আনা ইসলাম
-
প্যারিস থেকে : শতাব্দীর চোখ অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ
চূড়ান্ত মুহূর্তে ঠিক জিনিসটির ওপর ক্যামেরা ধরতে পারাটাই আসল কাজ, আর ওই বিশেষ ক্ষণ থেকেই ভূমিষ্ঠ হতে পারে কালজয়ী ছবি – এই বিশ্বাস লালন করতেন তিনি। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রীদের একজন অঁরি কার্তিয়ে ব্রেসঁ। সংস্কৃতি ও ঐশ্বর্যের বনেদি পরিবেশে জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালে ফ্রান্সে সন্তেল-পরিবারে। দাদা, বাবা, চাচা সবাই কম-বেশি চিত্রচর্চা করতেন। তবে বাবার ছোটভাই লুই কার্তিয়ে ছিলেন বিখ্যাত, ‘প্রি দ্য রোম’ (১৯১০) জয়ী শিল্পী। ১৯১৩ সালে বড়দিনের রাতে শিশু ব্রেসঁ জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি পেয়েছিলেন। চিত্রশিল্পী চাচা ভাইপোকে অনুমতি দিলেন তাঁর স্টুডিওতে প্রবেশের। পাঁচ বছরের শিশুর সামনে উন্মোচিত হলো রঙিন কিংখাবে মোড়া সৃজনের ভুবন। চোখে গুপ্তধন-আবিষ্কারের বিস্ময়। ঘটনার আশি বছর পরও রং, তুলির গন্ধে তাঁর দ্বিতীয় জন্মলাভের স্মৃতিতে আলোড়িত হয়েছেন কীর্তিমান চিত্রী ব্রেসঁ। চাচার স্টুডিও দেখার প্রথম পরিচিতিটি নিয়তির মতো হয়েছিল তাঁর জীবনে; মলের গোপন সুড়ঙ্গে জমা শিল্পসৃজনের রাগ-রাগিণী। ফলে শৈল্পিক জীবন শুরু করেছিলেন চিত্রশিল্পী হিসেবেই। সাদা-কালো আলোকচিত্রের ভুবনে মোহাবিষ্ট হয়েছেন পরে। শৈশবে মুকুলিত শিল্পে অনুরাগ, মুগ্ধতা ছিল জীবনভর। কৈশোরের অনপনেয় স্মৃতিচারণ, “চিত্রকলা ছিল আমার আবেশ, বাবার ভাই যিনি বড়দিনের রাতে স্টুডিও দেখিয়েছিলেন আমার সেই ‘মিথিকাল ফাদার’… আমি চিত্রকলার ছায়ায় বাস করেছি; আমি নিশ্বাসে টেনেছি ক্যানভাসের গন্ধ।” পরে ১২ বছরের নওল কিশোরের চিত্রচর্চায় অভিষেক হয়েছিল চাচার দেখা তেলরং দিয়েই। তিনি মারা যান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। মনের শিষ্য এবং প্রুস্তের বন্ধু জ্যাক এমিল ব্লশ ১৬ বছর বয়সের ব্রেসঁকে আমন্ত্রণ জানান তাঁর স্টুডিওতে গিয়ে ছবি আঁকার। লিসেতে পড়ার সময়েই ক্লাসের বইয়ের চাইতে আনন্দ পেতেন দস্তয়ভস্কি, শোপেনহার, প্রুস্ত, মালার্মে, জয়েস, মার্কস পড়ায়। আর বয়ঃসন্ধিতে লক্ষ্যস্থির তখন চিত্রকর হবার। ফলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ব্রেসঁর ধ্যানের দেবতা র্যাঁবো। মূলত দাদা, সুররিয়ালিজম, জয়েস প্রায় অঁভ-গার্দদের সবাই – অ্যাপোলিন্যার থেকে জঁলুক গদার – শুরুটা র্যাঁবোকে দিয়েই। দান্তের ডিভাইন কমেডিতে রদ্যাঁ-সৃষ্টির ব্যাকুলতম প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলেন আর ব্রেসঁ প্রেরণা খুঁটে নিয়েছিলেন র্যাঁবো থেকে। সেই ষোলো বছরেই পরিচয় হয়েছিল ম্যাক্স জ্যাকব এবং রেনে ক্রেভাল, আর উনিশে অঁদ্রে ব্রেতঁ, ম্যাক্স অ্যারনস্ত, এলি ফোরের সঙ্গে। লিসের গণ্ডিবাঁধা জীবন ছেড়ে উনিশ বছর বয়সে তিনি ছবি আঁকা শিখতে যান শিল্পী অঁদ্রে লোৎয়ের কাছে। লোৎ ছিলেন কিউবিস্ট ঘরানার। ছাত্রকে শিল্পগুরুদের চিত্রকর্ম দেখানো এবং অধ্যয়নের জন্য ল্যুভ্রসহ অন্যান্য গ্যালারিতে নিয়ে যেতেন সমসাময়িক শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা দিতে। আধুনিক শিল্পকলা সম্পর্কে ব্রেসঁর আকর্ষণের পেছনে ছিল রেঁনেসার চিত্রকর্মসমূহ – পাওলো উচ্চেলো, পিয়েরো দেল্লা, ফ্র্যান্সেসকা, মাসাচ্চিও এবং জানভান এইকের প্রতি সশ্রদ্ধ মুগ্ধতা। শিক্ষক লোৎ সম্পর্কে বহু পরে বলেছেন, ‘তিনি আমাকে পড়তে এবং লিখতে শিখিয়েছিলেন। তার ভূ-চিত্র এবং পিগারের উপর বইগুলো ছিল গবেষণাধর্মী… তাঁর মৃত্যুর কদিন আগে আমার দেখা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে ১৯৬২তে। আমার আলোকচিত্র সম্পর্কে বলেছিলেন – চিত্রশিল্পী হিসেবে তোমার চর্চা থেকেই সবকিছু এসেছে। অঁদ্রে লোৎয়ের কাছে কাজ শিখবার এক পর্যায়ে মনে হতে থাকে তাঁর ছবি প্রায় শিক্ষকের কাজের অনুকরণ হয়ে পড়ছে। কিন্তু লোৎয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা চিত্রকলায় না হলেও পরবর্তীকালে ফটোগ্রাফির কম্পোজিশন ও ফর্মের সমস্যা-সমাধানে সাহায্য করেছে। ইতোমধ্যেই ইউরোপের সর্বত্র ফটোগ্রাফিক রিয়েলিজম বা আলোকচিত্রের বাস্তবতার স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদ্দেশ্য, কীভাবে আলোকচিত্রের উন্নতি করা যায় – এ-সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা, মতবাদ। তুমুল আলোচনা, হল্লা চলছে – Crush tradition! Photograph things as they are! বলাই বাহুল্য এই বিদ্রোহের কেন্দ্রে ছিল সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের ঝাপটা, সময়টা ১৯২৪। ১৯২৫, তখনো ব্রেসঁ কাজ করছেন লোৎয়ের স্টুডিওতে। এর মাঝেই যাওয়া-আসা বিখ্যাত কাফে লা প্লাস ব্লশের আড্ডায়; সঙ্গী প্রিয়বন্ধু তরুণ কবি রনে ক্রেভাল,…
