শান্তনু কায়সার
-
না
বিপ্লবকে বলা যায় গ্লোব-ট্রটার। সে যে কোন সময়ে পৃথিবীর কোন প্রান্তে থাকে, তা বুঝি সে নিজেও জানে না। আর দ্রুত ভুলে যাওয়ার অসম্ভব ক্ষমতা তার। আই অফেন ফরগেট, আই ডু, অ্যান্ড দ্যাটস মাই লাইফ। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে এভাবেই সে নিজেকে ও তার দর্শনকে তুলে ধরে। ন্যাথানিয়েল কানের ডকুমেন্টারি মাই আর্কিটেক্ট : এ সন্স জার্নি সে কোথায় দেখেছিল মনে করতে পারছে না। হনলুলুর হাওয়াই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র-উৎসবে, নাকি অন্য কোথাও? যেখানেই দেখে থাকুক ন্যাথানিয়েলের সঙ্গে ওইসময়েই তার পরিচয়, হয়তো সামান্য ঘনিষ্ঠতাও। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরে বিপ্লবের জন্ম। অসংখ্য বিপ্লবদের মধ্যে সে-ও একজন। ফরাসি বিপ্লবের মতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও নারীদের প্রকৃত অংশগ্রহণ ও ত্যাগ ছিল সর্বাধিক। তাদের আশাও ছিল গগনচুম্বী। নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগের মধ্য দিয়ে তারা ভেবেছিল একটি শৃঙ্খলমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবে। তা তো হলোই না, উলটো তারাই বরং শৃঙ্খলে জড়িয়ে পড়ল। বিপ্লব নামটা তার মায়ের আশার, তার আকাক্সক্ষার প্রতীক। বাংলাদেশের কত মা যে তাঁদের সন্তানের নাম বিপ্লব রেখেছেন, কে জানে? সে সিঙ্গেল-প্যারেন্ট সন্তান, সে তার মায়ের ছেলে। সে ওয়ার-চাইল্ড, যুদ্ধ-শিশু। পাশ্চাত্যে সিঙ্গেল-প্যারেন্ট সন্তান কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু যে-পরিস্থিতিতে তার জন্ম, তাতে এতদিন পরেও সে তার আইডেনটিটি খুঁজে পাচ্ছে না। মায়ের কাছে সে শিখেছে জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী Ñ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও বড়। শুধু জননী? জনকও নয় কেন? তার না হয় জনকের কোনো পরিচয় নেই, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তার জন্ম, কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তো তা নয়, তবুও কেন …? তাহলে বাঘের মতো জনকেরাও কি সন্তানদের শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করে, আর জননী সকল অবস্থায় …। তার কথা আলাদা, সে স্বতন্ত্র। তাহলে অন্য সন্তানরাও কি শেষ-বিবেচনায় মায়েরই সন্তান, তারই মতো? তা কী করে হয়? তার জন্ম অস্বাভাবিক, অন্যদের তো নয়। মায়ের দুঃসময়কে এখন চোখ বুজলে দেখতে পায় সে। যুদ্ধের পর মায়েদের সবাই বলল, বীরাঙ্গনা। রাষ্ট্রঘোষিত সম্মান হয়ে দাঁড়াল অসম্মানের সাক্ষ্য, তাদের চিহ্নিতকরণের সহজ উপায়। এখন যেন বিপ্লব তা প্রত্যক্ষ করে। আই অফেন ফরগেট, আই ডু, অ্যান্ড…। মাই আর্কিটেক্ট দেখে চলে যাবার সময় তার এক বন্ধু বলল, ‘যাচ্ছ কেন? ন্যাথানিয়েলের সঙ্গে কথা বলবে না?’ ‘ন্যাথানিয়েল? কোথায় সে?’ ‘এসো, পরিচয় করিয়ে দিই।’ দেখে মনে হলো, সে তার কবছরের বড়। দুজনের আলাপ জমতে দেরি হলো না। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাথানিয়েলের বয়স সাত-আট, আর ওইসময়, ঠিক কখন যেন পশুর লালসায় মায়ের গর্ভে ভ্রƒণ হিসেবে সে একটু একটু করে বড় হচ্ছে। দেখেছ তো চব্বিশ ঘণ্টার ভ্রমণশেষে আমার বাবার (সরি, ইফ আয়াম অ্যালাউড টু কল হিম সো) মৃত্যু হয়েছে নিউইয়র্কের পেনসিলভেনিয়া স্টেশনের বাথরুমে। দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর তিনি সেখানেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। তারও পর তিনদিন পর্যন্ত নিউইয়র্ক সিটি-মর্গে তার লাশ আনআইডেন্টিফায়েড হয়ে পড়ে ছিল। কারণ পাসপোর্টে তার ঠিকানা তিনি কালো কালি দিয়ে মুছে দিয়েছিলেন। এখান থেকেই শুরু হয়েছে আমার যাত্রা Ñ এ সন্স জার্নি।…
