রক্তকরবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জটিল ও দুরূহ নাটকগুলোর মধ্যে একটি। রবীন্দ্রনাথকৃত রক্তকরবীর নাট্যপরিচয়ের প্রথম প্যারাতেই এর সত্যতা উপলব্ধ হয়। নাটকটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘এই নাটকটি সত্যমূলক, এর ঘটনাটি কোথাও ঘটেছে কিনা ঐতিহাসিকের ’পরে তার প্রমাণসংগ্রহের ভার দিলে পাঠকদের বঞ্চিত হতে হবে। এইটুকু বললেই যথেষ্ট যে, কবির জ্ঞানবিশ্বাসমতে এটি সম্পূর্ণ সত্য।’
প্রসঙ্গত, রক্তকরবী ১৩৩৩ সনে, ১৯২৬-এর ডিসেম্বরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৩৩০ সনে গ্রীষ্মাবকাশে শিলং বাসকালে রবীন্দ্রনাথ নাটকটি যক্ষপুরী নামে প্রথম রচনা করেন। পাণ্ডুলিপি-আকারেই পরে এর নাম দিয়েছিলেন নন্দিনী। ১৩৩১ সনের আশ্বিন মাসের প্রবাসীতে সংশোধিত বর্তমান আকারে নাটকটি রক্তকরবী নামে সম্পূর্ণ মুদ্রিত হয়েছিল। রক্তকরবী নাটকে মানবতার নিপীড়িত রূপ, করুণ বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। নন্দিনী নামে মানবীর ছবির রূপকতায় সমসাময়িককালের ধনতন্ত্রবাদ ও পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার শৃঙ্খলিত মানবতার জীর্ণদশা রক্তকরবী নাটকে ফুটে উঠেছে। ‘শিক্ষার মিলন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ এ-সম্পর্কে তাঁর মতামত উল্লেখ করেছেন, যেখানে আমরা রক্তকরবীর একটি পরিচয়ও খুঁজে পাই – ‘অনবিচ্ছিন্ন সাতমাস আমেরিকায় ঐশ্বর্যের দানবপুরীতে ছিলেম। সেখানে ভোগের চেহারা দেখেছি, আনন্দের নয়। দানব মন্দের অর্থে বলছিনে, ইংরেজিতে বলতে হলে হয়তো বলতেম, টাইটানিক ওয়েলথ। অর্থাৎ যে ঐশ্বর্যের শক্তি প্রবল, আয়তন বিপুল। হোটেলে জানালার কাছে রোজ ত্রিশ পঁয়ত্রিশতলা বাড়ির ভ্রƒকুটির সামনে বসে থাকতেম আর মনে মনে বলতেম, লক্ষ¥ী হল এক, আর কুবের হল আর এক – অনেক তফাৎ। লক্ষ¥ীর অন্তরের কথাটি হচ্ছে সংগ্রহ। সেই সংগ্রহের দ্বারা ধন বহুলত্ব লাভ করে। বহুলত্বের কোন চরম অর্থ নেই। দুই দু’গুণে চার, চার দু’গুণে আট, আট দু’গুণে ষোলো। অঙ্কগুলো ব্যাঙের মতো লাফিয়ে চলে – সেই লাফের পাল্লা কেবলই লম্বা হতে থাকে। এই নিরন্তর উল্লম্ফনের ঝোঁকের মাঝখানে যে পড়ে গেছে তার রোখ চেপে যায়, বাহাদুরির মত্ততায় সে ভোঁ হয়ে যায়।’ এই কুবের ও লক্ষ¥ীকে যক্ষপুরীর রাজার ঐশ্বর্যশক্তির প্রতীকের সঙ্গে তুল্য করা যায়। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় রক্তকরবী শুধুমাত্র একসন্ধ্যা অভিনীত হয়েছিল। রবীন্দ্র-গবেষকরা এমনও বলেন, রক্তকরবীর নন্দিনীকে রবীন্দ্রনাথ এঁকেছিলেন তাঁর প্রিয়ভাজন রানু মুখার্জীর অবয়বে। তবে, শেষাবধি রানু মুখার্জীর এ-ভূমিকায় অভিনয় করা হয়ে ওঠেনি। রক্তকরবীর একসন্ধ্যার অভিনয় নিয়েও রবীন্দ্রনাথের মনে বিস্তর সংশয় ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। রক্তকরবীর ‘প্রস্তাবনা’ ১৩৩১ সনে লিখিত কবির একটি অভিভাষণে উল্লেখ করা হয়েছে – ‘আজ আপনাদের বারোয়ারি সভায় আমার নন্দিনীর পালা অভিনয়। প্রায় কখনো ডাক পড়ে না, এবারে কৌতূহল হয়েছে। ভয় হচ্ছে, পালা সাঙ্গ হলে ভিখ মিলবে না, কুত্তা লেলিয়ে দেবেন। তারা পালাটিকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করবার চেষ্টা করবে। এক ভরসা, কোথাও দন্তফুট করতে পারবে না।’
রক্তকরবী একটি জটিল ও দুরূহ নাটক এরূপ প্রচারণা থাকায় এবং এই নাটকের মঞ্চসফলতা, দীর্ঘসময় ধরে প্রচলিত এই ধারণা সর্বপ্রথম উপেক্ষিত হয় শম্ভু মিত্র-নির্দেশিত রক্তকরবীর সফল মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে। তবে তার জন্য রক্তকরবীকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-পরবর্তী তেরো বছর। বহুরূপী রক্তকরবী মঞ্চায়ন করেছিল ১৯৫৪ সালে।
শম্ভু মিত্র-পরবর্তী সময়ে রক্তকরবীর মঞ্চায়নে বিচ্ছিন্ন প্রয়াস বাংলা ভাষার কতিপয় নাট্যসংগঠন নিলেও আজ অবধি সার্থক ও সফল প্রয়াস হিসেবে বিবেচিত হয় নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের আতাউর রহমান নির্দেশিত রক্তকরবী। নাগরিকের রক্তকরবী শুধু বাংলাদেশে নয়, কলকাতার নাট্যসুহৃদ ও নাট্যদর্শকদেরকেও বিপুলভাবে আলোড়িত করেছে।
নাগরিক-প্রযোজিত রক্তকরবী-প্রসঙ্গে আতাউর রহমানের নির্দেশক-ভাষ্য এরকম : ‘রক্তকরবীকে আমি বিশ্বের অন্যতম সেরা নাটক মনে করি। মনে হয়, এই নাটকের প্রতিটি শব্দ বা বাক্য যেন পল-কাটা রত্ন। এই মনিহার হয়তো আমাদের সাজে না, তবুও পাণ্ডিত্য, আবিষ্টতা ও প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে রক্তকরবীকে আজকের দর্শকদের কাছে অর্থবহ ও মনোগ্রাহী নাট্যপ্রযোজনা হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছি। উল্লেখ্য, কলকাতার বহুরূপীর পরে বাংলা থিয়েটারে রক্তকরবীর তেমন উল্লেখযোগ্য বা নিয়মিত মঞ্চায়ন দেখি না। বিক্ষিপ্ত প্রয়াস অবশ্য হয়েছে।
স¥র্তব্য যে, গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে আমরা এই নাটকের কারিগরি দিক নিয়ে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রয়াসী হয়েছি। যেমন পোশাক, দৃশ্যসজ্জা, আলোক ও শব্দ ও সংগীত-পরিকল্পনায় নবনির্মাণে সচেষ্ট হয়েছি। টোটাল অথবা সর্বাঙ্গীণ থিয়েটারে আমাদের এই উদ্ভাবনগুলো দর্শকদের ভাবনায় কিছু নতুন রঙের আঁচড় লাগাবে বলেই আমার বিশ্বাস।’
নাগরিকের রক্তকরবী-প্রসঙ্গে অধ্যাপক শফি আহমেদ এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা যখন মহিলা সমিতি মঞ্চে রক্তকরবীর প্রযোজনা দেখি, সূচনাতেই বুঝতে পারি, নির্দেশক রবীন্দ্রনাথের ভাষ্যও সমকালে তার মঞ্চপ্রয়োগ নিয়ে স্পষ্টতই সৃজনধর্মী। রক্তকরবী নাটকের এক জায়গায় কিশোর ও নন্দিনীর কথোপকথন এরকম :
‘কিশোর : সমস্ত দিন তো কেবল সোনার তাল খুঁড়ে আনি, তার মধ্যে একটু সময় চুরি করে তোর জন্যে ফুল খুঁজে আনতে পারলে বেঁচে যাই।
… … …
নন্দিনী : আমাকে দেখিয়ে দে, আমি নিজে গিয়ে ফুল তুলে আনবো।
কিশোর : অমন কথা বোলো না, নন্দিনী, নিষ্ঠুর হোয়ো না। ঐ গাছটি থাক্ আমার একটি মাত্র গোপন কথার মতো। বিশু তোমাকে গান শোনায়, সে তার নিজের গান। এখন থেকে তোমাকে আমি ফুল জোগাব, এ আমারই নিজের ফুল।
নন্দিনী : কিন্তু এখানকার জানোয়াররা তোকে শাস্তি দেয়, আমার যে বুক ফেটে যায়।
কিশোর : সেই ব্যথায় আমার ফুল আরো বেশি করে আমারই হয়ে ফুটে ওঠে। ওরা হয় আমার দুঃখের ধন।’
কিশোর আর নন্দিনীর হৃদয় জাগানিয়া এরকম কথোপকথনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নাটক রক্তকরবী। কিশোর আর নন্দিনীর মাঝে অসম এই প্রেম-ভালোবাসার আড়ালে তাদের ব্যথাতুর হৃদয়ের গোপন আর্তিও নাটকের শুরুতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিশোরের পথ বেয়ে নন্দিনীর সামনে উপস্থিত হয় অধ্যাপক, বিশু, ফাগুলাল, বড় সর্দার, মেজো সর্দার, গোকুলসহ অন্যেরা। এসব চরিত্রের প্রত্যেকেই নন্দিনীর প্রতি মোহাবিষ্ট। এমনকি গোকুলের নন্দিনীর প্রতি যে-রাগ, সেটি তার অবদমিত ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। রাজাও নন্দিনীর প্রতি মুগ্ধ, কিন্তু সেটি রাজার মতো করেই। ফলে রাজা আর নন্দিনীর মাঝে দৃশ্যত জালের আড়াল থাকলেও তা ভেদ করে রাজা নন্দিনীকে নিজের মতো করে পেতে চায়। যক্ষপুরীর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজার অনুগত সবাই। শুধু নন্দিনী এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। রাজার চোখ রাঙানোকে নন্দিনী প্রথম থেকেই থোড়াই কেয়ার করেছে। নন্দিনীর নিজের মতো করে চলার এই স্বাতন্ত্র্যে একসময়ে রাজাও নন্দিনীর দলে ভিড়ে যায়, যেটি আমরা রক্তকরবীর শেষদৃশ্যে দেখি। এই নাটকে সবাই নন্দিনীর প্রতি ভালোবাসা দেখাতে উদ্গ্রীব। সকলের সেই ভালোবাসা নন্দিনী গ্রহণও করে। তবে সবাইকে এটিও জানিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না যে, নন্দিনী ভালোবাসে রঞ্জনকে। নন্দিনী গলায় যে-সুর ভাঁজে তার ভেতরেও যেন রঞ্জনের অস্তিত্ব মেলে। পুরো নাটকে রঞ্জন না থেকেও যেন সকল সময়েই আছে। রঞ্জনকে ঘিরে একদিকে ভালোবাসার এই বহিঃপ্রকাশ, অন্যদিকে তার অনুপস্থিতি রক্তকরবী নাটকে তৈরি করে অদ্ভুত এক ড্রামাটিক আয়রনি, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে রঞ্জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। রঞ্জনের মৃত্যু এই নাটকে তার দৃশ্যত উপস্থিতি ঘটায়। যে-মৃত্যুকে নন্দিনী আখ্যা দেয় বীরোচিত মৃত্যু হিসেবে। নন্দিনীর সংলাপে উচ্চারিত হয়, ‘বীর আমার, নীলকণ্ঠ পাখির পালক এই পরিয়ে দিলুম তোমার চূড়ায়। তোমার জয়যাত্রা আজ হতে শুরু করেছে। সেই যাত্রার বাহন আমি-’। এই নাটকের একটি ফ্লাশব্যাক দৃশ্যে নন্দিনী রঞ্জনের স্মৃতিচারণ করে এভাবে। রঞ্জন তাকে তুফানের নদী পার করে দেয়। বুনো ঘোড়ার কেশর ধরে তাকে রঞ্জন বনের ভেতর দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। নন্দিনী দেখে যে, রঞ্জন নাগাই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্রোতটিকে তোলপাড় করে তোলে। এই নাটকে রঞ্জন ও রাজা অদৃশ্য, তাদের বিরোধ সকল মুহূর্তের। কিন্তু শেষ দৃশ্যে তাদের উপস্থিত ও মিলন নাটকীয় পরিণতি ঘটায়।
অন্যদিকে, অধ্যাপক রক্তকরবী নাটকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন ধনতান্ত্রিক রাজশক্তির প্রতীক। এই অধ্যাপক দিনরাত পুঁথির মধ্যে গর্ত খুঁড়েই চলেছে, সে নিরেট নিরবকাশ গর্তের পতঙ্গ, ঘনকাজের মধ্যে সেঁধিয়ে আছে। কিন্তু নন্দিনীর সংস্পর্শে তার ভেতরেও প্রাণের দ্যোতনা ঘটে। সে বলে, ‘আমাদের এই যক্ষপুরে যা কিছু ধন ও ধুলোর নাড়ির ধন সোনা, কিন্তু সুন্দরী, তুমি যে সোনা সে তো ধুলোর নয়, সে যে আলোর। দরকারের বাঁধনে তাকে কে বাঁধবে? যক্ষপুরে তুমি সেই আচমকা আলো।’ নাটকে অধ্যাপক-নন্দিনীর কথোপকথন সে-সুরের বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটায়। নন্দিনী ও রাজার কথোপকথনে সমস্ত পরিবেশ ও পরিস্থিতি যখন বিরূপতায় ভরে ওঠে, তখনি অধ্যাপকের আবির্ভাবে সেখানে প্রাণস্পন্দনের সতেজতার বান ভেসে যায়। একসময় অধ্যাপক প্রকৃত সত্য উচ্চারণ করে, ‘জানো নন্দিনী আমিও আছি একটা জালের পেছনে।’ জালের পেছনের এবং জালের বাইরের মানুষের দ্বন্দ্বই এই নাটকের সারাৎসার।
রক্তকরবী নাটকের চরিত্র-পরিচয় বিচিত্রভাবে এসেছে। বিশু চরিত্রটির সঙ্গে কখনো কখনো রঞ্জনকে মিলিয়ে ফেলে নন্দিনী। বিশুর ‘ওগো দুখ জাগানিয়া’ গানে তার মনের স্বরূপ খুঁজে পাওয়া যায়। বিশু ও নন্দিনী একে অপরকে ভালো করে বোঝে। তাইতো নন্দিনী এলেই বিশুর রূপান্তর ঘটে। চিরদুঃখের আলো জ্বলে ওঠে।
অন্যদিকে, বিশুর চোখেই ধরা পড়েছিল, গোঁসাই যাদের কর্মাবতার সময়-পরিক্রমায় তারাই একদিন বরাহ-অবতার হয়ে উঠবে।
নাটকে বিশুই নন্দিনীকে জানিয়ে যায়, রঞ্জন ভেতরে এসেছে। তার মিলন হবে নন্দিনীর সঙ্গে। এই শুভসংবাদ বিশু যখন জানায়, তখন প্রহরীরা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তার গায়ে চাবুকের চিহ্ন।
ফাগুলাল ও চন্দ্রা এই নাটকের বাস্তবস্পর্শী চরিত্র। ফাগু সরল, অকপট, মদ্যপানে আকৃষ্ট। নন্দিনীর সামনে সে নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে। নাটকে তার সরল উচ্চারণ তার চরিত্রের অন্তর্নিহিত সত্যকেই তুলে ধরে। সর্দার ও গোঁসাইয়ের সামনে সে ধর্মোপদেশের প্রসঙ্গে বলে, ‘না, না, সে হবে না সর্দারজি। এমন সন্ধ্যেবেলায় মদ খেয়ে বড়ো জোর মাতলামি করি, উপদেশ শোনাতে এলে নরহত্যা ঘটবে।’ ফাগুর স্ত্রী চন্দ্রা বাস্তবের আর দশটি নারীচরিত্রের মতোই। নন্দিনীকে সহ্য করতে পারে না। অনেক কিছুই সে তার মতো করে বোঝে। আর বোঝে বলেই সর্দারদের স্তুতি করতেও তার কোনো সংশয় জাগে না।
নাগরিকের রক্তকরবী নাটকের প্রাণ হচ্ছে কুশীলবদের অভিনয়। দলের সিনিয়র-জুনিয়র সব বয়সী কর্মীই অভিনয়ে অংশ নিয়েছেন। নির্দেশকের কৃতিত্ব হলো সকল শিল্পীর অভিনয়কে তিনি একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ফলে সমগ্র নাটকে প্রাণের যে-ব্যঞ্জনা অনুরণিত হয়, সেখানে তাল-লয়ের ত্রুটি দৃষ্টিগোচর হয় না। বরং বেজে ওঠে অন্যরকম এক সিম্ফনি, যা ঢাকার মঞ্চে ব্যতিক্রমই শুধু নয়, দৃষ্টান্তবিচারে দুরূহও বটে। রক্তকরবী নাটকের ‘বিশু’-চরিত্র নানা কারণে আলোচিত। চরিত্রটি একদিক নন্দিনীর প্রণয়ধন্য, অন্যদিকে রাজা ও সর্দারদের ঈর্ষাপীড়িত জটিল, দ্বিবিধ বাস্তবতাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বিশুরূপী খালেদ খান। অভিনয়শৈলী-প্রদর্শনে, উচ্চারণে, প্রক্ষেপণে তিনি শুধু পারঙ্গমই নন, অসাধারণও বটে। মঞ্চে সবাই-ই নাকি অভিনয় করেন, কিন্তু অভিনেতা হন সামান্য কজন। এই সামান্য কজন নাকি তারাই হন, যারা অভিনয়ের ক্ষেত্রে ম্যাজিক্যাল টাচ্টা বোঝেন, বিশুরূপী খালেদ খানের অভিনয় স্পষ্ট করে দেয় অভিনয়ে ম্যাজিক্যাল টাচ্ কাকে বলে। ফাগুলাল-চরিত্রে অভিনয় করেছেন লুৎফর রহমান জর্জ। গ্রাম্য গোঁয়ার কিসিমের সরল-সোজা মানুষের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল প্রাণবন্ত ও কৃত্রিমতা-বর্জিত। এমনকি ফাগুলালরূপী জর্জ যখন হাতুড়ি উঁচিয়ে ধরে, কিংবা গোঁসাই সম্পর্কে খোলাখুলি অভিযোগ করে বড় সর্দারের কাছে, তখন উপলব্ধ হয় তিনি অভিনয়ের সঙ্গে কতটা একাত্ম হয়েছেন। একই ধরনের অভিনয়-প্রকাশ লক্ষণীয় হয় বড় সর্দাররূপী গাজী রাকায়েতের চরিত্রাভিনয়েও। রক্তকরবী নাটকের রাজা-চরিত্রে অভিনয় করেছেন আতাউর রহমান। রাজা এই নাটকের একটি দৃশ্যগ্রাহ্যের বাইরের চরিত্র। নাটকের মঞ্চায়নে নির্দেশক চরিত্রটিকে দৃশ্যগ্রাহ্য করেছেন। এ-দৃশ্যগ্রাহ্যের বাইরের স্বরূপের যে-প্রকাশ সংলাপে পাওয়া যায় তাতে রাজার উপস্থিতি সেভাবে মেলে ধরে না। বরং এ-রূপপ্রকাশে রাজা হয়ে পড়ে তুলনামূলকভাবে খর্বাকৃতির। এমনকি শেষ মুহূর্তে এসেও রাজা যখন নন্দিনীর দলে ভেড়ে তখনো টেক্স্টের চেনা রাজা আর মঞ্চের রাজার মধ্যে ফারাকের ব্যাপারটি সহজেই উপলব্ধ হয়। এক্ষেত্রে হয়তো এমনটিই হয়েছে, টোটাল টিমওয়ার্কের হাল ধরার কারণে নিজ-চরিত্রের প্রতি সুবিচার করার অবকাশ খুঁজে পাননি। তাইতো নির্দেশক আতাউর রহমানের কাছে রাজা-চরিত্রটি তুল্যদণ্ডে নিষ্প্রভ বলেই দৃষ্ট হয়। রক্তকরবী নাটকের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে নন্দিনীকে ঘিরে। নানা কারণে এই চরিত্রটি যেমন জটিল তেমনি ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে যায় নানা মাত্রিকতাকে। এরকম একটি চরিত্রে নাচ, গান, কোরিওগ্রাফি, অভিনয় – সবক্ষেত্রেই নন্দিনীরূপী অপি করিম প্রশংসার্হ অভিনয় করেছেন। পুরো নাটকে তিনি নন্দিনীর আদল ধরে রেখেছেন সাবলীল অভিনয়শৈলী প্রদর্শন করে। এই সাবলীলতার বিষয়-ভাবনায় অপি করিমের কাছে প্রত্যাশাটা ক্ষেত্রবিচারে একটু বেশি। বিশেষ করে প্রাণের বান ডেকে যাওয়ার যে-বিষয়টি নন্দিনীরূপী অপির অভিনয়শৈলীতে ব্যক্ত হওয়ার কথা, তা যেন কখনো কখনো প্রত্যাশাকে ছুঁয়ে যায় না। আরো বেশি বেশি প্রাণের হিল্লোল প্রত্যাশিত ছিল নন্দিনী-চরিত্রে, কেননা প্রাণ দিয়েই তো সে গোকুল, বিশু, রাজা, সর্দার, রঞ্জন, কিশোর, অধ্যাপকের মতো মানুষগুলোকে নিজ-বলয়ে বেঁধেছে। এই বন্ধনে শত্রু-মিত্রের চিরন্তন বাস্তবতা থাকলেও কজন পারে এভাবে বাঁধতে? নন্দিনীর এই রূপের প্রকাশ মঞ্চে স্পষ্ট করতে হলে প্রাণের ভেতরের প্রাণকে জাগিয়ে তুলতে হবে, তবেই প্রত্যাশিত নন্দিনীকে খুঁজে পাওয়া যাবে।
রক্তকরবী নাটকের অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন গোকুল-রাজীব দে, কিশোর-শামীম শাহেদ, অধ্যাপক-নাসিমুল হক রিপন, চন্দ্রা-শিরীন বকুল, মোড়ল-অমল বিশ্বাস কথা, ছোট সর্দার-রওনক হাসান, পুরাণ বাগীশ-সন্দীপন দাস, গজ্জু পালোয়ান-আবদুর রশীদ, গোঁসাই-ফখরুজ্জামান চৌধুরী, চিকিৎসক-হারুনুর রশীদ, মোড়ল-২-খালেদ আনোয়ার, মেজো সর্দার-ওমর আয়াজ অনি; প্রথম দল-সাগর, আজাদ, প্রদীপ, মিল্কি মোহাম্মদ; দ্বিতীয় দল-সন্দীপন, রওনক, শান্ত, শাহিন; তৃতীয় দল-নাজনীন, স্বাতী, তটিনী রোজারিও, মিশু, ঝুমু; চতুর্থ দল-মাসুদ রানা, অমল বিশ্বাস কথা, হারুনুর রশীদ; শ্রমিক-মিল্কি, আজাদ, সাগর, শান্ত, রওনক হাসান, প্রদীপ, পাপ্পু এবং রঞ্জন-মুস্তাফিজুর রহমান।রক্তকরবী নাটকের প্রতিটি চরিত্রকে নিয়েই কুশলপনায় নিজের মতো করে খেলেছেন নির্দেশক আতাউর রহমান। ফলে প্রতিটি চরিত্রই হয়ে উঠেছে সমধিক গুরুত্বপূর্ণ। রক্তকরবী নাটকের মূল সুর হলো নন্দিনীর মানবীয় রূপের আড়ালে মানবতার ভগ্ন বাস্তবতা। যক্ষপুরীতে মানবতা কীভাবে লঙ্ঘিত তা নাট্যাখ্যানের পরতে পরতে স্পষ্ট। মানবতার করুণাবস্থার পাশে নন্দিনীর উপস্থিত চরিত্র-বাস্তবতা আরো প্রকট করে তোলে, যেটি ধরতে এবং উপস্থাপন করতে পারঙ্গম হয়েছেন নির্দেশক। টোটাল নাটকে কোনো চরিত্রই খাটো থাকে না। প্রতিটি চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব এতটাই প্রাণবন্ত ও সাবলীল যে, নাটকের মূল সুর সকলের মাঝে রক্তকরবীর মূল ইঙ্গিতকে ছুঁয়ে যায়। এই সাফল্যের পর, সত্য স্বীকারোক্তির পর, রক্তকরবী জটিল ও দুরূহ নাটক, সেটি বলার অবকাশ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। নির্দেশক আতাউর রহমান মনে করেন, এই নাটকে তাঁর সাফল্য হচ্ছে, তিনি রক্তকরবীকে দর্শকদের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পেরেছেন। দর্শকের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পেরেছেন। একদিকে অভিনয়শিল্পীদের দুর্দান্ত অভিনয়, অন্যদিকে, সাইফুল ইসলামের মঞ্চ-পরিকল্পনা, কে. বি. আল আজাদের শব্দ ও আবহসংগীত পরিকল্পনা, নাসিরুল হক খোকনের আলোক-পরিকল্পনা রক্তকরবী নাটকের মঞ্চসাফল্যকে নিশ্চিত করেছে। এজন্য অবশ্য নাগরিকের টোটাল টিমওয়ার্ককে ধন্যবাদ জানাতে হয়। শম্ভু মিত্রের রক্তকরবী, মোস্তফা মনোয়ারের রক্তকরবী নাট্যদর্শকদের দীর্ঘসময় ধরে এক ধরনের মোহগ্রস্ততায় আবিষ্ট করে রেখেছে। এর বাইরে গিয়ে আতাউর রহমানের রক্তকরবীও নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে রবীন্দ্রনাটকের মঞ্চপ্রয়োগে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.