আমি জন্মেছিলাম উত্তর বাংলার একটি চা-বাগানে, যেখানে কারও বাড়িতে রেডিও ছিল না। আমার চার বছর বয়সে বাড়িতে রেডিও এলো। বিশাল একটা বাক্স। তার শরীর থেকে দুটো তার বেরিয়েছে। একটা চলে গেছে ছাদের নিচের ঘুলঘুলি দিয়ে আকাশছোঁয়া লম্বা বাঁশের ডগায়। আর-একটা নেমেছে নিচে রাখা গাড়ির ব্যাটারির বুকে। সেই রেডিওতে প্রথম গান শুনেছিলাম। সায়গলের গান, পঙ্কজ মল্লিকের গান। স্পষ্ট মনে আছে, একটুও ভালো লাগেনি। কিন্তু দলে দলে লোকজন এসে যখন বাক্সটার সামনে বসে সেই গান শুনে মাথা দোলালো তখন বুঝেছিলাম, ভালো না লাগলেও মুখে সেটা বলতে নেই।
পাঁচ বছর বয়সে ঠাকুরদা এবং পিসিমার সঙ্গে চলে এলাম জলপাইগুড়ি শহরে, বাবা-মাকে ছেড়ে। স্কুলজীবন শুরু হলো। ঠাকুরদার শাসন এত কড়া ছিল যে, বাড়িটাকে জেলখানা বললে কম বলা হতো। কখন পড়ব, কী পড়ব, কী খাবো, কখন খেলব, কখন ঘুমাবো-সব ঠাকুরদা ঠিক করে দিতেন। অমান্য করার সাহস ছিল না। বাড়িতে রেডিও ছিল না। চা-বাগানে বাবা ওটা বাড়িতে এনেছিলেন ঠাকুরদার অমতে। নিজের বাড়িতে ঠাকুরদা তো আনবেনই না। রেডিও শুনলে আমার পড়াশুনার বারোটা বেজে যাবে যে!ুু
কিন্তু আশেপাশের বাড়িতে তো ঠাকুদার হুকুম চলত না। শনিবার এবং রবিবারের দুপুরে অনুরোধের আসর বাজতো। আমি ছাদে উঠলেই গান শুনতে পেতাম। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়দের নাম দূরের রেডিওতে শুনে শুনে মুখস্থ করতাম। আর ছিল তপন। তপন ঘোষ। ও আমাদের সঙ্গে পড়ত। দারুণ গানের গলা। টিফিনের সময় একটার পর একটা গান গাইত। আমি তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলবন্ধু ঘোষ, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গান শুনেছিলাম ওর মুখে। বাড়িতে কোনো মেয়ে নেই। গানের রেওয়াজ তো ছিলই না। কিন্তু তপনের মুখে, পাশের বাড়ির রেডিও থেকে শুনে, ‘রানার’ গানটি পুরো গাইতে পারলাম। কী যে আনন্দ হলো।
জলপাইগুড়িতে তখন সিনেমা হল ছিল দুটি। রূপশ্রী এবং আলোছায়া। সিনেমা দেখার কোনো সুযোগই ছিল না। প্রথমত ঠাকুরদা অপছন্দ করতেন, দ্বিতীয়ত পকেটে পয়সা নেই। আমার বন্ধুরা তাদের মা-দিদিদের সঙ্গে মাঝে মাঝেই সিনেমা দেখতে যেত। পরের দিন স্কুলে যেতেই সেইসব সিনেমার গল্প শুনতাম ওদের কাছে। উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের নাম ওরাই আমাকে বলেছিল। শেষ পর্যন্ত তপনই আমাকে পরামর্শ দিল। খেলার জন্যে ঠাকুরদা রোজ বিকেল সাড়ে চারটে থেকে ছটা পর্যন্ত সময় বরাদ্দ করেছিলেন। ঠিক ছটার মধ্যে খেলা শেষ করে বাড়িতে ফিরতে হতো। নইলে রাতের খাওয়া বন্ধ। তপনের পাড়ার এক দাদা রূপশ্রীর টিকিট-চেকার। ম্যাটিনি শো-র বিরতি হতো সাড়ে চারটে নাগাদ। তপন তার সেই দাদাকে বলে আমাকে নিয়ে ভেতরে গিয়ে খালি আসন দেখে বসে পড়ত। বিরতির পর সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধ দেখে গেছি সমানে। প্রথমার্ধে কী ঘটেছিল তা জানা হয়নি। সেই অর্ধে যে-গানগুলো চরিত্রগুলোর ঠোঁটে বাজতো তা গিলতাম মুগ্ধ হয়ে। ঠাকুরদা কোনোদিন এই বিপ্লবের কথা জানতেও পারেননি।
ক্লাস নাইনে পড়ার সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে নাইটশোতে সিনেমা দেখেছিলাম। শীতের রাত। ঠাকুরদা আটটায় ডিনার সেরে সাড়ে আটটায় ঘুমাতে যেতে বলতেন। কারণ ভোর চারটেতে উঠে ওঁর সঙ্গে হাঁটতে যেতে হতো। উঠোনের একপ্রান্তে দালানবাড়ির একটা ঘরে আমি একা শুতাম। পাশবালিশের ওপর লেপ চাপা দিয়ে, কাগজ ভাঁজ করে তা দিয়ে দরজা চেপে বন্ধ করে শীতে কাঁপতে কাঁপতে রূপশ্রীতে সুচিত্রা-উত্তমের সিনেমা দেখেছিলাম। তাতে সন্ধ্যা মুখার্জির অনবদ্য গান ছিল। মাঝরাতে সুনসান রাস্তায় যখন ঠান্ডার কারণে কুকুরেরাও নেই, তখন বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হয়েছিল সন্ধ্যা মুখার্জি আমার পাশে হাঁটতে হাঁটতে ওই গানগুলো গাইছেন। বরাত ভালো ছিল বলে ঠাকুরদার কাছে ধরা পড়িনি। তবে সে-ই প্রথম আর শেষ।
ওই সময় একদিন সাইকেল-রিকশায় মাইক ঝুলিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোষণা করা হলো, ‘আসিতেছে, আসিতেছে। বিরাট জলসা জলপাইগুড়িতে। আগামী অমুক তারিখে রেসকোর্সের মাঠে সারারাত্রব্যাপী জলসা। কলিকাতার বিখ্যাত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, জহর রায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, শীতল বন্দ্যোপাধ্যায় ওই জলসায় অংশগ্রহণ করিবেন। টিকিটের মূল্য তিন টাকা, পাঁচ টাকা, দশ টাকা এবং পঞ্চাশ টাকা। দলে দলে যোগদান করুন।’
উত্তেজনায় ফেটে পড়লাম। যাঁদের নাম এতকাল শুনে এসেছি তাঁরা আমাদের শহরে আসছেন। ভাবতেই গায়ে কাঁটা ফুটছিল। তারপর যেই খবর পেলাম জলসা শুরু হবে রাত আটটায়, শেষ হবে ভোরে, তখনই উত্তেজনায় জল পড়ল। ওই সময় বাড়ির বাইরে থাকার কথা ঠাকুরদা চিন্তাও করবেন না। পিসিমাকে ধরলাম। তিনি যতই স্নেহ করুন, তাঁর পিতৃদেবকে রাজি করাতে যে পারবেন না, তা সরাসরি বলে ফেললেন। এদিকে সারা শহরে সবার মুখে এঁদের নিয়ে আলোচনা চলছে। তপনের বাবা ওদের সবার জন্যে দশ টাকার টিকিট কেটেছেন। মনে হচ্ছিল, বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই।
সেদিন ছিল শনিবার। কী কারণে স্কুল ছুটি। সেটা বাড়িতে না বলে ইউনিফর্ম পরে সাড়ে নটায় খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। শুনেছিলাম শিলিগুড়ি থেকে শিল্পীদের গাড়িতে চাপিয়ে শহরে আনা হবে। অর্থাৎ এগারোটা বেজে যাবে জলপাইগুড়িতে পৌঁছাতে। শহরে ঢোকার মুখেই মাসকলাইবাড়ির শ্মশান। দল বেঁধে সেখানে পৌঁছে দেখি রাস্তার দুপাশে প্রচুর মানুষ। তিনটি সাইকেলে ছয়জন গিয়েছিলাম। হঠাৎ আওয়াজ উঠল, ‘আসছে আসছে।’ গোটা পাঁচেক গাড়িকে দেখা গেল গতি কমিয়ে এগিয়ে আসছে। চোখের সামনে জানলার ধারে বসা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দেখলাম। গাড়িটা চলে যেতে চিৎকার উঠল, ‘ভেনো ভেনো! শালা জহর রায় রে।’ ওঁরা নমস্কার জানালেন।
গাড়ির মিছিল চলে গেলে রিকশা-মাইকে ঘোষণা শুরু হয়ে গেল, ‘এসে গেছেন, এসে গেছেন। যাঁদের নাম ঘোষিত হয়েছিল তাঁরা সবাই এসেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের সঙ্গে এসেছেন বিখ্যাত গায়ক শ্র্রীধনঞ্জয় ভট্টাচার্য।’
তপন লাফালো, ‘আমার ফেবারিট গায়ক। ত্রিনয়নী দুর্গা -।’
সেই সন্ধেবেলায় আমি লেপমুড়ি দিয়ে শুয়েছিলাম। পিসিমাকে বলেছিলাম পেটব্যথা করছে। এই বয়সে এ ছাড়া প্রতিবাদ জানানোর কোনো পথ জানতাম না।
সেই আমি কলকাতায় পড়তে আসার পর ধীরে ধীরে নাগরিক হয়ে গেলাম। চালু কথা আছে, কলকাতা করপোরেশনের জল বেশিদিন পেটে গেলে মফস্বলি গন্ধ চলে যায়। নাটকের দল তৈরি করলাম। সিনেক্লাবের সদস্য হলাম। তারপর লেখালেখি। শেষ পর্যন্ত বিখ্যাত দেশ পত্রিকার সম্পাদক শ্রীযুক্ত সাগরময় ঘোষ আমাকে ওই কাগজে চলচ্চিত্র-সমালোচনার দায়িত্ব দিলেন। একটু অন্য ধরনের সমালোচনা বলে অনেকেরই চোখে পড়ছিল। ছবিগুলোর মুক্তি-উপলক্ষে যেসব পার্টি হতো সেখানে যেতাম। একে একে চিত্রপরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল।
সে-সময় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বর বয়সের ভারে ক্লান্ত ছিল। কোনো একটি ছবিতে তাঁর গান ভালো লাগেনি। অল্পবয়সী চাপল্যে লিখে ফেললাম, ‘আমাদের স্মৃতিতে যে-হেমন্ত আছেন তিনি হাজার বছর বেঁচে থাকবেন। এখন ওঁর উচিত গান না গেয়ে সুর দিয়ে যাওয়া।’ অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হলেন।
কয়েকদিন পরে আনন্দবাজারের পার্টিতে সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছি, দেখলাম হেমন্তবাবু এবং রামকুমার চট্যোপাধ্যায় আসছেন। সন্তোষদা আর হেমন্তবাবু প্রায় বাল্যবন্ধু। ওঁরা পরস্পরকে পেয়ে খুব খুশি। তারপর সন্তোষদা আমার সঙ্গে হেমন্তবাবুর পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার নাম শুনেই গম্ভীর হয়ে হেমন্তবাবু বললেন, ‘এই ভদ্রলোক আমাকে গায়ক বলে মনেই করেন না। আমাকে গান বন্ধ করার উপদেশ দিয়েছেন।’ বলেই হাঁটা শুরু করলেন। আমি হতভম্ব। সন্তোষকুমার ঘোষ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ব্যাপারটা কী?’
ছবির সমালোচনার কথা বললাম। কিন্তু ওঁর মতো কিংবদন্তি গায়ক আমাকে ভুল বুঝবেন, এটা মানতে পারছি না। এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আমি আপনার গানের ভক্ত। রবীন্দ্রনাথের গান বা আধুনিক, আপনাকে ছাড়া ভাবতে পারি না। আপনাকে আঘাত করার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। তবু যদি আহত করে থাকি তাহলে আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি।’
দেখলাম বরফ গলল না। বললেন, ‘ওরা বলল, আপনি আমাকে নস্যাৎ করেছেন।’
‘কারা বললেন?’
‘ওই যারা আমার কাছে আসে!’
‘আপনি নিজে পড়েননি?’
‘না।’
পরের দিনই ওঁর ঠিকানায় লেখাটার জেরক্স কপি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তার কিছুদিন পরে দেখা হলো রবীন্দ্রসদনে, সন্তোষদার ষাটবছর পূর্তি-উপলক্ষে। আমাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘এই যে, আসুন। আপনি ঠিক লিখেছেন। সব গান আমার এই বয়সে গাওয়া উচিত নয়। ওরা আমাকে ভুল বুঝিয়েছিল।’
সেই সূত্রপাত। হেমন্তদার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। টিভি ধারাবাহিক নাটকে ওঁর গান ব্যবহার করতে চাই। শুনলাম অনেক টাকা দিতে হবে। গিয়ে বলতেই মাথা নাড়লেন, ‘আরে যা ভালো বোঝ করবে। আমাকে জিজ্ঞাসা করার কী আছে।’
লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে হাইওয়ে ধরে বন্ধুর গাড়িতে যাচ্ছি। কফি খাবো বলে এক্জিট দিয়ে বেরিয়ে একটি দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করালো বন্ধু। সেখানে আরো পঞ্চাশেক গাড়ি পার্ক করা আছে। হঠাৎ কানে এলো, ‘যৌবনে আজ মউ জমেছে বউ কথা কও ডাকে।’ শিহরিত হলাম। হেমন্তদার গান এখানে বাজছে। আবিষ্কার করলাম একটি পার্ক-করা গাড়ির টেপে ওটা চলছে। সাহেব এলেন। প্রশ্ন করে জানলাম, কোনো এক ভারতীয় বন্ধু ক্যাসেটটি উপহার দিয়েছেন তাঁকে। গায়কের গলা তাঁর খুব ভালো লাগছে। বললেন, ‘গোল্ডেন ভয়েস।’ বল্টনে পৌঁছেই হেমন্তদাকে ফোন করলাম।
‘কোত্থেকে বলছ?’
‘ইংলন্ড। আজ সন্ধ্যায় আপনার গান একটি সাহেব বাজাচ্ছে, শুনে এলাম।’
‘যাঃ! ইয়ার্কি মারা হচ্ছে?’
‘না হেমন্তদা, আমি এতটাই উত্তেজিত যে আপনাকে ফোন না করে পারলাম না। লোকটি বলল আপনি স্বর্ণকণ্ঠের অধিকারী।’
‘ধুর!’
যতদূর মনে পড়ে, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বিখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। খুব দ্রুত আমাদের সম্পর্ক নিবিড় হলো। প্রায়ই রাত্রে ফোনে গল্প হতো। তখন মানবদা তাঁর বিখ্যাত আধুনিক গানগুলো থেকে সরে এসে নজরুল গাইছেন। এ নিয়ে আমার অভিযোগ ছিল। এক রাত্রে বললেন, ‘আধুনিক সবাই গাইতে পারে, নজরুল অত সোজা নয়। ক্লাসিকাল সংগীতচর্চা না থাকলে হয় না।’
বললাম, ‘আমি একমত নই। নিয়ন্ত্রিত আবেগ এবং কণ্ঠের মাধুর্য কথা দিয়ে যে-ছবি তৈরি করে তা সবাই পারেন না।’
‘তুমি সাহিত্যিক, কথায় পারব না। আমার কোন গান তোমার প্রিয়?’
‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি।’
তৎক্ষণাৎ মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় গানটি ধরলেন। বাংলা গানের ভাণ্ডারে অন্যতম দামি হীরে এই গানটির বৈশিষ্ট্য ছিল কথা কণ্ঠ সুর মিলে-মিশে একটা আর্তি তৈরি করেছে, কিন্তু মানবদা শুরু করলেনরাগপ্রধান গানের মেজাজ নিয়ে। সেই রেকর্ডের গানের মাধুর্য উধাও হয়ে গেল। আমি না বলে পারলাম না, ‘মানবদা, একটা কথা বলতে চাই।’
গান থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী কথা?’
‘এই গান শুনে আমরা বড় হয়েছি। এভাবে নাইবা গাইলেন।’
‘তার মানে? আমার গান আমি ভুল গাইছি?’ চিৎকার করলেন তিনি।
‘ঠিক গাইছেন না।’
‘বেশ, ঠিক কী তা গেয়ে শোনাও। বাঙালির স্বভাব হলো অন্যের ছিদ্র-অন্বেষণ করা। নিজে করে দেখাতে কেউ পারে না। শোনাও তুমি!’
রাগ হচ্ছিল। আমি গায়ক নই। গান গাইলে স্কেল ঠিক থাকে না। তবু গাইলাম। ওই গানের আবেগটাকে ধরতে চাইলাম। হঠাৎ বুঝলাম রিসিভার নামিয়ে রাখলেন মানবদা।
প্রায় আধঘণ্টা পরে ফোন বাজল। রিসিভার তুলতেই মানবদা বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ। ওই গানগুলো আমি তখনকার আমার মতো গাইতে পারি না।’
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে প্রসাদ পত্রিকা লিখতে বলেছিল। নিজেকে উজাড় করে লিখেছিলাম। কয়েক বছর আগে ওঁকে সাহস করে ফোন করলাম। শুনেছিলাম, ওঁর স্বামী শ্যামল গুপ্ত মশাই একটু রাগী মানুষ, অকারণে বিরক্ত হতে চান না। ফোনটা তিনিই ধরলেন এবং জানিয়ে দিলেন কেউ বাড়িতে নেই। পরের দিন সন্ধ্যার পর ফোন করতেই ওপাশে সেই পরিচিত কণ্ঠ বাজল। বললাম, ‘দিদি, আমি একজন সামান্য লেখক, কিন্তু সেই কিশোরবেলা থেকে আপনার ভক্ত।’
‘আপনার নাম?’
নাম বলতেই তিনি উচ্ছ্বসিত হলেন, ‘ওমা, আপনি? আমি আপনার লেখার খুব ভক্ত। কী সুন্দর লেখেন আপনি।’
আমার পায়ের তলায় পৃথিবী দুলে উঠল। যাঁর গান সিনেমায় দ্বিতীয়ার্ধে শুনেছি, রাতের শো-তে যাঁর গান শুনে আলোড়িত হয়েছি তিনি আমার ভক্ত? আমি যত বলি উনি অনেক ওপরে আছেন, তিনি মানতে চান না। আমি কোথায় কী লিখেছি তাও জানিয়ে দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার কোন গান আপনার বেশি ভালো লাগে?’
কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব? বললাম, ‘গানে মোর ইন্দ্রধনু?’
‘গাই?’
আমি হতভম্ব। কী শুনলাম? উনি টেলিফোনে গান গাইবেন? বললাম, ‘যদি কষ্ট না হয়, আমার এত সৌভাগ্য – !’
উনি কথার মাঝখানে গান ধরলেন, এই প্রায় আশিতেও তাঁর গলায় সেই সুর, সেই কাজ। এক লহমায় তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন সেই কিশোরবেলায়, তরুণকালে, যৌবনের দিনগুলোতে। তারপর গান শেষ হলে বললেন, ‘এরপর কী গাইব?’
‘আপনার যা খুশি।’
শুরু হলো, ‘জানিনা ফুরাবে কবে এই পথ চাওয়া’। সঙ্গে কোনো যন্ত্র, তবলা, এমনকী হারমোনিয়াম পর্যন্ত নেই। কিন্তু ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রারা সূর্যের চঞ্চল রৌদ্রে উড়ে উড়ে যাচ্ছিল। সেদিন চারটে গান শুনেছিলাম। ভালোবাসার চার চারটে পাপড়ি।
কলেজ স্ট্রিটের বসন্ত কেবিনের পাশে আমাদের একটি বন্ধুর দোকান ছিল। সেখানে জড়ো হয়ে আড্ডা মারতাম এককালে। পাশেই প্রতাপ চ্যাটার্জি লেন। গলির প্রায় মুখেই হোটেল সিসিল। জানতাম হোটেলটি বিখ্যাত গায়ক ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের। মাঝে মাঝে তাঁকে দেখতাম বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে। ওঠার সময় আমাদের একবার দেখতেন। পান খেতেন খুব। দুটি গাল পানে ফুলে থাকত।
একটা সময় ছিল যখন লোকে তর্ক করত, কে বড় গায়ক? ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য না হেমন্ত মুখোপাধ্যায়? শ্রোতারা দুভাগ হয়ে যেত। হেমন্তবাবুর মেলোডি, গম্ভীর কণ্ঠে রোমান্টিকতার শেষকথা বাজত, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গলার কাজ ছিল বিখ্যাত। সুর তার সাতটি ডানা মেলে আকাশে উড়ত তিনি গলা খুললেই। কিন্তু ক্রমশ চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার কারণে হেমন্তবাবু অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন।
আমি যখন চিত্রসমালোচক তখন একই অনুষ্ঠানে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য এসেছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেমন আছেন ভাই?’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘ভালো।’
‘বুঝতে পারছেন না? আমাদের তো প্রায়ই দেখা হতো বছর পনেরো আগে। বাড়ি থেকে বেরুতেই আপনাদের দেখতাম।’ হাসলেন তিনি।
একবার দরজা খুললে না ঢোকার পাত্র আমি নই। আপাতগম্ভীর এই মানুষটির ভেতরের প্রাণটি যে আলাদা বুঝতে দেরি হলো না। প্রায়ই ফোন করতাম। সেই বাল্যকাল থেকে শুনে আসছি, ‘মাটিতে জন্ম নিলাম, মাটি তাই রক্তে মিশেছে’, ‘ও তোর জীবনবীণা আপনি বাজে’, ‘ঝিরঝির ঝির বৃষ্টি’, ‘ঝনক ঝনক’, ‘বাসরের দীপ আর রাতের তারা নিভে গেলে’।
লজ্জায় পড়েছিলাম খুব। আমারই উদ্যোগে জগন্ময় মিত্র থেকে নির্মলা মিত্র পর্যন্ত বিখ্যাত দশজন শিল্পী একটি অনুষ্ঠানে গাইতে এসেছিলেন। ধনঞ্জয়বাবুকে বললাম, ‘একটা গান শোনাবেন? বাসরের দীপ – ?’ উনি মাথা নাড়লেন। তারপর সময় এলে মঞ্চে উঠে একের পর এক গানের পর হঠাৎ থেমে গিয়ে বললেন, ‘সমরেশবাবু আমাকে বলেছেন বাসরের দীপ গাইতে। এই বয়সে তো আর আমার বাসরের সম্ভাবনা একেবারেই নেই, তাই দীপ নিভে গেলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু সমরেশবাবুর আছে। তাই এই গানটি তাঁর জন্যে -।’ তারপর খোলা গলায় গান ধরলেন। শ্রোতারা হাততালি দিল মজা পেয়ে, আর আমি লজ্জায় মাথা নামিয়ে বসে রইলাম।
এই বছরগুলোতে আমার সৌভাগ্য হয়েছে অনেক শিল্পীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার। সুবীর সেন, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়।
সুবীরদার বিখ্যাত গান, ‘এত সুর আর এত গান’ বাঙালি কোনোদিন ভুলবে না। স্ত্রী গত হওয়ার পর সুবীরদা একাই থাকেন। সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে গেলে দুটো জিনিস অনায়াসেই পাওয়া যায়। এক, গান শোনা আর দুই, পান করা। পান করতে করতে সমস্ত সংগীতজগৎটাকে ছোট্ট করে অনায়াসে নিয়ে আসেন তিনি। হ্যাঁ, কখনো পান করে নিজেকে হারাননি তিনি।
দ্বিজেনদা আবার ওঁর ঠিক বিপরীত। নিপাট ভদ্রলোক। কোনো নেশা নেই। দীর্ঘ শরীর এখনো তরতাজা। ওঁর ‘একদিন ফিরে যাব চলে, এ ঘর শূন্য করে -’ আমৃত্যু বুকের মধ্যে বাজবে। মাঝে মাঝে ওঁর দুপুরের ক্লাসে হানা দিতাম। দেখেই বলতেন, ‘আসুন, আসুন। কী সৌভাগ্য!’
পাঠক। এই যে এতক্ষণ বিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা আপনাদের বললাম, বুঝতেই পারছেন, এ আমার পরম প্রাপ্তি।
ঈশ্বর আমাকে গানের গলা দেননি। গানের কান দিয়েছেন বলে দাবি করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেই কিশোরকাল বা তরুণকালে জলপাইগুড়ি শহরে ঠাকুরদার শাসনে লালিত হয়ে গান শুনতে উন্মুখ হয়ে থাকতাম, যখন প্রখ্যাত শিল্পীরা জলপাইগুড়িতে গেলে তাঁদের একবার চোখের দেখা দেখবার জন্যে পেছনে পেছনে ছুটতাম, তখন কি জানতাম বছর পনেরো-কুড়ির মধ্যে আমি তাঁদের কাছের মানুষ হয়ে যাব?আমি বিশ্বাস করি, ঠিকঠাক চাইতে পারলে জীবন দুহাত ভরে দিয়ে যায়। এই যে আমি, কলকাতার কাগজগুলোতে লিখি আর আপনারা, বাংলাদেশের মানুষেরা, সেগুলো বই হয়ে বেরুবার পর পড়েন, এতে আমার তৃপ্তি হতো না। ইচ্ছে হতো, সরাসরি আপনাদের কাছে পৌঁছাতে। কালি ও কলমের স্তম্ভ, আমার প্রিয় আনিসদা, সেই সুযোগ করে দিলেন। এখন আমার মাথায় যা আসে, বুকে যে-ইচ্ছে ফোটে, তাই সরাসরি আপনাদের নিবেদন করতে পারছি। হয়তো সব লেখাই উতরোচ্ছে না, কিন্তু ঘরের ছেলের ত্রুটিবিচ্যুতি তো ঘরের মানুষেরা ক্ষমার চোখে দ্যাখেন, সেই ভরসায় লিখে যাচ্ছি।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.