কবিতা

  • দিনলিপি

    জাহিদ হায়দার ০১.০১.২০১২ : মৃতদিন, বেশ শীত, কেউ বীজ উঠানে শুকায়; ০২.০১.২০১২ : মৃতদিন, ডানা থেকে শিশির ঝাড়লো পাখি, ছাদে বুড়ো পায়রা ওড়ায়; ০৩.০১.২০১২ : মৃতদিন, হাজার হাজার বিপরীত শব্দ স্কুলের সবুজ ব্যাগে নিয়ে যাচ্ছে একদল শিশু। আমরা, তোমরা আর আমি তিরিশটা দিন কি লিখবো? পঞ্জিকার পাতায় একটি কালো পাখি নেমে যাচ্ছে শিকারের দিকে, নখের…

  • চিত্রিত সাপের কথা

    মৃণাল বসুচৌধুরী সে যখন একলা বেড়ায় শীতের উঠোনজুড়ে সে যখন অন্ধকারে একা একা নাচে নিঃসঙ্গ চুমুকে অস্থির গলায় ঢালে অনুদার বিষ অক্ষরবাগিচা থেকে সে যখন দ্রুতপায়ে ফিরে আসে একা মায়াকীট নষ্ট করে প্রাণের সবুজ দিশাহীন দূরত্ব পেরিয়ে সে যখন অন্তিম দুয়ারে মুখাগ্নির আগুন নিভিয়ে বসে থাকে নাভিকুন্ডে জমে থাকা মেঘের আড়ালে অনন্ত উড়ান শেষে মাটি…

  • পারহীন জলের মুর্শিদ

    আসাদ মান্নান নিজেকে হারিয়ে এক জলশিশু ডুবে যায় গহন আলোয়, ঘুমন্ত মেঘের মতো মহাশূন্যে স্বপ্নডানা নিয়ে যে ওড়ে নির্জন নীল আগুনের নিচে, সে এক জলের শিশু – স্বপ্নে কিংবা জাগরণে ওই শিশু মরমিয়া অন্ধকারে পাঠ করে আগুনের প্রকৃত জীবন : শূন্য থেকে শুরু যার শূন্যে তার শেষ – মাঝখানে দু’দিনের মায়াবতী সংসার ফানুস। মেঘের অলিন্দে…

  • অন্য এক নির্জনতার দিকে

    আশিস সান্যাল হেঁটে চলেছি সকাল থেকে সেই নির্জনে। পাহাড়তলির মাঠে অচেনা সব লাল-নীল পাখি হলুদবরণ ফুল আর টুকটুকে লাল শাড়িতে শরীর জড়িয়ে কাজ করছে তিনটি বালিকা। তাদের মধ্যে একজন বলল : কোথায় যাচ্ছ? তোমার চোখে নেই কোনো ক্ষুধা – কেবল হাহাকার। হাহাকার দিয়ে জয় করা যায় না কিছুই। জঠরাগ্নি থেকে তোমার দুচোখে প্রজ্বলিত করো দুরন্ত…

  • দুটি কবিতা

    আলতাফ হোসেন   দেড় আঙুলের বেলে মাছেরা কলা রামনাথের দিনকি পুরিয়ার আবহে বসতে হলো। আজকের মতো সকালের যা যা করা দরকার শেষ করে গেছে। এ মেয়েটির কথা তপন বলেছে অন্তত দশবার। তার আগে বৃষ্টি হচ্ছিল। দ্যাখো, আমাকে অত কুয়াশা  দেখিয়ো না। এমনিতেই মেঘলা আকাশ। বাহ্, দারুণ তো! এই বুঝি নতুন রাগিণী? কিন্তু কথকের তো একবারের…

  • কিচ্ছুই ভুলিনি

    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ভুলব কেন, সবকিছু এখনও দুই চক্ষে লেগে আছে, কিচ্ছুই ভুলিনি। এটা তো গেরস্তপাড়া, মধ্যবিত্ত মানুষজনের একতলা দোতলা ঘরবাড়ি এখানে ছিল পরপর সাজানো। সব বাড়ি কি পাকা ছিল? না, তাও ছিল না। ইটে-গাঁথা বাড়ির পাশেই এখানে ওখানে ঢেউ-খেলানো টিনের চালের কিছু কাঠের বাড়িও দেখেছি তা পষ্ট মনে পড়ে। প্রতিটি বাড়ির সামনে একটুখানি করে ফাঁকা…

  • দুটি কবিতা

    শঙ্খ ঘোষ বাস্ত্ত ঘরের দখল নিতে আসিনি তোমার কাছে আজ মাটির দখল নিতে নয়। আমি শুধু আগন্তুক। আমি শুধু নিমেষের দৃষ্টি মেখে চলে যাব ভেবে এসেছি ভিটের কাছে শতাব্দী পেরিয়ে। তুমি আছো, তাই আমি এসে বসি এখানে এ-সিঁড়ির কোনায় চা খাই মাটির ভাঁড়ে, দেয়ালে বুলিয়ে নিই হাত, সামনেই শুকোতে-দেওয়া হলুদ সুপুরিগুলি থেকে দুটো-একটা তুলে নিই।…

  • শুদ্ধসত্ত্ব

    আবুবকর সিদ্দিক কামে ও প্রেমে ক্ষারকাচা হতে হতে সেই কবিমানুষটা দেখো ফৌত হয়ে এসেছে শেষটা। জহুরিরা চিরকাল নির্বিকার তার জীবনভর আত্মব্রতী লেখালেখি নিয়ে। পাঠকেরা ভুলো উদাসীন। পথে তার বিছিয়ে দেয়নি কেউ গোলাপপাপড়ি। প্রিয় নারী ক্লীবের অধিক তাকে পোছেনি কখনো। এমনকি পড়শিরা কেউ তাকে নিয়ে ঘামায়নি মাথা। পৃথিবী ঘুমের ঘোরে সংজ্ঞালুপ্ত হলে জেগে উঠত গোক্ষুরফণা। আগ্নেয়…

  • পারিপার্শ্বিক

    উৎপলকুমার বসু ভ্রমেরই পারাবত ভ্রমণে এসেছে। বৃক্ষহীন, ছায়াহীন এই লোকালয় শুধু মানচিত্রে লেখা, শুধু কাগজে চিহ্নিত – মিথ্যা ও অবাস্তব। দিলো কি আশ্রয় সৃষ্টিছাড়া তোমাদের মতো দু-চারজন কবি ও চিত্রীকে – যারা ভুল করেছিল আত্মনির্বাসনে এই দেশে ঢুকে পড়ে? মৌচাকে মধু চায় প্রাণপাখি – ওই ভ্রম-পারাবত – ছায়া চায়, জল চায়, সে কোথায় পাবে? বেলা…

  • হয়, হতে পারে

    আসাদ চৌধুরী ব্যাঙ ডাকুক বা না-ডাকুক, কদম ফুটলে ফুটবে, না-ফুটলেই বা কী? এক ধরনের বৃষ্টি হাত ধ’রে ছাদে নিয়ে যায় নিজের ছায়ার সঙ্গে আরও একটি ছায়ার কাঁপন। আর কোনো কোনো বৃষ্টি বাঘের মতো ধমকায়। কাকুতি-মিনতি করে ওগো আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

  • জীবন এরকমই

    রবিউল হুসাইন চারিদিকে হইচই নিঃশব্দতা দরকার প্রচন্ড শব্দ করে চুপ্ বলতেই পলকে হুড়মুড় করে সুনসান অলক্ষে নির্জনতা এসে দেখা দেয় যদিও সবাই উপস্থিত ছিল তখনো অদূরে দূরত্ব দাঁড়িয়ে ছিল নৈকট্য বহু দূরে ঝাপসা চোখে কাছে ডাকে দূরত্ব কাছে আসে নিকট নিকটে আসে না কখনো দূরই কাছে নিকট ধরা দেয় না দুটি চোখ পাশাপাশি মিলেমিশে একটি…

  • কাইয়ুম চৌধুরীর তিনটি কবিতা

    মৃগনাভি কী সুগন্ধি মেখেছো আজ – মৃগনাভি? তৃষ্ণার্ত কাতর শরীরী গন্ধে মাতাল সর্বব্যাপী। কর্ণকুহরে ভেসে আসে তিলক কামোদ কী যে সুমধুর – জল টলটল আকাশে জাগে অগুনতি তারা রাত্রি দ্বিপ্রহর। দু্ই চোখে ঘুম নেই সুগন্ধির উৎসমুখে – অবিরাম ওড়াউড়ি কী ভীষণ সুখে – নামিয়ে এনেছি দুকূলপ্লাবী স্বপ্নলোকের চাবি। কী সুগন্ধি মেখেছো আজ মৃগনাভি? সংলাপ হাতে…