নৌকার বাঁকে বাঁকে

বেঙ্গল গ্যালারী অফ ফাইন আর্টসে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মৌলিক ও গবেষণাধর্মী একটি চমৎকার প্রদর্শনী – নদীমাতৃক এদেশের নৌকা নিয়ে। যে-দেশ নদীর, সে-দেশে নৌকা জীবনের একেবারে অন্তস্তলে প্রবাহিত। নৌকার সঙ্গে জড়িত বাংলার অর্থনীতি, সমাজ এবং জীবনযাত্রা। নৌকাকেন্দ্রিক সম্প্রদায় বেদেদের দিয়েই বাংলার আদিসমাজের অবশেষ আমরা দেখতে পাই। এককালে দুনিয়াব্যাপী নৌকাই ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনীতির মূল বাহন। নতুন ভূমির আবিষ্কার এবং সাম্রাজ্যবিস্তারের প্রপঞ্চগুলো প্রায় সবই জলযাননির্ভর। ফলে যে-সভ্যতার সঙ্গে আমরা সম্পর্কিত তার সঙ্গে জলযানের নিবিড় যোগাযোগ বিদ্যমান এবং নৌকা এই জলযোগাযোগেরই অপরিহার্য অংশ।

সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নৌকারও বিবর্তন ঘটেছে সমাজ ও সংস্কৃতিভেদে। বাংলাদেশেও তাই হয়েছে। এই সত্য উদ্ঘাটনেই এগিয়ে এসেছেন ইভ্ মার ও তাঁর সহধর্মিণী রুনা মার খান। জাতিতে ফরাসি ইভ্ মার এবং বাংলাদেশী রুনা মার খান ১৯৭৭ সালে ‘কন্টিক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং বাংলাদেশের জলাঞ্চল ঘুরে ঘুরে প্রচলিত ও বিলুপ্ত অনেক ধরনের নৌকার নক্শা ও চরিত্রপ্রকৃতি যোগাড় করেন। পরবর্তী সময়ে সেগুলোর চমৎকার ছোট ছোট অনুকৃতি তৈরি করেন। সেইসব অনুকৃতির মধ্যে প্রায় চব্বিশ ধরনের নৌকার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় বেঙ্গল গ্যালারীতে। ইভ্ মার এদেশে এসেছিলেন সুদূর ফ্রান্স থেকে একটি জাহাজে করে। সেই জাহাজ এখন একটি ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল – বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে দাতব্য চিকিৎসা প্রদান করে যাচ্ছে। পূর্বে তিনি ছিলেন বিমানচালক। পরবর্তীকালে তাঁর ইচ্ছে হলো জলের জীবন-স¤¦ন্ধে জানতে। সেখান থেকেই যাত্রাশুরু। বাংলাদেশে কর্মসূত্রে পরিচয় হলো রুমা মার খানের সঙ্গে, শেষে পরিণয় ও সহকর্মী। দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কন্টিক পরিচালিত হচ্ছে। কন্টিক এমন দুটি নৌকা বানিয়েছে যেগুলো এখন বাংলাদেশের নদীতে দেখা যায় না। ইতিহাস থেকে উঠে-আসা বিশালাকৃতির এই নৌকাগুলোর সৌন্দর্য অসাধারণ। এই নৌকা বানাতে ইভ্কে যোগাড় করতে হয়েছে দক্ষ কারিগর ও কাঠ। এই কারিগররাই পরবর্তী সময়ে নানা প্রকার নৌকার অনুকৃতি তৈরি করেছেন। চমৎকার মৌসুমি টিম্বার দিয়ে তৈরি হয়েছে অসাধারণ সব নৌকা।

নৌকা-তৈরির দক্ষতা বাংলা অঞ্চলে প্রায় তিন হাজার বছরের পুরানো। এক অর্থে এদেশের সবচেয়ে প্রাচীন কারুশিল্প। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নৌকা এখানে তৈরি হয়েছে এবং প্রকৃতিগতভাবেও সেগুলোর সংখ্যা সর্বাধিক। একজন বাংলাদেশী হিসেবে যে-তথ্য আমরা জানি না, ইভ্ তা আমাদের জানিয়ে দিলেন। ইভের মতে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে নৌকার আদিরূপ অনেকাংশে বদলে যাচ্ছে, ব্যবহারও কমে আসছে। তবে এজন্য হতাশ হবার কিছু নেই, কারণ কালের নিয়মই এই, তবে এগুলোর সংরক্ষণ প্রয়োজন। এই শিল্প বাংলার সম্পদ নিশ্চয়ই, কিন্তু বিশ্বমানবতার জন্যেই এর সংরক্ষণ প্রয়োজন। বাংলাদেশের নৌকার রয়েছে প্রযুক্তিগত সাবলীল উৎকর্ষ, যা নদী ছাড়িয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল প্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দেয়। নৌকাশিল্পীদের সংখ্যাও পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি এদেশেই ছিল।

হাজার নদীর বাংলাদেশে নৌকাশিল্পীদের বানাতে হয়েছে দুধরনের নৌকা – সমুদ্রগামী ও নদীগামী নৌকা। সমুদ্রগামী নৌকা এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে মাছধরা ও মালামাল আনা-নেওয়ার কাজে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে বঙ্গোপসাগর যখন অশান্ত হয়ে উঠে তখন নৌকাশিল্পীদের বলা হয় বিশেষ ধরনের উপযুক্ত নৌকা তৈরি করতে, যা বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ-খাইয়ে নিতে পারে। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের নৌকা নক্শার দিক দিয়ে নিরাপদ। বঙ্গোপসাগরসহ যে-কোনো সাগরের মোকাবিলায় পারদর্শী। শুধুমাত্র গঠন বা আকৃতির দিক দিয়েই এগুলো অনন্য নয়, তৈরির দিক দিয়ে, কাঠ-ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ থেকেও এগুলো অসাধারণ, যে-কারণে ইংল্যান্ডের নাবিকরা চিন্তা করেছিল চট্টগ্রামে নৌ-কারখানা স্থাপনের, কিন্তু সেটি ইংল্যান্ডের নৌ-শ্রমিকদের বেকারত্ব সৃষ্টি করবে বলে বাস্তবায়িত হয়নি।

বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক জলযোগাযোগ-ব্যবস্থা থাকায় এদেশের নৌকাশিল্পীদের কাজেও এসেছে বৈচিত্র্য এবং ঐতিহ্য। তারা তাদের নির্মাণকৌশলের উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছেন। চট্টগ্রামের ‘সাম্পান’ নৌকায় পড়েছে চৈনিক রীতির সরাসরি প্রভাব। সাম্পান নামটিও চাইনিজ। মালবাহী নৌকাগুলোয় আছে আরবিয় প্রভাব, যার সঙ্গে মিল আছে আরব সাগরের ‘ঢাউস’ নৌকার। মাছধরার নৌকায় এই প্রভাব তেমন নেই। সমুদ্রগামী নৌকাগুলো কদাচিৎ নদীতে যেত। ফলে নদীর নৌকায় বিদেশী প্রভাব তেমন নেই। বাংলার নৌকার অসংখ্য প্রকৃতি ছিল, এখনো আছে। এগুলো শনাক্ত করা বেশ কঠিন। আবার সব ধরনের নৌকার আলাদা যে-নাম বিদ্যমান, সেগুলোও অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। ফলে কোন নৌকার কী নাম, সেগুলো শনাক্ত করা আসলেই কঠিন কাজ। মূলত বাংলার নদীর মতোই ব্যাপারটি, যেমন একই নদীকে অঞ্চলভেদে ভিন্ন নামে ডাকা হচ্ছে।

একটি নৌকার হালের সঙ্গে যে-কাঠের তক্তা দিয়ে নৌকার কাঠামো তৈরি করা হয় সেগুলো জোড়া দেওয়া হয় সেলাইয়ের মতো স্টিলের শলাকা দিয়ে কাঠ এফোঁড়-ওফোঁড় করে। এই তক্তাগুলো বাঁকানো হয় আগুনে-পোড়া কাঠের গুঁড়োর ধোঁয়া দিয়ে। হালের সঙ্গে লোহার ছোট ছোট শলাকা সেলাইয়ের পর নৌকাটিকে একটি শূন্য চামচের মতো দেখায়। প্রতিটি সেলাই ১ ইঞ্চি অন্তর করা হয়। মাঝরি আকৃতির একটি নৌকায় তিরিশ হাজার সেলাইয়ের প্রয়োজন হয়। নৌকা-তৈরির এই পদ্ধতি থেকে এই প্রক্রিয়া-প্রচলনের সময়কাল নির্ধারণ করা যায়। কারণ খ্রিষ্টপূর্ব তিন থেকে চার হাজার বছর আগে মিশরিয়রা নৌকায় এ-ধরনের সেলাই ব্যবহার করত। এর ঠিক পরবর্তী সময়েই বাংলা অঞ্চলে এর প্রচলন শুরু হয়। নৌকার অনিন্দ্যসুন্দর পালগুলো রঞ্জিত করা হয় মাটি দিয়ে। মাটির মধ্যকার আয়রন পিগমেন্ট লাল পাথরের মতো রঙে পালগুলোকে রাঙা করে। লম্বা করে কেটে জোড়া দিয়ে পালগুলো তৈরি হয়। সেগুলো দক্ষতার সঙ্গে পাল্টা বাতাস বুকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। আরব ও ল্যাটিনদের পালের প্রযুক্তিও প্রায় একই, কিন্তু বাংলার এই পাল আরো পুরানো।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নৌকাশিল্পীদের মুখে মুখে নৌকা-তৈরির কলাকৌশল ছড়িয়ে পড়েছে। তৈরি হয়েছে দক্ষ শিল্পী, তাদের প্রশিক্ষক ও বিশাল বাহিনী। এসব কলাকৌশলের কোনোটিই লিখিত অবস্থায় নেই অথবা গোপনও করা হয়নি। সবই এই শিল্পীগোষ্ঠীর মুখে মুখে প্রচারিত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব কৌশলের সময়কাল জানা গেছে।

এনসাইক্লোপিডিয়া-অনুযায়ী কারুকৌশল পৃথিবীর প্রাচীনতম। সভ্যতার শুরুতে কাঠের যে-অস্ত্র তৈরি হতো পরবর্তী সময়ে তাই ‘ক্যানু’তে (বিশেষ ধরনের নৌকা) এসে ঠেকেছে। আজ বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রাচীনতম কারুশিল্পের অন্যতম সফল অধিকারী। ফলে দায়িত্বও অনেক পরবর্তী প্রজন্মকে এই সম্পদময় ঐতিহ্য-স¤¦ন্ধে জানাবার। এখন ইস্পাতের পাত আর ইঞ্জিন দিয়ে কম খরচে অধিক গতিসম্পন্ন জলযান তৈরি হচ্ছে, যা নৌকার এই ঐতিহ্যকে সরিয়ে দিচ্ছে, যেটি হাজার বছর টিকে ছিল। যদি আমরা এদিকে নজর না দিই এবং নৌকাশিল্পীদের পরবর্তী প্রজন্মকে এই বিদ্যা শেখানোতে সাহায্য না করি তবে আগামী দশ বছরের মধ্যে তিন হাজার বছরের এই ঐতিহ্য স্মৃতির অংশ হয়ে যাবে। জাতীয় স্বার্থেই সরকারের এদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ইভ্ মার ও রুনা মার সেই চেষ্টাই করছেন। তাঁরা সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য-সংরক্ষণের জন্যেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন এবং তাতে নিষ্ঠার স্বাক্ষর রেখেছেন, যে-কারণে তাঁরা যখন ক্ষুদ্র অনুকৃতিগুলো তৈরি করেছেন, সেগুলোতেও ব্যবহার করেছেন প্রকৃত নৌকা-তৈরির কাঠই, শুধু আকৃতি কমিয়ে এনেছেন। অনুকৃতিগুলোর পালে একই রং ব্যবহার করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমাগত প্রদর্শনী করে দেশীয় নৌকার ঐতিহ্য-স¤¦ন্ধে জানানো ও নৌকাশিল্পীদের পরম্পরা রক্ষা করা এবং পরবর্তীকালে দেশীয় নৌকার মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশের নৌকাসমূহের অদ্ভুত সুন্দর সব নাম আছে, যেগুলো যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, মহানন্দা, তিস্তা, ধলেশ্বরী, ইছামতি প্রভৃতি নদীতে হাজার বছর ধরে চষে বেড়িয়েছে। যেমন, পাতাম, মালার, ডিঙ্গি, কোষা, হোরোঙ্গা, ঘুগী, পানসি, খেলনা, সাম্পান, পদী ইত্যাদি।

মালার নৌকা শস্য আনা-নেওয়ায় ব্যবহৃত হয়। সত্তর থেকে নব্বই ফুট লম্বা হয়। মূলত পাবনা অঞ্চলে দেখা যায়। এগুলো একশ তিরিশ টন ওজন বহনে সক্ষম।

ডিঙ্গি নৌকা বিশ থেকে পঁচিশ ফুট লম্বা হয় এবং ১২ জন আরোহী এতে চড়তে পারে। বাংলাদেশের অনেক স্থানে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হয়। কোষাও গৃহস্থালির কাজে, কখনো মাল আনা-নেওয়ার কাজে নিয়োজিত থাকে। পাল ছাড়া কোষা বিশ-ত্রিশ ফুট লম্বা হয়ে থাকে।

হোরোঙ্গা নৌকা সিলেটের সুরমা নদীতে দেখা যায়। এতে ইঞ্জিনও ব্যবহার করা হয়। উল্লম্বধর্মী ব্যতিক্রমি পাল এদের বৈশিষ্ট্য। দুই থেকে চার হাজার মণ বহনক্ষমতা, মালামাল আনা-নেওয়া করে।

ঘুগীও সিলেটের সুরমায় দেখা যায়। এই নৌকা সওদাগররা বাণিজ্যের কাজে ব্যবহার করত। এগুলো পঞ্চাশ থেকে সত্তর ফুট লম্বা হয়ে থাকে। দুই থেকে তিন হাজার মন ওজন বহন করতে পারে। পানসি নৌকা যাত্রী ও মালপরিবহণে ব্যবহৃত হয়। চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট লম্বা হয়। তিন থেকে চারশ মণ ওজন বহনে সক্ষম। খেলনা নৌকা টাঙ্গাইলে দেখা যায়। এটি বাহন নৌকা। চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট লম্বা হয়। ত্রিশ-চল্লিশজন মাল্লা বাইতে পারে। পালসহ সাম্পান দেখতে পাওয়া যায় চট্টগ্রামের উপকূলে, কক্সবাজার ও মংলায়। এগুলো চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ফুট লম্বা হয়। দুই থেকে তিন হাজার মণ মাল বহন করতে পারে। ত্রিকোণ পাল চোখে পড়ার মতো।

এ-ধরনের নৌকার বৈচিত্র্য বাংলার চারদিকে ছড়িয়ে ছিল এবং এখনো আছে, যেগুলোর শনাক্তকরণ কঠিন কাজ। তবে যেটুকু জানা গেছে সেটুকুর সংরক্ষণই জরুরি।ইভ্ মার ও রুনা মারের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের একটি বিলীয়মান ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরবে বলে আশা করা যায়।