ওয়াহিদুল হক
-
গুরু, আমার উপায় করো না পিপাসার্ত এক যোগ্যতাহীনের কথা
গানে যেন অচিন পাখির দেখা পাওয়া যাবে। সেই পাখির সন্ধানে লেগেছিলাম প্রথম কৈশোরে। পরিবারের প্রভাব, গানেতে অর্থকড়ি-সমস্যায় হিল্লার সম্ভাবনা, লেগে থাকতে পারলে যশ-প্রতিপত্তি-লাভের সুযোগ, এই মতো কোনো কিছু তো আমাকে গানে টানেনি। যাকে জানি না, অথচ ঠিক জানি সে সুন্দর, জাগতিক সব ক্ষুদ্র স্বার্থ-আবেগ-উদ্বেগের ঊর্ধ্বে এবং পবিত্র, তাকে যেমন করে হোক ঝলকমাত্রের জন্যে হলেও, আমার পাওয়া চাই, – এমন করে আমি সঙ্গীতের পথে তাড়িত হলাম কী করে? সে-প্রশ্নের উত্তর জানি না। শুধু মনে পড়ে ঢাকার পশ্চিম প্রান্তের পোস্তা নামের চামড়া ব্যবসায়ের ঘাঁটির এক মুদি দোকান থেকে চার পয়সার ঝাল বুট কিনে, কামরাঙ্গির চরের ওপর দিয়ে হাঁটা-পথে আমাদের গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দিতাম। একটা একটা করে সে-বুট খেতে খেতে ঘণ্টা তিনের কমেই পৌঁছে যেতাম দাদির ঘরে। পথের দু’পাশের দৃশ্য এত নয়নাভিরাম নয় যে মন ভোলাবে। ভীষণ একা লাগত ওই দুই-তিন ঘণ্টা। হাঁটছি বটে, সে-তো কোনো কাজ নয়। আচ্ছা, আমাদের গানগুলো তিন-চার মিনিটের কেন? এমন গান হয় না যে দু’ঘণ্টায় শেষ হয় না। গানের এ ছোট মাপটা বেঁধে দিল কে? এই মতো ভাবনাক্রান্ত কিশোরটি, প্রায় যেন কোনো গুহামানবের মতোই নিজেরই কণ্ঠস্বরে খুঁজে পায় এক সঙ্গীকে, যে সারাক্ষণ থাকে সঙ্গে। সেই প্রায় অশেষ সুতোর মতো কণ্ঠধ্বনি অবশ্যই সুরেলা ছিল না। হয়তো ছিল গোঙানিরই মতো কিছু। কিন্তু তা একই ধ্বনির পুনঃপুনঃ আবর্তনও ছিল না, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত। যখন প্রথম খেয়াল গান শুনি, আমার তা গ্রহণ করতে কোনোই অসুবিধা হয়নি, সম্ভবত সেই কারণে। আমার ওয়াহাবী প্রভাবের পিতামহ-পরিবারের সঙ্গীতশূন্যতা এতই নিশিছদ্র ছিল, নকল করবার মতো নিবদ্ধ কাব্যসঙ্গীত (গ্রাম্য রূপের) আমি তেমন শুনিনি সে-কাল পর্যন্ত। সেও এক কারণ হবে, ঘণ্টাবিস্তৃত খেয়ালগানে প্রথমেই বিরক্ত না হবার। পরে ভেবে দেখি ভারতবর্ষে যেমন পশ্চিমে অর্থাৎ ইউরোপে তেমন, ছোট ছোট খণ্ডে সম্পূর্ণ গান কিংবা বাদ্যকে তত সঠিকভাবে সঙ্গীত কিংবা মিউজিক বলে না। আমাদের এখানেও বিশুদ্ধ সঙ্গীতানুষ্ঠানে যত গান হয়, বাদ্য হয়, তার এক একটি ইউনিট অন্তত ত্রিশ মিনিটব্যাপী হয়। ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি – গান হলেও যেন সঙ্গীতই ভারতবর্ষের। ইউরোপের অপেরাগুলো গীতনৃত্যাভিনয় হলেও, বাখ-বীঠোফেন-মোৎসার্টের ঐকতান-কৃতির মতো সঙ্গীত – ইউরোপের। গান (খণ্ডগীতি) কিংবা খণ্ডবাদ্য ও সঙ্গীতের ভিতরকার প্রভেদটা ছেলেবেলাকার প্রচণ্ড মূর্খতাময়তার ভিতরে কেমন সুন্দর ধরা দিয়েছিল ভেবে অবাক হই। উত্তরকালে সঙ্গীত-নবীনদের কাছে আমার যে-ভাবমূর্তি – গান বিষয়ে বকি বেশি, করি কম – এরই সঙ্গে বেশ সঙ্গতিপূর্ণ আমার প্রথম কৈশোরের ভাবয়িত্রী অগ্রমানতা, কারয়িত্রী পক্ষে একেবারেই, যাকে গ্রামে বলে ফাড্ডা, তাই হলেও। সঙ্গীতকে আদৌ কোনো রূপে জানবার আগে তার জন্যে যে-তৃষ্ণা তৈরি হয়েছিল কতকগুলি অজানা-মূলের পূর্ব-ধারণার বশে, যে-সঙ্গীত সুন্দরের সারাৎসার এবং পবিত্র এবং ক্ষুদ্র স্বার্থান্ধ সংঘাত-সঙ্ঘর্ষের অতীত, – সেই মতো সঙ্গীত কি বাহাত্তুরে ধরা পরিণত বয়সের বিস্তৃত পটে কখনো পড়েছে ধরা, ফেলেছে দাগ? সঙ্গীত নামের একক্ষেত ঘন সর্ষে ফুল দেখেছি, থেকেছিও তার মধ্যে কখনো কখনো। মৌমাছিও যায় সর্ষে ক্ষেতে, নিয়ে আসে মধু, চাকে জমা করে। আমি মৌমাছি নই,…
