মুল্ক রাজ আনন্দ

দলিতজনের লেখক

সুরেশ রঞ্জন বসাক

মুল্ক রাজ আনন্দ প্রয়াত হলেন গত ২৮ সেপ্টেম্বর, নিরানব্বই বছর বয়সে। প্রায় শতাব্দী-বয়সী এ-মানুষটি একাধিক কারণে বিখ্যাত। তিনি ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সাহিত্য ও শিল্প-সমালোচক। তিনি গান্ধিভক্ত, মার্কসভক্ত। ভারতের স্বাধীনতা-আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলেন। এসব কৃতিত্ব অনেকের আছে। তিনি ছাড়াও বহু ভারতীয় বিখ্যাত লেখক আছেন, সাহিত্য-শিল্প-সমালোচক আছেন, আছেন সত্যাগ্রহী ও বাম-দার্শনিক, কিন্তু কেউ মুল্ক রাজ আনন্দ নন। তিনি তাঁর মাতৃভাষায় লেখেননি, লেখেননি হিন্দিতেও। লিখেছেন ইংরেজিতে। তিনি ক্ষত্রিয়, উচ্চবর্ণের মানুষ। অথচ বলেছেন সমাজের দলিত, অবহেলিত, প্রান্তিক মানুষদের কথা। গান্ধি হরিজনদের ছয় হাজার বছরের অস্পৃশ্যতা ঘোচাতে চেয়েছিলেন সমাজে। আনন্দ তাদের কথা লিখেছেন সাহিত্যে। এমনভাবে লিখেছেন যা আগে কেউ লেখেননি। এমন ভাষায় লিখেছেন যা তখনকার হরিজনদের তো নয়ই, অধিকাংশ ভারতীয়রও বোধগম্য ভাষা ছিল না – সাহেবদের ভাষায়। কার্ল মার্কস সাম্যবাদী সমাজের কথা বলেছেন, প্রলেতারিয়েতদের কথা বলেছেন আর্থরাজনৈতিক দর্শনের ভাষায়। আনন্দ তাদের কথা বলেছেন সাহিত্যে, কমিউনিস্টদের মতো করে নয়, মানবতাবাদীদের মতো করে। দারিদ্র্য, শ্রম ও শ্রমিকের কথা বলেছেন এমন ভাষায়, যে-ভাষা তারা বোঝে না। তিনি সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। পাঞ্জাব, কেমব্রিজ ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তাঁর হওয়ার কথা ছিল নব্য-সাহেব। তিনি তা হননি। তিনি ভারতীয়ই রয়ে গেছেন। আর কে নারায়ণ, রাজা রাওয়ের মতো মুষ্টিমেয় অগ্রপথিক ভারতীয় লেখকদের মতো তিনি রাজনৈতিক-সামাজিক উপনিবেশবাদের পাশাপাশি ভাষাগত ঔপনিবেশিকতাকে মোকাবিলা করেছিলেন একান্তই ঔপনিবেশিক ইংরেজি দিয়ে – ‘to write back to the empire| বলেছেন নিজেদের কথা, নিজেদের মধ্যে যারা নিজেদের নয় তাদের কথা, বহিরাগতদের কথা, আরো অনেকের কথা- যা অমন করে তাঁর মতো অপরিমেয় ভালোবাসায়, অমিত সাহসে, একটি বর্ণাশ্রমশাসিত সমাজে, একটি ঔপনিবেশিক শক্তিশাসিত রাষ্ট্রযন্ত্রে, এমনকী একটি দ্বিধাবিভক্ত উপমহাদেশে কেউ বলতে সাহস পাননি।

মুল্ক রাজ আনন্দ এমন এক সময়ে লিখতে শুরু করেছেন যখন ভারতবর্ষে চলছে উপনিবেশ ও উত্তর-উপনিবেশের ক্রান্তিকাল। সবচেয়ে দুর্যোগপূর্ণ শতাব্দীটিই তাঁর জীবনকাল। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা-আন্দোলন, ঔপনিবেশিক শক্তির প্রস্থান, দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় – কী কঠিন ঘটনা-দুর্ঘটনাময় একটি শতক। তাঁর জীবনের বিয়াল্লিশ বছর কেটেছে ইংরেজ-শাসনে এবং সাতচল্লিশ বছর (১৯০৫-২০০৪) কেটেছে স্বাধীন ভারতে। তাঁর বাবা সুবেদার লাল চাঁদ আনন্দ ছিলেন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান রেজিমেন্টের অল্প কজন শিক্ষিতের একজন। তিনি ছোটবেলায় রেজিমেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মেথরদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলা করে বড় হয়েছেন। কৌলীন্যবাদের ছুতমার্গে প্রভাবিত না হয়ে তিনি তাদের ভালোবেসেছেন। যে-ট্রাজেডির শিকার হওয়া থেকে তিনি জন্ম ও বর্ণের কারণে বেঁচে গেছেন, সে-ট্রাজেডিই তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। এক্ষেত্রে গান্ধির আদর্শও তাঁকে প্রাণিত করেছে। তাই যখন লেখকের কলম হাতে নিলেন, তাদের কথাই বলতে চাইলেন। কিন্তু ১৯৩০-৩৫-এর দিকে, ‘তাদের’ কথা বলা – তাঁর মতো করে এমনভাবে বলা সহজ ছিল না। তখন পড়ার সুযোগ হলো একটি অসাধারণ উপন্যাস, তাও এক ইংরেজ সাহেবের লেখা। সেই থেকে এক বিস্ময়কর সখ্য ও দর্শনের জন্ম – Untouchable -এর স্রষ্টার আরেক ধরনের জন্ম।

ই এম ফস্টারের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী I A Passage to India -র চল্লিশ বছরপূর্তিতে ভারতীয় লেখকদের শ্রদ্ধাঞ্জলি E M Forster : A Tribute গ্রন্থে মুল্ক রাজ আনন্দ লিখেছিলেন : ‘এই শতাব্দীর সম্ভবত আপনিই একমাত্র ইংরেজ যিনি ভারতবর্ষের মানুষকে বুঝতে পারার মতো যথেষ্ট কাছাকাছি এসেছিলেন…।’ ১৯২৪ সালে যখন A Passage to India বেরোয়, আনন্দের বয়স তখন মাত্র উনিশ এবং তখন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ভারতবর্ষের ওপর এমন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন উপন্যাস অন্য কোনো ইংরেজ অন্তত তখনো পর্যন্ত লেখেননি। আমরা জানি, আনন্দ শুধু এ-ধারায় নয় – এ-ধারার অনুবর্তী, আরো মাটিলগ্ন ও আরো শেকড়সচেতন এবং বিপ্রতীপ – ইউরোপকেন্দ্রিকতার উলটোপথে, উপন্যাস-লেখার তাগিদটিও পেয়েছিলেন A Passage to India থেকে।

ফস্টার ও আনন্দ কেউ হরিজন নন, নন প্রান্তিক মানুষ। আমরা আগেই বলেছি, একজন ইংরেজ সাহেব এবং অন্যজন পাঞ্জাবি ক্ষত্রিয়। দুজন দুই উচ্চতা (?) থেকে দুই মাত্রায় দলিতদের দেখেছেন, একজন বহিরাগত হিসেবে, আরেকজন বর্ণগত দূরত্ব সত্ত্বেও স্বদেশী হিসেবে। ফস্টার লিখেছেন, তিনি একবার তাঁর A Passage to India-র একটি পুরানো কপি হাতে পেলেন। প্রথম পৃষ্ঠায় এক কর্নেল পাঠক লিখে রেখেছেন : ‘পড়া হলে পুড়িয়ে ফেলুন। লেখকের নোংরা মন, ২১৫ পৃষ্ঠায় দেখুন।’ কৌতূহলী ফস্টার ২১৫ পৃষ্ঠা খুলে পড়লেন, ‘চন্দ্রপুরের মেথররা ধর্মঘটে গেছে, ফলে অর্ধেক কমোড নির্মনুষ্য ও হতশ্রী হয়ে আছে। এই যদি বিবমিষার কারণ হয়, মুল্ক রাজ আনন্দের Untouchable-এর প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত?

আনন্দ স্বীকার করেছেন, শবরমতি আশ্রমে থাকাকালে তিনি যদি ফস্টারের দলিতজনদের প্রতি সহানুভূতির প্রমাণ না দেখতেন, তাঁর প্রথম উপন্যাস অস্পৃশ্য লেখা হতো না। মজার অথচ দুঃখের বিষয়, ‘এর নোংরামির জন্যে’ সতেরো জন প্রকাশক এ-উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি ছাপার অযোগ্য বলে ফেরত দিয়েছিলেন। ই এম ফস্টারের একটি সাধারণ মুখবন্ধ সংযুক্ত হলে তা উইশার্টের মতো দামি প্রকাশকের কাছেও দামি হয়ে যায় এবং শুরু হয় আনটাচেবল ক্রেজ ও বিদেশী ভাষায় অনুবাদের হিড়িক। বইটা কি আসলে নোংরা নাকি পরিচ্ছন্ন? ফস্টারই জবাব দিয়েছেন, ‘The book seems to me indescribably clean and I hesitate for words in which it can be conveyed’। ফস্টার নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন, যে-বই তিনি লিখতে পারেননি, যা তার পক্ষে লেখা সম্ভব ছিল না, তা উচ্চবর্ণীয় আনন্দ পেরেছেন অনবদ্য সারল্যে ও সহমর্মিতায়। তিনি আরো লিখেছেন, ‘It recalled to me very vividly the occasions I have walked the wrong way in an Indian city, and it is a way down which no novelist has yet taken me’। আনন্দ এ-কাজটি করেছিলেন বর্ণপ্রথাশাসিত এক কঠোর, অনালোকিত সমাজে যেখানে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের নিজেদের স্বার্থে বর্ণাশ্রমকে সমর্থন যুগিয়েছে। এর পরপর প্রকাশিত প্রতিটি বইতে তিনি এক-একটি অন্ধকার জগৎকে উন্মোচন করেছেন কখনো শ্রমের রাজ্যে (coolie), কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে (Across Black Waters), কখনো দেশভাগে (Death of a Hero), কখনো বা উপনিবেশের উপনিবেশে (Death of a Hero)। আরো ছোট পরিসরে অসংখ্য ছোটগল্পে এবং আত্মজীবনী, শিল্প ও সাহিত্য-সমালোচনায় তিনি নতুন নতুন আঙ্গিকে সেই অন্ধকার-উন্মোচনের কাজ করে গেছেন আজীবন।

আঠারো বছরের শক্তসমর্থ মেথর যুবক বাখা Untouchable -এর নায়ক। সে এই উপন্যাসে দলিত সমাজের একাংশের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি হলেও মেথর, ছুহরা, ঝাড়ুদার, বাল্মীকি ও হরিজন – পাঁচটি বড় দলিতগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। সোজা ভাষায়, আমরা যাদের মুচি, মেথর, ডোম, ঝাড়ুদার বলি। বাখার একটি পূর্ণ কর্মদিবসের আখ্যানই হচ্ছে অস্পৃশ্যর কাহিনী। রাত ভোর হবার অনেক আগেই বাবার ডাকে বাখার ঘুম ভাঙে। ঘরের উঠোনে হাবিলদার চরণ সিং হুংকার দেয় বাখা এসে যেন ল্যাট্রিন পরিষ্কার করে দেয়। মা যখন বেঁচে ছিল, এ-সময় এক জগ চা পাওয়া যেত। এখন ঘরে জলও নেই। বোন সোহিনী যাবে জল আনতে। অতএব চা না খেয়েই বাখা কোদাল, ব্রাশ, ঝুড়ি ও ঝাড়ু নিয়ে উচ্চবর্ণদের নিত্যকর্মের জন্যে সহায়ক পবিত্র পরিবেশ-নির্মাণে নেমে পড়ে। ল্যাট্রিনের পর ল্যাট্রিন ঝকঝক করতে থাকে বাখার ছোঁয়ায়। একটানা কাজ করে যখন ফেরে, তখন সোহিনী কেবল কয়লার আগুনে ফুঁ দিচ্ছে। ভাই সাহায্য করে। সোহিনী জল আনতে যায়। অস্পৃশ্যদের আলাদা কুয়োর সামনে তখন ভিড়। কোনো কুলীনের দেখা নেই। যাদেরও বা পাওয়া গেল, তারা জল তুলে কলসিতে ঢেলে দেবার ফালতু কাজে আগ্রহী নয়। অবশেষে এলেন স্থানীয় মন্দিরের পুরোহিত পণ্ডিত কালিনাথ। পণ্ডিতজীর শ্যেনদৃষ্টি বাড়ন্ত সোহিনীর উদ্ধত স্তনযুগল ও নিতম্বের দিকে। তিনি তাকে নিয়ম ভেঙে আগে জল ঢেলে দেন। এ-কোনো মহানুভবতা নয়, নারীদেহের প্রতি স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য ভেদাভেদের বাইরে এক গর্হিত লোভ। পণ্ডিত তাকে মন্দিরের সামনে তার উঠোন ঝাড়ু দিতে আসতে বলে। পণ্ডিতজী পরে তাকে ধর্ষণে উদ্যত হন এবং না পেরে মন্দির কলুষিত করার ধুয়ো তুলে খেদিয়ে দেন। এভাবে কাহিনী গড়ে ওঠে। বাখার একের পর এক অপমানজনক অভিজ্ঞতা, জীবনযাপনের গ্লানি, সাহেবদের প্রতি তার আকর্ষণ ও বিকর্ষণ, উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নির্মম ব্যবহার – এভাবে অসংখ্য কাহিনীর বুননের ভেতর লেখা হয় বাখাদের জীবনকাহিনী।

ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক – উভয়কালে জাতিভেদ-প্রথার মতো সম্পদের অসম বণ্টন আরেকটি নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদের জন্ম দিয়েছে, যা আমরা স্বাধীনতা-উত্তর আনন্দের লেখায় দেখি। আর তারই পূর্বাভাস পাই কুলি উপন্যাসে। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত এ-উপন্যাসের নায়ক পনেরো বছরের এতিম মুন্নো, ভাগ্য যাকে পাহাড়ের বাঁধনহীন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে পুঁতে দিয়েছে লোহালক্কড়ের শহরে। বাসার কাজের ছেলে হিসেবে ক্ষুধা ও নিগ্রহের শিকার মুন্নো শেষ পর্যন্ত নিজেকে সঁপে দেয় নিয়তির হাতে – নেমে আসে পথে। ট্রেনে চড়ে অজানা গন্তব্যে ছোটে। পুত্রহীন প্রভা-দম্পতি তাকে পুত্রস্নেহে কাছে টেনে নেয়। কিন্তু দৌলতপুরেও তার থাকা হয় না। প্রতারিত ও হৃতসর্বস্ব প্রভা-দম্পতির সর্বনাশ মুন্নোকে ঠেলে দেয় কুলিজীবনে। সেখান থেকে বোম্বে এবং বোম্বে থেকে শিমলা। কিন্তু তার ভাগ্যের চাকা শুধু দুর্ভাগ্যের পথেই ঘোরে। দারিদ্র্য ও অপুষ্টির শিকার মুন্নো শেষ পর্যন্ত যক্ষ্মায় মারা যায়। মুন্নোর কাহিনীর ভেতর উঠে আসে সমগ্র ভারতবর্ষের শ্রমস্তর ও শোষণের ধাপগুলো, শোষণের ‘মোডাস অপারেন্ডি’ এবং শোষিত-শোষকদের মুখগুলো। উপনিবেশ কী স্বাধীন, আসলে একই : শাসক ও শাসিতের মধ্যে যে-সম্পর্ক তার অনুরূপ ভার্সন হচ্ছে শাসিতদের মধ্যে বিত্তবান ও বিত্তহীনদের সম্পর্ক। একই দুষ্টচক্র ঠিক বর্ণাশ্রম-চক্রের মতো।

মুল্ক রাজ আনন্দ সাম্রাজ্যিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রচলিত মিথকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তাঁর ঞড়ি খবধাবং রহ ধ ইঁফ উপন্যাসে। ব্রিটিশদের শ্রেষ্ঠত্বের সারমর্ম হলো : ওরা শ্রেষ্ঠ, বাকিরা মর্যাদাহীন, অনুল্লেখ্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবঞ্চিত বর্বর। অর্থশক্তি ও রাজশক্তি তাদের অনুকূলে, অতএব শোষণের হাতিয়ারটি তাদের হাতে এবং সভ্যতার আলো ছড়ানোর স্বআরোপিত দায়ও তাদের। এই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী মিথ। চা-বাগান হচ্ছে মূলত আণুবীক্ষণিক ভারতবর্ষ, যেখানে রাজশক্তির লক্ষ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক শোষণ, যেখানে আইন-শৃঙ্খলার অর্থ হলো শঠতা, দমন-নিপীড়ন-নির্যাতন। এখানে রিগি হান্টের বেয়ারা আফজালকে পলো খেলতে দেওয়া হয় যথেষ্টসংখ্যক খেলোয়াড় নেই বলে। অথচ তাকে গোল করার গৌরব দেওয়া যাবে না, কেননা সে ভারতীয়। এই অন্তঃসারশূন্য শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্বকে আনন্দ হাস্যকর প্রহসনে নামিয়ে এনেছেন।

যুদ্ধ ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে মুল্ক রাজ আনন্দের বলিষ্ঠ উচ্চারণ Across Black Waters। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের ফ্ল্যান্ডারে যুদ্ধরত ভারতীয় বাহিনী জানে না কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, কেন যুদ্ধ। শুধু জানে তারা বেঁচে থাকলে ভালো বেতন পাবে, সুদূর গ্রামে তার বুভুক্ষু বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তানের মুখে অন্ন উঠবে। আর মরে গেলে? তাদের চিন্তায় তা আসে না। জার্মান বাহিনীর গোলাবৃষ্টি, ট্রেঞ্চের ভেতর অসহনীয় জীবন, কখনো কাদাপানি কখনো হাড়কাঁপানো শীত, মৃত্যুকে হাতে নিয়ে সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাওয়া, একে একে সহকর্মীদের মৃত্যু, তারপরও সাম্রাজ্যরক্ষায় প্রজাবাহিনীকে ব্যবহার – শুধু যুদ্ধের নির্মমতা নয়, অভাবের নির্মমতাকেও স্পষ্ট করে তোলে। যদি অভাবের তাড়না প্রকট না হতো, এসব কৃষক-মজুর কখনো সেপাই হয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে যুদ্ধে যাবার জন্যে নাম লেখাত না। এই যুদ্ধ-উপন্যাস একটি অসাধারণ উপন্যাস, সন্দেহ নেই।

দেশভাগের শিকার মুল্ক রাজ আনন্দ দেশভাগের প্রেক্ষাপটে লিখেছেন ঞযব উবধঃয ড়ভ ধ ঐবৎড় এবং অনেক ছোটগল্প। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা-লাভের পরে কাশ্মিরের মহারাজার ভারত প্রজাতন্ত্রে যোগদান, কাশ্মির-দখলের প্রচেষ্টায় পাকিস্তান কর্তৃক পাঠান সন্ত্রাসীদের প্রেরণ ও তাদের নির্বিচার লুটতরাজ, হত্যা ও ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে কবি মকবুল শেরওয়ানি নিহত হন পাকিস্তানিদের হাতে। তিনি শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও তার প্যাট্রিয়টিক কাউন্সিলের অনুরোধে তার জন্মস্থান বারামুলায় ফিরছিলেন। মকবুল রক্তক্ষয়ী কাশ্মির-সমস্যার অসংখ্য শহীদের একজন। The Parrot in the Cage গল্পের রুক্ষিণী বিভাগোত্তর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার শিকার হাজার হাজার মানুষের মতো ভিটেবাড়ি ছেড়ে অচেনা দেশে পাড়ি জমায়। আনন্দের গল্প-উপন্যাসে এমন অনেক স্থানচ্যুত মানুষের দেখা মেলে।

নারীবাদী-আন্দোলনের ঢের আগে আনন্দ প্রান্তিক নারীদের কথা বলেছেন। ‘খঁষষধনু’ গল্পের ফালিনি, ‘Birth’ গল্পের পার্বতী কর্মজীবী। ফালিনি মেশিনে পাটের গোছা তুলে দিতে দিতে তার মুমূর্ষু সন্তানটিকে কোলে রেখে দোলায় আর তার প্রিয়তমের কথা ভাবে। সন্তানসম্ভবা পার্বতী দুমুঠো অন্নের জন্যে পাথর ভাঙে। পাথর ভাঙতে ভাঙতে একসময় তার প্রসব-বেদনা ওঠে। ‘লজ্জাবতী’ গল্পের লজ্জাবতী দেবর-ননদের অত্যাচারে একবস্ত্রে মাতৃহীন সংসারে বোঝা হয়ে ফিরে আসে এবং গ্লানি এড়াতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ‘Old Woman and the Crow’-এর গৌরীকে বিক্রি করে দেওয়া হয় এক মহাজনের কাছে। সে যখন স্বামীর ঘরে ফিরে আসে, সমাজের চাপে স্বামী তাকে গ্রহণ করে না। তখন তার আত্মহনন ছাড়া বিকল্প থাকে না। আনন্দের গল্প পড়তে পড়তে মনে হয় যেন শরৎচন্দ্র পড়ছি। একই সময়ের ভিন্নভাষী মানুষগুলোর দুঃখ-বেদনা-অপমান-নিগ্রহের ভাষা কিন্তু অভিন্ন।নারদ মুনি নামে খ্যাত মুল্ক রাজ আনন্দ ধারণ করে আছেন ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষকে। তিনি সাম্রাজ্যবাদের প্রগতিশীলতাকে যেমন বাতিল করে দেননি, তেমনি তার সামগ্রিক নষ্ট চরিত্রকেও গ্রহণ করেননি। স্বাধীনতার জন্যে তিনি সত্যাগ্রহ করেছেন, কিন্তু স্বাধীনতার সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়নি বলে সমালোচনা চালিয়ে গেছেন। তিনি সাহেব ও নব্য সাহেবদের ভণ্ডামিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছেন। আমরা মুল্ক রাজ আনন্দের মধ্যে আবিষ্কার করি : ঔপনিবেশিকতাবাদ একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া; এর খোলস বদলায়, আত্মা বদলায় না।