টোকিও থেকে – আমজাদ আলী খানের পুরস্কার ও আলাপচারিতায় গৌতম ঘোষ

ভারতের বিখ্যাত সরোদ-গুরু আমজাদ আলী খানের স্বীকৃতির তালিকায় কিছুদিন আগে যুক্ত হয়েছে নতুন এক সংযোজন। জাপানের কিউশু দ্বীপের প্রধান শহর ফুকুওকা সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আক্রস সিম্ফনি হল মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বার্ষিক এশীয় সংস্কৃতি পুরস্কারের গ্র্যান্ড পি্রঁ তুলে দিয়েছে ভারতের এই খ্যাতিমান সংগীতকারের হাতে। তিনি হলেন ফুকুওকা এশীয় সংস্কৃতি পুরস্কারের গ্র্যান্ড পি্রঁ লাভকারী চতুর্দশ বিজয়ী।

জাপানের সঙ্গে এশিয়ার মূল ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে পশ্চিম জাপানের ফুকুওকা শহর সবসময়েই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রায় দুহাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক সেই সংযোগকে স্থায়ী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার যে-উদ্যোগ ফুকুওকা নগর-কর্তৃপক্ষ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে

গ্রহণ করে, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এশীয় সংস্কৃতি পুরস্কার।এশিয়া মহাদেশকে সাধারণভাবে বৈচিত্র্যের এমন এক নিবাস হিসেবে গণ্য করা হয়, বিভিন্ন জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতি যেখানে একে অন্যের সংস্পর্শে এসে সৃজনশীলতার ধারায় নিয়ে আসছে নতুন বেগ। এর বাইরে আবার বহুমুখী সংস্কৃতির সেই প্রবাহ একই সঙ্গে হচ্ছে অমূল্য ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত সম্পদ। তবে সংস্কৃতির এই নিয়ত বহমান ধারা সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বে সারা পৃথিবীজুড়ে একই রকমের মানসম্পন্ন সংস্কৃতি গ্রহণ করে নেওয়ার চলমান প্রবণতায় এশিয়ার প্রাচীন সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে, তা অনুধাবন করে সাংস্কৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এশীয় সংস্কৃতি পুরস্কারের প্রবর্তন ফুকুওকার স্থানীয় প্রশাসন করেছে। একই সঙ্গে এশিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল্যায়ন-সংক্রান্ত সচেতনতা-বৃদ্ধির পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জনগণের মধ্যে আদান-প্রদান ও বিনিময়ের একটি কাঠামো গড়ে তোলাও হচ্ছে এশিয়ার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে পুরস্কৃত করার অন্যতম প্রধান একটি লক্ষ্য।

১৯৯০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই পুরস্কার-প্রবর্তনের একবছর পর, অর্থাৎ ১৯৯১ সাল থেকে মোট তিনটি বিভাগের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। প্রথম বছরের পুরস্কারে কোনোরকম বিভাজন রাখা হয়নি। জাপানের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র-পরিচালক আকিরা কুরোশাওয়াসহ চারজন কৃতী এশীয় নাগরিককে সেবার বিশেষ স্মারক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল। তবে পরের বছর থেকে গ্র্যান্ড পি্রঁ এবং সেই সঙ্গে শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পৃথক পুরস্কার প্রদানের যে-ধারা চালু হয়, বর্তমানেও তা অব্যাহত আছে। সেদিক থেকে ১৯৯১ সালে ফুকুওকা এশীয় সংস্কৃতি পুরস্কারের প্রথম গ্র্যান্ড পি্রঁ বিজয়ী হলেন ভারতের সংগীত জগতের আরেক কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব পণ্ডিত রবিশঙ্কর। আমজাদ আলী খান হচ্ছেন রবিশঙ্করের তেরো বছর পর ফুকুওকায় গ্র্যান্ড পি্রঁ পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় ভারতীয় এবং সংগীত-জগতের দ্বিতীয় প্রতিনিধি। পুরস্কার গ্রহণ করতে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে সপরিবারে তিনি এসেছিলেন ফুকুওকা শহরে এবং পুরস্কার-প্রদানের বিশেষ অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করা ছাড়াও নগর-কর্তৃপক্ষ-আয়োজিত বিশেষ কনসার্টেও জাপানের সংগীত-ভক্তদের তিনি শুনিয়েছেন সরোদের মধুর ধ্বনি।

বিজয়ীদের হাতে এশীয় সংস্কৃতি পুরস্কার তুলে দেওয়ার অনুষ্ঠান প্রতিবারই বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে নগর-কর্তৃপক্ষ আয়োজন করে। সেপ্টেম্বর মাস ফুকুওকায় এশিয়া মাস হিসেবে উদ্যাপিত হওয়ায় পুরস্কার-প্রদানের বাইরে এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নানারকম অনুষ্ঠানের আয়োজনও শহরে তখন চলে। এবারের অনুষ্ঠানেও তার কোনো ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়নি।

পুরস্কার-বিতরণী অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপানের সম্রাটের দ্বিতীয় পুত্র প্রিন্স আকিশিনো ও তাঁর স্ত্রী প্রিন্সেস কিকো। অনুষ্ঠানের শুরুতে সংক্ষিপ্ত ভাষণে রাজপুত্র এবারের বিজয়ীদের অভিনন্দন জানান এবং ফুকুওকা এশিয়া সংস্কৃতি পুরস্কার এশিয়ার জনগণের সম্পর্ক আরো দৃঢ় করে তোলায় অবদান রাখবে বলে আশাপ্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, ফুকুওকা নগর-কমিটি এবার আমজাদ আলি খানকে গ্র্যান্ড পি্রঁ পুরস্কারে ভূষিত করা ছাড়া অন্য যে-আরো তিনজন বিশিষ্ট এশীয় নাগরিককে শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কৃত করে তাঁরা হচ্ছেন, চীনের অর্থনীতিবিদ লি ই-নিং, নেপালের লোকজ সংস্কৃতির গবেষক রাম দয়াল রাকেশ এবং শ্রীলঙ্কার প্রত্নতত্ত্ববিদ রোলান্ড সিলভা।

ফুকুওকার মেয়র হিরোতারো ইয়ামাসাকির কাছ থেকে গ্র্যান্ড পি্রঁ পুরস্কার-গ্রহণের পর হিন্দি ভাষায় দেওয়া ভাষণে আমজাদ আলী খান উল্লেখ করেছেন যে, এই পুরস্কারের মধ্য দিয়ে জাপানের ফুকুওকা নগরীর প্রশাসন কেবল তাঁকে একা নয়, বরং ভারতের ধ্রুপদী সংগীতের ঐতিহ্যকেই সম্মান জানাল। পিতা এবং নিজের সংগীত-গুরু প্রয়াত হাফেজ আলী খানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে প্রদত্ত সেই ভাষণে সরোদ-গুরু উপস্থিত দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি যে বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে এগারোই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর থেকে বিশ্বজুড়ে হিংসা আর উন্মাদনার যে-দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, তার সবটার পেছনে রয়েছে মানুষের উদ্ধত আচরণ আর ঘৃণার প্রকাশ। এরকম এক কঠিন সময়ে সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হলো মানুষের দিকে ভালোবাসার হাত মেলে ধরা এবং সংগীতই কেবল পারে মানুষের সেই মানবিক গুণাবলিকে বিকশিত করে তোলার ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে সাহায্য করতে। সেদিক থেকে মানবজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যে সংগীত পালন করে চলেছে, উপস্থিত সুধীজনকে আমজাদ আলী খান তা স্মরণ করিয়ে দেন।

পুরস্কার-বিতরণীর আনুষ্ঠানিকতাশেষে পুরো আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল আমজাদ আলী খানের পরিবারের সংগীত-পরিবেশনা। পিতার সঙ্গে সহযোগী সরোদবাদক হিসেবে তাঁর দুই পুত্র আমান আলী বাঙ্গাশ এবং আইয়ান আলী বাঙ্গাশ ছাড়াও মঞ্চে তানপুরা নিয়ে উপস্থিত ছিলেন সরোদ-গুরুর স্ত্রী শুভলক্ষ্মী খান। ভারতের এই বিশিষ্ট সংগীত-পরিবার সেদিন প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে সরোদের মূর্ছনায় জাপানের ফুকুওকা শহরের দর্শকদের বিমোহিত করে রেখেছিলেন।

সংগীতানুষ্ঠানের শেষে সংক্ষিপ্ত এক সংবাদ-সম্মেলনে আমজাদ আলী খান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রশ্নোত্তর-পর্বের এক পর্যায়ে ভারতের সংগীতের তাল আর লয় সম্পর্কে জাপানের সংবাদিকদের ধারণা দেওয়ার জন্য গুনগুন করে খেয়ালের তানও একসময় তাঁকে ধরতে হয়েছিল। ভিন্ন এক দায়িত্ব নিয়ে সংবাদ-সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে কালি ও কলমের পক্ষ থেকে দুটি প্রশ্ন আমজাদ আলী খানকে করার সুযোগ সেদিন আমার হয়েছিল। শুরুতেই তাঁর কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম সংগীতের অনুপ্রেরণা কোথায় তিনি পেয়েছেন।

উত্তরে আবারো তিনি ফিরে গেছেন পিতা হাফেজ আলী খানের প্রসঙ্গে এবং স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেননি যে সংগীত-সাধনা, বিশেষ করে ভারতীয় রীতির সংগীতচর্চায় গুরুর প্রতি ভক্তি আর শ্রদ্ধার প্রকাশ ফুটিয়ে তোলা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবনে পিতা কেবল অভিভাবকই নন, একই সঙ্গে সংগীতচর্চার গুরু হিসেবে উপস্থিত থাকায় সেই গুরুভক্তিই তাঁকে নিয়ে গেছে সংগীতচর্চার অন্দরমহলে, যেখানে একসময় তিনি খুঁজে পেয়েছেন সংগীতের নিবিড় সৌন্দর্যের স্বাদ। ফলে গুরুভক্তি, নিজের জীবনে একই সঙ্গে যেটি ছিল পিতৃভক্তি, সেখান থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছেন সংগীতের যাবতীয় অনুপ্রেরণা, পরবর্তী জীবনে, যা তিনি বংশানুক্রমিক ধারায় পৌঁছে দিচ্ছেন নিজের দুই পুত্রের কাছে। ফলে গুরুভক্তির প্রকৃত উপস্থিতি মনে জায়গা করে নিলে হিন্দিতে যেটি হলো ‘সোয়ার হি ইসওয়ার হ্যায়’ বা শব্দই যে হচ্ছে ঈশ্বর, সেই বাণীর মর্মার্থ বুঝে নেওয়া সংগীতকারের পক্ষে কঠিন নয় বলে আমজাদ আলী খান মনে করেন।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে অবশ্য কিছুটা বিভ্রান্তি সরোদ-গুরুর মধ্যে দেখা যায়। প্রশ্ন ছিল, যেহেতু ফুকুওকা এশিয়া সংস্কৃতি পুরস্কারের গ্র্যান্ড পি্রঁ তাঁর স্বীকৃতির পরিধি উপমহাদেশের বাইরে সম্প্রসারিত করে দিচ্ছে, ফলে সংগীতের মিশ্রণ, যেমনটি এর আগে দেখা গেছে সেতারের গুরু পণ্ডিত রবিশঙ্করের বেলায়, সে-রকম পরীক্ষামূলক কিছু করার ইচ্ছা তাঁর আছে কিনা।

প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শুরুতেই আমজাদ আলী খান স্মরণ করিয়ে দেন যে, সংগীত হচ্ছে তাঁর নিজের পরিবারে ছয় পুরুষ ধরে বহমান এক ধারা। ফলে সংগীতের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার যে-দায়বদ্ধতা তাঁর উপর চেপে বসে আছে, সংগীতের পরিবারে জন্ম না হওয়ায় পণ্ডিত রবিশঙ্কর সে-রকম দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত। ফলে রবিশঙ্করের পক্ষে সহজেই যা করা সম্ভব, ঠিক ততটা সহজভাবে পিচ্ছিল কোনো পথে পা রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তাই বলে রবিশঙ্করের প্রতিভার অবমূল্যায়ন তিনি যে করছেন, তা মোটেও নয়। উলটোভাবে প্রশ্নকর্তাকে ঠিকই তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রবিশঙ্করের সংগীত-প্রতিভার প্রতি কীরকম আস্থা তাঁর রয়েছে।

সংগীতের বিশুদ্ধতার ধারণা যেহেতু তাঁর রক্তের ধারায় কয়েক পুরুষ ধরে বহমান, সেহেতু কৃত্রিম বা সিন্থেটিক সংগীতে আস্থা রাখা তাঁর পক্ষে মুশকিল। অন্যদিকে আমজাদ আলী খান এটিকে ঘরানার ধারা বজায় রাখা নয়, বরং বিশুদ্ধতার প্রতি নিষ্ঠাবান থাকার প্রকাশ বলে মনে করেন। তবে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু একটা করা যে একেবারে

অবাস্তব চিন্তাভাবনা নয়, তাও অবশ্য তিনি মনে করেন। বিশেষ করে জাপানি লোকজ ঐতিহ্যের কিছু কিছু বাদ্যযন্ত্র ও এসবের সুর তাঁকে মুগ্ধ করায় দুই ধারার বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণের পরীক্ষা আগামীতে তিনি   হয়তো চালাতে পারেন। বিশেষ করে এশিয়া সংস্কৃতি পুরস্কার সেই দুয়ার তাঁর জন্য খুলে দিচ্ছে, আর তাই আগামীতে কোনো

একদিন হয়তো জাপানি বাদকদের সঙ্গে একই মঞ্চে তিনি সংগীত পরিবেশন করবেন।

বিদায় নেওয়ার আগে সরোদ-গুরু বিশুদ্ধ হিন্দিতে ‘আপ কাঁহা সে আয়া’ বলে জানতে চাইলেন – কোথা থেকে আমি এসেছি। উত্তরে ‘বাংলাদেশ’ শুনে সহাস্যে তিনি জানালেন যে, কাছেই বসে থাকা তাঁর স্ত্রী ভালো বাংলা বলেন। শুভলক্ষ্মী খানের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে পরিষ্কার বাংলায় তিনি জানালেন, ‘আমার আদি নিবাস যে আসাম।’

আমজাদ আলী খান আরো জানালেন, এ-বছর ডিসেম্বর মাসে বাইশ বছর পর আবারো তিনি যাচ্ছেন বাংলাদেশে। শেষবার বাংলাদেশ ভ্রমণে গিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে সার্ক সম্মেলন উপলক্ষে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সফরসঙ্গী দলের অংশ হিসেবে। তবে এবারের বাংলাদেশ সফর হবে সম্পূর্ণই পারিবারিক সফর, স্ত্রী ও দুই পুত্র তাঁর সঙ্গে থাকবেন এবং পরিবারের সকলে মিলে বাংলাদেশের জনগণকে উপহার দেবেন সরোদের মধুর সুর।

গৌতম ঘোষের আসরে

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় একই সময় ফুকুওকায় বসে এশীয় চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন। এবারের চলচ্চিত্র-উৎসব-উপলক্ষে আমজাদ আলী খানের পুরস্কার-গ্রহণের সময় ফুকুওকা শহরে উপস্থিত ছিলেন ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র-পরিচালক গৌতম ঘোষ। উৎসবে তাঁর আবারও অরণ্যে ছবিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ফুকুওকায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয়কারী শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে এবারের ফুকুওকা চলচ্চিত্র-উৎসবে যোগ দেন পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল তাঁর লালন ছবিটি নিয়ে। আমজাদ আলী খানের অনুষ্ঠানশেষে রাতে গৌতম ঘোষের হোটেলকক্ষে জমে উঠে নির্ভেজাল আড্ডা, ফুকুওকা চলচ্চিত্র-উৎসব সম্পর্কে দুই পরিচালক আর এক অভিনেতার মতামত ছাড়াও তাঁদের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত অনেক দিক সম্পর্কে জানতে পারা সে-আসরে সম্ভব হয়ে উঠে।

গৌতম ঘোষ এবং তানভীর মোকাম্মেল দুজনেই মনে করেন যে, গত প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র-উৎসব-আয়োজনের মধ্য দিয়ে এশীয় ছায়াছবির চমৎকার যে-সংগ্রহশালা শহরে ইতোমধ্যেই গড়ে উঠেছে, এশীয় চলচ্চিত্রের আগামী গবেষকদের জন্যে তা অত্যন্ত মূল্যবান এক জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে। গৌতম ঘোষ এবার দেখতে গিয়েছিলেন ফুকুওকার সেই ফিল্ম-আর্কাইভ এবং নিজের ছবি দখল, ভারতে যার প্রিন্ট এখন দুষ্প্রাপ্য, মহাযত্নে সেখানে সেটি সংরক্ষিত দেখে তিনি এক ধরনের স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। ফলে এর আয়োজক, বিশেষ করে চলচ্চিত্র-উৎসবের পেছনে মূল ভূমিকা যিনি রাখছেন সেই জাপানি চলচ্চিত্র-সমালোচক তাদাও সাতো’র প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

আসরে গল্পবলার ভঙ্গিতেই তিনি আরো জানালেন জ্যোতি বসুর উপর তাঁর মাত্র শেষ করা প্রামাণ্য ছবিটির কথা। জ্যোতি বসুর মতো কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্বকে নিয়ে প্রামাণ্য ছবি করার ইচ্ছা অনেকদিন থেকে পোষণ করলেও বক্তব্যের যথার্থতা আর কোনোরকম রাজনৈতিক বাছবিচার না করে করা মন্তব্য শোনার জন্য জ্যোতি বসুর অবসরগ্রহণের অপেক্ষায় তিনি ছিলেন। ছবির কাজ শেষ করতে পেরে এ-কারণেই তিনি তৃপ্তি বোধ করছেন যে, উপমহাদেশ থেকে প্রায় অদৃশ্যমান অন্তত একজন অসাধারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আগামী প্রজন্মের কাছে কিছুটা হলেও তিনি সরাসরি উপস্থিত করতে পারছেন।

ছবি করতে গিয়ে জ্যোতি বসুর কাছে গৌতম ঘোষ একসময় জানতে চেয়েছিলেন, সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আজীবন রাজনীতি করে এই শেষ বয়সে এসে সামনে-পেছনে অস্ত্রধারী প্রহরী নিয়ে পথে বের হতে তাঁর কেমন লাগে। বিখ্যাত সেই চলচ্চিত্র পরিচালককে যে-উত্তর জ্যোতি বসু দিয়েছিলেন, তা কিন্তু ছিল ঢালাওভাবে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নবপ্রজন্মের রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্য করে। তিনি বলেছিলেন, উপমহাদেশের রাজনীতি যে এতটা নিষ্ঠুর আর নির্দয় চেহারা নেবে, তিনি এবং তাঁর মতো রাজনীতিবিদরা কিন্তু সে-যুগে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি।

অন্যদিকে শুভেন্দু সেই আসরে একই সঙ্গে শোনালেন তাঁর জীবনের কিছু আক্ষেপ আর পূর্ণতার কথা। আক্ষেপ ছিল ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘে জড়িত থাকার কল্যাণে আস্থা রাখা কমিউনিস্টদের পরবর্তী কার্যকলাপে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে অনেকদিন ধরে দেখে-আসা এক স্বপ্নের দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ার বেদনার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে পূর্ণতা হচ্ছে, সফল অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের পর পিতার কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দ।পেশাগত দিক থেকে অভিনেতা শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় এম বি বি এস ডাক্তার। অভিনয়ের নেশায় একসময় ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দেওয়ায় মনে কষ্ট পেয়েছিলেন তাঁর বাবা। তবে অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করার পর তাঁর সেই পিতাকে যখন শুভেন্দুর বাবা হিসেবে এমনকি অপরিচিত লোকজনও আদর-যত্ন করতে শুরু করেন, বাবা তখন প্রথমবারের মতো অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে খুব একটা খারপ পথে সন্তান তাঁর যায়নি।