ভূমিকা ও অনুবাদ : হায়াৎ মামুদ
অঞ্চলটির ইতিহাস অন্তত হাজার তিনেক বছরের। বাইবেলের ‘পুরাতন নিয়মে’ ভালোভাবে পাওয়া যাবে, নানা প্রসঙ্গে ও নানান অনুষঙ্গে। মধ্যপ্রাচ্যের গল্পগাথা চুঁইয়ে এসেছে যেভাবে বাংলা পুঁথিসাহিত্যে সেটুকুর ভিতরেও আমরা নামটি ছোটবেলা থেকেই জেনে গেছি : কেনান্। শত শত বৎসরপরিক্রমায় নাম পালটেছে যে কতবার! ফিলিস্তিয়া, ফিলিস্তিন,ুুু প্যালেস্টাইন, জুডিয়া, ইসরায়েল ইত্যাদি। ভূখণ্ডের সীমানাও অবশ্য এক থাকেনি, রদবদল হয়েছে বারেবারে। লেবানন, সিরিয়া, জর্দান, মিশর – সব তিন দিকে, আর একদিকে তো সমুদ্র। চালচিত্রে এই মৃদু ভূগোল-ইতিহাসজ্ঞান থাকাটা জরুরি। কারণ মাহ্মুদ্ র্দাবিশ্ এই ভূমি ফুঁড়ে উঠে-আসা কবি।
প্যালেস্টাইনের তিনটি প্রদেশের একটি হলো গালিলি। উত্তর গালিলি অঞ্চলের আক্কা জেলার আল্-র্বিওয়েহ্ গ্রামে র্দাবিশের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৩ই মার্চ। যখন তাঁর বয়স মাত্র ছয়, ১৯৪৮-এ ইসরায়েলি বাহিনী ওই গ্রাম দখল করে এবং পরে ৪১৬টি গ্রামসহ আল্-র্বিওয়েহ্কে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দেয়। জীবন বাঁচাতে র্দাবিশ্দের পরিবার লেবাননে পালিয়ে যান। পরে যখন দেশে ফিরে এলেন, দেখা গেল – ফিলিস্তিনি আরবদের আদমশুমারি শেষ হয়ে গেছে, তাঁরা দেরি করে ফেলেছেন, এবং শেষ পর্যন্ত বিধি-মোতাবেক পরিচয়পত্র জোগাড় করতে তাঁরা ব্যর্থ হলেন। স্বাধীনভাবে নিজের দেশের ভেতরেই ঘোরাফেরা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল, কর্তৃপক্ষের হাতে বারংবার হয়রানি ও নাস্তানাবুদ হওয়া যেন বিধিলিপি। ষাটের দশকে একাধিকবার তাঁকে গারদে ভরা হলো, বাড়িতেও অন্তরীণ করা হলো। অতঃপর দেশের ভেতরে থাকা, পালিয়ে যাওয়া, ফের ফিরে আসা – এসব ক্রমাগত ও সুযোগ-সুবিধেমতো চলতে থাকবে। পাকাপাকিভাবে দেশ ছাড়লেন ১৯৭১ সালে। ইসরায়েল থেকে কায়রো গেলেন, সেখানে আল্ আহরাম্ সংবাদপত্রে কাজ করতে লাগলেন। দুবছর পর বৈরুত গিয়ে পিএলও-তে যোগ দিলেন এবং ওই সংস্থারই ফিলিস্তিনি প্রসঙ্গ নামে আরবি ভাষায় এক মননশীল পত্রিকার সম্পাদনা-দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হলো। ১৯৮৭ সালে পিএলও-র কার্যনির্বাহী পর্ষদের সভ্যপদ লাভ করেন, কিন্তু ১৯৯৩-এ প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হলে তিনি পদত্যাগ করেন। যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, ‘কার্যনির্বাহী পর্ষদে আমার ভূমিকা নিতান্তই প্রতীকী। আমি ওখানে ছিলাম কোনো টেনশন দেখা দিলে তখন দরকারমতো শান্ত-সুস্থিরতার প্রভাব যেন খাটাতে পারি, তাতে মতপার্থক্যের জায়গাগুলো কমানোয় সাহায্য হতো। আমি তো কখনোই রাজনীতির লোক ছিলাম না। আমি কবিমাত্র, বাস্তবতার বিশেষ পরিপ্রেক্ষিত মগজে বয়ে বেড়ায় এরকম এক কবি।’ ১৯৮২ পর্যন্ত বৈরুতে থেকে পারীতে পাকাপাকিভাবে চলে যান এবং সেখানে ফিলিস্তিনি সাহিত্যপত্র আল্-কার্মাল্ বের করতে থাকেন।
আধুনিক আরবি সাহিত্যে ‘প্রতিরোধের সাহিত্য’ নামে একটি ধারা গড়ে উঠেছে। মাহ্মুদ্ র্দাবিশ্ তার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক প্রতিনিধিত্বমূলক কবি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকেন। তাঁর নিজের স্বীকারোক্তি-অনুযায়ী যাঁদের কবিকৃতি তাঁর ওপর প্রভাব ফেলেছে তাঁরা হলেন ফরাসি কবি লুই আরাগঁ ও পল্ এলুর্য়া, তুরস্কের নাজিম্ হিকমত, হিস্পানি ফেদেরিকো গার্থিয়া লোর্কা এবং চিলোনে পাব্লো নেরুদা।
১৯৯৬ সালে, ছাব্বিশ বছর নির্বাসিত জীবন যাপনের পর, তাঁকে নিজ পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনকে দেখতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তাঁর বান্ধবজন, সতীর্থবৃন্দ, ‘অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু’, সব ফিলিস্তিনি মেতে উঠেছিলেন তাঁকে পেয়ে। হাজার হাজার মানুষ তাঁকে সংবর্ধনা জানায়, তাঁর কবিতা তাদের মুখে মুখে ফেরে। এই স্মৃতি-রোমন্থনে গভীর বেদনায় তিনি বলেছিলেন : ‘যত দিন আমার এ দেহে প্রাণ আছে আমার দেশ ফিলিস্তিনের জন্য আমার নস্টালজিয়ায় কেউ এতটুকুও আঁচড় কাটতে পারবে না।’
১৯৯৭-এ সিমন্ বিতঁ নামে জনৈক ইসরায়েলি-ফরাসি চলচ্চিত্রকার আল্-র্বিওয়েহ্ গিয়েছিলেন র্দাবিশের শৈশবস্মৃতির নিসর্গ ধরে রাখার জন্যে, কিন্তু কিছুই দেখতে পাননি – খাঁ-খাঁ শূন্যতা, পরিত্যক্ত, ঘাসপালা-জঞ্জালে ঢেকে-যাওয়া গোরস্তান ছাড়া। ২০০১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ইসরায়েলিদের বুলডোজার ওইসব কবর খুঁড়ে, মানুষের যেটুকুই স্মৃতি পড়ে ছিল কঙ্কালরাশির ভিতরে – সব তুলে ফেলে দিয়ে, নতুন রাস্তা তৈরির কাজে লেগে যায়। কোনো গ্রাম যে কখনো পৃথিবীর বুকে ঠিক ওইখানটিতে ছিল তার আর কোনো চিহ্নই পড়ে থাকে না। মাতৃভূমি নেই, কিন্তু মাতৃভাষা তো রয়ে যায় মাহ্মুদ্ র্দাবিশের। কাব্য-পঙ্ক্তিতে সেই ঘোষণা উচ্চারণ করেন :
কে আমি? প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করে সবাই, অথচ উত্তর নেই।
আমিই আমার ভাষা, এবং আমিই স্তোত্রপঙ্ক্তি – একটি, দুটি, দশটি।
এই হলো আমার ভাষা। আমিই আমার ভাষা।
ইয়াসির আরাফাত, ফিলিস্তিনি সংগ্রাম ও মাহ্মুদ্ র্দাবিশ্ আজ প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে।
আমরা হাঁটি কোনো-এক দেশের পানে
আমরা হাঁটি কোনো-এক দেশের পানে যা আমাদের রক্তমাংসের নয়,
তার কাঠবাদামের গাছও তৈরি নয় আমাদের হাড়ে,
সলোমন বাদশার গানে কথিত
ভেড়ার কুঞ্চিত লোমের মতো নয় এদেশের পাথর।
আমরা হাঁটি কোনো-এক দেশের পানে
যেখানে আকাশে কোনো সূর্য থাকে না শুধুই আমাদের জন্যে।
প্রাক্পুরাণিক নারীদল হাততালি দেয় :
আমাদের চারপাশে দরিয়া,
আমাদের ওপরে দরিয়া।
নাগালের মধ্যে যদি গম আর পানি না থাকে, তো
তোমার খাদ্য হোক আমাদের প্রেম, পানীয় হোক আমাদের অশ্রুবারি।
আমাদের কবিকুলের জন্যে আছে শোকের কালো ঘোমটা।
তোমার ঘরে আছে তোমাদের জয়গাথা, আমাদেরও আছে আমাদের,
আমাদের একটি দেশ আছে যেখানে আমরা
কেবলই দেখি অদৃশ্যকে, যা আর কেউই দেখতে পায় না।
কথা
আমার কথা যখন গমের দানা
আমি তখন মৃত্তিকা হই।
আমার কথা যখন ক্রোধবহ্নি
আমি তখন ঝঞ্ঝা হই।
আর আমার কথা যখন শিলাখণ্ড
তখন আমি স্রোতস্বিনী,
এবং কথা মধুক্ষরা হলে
মক্ষিকারা এসে ঢেকে দেয় আমার ঠোঁট।
বাসনাপুঞ্জ নিয়ে
আমায় এ-কথা বোলো না :
আলজিয়ার্সে যদি রুটিওয়ালা হতাম
তা হলে ঠিক নাম লেখাতাম বিদ্রোহীর খাতায়।
আমায় এ-কথা বোলো না :
ইয়েমেনের মাঠে পশুচরানো রাখাল হলে
হয়তো-বা কম্পমান সময়ের ডাকে আমিও কাঁপতাম।
এ-কথা শুনিও না আমাকে :
কুবার আবানা শহরে কাফে-ওয়েটার হলে
দুঃখিনী মা-বোনদের বিজয়সঙ্গীতে আমিও গলা সাধতাম।
শুনিও না ও-কথা :
আসওয়ানে যদি জওয়ান মজদুর হিসেবে কাজ করতাম
তা হলে পাহাড়ে পাহাড়ে আমার গান বাজত।
বন্ধু হে, শোনো,
নীল নদ ভোল্গায় গিয়ে পড়বে না,
কিংবা কঙ্গো কি জর্দান নদী পড়বে না গিয়ে ইউফ্রেতিসে।
সব নদীরই আছে নিজ উৎসস্থল, গতিপথ, নিজস্ব জীবন।
বন্ধু, আমাদের দেশ তো বন্ধ্যা নয়।
প্রতিটি দেশের থাকে জন্মাবার নিশ্চিত দিনক্ষণ,প্রতি প্রত্যূষই হলো নবজাত বিদ্রোহীর জন্মদিন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.