আত্মচরিত : শিবনাথ শাস্ত্রী

শিবনাথ শাস্ত্রীর সারাজীবনের কর্মসাধনার মধ্যে তাঁর সাহিত্যসাধনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সমাজসেবক, শিক্ষাব্রতী ও ব্রাহ্মসমাজের নেতা হিসেবে ধর্মসাধনা ও কর্মব্রত-উদ্যাপন তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য হলেও তিনি নিয়মিত সাহিত্যসাধনাও করে গেছেন। কবিতা লিখেছেন। পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ আছে তাঁর। উপন্যাস লিখেছেন চারটি। প্রবন্ধ লিখেছেন। পত্রিকা-সম্পাদনা করেছেন। বেশকিছু ব্রহ্মসংগীতও রচনা করেছেন। যে-অন্তর্গত তাগিদ তাঁকে সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ করেছিল সেই একই প্রাণের তাগিদে তিনি সাহিত্যসাধনা করে গেছেন।

সময়ের স্রোতে তাঁর রচনা হারিয়ে না গেলেও আধুনিক পাঠকের কাছে তাঁর আবেদন হয়তো সংকুচিত হয়েছে। এখন তাঁর রচনা হয়তো শুধুই গবেষকদের গবেষণার বিষয়। কিন্তু তাঁর আত্মচরিত ঐতিহাসিকতায় এবং অনুপম রচনাশৈলীর গুণে আলোকিত একজন মহৎ মানুষের আত্মোপলব্ধির অকপট উচ্চারণে আজও অবিস্মরণীয় কীর্তি হয়ে আছে।

আত্মচরিত আত্মকথনের আড়ালে একটি যুগের ইতিহাসকে ধারণ করে আছে। সেই যুগ বাঙালির আত্মবিকাশের যুগ। শিবনাথ শাস্ত্রী ছিলেন সেই যুগের ঋত্বিক পুরুষ। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই যুগে, যে-যুগে মধ্যযুগীয় সামাজিক কাঠামো আর মূল্যবোধের সঙ্গে নতুন চিন্তার সংঘাতে সৃষ্টি হয়েছিল আধুনিকতার যাত্রা, যে-যুগ রামমোহন বিদ্যাসাগর দেবেন্দ্রনাথ কেশবচন্দ্র বিবেকানন্দ হয়ে পরিণতি লাভ করেছিল রবীন্দ্রনাথে…। আত্মচরিত একটি যুগের ইতিহাসকেই শুধু ধারণ করেনি, আন্তরিকতায়, রচনানৈপুণ্যে, শিবনাথের অনবদ্য প্রকাশভঙ্গি ও বর্ণনার গুণে আত্মচরিত হয়ে উঠেছে অনুপম এক শিল্পকর্ম। নিজেকে আড়ালে রেখে নিজের কথা, নিজের সময় এবং সমাজের কথা নিষ্ঠা এবং সততার সঙ্গে কীভাবে বলা যায়, শিবনাথের আত্মচরিত তারও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

উনিশ-শতক। ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি Ñ সর্বক্ষেত্রে একটি জাতির জেগে-ওঠার যুগ। উনিশ-শতক সংগ্রাম আর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির নিজেকে গড়ে-তোলার যুগ। উনিশ-শতক সংঘাত আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিক বন্ধন থেকে মুক্ত হবার আন্দোলনের সূচনার যুগ। শিবনাথ এই নতুন যুগের প্রত্যক্ষ দর্শক ছিলেন। সেই যুগের সবটুকু গৌরব আপন প্রজ্ঞা দিয়ে

অন্তরে গ্রহণ করেছিলেন। আত্মচরিতে নিজের জীবন-প্রসঙ্গে সেইসব বিদগ্ধ জনমণ্ডলীর কথাই তিনি বেশি বলেছেন, যাঁদের আপন কর্মসীমানার চারদিকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। এঁদের মহত্ত্বকেই তিনি বড় করে দেখেছেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পিতা হরানন্দ ভট্টাচার্য, মাতুল দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ, মাতা সোলোকমণি দেবী, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, রামকৃষ্ণ পরমহংস প্রমুখ মনীষী তাঁর আত্মচরিতে নিজ নিজ মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। সকলের কথা বলতে গিয়ে, সকলের মহত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে শিবনাথ নিজেকে আড়াল করেছেন। তাতেই তিনি সকলের শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেছেন।

সমসাময়িক বিশিষ্ট আত্মজীবনীকারদের সঙ্গে শিবনাথের পার্থক্য এখানেই Ñ অন্যরা যখন তাঁদের ব্যক্তিগত উপলব্ধি, বিশ্বাস ও জীবনাদর্শের সমর্থন খুঁজেছেন তাঁদের আত্মজীবনীতে, শিবনাথ তখন তাঁর ব্যক্তিজীবনের প্রাত্যহিকতার সঙ্গে সমসাময়িক ইতিহাসকেও আশ্চর্য নিপুণতায় যুক্ত করে দিয়েছেন। কোনো মানুষই যে তার সময় এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, একথা শিবনাথ বিশ্বাস করেছিলেন বলেই তাঁর ব্যক্তিজীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষা, ভালো-মন্দ আর ত্রুটি-বিচ্যুতির সঙ্গে সমসাময়িক ইতিহাসের একটি যোগসূত্রও তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন।

আত্মজীবনী লেখায় শিবনাথের প্রবল অনীহা ছিল। অনুরোধ ছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের। কন্যা হেমলতা নিজেই উদ্যোগী হয়েছিলেন পিতার জীবনী-রচনায়। কুণ্ঠিত শিবনাথ আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘ছি ছি এমন কাজ করিও না। …আমার আবার জীবনচরিত লেখা হইবে ভাবিলেও আমার লজ্জা হয়।’ মহৎ মানুষের মহত্ত্বই বোধহয় নিজেকে তুচ্ছ এবং অকিঞ্চিৎকর ভাবায়। শেষ পর্যন্ত শিবনাথ আত্মচরিত লিখতে শুরু করেন এবং শেষও করেন। লেখা শুরু করেছিলেন ১৯০২ সালে। শেষ হয় ১ ডিসেম্বর ১৯০৬ তারিখে। লেখা শেষ হবার সঠিক তারিখ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। তাঁর ডায়েরি থেকে জানা যায়, ১৯০৮ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত আত্মচরিত লেখা চলেছিল। লেখা শেষ হবার পর মুদ্রণের প্রয়োজনে আত্মচরিত কিছুটা সংশোধনও করেছিলেন শিবনাথ। শেষ পর্যন্ত মুদ্রিত হয়ে প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে, তাঁর মৃত্যুর মাত্র একবছর আগে। লেখা শেষ হবার তারিখ এবং প্রকাশিত হবার তারিখের মধ্যে ব্যবধান ছিল দশ বছরের।

প্রায় চারশ পাতার (৩৯১ পৃষ্ঠা) বিশাল আত্মচরিত, তেইশটি পরিচ্ছেদে বিধৃত। পূর্বপুরুষের বর্ণনা দিয়ে শুরু হয়ে শেষ ভ্রমণ ও ধর্মকার্যের (১৮৮১-১৯০৭) বিস্তৃত বর্ণনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। শৈশব, ছাত্রজীবন, ধর্মজীবনের উন্মেষ, ছাত্রজীবনে সমাজ-সংস্কার ও প্রতিজ্ঞা, ব্রাহ্মসমাজে প্রবেশ ও দীক্ষাগ্রহণ, কেশবচন্দ্র সেনের দলে যোগদান, পল্লি-সংস্কারে আত্মনিয়োগ, কলকাতায় শিক্ষকতা ও ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজে আন্দোলন, কেশবচন্দ্রের সঙ্গে বিচ্ছেদ, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ-প্রতিষ্ঠা, ভারত ভ্রমণ, কর্মজীবন, ইংল্যান্ড গমন প্রভৃতি অধ্যায়ে শিবনাথ তাঁর ব্যক্তিজীবন, কর্মজীবন ও ধর্মসাধনার প্রতিটি খুঁটিনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। আত্মচরিত কখনোই শিবনাথের ব্যক্তিগত ধর্মবোধ কিংবা বিশ্বাস-প্রচারের মাধ্যম হয়ে ওঠেনি। আত্মপ্রচার নেই। আস্ফালন নেই। কোথাও নিজ-কর্ম কিংবা কৃতিত্বের বড়াই নেই। আত্মপ্রচারসর্বস্ব আত্মকথা-পাঠে অভ্যস্ত আধুনিক পাঠক শিবনাথের আত্মচরিতে আবিষ্কার করেন বিনম্র আত্মসমালোচনায়

মুখর বিরাট মাপের এক মানুষকে, যিনি নিজেকে ছোট করতে করতে নিজের অজান্তেই উন্নত এবং সকলের শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেন।

পঞ্চান্ন বছর বয়সে শিবনাথ আত্মচরিত লিখতে শুরু করেন। একষট্টি বছর বয়সে লেখা শেষ হয়। তাঁর মৃত্যু হয় বাহাত্তর বছর বয়সে Ñ ১৯১৯ সালে। লেখা শেষ হবার পর শিবনাথ আরো এগারো বছর বেঁচেছিলেন। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন শিবনাথ। পঞ্চান্ন বছর বয়সে পনেরো বছর বয়সের, এমনকী নিতান্ত শৈশবের ঘটনারও হুবহু বর্ণনা দিয়ে যান তিনি। সবসময়ে যে সাল-তারিখ হুবহু অনুসরণ করেছেন, তা নয়। যদিও ১৮৭৮ সাল থেকে মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে প্রায় আমৃত্যু ডায়েরি লিখে গেছেন তিনি। ক্ষুদ্র, তুচ্ছ ঘটনা কিংবা চরিত্রের বর্ণনায় তাঁর নির্ভুল স্মৃতিশক্তি এবং মুনশিয়ানার পরিচয় পাওয়া যায়। শুরু থেকেই পাঠককে তিনি সম্মোহিত করে রাখেন তাঁর প্রকাশভঙ্গির আন্তরিকতা ও অকপটতায়। আত্মজীবনীতে অনায়াসে সঞ্চারিত করে দেন উপন্যাসের স্বাদ। অনায়াস নৈপুণ্যে তাঁর সময়, সমাজ ও মানুষের ছবি একের পর এক এঁকে যান তিনি। তাঁর আন্তরিকতা, সততা এবং হৃদয়ের স্পর্শ প্রতিটি বাক্যের মধ্যে পরিব্যাপ্ত হয়ে পাঠকের হৃদয়কেও ছুঁয়ে যায়।

কারো প্রতি বিন্দুমাত্র পক্ষপাতিত্ব না করে গভীর সহানুভূতির সঙ্গে অল্পকথায় এক-একটি চরিত্রকে কেমন করে শিবনাথ জীবন্ত করে তোলেন, আত্মচরিত থেকে তার দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। প্রথম পরিচ্ছেদে নিজ-গ্রাম মজিলপুর এবং পূর্বপুরুষের বর্ণনা দিতে গিয়ে পঁচানব্বই বছর বয়সী প্রপিতামহের বর্ণনায় তিনি এতটাই সাবলীল যে, মনে হয় খর্বকায়, কৃশ, মূক ও বধির বৃদ্ধকে সামনে দেখতে পাচ্ছি। ১৮৩৩ সালের সাইক্লোনে স্রোতে ভেসে-আসা তাঁদের বাড়ির আশ্রিতা পরিচারিকা তারা দাসীর চরিত্রটি তাঁর বর্ণনার গুণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘… যে সকল লোক ভাসিয়া আসিয়াছিল তাহাদের মধ্যে চিন্তা নামে এক নিম্নশ্রেণীর স্ত্রীলোক আসিয়া আমাদের বাড়ীতে শরণাপন্ন হয়। …চিন্তা আমাদের বাড়িতে থাকিয়া যায়, এবং আমার বড় পিসীর পরিচারিকা হয়। আমার বড় পিসার ছেলেমেয়েরা মাতার গর্ভ হইতে চিন্তা দাসীর ক্রোড়েই পড়িয়াছেন ও তাহার ক্রোড়েই প্রতিপালিত হইয়াছেন। আমিও মাতুলালয় হইতে আসিয়া চিন্তার ক্রোড়ে আশ্রয় পাই। আমার জ্ঞানের সঞ্চার হইলে দেখিতাম যে, চিন্তাই আমাদের হর্ত্রী কর্ত্রী। আমরা তাহাকে দাসী বলিয়া মনে করিতাম না; চিন্তাদিদী বলিয়া ডাকিতাম। চিন্তা সকল কার্যেই পটু ছিল। বন হইতে কাঠ কাটিয়া আনিত; জাল পোলো প্রভৃতি লইয়া গ্রামের প্রান্তবর্তী খাল হইতে মাছ ধরিয়া আনিত; গো দহন করিত; বাজারহাট করিত; ধান ভানিত; সর্বোপরি আমাদের প্রতি কেহ কোনো অত্যাচার করিলে বাঘিনীর ন্যায় তার ঘাড়ে গিয়া পড়িত। চিন্তার প্রতাপে পাড়ার লোক সশঙ্কিত থাকিত। চিন্তা এমন সুস্থ ও সবল ছিল যে প্রাতে উঠিয়া ১৮-১৯ মাইল হাঁটিয়া আমার মাতুলালয়ে তত্ত্ব লইয়া যাওয়া তাহার পক্ষে কিছুই কষ্টকর ছিল না’ (আত্মচরিত, পৃ. ২৪)। চিন্তা দাসী বাড়ির সব শিশুর শৈশবকে স্বরচিত গল্প দিয়ে কেমন রহস্য আর রোমাঞ্চে মুড়ে দিয়েছিল, আত্মচরিতে তারও চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন শিবনাথ। সময়কে শিবনাথ কত নিখুঁতভাবে ধরে রাখতে পারেন তার একটি কৌতুকময় পরিবেশনা সেকালের নাপিতের বর্ণনা। ‘নাপিতেরা তখন কুঠীওয়ালা বাবুদের ন্যায় বেনিয়ান পরিয়া পাগড়ী মাথায় দিয়া পথে পথে ঘুরিত। একজন নাপিত এলেন, যেন কেরানীবাবু এলেন’ (আত্মচরিত, পৃ. ৫০)। সমগ্র আত্মচরিতে ছড়িয়ে আছে এমন

অনেক চরিত্র, শিবনাথের বুদ্ধিদীপ্ত, অকপট, আন্তরিক বর্ণনায় যারা জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

শিবনাথের শৈশবের শখ ছিল জানোয়ার পোষা, পিঁপড়া পোষা, পাখি ধরা, পাখি পোষা, পাখি দেখতে তন্মনস্কতা, বিড়াল ছানা পোষা, কারণানুসন্ধিৎসা প্রভৃতি। ছেলেবেলার ভালো লাগার বিষয় দিয়ে মানুষকে বোধহয় অনেকটাই চিনে নেওয়া যায়। শৈশবের শখের মধ্য দিয়ে শিবনাথের কৌতূহলী, অনুসন্ধিৎসু মনের পরিচয় পাওয়া যায়। এই মনটিকে তিনি আমৃত্যু ধরে রেখেছিলেন। ছেলেবেলার কৌতূহল, প্রশ্ন করে কারণ জানার অনুসন্ধিৎসাই পরবর্তীকালে তাঁকে জীবনের সত্য-সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছিল। নিঃসন্দেহে পড়তে বেশি ভালো লাগে আত্মচরিতের প্রথম ভাগ। পড়তে পড়তে মনে হয় শুধু পড়ছি না, দেখছিও Ñ চলচ্চিত্রের মতো। একটি সাক্ষাৎকারে কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর পছন্দের বইয়ের তালিকায় প্রথমেই শিবনাথ শাস্ত্রীর আত্মচরিতকে রেখেছিলেন। শিল্পের সততা এবং আন্তরিকতা যে সময়কে অতিক্রম করে যায় একশ বছর পর আজও আত্মচরিতের পাঠকপ্রিয়তা সে-কথাই প্রমাণ করে।

বাংলা সাহিত্যে শিবনাথ শাস্ত্রীর আত্মচরিতেই আমরা প্রথম সত্যিকার আত্মজীবনীর স্বাদ পাই। ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন ঘটনা নিরপেক্ষ এবং শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপনের ওপরই নির্ভর করে আত্মজীবনী লেখার সার্থকতা। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন, আশা-আকাক্সক্ষা একটি গভীর উপলব্ধির স্থিরবিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হলে সেই আত্মোপলব্ধি আত্মজীবনী লেখার প্রেরণা হয়ে ওঠে। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসাধারণ আত্মজীবনীতে তাঁর ঈশ্বরোপলব্ধির কথা গভীর অনুভব ও আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যক্ত হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিজীবন থেকেছে অনুপস্থিত। দেবেন্দ্রনাথ এবং শিবনাথ দুজনেরই জীবন ছিল ধর্মভাবের বিন্দুতে স্থিতিশীল। দেবেন্দ্রনাথের ঈশ্বরভক্তি তাঁকে আধ্যাত্মিক মগ্নতায় যতটা নিবিষ্ট করেছে, শিবনাথ ধর্মভাবের আচ্ছন্নতা থেকে ততোটাই নিজেকে মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন। এর কারণ এই নয় যে, শিবনাথ ঈশ্বরভক্ত ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ শিবনাথ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শিবনাথের প্রকৃতির একটি লক্ষণ বিশেষ করিয়া চোখে পড়ে; সেটি তাঁহার প্রবল মানববাৎসল্য।’ মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সকল মানুষের কল্যাণসাধনের মধ্যে শিবনাথের ঈশ্বরপ্রীতি পথ খুঁজে পেয়েছিল।

কর্মকেই শিবনাথ ধর্ম বলে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ধর্মবোধ কখনোই তাঁকে আপ্লুত করেনি। নিষ্ক্রিয়তায় নিমজ্জিত করেনি। উজ্জীবিত করেছে মানবকল্যাণে। দুর্গত মানুষ, লাঞ্ছিত মানবতা, নিপীড়িত নারী সবসময়ে তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তাঁর প্রকৃতিপ্রেম, ঈশ্বরপ্রেম মানবপ্রেমে মিলে একাকার হয়ে গেছে।

উনিশ-শতকের বহুখ্যাত, অল্পখ্যাত ব্যক্তির জীবনী-রচনা করেছিলেন শিবনাথ। জীবনী-রচনার ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কাদের জীবনচরিত লেখা উচিত, সে-প্রসঙ্গে শিবনাথ লিখেছিলেন, ‘… যে কেহ সৎপথে থাকিয়া নিজ পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের গুণে আপনার উন্নতি সাধন করিয়াছে সে সকলেরই জীবনচরিত লেখা কর্তব্য’ (অপ্রকাশিত ডায়েরী, তারিখ ১৩ মে ১৮৮৪)। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন আমরা দেখি তাঁর আরেক অসামান্য কীর্তি রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজে। তাঁর রচিত জীবনচরিতগুলোকে তিনি কখনোই অতিরিক্ত তথ্যভারে ভারাক্রান্ত করে তোলেননি। বরং বহিরঙ্গের বাহুল্য বর্জন করে অন্তর্জীবনের সত্য ও মহত্ত্বের মৌলিকতাকে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিই তাঁর মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছে বেশি। অবচেতনে হয়তো শিবনাথ তাঁর নিজের জীবন-অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর রচিত মনীষীবৃন্দের জীবনকথায় মিল খুঁজে পেয়েছিলেন, যা তাঁকে প্রভাবিত করেছিল আত্মজীবনী-রচনায়। যদিও আমরা জানি বিশেষ স্নেহভাজন একজনের অনুরোধ এড়াতে না পেরেই অনিচ্ছুক শিবনাথ আত্মচরিত লেখা শুরু করেন।

বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনী-রচনা-প্রসঙ্গে যে-অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন শিবনাথ, তাঁর নিজের জীবনই তো ছিল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যে-পরিবারে শিবনাথ জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানে পাণ্ডিত্য ছিল, প্রাচুর্য ছিল না। সংসারের দারিদ্র্যভার-লাঘবে শিবনাথ বেছে নিতে পারতেন উপার্জনের সহজ রাস্তা। হতে পারতেন লব্ধপ্রতিষ্ঠ আইনজীবী অথবা খ্যাতিমান শিক্ষক। তাঁর জীবনবোধ তাঁকে প্রতিযোগিতায় প্রলুব্ধ না করে আত্মোন্নতি-সাধনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কী কঠিন দারিদ্র্য আর দৈন্যের মধ্যে তাঁকে বসবাস করতে হয়েছে ভাবলে অবাক হতে হয়। পিচ্ছিল পথ। পতনের সম্ভাবনা তো ছিলই। পরিবারে মায়ের স্নেহ, সুরুচিবোধ যতটা তাঁকে তাঁর কাছে টেনেছে, পণ্ডিত পিতার মাত্রাতিরিক্ত ক্রোধ ততোটাই তাঁকে তাঁর কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। শিবনাথ পিতাকে যতই শ্রদ্ধা আর সমীহ করুন, আত্মচরিত থেকে আমরা জানতে পারি, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পিতার সঙ্গে তাঁর দূরত্ব থেকে গিয়েছিল। পিতা-পুত্রের সম্পর্ক সহজ হয়নি কখনো।

সংস্কৃত কলেজে পড়ার সময় বিভিন্ন বাসায় থেকে তাঁকে পড়াশুনা করতে হয়েছিল। সেসব বাসায় বাড়ির সকলের রান্না তাঁকেই করতে হতো। বাসনপত্র পরিষ্কার করতে হতো। সুদূর ভবানীপুর থেকে পায়ে হেঁটে কলেজ করতে হতো। তার ওপর ছিল পিতার নির্মম প্রহার। এসব বাসায় যাদের সঙ্গে তাঁকে থাকতে হতো তারা সকলেই ছিল তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ। সকলেই ছিল অত্যন্ত নিম্নরুচির মানুষ। এসব বাসার বাসিন্দারা নানারকম কু-অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিল। কিশোর শিবনাথ সহজেই আসক্ত হতে পারতেন এসব কু-অভ্যাসে। মায়ের সুশিক্ষা আর তাঁর নিজের আত্মগত প্রতিরোধ-শক্তি তাঁকে সেই কুৎসিত পরিবেশের মালিন্য অতিক্রম করে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখতে সাহায্য করেছিল। এ যেন তাঁর পাঁক ঘেটে ঘেটে পথ চলা।

কঠিন জীবনসংগ্রামের এই শিক্ষা পরবর্তীকালে তাঁকে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল। মানুষ ও সমাজের স্বার্থে স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণে সমাজ-সংস্কারের প্রবল ইচ্ছা তাঁকে ব্রাহ্মধর্ম-গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পিতা এবং পরিবারের প্রবল বিরোধিতার মুখে সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ-পরিবারের সন্তান শিবনাথ তাই উপবীত পরিত্যাগ করে ব্রাহ্মধর্ম-গ্রহণে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন সরকারি চাকরি করবেন না। সাম্রাজ্যবাদী সরকারের শিক্ষাবিভাগের চাকরি সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিবাহে অনিচ্ছুক কিশোর শিবনাথ পিতার ইচ্ছায় দ্বিতীয়বার বিবাহ করতে বাধ্য হলেও পরবর্তীকালে দ্বিতীয় স্ত্রীর পুনর্বিবাহে নিজেই উদ্যোগী হয়েছিলেন একথা ভেবে যে, দ্বিতীয়বার বিবাহ করায় একজন অসহায় নারীর (প্রথম স্ত্রী) প্রতি চরম অন্যায় ও অবিচার করা হয়েছে। শিবনাথের চরিত্রের এই দিকটির প্রতি বিশেষভাবে উল্লেখ করে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই সময় উপন্যাসে শিবনাথকে পাঠকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এভাবে, ‘…ইনিতো সোমপ্রকাশের সম্পাদক দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের ভাগনে। এর নাম শিবনাথ… এই শিবনাথও কবিতা লেখেন। …শিবনাথ আরো একটি কাণ্ড করেছিলেন, …এক হিসেবে আমাদের শিবনাথ বিশ্বে অদ্বিতীয়, ইনি নিজের বউয়ের বিয়ে দেবার উদ্যোগ করেছিলেন Ñ’। (সেই সময়, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৭২)।

সারাজীবনব্যাপী যাঁর অসংখ্য সুকৃতি, যাবতীয় ভুল আর ত্রুটির জন্য নিজেকে দায়ী করে আত্মচরিতে তিনিই আত্মসমালোচনায় মুখর হয়েছেন। এমন করে নিজেকে দেখার দৃষ্টির স্বচ্ছতা কি সবার থাকে! কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে মতদ্বৈধ দেখা দেওয়ায় আদি ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে অন্যান্য ব্রাহ্মের সঙ্গে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ গড়ে তুলেছিলেন শিবনাথ। মতদ্বৈধ কখনো বিরোধ কিংবা বৈরিতায় পরিণত হয়নি। আত্মচরিতে কোথাও কারো সম্পর্কে কোনো বিরূপ মন্তব্য নেই। বরং কেশবচন্দ্রের মৃত্যুতে শোকবিধুর শিবনাথ ব্রাহ্মসমাজের বিভক্তিকেই তাঁর মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করে দুঃখপ্রকাশ করেছেন, ‘আমরা পরোক্ষভাবে তাঁহার মৃত্যুর অন্যতম কারণ, এই মনে করিয়া সেই দুঃখ ঘনীভূত হইল’ (আত্মচরিত, পৃ. ২০০)। ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে দলাদলিতে দুঃখ পেয়েছেন শিবনাথ এবং সমাজের অধঃপতনের জন্য নিজেকে অভিযুক্ত করেছেন। আপন কর্মসীমানার চারদিকে যে-বিদগ্ধ জনমণ্ডলীকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ তাঁর হয়েছিল, তাঁদের তিনি তাঁর জীবনের সকল কাজের প্রেরণার উৎস মনে করতেন। কারো কাছ থেকেই জীবন এবং কর্মের পাঠ নিতে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিল না। হিন্দুধর্মের মনীষী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের কাছে ধর্মের উদারতা ও বিশ্বজনীনতার পাঠগ্রহণেও তাই ব্রাহ্ম শিবনাথের কোনো সংকোচ নেই। ‘রামকৃষ্ণের সহিত মিশিয়া আমি ধর্মের সার্বভৌমিকতার ভাব বিশেষরূপে উপলব্ধি করিয়াছি’ (আত্মচরিত, পৃ. ১৮৩)।

উনিশ শতকীয় সমাজের মানুষ কলহপ্রবণতা থেকে মুক্ত ছিল, এমন নয়। একনায়কতন্ত্রী মানসিকতার মানুষেরও অভাব ছিল না। কেশবচন্দ্র সেন কি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত হয়ে নতুন সমাজ ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজে’র পতন করেননি? সেই যুগেও বিরোধ ছিল, কলহ ছিল। আজকের মতো পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি বোধহয় ছিল না। আক্রমণাত্মক না হলে এখন আলাপই জমে না। অর্থ দিয়ে, ধর্ম দিয়ে, শক্তিপ্রয়োগে একে অন্যকে টেনে নিচে নামাতে আমাদের তৎপরতারও অন্ত নেই। শিক্ষা, সভ্যতা, উন্নয়ন আর অগ্রগতির শিখরে পৌঁছেও উদারতার পরিবর্তে অসহিষ্ণুতা, গোঁড়ামি আর সংকীর্ণতা সমাজ-জীবনকে আজ বিষিয়ে তুলছে। নিজ-ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব আর পর-ধর্মের নিকৃষ্টতা প্রমাণ করে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেওয়া হচ্ছে। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাই দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে-ওঠার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে উঠেছে। মানবকল্যাণে নিঃস্বার্থ ত্যাগের যে-দৃষ্টান্ত শিবনাথ রেখে গেছেন, সময় পালটেছে বলে তাকে কি আমরা অতীতের বর্জ্য বলে বাতিল করব নাকি সমাজ-গঠনে দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করব?

জীবনে কখনো পার্থিব সুখ বা সচ্ছলতা কামনা করেননি শিবনাথ। ১৮৭৬ সালে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন সরকারি চাকরি করবেন না। সাম্রাজ্যবাদী সরকারের শিক্ষাবিভাগের চাকরি সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়ে তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞা পালন করেছিলেন। তারপর জীবনে আর কোনো আর্থিক উপার্জনের কাজ করেননি। শিষ্যদের সঙ্গে নিয়ে আরো প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, কেউ কখনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি করার চেষ্টা করবেন না। শিবনাথ সে-প্রতিজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। আজীবন কপর্দকহীন ছিলেন তিনি। আজকের ভোগবাদী সমাজ শিবনাথকে হয়তো বোকা, নির্বোধ বলে অভিহিত করবে। এ সমাজ মানুষকে মূল্যায়ন করে অর্থ আর ক্ষমতা দিয়ে। দেশে এখন সমাজসেবকেরও অভাব নেই। অর্থ হলেই সমাজসেবক হওয়া যায়। জীবনে যার কোনো ত্যাগ নেই বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই সৃজনশীলতার সঙ্গে তারও সমাজসেবক হতে বাধে না। জহুরির মতো খাঁটি সোনা চিনতে কখনো ভুল করেননি রবীন্দ্রনাথ। মানবকল্যাণে নিজেকে উজাড় করে-দেওয়া বিশাল মাপের মানুষটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেছিলেন, ‘জ্ঞানে গভীরতা, প্রেমে বিশালতা, কর্তব্যপালনে দৃঢ়তা, চরিত্রে সংযম, মানবে প্রীতি এবং ঈশ্বরে ভক্তিই’ ছিল শিবনাথের জীবনের মন্ত্র। মানবিক গুণাবলিই ছিল তাঁর শক্তি, তাঁর সম্বল।

আত্মচরিতে শিবনাথের চরিত্রের আরো একটি যে-বিশেষ দিক উন্মোচিত হয়েছে, তা হলো নারীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, সহানুভূতি আর ভালোবাসা। নারীজাতির প্রতি তাঁর এই ভালোবাসারও উৎস ছিল তাঁর মানবপ্রেম। শৈশবেই বাল্যবিবাহকে ঘৃণা করতে শিখেছিলেন। বিধবা-বিবাহের সমর্থক ছিলেন। ১৮৫৬ সালে কলকাতায় প্রথম বিধবা-বিবাহের অনুষ্ঠানে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে বালক শিবনাথের উপস্থিত থাকার বিবরণ আমরা তাঁর আত্মচরিতে পাই। নারীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা সব থেকে বেশি প্রকাশ পেয়েছে বহু আশ্রয়হীনা নিপীড়িত নারীকে নিজ-গৃহে আশ্রয়দানের মধ্য দিয়ে। এই আগ্রহের পেছনে সমাজ-সংস্কারের খ্যাতির আকাক্সক্ষা তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র ছিল না। বারিদ বরণ ঘোষ লিখেছেন, ‘জীবনপথে চলতে চলতে নিরাশ্রয় ও পতিত হয়েছে, এমন মানুষের প্রতি শাস্ত্রী মহাশয়ের সহানুভূতি ছিল অসীম। ফলে অন্যে যাদের পায়ে দলে যেতে চেয়েছে, শাস্ত্রী মহাশয় তাঁদের গভীর আগ্রহে বুকে তুলে নিয়েছেন। যে পতিতাদের স্থান দিতে অন্যের মনে স্বাভাবিক সঙ্কোচ জাগত, শিবনাথের কাছে এসে তাঁরা শান্তির নীড়ের সন্ধান পেত।’ নারীর প্রতি সহিংসতা আর অমানবিক আচরণের নিষ্ঠুর এই সময়ে একালের আধুনিক নারীর কাছ থেকে সহজেই শিবনাথ শ্রদ্ধা আদায় করে নিতে পারেন। আধুনিক পুরুষও পারে নারীর প্রতি তার প্রথাবদ্ধ সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে বেরিয়ে আসতে।

দেশে এখন অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নারীমুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আজ থেকে একশ পনেরো-কুড়ি বছর আগে এসব কিছুই যখন ছিল না তখন শিবনাথের গৃহই হয়ে উঠেছিল পতিত, নির্যাতিত নারীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। নারীমুক্তি-আন্দোলনে ব্রাহ্মসমাজের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। স্ত্রী-শিক্ষা এবং নারী-অধিকার নিয়ে মতভেদের কারণে ব্রাহ্মসমাজ দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়। আত্মচরিতে শিবনাথ এ ব্যাপারে আভাস দিয়েছেন। নারীজাতির সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন শিবনাথ। নারী-পুরুষের সমান অধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। নারীর উচ্চশিক্ষার অধিকারও এর

অন্তর্ভুক্ত ছিল।

শিবনাথ যা বিশ্বাস করেছেন নিজের জীবনেও তার চর্চা করে গেছেন, যে-কারণে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শিবনাথকে ‘বিশ্বে অদ্বিতীয়’ বলেছিলেন। দ্বিতীয় পত্নীর পুনর্বিবাহের সেই বিষয়টি থেকেও নারীজাতির প্রতি শিবনাথের শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির ব্যাপারটি প্রমাণিত হয়। প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও পিতার ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করে দ্বিতীয়বার বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছিলেন শিবনাথ। তখন তাঁর বয়স অল্প। পিতার ব্যক্তিত্ব, ক্রোধ এবং প্রহারের ভয়ে সদাসন্ত্রস্ত থাকতে হতো তাঁকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ নির্বাসিতের বিলাপ তখন সবেমাত্র প্রকাশিত হয়েছে। মনে মনে মস্ত কবি হবার আনন্দে বিভোর শিবনাথ। ঠিক সেই সময়ে তাঁর পিতা কোনো কারণে তাঁর পত্নী প্রসন্নময়ী এবং তাঁর বাড়ির লোকের প্রতি বিরক্ত হন এবং তাঁকে (প্রসন্নময়ীকে) পিতৃগৃহে পাঠিয়ে একেবারে বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেন। শিবনাথ একমাত্র পুত্রসন্তান হওয়ায় বংশরক্ষার উপায় হিসেবে তাঁর পিতা পুত্রের পুনরায় বিবাহ দেওয়া স্থির করেন। শিবনাথ লিখেছেন, ‘বাবা আমাদের (মায়ের এবং তাঁর) আপত্তির প্রতি দৃক্পাতও করিলেন না। আমাকে ধরিয়া বিবাহ দিতে লইয়া গেলেন’ (আত্মচরিত, পৃ. ৮৮)।

দ্বিতীয় বিবাহ শিবনাথের মনে অপরাধবোধের ঝড় তুলেছিল। ‘একটি নিরপরাধী স্ত্রীলোককে অন্যায়রূপে গুরুতর সাজা দেওয়া হইল, এবং আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই অন্যায় কার্যের প্রধান পুরুষ হইলাম ইহা ভাবিয়া লজ্জা ও দুঃখে অভিভূত হইয়া পড়িলাম।’ লজ্জা আর দুঃখ পরিণত হয়েছিল চরম মানসিক অবসাদে। অপরাধবোধ থেকেই পরবর্তীকালে শিবনাথ দ্বিতীয় পত্নীর পুনর্বিবাহে উদ্যোগী হয়েছিলেন। তুচ্ছ কারণে পিতা যাকে চিরদিনের জন্য পিতৃগৃহে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সেই প্রথমা পত্নী প্রসন্নময়ীকে শিবনাথ আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন নিজের কাছে। পুনর্বিবাহে রাজি না হওয়ায় দ্বিতীয় পত্নী বিরাজ মোহিনীকেও স্ত্রীর সম্মান ও মর্যাদায় সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।

নারীর শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার বিষয়টি শুধু যে শিবনাথের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে তাই নয়, নারীকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। নারীশিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন ব্রাহ্মবালিকা শিক্ষালয়। নারী এবং শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত কিছু ধারণা ছিল। নারীর শিক্ষা এবং স্বাধীনতার উপরেই যে সামাজিক পবিত্রতা এবং মানবকল্যাণ নির্ভর করে, এ কথা শিবনাথ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। সুদূর ইংল্যান্ডে দীর্ঘ আট মাস অবস্থানকালে সেখানকার নারীসমাজ, সমাজে নারীর ভূমিকা এবং নারীর শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি লক্ষ করেছিলেন সে-দেশের প্রাচীনপন্থি পুরুষরা নারীর শিক্ষা এবং স্বাধীনতাকে যথেষ্ট মুক্ত মনে গ্রহণ করতে পারেনি। শিবনাথ লিখেছেন, ‘এদেশের (ইংলন্ডের) প্রাচীন ভাবাপন্ন অনেক মানুষের মত এই যে নারীগণকে সামাজিক স্বাধীনতা দিলে সামাজিক পবিত্রতা থাকিবে না। ঠিক ইহার বিপরীত কথা সত্য, নারীগণের শিক্ষা ও স্বাধীনতার উপরেই সামাজিক শক্তি ও পবিত্রতা নির্ভর করে’ (আত্মচরিত, পৃ. ৩৪২)।

১৯০২ সালে শিবনাথ যখন আত্মচরিত লেখা শুরু করেন তার অনেক আগেই সতীদাহ রহিত হয়েছে, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহের প্রতি ঘৃণা এবং বিধবা-বিবাহের প্রচলন হয়েছে। মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে নানা উদ্যোগ এবং ব্যবস্থাও গৃহীত হয়েছে। ব্রাহ্মসমাজ নারীমুক্তি-আন্দোলনে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখে চলেছে। গত একশ বছরে সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীর অগ্রগতিকে এক কথায় অভূতপূর্ব বলা যায়। নারীর চলার পথ কিন্তু আজও মসৃণ হয়নি। ঘরে-বাইরে অবদমিত নারী আজও নীরব লাঞ্ছনাভার বয়ে চলেছে। নারী যেটুকু বলে, বলতে পারে, না-বলা থাকে তার চাইতে অনেক বেশি। সাজানো গৃহে নারী শুধু সজ্জিত পুতুল হয়ে থাকবে Ñ নারীকে ঘিরে পুরুষের এই দৃষ্টিভঙ্গির আজও তেমন পরিবর্তন হয়নি। ধর্মের নামে তালেবানি কূপমণ্ডূকতায় নারীকে অবরুদ্ধ করারও পাঁয়তারা চলছে। প্রয়োজন নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন। শিবনাথ নারীর সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। পুরুষের আন্তরিকতা আর সদিচ্ছা ছাড়া নারীর সর্বাঙ্গীন মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়।

সারাজীবন অন্ধকার থেকে আলোতে যাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন শিবনাথ। তাঁর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘তমসো মা জ্যোতির্গময় Ñ এই প্রার্থনাটি তিনি শাস্ত্র হইতে পান নাই, বিচারবুদ্ধি হইতে পান নাই, ইহা তাঁহার জীবনীশক্তিরই কেন্দ্রে নিহিত ছিল, এই জন্য তাঁহার সমস্ত জীবনের বিকাশই এই ব্যাখ্যা।’ শিবনাথ শাস্ত্রী বর্তমান প্রজন্মের কাছে আজ বিস্মৃত অতীত। তাঁর জীবন এবং যুগ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। তাঁকে জানা কিংবা মনে রাখার কোনো দায় আমাদের নেই। কিন্তু ‘অতীতের বর্জিত ধ্বংস¯ূ—পের মাঝেও এমন কেউ কেউ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন, যাদের জীবনে কান পেতে ইতিহাস তার নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে পায়।’ শিবনাথ শাস্ত্রী তেমনই চিরস্মরণীয় এক ব্যক্তিত্ব। আত্মচরিতের পাতায় পাতায় বিনম্র যে-মানুষটি তাঁর জীবন-সংগ্রাম ও সাধনার কথা বলে গেছেন, লাঞ্ছিত মানবতা আর লুণ্ঠিত মূল্যবোধের অন্ধকার এই সময়ে তিনি কি আজও আমাদের সত্যের পথে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যাবার পথ দেখান না?

শিবনাথের জীবন এবং কর্ম দৃষ্টান্ত হতে পারে সকলের জন্য। প্রতিকূল পরিবেশের চাপে পরাস্ত না হয়ে সততা, পরিশ্রম আর অধ্যবসায় দিয়ে নিজেকে উন্নত, সতেজ রেখে, নিজের কর্মসীমানাকে সততই বিস্তৃত করা তাঁর চলিষ্ণু জীবনের মহত্ত্বকেই প্রমাণ করে। শিক্ষকতা, সমাজসেবা এবং দেশপ্রেমে নিজেকে উজাড় করে দেবার পরও অসম্পূর্ণ মনে হতো তাঁর নিজেকে। সমাজ-প্রগতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে নিঃস্বার্থ মানবসেবার এই আদর্শ কি একেবারেই লুপ্ত হয়ে গেছে? ধর্ম কি শুধুই বিদ্বেষ, হানাহানি আর শক্তিপ্রয়োগে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে? সংঘাতমুখর এই পৃথিবীতে হানাহানিতে লিপ্ত মানুষ একদিন ক্লান্ত হবেই। ঘৃণা, বিদ্বেষ আর অস্ত্র ছুড়ে ফেলে তাকে মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতেই হবে। কারণ শক্তি একদিন শেষ হয়। ক্লান্ত হয়। প্রেম, ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না। ক্লান্ত হয় না।

সহায়ক গ্রন্থ

১. শিবনাথ শাস্ত্রী, আত্মচরিত, ভূমিকা, অনুষঙ্গ, সম্পাদনা গৌতম নিয়োগী, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ শতবার্ষিক সংস্করণ।

২. সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী (সম্পাদিত) শ্রীমহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, কলকাতা ১৯২৭।

৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘শিবনাথ শাস্ত্রী’ প্রবাসী, অগ্রহায়ণ, ১৩২৬। ৪. বারিদবরণ ঘোষ, সাহিত্য-সাধক শিবনাথ শাস্ত্রী, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ শতবার্ষিক সংস্করণ।