রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি শিরাতোরি সেইগো

  • রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি শিরাতোরি সেইগো 

    রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি শিরাতোরি সেইগো 

    জাপানি থেকে বাংলায় ভাবানুবাদ : প্রবীর বিকাশ সরকার তাইশোও যুগে (১৯১২-২৬) দু’বার জাপানে আগমন করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিগুলি আজ অনেকটাই দূরের হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ যে একজন অসাধারণ কবি এবং দেশপ্রেমিক ছিলেন একথা যথার্থই; কিন্তু তিনি যে এমন একজন ব্যক্তি তা প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে খুব একটা পরিচিত ছিল না। এই মহান কবি বিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠেন, যার সূচনা হয় ১৯১২ সালের গ্রীষ্মকালে, যখন আইরিশ কবি ইয়েটস তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। এর পরের বছর শীতকালে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করে কবি হিসেবে আরো বিখ্যাত হন। এরও তিন বছর পর (১৯১৬) শীতে তিনি  প্রথমবার জাপানে আগমন করেন। জাপানের সমাজ ও সাহিত্যজগতে রবীন্দ্রনাথ আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেন। এরপর তাঁর কাব্য গীতাঞ্জলি, দ্য গার্ডেনার, সমালোচনা দ্য রিয়ালাইজেশন অফ লাইফ (সাধনা) প্রভৃতি জাপানি ভাষায় অনূদিত হলে পাঠকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। কিন্তু প্রাচ্যের এই মহান কবি আমাদের দেশে তেমনভাবে গৃহীত হননি এবং তাঁর প্রভাবও প্রায় ছিল না। দুঃখের বিষয়, এই অনুবাদগুলো কেবল সাময়িক আলোচনামূলক প্রকাশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যাঁরা তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে য়োশিদা গেনজিরোও, মাশিনো সাবুরোও এবং মিউরা সেকিজোওর নাম আমি স্মরণ করতে পারি।  নির্মল আস্থাভাজন এই কবিকে কেন জাপানের কাব্যজগৎ গ্রহণ করেনি? সে-সময়ে আমাদের কাব্যজগতে একদিকে ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতাকে পুষ্টিস্রোত হিসেবে গ্রহণ করে গড়ে ওঠা কবিতা সমৃদ্ধ হচ্ছিল; অন্যদিকে য়োরোপীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী চিন্তাধারার প্রভাবে অ্যাংলো-আমেরিকান ধারার জনপ্রিয় কবিতাও বিকাশ লাভ করছিল। রবীন্দ্রনাথ পুনরায় জাপান সফরে এলে তখনো এই প্রবণতাই প্রভাবশালী ছিল।  নথিপত্র অনুযায়ী, রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালের শরৎকাল থেকে পরবর্তী বছরের বসন্তকাল পর্যন্ত আমেরিকায় অবস্থান করেছিলেন। তবে এই বিষয়টি প্রায় কোনো গুরুত্বই পায়নি। এমনকি, এমন উদাহরণও আছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই বিখ্যাত হন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান ভ্রমণ সম্পর্কে বলতে গেলে, তাইশোও ত্রয়োদশ বর্ষের (১৯২৪) আগস্ট মাসের আসাহি শিম্বুন পত্রিকায় প্রকাশিত আমার নিজের লেখা নিবন্ধগুলোর মধ্যে ‘কবিতা-জগতের বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক রচনার একটি অংশ নিম্নরূপ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাপানে আগমন করলেও চার-পাঁচটি সংবাদপত্রের মাধ্যমে ভূমিকাসুলভ পরিচিতিই ছিল সর্বস্ব। সাধারণের কাছে তাঁর কবিতা ও গদ্য রচনা অনেকাংশেই অপঠিত ছিল। রবীন্দ্রনাথও আমাদের সাহিত্য সম্পর্কে জানার অনাগ্রহ নিয়ে ধূমকেতুর মতো চলে গেছেন। এখানেই রাষ্ট্রদূত ক্লোডেল (ফরাসি কবি, নাট্যকার, কূটনীতিক পল ক্লোডেল, একদা জাপানে ও আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত) প্রমুখের সঙ্গে তফাৎ বিদ্যমান। একই প্রাচ্যের মানুষ হয়েও আমাদের মধ্যে আন্তরিক ঘনিষ্ঠতা নেই। অবশ্য কেবল আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মাধ্যমে আত্মার গভীর মিলন সম্ভব – এমনটা ভাবাও যায় না। কিন্তু কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্বাগত জানানোর নেতৃত্ব সাহিত্যিকরা নন, বরং শিল্পপতি ও শিক্ষাবিদদের মতো ব্যক্তিরাই গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘটনাটি সেই সময়ে জাপানের বাস্তব অবস্থা, যেখানে সাহিত্যিক সমাজ ও বৃহত্তর সমাজের মধ্যে একধরনের দূরত্ব বিদ্যমান ছিল, সেই দৃষ্টিতে দেখলে বরং আশ্চর্যজনক বলেই মনে হয়। ভেবে দেখলে, বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ কোনো জাতির পক্ষে এর ব্যতিক্রম হওয়াই কঠিন। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও প্রবন্ধ, সেই নীরব মহাজাগতিক চেতনার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও, জাতীয় স্বাধীনতার জন্য উচ্চারিত এক উষ্ণ ও তীব্র আহ্বান সেখানে বিদ্যমান এবং তাঁর রচনায় এমন এক সামাজিক চেতনা আছে, যা আমাদের দেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে দেখা যায় না। সেই কবিতাও গদ্যের মতো একধরনের স্বাধীনতা ও সরলতা ধারণ করে।  রবীন্দ্রনাথ কেবল উপরিভাগের অভ্যর্থনার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকার কবি নন, বরং তিনি এমন একজন কবি, যাঁকে আমাদের দেশের মানুষের আরো গভীরভাবে আস্বাদন করা উচিত। এ ধরনের গুণসম্পন্ন সাহিত্যিক আমাদের দেশে অতীতে প্রায় ছিলই না। সমাজসমস্যার স্পন্দন ধারণ করে এমন রচনা সম্প্রতি এর অঙ্কুরোদ্গম দেখাতে শুরু করেছে মাত্র …।  আর যাই হোক, কবি যে সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আধা-রাষ্ট্রীয় অতিথিরূপে বরণীয় হবেন – এমন দৃষ্টান্ত তখনো দেখা যায়নি। রবীন্দ্রনাথকে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে একধরনের পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল; এর পেছনে জাপানে নারীশিক্ষার অগ্রদূত নারুসে জিনজোওর প্রচেষ্টার প্রভাব কাজ করেছিল বলে মনে করা হয়। সেই সময়ে জাপানে কোনো সাহিত্যিক গোষ্ঠী আজকের পেন-ক্লাবের মতো সংগঠিত সাহিত্যসমাজ ছিল না তাঁকে গ্রহণ করার জন্য, এমন পরিস্থিতি মোটেই ছিল না;…