জীবনের নীল নকশা

বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড বলেছিলেন, তুমি যদি বিজ্ঞানের কোনো তত্ত্ব তোমার কাজের বুয়াকে বোঝাতে না পারো তাহলে বুঝতে হবে ব্যাপারটি তুমি নিজেই বোঝনি! কাজের বুয়া কিংবা মহিলাদের বুদ্ধিমত্তাকে উপহাস করার জন্যে কথাটি বলা হয়নি, বিজ্ঞানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও যে বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলো বোঝা সম্ভব – সেই বিষয়টিকে এখানে জোর দিয়ে বলা হয়েছে। বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলো সবসময়েই আশ্চর্যরকম সহজ এবং সরল – এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। প্রকৃতি জটিলতা পছন্দ করে না, সে সবচেয়ে সহজ এবং সুন্দর উপায়ে সবকিছু গড়ে তুলেছে। বিজ্ঞানীরা সেটি খুঁজে বের করছেন এবং তাদের মাথার ভেতরে সবসময়েই এটি কাজ করে যে, বিজ্ঞানের যে-অজানা জটিল বিষয়টি নিয়ে এখন তারা হাবুডুবু খাচ্ছেন, যখন তার সমাধানটি তারা পাবেন সেটি হবে আশ্চর্যরকম সহজ এবং সরল। প্রাচীনকালে মানুষ ধরে নিয়েছিল চাঁদ-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছু পৃথিবীকে ঘিরে ঘোরে (ধর্মগ্রন্থে সেটি লেখা আছে, কার ঘাড়ে দুটি মাথা যে সেটি অস্বীকার করবে?) সে-সময়কার বিজ্ঞানীরা যখন চাঁদ-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করে সেগুলো ঠিক কীভাবে পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে বের করার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাদের মাথা খারাপ হবার অবস্থা। চাঁদ এবং সূর্যের বিষয়টি নিয়ে সমস্যা নেই, কিন্তু গ্রহগুলোর গতিপথের কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই, কখনো সেটি যাচ্ছে জোরে, কখনো আস্তে। শুধু তাই নয়, কখনো কখনো একদিকে খানিকটা গিয়ে আবার গতিপথ পালটে উলটোদিকে ফিরে আসছে! কারো সঙ্গে কারো মিল নেই, সব মিলিয়ে একটি বিশাল জগাখিচুড়ি। চাঁদ, সূর্য এবং গ্রহ-নক্ষত্রের এই জটিল গতিবিধি ব্যাখ্যা করা পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীদের জন্যেও ছিল অসম্ভব একটি ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত কোপার্নিকাস যখন বললেন আসলে পৃথিবী নয় সূর্যকে ঘিরে সবগুলো গ্রহ ঘুরছে, সঙ্গে সঙ্গে প্রায় চোখের পলকে সব জটিলতা দূর হয়ে গেল। বিজ্ঞানী এবং সাধারণ মানুষ একই সঙ্গে অবাক হয়ে দেখল সবকিছুর মূলে আছে মহাকর্ষ বল, সেই মহাকর্ষ বলের আকর্ষণে সূর্যকে ঘিরে সবগুলো গ্রহ ঘুরছে! খুব সহজ-সরল একটি বিষয়, কাজের বুয়ারাও সেটি বুঝবেন।

জীবিত প্রাণীর মূল ব্যাপারটিও সে-রকম আশ্চর্যরকম সহজ এবং সরল। একটি জীবিত প্রাণী কীভাবে জন্ম নেবে এবং বিকশিত হবে তার একটি নীল নকশা থাকে। ক্ষুদ্র একটি জীবাণু থেকে শুরু করে মানুষের মতো জটিল একটি প্রাণী – সবার ভেতরেই সেই নীল নকশাটি একই প্রক্রিয়ায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে – এই তথ্যটিই কি আমাদের অবাক করে দেয় না? একটি নীল নকশা মানে কিছু তথ্য কিছু নির্দেশ – সেগুলো আমরা আগে রাখতাম কাগজে লিখে, আজকাল রাখি কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ কিংবা সিডি-রমে। আপাতদৃষ্টিতে পুরো বিষয়টিকে অনেক জটিল মনে হলেও তথ্য-সংরক্ষণের সময় সেটি রাখার জন্যে আশ্চর্যরকম সরল একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তার নাম বাইনারি পদ্ধতি এবং সেটি করার জন্য ১ এবং ০ এই দুটি অঙ্ক ব্যবহার করা হয়। জীবিত প্রাণীরা তাদের নীল নকশায় তথ্য-সংরক্ষণ করার জন্য প্রায় এ-রকম একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। ডি.এন.এ-র ডাবল হেলিক্সে সেই তথ্য রাখা হয় মাত্র চার ধরনের বেস পেয়ার দিয়ে, শর্টকাটে তাদের নাম হচ্ছে অ, ঈ, এ এবং ঞ। শুধু তাই নয় ডি.এন.এ-তে অ-র বিপরীতে থাকে সবসময়ে ঞ এবং ঈ-এর বিপরীতে থাকে এ। যারা পৃথিবীর একটু খোঁজ-খবর রাখেন তারা নিশ্চয়ই জানেন বর্তমান জগতে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট হচ্ছে মানব জিনোম প্রজেক্ট, কেউ যদি আক্ষরিক অর্থে সেটি দেখতে চান তাহলে তিনি দেখবেন অঞঈএঈঈঞএঅঞঞঈঈএঞ … এ-রকম মাইলের পর মাইল চার অক্ষরের সারি। এটি হচ্ছে মানবদেহের নীল নকশা, এর মাঝে লুকিয়ে আছে মানবদেহের সকল রহস্য।

মানুষ কিংবা অন্য যে-কোনো জীবিত প্রাণীর জন্যেই এই নীল নকশাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো খুব যত্ন করে সংরক্ষণ করা দরকার। তাই জীবিত প্রাণী এগুলো সংরক্ষণ করার জন্য যে-পদ্ধতি বেছে নিয়েছে সেটি খুবই চমকপ্রদ। শরীরের বিশেষ কোনো এক জায়গায় বিশেষ যত্ন করে না রেখে সেটিকে শরীরের লক্ষ লক্ষ কোষের প্রত্যেকটি কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতর রেখে দেওয়া হয়েছে। শরীরের যে-কোষের জন্যে যে-নির্দেশটি প্রয়োজন সে তার প্রয়োজনমতো হাতের কাছে নীল নকশা থেকে পেয়ে যাচ্ছে।

একটি জীবিত কোষের নিউক্লিয়াসের যেখানে এই নীল নকশাকে রাখা হয় তার বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে ক্রোমোজম। ফ্রুটফ্লাই নামক পতঙ্গের ক্রোমোজম হচ্ছে ৮টি, বিড়ালের ৩৮টি এবং মানুষের ৪৬টি। কেউ যেন মনে না করে, যে-প্রাণী যত উন্নত তার ক্রোমোজমের সংখ্যা তত বেশি। কারণ কুকুরের ক্রোমোজমের সংখ্যা মানুষের চেয়ে বেশি – ৭৮টি।

অল্প কয়েকটি প্রাণীর ক্রোমোজমের সংখ্যা বলা হয়েছে বলে কেউ হয়তো আলাদাভাবে লক্ষ করেনি যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেগুলো জোড় সংখ্যক। মানুষের বেলাতেও তাই, মোট ক্রোমোজমের সংখ্যা ৪৬ হলেও সেটি আসলে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম এবং প্রকৃতির সহজ-সরল নিয়মে

সন্তানের ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের ২৩টি আসে বাবার কাছ থেকে বাকি ২৩টি আসে মায়ের কাছ থেকে। ১নং ছবিতে মানুষের ২৩ জোড়া ক্রোমোজমকে দেখানো হয়েছে, কেউ যদি একটু মনোযোগ দিয়ে ছবিটি লক্ষ করেন তাহলে ছবিটির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নজরে পড়বে। প্রথমত দেখা যাচ্ছে, ক্রোমোজমগুলোকে সাজানোর সময় বড় থেকে ছোট ক্রোমোজমে সাজানো হয়েছে, এটি নেহায়েতই তালিকাভুক্তি করার ব্যাপার, এর মাঝে কোনো বিজ্ঞান নেই। একটি কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে যখন ক্রোমোজমগুলো থাকে তখন কিন্তু সেগুলো এ-রকম সাজানো-গোছানো থাকে না, ডি.এন.এ. তন্তুগুলো খোলা অবস্থায় পুরো নিউক্লিয়াসের ভেতরে এলোমেলো অবস্থায় থাকে। শুধুমাত্র কোষ-বিভাজনের সময় সাময়িকভাবে এগুলো ছোট এবং মোটা হয়ে আসে, সেগুলো তখন আলাদাভাবে দেখা সম্ভব হয়। ছবির ক্রোমোজমগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে আমরা যে-জিনিসটি দেখব সেটি হচ্ছে ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের সবগুলো এক ধরনের জোড়া, তাদের নামকরণ করা হয়েছে ১, ২, ৩ এ-রকম সংখ্যা দিয়ে। শুধুমাত্র শেষ জোড়াটিকে ২৩ নম্বর না বলে বলা হয়েছে ঢণ, শুধু তাই নয় ঢ এবং ণ দেখতে ভিন্ন, বিশাল ঢ ক্রোমোজমের পাশাপাশি ণ রীতিমতো ক্ষুদ্র এবং খর্বকায়। আমরা আগেই বলেছি, ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের একটি এসেছে বাবা অন্যটি মা থেকে – যার অর্থ ঢণ এই জোড়ার ভেতরে একটি বাবার অন্যটি মায়ের। কাউকে যদি অনুমান করতে বলা হয়, কোনটি বাবা থেকে এসেছে? আমি নিশ্চিত সে বলবে বৃহদাকৃতির ঢ ক্রোমোজমটি বাবার, আমরা পুরুষশাসিত-সমাজে থাকি – যা কিছু বড়, যা কিছু ক্ষমতাশালী সেটিকেই পুরুষের সঙ্গে তুলনা করতে ভালোবাসি। প্রকৃতপক্ষে ণ ক্রোমোজমটি এসেছে বাবার কাছ থেকে।

একজন মানুষের প্রত্যেকটি কোষের প্রত্যেকটি নিউক্লিয়াসে এই ২৩ জোড়া ক্রোমোজম রয়েছে এবং এর মাঝেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে সেই মানুষটির দেহ-গঠনের নীল নকশা। কারো নীল নকশায় যদি কালো চুলের নির্দেশনা থাকে তাহলে সে হবে কালো চুলের মানুষ, যদি নীল নকশায় নীল চোখের নির্দেশনা থাকে তাহলে সে হবে নীল চোখের মানুষ। যদি গায়ের রং শ্যামলা হওয়ার নির্দেশনা থাকে তাহলে সে জন্ম নেবে কোমল শ্যামল রং নিয়ে। আবার কোনো দুর্ভাগ্যের কারণে যদি তার নীল নকশায় থাকে হেমোফিলিয়া রোগের নির্দেশনা তাহলে সে অবধারিতভাবে বড় হবে হেমোফিলিয়া রোগ নিয়ে। শুধু যে চুল বা চোখের রং বা গায়ের রং এবং কখনো কখনো দুরারোগ্য রোগের নির্দেশনা এই ক্রোমোজমের ভেতরে ডি.এন.এ-র সুদীর্ঘ তন্তুতে লুকিয়ে থাকে, তা নয়। একজন মানুষ পুরুষ হবে না মেয়ে হবে, সেটিও থাকে এই ক্রোমোজমগুলোর ভেতরে, আরো স্পষ্টভাবে। একজন মানুষ যদি পুরুষ হয় তাহলে তার ২৩তম জোড়ার ক্রোমোজমগুলো হয় ঢ এবং ণ, যে-রকম ছবিতে দেখানো হয়েছে। ছবিটি যদি পুরুষমানুষের না হয়ে একটি মেয়ের ক্রোমোজম হতো তাহলে ২৩তম জোড়ার দুটিই হতো একই ধরনের, সেখানে থাকত ঢঢ! খুব সংগত কারণেই এখন কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, মেয়েরা পাচ্ছে দুটি দীর্ঘ ঢ ক্রোমোজম অথচ ছেলেরা পাচ্ছে একটি দীর্ঘ ঢ এবং একটি রীতিমতো ছোটখাটো ণ ক্রোমোজম – তাহলে কি বলতে হবে ছেলেদের প্রতি প্রকৃতি খানিকটা অবিচার করেছে? কথাটি একেবারে মিথ্যে নয়, আমরা আমাদের চারপাশে অনেক টাকমাথার পুরুষ দেখেছি, কিন্তু কখনো কি কোনো টাকমাথার মহিলা দেখেছি? এর কারণটিও লুকিয়ে আছে ঢ এবং ণ ক্রোমোজমের ভেতর।

এর মাঝে বেশ কয়েকবার বলা হয়ে গেছে যে, মানবদেহের প্রত্যেকটি কোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থাকে, আসলে কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। সন্তান-জন্মের জন্যে পুরুষের শুক্রাণু এবং মেয়েদের ডিম্বাণুতে থাকে ঠিক অর্ধেক – অর্থাৎ ২৩টি করে ক্রোমোজম। নারীদেহের কোষের ২৩ জোড়া ক্রোমোজমকে দুভাগে ভাগ করে ২৩টি আলাদা করে ডিম্বাণু তৈরি করা হয় বলে আমরা বলে দিতে পারি, সেখানে ১ থেকে ২২ পর্যন্ত ২১টি ক্রোমোজম এবং একটি ঢ – সব মিলিয়ে ২৩টি ক্রোমোজম থাকবে। কিন্তু পুরুষের বেলায়? তাদের তো ঢ এবং ণ দুটিই আছে, তাহলে তাদের শুক্রাণুতে ঢ না ণ ক্রোমোজম, কোনটি থাকবে? উত্তরটি সহজ, তাদের সাধারণ কোষ থেকে আলাদা করে দুটি তৈরি হয় বলে শুক্রাণুতে ঢ এবং ণ দুটিই থাকতে পারে। কাজেই তাদের শুক্রাণুর অর্ধেকের মাঝে থাকে ঢ ক্রোমোজম বাকি অর্ধেকে থাকে ণ ক্রোমোজম। মায়ের গর্ভের সন্তানের জন্মের সময় যদি ডিম্বাণুর সঙ্গে ঢ ক্রোমোজমের শুক্রাণু মিলিত হয় তাহলে সন্তানের সর্বমোট ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের ২৩তম জোড়াটি হয় ঢঢ, অর্থাৎ সন্তান জন্ম নেয় মেয়ে হিসেবে। যদি তা না হয়ে শুক্রাণুটিতে থাকে ণ ক্রোমোজম তাহলে সন্তানের ২৩তম জোড়াটি হয় ঢণ, অর্থাৎ সন্তানের জন্ম হয় পুরুষ হিসেবে। যেহেতু অন্য সবগুলো ক্রোমোজমই বাবা এবং মা দুজনের কাছ থেকে এসেছে তাই সন্তানের মাঝে বাবা এবং মা দুজনেরই ছাপ পড়ে।

আমাদের দেশে এখনো অনেকের মধ্যে ছেলেসন্তানের একটি আলাদা গুরুত্ব থাকে। ইতিহাসে পুরুষ সন্তান জন্ম দিতে না পারার জন্য অনেক রানিকেই অপমান এবং হেনস্তা সহ্য করতে হয়েছে। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, একটি সন্তানকে পুরুষ হবার জন্য প্রয়োজনীয় ণ ক্রোমোজমটি মেয়েদের থাকে না, সেটি আসতে পারে শুধুমাত্র পুরুষদের ভেতর থেকে! কাজেই কাউকে যদি দায়ী করতেই হয় তাহলে বাবাকেই দায়ী করতে হবে, কোনোভাবেই মাকে নয়।

এবারে আমরা আরো একটি মজার জিনিস দেখতে পারি। একজন মানুষের হাজার হাজার বৈশিষ্ট্য এই ২৩ জোড়া ক্রোমোজমে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। যে-বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম ২২ জোড়াতে পড়েছে, সেগুলোর একটি সুবিধা আছে। প্রত্যেকটিই দুটি করে থাকার কারণে কোনো একটিতে সমস্যা থাকলে অন্যটি থেকে পুষিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সেই সমস্যাটি যদি আসে ঢ ক্রোমোজম থেকে তাহলে মেয়েরা তাদের দ্বিতীয় ঢ ক্রোমোজম থেকে সেটি পুষিয়ে নিতে পারে, ছেলেরা পারে না। টাকমাথা সে-রকম একটি ব্যাপার, মেয়েদের একটি ক্রোমোজমে টাক পড়ার নির্দেশনা থাকলেও ক্ষতি নেই অন্য ঢ ক্রোমোজম সেই বিপদটুকু কাটিয়ে উঠতে পারে, যা ছেলেরা পারে না। তাই আমাদের চারপাশে এত টাকমাথা পুরুষমানুষ, টাকমাথা মেয়ে একজনও নেই!

সব ব্যাপারে পুরুষরা মেয়েদের ওপর একটি সুবিধা নেবে – প্রকৃতি মনে হয় সেটি পছন্দ করে না – তাই তাদেরকে ছোট একটি শিক্ষা দেবার জন্য সম্ভবত এ-রকম ব্যবস্থা করে রেখেছে! য়মনে না করে, যে-প্রাণী যত উন্নত তার ক্রোমোজমের সংখ্যা তত বেশি। কারণ কুকুরের ক্রোমোজমের সংখ্যা মানুষের চেয়ে বেশি – ৭৮টি।

অল্প কয়েকটি প্রাণীর ক্রোমোজমের সংখ্যা বলা হয়েছে বলে কেউ হয়তো আলাদাভাবে লক্ষ করেনি যে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেগুলো জোড় সংখ্যক। মানুষের বেলাতেও তাই, মোট ক্রোমোজমের সংখ্যা ৪৬ হলেও সেটি আসলে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম এবং প্রকৃতির সহজ-সরল নিয়মে

সন্তানের ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের ২৩টি আসে বাবার কাছ থেকে বাকি ২৩টি আসে মায়ের কাছ থেকে। ১নং ছবিতে মানুষের ২৩ জোড়া ক্রোমোজমকে দেখানো হয়েছে, কেউ যদি একটু মনোযোগ দিয়ে ছবিটি লক্ষ করেন তাহলে ছবিটির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য নজরে পড়বে। প্রথমত দেখা যাচ্ছে, ক্রোমোজমগুলোকে সাজানোর সময় বড় থেকে ছোট ক্রোমোজমে সাজানো হয়েছে, এটি নেহায়েতই তালিকাভুক্তি করার ব্যাপার, এর মাঝে কোনো বিজ্ঞান নেই। একটি কোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে যখন ক্রোমোজমগুলো থাকে তখন কিন্তু সেগুলো এ-রকম সাজানো-গোছানো থাকে না, ডি.এন.এ. তন্তুগুলো খোলা অবস্থায় পুরো নিউক্লিয়াসের ভেতরে এলোমেলো অবস্থায় থাকে। শুধুমাত্র কোষ-বিভাজনের সময় সাময়িকভাবে এগুলো ছোট এবং মোটা হয়ে আসে, সেগুলো তখন আলাদাভাবে দেখা সম্ভব হয়। ছবির ক্রোমোজমগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে আমরা যে-জিনিসটি দেখব সেটি হচ্ছে ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের সবগুলো এক ধরনের জোড়া, তাদের নামকরণ করা হয়েছে ১, ২, ৩ এ-রকম সংখ্যা দিয়ে। শুধুমাত্র শেষ জোড়াটিকে ২৩ নম্বর না বলে বলা হয়েছে ঢণ, শুধু তাই নয় ঢ এবং ণ দেখতে ভিন্ন, বিশাল ঢ ক্রোমোজমের পাশাপাশি ণ রীতিমতো ক্ষুদ্র এবং খর্বকায়। আমরা আগেই বলেছি, ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের একটি এসেছে বাবা অন্যটি মা থেকে – যার অর্থ ঢণ এই জোড়ার ভেতরে একটি বাবার অন্যটি মায়ের। কাউকে যদি অনুমান করতে বলা হয়, কোনটি বাবা থেকে এসেছে? আমি নিশ্চিত সে বলবে বৃহদাকৃতির ঢ ক্রোমোজমটি বাবার, আমরা পুরুষশাসিত-সমাজে থাকি – যা কিছু বড়, যা কিছু ক্ষমতাশালী সেটিকেই পুরুষের সঙ্গে তুলনা করতে ভালোবাসি। প্রকৃতপক্ষে ণ ক্রোমোজমটি এসেছে বাবার কাছ থেকে।

একজন মানুষের প্রত্যেকটি কোষের প্রত্যেকটি নিউক্লিয়াসে এই ২৩ জোড়া ক্রোমোজম রয়েছে এবং এর মাঝেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে সেই মানুষটির দেহ-গঠনের নীল নকশা। কারো নীল নকশায় যদি কালো চুলের নির্দেশনা থাকে তাহলে সে হবে কালো চুলের মানুষ, যদি নীল নকশায় নীল চোখের নির্দেশনা থাকে তাহলে সে হবে নীল চোখের মানুষ। যদি গায়ের রং শ্যামলা হওয়ার নির্দেশনা থাকে তাহলে সে জন্ম নেবে কোমল শ্যামল রং নিয়ে। আবার কোনো দুর্ভাগ্যের কারণে যদি তার নীল নকশায় থাকে হেমোফিলিয়া রোগের নির্দেশনা তাহলে সে অবধারিতভাবে বড় হবে হেমোফিলিয়া রোগ নিয়ে। শুধু যে চুল বা চোখের রং বা গায়ের রং এবং কখনো কখনো দুরারোগ্য রোগের নির্দেশনা এই ক্রোমোজমের ভেতরে ডি.এন.এ-র সুদীর্ঘ তন্তুতে লুকিয়ে থাকে, তা নয়। একজন মানুষ পুরুষ হবে না মেয়ে হবে, সেটিও থাকে এই ক্রোমোজমগুলোর ভেতরে, আরো স্পষ্টভাবে। একজন মানুষ যদি পুরুষ হয় তাহলে তার ২৩তম জোড়ার ক্রোমোজমগুলো হয় ঢ এবং ণ, যে-রকম ছবিতে দেখানো হয়েছে। ছবিটি যদি পুরুষমানুষের না হয়ে একটি মেয়ের ক্রোমোজম হতো তাহলে ২৩তম জোড়ার দুটিই হতো একই ধরনের, সেখানে থাকত ঢঢ! খুব সংগত কারণেই এখন কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, মেয়েরা পাচ্ছে দুটি দীর্ঘ ঢ ক্রোমোজম অথচ ছেলেরা পাচ্ছে একটি দীর্ঘ ঢ এবং একটি রীতিমতো ছোটখাটো ণ ক্রোমোজম – তাহলে কি বলতে হবে ছেলেদের প্রতি প্রকৃতি খানিকটা অবিচার করেছে? কথাটি একেবারে মিথ্যে নয়, আমরা আমাদের চারপাশে অনেক টাকমাথার পুরুষ দেখেছি, কিন্তু কখনো কি কোনো টাকমাথার মহিলা দেখেছি? এর কারণটিও লুকিয়ে আছে ঢ এবং ণ ক্রোমোজমের ভেতর।

এর মাঝে বেশ কয়েকবার বলা হয়ে গেছে যে, মানবদেহের প্রত্যেকটি কোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থাকে, আসলে কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। সন্তান-জন্মের জন্যে পুরুষের শুক্রাণু এবং মেয়েদের ডিম্বাণুতে থাকে ঠিক অর্ধেক – অর্থাৎ ২৩টি করে ক্রোমোজম। নারীদেহের কোষের ২৩ জোড়া ক্রোমোজমকে দুভাগে ভাগ করে ২৩টি আলাদা করে ডিম্বাণু তৈরি করা হয় বলে আমরা বলে দিতে পারি, সেখানে ১ থেকে ২২ পর্যন্ত ২১টি ক্রোমোজম এবং একটি ঢ – সব মিলিয়ে ২৩টি ক্রোমোজম থাকবে। কিন্তু পুরুষের বেলায়? তাদের তো ঢ এবং ণ দুটিই আছে, তাহলে তাদের শুক্রাণুতে ঢ না ণ ক্রোমোজম, কোনটি থাকবে? উত্তরটি সহজ, তাদের সাধারণ কোষ থেকে আলাদা করে দুটি তৈরি হয় বলে শুক্রাণুতে ঢ এবং ণ দুটিই থাকতে পারে। কাজেই তাদের শুক্রাণুর অর্ধেকের মাঝে থাকে ঢ ক্রোমোজম বাকি অর্ধেকে থাকে ণ ক্রোমোজম। মায়ের গর্ভের সন্তানের জন্মের সময় যদি ডিম্বাণুর সঙ্গে ঢ ক্রোমোজমের শুক্রাণু মিলিত হয় তাহলে সন্তানের সর্বমোট ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের ২৩তম জোড়াটি হয় ঢঢ, অর্থাৎ সন্তান জন্ম নেয় মেয়ে হিসেবে। যদি তা না হয়ে শুক্রাণুটিতে থাকে ণ ক্রোমোজম তাহলে সন্তানের ২৩তম জোড়াটি হয় ঢণ, অর্থাৎ সন্তানের জন্ম হয় পুরুষ হিসেবে। যেহেতু অন্য সবগুলো ক্রোমোজমই বাবা এবং মা দুজনের কাছ থেকে এসেছে তাই সন্তানের মাঝে বাবা এবং মা দুজনেরই ছাপ পড়ে।

আমাদের দেশে এখনো অনেকের মধ্যে ছেলেসন্তানের একটি আলাদা গুরুত্ব থাকে। ইতিহাসে পুরুষ সন্তান জন্ম দিতে না পারার জন্য অনেক রানিকেই অপমান এবং হেনস্তা সহ্য করতে হয়েছে। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, একটি সন্তানকে পুরুষ হবার জন্য প্রয়োজনীয় ণ ক্রোমোজমটি মেয়েদের থাকে না, সেটি আসতে পারে শুধুমাত্র পুরুষদের ভেতর থেকে! কাজেই কাউকে যদি দায়ী করতেই হয় তাহলে বাবাকেই দায়ী করতে হবে, কোনোভাবেই মাকে নয়।

এবারে আমরা আরো একটি মজার জিনিস দেখতে পারি। একজন মানুষের হাজার হাজার বৈশিষ্ট্য এই ২৩ জোড়া ক্রোমোজমে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। যে-বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম ২২ জোড়াতে পড়েছে, সেগুলোর একটি সুবিধা আছে। প্রত্যেকটিই দুটি করে থাকার কারণে কোনো একটিতে সমস্যা থাকলে অন্যটি থেকে পুষিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সেই সমস্যাটি যদি আসে ঢ ক্রোমোজম থেকে তাহলে মেয়েরা তাদের দ্বিতীয় ঢ ক্রোমোজম থেকে সেটি পুষিয়ে নিতে পারে, ছেলেরা পারে না। টাকমাথা সে-রকম একটি ব্যাপার, মেয়েদের একটি ক্রোমোজমে টাক পড়ার নির্দেশনা থাকলেও ক্ষতি নেই অন্য ঢ ক্রোমোজম সেই বিপদটুকু কাটিয়ে উঠতে পারে, যা ছেলেরা পারে না। তাই আমাদের চারপাশে এত টাকমাথা পুরুষমানুষ, টাকমাথা মেয়ে একজনও নেই!সব ব্যাপারে পুরুষরা মেয়েদের ওপর একটি সুবিধা নেবে – প্রকৃতি মনে হয় সেটি পছন্দ করে না – তাই তাদেরকে ছোট একটি শিক্ষা দেবার জন্য সম্ভবত এ-রকম ব্যবস্থা করে রেখেছে।

Published :