মুর্শিদা জামান
-

অন্তঃশূন্য
পুবের জোলায় টপাস টপাস করে লাটিম পড়ার শব্দ ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছু শুনছে না বাদল। ওর ঘাড়ের পেছনে বিশ্বনাথের ক্ষুর সেই যে নেমেছে আর নড়ার নামগন্ধ নেই যেন। মনে মনে খুব বিরক্তবোধ করলেও মুখে কিছুই বলে না কখনো সে। বিশ্বনাথের কাজের ধারাই যে এমন। তাছাড়া বাড়ি বয়ে এসে এখন আর কে চুল কেটে দেবে? বংশের শেষ নাপিতের খাতায় ওর নামটা লেখা হবে খুব সম্ভব। ছেলেরা কেউ এই পেশায় আসেনি। গত মাসে বাদল তার চোখ দেখিয়ে একটা ভালো চশমার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিন্তু তাতে একটুও ওর কাজের গতি বাড়েনি। ঘাড় নিচু ছিল বলে অনেকক্ষণ ধরে একটা কাকলাসকে মন দিয়ে দেখছিল বাদল। সামান্য দূরে দোপাটি ফুলের ঝোপে দুটো ফড়িং উঠি-নামি উঠি-নামি মতো খেলা খেলছিল, এদিকে গোবর ফেলানো ডালিতে কাকলাসটা ঘাপটি মেরে আছে। কিন্তু বাদলের মন বলছে, ফড়িংগুলো উড়ে যাক। অমনি কোথা থেকে মোরগের ধাওয়া খেয়ে বাসন্তী বেড়াল গিয়ে লুকালো ডালির তলায়। ওই শব্দটুকুই ফড়িংদের খেলা ভেঙে দিলো মুহূর্তে। কাকলাসটা এক লাফে মানকচুর শুকনো ডালে গিয়ে সটান হলো। এদিকে বাসন্তীর গো-গো শব্দে বিশ্বনাথের ক্ষুর অন্যমনস্ক হয়ে বাদলের ঘাড়ে হালকা হোঁচট খেল সম্ভবত। চিকন শব্দ বেরুলো তার গলা থেকে। কিন্তু বাদল তাকিয়ে ছিল কাকলাসটার চোখের দিকে, শিকার হাতছাড়া হওয়ার জন্য নিশ্চয়ই, না বাদলের মনের অভিসন্ধি টের পাওয়াতে, ব্যাটা বুঝি রক্তমস্তক। চুল কাটার পয়সা নিতে নিতে বিশ্বনাথ পা দিয়ে ডালি তুলে বাসন্তীকে উদ্ধার করল। অবশ্য তার দরকার ছিল না, এ বেড়াল যেই সেই শেয়ানা নয়, পাড়ার মাস্তান একেবারে। খালি মাঝেসাঝে মোরগের তাড়া খেয়ে বেগতিক হয়ে দৌড় দেয়। বাড়ির বউ-ঝি কামলারা গেছে পাট শুকোতে তপনের খোলায়। টানা বৃষ্টিতে কদিন সব কেমন স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠেছিল। ওর গোসলের জল তুলে রেখে গেছে এনামের মা। তাতে একটা সেদ্ধ নিমের ডাল ফেলা। সারা কলতলায় লাটিম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। গাছটা কাটি কাটি করেও কাটায় না ওর বাপ। অথচ মদ্দা তালগাছটা কাটালো জ্যৈষ্ঠ মাসে। এ-বাড়িতে বাদলের কথা কেউ শোনে না, মা ছাড়া। ওর ভালো-মন্দের ভাবনা এখন মায়ের হাতে। বাদলের ডান হাতটায় আগের মতো জোর নেই। তবু মা এ-তাবিজ সে-তাবিজ গুঁজেই যাচ্ছে কোমরের তাগায়। আজ বুঝি কোনো শাপ লেগেছে কপালে ওর। নাভির নিচেও কেটে গেল রেজার চালাতে গিয়ে। রক্তের রেখা মুছে নিল বাঁ-হাতের চেটোয়, মুখের ভেতরটায় বিষের স্রোত বয়ে গেল সহসা। কেউ বুঝি গলায় বালতিতে চুবিয়ে রাখা নিমের ডালটা গুঁজে দিচ্ছে প্রাণপণ! কোনোক্রমে গায়ে জল ঢেলে ঘরে এসে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল বাদল। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না, মাগরিবের আজান ভেসে আসছে দক্ষিণপাড়া থেকে। গরুর দল এসে পড়েছে মাঠ থেকে, সব ঘরে বাতি দেওয়া হয়ে গেছে। এনামের মা রুস্তমকে ঘরে তুলেছে চু-চু শব্দ তোলে। সমস্ত শব্দ মন দিয়ে শোনে বাদল। ঘোড়াটা মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ করল, তাতে এনামের মা কলকল করে উঠল, ‘দিন দিন তোমার আহ্লাদ বাইড়েই যাচ্ছে।’ বলে চটের পর্দাটা টান দিলো, ক’খানা কাচের চুড়ি রিমঝিম করে উঠল তাতে। আবেশে ঘোর চলে এলো বাদলের সদ্য পয়পরিষ্কার করা শরীরে। সামান্যতম শব্দ বাদলের ভালো লাগে। রাতে সবার খাওয়া হয়ে গেলে মা আর ও খেতে বসলো। বাসন্তীর দিকে এঁটো ছুড়ে দিতে দিতে মা জানাল, ‘শুনছিস কাল থেকে এনামের মা আসবে না, ওর ভাশুরঝি আসবে। বাচ্চা খালাস-টালাস করে ঝরঝরা হয়ে কামে ঢুকবে। এ ক’মাস রুস্তমের চাড়িমাখা, ঘাসঘুস জলিল আর ওই মেয়েটা দেখবে।’ বাদল নীরবে ভাত খেতে খেতে শুনল সবিস্তারে। খাওয়ার পর তেল মালিশ করে দিলো ওর ডান হাতে মা। – কাল একবার আব্বাস জ্যাঠার কাছে যা না বাপ। আসার পর তো একবার দ্যাখা করা দরকার। এই আট বছর দিন-রাত কত জায়গায় গেছি, সবাই মুখ অন্ধকার করে ফেলছে; কিন্তু আব্বাসভাই একমাত্র গলা নরম করে পরামর্শ দিছেন। আমি নরেশের বাড়ি থেকে ঘি আনায় রাখছি। কাল যা একবার। – মা, আব্বা আসেনি বাড়ি? – সে তো এতো তাড়াতাড়ি আসার মানুষ না, পাটের বোঝা তুলতে গেছে নৌকায়। হাট ধরতে হবে না সকালে! তুই ঘুমা বাপ। দুই উনিশশো চুরানব্বই সাল, হেমন্তের বিকেল। হাটুরেরা সব বোয়াল মাছ নিয়ে যাচ্ছে। বোয়ালের চওড়া মসৃণ পিঠে পড়ন্তবেলার কিরণ, নাইওরে আসা কিশোরী বধূর লাজুক হাসির মতো স্মিত খেলছিল সেই আলো। বাদল মাছের দামদর জিজ্ঞেস করল, কাউকে কাউকে বাহবাও দিলো ইয়া পেল্লায় মাছ কেনার জন্য। দামে জেতার জন্য প্রায় সবাইকে এক রায় দিলো। সেই রাতে ওদের বাড়িতেও বোয়াল মাছ রান্না হয়েছে। সবাই গোল হয়ে বসে গালগল্প করতে করতে হাত ধুয়ে বসেছে কেবল, বাড়ির কুকুর দুটো গলা ফুঁড়ে চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। গাংপাড়ার নেয়ামতদের বাড়ির লোকজন এসেছে। শাহীনকে নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কাল থেকে। বাদলদের সঙ্গেই ক্যারম খেলে সে দোকান বন্ধ করে। বাদল সাফ জানাল, বুধবারের হাটে ছাড়া কথাই হয়নি আর। কে যেন বলে উঠল, বউয়ের বাচ্চা হবে শুনছিলাম, ও-বাড়ি যায়টায় নাই তো। সব খোঁজখবরই নিচ্ছি আমরা, দেখি বজলু কাকার বাড়ি গিয়ে একবার। খাওয়া-দাওয়া সেরে দাদির ঘরে এসে বাদল কোলপাঁজা করে মোতালো তাকে। কোমরে আঘাত পাওয়ায় হাঁটতে পারে না তেমন, তাছাড়া বেশ আছেন। ‘শোন, তুই একবার হুসেনদের বাড়ি যা তো’, প্রায় ফিসফিস করে বলল দাদি। ‘বউ পোয়াতি হলে ব্যাটাছেলেরা এখানে-সেখানে রাত কাটায় বুঝলি। তোর দাদাও নিখোঁজ হতো।’ বাইরে এসে ভাবতে লাগলো, দাদি কী করে এতো খবর রাখে। সারাদিন ঘরে শুয়ে পুরো গাঁয়ের নাড়ি বুঝতে পারে বুড়ি! হুসেনদের বাড়ি খবর যে পৌঁছে গেছে, সেটা বাদল জানে। শাহিদার স্বামী লিবিয়া গেছে আজ প্রায় ছয় বছর। সেই থেকে বাপের বাড়ি সে। ওদের বাড়ির পাশেই খলিফাবাড়ি। সেখানেই ক্যারম খেলে বাদলদের গ্রুপটা। পরপর দুবার ডিগ্রি পরীক্ষায় ফেল করেছে ও আর মমিন। মমিন লিবিয়া যাওয়ার জন্য শাহিদার কাছে ধরনা দিতে দিতে এক প্রকার সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছে। এদিকে শাহিদার খালাত ভাই শাহীন ওদের যাওয়া-আসা খুব একটা ভালো নজরে দেখে না। ক্যারম খেলার সময় প্রায়ই ঝগড়াঝাটি লেগে যায় ওদের। শাহিদা উঠোন লেপে, গোবরমাখা হাতে শাড়ি ঠিক করে। তাই দেখে দেখে মমিন শালা প্রেমে পড়ল। বাদলের বাবা এ-গ্রামের দু-দফার চেয়ারম্যান, পয়সার বিচারে ওরা সাত গাঁয়ের এক মাথা। আর শাহিদা কি না মমিনের মতো হ্যাংলায় মজে গেল?…
