জয়নুল আবেদিন চোখে যা দেখেছেন তা-ই তাঁর কাছে বাস্তব। প্রতিভাস মাত্র দৃশ্যমানতার সীমাহীন স্পেসের সঙ্গে যুক্ত। এই যুক্ততার মাধ্যমে তিনি নিজে অভিজ্ঞ হয়েছেন তাঁর কল্পনা ও ভাবনার স্পেসের সঙ্গে। এই দুই স্পেসের সম্পর্ক – খুব সম্ভব একই বিষয় কিংবা বস্তুর বিভিন্ন ফর্ম। দুই স্পেস থেকে তিনি নির্মাণ করেন অর্থ। যখন তাঁর দিক থেকে প্রতিভাস ও অর্থ এক হয়, তিনি অর্জন করেন দৃশ্যমানতার সঙ্গে সমতা। তাঁর সেরা কাজগুলোতে দৃশ্যমানতার সঙ্গে সমতা স্পষ্ট, প্রত্যক্ষ, জ্বলজ্বলে। দৃশ্যমানতা, তাঁর চোখে বাস্তব এবং এই বাস্তবের পরপারে তাঁর দিক থেকে কিছু নেই। দৃশ্যমানতা হচ্ছে পৃথিবী সম্বন্ধে জানার প্রধানতম উৎস। দৃশ্যমানতা পৃথিবীকে আমাদের কাছে নিয়ে আসে। দৃশ্যমানতা, তার দরুন, একই সঙ্গে পৃথিবী সম্বন্ধে জানা এবং পৃথিবীকে আমাদের কাছে নিয়ে আসা। দৃশ্যমানতা যেমন বাস্তব তৈরি করে তেমনি তৈরি করে নান্দনিক আবেগ। জয়নুল এই বোধ থেকে কখনো দূরে সরে যাননি।
এই আবেগ থেকে শিল্পে মিরাকল তৈরি হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত, শিল্পে বস্তু, বিষয়, তথ্য টিকে থাকে। বাস্তবের মধ্যে আছে এক ধরনের টিকে থাকার শক্তি, অসম্ভবকে সম্ভব করার শক্তি। জয়নুল যদি অন্য শতাব্দীতে জন্মাতেন, তাহলে হয়তো হতেন একজন ধর্মজ শিল্পী। বিপরীতে, তিনি জন্মেছেন এমন এক সময়ে, বেড়েছেন এমন এক সময়ে, যখন দুর্ভিক্ষ থাবা মেলেছে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থাবা মেলেছে, বঙ্গীয় কৃষক-সমাজের সংহতি ভেঙে গেছে, পৌরাণিকতা কোথাও নেই, সেজন্য তিনি ধর্ম কিংবা ধর্মজ পুরাণের মাধ্যমে পলায়ন করতে চাননি, যে-পলায়ন হতো এক ধরনের অতীতের মধ্যে সরে যাওয়া। তিনি জেদি মাছির মতো তাঁর সময়ের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন, এই বিশ্বস্ততা নিজের চামড়ার প্রতি বিশ্বস্ততা। জীবন সম্বন্ধে এ-ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য দরকার এক ধরনের মেজাজ। এই মেজাজ দৃশ্যমান ছিল জয়নুলের মুখে, মুখটি কৃষকের, যে-মুখে আবহমান কৃষকের সহ্যশক্তি কম্পমান, সেই সঙ্গে জ্বলজ্বল করছে কৃষকের ধূর্তামি। এই সহ্যশক্তি, এই ধূর্তামি না থাকলে জয়নুলের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না। নেহায়েত মেজাজ দিয়েও এই প্রশ্নের সমাধান হয় না : প্রশ্নটিকে ঘিরে আছে চতুর্পার্শ্বের সমাজ- বাস্তবতা। তাঁর মতো মানুষের কাছে মানুষের স্বরূপ হচ্ছে সামাজিক; এই সামাজিকতা প্রকাশিত ভাষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে। জয়নুল অভিজ্ঞ হয়েছেন এসব অস্তিত্বসাবজেক্টিভলি বোধ করে। সেজন্য তিনি কখনোই পলায়নপর শিল্পী হননি। তাঁর কাছে সমাজ, সংস্কৃতি, জীবনযাপন প্রাসঙ্গিক; যেমন প্রাসঙ্গিক পাতাল কিংবা আকাশ কিংবা ধু-ধু প্রান্তর; যেমন প্রাসঙ্গিক বাতাসের কোলাহল, আকাশের উধাও বিস্তার, ধু-ধু প্রান্তরের বুকে। তাঁর বেড়ে ওঠার মধ্যে কিছু কিছু এসেছে দারিদ্র্য, তাঁর জীবনযাপনকে ঘিরে ধরেছে অভাব – সব সত্ত্বেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা এবং সততা এমন যে তিনি, সব সত্ত্বেও, সঞ্চয় করতে পেরেছেন এবং প্রকাশ করতে পেরেছেন একটি সত্যকে। এই সত্যটি নিরাভরণ, মেদহীন, মানুষী স্বার্থের যেন শেষ সীমা, তিনি যেভাবে প্রকাশ করেছেন, সেই প্রকাশ সামাজিক হতাশা কিংবা সিনিসিজমের পরপারে পৌঁছেছে।
জয়নুলের প্রস্তাব কিংবা বক্তব্য হচ্ছে সত্যকে কিংবা বাস্তবকে শেয়ার করা সম্ভব। তিনি কখনো মৃত্যুর প্রক্রিয়া সম্বন্ধে আহাজারি করেননি, করলে তাঁর পক্ষে দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো আঁকা সম্ভব হতো না, বরং দুর্ভিক্ষের কাজগুলোতে জীবনের প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি ভাবিত, এই প্রক্রিয়া এমন একজন মানুষ দেখেছেন যার, জয়নুলের নিজের নশ্বরতার পরিপ্রেক্ষিতে নিজে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। নশ্বরতার এই পরিপ্রেক্ষিত আমাদের কারো পক্ষেই প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব নয়। নশ্বর মানুষ কেন মানুষের ওপর অন্যায় করে? নশ্বর মানুষ কেন মানুষের ওপর নির্যাতন করে? এই প্রশ্ন তিনি করেছেন এবং এই প্রশ্নের জবাব তিনি খুঁজেছেন। যেসব মুখ তিনি এঁকেছেন, সেসব মুখে জ্বলজ্বল করে এই জ্ঞানের বিভা, যে-বিভা ক্ষতের মতো গভীর। এসব মুখ দুঃখীর, পরাজিতের কিংবা বেপরোয়ার, এই সত্যের সামনে তিনি আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন।
জয়নুল যাদের আঁকেন, যাদের শরীর ও মুখ, তাদের মধ্য দিয়ে কী তিনি প্রকাশ করেন? এসব শরীর ও মুখ, বহুক্ষেত্রে হা-ভাতে, রুক্ষ, মেহনতে ক্লান্ত, তাদের শরীর জীবনের ভার ও অভিজ্ঞতায় চষা জমির মতো ফাটা। পুরুষের শরীর এমনই, তাদের হাত এবং পা নোংরা। তাদের শরীরভরা অভিজ্ঞতা। নারীর শরীর লাবণ্যময়, তাদের ত্বকে দ্যুতি। তাদের মাংস শরীরকে আকাক্সিক্ষত করে তোলে, কিন্তু তারা গরিবের সংসারী – অভাব এবং অনটনের বাসিন্দা। জয়নুল তাদের অব্যবহিত বাস্তবতার মধ্যে ধরে রেখেছেন। তাদের শরীরে লালচের কোনো ভঙ্গি নেই। তাদের মুখে প্রকাশিত পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা : ১৯৪৩-এর ‘দুর্ভিক্ষের নারী’ থেকে ১৯৫৩-র ‘পাইন্যার মা’ থেকে ১৯৭১-এর ‘বীরাঙ্গনা’ থেকে ১৯৭২-এর ‘বিশ্রাম’ কিংবা ১৯৭২-এর ‘কনে’ পর্যন্ত, সবক্ষেত্রে উদ্ভাসিত নিষ্ঠুরতা ও বঞ্চনা। সর্বত্র তাই। সবসময়ে তাই। এসব কাজ যত দেখেছি তত মনে হয়েছে আমি ভাবতে বাধ্য হয়েছি, যারা ক্ষমতার ছড়ি ঘোরায় তাদের জয়নুল সহ্য করেননি। জয়নুলের কাছে ক্ষমতা – নষ্ট। তিনি মানুষকে, মানুষের জীবনকে উপস্থাপিত করেননি দৃশ্য হিসেবে, তিনি মানুষকে দেখেছেন। এই দেখাটিকে তিনি শেয়ার করতে চেয়েছেন অন্যদের সঙ্গে।
জয়নুলের কাছে দেখাটাই বাস্তব। এই দেখাটাকেই তিনি ধরতে চেয়েছেন প্রধানত আলোক ও ছায়ার ভেতর দিয়ে, কলম ও ব্রাশের মধ্য দিয়ে। এভাবে তিনি তৈরি করেছেন এক ধরনের নতুন স্পেস, এই স্পেস বর্ণিত অন্ধকার ও আলোক দিয়ে। স্পেসটিতে রক্ষিত অভিজ্ঞতা। তাঁর আগে যাঁরা কাজ করেছেন তাঁরা স্পেসটিকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এমন একটা বোধ জাগে অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু, যামিনী রায় এবং এমনকী রবীন্দ্রনাথের কাজ দেখে। জয়নুল, তাঁদের বিপরীতে নতুন ধরনের স্পেসের বোধ পেইন্টিংয়ে নিয়ে এসেছেন স্পেসকে অবারিত করে। অবারিত স্পেসে অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যায়। জয়নুল, নীরবে, একটা বিপ্লব সম্পন্ন করেছেন পেইন্টিংয়ের ক্ষেত্রে, নতুন ধরনের স্পেস তৈরি করেছেন যাতে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, আমরা দর্শকরা তাঁর সঙ্গে শেয়ার করতে পারি এবং আমরা পাঠকরা তাঁর সঙ্গে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা পাঠ করতে পারি।
জয়নুলের কাজ, তাঁর পেইন্টিং হালকা এবং টোনাল কনট্রাস্ট মিনিমাম। এই মিনিমালিটি মনে করিয়ে দেয় স্বচ্ছ স্রোতের কথা, স্বচ্ছ আকাশের কথা, স্বচ্ছ বাতাসের কথা। পেইন্টিং কিংবা তাঁর ড্রয়িং, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের ড্রয়িংগুলো তাৎক্ষণিক আলোকে উদ্ভাসিত, কঙ্কালগুলো স্পষ্ট, প্রখর, নিষ্ঠুর, আলোকের মধ্যে উন্মোচিত, কিন্তু আলোক কোনোকিছু ঢেকে দেয়নি। তিনি কি দুর্ভিক্ষের হাড্ডিসার মানুষগুলোর ওপর, কঙ্কালগুলোর ওপর, একদা স্বাস্থ্যবান মানুষগুলোর ওপর আলোকের প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছেন? তিনি কোনোকিছুই লুকোতে চাননি, ঢেকে দিতে চাননি অন্য কোনো বক্তব্য দিয়ে। তাঁর প্রাণান্ত চেষ্টা যা ঘটছে তাকে রক্ষা করা। ১৯৪১-এ জলরঙে আঁকা মই কিংবা ১৯৫১-তে জলরঙে আঁকা বিদ্রোহ-চিত্রে একই উদ্ভাস, সব স্পষ্ট, শানিত। তিনি বস্তুকে, বিষয়কে, বাস্তবকে ধরতে চেয়েছেন, চিনতে ও জানতে চেয়েছেন; সেজন্য বস্তু, বিষয়, বাস্তব হচ্ছে একটি মুহূর্তের সমগ্র।
দেখাটা বাস্তব, দেখাটাই সমগ্র, সেজন্য তাঁর কাজে বস্তু, বিষয়, বাস্তবের কোনো রেফারেন্স-পয়েন্ট নেই। তাঁর মহান পূর্বসূরিদের ক্ষেত্রে উলটোটা ঘটেছে। তাঁর কাজের সঙ্গে অন্যদের কাজের তুলনা যদি করা যায় (যদিও তুলনা, এক হিসেবে অর্থহীন) তাহলে, তাঁর কাজের রেফারেন্স-পয়েন্টহীনতা বৈপ্লবিক মনে হয়। অবনীন্দ্রনাথের কাজে রেফারেন্স-পয়েন্ট আছে – ভারতীয় পুরাণের ও মোঘল ঐতিহ্যের। নন্দলালের কাজে রেফারেন্স পয়েন্ট আছে – ভারতীয় পুরাণের। যামিনী রায়ের কাজে রেফারেন্স-পয়েন্ট আছে – ভারতীয় পুরাণের এবং লোকজ ঐতিহ্যের। রবীন্দ্রনাথের কাজে রেফারেন্স-পয়েন্ট আছে – তাঁর সাহিত্যের। এক্ষেত্রে জয়নুল ভিন্ন, স্বতন্ত্র। তাঁর কাজে রেফারেন্স-পয়েন্ট নেই। কৃষক-জীবনের বৃত্তান্ত, মাঝিমাল্লাদের বৃত্তান্ত,পশুপখির বৃত্তান্ত সবই প্রত্যক্ষ, পুরাণবিহীন এবং সুদূর কোনো অতীতবিহীন। পুরাণবিহীনতা এবং অতীতবিহীনতা তাঁর কাজকে কোনো ধর্মজ্ঞতা, কোনো কাহিনীনির্ভরতা, কোনো মিথনির্ভরতার সঙ্গে যুক্ত করেনি। এদিক থেকে তাঁর কাজ সেক্যুলার, আদিঅন্ত সেক্যুলার। সেজন্যে তাঁর কাজের মধ্যে অংশগ্রহণ সরাসরি, তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করা সম্ভব কোনো অতীত, কোনো মিথ, কোনো পুরাণের সাহায্য ছাড়া।
বিষয়, বস্তু, বাস্তবকে সেক্যুলার করা এবং সেক্যুলার বিষয়, বস্তু, বাস্তবকে পেইন্টিংয়ের, ড্রয়িংয়ের রসদ করা বৈপ্লবিক। ব্রিটিশ বাংলায় এভাবে তিনি তাঁর মহান পূর্বসূরিদের দিক থেকে দূরে সরে গেছেন এবং পাকিস্তানি বাংলায় বিষয়, বস্তু, বাস্তবকে ধর্মজ্ঞতার প্রভাব থেকে মুক্ত করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বিষয়, বস্তু, বাস্তবের মধ্যে কোনো মিথের অনুপ্রবেশ (প্রবল ব্যক্তিদের মিথ, সেনাবাহিনীর মিথ) করতে দেননি। প্রত্যক্ষ বাস্তবতা কল্পনার মানুষী ফ্যাকাল্টির অন্তর্গত। এই কল্পনার উদ্বোধন ও ব্যবহার তাঁর কাজের একটি বড় শক্তি। তাঁর কাজের মধ্যে পতনের কোনো আভাস কিংবা ইঙ্গিত নেই (কোনো কোনো ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কাজে পতনের আভাস কিংবা ইঙ্গিত স্পষ্ট; যামিনী রায়, নন্দলাল এবং অবনীন্দ্রনাথ পুরাণের জীবন্ততার অভাব লক্ষ করেছেন বর্তমানের মধ্যে)। সোনালি অতীত, বেহেশতের বাগান, দেবতাদের সময় – সবই বর্তমানের দুর্দশা থেকে দূর। বর্তমানের দুর্দশা জয়নুল মোহমুক্ত চোখে দেখেছেন। নবান্ন থেকে মনপুরা – এই মোহমুক্তির বাস্তবতা। সোনার বাংলা দুঃখভরা এবং মনপুরাতে কোনো আশা নেই। তিনি দেখেছেন দুর্ভিক্ষের কাল থেকে সরলতা, সততার অবসান।
মোহমুক্ত হয়ে বাস্তবকে দেখা এবং বিষয়, বস্তু, আখ্যানকে সেক্যুলার করার একটা কারণ নিশ্চয়ই তাঁর কৃষক-জীবনের পরিসর। কলকাতা আর্টস্কুলের আবহাওয়ার মধ্যে এবং ভারতশিল্পের তত্ত্বের মধ্যে কোনো টেনশন ছিল না। এই তত্ত্ব জোর দিয়েছে মানুষী স্বভাবের অপরিবর্তমানতার ওপর। এই অপরিবর্তমানতাই চিরন্তনতা এবং ঐতিহ্য। কিন্তু এই তত্ত্বের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত শুরু হয়েছে সমাজফর্মের। এই ফর্মের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে শ্রেণিদূরত্ব ও শ্রেণিসংঘাত এবং ঔপনিবেশিক আরোপণের যন্ত্রণা। এভাবে সূত্রপাত ঘটেছে শিল্পের তত্ত্বের সঙ্গে সমাজফর্মের দূরত্ব : তত্ত্ব-উৎসারিত সৃষ্টিশীল কল্পনার মধ্যে ভিন্নতা নেই, কিন্তু সমাজের মধ্যে ভিন্নতা শক্তিশালী। বিপরীতে জয়নুল কি কোনো তত্ত্ব তৈরি করেছেন? জয়নুল যাত্রা করেছেন বাস্তব থেকে এবং বাস্তবের মধ্যে বসবাস করেছেন। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশ-দশক থেকে পঞ্চাশ-দশকের ব্রিটিশ বাংলায় এবং পাকিস্তানি বাংলায় বামপন্থি আন্দোলন (এই আন্দোলনের প্রধান ভিত্তি ছিল কৃষক-আন্দোলন) সংস্কৃতি-ব্যাখ্যার এবং সাংস্কৃতিক উৎপাদনের একটি সূত্র তৈরি হয়েছিল। সূত্রটি ছিল কাঠামো এবং ওপর-কাঠামোর সম্পর্ক এবং দ্বন্দ্ব। সেই বুদ্ধিবাদী আবহাওয়ার মধ্যে, জয়নুল সূত্রগুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে। শ্রেণিদ্বন্দ্ব এবং দূরত্ব-উৎসারিত সমাজগঠনের টেনশন তিনি শিল্পের মধ্যে এনেছেন আমৃত্যু (দুর্ভিক্ষ, মহাপ্লাবন, গ্রামীণ জীবনযাত্রা), এবং শিল্পের টেনশনের সঙ্গে সমাজগঠনের টেনশনের দূরত্বও বোঝার চেষ্টা করেছেন (তাঁর সেক্যুলার জীবনবোধ এবং সেক্যুলার বিষয় বনাম সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্র বনাম সেক্যুলার বাঙালি জীবনাচরণ)।
জয়নুলের কাছে শিল্প – পেইন্টিং সামাজিক সংগ্রামের অংশ। এই সংগ্রামে যুক্ত আনন্দ, বেদনা, আকাক্সক্ষা, কোমলতা, ক্ষমতা, সিনিসিজম কিংবা ভয়। এ-সবই অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করা যায়। জয়নুল এই অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথমদিকে মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল অংশ শিল্পের বিরুদ্ধে অনৈসলামিক বলে অবস্থান নিয়েছে এবং তাঁর জীবনের শেষদিকে সকল সাংস্কৃতিক প্রকাশের অ-ধর্মজ ফর্মগুলোকে শরিয়া আইনের পক্ষ থেকে মুর্দাবাদ জানানো হয়েছে। ধর্মজ ফর্মগুলো হচ্ছে – শিল্প, সংগীত, নৃত্য, বিনোদন। এ-সবই পাপ এবং ইসলামবিরোধী। জয়নুল এই অবস্থানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন শিল্পের পক্ষে, সমাজ-সংগ্রামের অংশ হিসেবে এবং শিল্প আমাদের গভীরতর আবেগের অংশ বলে।
শিল্পের চারপাশে (কিংবা জয়নুলের কাজের চারপাশে) ক্রিয়াশীল টেনশন, সংঘাত, এবং বৈপরীত্য। শিল্প (কিংবা পেইন্টিং) জীবনের ইনোসেন্ট অলংকার নয়। শিল্প (কিংবা জয়নুলের কাজ) সমাজকর্মের একটি বড়ো ভূভাগের নির্মাতা, এই নির্মাণ প্রাত্যহিক জীবনের সকলদিকে প্রবিষ্ট। এই প্রবিষ্টতার জন্য প্রাত্যহিক জীবনের নান্দনিকতা ঘটছে। এক্ষেত্রে জয়নুল কাজের মধ্য দিয়ে শিল্প ও প্রাত্যহিক জীবনের সীমানার কিছু অংশ ভেঙে দিয়েছেন। কিন্তু এও সত্য, তিক্ত সত্য যে, জয়নুলের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, মানবতাবাদী ভাবনার প্রবাহ সত্ত্বেও, দক্ষিণপন্থি রক্ষণশীলতা, মোল্লাবাদী উগ্রতা শিল্পের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। জয়নুলের কাজ, মানবতাবাদী প্রবাহ দক্ষিণপন্থি উগ্রতার পাশাপাশি অসম এবং অসহ সহ-অবস্থানে বিদ্যমান থেকেছে।জয়নুল তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে একটি নান্দনিক প্রবাহ সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। শিল্পের সামাজিকতার মধ্যে মানুষ প্রকাশ করেছে এবং অভিজ্ঞ হয়েছে তাদের অনুভবের গভীরতার স্তর সম্বন্ধে : তাদের আনন্দ, তাদের বিষণ্নতা, তাদের লুকানো আকাক্সক্ষা, তাদের অবিশ্বাস ও অনাস্থা, তাদের সুন্দর অভিজ্ঞতার জন্য আকুতি। দুর্ভিক্ষের চিত্রাবলি প্রকাশ করেছে বাঙালি সমাজের অসহায়ত্ব ও দুর্গতি, কৃষক ও মাঝিমাল্লাদের জীবনের চিত্রাবলি আমাদের অভিজ্ঞ করেছে সমাজ ও সংস্কৃতির অন্য অংশ সম্বন্ধে, নবান্ন ও মনপুরা-চিত্র আমাদের মধ্যকার ক্রোধ, যন্ত্রণা, আর্তি ছড়িয়ে দিয়েছে সারাদেশে – আমরা অভিজ্ঞ হয়েছি, পরিণত হয়েছি, আমাদের বোধ গভীর ও স্বচ্ছ হয়েছে। সংস্কৃতি নেহায়েতই সুনিয়ন্ত্রিত ইমেজ নয়, ধ্বনি নয়, শব্দ নয়, প্রবল ভাবাবেগ নয় – সংস্কৃতি উন্মোচন করে নোংরা এবং কদর্য, সূক্ষ্ম ও প্রবল টেনশন এবং নিষ্ঠুর সত্য। জয়নুল তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে সংজ্ঞাপন করেছেন এই বোধ, ভেঙে দিয়েছেন শিল্পের নিরপেক্ষতা, খান খান করে দিয়েছেন ভদ্রলোকদের আরাম ও স্বস্তি, প্রমাণ করেছেন ভদ্রলোকদের ছাড়াও শিল্প বেঁচে থাকতে পারে, সাধারণ মানুষই শিল্পকে আশ্রয় দেয়, সাধারণ মানুষ হচ্ছে শিল্পের ঘরবাড়ি, যেখানে আমরা কাজ করি, যেখানে আমরা বন্ধুত্ব করি, যেখানে আমরা সন্তান-সন্ততি বড়ো করি, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কাজে অধিগম্য এবং যেখানে আমরা খুঁজে পাই সম্পদ ও বৈধতা। সাধারণ মানুষই গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বসবাসই গণতন্ত্র। জয়নুল এই গণতন্ত্রের খোঁজ করেছেন সাধারণ মানুষের বীরত্ব, ক্রোধ, ধৈর্য, বিষণ্নতা, আনন্দ, বেদনার চিত্র বারবার এঁকে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.