বিপ্লবকে বলা যায় গ্লোব-ট্রটার। সে যে কোন সময়ে পৃথিবীর কোন প্রান্তে থাকে, তা বুঝি সে নিজেও জানে না। আর দ্রুত ভুলে যাওয়ার অসম্ভব ক্ষমতা তার। আই অফেন ফরগেট, আই ডু, অ্যান্ড দ্যাটস মাই লাইফ। ঘনিষ্ঠজনদের কাছে এভাবেই সে নিজেকে ও তার দর্শনকে তুলে ধরে। ন্যাথানিয়েল কানের ডকুমেন্টারি মাই আর্কিটেক্ট : এ সন্স জার্নি সে কোথায় দেখেছিল মনে করতে পারছে না। হনলুলুর হাওয়াই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র-উৎসবে, নাকি অন্য কোথাও? যেখানেই দেখে থাকুক ন্যাথানিয়েলের সঙ্গে ওইসময়েই তার পরিচয়, হয়তো সামান্য ঘনিষ্ঠতাও। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরে বিপ্লবের জন্ম। অসংখ্য বিপ্লবদের মধ্যে সে-ও একজন। ফরাসি বিপ্লবের মতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও নারীদের প্রকৃত অংশগ্রহণ ও ত্যাগ ছিল সর্বাধিক। তাদের আশাও ছিল গগনচুম্বী। নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগের মধ্য দিয়ে তারা ভেবেছিল একটি শৃঙ্খলমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবে। তা তো হলোই না, উলটো তারাই বরং শৃঙ্খলে জড়িয়ে পড়ল। বিপ্লব নামটা তার মায়ের আশার, তার আকাক্সক্ষার প্রতীক। বাংলাদেশের কত মা যে তাঁদের সন্তানের নাম বিপ্লব রেখেছেন, কে জানে? সে সিঙ্গেল-প্যারেন্ট সন্তান, সে তার মায়ের ছেলে। সে ওয়ার-চাইল্ড, যুদ্ধ-শিশু। পাশ্চাত্যে সিঙ্গেল-প্যারেন্ট সন্তান কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু যে-পরিস্থিতিতে তার জন্ম, তাতে এতদিন পরেও সে তার আইডেনটিটি খুঁজে পাচ্ছে না। মায়ের কাছে সে শিখেছে জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী Ñ জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও বড়। শুধু জননী? জনকও নয় কেন? তার না হয় জনকের কোনো পরিচয় নেই, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তার জন্ম, কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ তো তা নয়, তবুও কেন …? তাহলে বাঘের মতো জনকেরাও কি সন্তানদের শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করে, আর জননী সকল অবস্থায় …। তার কথা আলাদা, সে স্বতন্ত্র। তাহলে অন্য সন্তানরাও কি শেষ-বিবেচনায় মায়েরই সন্তান, তারই মতো? তা কী করে হয়? তার জন্ম অস্বাভাবিক, অন্যদের তো নয়। মায়ের দুঃসময়কে এখন চোখ বুজলে দেখতে পায় সে। যুদ্ধের পর মায়েদের সবাই বলল, বীরাঙ্গনা। রাষ্ট্রঘোষিত সম্মান হয়ে দাঁড়াল অসম্মানের সাক্ষ্য, তাদের চিহ্নিতকরণের সহজ উপায়। এখন যেন বিপ্লব তা প্রত্যক্ষ করে। আই অফেন ফরগেট, আই ডু, অ্যান্ড…।

মাই আর্কিটেক্ট দেখে চলে যাবার সময় তার এক বন্ধু বলল, ‘যাচ্ছ কেন? ন্যাথানিয়েলের সঙ্গে কথা বলবে না?’

‘ন্যাথানিয়েল? কোথায় সে?’

‘এসো, পরিচয় করিয়ে দিই।’

দেখে মনে হলো, সে তার কবছরের বড়।

দুজনের আলাপ জমতে দেরি হলো না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাথানিয়েলের বয়স সাত-আট, আর ওইসময়, ঠিক কখন যেন পশুর লালসায় মায়ের গর্ভে ভ্রƒণ হিসেবে সে একটু একটু করে বড় হচ্ছে।

দেখেছ তো চব্বিশ ঘণ্টার ভ্রমণশেষে আমার বাবার (সরি, ইফ আয়াম অ্যালাউড টু কল হিম সো) মৃত্যু হয়েছে নিউইয়র্কের পেনসিলভেনিয়া স্টেশনের বাথরুমে। দীর্ঘ বিমানযাত্রার পর তিনি সেখানেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। তারও পর তিনদিন পর্যন্ত নিউইয়র্ক সিটি-মর্গে তার লাশ আনআইডেন্টিফায়েড হয়ে পড়ে ছিল। কারণ পাসপোর্টে তার ঠিকানা তিনি কালো কালি দিয়ে মুছে দিয়েছিলেন। এখান থেকেই শুরু হয়েছে আমার যাত্রা Ñ এ সন্স জার্নি।

আমারও একটা যাত্রা আছে, ন্যাথানিয়েল, সেটিও এ সন্স জার্নি। তোমাকে তো বলেছি, তোমার পিতা তোমাকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারেননি, আর আমি জানিই না হু হি ইজ, নর আই ওয়ান্ট টু নো। তবে তোমাকে একটা কথা বলি। বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি, তাঁকে বলা হয় এ-ভাষার আধুনিকতার প্রবর্তক Ñ মাইকেল মধুসূদন দত্ত Ñ নিজের ধর্ম ত্যাগ করলেও তাঁর নেটিভ পরিচয় ঘোচাতে পারেননি। অধিকন্তু দুই শ্বেতাঙ্গিনীর সঙ্গে ঘর করার দায়ে কলোনির ইংরেজরা, এমনকি ধর্মপুরোহিতরা পর্যন্ত তাঁকে ক্ষমা করতে পারেননি। তার ওপর হেনরিয়েটাকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়েও করেননি। তাঁর মৃতদেহ আষাঢ়ের দুর্গন্ধভরা মর্গে চব্বিশ ঘণ্টা ধরে পড়ে ছিল। কিন্তু বেঁচে থাকতে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। কবি যখন মৃত্যুশয্যায় তখন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং লন্ডন মিশনারি সোসাইটির রেভারেন্ড চন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় নানা জটিলতার কারণে তাঁর মৃত্যুর আগে খ্রিষ্টীয় নীতি-অনুসারে তাঁকে কনফেস করতে বলেছিলেন। কিন্তু তার জবাবে কবি কী বলেছিলেন, জানো? বলেছিলেন, আপনারা যেখানে খুশি আমাকে সমাধিস্থ করবেন, গাছতলায় হলেও আপত্তি নেই, শুধু দেখবেন তার ওপর যেন জন্মায় সবুজ ঘাস।

হ্যাঁ, বিপ্লব। এটা তোমাদের প্রাচ্য-ঐতিহ্য। এম্প্রেস নূরজাহান কী যেন বলেছিলেন তাঁর এপিটাফে Ñ?

বর মাজারে মা গরীবা না চেরাগে না গুলে

না পারায়ে পার মা সুজাত না সাদায়ে বুলবুলে।

বাংলা তো তুমি বুঝবে না, নাকি বুঝবে?

একটু একটু Ñ

তাহলে শোনো, সত্যেন দত্তের অনুবাদ :

গরিব গোরে দীপ জ্বেলো না ফুল দিও না কেউ ভুলে

শামা পোকার পোড়ে না পাখ, দাগা না পায় বুলবুলে।

এর মোটামুটি ইংরেজি হচ্ছে …

মাইকেলও তাঁর এপিটাফে মাইকেল থাকেননি, হয়েছেন দত্ত কূলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসূদন। শুরুতেই আহ্বান জানিয়েছেন Ñ দাঁড়াও পথিক বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে, তিষ্ঠ ক্ষণকাল।

হ্যাঁ, আমিও পিতৃমৃত্যু দিয়ে শুরু করে অডিসিয়ুসের যাত্রায় নেমেছি।

ওয়েল ন্যাথানিয়েল, আমার এক স্যার ছিলেন, ইংরেজির। সাগর স্যার। তিনি টেনিসনের ‘ইউলেসিস’ পড়াতেন। তাঁর ছিল অসম্ভব বর্ণনা দেওয়ার ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা, তোমার বাবার মতো। তোমার বাবার যেমন মুখের একপাশ পুড়ে গিয়ে তিনি ‘স্কার ফেইস’ হয়ে গিয়েছিলেন, তেমনি সাগর স্যারও দেখতে তেমন সুদর্শন ছিলেন না। কিন্তু যখন বলতেন তখন হয়ে যেতেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। তোমার বাবার মতো। তিনি যখন পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বা ইয়েলে বক্তৃতা দিতেন তখন শিক্ষার্থীরা যেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত, তেমনি সাগর স্যারও আমাদের পিনপতন মনোযোগ আকর্ষণ করতেন। তিনি ‘ইউলেসিস’ পড়াতে গিয়ে বলেছিলেন, যে-রাক্ষুসী মানুষের রক্ত পান করে তার সংগীত অসম্ভব সুন্দর, তা দিয়েই সে সকলকে আকর্ষণ করে। আর চুম্বক পাহাড়ে ধাক্কা লাগিয়ে জাহাজকে চূর্ণবিচূর্ণ করে যাত্রীদের রক্ত পান করে। ইউলেসিস তা জানতেন। কিন্তু তার ইচ্ছে হয়েছিল ওই সংগীতের আনন্দও তিনি নেবেন। সেজন্যে অন্য নাবিকদের তিনি বললেন, মাস্তুলের মাথায় যেন তাকে শক্ত করে বাঁধা হয়। তার আগে অন্যদের কান তিনি মোম দিয়ে এমন করে বন্ধ করে দিলেন যেন কোনো ধরনের শব্দ তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ না করে। বিপজ্জনক ওই জায়গা দিয়ে যাওয়ার সময় সংগীতে দ্রবীভূত হয়ে সহযাত্রীদের তিনি আদেশ করলেন তারা যেন সেদিকে যায়, কিন্তু কেউ তো কিছু শুনছে না। ইউলেসিসের হাত-পা কেটে রক্ত বেরুল, ওই সংগীতের অসাধারণ সুধা তিনি পান করলেন, আবার জাহাজ ও নাবিকরাও বিপদ থেকে রক্ষা পেল। ক্লাসশেষে মাকে ওই অসাধারণ বর্ণনার সামান্য যা বলতে পারতাম তাতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে তিনি কাঁদতেন। সত্যি ন্যাথানিয়েল, তখন ভুলে যেতাম, আমি যুদ্ধ-শিশু।

বিপ্লব, আমার মা-ও সারাজীবন দুঃখকে গোপন করেছেন। ভাবো তুমি, ষাটের দশকে কান যখন টেক্সাসের ক্যামবেল মিউজিয়ামে ডিজাইনারের কাজ করছেন তখন আমার মা হ্যারিয়েট প্যাটিশন এই প্রজেক্টের ল্যান্ডস্কেপ-স্থপতি। তাদের মধ্যকার তখনকার সম্পর্কের ফসল আমি। মা আমার আজীবন কুমারী ও লুই কানের প্রতি বিশ্বস্ত। আমার বাবা তাঁর ফিলাডেলফিয়ার রক্ষণশীল শ্বেতাঙ্গ-পরিবারে কখনো একথা জানাতে পারেননি, আর মা বয়েছেন তার দায়।

এ-ঘটনা পৃথিবীতে কম হলেও বহুবার ঘটেছে। মন্টেসরি মেথডের সেন্স পারসেপশনের মধ্য দিয়ে যে মারিয়া মন্টেসরি চিকিৎসক হয়েও শিক্ষকের জীবন বেছে নিয়েছিলেন, তিনিও তাঁর দয়িতের সন্তান ধারণ করেছিলেন, যদিও তার পিতৃপরিচয় প্রকাশ করেননি।

ওইরকম এক কিশোর তার বাবাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। সারা পৃথিবী খুঁজে ঢাকায় এসে সে তার পিতাকে আবিষ্কার করেছে। ‘দেখ বিপ্লব, তোমাদের শাহজাহান তাজমহল তৈরি করতে তেইশ বছর সময় নিয়েছেন, আমার পিতাও ওই সময় নিয়েছেন তোমাদের গল্পকে কংক্রিটের কাব্যে রূপ দিতে। তাঁর কাজের সময়েই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অনেকেই তাঁকে বলেছিলেন, এরপর কী হবে জানি না, তুমি কাজ বন্ধ করে চলে যাও। কিন্তু আমার পিতার মনে হয়েছিল, এর পরেই ঘটবে আসল ঘটনা, একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হবে। তিনি লেগে থাকলেন এবং জন্ম দিলেন এক অসাধারণ স্থাপত্য-কাব্যের। বিশাল এই স্থাপত্যের সঙ্গে তিনি যুক্ত করলেন নৈঃশব্দ। বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্যকে তিনি মনে রাখলেন, মনে রাখলেন, এটি এক ডেলটা-কান্ট্রি। পানিকে তিনি তাঁর স্থাপত্যের অংশ করে নিলেন, অর্থ নয়, কীর্তি নয়, খ্যাতি নয়, তিনি চাইলেন অসাধারণ এক কাব্য রচনা করতে, যে নিজে নিঃশব্দ জনগণের আকাক্সক্ষাকে ভাষা দেবে। ফিলাডেলফিয়ায় হাঁটতে হাঁটতে যে-কিশোর স্থপতি না চিত্রী, না প্রকৃতিবাদী না চলচ্চিত্রকার না ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হবে ভেবে ভেবে হয়ে গেল স্থপতি Ñ সে তো ভেবেছিল সে এমন জায়গায় এমন একটি স্থাপত্যের সৃষ্টি করবে যা মার্কিন ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নেবে, আমেরিকার যা ভুল হয়েছে সে তার পথ মাড়াবে না।’কিন্তু কী হলো?

হ্যাঁ, কী হলো?

তারপর পৃথিবীর দুই প্রান্তে চলে গেল দুজন।

দেশের সঙ্গে বিপ্লবের সম্পর্ক এখন শুধু সংবাদপত্রে। কিন্তু বোঝে সে তার সমস্ত উপলব্ধি দিয়ে। একদিন সে দেখে, দেশের প্রধান বিচারপতি বলেছেন, বিচারব্যবস্থা গরিব মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তিনি ইম্পিউনিটির কথা বললেন। কেউই কি দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে? কেউই না। আমাদের কবি তো বহু আগেই বলেছেন, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। কেঁদে চলেছে। ইম্পিউনিটির কথায় ইম্মিউনিটির কথাও বলা যায়। জনস্বার্থের সর্বোচ্চ রক্ষাকবচের জন্যে যে-ইম্মিউনিটি সে কি ক্ষুদ্র ও গোষ্ঠীস্বার্থের কাজেই শুধু লাগবে?

এত কেন ভাবছ, বিপ্লব? তুমি তো যুদ্ধ-শিশু। আই অফেন ফরগেট, আই ডু, অ্যান্ড দ্যাটস…। কিন্তু লুই কান? তাঁর স্বপ্ন? ক্ষিরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের নাটক আলিবাবা-র কথা মনে পড়ে, ছি ছি এত্তা জঞ্জাল, এত্তা বড়া বাড়িমে এত্তা…।

যাগ্গে, গ্লোব-ট্রটার হয়ে ঘুরে বেড়ানোই ভালো। কিন্তু অস্থিরচিত্ত মানুষের পক্ষে তাই কি সম্ভব? কম্পিউটারের স্ক্রিনে দেখছি গার্ডিয়ানে বেঞ্জামিন জেফানিয়ার লেখা। নভেম্বরের ১৩ তারিখে দেখছি Ñ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আমার নামে চিঠি এসেছে। অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী জানাচ্ছেন, তিনি আমার নাম অফিসার অব দ্য অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার হিসেবে রানির অনুমোদনের জন্যে পাঠাতে চান। 

ও বি ই Ñ মি? জেফানিয়ার বিস্ময়। আমার কাজিন মাইকেল পাওয়েলকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তখন আমি প্রধানমন্ত্রীর দরজায় ধরনা দিয়েও তাঁর সাক্ষাৎ পাইনি। আর আজ তিনি জানতে চাচ্ছেন আমি অফিসার অব দ্য… হতে সম্মত কিনা? ব্যাপারটা আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে আমাদের দাসত্বের কথা, কীভাবে আমার পূর্বসূরি মায়েরা ধর্ষিত এবং পিতারা অত্যাচারিত হয়েছে। আমি কালো, তাই ভালো। সাহিত্যে আমার অবদানের জন্যে ওরা আমাকে পুরস্কৃত করতে চায়। সাহস থাকে তো আমি যে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লিখেছি সেজন্যে আমাকে পুরস্কার দিক। ২০০২-এর ৯ জুলাই মিট দ্য রাইটার্স ডে-তে রানির সঙ্গে দেখা করবার জন্যে অনেকেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, আর তাদের অজুহাতেরও অন্ত ছিল না। পুরস্কার আসলে মানুষকে আত্মসমর্পণ করতে শেখায়। আমার একটা কবিতা আছে না? ‘বট অ্যান্ড সোল্ড’। ‘কেনা-বেচা’ Ñ তাই তো হচ্ছে। ও বি ই Ñ মি? ও, নো।

বিদেশে থাকলেও দেশের খোঁজখবর অল্প-বিস্তর রাখে বিপ্লব। একবার এক ছড়াকার লিখেছিলেন না Ñ ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা/ রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা। পুরস্কার পেয়ে সে এখন কেমন বশংবদ হয়ে গেছে, কেমন গৃহপালিত। আর পুরস্কারগুলোরও কোনো মাথামুণ্ডু নেই। যারা দিচ্ছে তারা যেমন বেহায়া, যারা নিচ্ছে তারাও কম বেহায়া নয়। থিংস ফল অ্যাপার্ট, দ্য সেন্টার ক্যান্ট হোল্ড। ইয়েটসের কবিতা অথবা চিনুয়া আচিবির উপন্যাস কী নিষ্ঠুর সত্য হয়ে বাংলাদেশে দেখা দিচ্ছে। হায় মুক্তিযুদ্ধ, হায় যুদ্ধ-শিশু, হায় লুই কানের স্থাপত্য।

আমার কেমন সব তালগোল পাকিয়ে যায়। আই অফেন ফরগেট, আই ডু, অ্যান্ড…। আচ্ছা, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮-এর ২১ মার্চ রেসকোর্সে উর্দুই যে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে সেটি যে বলেছিলেন তখন কেউ খুব-একটা প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু সে-কথাই যখন আবার ২৪ মার্চ কার্জন হলে ছাত্রদের সামনে বলতে গেলেন তখনই স্পষ্ট ও ঋজুকণ্ঠে প্রতিবাদ ধ্বনিত হলো, না, না, না। তাঁর ধারণা ছিল, তিনি ও তাঁর টাইপরাইটার পাকিস্তান সৃষ্টি করেছেন। জনগণ ও তাঁদের সামষ্টিক প্রত্যয়কে বাদ দিলে রাষ্ট্রের আর কী থাকে? দেশের পুরানো সংবাদপত্র দেখে বিপ্লব জেনেছে, থ্রিপিস স্যুটের প্রভাবশালী একজন বলেছেন, দেশের অখণ্ডতা চেয়ে ওরা কোনো দোষ করেনি। বটেই তো, ওরা কেন দোষ করবে? দোষ তো করেছে এদেশের জনগণ। দোষ করেছে তারা যারা সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে নিজেদের প্রজাতন্ত্র চেয়েছিল ও তা করেছিল। ওরা এ-ও বলে, পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না। অতএব পাকিস্তানের পথ ধরেই তো…। অন্ধকার না থাকলে তো আলো জ্বলে না। কিন্তু তাই বলে কে কবে অন্ধকারকে সমর্থন করেছে? পরাধীনতা থেকেই তো স্বাধীনতার জন্ম। কিন্তু তাই বলে স্বাধীনতার জন্যে কে কবে পরাধীনতার প্রশংসা করেছে? জেনারেল ডায়ারের কথা মনে করিয়ে দিয়ে দেশবাসীকে উদ্দেশ করে নজরুল কি লেখেননি, ‘ডায়ারের বুট এমন করিয়া তোমাদের কলিজা মথিত না করিয়া গেলে তোমাদের চেতনা হইতো না। তোমাদের মুখের সামনে তোমাদের আত্মীয়-আত্মীয়ার মুখে এমন করিয়া থুথু না দিলে তোমাদের মানব-শক্তি ক্ষেপিয়া উঠিত না। …তাই আজ আমরা ডায়ারকে প্রাণ ভরিয়া আশীর্বাদ করিতেছি…।’ কিন্তু ওরা এমনই পরাধীন যে, দাসত্ব থেকে আজও তাদের মুক্তি নেই। দেশের অখণ্ডতা মানে কী? কোন দেশ? যাকে না ভাঙলে আমরা গড়তে পারতাম না, সৃষ্টি হতো না প্রজাতন্ত্রের সেই পশ্চাৎপদতাকে আঁকড়ে ধরে পিছিয়ে যাওয়ার নামই কি ছিল দেশপ্রেম? আর ওই দু®কৃতির মধ্য দিয়ে মানুষের প্রাণ ও সম্ভ্রমহানির কী হবে? প্রতিটি বিশেষ দিবসে আমরা যে-সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কথা বলি, তাহলে তারই বা কী অর্থ? ওরা যখন কোনো দোষ করেনি, সমস্ত দেশবাসী তা করেছে, তাহলে আজ তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক। না বদরুদ্দীন উমর, বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ-প্রত্যাবর্তন এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।

মা বলতেন, ভাষা-আন্দোলনের বছরে তারপরে কুমিল্লায় যে-সাংস্কৃতিক সম্মেলন হয়েছিল তাতে মূল সভাপতির অভিভাষণ দিতে গিয়ে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ বলেছিলেন, মুসলমানদের ভাষা হওয়া সত্ত্বেও আরবি যখন আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো তখন ফেরদৌসী ইরানের ঐতিহ্য ও ভাষার প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করে শাহনামা রচনা করলেন। বহু সময় পেরিয়ে, একাধিক প্রজন্ম-উত্তর সাহিত্যবিশারদের কণ্ঠ শুনি, সেই দৃষ্টান্ত আমাদের সম্মুখে রয়েছে।

না, আমি আর ভুলব না।

ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না, ছাব্বিশে মার্চ ভুলব না, ষোলোই ডিসেম্বর ভুলব না। বায়ান্ন ভুলব না, উনসত্তর ভুলব না, একাত্তর ভুলব না।

বিদেশে থেকেও সে অনুভব করেছে, তৃণমূলের মানুষ তাকে ভুলতে দেবে না, দেবে না।১৮৫৭, ১৯৪৮-এর সব মানুষ যেন আবারো ২০০৪-এ একত্রিত হয়ে সমস্বরে বলছে Ñ না, না, না।