মালেকা পারভীন
-

আগুন-ছাই
আফরোজা সবসময় বিশ্বাস করতো – ভালোবাসা শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, বরং তা অর্জন করতে হয়, আর অর্জনের পর তা ধরে রাখার জন্য কিছু অতিরিক্ত প্রয়াস লাগে। অর্জন শব্দটা সে ইচ্ছে করেই বেছে নিত। কারণ, তার কাছে ভালোবাসা হঠাৎ নেমে আসা কোনো অলৌকিক ব্যাপার ছিল না; বরং ছিল একধরনের শ্রমসাধ্য বিনিয়োগ, রুপার বাসনের মতো – যত্নে ঘষলে উজ্জ্বল, অবহেলায় নিস্তেজ। জেলা শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত তার বাড়িটি যেন সেই বিশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি। উঁচু নীল রঙের লোহার গেটের আড়ালে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। প্রতি বৈশাখে সে গেটটা নতুন করে রং করায়। যেন নতুন রঙের সঙ্গে সে নিজের জীবনটাকেও নতুন করে শুরু করতে চায়। ভেতরে পোলিশ করা কাঠের আসবাব, ভারি পর্দা, মেঝের ওপর ঝকঝকে টাইলস – সবকিছুতেই একধরনের জোর করে চাপিয়ে দেওয়া স্থায়িত্বের ছাপ। যেন এই সবকিছু দিয়ে সে তার মালিকানার প্রমাণ দিতে চায় – তার টিকে থাকা কেউ ঠেকাতে পারবে না – এই ঘোষণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু এই আপাতস্থায়িত্ব অনায়াসে আসেনি। মোটামুটি বড় অঙ্কের টাকাটা তার জীবনে আসে বেশ কিছুটা দেরিতে। চল্লিশ পেরোনোর পর বাবার জমি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থই আফরোজার জীবনে প্রথম বড় পরিবর্তন এনে দেয়। সেই সম্পদ যেন হঠাৎ করে তার জীবনকে নতুন করে সাজানোর একটা সুযোগ তৈরি করে দেয় আর সেই চলমান সাজানোর প্রক্রিয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে মাহফুজের প্রবেশ ঘটে। সবকিছুই আকস্মিক, সবকিছুই একসঙ্গে। বয়সে দশ বছরের ছোট, চটপটে আর একধরনের নির্লিপ্ত ভদ্রতা, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রচণ্ড খ্যাপাটে আত্মবিশ্বাস – যে জানে, তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এক নিকটাত্মীয়ের বিয়ের বাগদান অনুষ্ঠানে তাদের প্রথম দেখা। পরিচয়ের সেই দিনটির কথা আফরোজার এখনো পরিষ্কার মনে আছে। ‘এই ছেলেটা কে?’ সে তার খালাতো বোনকে জিজ্ঞাসা করেছিল। ‘ওই যে নীল শার্ট পরা? বড় ভাবির ভাগ্নে। খুব স্মার্ট, না?’ মাহফুজ তখন অতিথিদের মাঝে চা পরিবেশন করছিল, মাঝেমধ্যে কারো চোখে চোখ পড়লে হালকা রসিকতার সঙ্গে মনকাড়া হাসি ছুড়ে দিচ্ছিল। তার সেই হাসিতে একটা নির্লিপ্ত আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন সে জানে, তাকেই লক্ষ করা হচ্ছে। আফরোজা লক্ষ করছিল তাকে। এক মাসের মধ্যেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়। প্রথমদিকে সবকিছুই সহজ ছিল। মাহফুজের উদ্দীপ্ত তারুণ্য আফরোজাকে আনন্দ ভীষণ দিত। তার হাসি, তার দুষ্টুমি, তার অবহেলাভরা দম্ভ, সন্ধ্যায় বাইকের পাশে নায়কোচিত ভঙ্গিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা – এসব যেন আফরোজার জীবনে এক নতুন তরঙ্গ নিয়ে আসে। সেই তরঙ্গের উন্মাতাল স্রোতে ভেসে মধ্য-যৌবনা আফরোজা নতুন করে বাঁচতে শেখার আগ্রহ অনুভব করে, হঠাৎ হাতে-পাওয়া জীবনের রস নিংড়ে তাকে যথেচ্ছ উপভোগ করে নিতে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। সে শুধু মাহফুজকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেই ফেলেনি, তার মধ্যে নিজের চাপা, বহুদিনের অবদমিত কামনা প্রকাশের পথও খুঁজে পেয়েছিল। একদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাহফুজ বলেছিল – ‘আন্টি না, এখন তো বলা যায় না, আফরোজা, তুমি হাসলে তোমাকে অনেক কমবয়সী লাগে।’ আফরোজা হেসে ফেলেছিল। ‘তুমি এসব বলতে শিখলে কোথায়?’…
