।বাংলার নানা রূপ, নানা ঋতু ও সময়ের ছবি এঁকে শিল্পীরা স্বদেশের বন্দনা করলেন আরো একবার।