দেরিদার দার্শনিক বিতর্কের জগৎ

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রবল প্রভাবশালী দার্শনিক, সমালোচক ও তাত্ত্বিক জাক দেরিদার খ্যাতি মূলত তাঁর বিনির্মাণবাদ তত্ত্বের জন্য। গত কয়েক দশক ধরে বিনির্মাণবাদ ও দেরিদা শব্দদুটো সমার্থক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মিশেল ফুকোর মতো তাঁর কপালেও প্রশংসার পাশাপাশি জুটেছিল ব্যাপক নিন্দা। বলা হয়ে থাকে, তাঁর প্রবন্ধে বাগ্বাহুল্য ও দ্ব্যর্থকতা প্রবল। তিনি প্রশ্নজিজ্ঞাসায় যতটা আগ্রহী উত্তরপ্রদানে  ততটাই নিস্পৃহ। ফুকো, গাইলস ডিলিউজ, জাঁ বোদরিলার্দের মতো দেরিদাকেও ভঙ্গিবিলাসী (poseur) হিসেবে উপহাস করা হয়। অভিযোগ আছে, সত্যিকার দার্শনিকের যে-রকম সুশৃঙ্খল দৃঢ়তা থাকা দরকার দেরিদার তা নেই এবং সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্পষ্ট ঢঙে তিনি লেখেন বিষয়বস্তুর অন্তঃসারশূন্যতাকে আড়াল করার জন্য। কিন্তু এত কিছুর পরও দেরিদা শব্দ বা স্বন (word), মূলগ্রন্থ বা মূলপাঠ বা লিখিত বয়ান (text), পাঠ (reading) এবং লেখকবৃত্তি (authorship) সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ভাবনার ভিতটিকে প্রবল ঝাঁকুনি দিতে সমর্থ হয়েছিলেন।

১৯৩০ সালের ১৫ জুলাই ফ্রান্স-শাসিত আলজিরিয়ার এক ইহুদি পরিবারে দেরিদার জন্ম। মাত্র দশ বছর বয়স থেকেই তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের প্রতিষ্ঠিত মতাদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। আলজিরিয়া তখন ফ্রান্সের শত্রু-সহযোগী ভিশি-সরকার কর্তৃক নিপীড়িত হচ্ছিল। সেইসময়ে একজন শিক্ষকের কাছ থেকে তিনি ‘ফরাসি সংস্কৃতি নাবালক ইহুদির জন্য সৃষ্টি হয়নি – এমন মন্তব্য শোনেন। এর অব্যবহিত পরেই দেরিদা স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি সন্দেহাতীতভাবে সহজাত মেধার একজন বেপরোয়া ছাত্র হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে সচেষ্ট হন। উনিশ বছর বয়সে তিনি ফ্রান্সের ইকোল নরম্যাল সুপিরিয়রে আসেন দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে। এখানেই তিনি মনোবিশ্লেষক মার্গারেত অক্যুতুরিয়ার দেখা পান, যাঁকে ১৯৫৭ সালে তিনি বিয়ে করেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত স্কুলে পড়ার সময়ে  তিনি মূলত জার্মান দার্শনিক এডমন্ড হাসের্ল ও মার্টিন হেইডেগারের রচনার প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে ওঠেন। এই দুই দার্শনিকের ওপর তাঁর লেখালেখি তাঁকে ১৯৫৬ সালে হার্ভার্ডে পড়ার জন্য একটি বৃত্তি জুটিয়ে দেয়। সেখান থেকে ১৯৬০ সালে প্যারিসের সরবোনে দর্শন পড়তে এসে দেরিদা দুবছর বাদেই হাসের্লের ‘জ্যামিতির উৎসে’র (The Origin of Geometry) অনুবাদ করে তার সঙ্গে মূল রচনার গুরুত্ব খর্বকারী দীর্ঘ এক মুখবন্ধ জুড়ে দিয়ে দার্শনিক হিসেবে নিজের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি তিনটি বীজগর্ভ প্রকাশনার মাধ্যমে তাঁর মৌলিক চিন্তাধারা প্রকাশ করেন। বই তিনটি হলো : বচন ও প্রপঞ্চ (Writing and Difference)), লেখন ও ভিন্নতা (Writing and Difference) এবং ব্যাকরণবিজ্ঞান সম্পর্কে (Of Grammatology)। এইসব রচনা তাঁকে দার্শনিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ২২টি ভাষায় অনূদিত ৪৫টি বইয়ের লেখক দেরিদা ১৯৮৬ সালে আরভিংয়ের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৯০ সাল থেকে সেখানে ‘দেরিদা আর্কাইভস গড়ে উঠেছে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাসের্ল      ও মার্টিন হেইডেগারের ওপর লেখালেখির মাধ্যমেই তিনি লেখকবৃত্তি শুরু করেছিলেন। ‘দর্শনের শেষ’ বলতে হেইডেগার বোঝাতে চেয়েছিলেন সেই দর্শনের শেষ যার শিকড় প্রোথিত অধিবিদ্যায় (metaphysics)। তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, প্রকৃত দর্শনের প্রশ্ন হবে সত্তাকেন্দ্রিক (নবরহম) অর্থাৎ অস্তিত্বের স্বরূপসন্ধানী (ontological), এবং স্বজ্ঞালব্ধ (transcendental) প্রশ্ন অর্থহীন। ষাটের দশকে এসে এই ‘দর্শনের শেষ’ ধারণাটি দাঁড়াল এ-রকম : দর্শন কিছুই নয় পশ্চিমা মূল্যবোধকেন্দ্রিক ভাবাদর্শ ছাড়া। কিন্তু দেরিদা যুক্তি দেখালেন যে, হেইডেগার স্বজ্ঞাবাদকে এড়িয়ে যাননি কারণ তাঁর সত্তার (নবরহম) ধারণাটি স্বজ্ঞালব্ধই। তিনি আরো যুক্তি দেখালেন যে, ভাবাদর্শরূপে (ideology) দর্শনের বিরুদ্ধে যে-অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সহি এবং দর্শনের ভাষায়ই এই অভিযোগের সমতা আনা হয়েছে যা এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। আসলে যা জিজ্ঞাসা করা হয়েছে তা হলো, কতিপয় ভিন্ন ও প্রবল ভাবাদর্শ, যেমন – মার্কসবাদ (দর্শন = শাসকশ্রেণির প্রতর্ক), ফ্রয়েডবাদ (দর্শন = যৌন অভিলক্ষণ) ইত্যাদি দ্বারা কর্তৃত্বব্যঞ্জক ভাবাদর্শ (দর্শন = পশ্চিমা মূল্যবোধের ভাবাদর্শ) প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। দেরিদা হেইডেগারের এই অবস্থান নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। দার্শনিক ঐতিহ্যের মাঝে প্রত্যক্ষ করা ইতিহাসচেতনা শেষ হয়ে গেছে এবং হেইডেগার নিজেও তা থেকে পালাতে পারেননি। কিন্তু দেরিদা প্রশ্ন তুলেছেন যে, দর্শনের সমাপ্তি ঘটলে সেখানে বলার জন্য কী থাকবে, যদিও দর্শন এখনো টিকে আছে কারণ যুক্তি হলো অসীম বা নির্বিকল্প (ধনংড়ষঁঃব) এবং শুধুমাত্র এর নিজস্ব শর্তেই প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হতে পারে। যে-কৌশল তিনি বেছে নিয়েছিলেন তা হলো চাতুরি (duplicity) ও দ্বৈতখেলা (ফড়ঁনষব-মধসব) খেলার নীতি। তিনি যুক্তির ভাষার শরীরে অস্ত্রোপচার করবেন যেহেতু সেখানে আর কিছু নেই, কিন্তু সেখানে এর জন্য ফাঁদ পাতার চেষ্টা করবেন সমস্যা খাঁড়া করে, যার কোনো উত্তর মিলবে না এবং বাহ্যত যুক্তিগ্রাহ্য অবস্থানে দাঁড়িয়ে অন্তর্নিহিত বিরোধকে খোলাসা করে দেখাবেন। তিনি এই কৌশলকে হেইডেগারের Destruktion -এর আদলে Deconstruction বা বিনির্মাণবাদ বলছেন।

হেইডেগারের Destruktion মূলত ছিল ইতিহাসের মাঝে ইতিহাস-অনুসন্ধান। পৃথিবীতে ব্যক্তিসত্তা রোজকার ঘটনাপ্রবাহের মাঝে প্রায়ই ফাঁদে পড়ে এবং উত্তরাধিকার-সূত্রে লালনকৃত ঐতিহ্য ও চেনাজগতের সাহায্যে সে তাকে ব্যাখ্যা করে থাকে। এই অবস্থাকে হেইডেগার বলেছেন পতনতা (fallenness)। যে যথার্থভাবে (authentically) বাঁচতে চায় সে এই প্রাত্যহিকতা এড়িয়ে চলবে এবং মৃত্যুচিন্তায় অভিনিবিষ্ট হবে, আর সেই চিন্তা সম্পাদিত হবে উৎকণ্ঠা (angst) দ্বারা যা একাধারে অতি সরলীকৃত যন্ত্রণা, মৃত্যুভীতি এবং Destruktion -এর মনোজাগতিক চর্চার ফল। Destruktion আজকের নেতিবাচক বিশ্লেষণের সমন্বয় – গড়পড়তা রোজকার পৃথিবী এবং ইতিহাসের ইতিবাচক বিশ্লেষণ, যা স্বীকৃত কর্তৃত্বের কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে যথার্থতা অর্জনের চেষ্টা করে, যার অর্থ হলো ইতিহাসকে খুঁজে বের করতে একটি শব্দকে এর বিভিন্ন অংশে ভেঙে ফেলা।

দেরিদার বিনির্মাণবাদ আরো সীমিত তবে ‘জিজ্ঞাসাবাদের কঠোর রূপ’। যেহেতু বর্ণনারত বিষয়ে (speaking subjcet) এমন কিছু নীরব-এলাকা আছে যেখানে দ্বৈত-এজেন্ট বিনির্মাণকারী যুক্তির (logos) বিধিবিধানের বিরুদ্ধে ধোঁকাবাজির কৌশল প্রয়োগ করে। আর এটি জানার জন্য দুটি শর্ত জানা জরুরি :

১. চাতুরির দ্বৈত খেলা খেলতে দর্শনের ভাষাকে চাতুরিপূর্ণ হতে হবে;

২. কৌশল-প্রণয়নকারী (বর্ণনারত বিষয়, বিনির্মাণকারী) অভিজ্ঞতাবাদের অরক্ষণীয় অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে এবং যুক্তির সত্য (truth of reason) ও বাস্তব সত্যের (truth of fact) মাঝে পার্থক্য মুছে দিয়ে যুক্তির (logos) ক্ষমতাকে ঠেকিয়ে রাখবে। এটি সম্পাদিত হবে প্রভেদ (difference) দ্বারা।

হেইডেগারের কাছে প্রভেদ হলো কালকেন্দ্রিকতার (temporality) ফল। সত্তা শুধুমাত্র ঐতিহাসিকভাবে অতীত সত্তাকে ধারণ করতে পারে, যে-অভিজ্ঞতা পৃথিবী এই মুহূর্তে লাভ করছে সেই অস্তিত্ববাদী সত্তা থেকে আলাদা। এই অর্থে সত্তা কর্তা (subject) হিসেবে সত্তা কর্ম (object) থেকে আলাদা।

দেরিদার difference দুটি ভাবনা ধারণ করে : difference I deference – অর্থাৎ পার্থক্য বা প্রভেদ ও বিলম্ব। দেরিদা হাসের্লের ইতিহাসের প্রপঞ্চবিদ্যাকে (Phenomenology of History) বিনির্মাণ করে এর অসম্ভাব্যতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, ইতিহাসের প্রপঞ্চবিদ্যা যে-প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করে তা হলো, আমাদের জন্য একটি সত্যের সম্ভাবনা কতখানি? যদি একটি সত্য সত্য হয়ে থাকে তাহলে তা হবে সন্দেহাতীত, যে-কোনো প্রসঙ্গেই হবে নিরপেক্ষ। প্রপঞ্চবিদ্যা (phenomenology) সত্যের উৎস সন্ধান করে এবং একটি প্রারম্ভিক বাস্তবতার মাঝে এই উৎসের অবস্থান চিহ্নিত করে যা সংজ্ঞানুযায়ী মাত্র একবার ঘটতে পারে।

প্রপঞ্চবাদী যুক্তি দেন যে, শুধুমাত্র বর্তমানের অস্তিত্ব রয়েছে। অতীত বজায় আছে বর্তমানের মাঝে, একটি অবর্তমান সভ্যতার বর্তমান ধ্বংসাবশেষের মাঝে। ভবিষ্যতের প্রশ্ন হঠাৎ করে উত্থাপিত হয় অথবা অনুমান করা হয়, কিন্তু তাও বর্তমানের মাঝে; যা এখনো আসেনি তাও অবশ্যই হবে বর্তমান এবং বর্তমান ইতোমধ্যে অতীত। এই প্রসঙ্গেই পার্থক্য বা প্রভেদ আসে।

‘প্রভেদ’ বা ‘পার্থক্য’ আবার প্রারম্ভিক বাস্তবতার (inaugural fact) সমস্যা তুলে ধরে। ধরা যাক, কোনো উদ্বোধনী ঘটনার চিহ্ন, যেমন, কোনোকিছুর ভিত্তিপ্রস্তর খুঁজে পাওয়া গেল। এখন খুঁজে পাওয়া অতীত একটি বর্তমান, কারণ বর্তমান বলে মেনে নেওয়ার সমস্ত বৈশিষ্ট্য এর মধ্যে আছে। নিজের সঙ্গে অতীতের এই মিলে যাওয়ার ব্যর্থতাই যতি বা বিলম্বের উৎস।

যদি আমরা ইতিহাসের প্রপঞ্চবিদ্যা গড়ে তুলতে চাই তাহলে আমাদের অবশ্যই, হাসের্ল যাকে মূলসূত্রসমূহের মূলসূত্র (principle of principles) বলেছেন, তাকে সিদ্ধ বলে ধরে নিতে হবে। এই মূলসূত্র হলো, ইতিহাস অর্থবহ এবং যতোই ধোঁয়াটে হোক বা গভীর বিবেচনার বিষয় হোক এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হবে। এটি একস্বরিক। এমনকী এটি যে-কোনো মুহূর্তে পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত হতে পারে না। সত্তা (নবরহম) ও অর্থ (meaning) কখনোই অনন্ততা (infinity) ছাড়া মিলতে পারে না। তাই অর্থ সবসময়ে প্রলম্বিত (deferred) হয়। কোনটি যথার্থ (de jure) এবং কোনটি সত্য (de facto) এমন অবস্থাও কখনোই মিলতে পারে না। কারণ হলো, সত্য ও যথার্থতা এবং সত্তা ও অর্থের মধ্যে উৎসগত পার্থক্য আছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু স্ববিরোধী ধারণা হচ্ছে উৎস বা মূলগত বিলম্বের ধারণা। দেরিদা বলেছেন, যে-জিনিসটি প্রথম বলে আমরা শনাক্ত করি তা প্রথম হয় তাকে অনুসরণকারী দ্বিতীয়ের পরিণতির কারণে। প্রথমকে প্রথম হিসেবে চেনা যাবে একক অস্তিত্ব হিসেবে নয় বরং দ্বিতীয়ের উপস্থিতির কারণে। দ্বিতীয় প্রথম হওয়ার পূর্বশর্ত। দ্বিতীয় প্রথমকে অনুমোদন দিচ্ছে প্রথম হওয়ার জন্য তার বিলম্বিত উপস্থিতির দ্বারা।

একইভাবে আমরা লক্ষণ ও বস্তুকে বিশ্লেষণ করতে পারি। এখানেও আমরা স্ববিরোধী অবস্থানে এসে যাই, কারণ লক্ষণ বস্তুটির আগে চলে আসে। যেমন, কুকুর বললে আমরা বুঝি চারপেয়ে ঘেউ ঘেউ আওয়াজ-তোলা প্রাণী। কুকুর বলার পরই আমরা তাকে চিনতে পারি, কারণ চারপেয়ে প্রাণী আরো আছে। হাসের্লের বিশুদ্ধ উৎস (pure origin) তত্ত্বের বিপরীতে দেরিদা বলছেন, সচেতনতা (consciousness) কখনোই ভাষার (language) আগে আসে না। এখানে কাঠামোবাদ প্রসঙ্গ চলে আসে। কাঠামোবাদ যুক্তি দেখাচ্ছে যে :

১. ভাষার কাঠামো স্বয়ং এক বাস্তবতা হাজির করে, যা আমরা শুধুমাত্র ভাষার মাধ্যমেই চিন্তা করতে পারি। তাই আমাদের বাস্তব-প্রত্যক্ষণের পুরোটাই আকার পেতে বা নিরূপিত হতে পারে ভাষার কাঠামোর দ্বারা।

২. ভাষা আমাদের জানান দেয় যে, অর্থের উৎস ব্যক্তি বা সত্তার অভিজ্ঞতা নয়। বৈপরীত্য ও ক্রিয়াশীলতা এবং প্রতীকী চিহ্ন ও ব্যাকরণ ভাষাকে শাসন করে। অর্থ (meaning) কোনো ব্যক্তি থেকে আসে না, আসে পদ্ধতি (system) থেকে, যার মাঝে থেকে একজন ব্যক্তি কাজ করতে পারেন।

৩. ব্যক্তিকে কেন্দ্রে স্থাপন করে দেখার বদলে কাঠামোবাদ কাঠামোকে কেন্দ্রে স্থাপন করে। অর্থাৎ ব্যক্তি নয় কাঠামোই অর্থের উৎস ও জন্মদাতা। ভাষাই বিশেষ করে সত্তা ও অর্থের কেন্দ্রে স্থাপিত।

আর এই প্রসঙ্গে জাক দেরিদা বলছেন যে, আমাদের মনোযোগ এখনো পদ্ধতি বা কাঠামোর দিকে, যে-পদ্ধতি কেন্দ্রকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করে, ভাবে, সেখান থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি। এটিই শব্দ বা স্বনকেন্দ্রিকতা (ষড়মড়পবহঃৎরপরংস)। কিন্তু প্রতিটি পদ্ধতি বা কাঠামো এক যুগল-বৈপরীত্য (binary opposition) নিয়ে গঠিত এবং এই যুগল-বৈপরীত্যের একটি অংশ অন্যটি থেকে সবসময়েই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের একটি হলো ইতিবাচক (positive) অন্যটি নেতিবাচক (হবমধঃরাব)। যেমন, ভালো-মন্দ যুগল-বৈপরীত্যের মধ্যে ভালোকে পাশ্চাত্য দার্শনিকরা সবসময় অধিক মূল্য দেন এবং মন্দকে (বারষ) ভালোর অধস্তন মনে করেন। দেরিদা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, সমস্ত যুগল-বৈপরীত্য যেমন, আলো-অন্ধকার, পুরুষ-নারী, ডান-বাম ইত্যাদির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য-সংস্কৃতিতে প্রথমটিকে সবসময়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

Of Grammatology-তে দেরিদা যুক্তি প্রয়োগ করেছেন যে, লেখাকে কথার অধস্তনরূপে কল্পনা করা হয়ে থাকে। এটি হয়তো ভালো-মন্দর মতো এত সুস্পষ্ট নয়, কিন্তু ভাষাতত্ত্ব-অনুযায়ী কথ্য ভাষাকে লিখিত ভাষার উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। লেখাটি বক্তব্যের লিখিতরূপ বই আর কিছু নয় এবং বস্তুর এই আধিপত্য-পরম্পরাও শব্দ ও স্বনকেন্দ্রিকতা থেকেই এসেছে। কথিত শব্দ কারো অস্তিত্বের নিশ্চয়তা প্রদান করে যা মূলত মানবতাবাদী ধারণা। দেরিদা উপস্থিতি বা বিদ্যমানতা (presence) ও সত্তার ধারণাকে প্লেটো থেকে দেকার্ত পর্যন্ত পশ্চিমা দর্শনের সমগ্র পদ্ধতির মূল বিষয় বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু উপস্থিতিও উপস্থিতি-অনুপস্থিতি এই যুগল-বৈপরীত্যের একটি অংশ যেখানে উপস্থিতিকে অধিক গুরুত্ববহ মনে করা হয়। কথা বা মুখের ভাষা আর উপস্থিতি বা বিদ্যমানতাকে সম্পর্কযুক্ত মনে করা হচ্ছে এবং উভয়ই লেখনী ও অনুপস্থিতির গুরুত্বকে খর্ব করে দেখছে। মুখের ভাষা ও উপস্থিতি বা বিদ্যমানতার এই আধিপত্যকেই দেরিদা শব্দ বা স্বনকেন্দ্রিকতা বলেছেন, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

বাইবেলের খবঃ there be Light শব্দগুচ্ছকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা যাক। এই শব্দসমষ্টি নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, ঈশ্বর বলে কেউ একজন আছেন, যিনি কথা বলেন এবং যিনি উপস্থিত, কারণ কথা = উপস্থিতি। উপস্থিত ঈশ্বর সবকিছুরই উৎস (কারণ তিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন) এবং ঈশ্বর যা সৃষ্টি করেছেন তা যুগল-বৈপরীত্য যার শুরু আলো-আঁধার দিয়ে। অন্যান্য যুগল-বৈপরীত্যও ধরা যাক : সত্তা-শূন্যতা, যুক্তি-পাগলামি, কথা-নীরবতা, সংস্কৃতি-স্বভাব, মন-দেহ ইত্যাদি। একের অর্থ আছে অন্যের জন্য। যেমন, আলো হলো যা অন্ধকার নয়। সস্যুরের মতে, দ্যোতকের শুধুমাত্র অর্থ অথবা নেতিবাচক মূল্য আছে এবং তা অন্য দ্যোতকের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে। প্রত্যেকটি লক্ষণ এক একটি দ্যোতক, যার দ্যোতক আবার অন্য একটি দ্যোতক। অভিধানে দ্যোতকের অর্থ খুঁজতে গেলে দ্যোতকের আরেকটি লম্বা তালিকা পেয়ে যাবেন। যুগল-বৈপরীত্যের একটি আরেকটি ছাড়া অস্তিত্বহীন। আলো মানে অন্ধকারের আর শুভ মানে অশুভের অনুপস্থিতি। দেরিদা এই আধিপত্যকে উলটে দিতে চাননি। মন্দ ভালোর উপর, অচেতন চেতনের উপর ক্রিয়া করবে, এমন কথা বলতে চাননি। বিনির্মাণবাদ যুগল-বৈপরীত্যের সীমানাকে মুছে দিয়ে দুইয়ের গুরুত্বকে সমানভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়।

সম্পূরক (supplement) পদটি দেরিদা নিয়েছেন রুশো থেকে, যিনি সম্পূরককে দেখেছেন ‘এক অনাবশ্যক বাড়তি হিসেবে যা স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো কিছুতে যুক্ত হয়। দেরিদা বলছেন, যা স্বয়ংসম্পূর্ণ সেখানে কিছুই যোগ হতে পারে না। সম্পূরক সেখানেই যুক্ত হতে পারে যেখানে উৎসগত ঘাটতি (originary lack) আছে। এই অর্থে বর্তমান শুধুই বর্তমান এই শর্তে যে, এটি অনুপস্থিত কোনোকিছুকে পরোক্ষে উল্লেখ করে, যার থেকে সে নিজে আলাদা। অধিবিদ্যা (metaphysics) এই পৃথকীকরণ চিহ্ন মুছে ফেলে, যেমন, অনুপস্থিতির আলামত বা ছায়াচিহ্ন (trace)। আমরা ছায়াচিহ্নকে সংজ্ঞায়িত করতে পারি সেই লক্ষণ হিসেবে যা অনুপস্থিত বস্তু রেখে গেছে যখন সে পূর্বে উপস্থিত ছিল। প্রতিটি বর্তমান নিজেকে বর্তমান হিসেবে জানতে অবর্তমান বা অনুপস্থিতিকে সংজ্ঞায়িত করে এবং তার ছায়াচিহ্ন খোঁজ করে। একটি উৎসগত বর্তমান অবশ্যই একটি উৎসগত আলামত তুলে ধরবে। অতীতের একটি বর্তমান আলামত, যা আগে কখনো ঘটেনি, তা একটি পরম অতীত। এইভাবে দেরিদা বিশ্বাস করেন, তিনি পরম জ্ঞান (ধনংড়ষঁঃব শহড়ষিবফমব) পেরিয়ে একটি অবস্থান-অর্জনে সমর্থ হয়েছেন।

দেরিদা বিদ্যমানতা, চিন্তামগ্নতা বা ধ্যান (meditation), যাকে তিনি দর্শন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তার সঙ্গে অবিদ্যমানতার উপর ধ্যানের সম্ভাবনার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন। তাঁর মতে দর্শন শুধুমাত্র বিদ্যমানতার ভাবনা হতে পারে, কারণ অভিজ্ঞতা বেঁচে থাকে এবং পরীক্ষার মুখোমুখি হয় শুধুমাত্র বর্তমানে। অন্য আরেক ধরনের চিন্তা যা দার্শনিক চিন্তা নয়, সেই কারণে তা ব্যক্তির বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের উপর কোনো আবেদন রাখতে পারে না। পরিবর্তে তা একটি সাধারণ অভিজ্ঞতার উপর আবেদন ফেলে।

লিখিত বয়ানের সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে, প্রত্যেকটিই দ্বৈত বয়ান। এটি দার্শনিক এবং পঠনের একটি স্তরে ধ্রুপদী ব্যাখ্যা দ্বারা অনুধাবন করা হয়। কিন্তু একই সঙ্গে তা ছায়াচিহ্ন এবং বৈপরীত্য (contradiction) উভয়ই ধারণ করে। ধারণ করে একটি দ্বিতীয় বয়ানের নির্দেশনা, যা একটি ধ্রুপদী পাঠ কখনোই উন্মোচন করতে পারে না। কোনো সংশ্লেষ সম্ভব হয় না। দ্বিতীয় বয়ান বিপরীতধর্মী কিছু নয় যার সামঞ্জস্যবিধান করতে হবে। এটির ক্ষেত্রে প্রভেদতত্ত্বের বিনির্মাণবাদী পঠন প্রয়োজন, যাকে দেরিদা দ্বৈতবিজ্ঞান (double science) বলে অভিহিত করেছেন।

অনস্তিত্বের ধ্যান সত্তার ধ্যান। প্রত্যেকটি অধিবিদ্যক গ্রন্থ আপন বয়ান থেকে দেরিদার ভাষায় ‘ক্ষীণ অবলোকিত অবগুণ্ঠন  দ্বারা আলাদা। পঠনের ক্ষেত্রে সামান্যতম নড়চড় একটির সঙ্গে আরেকটির গুলিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট। দেরিদার চাতুরি (duplicity) এই অধিবিদ্যক গ্রন্থকে দুভাগে ভেঙে ফেলে অন্তর্নিহিত বৈপরীত্যকে প্রকাশ করে। মূলপাঠকে স্তরে স্তরে ভেঙে তার লুক্কায়িত অর্থের অনুসন্ধান করে, অর্থাৎ অনুচ্ছেদ থেকে বাক্য, বাক্য থেকে শব্দ আলাদা করে তার গূঢ়ার্থ অনুসন্ধান। তাঁর মতে, কোনো লেখাই সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থ বহন করে না; তাই কোনো গ্রন্থেরই পরিপূর্ণ উপলব্ধি সম্ভব হয় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কোনো গ্রন্থের কোনো মানে নেই। তাঁর বক্তব্য হলো, লেখকের উদ্দিষ্ট বক্তব্যের বাইরে অনুদ্দিষ্ট অনেক অর্থ থাকে যার অনুসন্ধানই বিনির্মাণবাদের লক্ষ্য।

সব মিলিয়ে বিনির্মাণবাদের মৌলিক শৃঙ্খলা হলো : প্রথমত, একটি যুগল-বৈপরীত্য খুঁজে পাওয়া, আধিপত্য-পরম্পরাকে অধিক গুরুত্ব না দিয়ে বিপরীতধর্মী দুটি জিনিসকেই যথাযথ গুরুত্ব-সহকারে দেখা। তারপর কাঠামো বা বৈপরীত্য, যা তাদের আলাদা করে রাখে, তাকে মুছে দেওয়া, যাতে করে কোনটির কারণ কোনটি অর্থাৎ যুগল-বৈপরীত্য অর্থ হারায়। এই পদ্ধতিকেই বলা হচ্ছে deconstruction অর্থাৎ construction/ destruction, যেহেতু নতুন পদ্ধতির যুগল-বৈপরীত্য গঠন করা সম্ভব নয়, আধিপত্য-পরম্পরা ভেঙে প্রাচীন পদ্ধতি ধ্বংস করা সম্ভব নয়, তাই এর কাঠামোর মৌলিক এককের (basic units) বৈপরীত্য ও সমন্বয় এবং কীভাবে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধাচারণ করে তা তুলে ধরতে হবে। দেরিদার ভাষায় তা-ই বিনির্মাণ।

এই জটিল তত্ত্ব ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে দেরিদা নানা সাক্ষাৎকার, সেমিনার, বক্তৃতায় বর্তমান সময়ের দর্শনের মূল প্রশ্ন, নারী দার্শনিক নেই কেন, তিনি নিজে নারীবাদী কিনা, মানুষের হত্যা-প্রবণতার কারণ কী, আমেরিকার সামরিকায়ন ও আধিপত্যবাদী বিদেশনীতি, গণতন্ত্র, দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র, ইরাক-আগ্রাসন ইত্যাদি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত রেখেছেন। ২০০২ সালে ক্রিস্টাইন ম্যাকেনাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেরিদা বর্তমান সময়ের দর্শনের মূল প্রশ্ন কী, সে-সম্পর্কিত এক জিজ্ঞাসার জবাবে বলেছিলেন : প্রথমত, কীভাবে একজন মানুষের জীবন ও জীবনধারণ একসঙ্গে পরিচালনা করা যায়, যা রাজনীতির বিষয়ও বটে। আর এই বিষয়টিই গ্রিক দর্শনে ব্যাপকভাবে বিধৃত হয়েছে, তাই শুরু থেকেই রাজনীতি ও দর্শন গভীরভাবে পরস্পর সম্পৃক্ত হয়েছে। আমরা জীবন্ত সত্তা, আমরা বিশ্বাস করি জীবনকে পালটে দেওয়া সম্ভব এবং অন্যান্য প্রাণী থেকে আমাদের অবস্থানকে আমরা উচ্চে স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছি, যদিও প্রাণী শব্দটি যেভাবে দর্শনে ব্যবহৃত হয়েছে সে-ব্যাপারে আমার বক্তব্য আছে, তবে তা অন্য প্রসঙ্গ। যদিও আমরা মনে করি আমরা প্রাণী নই, যেহেতু আমাদের নিজেদের জীবন শনাক্তকরণের ক্ষমতা আছে। দর্শন যে-প্রশ্নটি সামনে আনে তা হলো : ভালোভাবে বাঁচতে হলে আমাদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ কী করা উচিত? আমার ধারণা এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রগতির স্বাক্ষর আমরা এখনো রাখতে পারিনি।

কেন কোনো নারী দার্শনিকের খোঁজ পাওয়া যায় না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন : যায় না এইজন্য যে, দার্শনিক বিতর্ক যে-ধারায় সংগঠিত হয় তা নারী-শিশু-পশু ও দাস এই চার শ্রেণির অংশগ্রহণকে সংকুচিত, অবদমিত ও মৌন করে দেয়। আর এই কারণেই কোনো নারী দার্শনিক নেই; এটিই বাস্তবতা আর একে অস্বীকার করাটা নির্বুদ্ধিতা। অনেক মহান নারী চিন্তাবিদ আছেন কিন্তু দার্শনিক নেই, কারণ দর্শন একটি বিশেষ ধরনের চিন্তা যা অন্য সব ধরনের চিন্তা থেকে আলাদা। তবে আমরা একটি বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি যখন এই পরিস্থিতি পালটে যাবার ইঙ্গিত লক্ষ করছি।

নিজেকে নারীবাদী ভাবেন কিনা? এমন অরেকটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ভারি এক সমস্যা, তবে এক অর্থে, হ্যাঁ। আমার অনেক কাজের বিষয়বস্তু পুংলিঙ্গ প্রাধিকারের (phallocentrism) বিনির্মাণ এবং অনেকের সঙ্গে আমিও এই প্রশ্নটি দার্শনিক বিতর্কের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলাম। নারীর প্রতি যে-দমনপীড়ন চলে অবশ্যই আমি তার অবসান চাই, যেহেতু বিশেষ করে বিষয়টি পুংলিঙ্গ প্রাধিকারের দার্শনিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু আমাকে নারীবাদী সংস্কৃতির একজন মিত্র বলতে পারেন। কিন্তু তারপরও নারীবাদের কিছু বিষয় সম্পর্কে আমার আপত্তি রয়েছে। আধিপত্য-পরম্পরাকে উলটে দেওয়া এবং প্রথাগতভাবে যে-আচরণ পুরুষোচিত বলে বিবেচিত তার নেতিবাচক দিকগুলো আত্নস্থ করাটা কাউকেই লাভবান করেনি।

মানুষের হত্যাপ্রবণতা হ্রাস পাবে কিনা – এ-বিষয়ে তিনি যা বলেছেন তা রীতিমতো হতাশাজনক হলেও এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা তিনি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এভাবে : হত্যাপ্রবণতা কখনোই দূর হবে না, কারণ এটি মানব-পশুর একটি বৈশিষ্ট্য। এই মানব-পশুর নিষ্ঠুর হওয়ার ক্ষমতা আছে, অন্যদের কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে আনন্দলাভের প্রচেষ্টা আছে। এটি নির্মূল করা সম্ভব নয়, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা হত্যা করার অধিকার পেয়ে গেছি। আর এই প্রবণতা কমিয়ে আনার অসাধ্যসাধনই দর্শনের জটিল বিষয়গুলোর একটি। নৃশংসতা ও বৈরী আচরণ সবসময়েই মানুষের মধ্যে ছিল, কিন্তু তাকে পরিবর্তিত হয়ে সুন্দর ও মহিমান্বিত হতে হয়। যখন আমি লিখি অমুক কাজের মধ্যে বৈরী ভাবাপন্নতা রয়েছে তখন আসলে আমি সেই বৈরিতাকে কার্যকরী কোনোকিছুতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করি। আগ্রাসনকে হত্যা অপেক্ষা আকর্ষণীয় কোনোকিছুতে রূপান্তরিত করা সম্ভব। অবশ্য খুন না করেও আপনি হত্যা করতে পারেন। কাউকে প্রাণে না মেরেও আমি কোনো নারী বা পুরুষকে হত্যা করতে পারি, এবং তার প্রতি ঘৃণার ভাব না দেখিয়েও বৈরী হতে পারি।

মৃত্যুর মাত্র একমাস আগে ১২ সেপ্টেম্বর লিভেল দ্য কুয়েতারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমেরিকার আধিপত্যবাদ, সামরিকায়ন ও একতরফা নীতির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দুর্বল ভূমিকার সমালোচনা করে বলেছেন, ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু এর কাঠামো, প্রদত্ত ক্ষমতা ও পদ্ধতির সংস্কারসাধন প্রয়োজন। আমি এর আমূল সংস্কারের আহ্বান জানাই, যদিও জানি না শীঘ্রই এটি সম্ভব হবে কিনা। কারণ দেরিদার ধারণা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো আমেরিকার পকেটের দেশ এবং তারা মানবাধিকারের প্রতি মোটেও শ্রদ্ধাশীল নয়। আমেরিকার ইরাক আক্রমণকে যারা ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেন, দেরিদা তাদের দলে নন। এ-প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন : আমার প্রকাশ্য বিতর্ক হয়েছে বোদরিলার্দের সঙ্গে, যিনি ইরাকের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে ১১ সেপ্টেম্বরের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে মন্তব্য করেছেন। আমি এই বিবৃতির প্রতিবাদ করেছি, বলেছি, যুদ্ধটা হতোই, ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল আগেই। যখন প্রকৃত ইতিহাস রচিত হবে, তথ্যপ্রমাণ প্রকাশিত হবে, তখন পরিষ্কার হবে যে, ১১ সেপ্টেম্বরের অনেক আগেই ইউরোপের সঙ্গে অতি উচ্চ পর্যায়ের জটিল ও গোপন দরদস্তুর হয়েছে তেল-পাইপলাইন নিয়ে যখন ওই তেলগোষ্ঠী ক্ষমতায় ছিল। সেখানে ষড়যন্ত্র ছিল, হুমকি দেওয়া হয়েছিল। একদিন এটিও হয়তো বের হয়ে আসবে ক্লিনটনের আমেরিকা নয়, ওইদিন বুশ ও তার সহযোগীরা ছিল লক্ষ্য। কিন্তু ভাবনাটি শুধু তেলে থেমে গেলেই চলবে না, সেখানে আরো কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক বিষয় রয়েছে যার মধ্যে চীন, ইউরোপ ও রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার বিষয়াবলি রয়েছে। ইরাক একদা আমেরিকা ও ফ্রান্স উভয়েরই মিত্র ছিল। আর এখনকার ঘটনা কূটনৈতিক অস্থিরতার অংশ, এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত শঠতাপূণর্, শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেই নয়। তেল ছাড়াও আরো অনেক বিষয় আছে। তেল তো মাত্র কয়েক দশকের ব্যাপার, কারণ ৫০ বছর পর আর তেল থাকবে না। তেলের বিষয়টি আমরা বিবেচনায় রাখব কিন্তু সমস্ত মনোযোগ ওর দিকে নিবদ্ধ করব না। এর সঙ্গে ভূখণ্ড-দখলদারিত্ব ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ছাড়াও সামরিক প্রশ্ন জড়িত আছে কারণ সামরিক ক্ষমতা শুধুমাত্র ভূখণ্ড-সম্পর্কিত ক্ষমতা নয়। এখন আমরা জানি যে, এই ক্ষমতা অদখলীকৃত ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ চ্যানেলগুলোও নিয়ন্ত্রণ করে।

লিভেন দ্য কুয়েতার তাঁকে সার্বভৌমত্বের ধারণা-সম্পর্কিত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছিলেন। প্রশ্নটি ছিল : নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিন্যাস, যারা অন্য রাষ্ট্রকে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র নাম দিচ্ছে, তারা কি আলাদা? আপনি আপনার Voyous -এ গণতন্ত্রের স্বতঃপ্রতিষেধক (auto-immunity) ব্যবস্থার ধারণা দিয়েছেন; বলেছেন যে, গণতন্ত্র কোনো এক সংকটময় মুহূর্তে নিজেকে রক্ষার জন্য স্থগিত হয়ে পড়বে। আমেরিকার স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কি এ-রকম ঘটছে না? এর উত্তরে দেরিদা যা বলেছেন তা আমেরিকা-প্রসঙ্গে একেবারে খাঁটি : সার্বভৌম সে-ই যে ব্যতিক্রমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। ব্যতিক্রম ও সার্বভৌমত্ব হাত ধরে চলে। একইভাবে গণতন্ত্র মাঝে মাঝে নিজেকে নিজে হুমকি দেয় এবং স্থগিত করে রাখে; সার্বভৌমত্ব কাউকে আইন স্থগিত রাখতেও অধিকার দেয়। এটিই সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা। সে আইন তৈরি করে, নিজে আইনের ঊর্ধ্বে থাকে এবং প্রয়োজনে আইনকে স্থগিত করতে পারে। এটিই যুক্তরাষ্ট্র করেছে। একদিকে তারা জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদ সম্পর্কে তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে অন্যদিকে ব্যতিক্রমি পুলিশ ও বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমের সূচনা করে নিজদেশের গণতন্ত্রকে খানিকটা হলেও হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। আমি শুধুমাত্র গুয়ানতানামো বন্দিশিবিরের কথা বলছি না, বলছি দেশপ্রেম আইন (Patriot Act) নিয়েও, যার সূচনা থেকেই ঋইও ত্রাসসৃষ্টিকারী জিজ্ঞাসাবাদ-পদ্ধতি অনুসরণ করছে, যা আমেরিকানদের দ্বারাই ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে, বিশেষ করে আইনজীবীদের দ্বারা, যাদের সংবিধান ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।

সত্য বলতে কী, একথা বলার পরও আমাদের মনে রাখা দরকার আমেরিকা একটি গণতান্ত্রিক দেশ। বুশ, যিনি গতবার নির্বাচনে খুবই স্বল্প ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন এবং এ-বছরের নির্বাচনে পরাজয়ের ঝুঁকির মুখে আছেন, সার্বভৌম মাত্র ৪ বছরের জন্য। এটি একটি আইনসিদ্ধ রাষ্ট্র যেখানে যথেষ্ট রাজনৈতিক স্বাধীনতা রয়েছে, যা অন্য অনেক দেশেই নেই। আমি শুধু সেইসব দেশের কথা বলছি না যেখানে গণতন্ত্র নেই, আমাদের পশ্চিম ইউরোপের অনেক গণতান্ত্রিক দেশের কথা বলছি। যুক্তরাষ্ট্রে যখন আমি দেখলাম ইরাকের বিরুদ্ধে আসন্ন যুদ্ধের প্রতিবাদে লাখো মানুষ হোয়াইট হাউসে বুশের অফিসের সামনে বিক্ষোভ করছে, তখন মনে মনে বলেছিলাম যে, যদি ফ্রান্সে এ-রকম হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ইলিসি প্রাসাদের সামনে অবস্থান নিত তাহলে তা কোনোমতেই সহ্য করা হতো না। সত্য বলতে কী, আমেরিকার গণতন্ত্রের এই বিপরীত-চিত্রটি মাথায় রাখতে হবে। একদিকে স্বতঃপ্রতিষেধক-নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে গণতন্ত্র গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে; অন্যদিকে এই আধিপত্যবাদী প্রবণতাই আধিপত্যবাদের সংকট। আমার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যখন সংকটে পড়ে তখন এই আধিপত্যবাদের কারণেই তার কম্পন ওঠে। আধিপত্যবাদী আঘাত ও সংকটের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। যুক্তরাষ্ট্র ভালো করেই অনুধাবন করে যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই চীন ও রাশিয়া উভয়কেই মাপতে হবে। তেল নিয়ে রচিত দীর্ঘমেয়াদি ইরাক-উপাখ্যানের সংকটের সম্পর্ক রয়েছে চীনের তেল-সরবরাহ, মধ্যপ্রাচ্যের তেলের নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির সঙ্গে। এই সবকিছুর কারণে এই লক্ষণ সুস্পষ্ট যে, আধিপত্যবাদ যতটা উৎকট ও উদ্ধত, ততটাই হুমকির মুখে।

দেরিদা প্রচুর ভ্রমণ করতেন। অতিথি অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতেন, সেমিনারে যোগ দিতেন। ১৯৮১ সালে নির্যাতিত চেক বুদ্ধিজীবীদের সাহায্য করার জন্য একটি গোপন সেমিনারে যোগ দিতে তিনি প্রাগে যান। সেখানে তাকে মাদকপাচারের কল্পিত অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর হস্তক্ষেপে তিনি ছাড়া পান এবং চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯৯২ সালে কেমব্রিজে কিছু তরুণ তাঁকে সম্মানজনক ডিগ্রিপ্রদানে বাধাপ্রদান করে। কয়েক মাস ধরে বিক্ষোভপ্রদর্শন চলে, পত্রপত্রিকায় আপত্তি জানিয়ে প্রচুর চিঠি লেখা হয়। কিন্তু সমর্থন দেরিদার পক্ষেই জোরালো ছিল। শেষে তাঁকে সম্মানজনক ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

২০০২ সালে দেরিদার জীবনভিত্তিক একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন এমি জায়ারিং কফম্যান ও কারবি ডিক। ছবিতে তাঁর মতো একজন মহান দার্শনিকের জীবনের কিছু হালকা দিক তুলে ধরা হয়েছে। দেরিদা নাশতা করছেন, পোশাকের রং-নির্বাচন নিয়ে হইচই করছেন, ঘরের চাবি কোথায় রেখেছেন তা মনে করবার জন্য স্ত্রীর ধমক হজম করছেন। একটি দৃশ্যে নিজের লাইব্রেরির মধ্যে পায়চারি করার সময়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, এখানকার সব বই কি আপনি পড়েছেন? না, মাত্র ৪ খানা পড়েছি। তবে তা খুব, খুউব গুরুত্বসহকারে।গত ৮ অক্টোবর পরলোকে চলে গেলেন দেরিদা, কিন্তু দার্শনিক-বিতর্কের যে-দুর্বোধ্য জগৎ রেখে গেলেন তা আগামী বহুদিন মানুষকে ভাবাবে সন্দেহ নেই।