কবিতা
-
দশটি প্রদীপ জ্বালো
আসাদ চৌধুরী কোলে-কাঁখে কখনো দেখিনি চার চরণের ব্যবহারও নেই, উল্লসিত মাতৃকুল চোখ ঠেরে বলেননি ‘ও রে ভাঁদর ফিরে চা।’ শুরু থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা দিগন্তের দিকে। আগে-পিছে নার্সিসাস হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। কোরাসের দলে নেই, শুধু মেঘ একাই বলেছে দগ্ধ দেহে প্রতিধ্বনি গুনগুন করে, ‘যাব, যাব’। লাঠি ফেলে, ঘৃত ঢেলে, সোনার মেয়েরা দশটি…
-
তোমার নাগকেশর
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত অনেক খুঁজে ফুটপাতের দোকানে পেয়ে যাই তোমার ‘নাগকেশর’ জীর্ণ মলাট, উইপোকারা এসে আমার প্রিয় কবিতাগুলি থেকে মুছে দিয়েছে দু-তিনটি অক্ষর ঠাকুর দেখতে গিয়েছে কারা সপ্তমীতে শ্রাবণধারায় ভেসে – অন্যদিকে কবিরা আজ ব্যস্ত আছে তোমার অনুল্লেখে একমাত্তর আমিই বুঝি পিছুটানের অাঁজলকাজল মেঘে তোমার বেঁচে-থাকার পথের স্টেশনগুলো গুনতে-গুনতে চলি; নদীয়া আর বরানগর, বনহুগলি, হিন্দুস্থান পার্ক…
-
কুবো
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী একটা পাখি ডেকে যাচ্ছে ভরদুপুরে আজ অদূরে কোথাও, অবিরাম। আর সে যতই ডাকে, ততই আমার চেতনায় আবছা হয়ে আসতে থাকে ট্রাম, বাস, জগঝম্প আর সাততলা-আটতলা হাইরাইজ বিলডিং নিয়ে কলকাতা শহর। ডাক শুনেই বুঝতে পারি, এ আমার চেনা জলচর কুবো পাখি। অজপাড়াগাঁয় গেরস্তবাড়ির যৎসামান্য দূরে হাজামজা ডোবার কিনারে ঠায় নিরঞ্জন দুপুরবেলায় নিরালা একাকী…
-
চিনতে নারি
আল মাহমুদ কোথায় কারা ডাক দিয়েছে হাঁক দিয়েছে আমার নাম হঠাৎ আমি দাঁড়াই ঘুরে বলি শুনুন, আছ ছালাম। আমার নামে পক্ষি উড়ে আকাশজুড়ে তারার ঢেউ তারায় তারায় পথ হারিয়ে একলা চলি নেই তো কেউ। একলা আমি অগ্রগামী কোথায় থামি কোথায় ঘর ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ওই চিনতে নারি আপন-পর।
-
বৃত্ত থেকে বৃত্ত
নওশাদ জামিল সবাই ছেড়েছে জানি। তুমিও তো যাবে জীবন্মৃত। একে একে বৃষ্টির ভিতর ছড়িয়ে পড়েছে বেলপাতা, নীলশাড়ি ভাঁজে ভাঁজে যেন এক নৌকার দুলুনি। আমি দুলি, সে-ও দোলে প্রায় প্রতিক্ষণে মাথাটা ঝাঁকিয়ে বলে, কোথায় যাবেন? পেছনে বিস্ফার ঢেউ, কাঁপে মত্ততায় যেন সে সন্ধ্যার বাঁকে দেখা রাজহাঁস। আমি হাসি, সে-ও হাসে প্রায় প্রতিক্ষণে শেষে…
-
কাঠুরিয়া কাঠ কেটে যায় বনে
সৈয়দ সারোয়ার এক বিশাল বনে কাঠুরিয়া কাঠ কেটে যায় আমার মনে দেখি সেই ছবি ঝরাপাতার নূপুরে কাঠুরিয়ার কুঠারে বেজে ওঠে যে-সুরের ধ্বনি সে-সুর আমি শুনেছিলাম কোথা থেকে মনে নেই গো, মনে নেই গো সবই। কাঠুরিয়ার কুঠারে কে একজন স্বর্গীয় ছড়িয়ে দিলো জ্যোতি কেন জ্যোতি কিসের জ্যোতি মনে নেই গো, মনে নেই আর…
-
ফিল্মফেস্ট-১
গৌতম গুহরায় প্রদীপ জ্বলে উঠলে তিনটে দেহ নেমে আসে, ভৌতিক নয় তবু করোটি ও মুখোশের মতো রক্তশূন্য ও রংমাখা লাইন ছেড়ে কেউ কেউ বেরিয়ে আসে, দেহগুলো ভাড়া নেয় আমিও একটা বহুবর্ণের মুখোশ ভাড়া নিই চারদিকে হাততালির অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসি নিস্তব্ধ গাছের নিচে, নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। তখন ঘণ্টা বাজে, হট্টগোল নিয়ে…
-
আগ্রার তাজমহল
সেলিম মাহমুদ মুহূর্ত বদল হলে ভাষা অণু-পরমাণুতে ছোটাছুটি করে। একদিন যা ছিল অধীরে আগ্রহের অন্যদিন হতে পারে সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিক। আজ পূর্ণিমার আকর্ষণে ফুলেফেঁপে-ওঠা উপকূল তারাদের বিশ্রামাগারের ফুল দুর্নিবার না-ও হতে পারে। সকল কিছুতে তাই সমান আগ্রহ হয় না কখনো কোনো কোনো দিন এমনিতেই ফেলে রাখি আগ্রার তাজমহল। আগ্রার তাজমহল সেলিম মাহমুদ…
-
নিজেই হয়েছি ঘরভেদী
গোলাম কিবরিয়া পিনু আমারও আত্মপীড়া আছে! কার ধরি দোষ? আমিও দাঁড়িয়েছিলাম শত্রুর সাথে কোন নদীটির কূলে? মাতৃকুল-পিতৃকুল ভুলে! আমিও তো সুসন্তান থাকিনি আমিও তো অঙ্গীকার রাখিনি সেই আত্মদোষ – ভালো করে জানে আমারও মস্তিষ্কের কোষ! কার করি নিন্দা? আমারই কারণে হয়েছে নষ্ট পরাগ ও রেণু আমিও বাজিয়েছিলাম কোন ইতরের বেণু? ভুলে…
-
প্রতীক্ষিত পিপাসার দ্বিধা
সুহিতা সুলতানা মাটি ও জলের মুখোমুখি ঝুলে আছে তার ঈর্ষাতুর হাসি কিসে পাপ আর কিসে অপরাধ য্যানো জানে না সে। ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রতীক্ষিত পিপাসার দ্বিধা। তোমাকে না দেখে কীভাবে বাঁচে প্রাণ বলো দেখি? কেন এতো আক্রোশ পুষে রাখো মনের ভেতরে? কেন ঈষৎ উঁচিয়ে ধরো বিষাদের দ্রাক্ষারস? বিভ্রান্ত নেশার ঘোরে নির্বোধ কেন হও তুমি?…
-
যারা কবিতা পড়েনি
উত্তম দাশ যখন দেখি দেশটা উন্মাদ হয়ে গেছে স্কুল-কলেজ ভেঙে খানখান দলতন্ত্রে পড়শিকে খুন করে হাতের রক্ত ধুয়ে ফেলছে ময়দান ভরিয়ে ফেলছে যে কারণে তার পেছনে কোনো দেশপ্রেম নেই – তখন বুঝি, এরা কখনো কবিতা পড়েনি। যে ছেলেমেয়েগুলো মাঠে-ময়দানে বাংলা আকাদেমির চত্বরে, ভিকটোরিয়ার প্রকৃতির মাঝখানে শরীর ডুবিয়ে প্রেম করছে মাসে মাসে সঙ্গী বদল…
-
সেই উঠোন
কাজী রোজী উঠোনটাকে পেরিয়ে গিয়ে পথ পথের শেষে অন্ধকারের রূপ বৃক্ষরাজির গভীর ঘন ছুঁয়ে তোমার আলো কালো কাটার পথ। অন্য আদেশ অন্য সময় মেনে রাতদুপুরে সুখের সীমা টানি আনন্দ বেশ জড়িয়ে নেব নিজে তোমার কোনো ক্ষতির কারণ, নয়। শত্রুপাখি গাছের ডালে থাকে তার নিধনে আমরা ডাকি তাকে হায় না জেনে, আড়াল যারে…
