কবিতা
-
বিস্মরণ
উৎপলকুমার বসু কত না নৈকট্যবোধে দূরত্ব বজায় রাখি, বুঝে দ্যাখো। মৃত আত্মীয়দের পাশ থেকে অবশ্যই দূরে থাকি, বিদায়ী বন্ধুদের মনেও পড়ে না, শিউলি ঝরার আগে ‘কাজ আছে’ এই অজুহাতে স্টেশনে পালিয়ে যাই, যাত্রীদের কেউ কি আমাকে চেনে? শহরে যাচ্ছে তারা, কতজন ফিরে এলো, একে-তাকে প্রশ্ন করি ক’টা বাজে ভাই, অথচ সামনেই বড় ঘড়ি, আলোয় উজ্জ্বল,…
-
ফুলের আর্তি
সোহেল মাজহার একটা মৌমাছি গুনগুন করে যে গান গায় তা হলো ফুলের আর্তি। সমুদ্রস্রোত তোমার-আমার সব ভাসিয়ে নেবে বলে সমুদ্রবন্দনা করে নদী ছুটে চলে নগর ও জনপদের স্মৃতিকে উপেক্ষা করেই নদী-বাসনা তুমি জানো তারও অধিক। তাই স্বপ্নে এক নগ্নিকা বিষ হুল ফুটিয়ে নির্লিপ্ত নিরাভরণ তার চুলে সূর্যাস্তের আভা আলো-অাঁধারের স্রোত সমুদ্রজাহাজের ডেকে মত্ত এক নাবিক…
-
বিমানের জানালা থেকে
তমিজ উদ্দীন লোদী কখনো ৩৪০০০ কখনো ৩৯০০০ ফুটে উড়ে যাচ্ছি টানো গাঢ় কখনো হালকা মেঘের চাদর উড়ে যাচ্ছে গহিন গভীরে সমান্তরালে উড়ছে অপার শূন্যতা। আর মানচিত্রের মতো শুয়ে আছে নিস্তব্ধ পৃথিবী। যেন চ্যাপলিন মূকাভিনয় করে যাচ্ছেন অবিরাম শব্দহীন যেন কোনো প্রাণী নেই, কোনো প্রাণস্পন্দন নেই নিরেট শহর শুয়ে আছে – চারপাশে জল কি কাদার প্রলেপ…
-
বার্লিন দেয়াল
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া ওরা তাকিয়ে তাকিয়ে ভাঙা দেয়াল দেখছে আর কষ্টকে বুঝে নিচ্ছে দেয়াল বিষয়ক। ওরা ভাঙা দেয়ালের টুকরোগুলো এখনো খুব যত্ন করে যাতে বিচ্ছেদের মর্মযাতনার পাথরগুলো আলোকিত থাকে দেখা যায় ভালোভাবে। ওরা ওখানে মিলিত হয় আর দেখে পেছনের অভিশাপগুলো – নাঙ্গা অগ্নি কীভাবে পুড়িয়েছে তাদের দীর্ঘদিন ধরে, ভুল করে। দেয়ালকে ভেঙে ফেলে ওরা ফুলকে করেছে…
-
স্বপ্ন-ছবি
শামিমা নাসরিন স্বপ্নসমুদ্র, কত ফসল ফলাও অন্ধকার গহবরে। রঙিন সুতোয় বোনা একমুঠো সুখ, প্রজাপতির নীলাভ ডানায় ভাসা সুর, মাতালের এলোমেলো প্রলাপ, কিংবা শিল্পীর প্রচ্ছদপট। চুম্বন, কামপিপাসা তৃপ্তির মোলায়েম ছোঁয়া ছোট ছোট আশা-নিরাশা এও স্বপ্ন। ছিনতাই, রাহাজানি, বলাৎকার – খুন তাও স্বপ্ন, জাগরিত স্বপ্ন। নষ্ট বেকারের অন্ধকার আকাশ, বিশ্বাসী প্রেমিকের আলোকদ্বীপ, সেও স্বপ্ন, কিংবা দুঃস্বপ্ন। স্বপ্ন,…
-
যখন ভাঙে নক্ষত্র
শিহাব শাহরিয়ার ১৫. তার গালে নেচে ওঠে প্রেম চোখে চোখে ভাসে রাঢ়িখাল পাখিরা বন্ধ্যা হলে – সন্ধ্যার পাটে ডুবে যাবে পাড় রাঙামাটির লেকে উড়বে পিঁপড়ার মতো লাল-নীল টিপ থাকবে কথা থাক শুধু তোমার একাকিত্ব হাঁটবে একা
-
কুয়াশায় ডুবে আছে নদীগণ
জাহাঙ্গীর ফিরোজ কুয়াশায় ডুবে ছিল বাড়িঘর নদী চশমার কাচে মেঘ, ডুবেছিল চোখ; আজ ঘড়ির কাঁটায় ভোর – সকাল দুপুর রাত। এই কুয়াশাভেজা দিনে তুমি অসুখের চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছ শীতার্ত, মঙ্গায় পুষ্টিহীন জড়সড় কুঁকড়ে আছ তুমি সন্ধ্যা নদীর জলে ক্রন্দনের ধ্বনি… তবু উত্তরে-দক্ষিণে মেরুপ্রভাতের বর্ণিল আলোর ঝরনা নাচে শ্বেতশুভ্র ভল্লুকের লোমে। এখানে বরফ নেই, তুষার…
-
কাশের পতাকা
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায় গভীর রাতে করমচার মতো শীতের কামড় আকাশে নক্ষত্রগুলি লেপ মুড়ি দিয়ে শুতে চলে গেছে পুনর্ভবা নক্ষত্রটি কেবল তাকিয়ে পুনর্ভবা নদীটির দিকে বোয়াল, দুপারের মানুষিক বর্জ্য আর ভাসমান কচুরিপানায় নদীটি এখন চর্মরোগী নদীটির ডাইনে কুয়াশা, বামদিকে মাঝি যায় নৌকো বেয়ে গান নেই মুখে শুধু চর ধুধু চর রয়েছে সমুখে বয়ে যেতে যেতে নদী হঠাৎ…
-
আমারও কিছু কথা ছিল
বিশ্বজিৎ ঘোষ কেমন আছো তুমি? স্বর্গলোকে কেমন কাটছে তোমার দিনগুলো এখন? কীভাবে কাটছে বৈকুণ্ঠের রাতগুলো? মনে পড়ে আমার কথা? সেই কবেকার কথা? জানো আমার নাম? জানবে কী করে? তোমার কবি, যাকে তোমরা দেবতা বানিয়ে তুলেছো সেই ব্যাসদেব আমাকে একটা নাম দিতেও কত কার্পণ্য করেছেন। ভেবে দেখেছো একবার? নাকি বৃন্দাবনের লীলালাস্যে সব ভুলে এখন স্বর্গলোকে বসে…
-
গুড মর্নিং রবীন্দ্রনাথ
সৈয়দ আল ফারুক অনেকটা এক্স (X)-এর মতো দেখতে কাঠের রেহেল রেহেলের ওপর খোলা কোরান শরিফ জায়নামাজে বসে আছেন বাবা তার দরাজ কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছে সুরেলা উচ্চারণ উঠোনে মাটিতে বিছানো পাটি উদোম শরীরে সর্ষে তেল মেখে-মেখে বাচ্চাটাকে ঊরু-কোলে মেলে ধরছেন মমতাময়ী মা আর পবিত্র উচ্চারণে তেলাওয়াত করছেন সন্তানের হাসিমাখা মুখ বিছানায় আধশোয়া, দ-য়ের মতো পড়ে…
-
টর্চ
আশরাফ আহমদ স্বপ্ন তো দিলেই, টর্চটাও নিয়ে গেলে! চিরজীবী অসুখের বীজ, কষ্টের কাঁকর যত মুখের ওপরে ছুড়ে ফিরে গেলে স্থায়ীভাবে অপর আলোয়, স্মৃতির ঘুণেরা আর অথই অন্ধকার অবিরাম গিলে খাচ্ছে আমার সময়। যাওয়ার বিপক্ষে, তবু থাকতে বলিনি – এই দোষে-মতিভ্রম, এই ভুলে-ছারখার, ছত্রখান, গোছানো জীবন। অতল পেয়েছি বলে, তলে? শীতল পাতাল হলো আমার ঠিকানা! বিবমিষা,…
