মঈনুল হাসান
-

গল্পটা লাইলি মজনুর হলেও পারত
বাপের থান থেকে এক কাপড়েই বেরিয়েছে লাইলি। মাথায় আলুঝালু চুল, পরনের কাপড়টারও দিশ নেই – ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে দেওয়া যায় যেন জেদে ফুঁসছে ভেতরটা। সন্ধের ঠিক আগে দুপদুপিয়া নদী থেকে খালের জল কেটে ইঞ্জিন বোটগুলো ঘাটের কাছে ভেড়ে। পশ্চিমের আকাশ যখন লাল এবং সেই লালিম আভা যখন চরাচরে মিশছে, লাইলি তখন ইসমতের ট্রলারে করে এসে নেমেছিল গুদারাঘাটের কাছে। লম্বা-কালো মুখখানা রাগে ফুঁসে ঢোল – ঘাটে নামার পর থেকে ডেরায় ফেরার আগ পর্যন্ত নিজের মতোই গজগজ করেছে রাগে। চর দুপদুপিয়ার গুদারাঘাটের কাছে দিদার মোল্লার বড় কাঠগোলা। তার পেছনেই লাইলিদের একচালা ঘর। ঘর মানে ঝাঁঝরা টিনের ছাউনির নিচে কাঠ-বাঁশ-বেড়া কোনোমতে জোড়া দিয়ে একটা ছাপরা। বেড়ার ফাঁক-ফোকর দিয়ে নামে রোদের আঁকিবুঁকি – দিনের বেলা আলো-হাওয়া যেমন ইচ্ছেমতো ঢোকে, ঝড়-বাদলা থেকেও তেমনি নিস্তার নেই। গেলবার আইলার সময় সেটাও প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। রশিদ নেহাত কাঠগোলায় কাজ করে বলে এবং দিদার মোল্লার সুদৃষ্টির কারণে সেইবার ডেরাখান তবু মাটিতে মিশে যায়নি। দিদার মোল্লা ডেকে বলেছিল, তুই তো পশুরও অধম রশিদ। মেয়েডারে ভাগাইয়া আইনা সংসার পাতছিলি। কিন্তু অহন তোর নজর নাই ক্যান রে? তোরা তো তিনডা পেট। ওইডার কতা মনে আছেনি? হাত-পা ধইরা আমার বোটখান নিলি – আর ওইডাও খালে ডুবাইয়া এমনি পচাইয়া ফেললি। ইসমতের কাছে বেইচা দিলেও না হয় কডা টাহা হাতে আইত। – ওই বোটখানই তো আমার কাল হইছিল। আমি কি আর এমনি এমনি বেইচা দিছি নাকি? – নিজের বউয়ের দিকে না হয় খেয়াল নাই তোর। কিন্তু পোলাখান? ওইডারে তো মানুষ কইরা তুলতে হইব রে। ছেলের কথা ওঠায় রশিদের মুখ যেন আরো ভোঁতা হয়ে গেল। থমথমে মুখে উত্তর দেয়, আর মানুষ! আমার চেহারার লগে কি ওইডার কোনো মিল আছে নাকি? ওই পোলা আমার না। রাগ চড়ে যায় দিদার মোল্লার। ব্যঙ্গ করে মুখ ভেংচেই বলে, ইস, ওই পোলা আমার না! এইডা অহন কেডা শুনব রে? ক্যান? লাইলির লগে পিরিত কইরা ওরে ভাগাইয়া আনবার টাইমে মনে আছিল না? আমার কতা শুনছস তহন? তহন তো দুইডায় আছিলি য্যান লাইলি-মজনু। অহন আমার চখে ধুলা দিতে চাস তুই? জোঁকের গায়ে এবার ঝিনুকের চুন পড়েছে। পাংশু মুখে মাথা গোঁজ করে তখন চুপচাপ বসে থাকে রশিদ। আসলেই ছেলেটা পেটে আসার পর থেকে রশিদ যেন অন্য মানুষ। মায়া-মমতা সব উবে গিয়ে সারাক্ষণ জ্বালা-যন্ত্রণা আর নানাবিধ গঞ্জনায় তখন ঝালাপালা লাইলি। ছেলের কথা জিজ্ঞেস করলেই লাইলি চুপ। রশিদেরও রাগ চড়তে থাকে চরমে। কখনো এক-দু’কথার পর হাতাহাতি, গালে চড়-থাপ্পড়। তারপর থেকে অত্যাচারের মাত্রাটা যেন বেড়েই গিয়েছিল। রশিদের মনে শুধু একটাই প্রশ্ন, এই ছেলেটা ওর নিজের তো? এভাবেই দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর কেটে গেল। সন্দেহ এখনো অটল পাহাড়ের মতো জেঁকে বসে আছে রশিদের মনে। রশিদের দেহাতি গড়ন, লম্বা-পেটানো শরীরে একমাথা ঝাঁকড়া চুল – চোখগুলো ভাটার মতো জ¦ললেও চেহারায় একটা সরলতাগোছের মায়া আছে। কিন্তু ছেলের মুখটা ছুঁচালো – রোগে ভোগা চেহারা নিয়ে দেখতে কালো ইন্দুরের মতো। কাঠগোলায় কেউ এলে কিংবা ওর সঙ্গে হাটে-দোকানে দেখা হলে বলে, কী রে রশিদ! এইডা যে তোর পোলা মনেই হয় না। বন্ধুবান্ধব তো ঠাট্টা করেই বলে, দ্যাখ গিয়া তোর বউ আবার কোন কোন জায়গায় মজনু রাইখা আইছে। ভালা কইরা খোঁজ নিয়া দ্যাখ। খোঁজ একদিন না একদিন পাইবিই। এসব শুনে রশিদের গা জ্বলে ওঠে, অকারণে জেদ বাড়ে। সে যে বিয়ের পর দোজবর বুড়োর কবল থেকে লাইলিকে ভাগিয়ে এনেছিল এ-কথাটাও তখন বেমালুম ভুলে যায়। খোঁজ মিলুক আর না-ই মিলুক কিংবা খোকার চেহারা ইন্দুর বা বান্দর যাই হোক, ছেলেকে সঙ্গে করে আর সেই নড়বড়ে ডেরার মুখে ঝাঁটা মেরে লাইলি এখন সোজা পথ নিয়েছে বোচারহাটের দিকে – সেখান থেকে সোজা বেতুয়ার লঞ্চঘাট। লাইলি জানে, কলাকান্দির ঘাট এখন সরিয়ে আনা হয়েছে বেতুয়ায় – সেখানে রাতবেরাতে দু-চারটে বড় লঞ্চ ঠিকই থামে,…
