মুল্ক রাজ আনন্দ্
-
খাঁচারটিয়া
অনুবাদ : জাফর আলম [ভারতে ইংরেজি উপন্যাসরচনার পথিকৃৎ মুল্ক রাজ আনন্দ্ ৯৯ বছর বয়সে মুম্বাইতে মৃত্যুবরণ করলেন গত ২৮ সেপ্টেম্বরে। তাঁর জন্ম হয় ১৯০৫ সালে, পেশোয়ারে। শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয় পাঞ্জাব, কেমব্রিজ ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুকাল জেনেভার লিগ অফ নেশনস ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনার পর তিনি নানাধরনের কাজ করেন ভারতে ও ইংল্যান্ডে। ১৯৪৬ সালে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসে স্থিত হন মুম্বাইতে। তিনি শিল্পবিষয়ক পত্রিকা মার্গ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে শিক্ষকতা করেন একাধিক ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর প্রথম উপন্যাস অস্পৃশ্যদের জীবন নিয়ে লেখা আন্টাচেবলস্ (অচ্ছুত, ১৯৩৫) ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হয়ে সাড়া জাগায়। এর ভূমিকা লেখেন ই এম র্ফস্টার। তারপর একে একে কুলি (১৯৩৬), টু লিভস অ্যান্ড এ বাড (দুটি পাতা একটি কুঁড়ি, ১৯৩৭), দি ভিলেজ (১৯৩৯), অ্যাক্রস দি ব্ল্যাক ওয়ার্টাস (১৯৪০), দি সোর্ড অ্যান্ড দি সিক্ল (১৯৪২), প্রাইভেট লাইফ অফ অ্যান ইন্ডিয়ান প্রিনস (১৯৫৩) প্রভৃতি তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়। সাহিত্য আকাদেমির পুরস্কার, বিশ্ব শান্তি পরিষদ পুরস্কার এবং রাষ্ট্রীয় ‘পদ্মভূষণ’ খেতাবে তিনি ভূষিত হন। হিন্দি ও পাঞ্জাবি বাক্যরীতিকে ইংরেজিতে রূপান্তর করতে যে-দক্ষতা তিনি দেখিয়েছেন, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর লেখা এবং তাঁর সম্পর্কে লেখা বইয়ের সংখ্যা দেড় শতাধিক। মুল্ক রাজ আনন্দ্ ভারতীয় স্বাধীনতা-সংগ্রামে এবং স্পেনের গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দেশে সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।] রুকমানীই, নী রুকমানীই – খাঁচায় বন্দি কাকাতুয়া ডাক দেয়। রুকমানীর বান্ধবী এমনিভাবে লাহোরের কাচ্চা চাবুক সরণিতে প্রবেশ করে এভাবে ডাক দিত। কাকাতুয়া বারবার তাকে ডাক দেয়, যতক্ষণ সে পাখিকে কৌতুকবশে জবাব না দিচ্ছে ততক্ষণ সে ডেকেই চলে। সে কোনো জবাব দেয়নি বরং রাস্তার পাশে বসেই ছিল। অমৃতসর কোর্ট দেড় মাইল দূরে, রাস্তার ধারে রুকমানী পা ছড়িয়ে বসেছিল। কাকাতুয়া আবার ডাক দেয়, ‘রুকমানীই, নী রুকমানীই’। রাস্তায় ধুলা উড়িয়ে মোটর, টাঙ্গা, এক্কা গাড়ি যাতায়াত করছে অবিরাম। সে ধুলায় আচ্ছন্ন আকাশের একদিকে তাকিয়ে থাকে। দোকানদার বলেছে রুকমানীকে, ওই দিক থেকে ডেপুটি কালেক্টর আসবে। কাকাতুয়ার ডাকাডাকি তার কানে যাচ্ছিল না। ‘রুকমানীই, নী, রুকমানীই’ – কাকাতুয়া অবিরাম ডাকতে থাকে! কাকাতুয়ার ধারণা, হরবোলা পাখির ন্যায় বারবার ডাকাডাকি করলে হয়তো সে একটিবার অবশ্যই উত্তর দেবে। ‘হ্যাঁ, বাবা হ্যাঁ’, ক্লান্তস্বরে জবাব দেয়। তার মাথার পেছনে চুলের খোপার নিচে ব্যথা ছিল। সেপ্টেম্বরের সকালের রোদে ব্যথাটি আবার চাড়া দিয়ে উঠে। তাদের এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় একদিন লোকজন অগ্নিসংযোগ, লুটপাট আর হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠেছিল। সেই ভয়াবহ রাতের ঘটনার চেয়ে তার ঘাড়ের ব্যথাটি আরো বেদনাদায়ক। বয়সের ছাপ তার চোখে-মুখে আর কপালে। সে দুহাতে কপালে ছায়া মেলে সড়কের দিকে তাকায়, উদ্দেশ্য ডেপুটি কমিশনার আসছে কিনা নিশ্চিত হওয়া। তার দাঁতবিহীন মুখখানি ছিল উন্মুক্ত আর ঠোঁটের উপর বসেছিল কয়েকটি মাছি। সে বাঁ হাতে মাছি তাড়ায়। কিন্তু দুষ্ট মাছি কোনোমতেই পালাতে চায় না। ফলে বুড়ি কিছুটা উত্তেজিত হয় আর সে-উত্তেজনা যেন আর বুক থেকে পেটে গিয়ে তোলপাড় করছিল। ‘নী তু কিত্তে হ্যায়’, কাকাতুয়া আবার ডেকে উঠে। এই বাক্যটি কাকাতুয়া বুড়ির বান্ধবীর মুখে শুনেছে। সে বুড়ির বাড়িতে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ডাক দিত,…
