মোটামুটিভাবে সবাই একমত যে, উনবিংশ শতাব্দী বাংলার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী শতক। ওই শতক সামন্তবাদী অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির পশ্চাদপসরণের শতক – ওই শতক পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়া সভ্যতার অগ্রযাত্রার শতক। উনিশ শতকের প্রথম থেকেই সেই নবজাগরণের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। ইউরোপের রেনেসাঁসের কেন্দ্র যেমন ইতালি, বাংলার নবজাগরণের কেন্দ্র ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী কলকাতা। তাই বাংলার তথা সমগ্র ভারতবর্ষের সে-নবজাগরণের পুরোধা প্রায় সবাই বাংলার মানুষ – বাঙালি। রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ। সে-নবজাগরণের প্রথম পঞ্চাশ বছরে বাংলার কোনো মুসলমান জড়িত ছিলেন এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। কলকাতার মুসলমান জমিদার ও অভিজাতশ্রেণি হিন্দু স্বশ্রেণির মতো সে-আন্দোলনে সাড়া দেননি, তার থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। বরং তাঁরা সে-আন্দোলনের বিরোধিতাই করেছিলেন। প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর পর মুসলমান সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ যখন দেখলেন, তার ফল মুসলমানদের জন্যে ভালো হয়নি, মুসলমান সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তখন উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে তাঁরা নড়াচড়া শুরু করেন।
অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরণের বাণী সর্বপ্রথম প্রচার শুরু করেন নবাব আবদুল লতিফ। একথা সত্যি যে, নবাব আবদুল লতিফ ভারতবর্ষকে মুসলমানদের আবাসভূমি বলে স্বীকৃতি-আদায়ের চেষ্টা করেন এবং ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালান। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পশ্চাৎমুখী এবং অনাধুনিক। তিনি ইংরেজি ভাষার বৈষয়িক উপযোগিতার কথা চিন্তা করে ইংরেজি শেখার আন্দোলন করেন। কিন্তু সে-ভাষা নবজাগরণের যে-দর্শন বহন করে আনবে, তা থেকে মুসলমানদের দূরে সরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখানেই কলকাতার হিন্দু নবজাগরণবাদীদের সঙ্গে নবাব আবদুল লতিফের দৃষ্টিভঙ্গিজনিত পার্থক্য। কাজেই নবাব আবদুল লতিফকে কিছুতেই একজন নবজাগরণবাদী বলা যায় না। আমার মনে হয়, বাংলার সে-নবজাগরণের প্রথম মুসলমান পথপ্রদর্শক হলেন রোকেয়া খাতুন ওরফে ‘রকু’। তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে মাজেদা সাবের বিতর্ক সৃষ্টি করলেও১ ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বরই তাঁর জন্মদিন হিসেবে সাধারণভাবে স্বীকৃত হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই তিনি পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো বাংলার আকাশে আবির্ভূত হন। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। সবার এক প্রশ্ন, ‘কে এই মহিলা?’
জানা গেল রংপুরের এক অখ্যাত গ্রাম পায়রাবন্দের সম্ভ্রান্ত ভূস্বামী জহিরউদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবেরের প্রথমা স্ত্রীর কন্যা তিনি। প্রায় সাড়ে তিনশ বিঘা লাখেরাজ জমির ওপর তাঁর সুবৃহৎ বাড়ি। রোকেয়ার মায়ের নাম রাহাতুন্নেসা চৌধুরানী। সেকালে একজন সামন্ত ভূস্বামীর যত দোষ থাকার কথা, তার সবই ছিল সাবের সাহেবের। বিলাসী, অপব্যয়ী, রক্ষণশীল ও ধর্মান্ধ। ‘ব্যয়বহুল প্রস্তরশোভিত বাসভবন। তাতে বিলাসময় ঝাড়লণ্ঠন, শখের শিকারযাত্রা, ধূমপানের বিলাসী আয়োজন। জমিদারের চিত্তবিনোদনের জন্য বিভিন্ন বয়সী দাসী – সবকিছুরই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল।’২ রোকেয়ার বাবা চারটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথমা স্ত্রীর মেয়ে রোকেয়া। রোকেয়ার নিজের দুটি ভাই ও দুটি বোন ছিল। বৈমাত্রেয় ভাই ও বোনের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ছয় ও তিন। সেকালের আর দশটা এ-রকম পরিবারের মতো রোকেয়ার পরিবারের মেয়েরাও ছিল অসূর্যম্পর্শ্যা। কঠোর পরদাপ্রথার মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন রোকেয়া। কেবল পুরুষ নয়, অনাত্মীয়া মহিলাদের সামনেও পরিবারের মেয়েদের কঠোর পরদাপ্রথা মেনে চলতে হতো। সে-পরদাপ্রথার অমানবিকতা থেকে শিশুরাও রেহাই পেত না। রোকেয়া তাঁর অনেক প্রবন্ধে খোলাখুলিভাবে সেসব বিবরণ লিখেছেন। তাঁর পরিবারের ভাষা ছিল উর্দু। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রবেশাধিকার ছিল না সেখানে। কঠোর অবরোধের মধ্যে রোকেয়ার শিশুকাল কেটেছে। ‘লেখাপড়া শেখার দুর্দমনীয় আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ছোট্ট রোকেয়া পিতার কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাননি। কোনো বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করার সুযোগ পাননি তিনি। পাঁচ বছর বয়সে রোকেয়া তাঁর মায়ের সঙ্গে আসেন কলকাতায় এবং তাঁর বড়বোন করিমুন্নেসা খানমের
শ্বশুরবাড়িতে থেকে এক মেম-শিক্ষিকার কাছে প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন। প্রথম যেদিন তিনি মেমের সামনে বের হন সেদিন তাঁর মা তাঁকে মারতে পর্যন্ত উদ্যত হয়েছিলেন। এরপর তাঁদের দেশে ফিরে যেতে হয়। বাড়িতে দিনের বেলায় লেখাপড়া শেখার সুযোগ নেই। দিনের শেষে রাত্রিতে গভীর অন্ধকারে মোমবাতি জ্বেলে ছোট্ট রোকেয়া বড়ভাই ইব্রাহিম সাহেবের কাছে পাঠগ্রহণ করতে লাগলেন। তাঁর কাছে শিখলেন ইংরেজি ভাষা এবং বড় বোনের কাছে শিখলেন বাংলা ভাষা।’৩ তাঁদের সে-ঋণ তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যথাক্রমে মতিচুর প্রথম খণ্ড ও পদ্মরাগ উপন্যাসের উৎসর্গপত্রে।
ষোলো বছর বয়সে বিহারের ভাগলপুর-নিবাসী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে রোকেয়ার বিয়ে হয়। পায়রাবন্দ গ্রাম ছেড়ে তিনি সেখানে চলে যান এবং ১৯০৯ সালের ৩ মে স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছর সেখানেই অতিবাহিত করেন। স্বামী ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। রোকেয়া তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী। প্রথমা স্ত্রী একটি কন্যাসন্তান রেখে মারা যান। বিয়ের সময় সাখাওয়াতের বয়স ছিল প্রায় চল্লিশ। রোকেয়ার দুটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল, কিন্তু প্রথমজন পাঁচ মাস ও দ্বিতীয়জন মাত্র চার মাস বয়সে মারা যায়। স্বনামখ্যাত সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশে সাখাওয়াত কৃষিশিক্ষার বৃত্তি নিয়ে বিলেত যান এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন স্পষ্টবাদী, তেজস্বী এবং কর্মদক্ষ মানুষ। ইংল্যান্ডের আবহাওয়ায় বসবাস ও সেখানে শিক্ষার প্রভাবে তাঁর মধ্যে বুর্জোয়া মানবতাবাদী ও স্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটা অস্বাভাবিক নয়। তিনি অবাঙালি ও উর্দুভাষী। ‘অন্যান্য গুণাগুণকে প্রাধান্য না দিয়ে প্রাণাধিক বোনটি ভবিষ্যৎ-জীবনে যাতে বিদ্যাচর্চা ও প্রতিভা-বিকাশের উপযোগী পরিবেশ ও সহায়তা পায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই বড়ভাই ইব্রাহিম সাবের কুসংস্কারমুক্ত, উদার, শিক্ষানুরাগী ও ধীর-গম্ভীর স্বভাবের বিপত্নীক ও প্রৌঢ়ত্বের সীমায় পদার্পণকারী সাখাওয়াত হোসেনকে অনিন্দ্যসুন্দর দেহলাবণ্য সুষমার অধিকারী কিশোরী রোকেয়ার জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করেন বোনের সঙ্গে আলোচনা করেই।’৪ বড়ভাইয়ের সে-মনোবাঞ্ছা ব্যর্থ হয়নি। সাখাওয়াতের সঙ্গে বিবাহ রোকেয়াকে পৈত্রিক পরিবারের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে মুক্তি দেয়। সাখাওয়াত তাঁকে তাঁর প্রতিভা-বিকাশ ও বিদ্রোহে শক্তি জোগাতে পিছপা হননি। ভাগলপুরে স্বামীর কাছে থাকার সময়েই তাঁর ৭টি প্রবন্ধ-সম্বলিত মতিচুর (প্রথম খণ্ড) গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯০৫ সালে। আলোড়ন-সৃষ্টিকারী তাঁর ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধটিও সেখানে অন্তর্ভুক্ত। কাজেই এ-রকম সিদ্ধান্তে আসতে কষ্ট হয় না যে, স্বামীর সম্মতি ও উৎসাহ-ব্যতিরেকে তখন কোনো মুসলমান মেয়ের পক্ষে কাগজে বাংলা ও ইংরেজি লেখা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। রোকেয়া নিজেই সে-কথা স্বীকার করেছেন। ‘আমার শ্রদ্ধেয় স্বামী অনুকূল না হইলে আমি কখনোই প্রকাশ্যে সংবাদপত্রে লিখিতে সাহসী হইতাম না।’৫ তবে এ-প্রসঙ্গে একটি কথা মনে রাখা উচিত। তা হলো ঐতিহ্যিক চেতনায় সমৃদ্ধ আরো শত-সহস্র স্ত্রী সাখাওয়াতের মতো ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, উদার, মানবতাবাদী স্বামীর ঘর করে গেছেন এবং এখনো করছেন। কিন্তু তাঁদের কজন রোকেয়া হতে পেরেছেন? কাজেই সিদ্ধান্ত নিতেই হয় যে, রোকেয়া সাধারণ কোনো মহিলা ছিলেন না। তিনি একাধারে ছিলেন পণ্ডিত, সাহসী, মুসলমান সমাজের কুসংস্কার ও নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরব কণ্ঠস্বর। সাখাওয়াত রোকেয়াকে তৈরি করেননি, শুধু উৎসাহ জুগিয়েছেন, সাহায্য করেছেন মাত্র। সেকালে সেটির মূল্যও কম ছিল না। স্বামীর সে-উৎসাহ ও সাহায্য ছাড়া তিনি রোকেয়া হয়ে উঠতে পারতেন না। হাজার হাজার সৃজনশীল, মেধাবী নারীর মতো সংসার-ধর্ম পালন করেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতেন। সেদিক থেকে বিচার করলে বলতে হয়, সে-যুগে সাখাওয়াতও একজন ব্যতিক্রমি পুরুষ ছিলেন। ভাবতে অবাক লাগে, পৈত্রিক ও বৈবাহিক সূত্রে প্রাপ্ত বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি-বিচ্ছিন্ন পরিবেশে জীবন কাটিয়ে তিনি কী করে একজন ‘রোকেয়া’ হয়ে উঠলেন! এ-থেকে এ-সিদ্ধান্তটি বেরিয়ে আসে যে, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও রোকেয়া ছিলেন একজন ‘স্বগঠিত মানুষ’। ‘ব্যাপক অধ্যয়ন, পরিশীলন এবং পরিবারের যৎকিঞ্চিৎ আনুকূল্য ছিল তাঁর পশ্চাতে।’৬
রোকেয়ার প্রতিভা বিভিন্নমুখী। তবু নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তি-আন্দোলনের জন্যেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত ও স্বনামধন্য। তাঁকে বাংলার তথা সারা ভারতবর্ষের গধৎু ডড়ষষংঃড়হবপৎধভঃ (১৭৫৯-৯৯) বলা যায়। রোকেয়া এদেশের সমাজ ও সংসারের সকল ক্ষেত্রে নারীর ন্যায্য অধিকার-প্রতিষ্ঠার জন্যে সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। এছাড়া সমসাময়িক ঘটনাবলির সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, সাহিত্য-সৃষ্টি, ধর্ম বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় তাঁর রচনা সমৃদ্ধ। সমসাময়িক রাজনৈতিক গতিপথের ওপরও তিনি তীক্ষè দৃষ্টি রেখেছেন এবং দ্বিধাহীন চিত্তে তাঁর নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন কখনো সরাসরি, কখনো-বা রূপকের আড়ালে। কিন্তু তাঁর সব কাজ একত্রে দেখলে এটি স্পষ্ট হয় যে, তাঁর মূল সংগ্রাম ছিল তৎকালীন আধুনিক শিক্ষাগ্রহণে অনিচ্ছুক, ধর্মান্ধ, ঐতিহ্যপীড়িত মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে। তাই যখন যেভাবে মনে হয়েছে সেইভাবেই তিনি কখনো ধর্ম ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং বিধিনিষেধকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। কখনো নিজের মতের সমর্থনে আদি ইসলামের বৈপ্লবিক মতামতগুলোর সপ্রশংস উল্লেখ করেছেন। আবার কখনো-বা কঠিন ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের কশাঘাতে ধর্মান্ধতা ও আচারসর্বস্ব ধর্মাচরণকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। এমনকী ধর্মগ্রন্থগুলো ঈশ্বরপ্রেরিত কিনা সে-বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করতে সাহসী হয়েছেন। তবুও একথা সত্যি যে, তিনি নাস্তিক ছিলেন না। বোরকা পরেই তিনি বোরকার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। রোকেয়ার যে-কোনো মূল্যায়নে একথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। ধর্মের গণ্ডির মধ্যে থেকে তিনি নিজ ধর্ম-সংস্কারের মাধ্যমে সমাজ-সংস্কার ও নারীমুক্তির পথ খুঁজেছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার সঙ্গে উনিশ-শতকের নবজাগরণের নায়ক রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখের প্রয়াসের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। তাই রোকেয়াকে উনিশ-শতকের বাংলার নবজাগরণের সাক্ষাৎ উত্তরসূরি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
রোকেয়া ছিলেন পুরোপুরি একজন আধুনিক মানুষ। এটি রীতিমতো বিস্ময়ের ব্যাপার। যখন বাংলার সমগ্র মুসলমান সমাজ অশিক্ষা-কুশিক্ষা ও অজ্ঞানতা এবং ধর্মান্ধতার নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত তখন রোকেয়ার মধ্যে আধুনিকতার লক্ষণগুলো প্রবেশ করল কী করে, তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগকে শুধু একটি কালপর্ব দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না। প্রত্যেকটি যুগের কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। আছে চিন্তার আলাদা কাঠামো – কিছু লক্ষণ – কিছু দর্শন। আধুনিকতার লক্ষণগুলোর মধ্যে ইহজাগতিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদিতাই প্রধান লক্ষণ। এর প্রত্যেকটি লক্ষণই রোকেয়ার মধ্যে ক্রীড়াশীল ছিল। তাঁর মতো আধুনিক মানুষের সংখ্যা আজকের বাংলাদেশেও বিরল। তাঁর মতো একটি পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি কোথা থেকে এ-লক্ষণগুলো সংগ্রহ করলেন, কীভাবে সংগ্রহ করলেন, এটিও একটি বড় প্রশ্ন। ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ, মানবতাবাদ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার আলোকে ধর্মের পুনর্ব্যাখ্যা তাঁর মনের ওপর কতদূর প্রভাব ফেলেছিল, তার অসামান্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় পদ্মরাগ উপন্যাসের ‘নিবেদনে’। তিনি লিখছেন, ‘ধর্ম একটি ত্রিতল অট্টালিকার ন্যায়। নীচের তলায় অনেক কামরা, হিন্দু-ব্রাহ্মণ, শূদ্র ইত্যাদি বিভিন্ন শাখা ও মুসলমান – শিয়া, সুন্নী, হানাফী, সাফী প্রভৃতি নানা সম্প্রদায়, ঐরূপ খ্রীস্টান, রোমান-ক্যাথলিক, প্রোটেস্টান্ট ইত্যাদি। তাহার উপর দ্বিতলে দেখ, কেবল মুসলমান – সবই মুসলমান; হিন্দু, সবই হিন্দু ইত্যাদি। তাহার উপর ত্রিতলে উঠিয়া দেখ, একটি কক্ষ মাত্র, কামরা বিভাগ নাই, অর্থাৎ মুসলমান, হিন্দু, কিছুই নাই – সকলে একপ্রকার মানুষ এবং উপাস্য কেবল এক আল্লাহ।’৭ হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, বৌদ্ধ নয়, খ্রিষ্টান নয়, সবার ওপরে মানুষ। এটি আধুনিকতার প্রধান লক্ষণ। এমন এক সময় ছিল যখন ধর্মীয় পরিচয় ছিল প্রধান। সেটি মধ্যযুগ। যিনি ধর্ম-পরিচয়ের ওপরে রাষ্ট্র বা দেশের পরিচয় আগে দেন তিনি আধুনিকমনস্ক। রোকেয়া যে কত বড় আধুনিকমনস্ক মানুষ ছিলেন তার পরিচয় পাই, তিনি যখন ঘোষণা দেন, ‘আমরা শুধু হিন্দু বা মুসলমান কিংবা পারসী বা খ্রীস্টান অথবা বাঙালী, মাদ্রাজী, মাড়ওয়ারী বা পাঞ্জাবী নহি – আমরা ভারতবাসী। আমরা সর্বপ্রথম ভারতবাসী – তারপর মুসলমান, শিখ বা আর কিছু।’৮
রোকেয়ার প্রায় প্রতিটি লেখা সমকালীন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে ঝড় তুলেছিল। তবে যে-প্রবন্ধটি ভীমরুলের চাকে ঢিল মারে সেটি হলো ‘আমাদের অবনতি’। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৪ সালে নবনূর পত্রিকার ভাদ্র সংখ্যায়। তবে প্রবন্ধটি ‘অলঙ্কার না Badge of Slavery নামে ১৩১০ বঙ্গাব্দে মহিলা নামক একটি পত্রিকার বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯০৫ সালে মতিচুর প্রথম খণ্ডের দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ প্রবন্ধটি একই প্রবন্ধের সর্বশেষ তৃতীয় পাঠ। প্রথম দুটি পাঠে বাংলার রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে যে-সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, মতিচুর প্রথম খণ্ডে সংকলিত ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’তে মুসলিম সমাজ অনেকটাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। রোকেয়া কিছুটা হলেও পিছনে সরে আসেন, ঐতিহ্যের সঙ্গে আপোস করতে বাধ্য হন। মতিচুর প্রকাশের পর মুসলিম সমাজের স্বস্তির আভাস পাওয়া যায় ১৯০৮ সালের ৪ঠা মে প্রকাশিত The Mussalman পত্রিকায় বইটির সমালোচনায়। পত্রিকা লেখে, ‘We have received a copy of the 2nd edition of Mrs. R. S. HossainÕs Motichur and are glad to note certain changes which have made the viwe expressed therein acceptable of people of different shades of opinion.’৯ আর ‘অলঙ্কার না Badge of Slavery’ প্রবন্ধটি পড়ে জনৈকা পাঠিকা প্রতিবাদে রণমূর্তি ধারণ করেছিলেন। লিখেছিলেন, ‘তিনি (রোকেয়া) যেরূপভাবে যথেচ্ছচারিণী রমণী মূর্তি অঙ্কিত করিয়াছেন ও পুরুষ জাতিকে আক্রমণ করিয়াছেন তাহা একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় রমণীর পক্ষে অত্যন্ত নিন্দনীয় হয়েছে।’১০ সেই পাঠিকা অবরোধবাসিনী থাকতেই পছন্দ করেন। ‘আমি পূর্বেও বলিয়াছি, এখনও বলিতেছি স্ত্রীর প্রধান কর্তব্য গৃহে। স্বামী, সন্তান-সন্ততি, পরিবার-পরিজনের সর্বাঙ্গীন উন্নতি ও তাহাদের সুখ-স্বচ্ছন্দতা দেখাই আমাদের প্রধান কর্তব্য। কি করিয়া কোর্টে চষবধফ করিব, তাহা না ভাবিয়া কি করিয়া সন্তানগণকে প্রকৃত মানুষ করিব, কি করিয়া স্বামীর সহধর্মিণী, আরামদায়িনী গৃহলক্ষ্মী হইব, তাহাই চিন্তা করা উচিত।’১১ কেবল মুসলমান নয়, হিন্দুরাও ওই প্রবন্ধটি-পাঠে তাহাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। ১৩১০-এর ভাদ্র মহিলা পত্রিকায় ‘অলঙ্কার না ইধফমব ড়ভ ঝষধাবৎু এবং অর্ধাঙ্গী’ শিরোনামে সম্পাদকীয় লেখেন গিরিশচন্দ্র সেন। সেখানে লেখা হয়, “প্রবন্ধ রচয়িত্রীর প্রতি আমাদের আন্তরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা আছে। তিনি মোসলমান সম্ভ্রান্ত লোকের স্ত্রী। … তিনি বেশ বুদ্ধিমতী। চিন্তাশীল মনস্বিনী কন্যা। বঙ্গীয় মোসলমান-কূলে অসামান্যা নারী বলিয়া আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা, আদর ও সম্মান করি। মোসলমান পরিবারের বধূদিগকে ও কন্যাদিগকে নানা কারণে পুরুষগণ কর্তৃক অনেক প্রকার নিপীড়ন ও ক্লেশ সহ্য করিতে হয়, তিনি ব্যথিত হৃদয়ে সেই ভগিনীদের কল্যাণোদ্দেশে উপরিউক্ত প্রবন্ধ ও ‘অর্দ্ধাঙ্গী’ প্রবন্ধ লিখিয়াছেন, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। এজন্য পুরুষদের প্রতি তাঁহার আক্রমণ কিছু সীমা অতিক্রম করিয়াছে, স্ত্রীস্বাধীনতা বিষয়েও তাঁহার কিছু ভ্রান্ত মত প্রকাশ পাইয়াছে।”১২ ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধের প্রতিবাদ করে ১৩১১ আশ্বিনের নবনূরে এস.এ. আল মুসাভী লেখেন ‘অবনতি প্রসঙ্গে’। তাতে বলেন, ‘ভগ্নী মিসেস আর. এস. হোসেন নবনূরের একজন সুযোগ্য লেখিকা। লেখিকাকে অজস্র ধন্যবাদ দিতে হয়। নারী কখনও সমস্ত বিষয়ে পুরুষের সমতুল্য হইতে পারে না – তাহা হইলে স্বভাবের বিরুদ্ধাচারণ করা হইবে।’১৩ ১৩১১ কার্তিকের নবনূরে নওশের আলী খান ইউসুফজী লেখেন, ‘একেই বলে কি অবনতি?’ মিসেস আর. এস. হোসেন সাহেবার লিখিত ‘আমাদের অবনতি’ পড়িয়া সুখী হইলাম, কিন্তু সকল বিষয়ে একমত হইতে পারিলাম না। …পাঠিকাগণ! সত্যই কি আপনারা দাসী? … অলঙ্কারগুলি কি সত্যই আপনাদের দাসত্বের নিদর্শন? … পোশাকগুলি ছিঁড়িয়া ফেলিয়া
বিবসনা না সাজিলে কি প্রকৃত উন্নতি সাধিত হইতে পারিবে না? …স্বর্গোদ্যানে আপনারাই আমাদের পতনের পথপ্রদর্শক ছিলেন, ট্রয়-সমরের আপনারাই নায়িকা ছিলেন, লঙ্কাকাণ্ড আপনাদেরই পদানুসারে ঘটিয়াছিল। কারবালার সে ভীষণ কাণ্ডেও আপনারাই অভিনেত্রী ছিলেন। তাই ভয় হয় আপনারা আবার জাগিলে না জানি কি কাণ্ড সংঘটিত হয়। আপনারা স্বাধীন হউন ভাল কথা, কিন্তু স্বাধীনতার অপব্যবহার না করেন, ইহাই প্রার্থনীয়।’১৪
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র-মজুমদার মতিচুর বইখানার এক বিরাট সমালোচনা লিখেছিলেন। লেখিকার কোনো কোনো বিষয়ে তিনি ঐকমত্য পোষণ করেন, আবার কোনোখানে দ্বিমত পোষণ করে প্রশ্ন তোলেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘কেবল এই জন্যই বঙ্গসাহিত্য ভাণ্ডারে এ শ্রেণির সর্বপ্রথম গ্রন্থ মতিচুর অমূল্য রত্নখণ্ড। … মতিচুর সত্যই মতিচুর। ইহার লিখনভঙ্গী যেমন বিস্ময়কর, ভাষাও তেমনি মনোহারিণী। ভাষার মধ্যে যে গভীর ভাবরাশি উজ্জ্বলরূপে ফুটিয়া রহিয়াছে, প্রত্যেক পাঠকের নিকট তাহা অন্তত চিন্তার বিষয় হইয়া উঠিয়াছে।’১৫ মতিচুর পড়ে, তাঁর বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্ত ও লোকরহস্য এবং কালীপ্রসন্ন সিংহের ভ্রান্তিবিনোদের কথা মনে পড়ে। এইসব প্রতিক্রিয়ার ফলে মতিচুর প্রথম খণ্ডে ‘আমাদের অবনতি’ ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ নামে প্রকাশিত হয় এবং মূল প্রবন্ধের ২৩ থেকে ২৭ – এই পাঁচটি অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়া হয়। সেই পরিত্যক্ত পাঁচটি অনুচ্ছেদে কী ছিল, তা জানার আগ্রহ পাঠকের থাকতে পারে। মতিচুর গ্রন্থ থেকে বাদ পড়লেও, একবার ছাপা হয়ে যাওয়ার পর তা মানবজাতির সাধারণ সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে তা বাদ দেওয়া যায় না। তাই পরিত্যক্ত অনুচ্ছেদগুলো নিচে উদ্ধৃত হলো :
‘আমাদের যথাসম্ভব অধঃপতন হওয়ার পর দাসত্বের বিরুদ্ধে কখনও মাথা তুলিতে পারি নাই; তাহার প্রধান কারণ এই বোধ হয় যে, যখনই কোন ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে! অবশ্য একথা নিশ্চয়ই বলা যায় না, তবে অনুমানে ঐরূপ মনে হয়। আমরা প্রথমতঃ সহজে মানি নাই, তাহা পরে ধর্মের আদেশ ভাবিয়া শিরোধার্য করিয়াছি। এখন ত অবস্থা এই যে, ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই শুনিতে পাই : ‘প্যাট্! তুই জন্মেছিস্ গোলাম, থাকবি গোলাম!’ সুতরাং আমাদের আত্মা পর্যন্ত গোলাম হইয়া যায়।’
‘শিশুকে মাতা বলপূর্বক ঘুম পাড়াইতে বসিলে, ঘুম না পাওয়ায় শিশু যখন মাথা তুলিয়া ইতস্ততঃ দেখে, তখনই মাতা বলেন : ‘ঘুমা শিগগীর ঘুমা! ঐ দেখ জুজু।’ ঘুম না পাইলেও শিশু অন্ততঃ চোখ বুজিয়া পড়িয়া থাকে। সেইরূপ আমরা যখনই উন্নত মস্তকে অতীত ও বর্তমানের প্রতি দৃষ্টিপাত করি, অমনই সমাজ বলে : ‘ঘুমাও ঘুমাও, ঐ দেখ নরক।’ মনে বিশ্বাস না হইলেও অন্ততঃ আমরা মুখে কিছু না বলিয়া নীরব থাকি।’
‘আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। কোন বিশেষ ধর্মের নিগূঢ় মর্ম বা আধ্যাত্মিক বিষয় আমার আলোচ্য নহে। ধর্মে যে সামাজিক আইন-কানুন বিধিবদ্ধ আছে, আমি কেবল তাহারই আলোচনা করিব, সুতরাং ধার্মিকগণ নিশ্চিন্ত থাকুন। পুরাকালে যে ব্যক্তি প্রতিভাবলে দশজনের মধ্যে পরিচিত হইয়াছেন, তিনিই আপনাকে দেবতা কিম্বা ঈশ্বর-প্রেরিত দূত বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। এবং অসভ্য বর্বরদিগকে শিক্ষা দিতে চেষ্টা করিয়াছেন। ক্রমে যেমন পৃথিবীর অধিবাসীদের বুদ্ধি-বিবেচনা বৃদ্ধি হইয়াছে, সেইরূপ পয়গাম্বরদিগকে (অর্থাৎ ঈশ্বর-প্রেরিত মহোদয়দিগকে) এবং দেবতাদিগকেও বুদ্ধিমান হইতে বুদ্ধিমত্তর দেখা যায়।’
‘তবেই দেখিতেছেন, এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষ-রচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে-কথা শুনিতে পান, কোন স্ত্রী মুনির বিধানে হয়ত তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। কিন্তু স্ত্রীলোকদের সেরূপ যোগ্যতা কই যে, মুনিঋষি হইতে পারিতেন? যাহা হউক, ধর্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বর-প্রেরিত কিনা, তাহা কেহই নিশ্চয় বলিতে পারে না। যদি ঈশ্বর কোন দূত রমণী-শাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত বোধ হয় কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না। দূতগণ ইউরোপে যান নাই কেন? আমেরিকা এবং সুমেরু হইতে কুমেরু পর্যন্ত যাইয়া ‘রমণী জাতিকে নরের অধীন থাকিতে হইবে’ ঈশ্বর এই আদেশ শুনান নাই কেন? ঈশ্বর কি কেবল এশিয়ারই ঈশ্বর? আমেরিকায় তাঁর রাজত্ব ছিল না? ঈশ্বরপ্রদত্ত জলবায়ু ত সকল দেশেই আছে, কেবল দূতগণ সর্বদেশময় ব্যাপ্ত হন নাই কেন? যাহা হউক, এখন আমাদের আর ধর্মের নামে নত মস্তকে নরের অযথা প্রভুত্ব সহা উচিত নহে। আরও দেখ, যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। প্রমাণ – সতীদাহ। (পাদটীকা : একজন কুলীন ব্রাহ্মণের মৃত্যু হইলে তাঁহার শতাধিক পত্নী সহমৃতা হইতেন কি?) যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন। এস্থলে ধর্ম অর্থে ধর্মের সামাজিক বিধান বুঝিতে হইবে।” “কেহ বলিতে পারেন যে, ‘তুমি সামাজিক কথা বলিতে গিয়া ধর্ম লইয়া টানাটানি কর কেন?’ তদুত্তরে বলিতে হইবে যে, ‘ধর্ম’ শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে; ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন। তাই ‘ধর্ম’ লইয়া টানাটানি করিতে বাধ্য হইলাম। এজন্য ধার্মিকগণ আমায় ক্ষমা করিতে পারেন।’ (নবনূর, ২য় বর্ষ, ৫ম সংখ্যা, ২১৬-২১৮ পৃষ্ঠা)১৬
ধর্ম, ধর্মপুস্তক ও পয়গাম্বরদের সম্পর্কে এমন শক্ত কথা কোনো বাঙালি মুসলমান, নারী কিংবা পুরুষ, কখনো উচ্চারণ করেছেন কিনা, সন্দেহ আছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে, সেটা স্বাভাবিক বিষয়। সে-প্রতিক্রিয়ার সামান্য নমুনা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় চোখে পড়ার মতো। তা হলো রোকেয়ার বক্তব্যের বিরুদ্ধে যাঁরা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, তাঁরা কেউ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁর গলা কাটতে যাননি। তাঁকে ‘কাফের’ বলে দেশত্যাগে বাধ্য করেননি। প্রতিবাদের জন্যে তাঁরাও কলমই বেছে নিয়েছিলেন। এবং তাঁদের বক্তব্যে তেমন কোনো উগ্রতাও প্রকাশ পায়নি। ব্রিটিশ সরকার যখন তার সাম্প্রদায়িক অস্ত্রে ধার দেওয়ার জন্য মুসলিম লীগ-প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকে মারাত্মক জায়গায় নিয়ে যাবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ঠিক তার আগ মুহূর্তে রোকেয়া তাঁর এটম বোমাটি ছাড়লেন। কতবড় সাহসী না হলে, তাঁর পক্ষে এটা সম্ভব হতো না। আজকের বাংলাদেশের দিকে চেয়ে মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা এগিয়েছি, না পিছিয়েছি?
একথা ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে, সেকালে সমগ্র মুসলিম সমাজ রোকেয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। রোকেয়াকে সমর্থন করে অনেকেই সরাসরি পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেছিলেন। তাঁদের একজন আবুল হুসেন। তিনি মতিচুর (প্রথম খণ্ড) এবং ঝঁষঃধহধ’ং উৎবধস (প্রথম প্রকাশ ১৯০৮) বই দুখানার আলোচনা করেছিলেন এবং তা যথাক্রমে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার কার্তিক ১৩২৮ এবং সাধনা পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩২৮ সালে প্রকাশিত হয়। মতিচুর (১ম খণ্ড) পুস্তক-পরিচয়ে তিনি লেখেন, ‘আমাদের দুর্গতি আরম্ভ যে কোথায়, তাহাই লেখিকা তাঁহার প্রাঞ্জল, সুরুচিসদ্ভাবপূর্ণ, দৃষ্টান্ত-বহুল সরল অকপট মাধুর্যময় রচনা দ্বারা দেখাইতে যাইয়া স্বকীয় বেদনার অনুভূতিকে প্রতি ছত্রে ফুটাইয়া তুলিতে সক্ষম হইয়াছেন। লেখিকা বঙ্গীয় মোসলেম নারী-সমাজের আদর্শ। তাঁহার অবরুদ্ধা অবলা ভগিনীগণের দুরবস্থা দেখিয়া তাহাদিগকে জ্ঞান, শিক্ষা, নীতি, কর্ম ও স্বাধীনতায় প্রবুদ্ধ করিবার জন্য তিনি এই পুস্তকখানি লিখিয়াছেন। পুরুষের নিদারুণ স্বার্থপরতা, শাসন-নীতি ও কঠোর পশুশক্তির ফলে নারীকে যে কিরূপ জঘন্য জীবন-যাপন করিতে হইতেছে, আর তাহাতে সে সমাজ ও দেশের কত অকল্যাণ ও অনর্থ ঘটিতেছে, তাহাই অতি সংযত ভাষা ও কোমল শ্রদ্ধার সহিত লেখিকা দেখাইতে প্রয়াস পাইয়াছেন। …পুস্তকে তিনি পুরুষের বিরুদ্ধে এমন কিছু বলেন নাই, যাহাতে পুরুষেরা আপত্তি করিতে পারে। আমার মনে হয়, পুরুষের অপরাধের তুলনায় তাহাদিগকে তদপেক্ষা আরও অধিক কষাঘাত করা উচিত ছিল।’১৭
সুলতানার স্বপ্ন সম্পর্কে লেখেন, ‘Sultana’ং উৎবধস-এর মধ্যে পুরুষকে অবরুদ্ধ করিবার একমাত্র হেতু : আমাদের নারীজাতির দাসত্ব, অর্থাৎ পুরুষের উপর একান্ত নির্ভরতা। পুরুষ না হইলে আমাদের নারী একেবারে অকর্মণ্য ও অসহায়, মূর্খ ও অজ্ঞ বলিয়া সে পুরুষের উপর তাহার জীবনের মাত্র অস্তিত্বটুকুর জন্য নির্ভরশীল, এ-কথা কেবল পুরুষের দ্বারাই নিখিল বিশ্বে ঘোষিত হইয়াছে, এবং সেই ঘোষণা দ্বারা নারীও তাহার শক্তি আছে – এ-কথা বিশ্বাসই করিতে পারে না। পক্ষান্তরে, নারী যে ক্ষমতাসম্পন্ন, সে যে পুরুষের মতো, এমনকি তদপেক্ষা অধিকতর প্রতিভাবতী হইতে পারে, তাহার শক্তিকে জাগ্রত করিলে যে প্রকৃতিকে নিজের আয়ত্তাধীন করিয়া পুরুষের বিন্দুমাত্র সাহায্য ব্যতিরেকে সে দুনিয়ার বুকে নির্মল, সৌন্দর্য, সম্পদ ও কল্যাণের বিরাট ক্ষেত্র সৃষ্টি করিতে পারে, তাহা ঐ খধফু খধহফ-এর নারীদের ক্ষমতার দৃষ্টান্ত দ্বারা মিসেস আর. এস. হোসেন অতি অসহায়া বঙ্গীয়া নারী-হৃদয়ে আত্মবিশ্বাস ও আত্মশক্তির বীজ বপন করিবার উদ্দেশ্যে বোধ করি এই SultanaÕs Dream রচনা করিয়াছেন।’১৮
এই মহীয়সী নারীর মহাপ্রয়াণে (৯ই ডিসেম্বর, শুক্রবার ভোর ৫.৩০ মিনিট, ১৯৩২) সমগ্র কলকাতায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন সংস্থা, সমিতি এবং বাংলার গভর্নর ও কলকাতাবাসীর পক্ষ থেকে শোকসভার আয়োজন করা হয় এবং মরহুমার কীর্তির কথা স্মরণ করা হয়। বাংলার তৎকালীন গভর্নর John Anderson কর্তৃক প্রেরিত শোকবার্তায় বলা হয়, ‘I was exceedingly sorry to learn the sad news. I have heard the late Mrs. R. S. Hossain described pioneer of higher education among Muslim girls in this province and her services as founder and principal of the Sakhawat Memorial School must ensure for her memory a high place in the affection of her community and sex .’১৯ ১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কলকাতা করপোরেশন কর্তৃক গৃহীত শোকপ্রস্তাব। সে-প্রস্তাবে বলা হয়, ‘This corporation places on record itÕs sense of deep regret at the sad and sudden demise of Mrs. R. S. Hossain, a pioneer of female education among Mussalmans in bengal and the founder of the Shakhawat Memorial School for girls which long remain as a striking memorial to her indefatigable industry, uncommon organising power, an unselfish devotion to the cause which she had at heart.’২০ নিখিলবঙ্গ মুসলিম মহিলা সমিতি, বঙ্গীয় পরিশীলন সমিতি, নিখিলবঙ্গ মুসলিম ছাত্র সমিতি এবং বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদের যৌথ উদ্যোগে ১৫ই ডিসেম্বর ১৯৩২ কলকাতার এ্যালবার্ট হলে এক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন মিসেস পি. কে. রায়। মিসেস রায় তাঁর ভাষণে বলেন যে, রোকেয়ার কাছে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। ১৮ই ডিসেম্বর নিখিলবঙ্গ মুসলিম মহিলা সমিতির শোকসভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয় যে, তিনি ছিলেন ‘a born fighter for the causes of women, a pioneer of female education, the first and best authoresses of Bengal and the foundress of the Shakhawat Memorial GirlÕs H. School.’২১ মুসলিম মহিলা সমিতি তাঁর নামে বেনিয়াপুকুর রাস্তা কিংবা অন্য যে-কোনো রাস্তার নামকরণ করার দাবি জানায়। এছাড়া তাঁর মৃত্যুতে সম্পাদকীয়তে শ্রদ্ধা প্রকাশ করে মাসিক মোহাম্মদী (পৌষ ১৯৩৯); The Statesman (December 10, 1932); The Mussalman (December 10, 1932)।
রোকেয়ার মৃত্যুর পর দেশে অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক পট-পরিবর্তন হয়েছে। বাঙালি মুসলমান আজ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মালিক হয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি বহু আকাক্সিক্ষত চাকরি পেয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, ডাক-সাইটে আমলা হয়েছেন, সেনাবাহিনীর জেনারেল হয়েছেন, অফিসের ‘বড় সাহেব’ হয়েছেন, প্রেসিডেন্ট-মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, এ-সবই সত্যি কিন্তু সংস্কৃতি-নির্মাণে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মেধা-মনন-চর্চার সর্বক্ষেত্রে এদেশের মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত শ্রেণি অব্যাহতভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন, সে-বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ হয়েছে অতি দ্রুত। তাই তারা মধ্যবিত্ত বাসনই থেকে গেছেন। এক ইঞ্চি বড় হতে পারেননি। রোকেয়ার লেখা পড়লে এটি স্পষ্ট হয় যে, সৃজনশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক বড় প্রতিভাবিকাশের জন্য দরকার বড় মাপের একটি সংস্কারমুক্ত সমাজকাঠামো, যেখানে নির্ভয়ে প্রত্যেকে নিজের নিজের কাজ করার স্বাধীনতা পায়; সৃজনশীল প্রতিভাবিকাশের সুযোগ পায়; ভাবের আদান-প্রদান ও গ্রহণ-বর্জনের পালাটি সেখানে তার স্বাভাবিক গতিতে অগ্রসর হতে পারে; যেখানে স্ব-ঘোষিত কোনো ‘অভিভাবক’ এবং ‘সংস্কারবদ্ধ’ সমাজ ‘ডান্ডা’ নিয়ে মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। তাই রোকেয়া অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে বড়বোন করিমুন্নেসার স্মৃতির উদ্দেশে লিখেছিলেন, “সমাজ তাঁহাকে গলাটেপা করিয়া না রাখিলে করিমুন্নেসা সাহেবা দেশের একটি উজ্জ্বল রত্ন হইতে পারিতেন।”২২ একই কথা রোকেয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই ‘গলাটেপা’ সমাজ তাঁকে পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ দেয়নি।
একাত্তরের ‘স্বাধীনতার’ পর কেউ কেউ ভাবতে শুরু করেছিলেন যে, আমরা সে-সমাজ পেয়েছি। কিন্তু সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র, লুটেরা ধনিকতন্ত্র এবং একাত্তরের পরাজিত ধর্মব্যবসায়ীরা একত্রে নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে বাংলাদেশের মেধা, মনন ও প্রতিভাবিকাশের বিরুদ্ধে ‘ডান্ডা’ হাতে দণ্ডায়মান। রোকেয়ার মূল লড়াই ছিল এদেরই বিরুদ্ধে।
তথ্যসূত্র :
১। অধ্যাপিকা মাজেদা সাবের : সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল এ্যালামনাই এসোসিয়েশন স্মরণিকা, ঢাকা, ১৬ই মার্চ, ২০০১।
২। মুহম্মদ শামসুল আলম : রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন : জীবন ও সাহিত্যকর্ম, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, পৃ ৮৪।
৩। রোকেয়া রচনাসংগ্রহ, সম্পাদক : ড. মীরাতুন নাহার, বিশ্বকোষ পরিষদ কলকাতা, ৯ ডিসেম্বর ২০০১, ভূমিকা, পৃ ৮।
৪। ঐ, পৃ ৮।
৫। রোকেয়া ‘লুকানো রতন’, বেগম রোকেয়া রচনাবলী, সম্পাদক : আবদুল কাদির, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, জুন ১৯৮৪, পৃ ২৬২।
৬। ড. গোলাম মুরশিদ ‘ঐতিহ্যের সঙ্গে আপোষ, বেগম রোকেয়ার নারীমুক্তি ভাবনা’ জিজ্ঞাসা, বর্ষ ১, সংখ্যা ৩, কার্তিক ১৩৮৭, পৃ ৩১৪।
৭। রচনাবলী, সম্পাদক : আবদুল কাদির, প্রাগুক্ত, পৃ-২৯১।
৮। ড. গোলাম মুরশিদ, প্রাগুক্ত, পৃ ৩২৬।
৯। রোকেয়া রচনাসংগ্রহ, প্রাগুক্ত, পৃ ৫৭৬-৭৭।
১০। ঐ, পৃ ৫৭০।
১১। ঐ, পৃ ৫৭১।
১২। ঐ, পৃ ৫৬৮।
১৩। ঐ, পৃ ৫৭১।
১৪। ঐ, পৃ ৫৭১-৫৭২ এবং বেগম রোকেয়া রচনাবলী, প্রাগুক্ত, পৃ ১২।
১৫। ঐ, পৃ ৫৫২।
১৬। বেগম রোকেয়া রচনাবলী, প্রাগুক্ত, সম্পাদকের নিবেদন, পৃ ১১-১২।
১৭। রোকেয়া রচনাসংগ্রহ, প্রাগুক্ত, পৃ ৫৬৬-৫৬৭।
১৮। ঐ, পৃ ৫৭৬।
১৯। ঐ, পৃ ৫৮২।
২০। ঐ, পৃ ৫৮২।
২১। ঐ, পৃ ৫৮৪।২২। বেগম রোকেয়া রচনাবলী, ‘লুকানো রতন’, প্রাগুক্ত, পৃ ২৬২।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.