অনুপম সেন
-

আদি-অন্ত বাঙালি : বাঙালি সত্তার ভূত-ভবিষ্যৎ
বাঙালি কে? এই প্রশ্নটি যদি আজ করা হয় তাহলে অনেকেই হয়তো হেসে উঠবেন। কিন্তু প্রশ্নটি কি নিতান্তই অবান্তর? আমজনতা বলবেন : যিনি বাংলায় কথা বলেন, যাঁর মাতৃভাষা বাংলা তিনিই – তো বাঙালি। তখনই হয়তো প্রশ্ন উঠবে, শিক্ষিত বাঙালি সমাজের অনেকেই আজ এ-ভাষায় দক্ষতা অর্জনে কি গৌরব বোধ করবেন, স্বস্তিবোধ করছেন? আজ থেকে কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে ব্যবহারের/ প্রয়োগের নির্দেশ জারি করে এর অন্যথায় শাস্তির বিধান রাখা হলেও আজ বোধ হয় রাষ্ট্রই সে-ব্যাপারে সবচেয়ে দ্বিধান্বিত। বিশেষত সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে, শিক্ষাদীক্ষায়-সংস্কৃতিতে অনগ্রসর একটি নব্য ধনিক গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের সন্তানদের ইংরেজি-পটু করার এক উদগ্র বাসনা গত দশকে ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাঁরা ভাবছেন, বাংলা ব্রাত্যজনের ভাষা। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানেও বর্তমানে বাংলা প্রায় পরিত্যাজ্য। উদাহরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা-প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ), প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি কিছু কিছু কলেজের কথাও বলা চলে (ইংরেজি-মাধ্যম ব্যয়বহুল স্কুলগুলোর কথা বাদই দিলাম) যেখানে বাংলার প্রবেশাধিকারই নেই। অতিসম্প্রতি শ্রেণিকক্ষে বাংলা বলায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন প্রভাষকের চাকরি যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। দুঃখের বিষয়, দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের উচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের ভাষা ইংরেজি; ফলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা যখন রায় হাতে পান, তখন তাঁরা বুঝতে পারেন না সেখানে কী লেখা রয়েছে। অনেক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও বিদগ্ধ আইনজীবী মতপ্রকাশ করেছেন, উচ্চ আদালতের ভাষা অবিলম্বে বাংলা করা প্রয়োজন, জনগণের স্বার্থে। তাঁরা এও অভিযোগ করেছেন, ইংরেজিতে লেখা বিচারিক রায়ের ভাষা অনেক সময় ভুলে কণ্টকাকীর্ণ থাকে, অধুনা বিচারকদের ইংরেজি-জ্ঞানের অভাবের কারণে। এই অবস্থা যে কেবল বাংলাদেশে বিরাজ করছে তা নয়। বাংলা-ভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গেও বাংলা ব্রাত্যজনের ভাষায় পরিণত হচ্ছে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সেখানে হিন্দির উৎপাত বেড়েছিল, কিন্তু হিন্দির আক্রমণ বাংলার অগ্রগতি ও বিকাশকে রুদ্ধ বা ব্যাহত করতে পারেনি। মনস্বী ব্যক্তিরা সে-সময় তাঁদের মনীষার, মননের স্বাক্ষর বাংলায় রাখতে দ্বিধা করেননি। রচিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য কথাসাহিত্য, উপন্যাস ও ছোটগল্প। কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গে ইংরেজি কেবল শিক্ষাদীক্ষারই মাধ্যম নয়, উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের জীবনচর্চার বাহনও হয়ে উঠেছে। এর একটা বড় কারণ বিশ্বায়নের ফলে ইংরেজির সর্বভারতীয়-ভাষা হয়ে ওঠা। বিশ্বজুড়ে বৃহৎ মাল্টিন্যাশনাল করপোরেশন বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আজ তাদের বহুবিধ পণ্যের বিপণন ও প্রচার-প্রসারের সঙ্গে তার বাহন হিসেবে ইংরেজিকেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব ভারতের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যে প্রকট হচ্ছে, কারণ বহুজাতিক সংস্থাগুলো দেশটিকে তাদের পণ্যপ্রবাহ ও বিপণনের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে। একইসঙ্গে তাদের সহকারী হিসেবে কিছু ভারতীয় বহুজাতিক কোম্পানি বা সংস্থাও গড়ে উঠেছে। এরাও নিজেদের পুঁজি ও পণ্যের বাহন করেছে স্বাভাবিকভাবে ইংরেজিকেই। এরই ক্রমপ্রসারমান ফল ও প্রতিক্রিয়া হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের তরুণ প্রজন্মেরও এক পরম কাক্সিক্ষত বা আরাধ্য ব্যাপার হয়ে উঠেছে ইংরেজি-জানা এবং ইংরেজি-বলা, যা জীবন-ক্ষেত্রে এগোনোর পাথেয় হিসেবেও দেখা দিয়েছে। এই প্রজন্মের কাছে বাংলা মুখের ভাষা হলেও, মাতৃভাষা হলেও, তা-কে তারা জীবনের সঙ্গী করতে পারছে না, সেভাবে ভাবছেও না। মৌখিক ইংরেজি চর্চার ফলে একটা কৃত্রিম বা পরজীবী আবহ ধীরে ধীরে তাদের জীবনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। বাংলা ভাষা জীবনের চর্চার ক্ষেত্র থেকে বিচ্যুত হওয়ায় এ-ভাষায় যে-বিরাট ও মহৎ-সৃষ্টিসমূহ রয়েছে তার সঙ্গে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অধুনা আমার বেশ কয়েকজন আত্মীয়ের ছেলেমেয়ে যারা স্কুল-কলেজ-জীবনে কৃতী ছাত্রছাত্রীর গৌরব অর্জন করেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, নজরুল, জীবনানন্দ, তারাশঙ্কর অথবা অন্য কোনো মহৎ বাঙালি লেখকের লেখা তারা পড়েনি; এমনকি, পড়ার কোনো আগ্রহও তাদের নেই। মৌল ইংরেজি নয়, মৌখিক ইংরেজিরই চর্চা করে এরা। তাই কথ্য ইংরেজিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করলেও ইংরেজি বা বিশ্বের অন্যান্য ভাষার মহৎ লেখকদের রচনার সঙ্গে তাদের পরিচিতি নেই বললেই চলে। ফল হচ্ছে এই, জীবনের গভীর উপলব্ধির ক্ষেত্রটা তাদের কাছে প্রান্তবর্তী থেকে যাচ্ছে। প্রায় একই আলেখ্য আমরা নব্বই-পরবর্তী বাংলাদেশেও দেখতে পাচ্ছি। এখানে এর ভিত্তিটা আরো কিছুটা স্থূল, তা আগেই উল্লেখ করেছি। এখানে পরভৃত ইংরেজি-সংস্কৃতির বাহক হলো নব্য ধনজীবীরা; তাঁদের অনেকে ধন অর্জন করেছেন অনেকটা লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায়, খুব অল্প সময়ের মধ্যে। এঁদের ধনের বড় একটা অংশ হলো আত্মসাৎকৃত ব্যাংক-ঋণ, অসৎ ব্যবসাও এঁদের ধনের উৎস, যেমন, আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং,…
-

আমাদের একাত্তর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আনিস স্যারের সান্নিধ্যে
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে অর্থাৎ ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে যে-রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল, সেই রেনেসাঁসের অগ্রণী পুরুষরা ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. কাজী মোতাহের হোসেন, ড. এনামুল হক, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল, সরদার ফজলুল করিম, আব্দুর রাজ্জাক, বদরুদ্দীন উমর, রেহমান সোবহান, ড. মাহমুদ, শওকত ওসমান প্রমুখ। পঞ্চাশের দশকেই এই অগ্রণী চিন্তানায়কদের সঙ্গে…
-

বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র
২৩ জুন বাঙালির ইতিহাসের একটি অনন্য দিন, পরম দুঃখের, পরম সুখের দিন। পরম দুঃখের দিন এ-কারণে যে, ১৭৫৭ সালের এই দিনে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার নবাব (জায়গিরদার) সিরাজউদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হন। বাংলার ইংরেজ উপনিবেশে পরিণত হওয়ার মধ্য দিয়ে উপমহাদেশজুড়ে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা হয়। একসময়ের বিশ্বের সমৃদ্ধতম দেশ বাংলাদেশ বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর…
