‘ম্যাটার রিয়ালিজম’ শিরোনামে ফরিদা ইয়াসমিনের একক চিত্র-প্রদর্শনী হয়ে গেল জয়নুল গ্যালারিতে। ফরিদা ইয়াসমিন বিমূর্তবাদী চিত্রশিল্পী। বিমূর্তবাদের সঙ্গে বস্তুর ত্রিমাত্রিকতার সম্পর্কই ছিল এই প্রদর্শনীর মূল ভাব। বস্তু ও নির্বস্তুতার উপকরণগত বাস্তবতার বিষয়টি শিল্পী ফরিদা চিহ্নিত করেছেন এ-প্রদর্শনীতে।
বাংলাদেশে বিমূর্তবাদের দীর্ঘ ও দৃঢ় ইতিহাস বিদ্যমান। তরুণ শিল্পী যাঁরা বিমূর্তবাদের পক্ষে ছবি আঁকছেন তাঁদের বিশিষ্টতা হবে যদি তাঁরা পঞ্চাশের দশকে শুরু হওয়া বিমূর্তবাদী চিত্রের ধারাগুলোর সঙ্গে নতুন মাত্রা বা ধারা যোগ করতে পারেন। শিল্পী ইয়াসমিনের মধ্যে সেই প্রচেষ্টা বিদ্যমান। বিমূর্ত ধারা নিয়ে যেসব শিল্পী পরবর্তী সময়ে কাজ করে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তাঁদের মধ্যে শিল্পী রোকেয়া সুলতানা, মুহম্মদ ইউনুস, ফকরুল ইসলাম, এ রহমানসহ আরো দু-একজনের কথা বলা যায়। শিল্পী ইয়াসমিন তাঁদের সঙ্গে আরেকটি মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছেন বলে মনে হয়।
শিল্পী ফরিদা রং-রেখা ও ত্রিমাত্রিক বস্তুর সম্মিলনে প্রস্তুত ভার্চুয়াল পরিবেশের ওপর নির্ভর করেন। তাঁর তৈরি পরিবেশে পরিশুদ্ধতা এবং কখনো সেই শুদ্ধতার বিপরীতে কিছু উপাদান যুক্ত করে তিনি প্রশ্ন তৈরি করেন। এই দ্বৈত ব্যক্তিত্বের মধ্য-সংঘাতেই তাঁর চিত্রভাষা তৈরি হচ্ছে। যেমন, সুন্দর পরিশীলিত রঙের বিপরীতে তিনি হঠাৎই অস্থির ভঙ্গির রং বা ত্রিমাত্রিক গঠন (প্লাস্টার অফ প্যারিসের তৈরি ফর্ম বা ব্যাগ গ্ল্যাভস্ ইত্যাদি) যুক্ত করে তাঁর দ্বৈতমতের অবস্থান গ্রহণ করছেন। অপরিশীলতার জায়গাটি থেকেই তিনি পরবর্তী সময়ে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করতে পারবেন বলে মনে হয়।
রঙের ক্ষেত্রে ফরিদা ইয়াসমিন বিচিত্রগামী। কিছু অপ্রচলিত রঙের বিন্যস্ত বিন্যাস তাঁর ছবিতে এসেছে। রং-প্রয়োগে তাঁর নিজস্ব কিছু ভঙ্গির সঙ্গে পূর্ববর্তী বিমূর্তবাদীদের প্রভাব বিদ্যমান। এই প্রভাব ও তাঁর স্বচিন্তার পার্থক্যের মধ্য দিয়ে রংগুলো স্পর্শকাতর ও অনুভূতিনির্ভর। এই অনুভূতি জীবনবোধের, জীবনের নয়। জীবন ও জীবনবোধের পার্থক্যশুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গির। কারণ দুটি বিষয়ই পারস্পরিক অধিবিদ্যার অন্তর্গত। শিল্পী ইয়াসমিনের ছবিতে দার্শনিক প্রশ্ন বিদ্যমান। এই প্রশ্ন ভাববাদী, কিছুক্ষেত্রে বস্তুবাদী, নামকরণের ক্ষেত্রে যা প্রতিভাত। চিত্রকলায় চিত্রের নামকরণ চিত্রবস্তুর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। শিল্পবস্তুকে অনেকে নামকরণের আওতা থেকে বাদ দিতে ‘আনটাইটেলড্-১, ২, ৩’ এভাবে দিয়ে থাকেন বা আপাত অর্থহীন একটি নাম দিয়ে দেন। এক অর্থে এ-ধরনের তাৎপর্যহীন নাম কখনো শিল্পবস্তুর জন্যে সহায়ক হতে পারে আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ছবির আরেকটি মাত্রা-অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। কারণ চিত্রকলা যেমন সাহিত্যের অংশ সাহিত্যও তেমনি চিত্রকলার অংশ, পরস্পর নির্ভরশীল। যে-কোনো মহৎ শিল্প শিল্পকলার অন্যান্য শাখার যথাসম্ভব সর্বাধিক অর্জনেই সৃষ্টি হয়। সেক্ষেত্রে যুৎসই নাম দিয়ে অনেক সময়েই শিল্পবস্তুকে শক্তিশালী করা যেতে পারে। নামের গুরুত্বকে বাদ যে দেওয়া যায় না, তা জগৎখ্যাত কিছু চিত্রকর্মের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। ‘মোনালিসা’, ‘গোর্নিকা’, ‘ডেভিড’ – এসব শিল্পকর্ম এখন নাম দিয়েই প্রথমে উপস্থাপিত হয় এবং বলা হয়। ফলে নামের একটি প্রাথমিক ও মৌলিক গুরুত্ব বিদ্যমান চিত্রকলায়। শিল্পী ইয়াসমিন সেক্ষেত্রে সচেতন, যার কারণে দেখা যায় নামকরণে তিনি মনোযোগ দিয়েছেন। যেমন, আইকনোগ্রাফিক ড্যানস্, গোল্ড স্কাই মাইনিং, ফসিল্স অফ ফরমালিজম, জেনেসিস অফ ফর্ম অ্যান্ড নন ফর্ম, লাস্ট ট্রিপ টু আননোন টুম্ব, দ্য ইন্টারনাল স্ট্রিং থিয়োরি ইত্যাদি। নামকরণের এই কাব্যধর্মিতার ফলে তাঁর কাজে ধারণাগত কিছু বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। ফর্ম-সংক্রান্ত চিন্তাভাবনার সুনির্দিষ্ট অবস্থান পাওয়া যাচ্ছে। ফরমালিজমের প্রতি তাঁর সমালোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে তিনি বিমূর্তবাদের নির্দিষ্ট ফরমেশন নিয়ে সন্দিহান। সেক্ষেত্রে তাঁর পরবর্তী কাজের ভবিষ্যদ্বাণীও ঘোষিত হয়। মূলত বস্তুর বাস্তবতা ও সেই বাস্তবতার অন্তর্নিহিত বিমূর্ত সত্যকে তিনি এখন পর্যন্ত প্রকাশ করে চললেও ভবিষ্যতে হয়তো বস্তুর অন্য কোনো বাস্তবতার সত্য-উন্মোচনে উৎসাহী হবেন। সেটি হবে হয়তো আরো বেশি ইতিবাচক।
শিল্পী ইয়াসমিনের ছবিতে কম্পোজিশনের বেশকিছু নিরীক্ষা বিদ্যমান। যেমন, ‘দ্য ইন্টারনাল স্ট্রিং থিয়োরি’ ছবিটিতে বাদামি রঙের যুক্ত ব্যবহারে লোহার আঁকাবাঁকা তার বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ তৈরি করে ব্যবহার করেছেন। তারের আঁকাবাঁকা উপস্থাপন ছবিটিতে দূরবর্তী সত্যকে নির্দেশ করে। স্ট্রিং থিয়োরির ধারণাগত স্থানটিকে অধিবিদ্যার জায়গা থেকে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। কম্পোজিশন এবং মেটেরিয়ালের এলোমেলো ব্যবহার ছবিটিকে প্রদর্শনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে পরিণত করেছে। আরেকটি ছবিতে দেখা যায় একটি গ্লাভস্ ছবির নিচের দিকে লাগানো এবং উপরের অংশে সাদা প্লাস্টার অফ প্যারিসের মোটা ব্রাশিং। কম্পোজিশনের ধারালো ইমেজ ছবিটিকে দৃশ্যবাস্তবতার অন্য অর্থে রূপান্তরিত করেছে। স্পর্শগত অনুভূতি ও স্পর্শের বিপন্নতা এ-দুটি বিষয় ছবিটিতে একাধারে এসেছে। এই দুটি ছবি শিল্পী ইয়াসমিনের চিত্রভাষার আকর গ্রন্থ বলা যায়। এই দুটি কাজে তাঁর উদ্দেশ্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে চোখে বা মনে ধরা পড়ে। বিমূর্ত প্রকাশবাদী চিন্তায় শিল্পী ইয়াসমিন জাপানি কম্পোজিশন ও রং দ্বারাও কিঞ্চিৎ প্রভাবিত, অন্তত পরিশীলনের জায়গাটিতে। মোহাম্মদ কিবরিয়ার দূরবর্তী প্রভাব রয়েছে, তবে মেটেরিয়াল ও রঙের কিছু প্রক্ষেপণ সেগুলোকে অস্বীকার করতে চায়। এই অস্বীকারের জায়গাটিই তাঁর মৌলিক ও বৈপ্লবিক মানসিকতার স্থান।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.