ছোট গল্প
-
কুরুক্ষেত্রের দিকে
সুদর্শন সেনশর্মা গোপাল লাল কাঞ্জিলাল সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছেন ততক্ষণে। তাঁকে অনেক দূরে ফিরতে হবে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড থেকে বেহালা চৌরাসত্মা কম দূর নয়। ফাঁড়ির হাজরা রোডের মুখ থেকে অটো ধরে যতীন দাস পার্ক, তারপর মিনি বা বাস… পৌনে ন’টা বাজে… এ-সময় দরজায় জলতরঙ্গ বেজে উঠল… মহাবিষ্ণু অস্থির গলায় বললেন, গোপাল দেখুন তো আবার কে…
-
মুখার্জি পরিবার
হরিশংকর জলদাস অরিন্দম মুখার্জি বিয়ে করেছে। একটা গল্পের সূচনা-লাইন এরকম ম্যাড়মেড়ে হলে কি কেউ আর গল্পটা পড়তে চাইবে? এই লাইনে কোনো চমক নেই, ঠমকও নেই, নেই কোনো কৌতূহল – উদ্রেককারী তথ্য বা তত্ত্ব। পাঠকের কী দরকার পড়েছে সাদামাটা একটা পঙ্ক্তি দিয়ে শুরম্ন করা গল্পকে এতটা সময় দেওয়ার? মানুষের কাছে সময়ের এখন অনেক দাম। কোনো শিক্ষিত…
-
অন্যলোক
জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ভূলোক এই চন্দ্রাতপে কোন সুখ আসে না। রাত্রির প্রথম প্রহরে অসংখ্য বিবর্ণ আলো আকাশের কোলে ফুটে থাকে। তখন কেবল ঘষা কাচের গায়ে অতিকায় অট্টালিকার সারি কি দূরে জ্বলে নেভে টাওয়ারের আলো। নিচে আরো দূরে নিশ্চয়ই বৃক্ষরাজি দিনমানে স্পষ্ট; কিন্তু তখন কেবল অন্ধকারের স্তূপ। এবং অকস্মাৎ ছড়ানো হলুদের সহস্র বিন্দু মুছে গেলে ফুটে…
-
কাপুরুষ
হাসান ফেরদৌস আজ অনেকদিন পর আবু হোসেন সকাল-সকাল ঘুম থেকে উঠেছেন। অনেকদিন পর নয়, হিসাব করলে দেখা যাবে গত দশ বছরে এই প্রথম। রেস্তোরাঁর চাকরি, ক্যাশ গুছিয়ে, সবাইকে বিদায় দিয়ে, দোকানের শাটার নামিয়ে তবে ঘরে ফেরা। ঘর মানে এই রেস্তোরাঁর তিনতলা। শুতে-শুতে রাত দেড়টা-দুটো তো বটেই, কখনো-সখনো বড়সড় পার্টি থাকলে, তারও পরে। সকালে সূর্য ওঠা…
-
পাইন-পাতার রূপকথা
সাত্যকি হালদার মানুষটা কবে থেকে এলো তা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল অনেক। এক-একজন একেক রকম কথা বলত। কেউ বলত, পাশেই আলগরায় ওর জন্ম। পরে এদিকে চলে আসে। বুড়ো জুলে শেরপা বলত, আদতে ও এদিকের লোকই নয়। বাপ-মার সঙ্গে কখনো পাহাড়ে এসেছিল। কোনো একটা বোর্ডিং ইশ্কুলে নাকি ভর্তি করে দিয়ে গিয়েছিল বাবা-মা। পরে যে-কোনো কারণে হোক খোঁজ…
-
জগন্নাথের হাত
কৃষ্ণেন্দু পালিত ট্রেনে উঠতেই কানে এলো কেউ একজন আস্ফালন করছে, আপনি আমাকে চেনেন? কথা বলতে-বলতে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছে সে। বুঝলাম, কোনো একটা বিষয় নিয়ে অনেক আগে থেকেই চলছে। মাঝবয়সী ভদ্রলোক, লম্বা-চওড়ায় দশাসই, মাথায় কদমছাঁট চুল, দুদিনের না-কামানো দাড়িগোঁফ, পরনে ফেডেড জিনসের ওপরে লাল-সবুজের ডোরাকাটা টি-শার্ট। চোখমুখে অদ্ভুত একটা রুক্ষতা। দুপুরের বনগাঁ লোকাল এমনিতেই ফাঁকা…
-
নতুন বাড়ি
অর্ণব রায় ম্যাটাডর থেকে মাটিতে পা দিতেই জায়গাটা যেন গাছগাছালি, পুকুর, পাখির ডাক, ঝিরঝিরে বাতাস – সব নিয়ে এক পলকে একেবারে দশ হাতে আপন করে নিল। দুটো লম্বা লম্বা শ্বাস ফেললাম দাঁড়িয়ে। বেশ ছড়ানো-ছিটানো পাড়া। বা এখনো পাড়া হয়ে ওঠেনি সেভাবে। দুপাশে বেশকিছু কিনে রাখা প্লট। মাঝখান দিয়ে যে-রাস্তা ধরে আমরা এলাম, সেটা শেষ হচ্ছে…
-
অন্ধকারের গন্ধ
অভিজিৎ সেনগুপ্ত সকাল ছটায় হাত-মুখ ধুয়ে ফ্লাস্কে রাখা চা আর গোটা কয়েক বিস্কুট পেটে চালান করে দিয়েই লেখার টেবিলে এসে বসেছেন রাজা রায়। এখন দশটা বাজে। নিচ থেকে নীলা ক্রমাগত তাড়া দিচ্ছে জলখাবার খেয়ে তাকে উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু কাউকে উদ্ধার করার মতো সময় রাজা রায়ের হাতে নেই এখন। তাঁকে কে উদ্ধার করে তারই ঠিক-ঠিকানা…
-
উপহার
বুলবন ওসমান মেলামাইনের কোয়ার্টার প্লেটটা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছে ফজল। থাকে ফ্ল্যাটবাড়িতে। বাড়িটা শহরের মাঝখানে, খুব একটা অভিজাত এলাকা বলা যায় না, আবার চারিদিকে যোগাযোগের ব্যবস্থাটা ভালো বলে অনেক অভিজাত এলাকার চেয়ে সে পছন্দ করে এই সেগুনবাগিচা। কখন এখানে সেগুনগাছ ছিল কে জানে! তবে নামটি রয়ে গেছে। রমনা পার্কের পাশে টেনিস কমপ্লেক্সে বেশকটা গাছ…
-
বেলি কেড্সের স্মৃতি
প্রশান্ত মৃধা পুব-পশ্চিমে টানা খানজাহান আলী রোড, মেইন রোডে মিশে যেখানে শেষ, সেই নাগেরবাজারের আগে বামে ঢুকে যাওয়া রাস্তাটার নাম কাজী নজরুল ইসলাম রোড। শহরের পুরনো বাসিন্দারা কেউ বলে, এই রাস্তার কাজিবাড়িতে একদিন এসেছিলেন বিদ্রোহী কবি, তাই এই নামকরণ। কেউ বলে, ওসব কিছুই না, এমনিতেই কাজী নজরুল ইসলামের নামে নাম, ওই কাজিরা কাজী নজরুলের কিছু…
-
বেহুলার দ্বিতীয় বাসর
জাকির তালুকদার চাঁদ সদাগরের সাতমহলা বাড়িতে আজ সাজ-সাজ রব। যমলোক থেকে বেহুলা ফিরে এসেছে প্রাণাধিক পতি লখিন্দরকে সঙ্গে নিয়ে। ইন্দ্রের সভায় যখন পা দিয়েছিল বেহুলা, তার কোলে ছিল লখিন্দরের কঙ্কাল। আজ লখিন্দর ফিরে পেয়েছে তার জীবন, তার কন্দর্পকান্তি। লোহার বাসরঘরে যাকে একবার চোখের দেখা দেখেই মনপ্রাণ যার পায়ে সঁপে দিয়েছিল বেহুলা সুন্দরী, সেই সোয়ামির সঙ্গে…
-
জনৈক স্তন্যপায়ী যিনি গল্প লেখেন
শাহাদুজ্জামান স্তন্যপায়ীদের জন্য খেলা একটি জরুরি কর্মকান্ড। শরীরতত্ত্ববিদরা জানাচ্ছেন, বিবর্তনের ইতিহাসে খেলা স্তন্যপায়ীদের সারভাইভালের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। যাবতীয় স্তন্যপায়ীর জন্য শৈশবে খেলা বেঁচে থাকার, বেঁচে ওঠার একটা অপরিহার্য শর্ত। বাস্তবের নকল করে একটা কপট বাস্তব নিয়ে খেলা। বাঘ-শাবকরা একে অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, কপট কামড় দেয়, যেন একে অন্যের শত্রু, যেন সে শত্রুর মোকাবেলা করছে। এ…
