আত্মজা

অফিস থেকে ফিরে স্নান। শীতের কদিন অবশ্য কেবল হাতমুখ ধোয়া। তারপর পাতা ভিজিয়ে চা বানানো। খাবার টেবিলে মুড়ির টিন আর খোসা ছাড়ানো বালিতে ভাজা বাদামের কৌটো রাখার স্থায়ী ব্যবস্থা। দু-চার মুঠো মুড়ি আর দু-চারটে বাদাম মুখে নিয়ে চিবোতে চিবোতে গ্লাসভর্তি চায়ে চুমুক দেওয়া। এরপর চায়ের গ্লাস ও বাসন ধোয়া, মোছা এবং তুলে রাখা। তারপর বিছানায় দুটো পা টানটান করে রিমোট হাতে টিভির চ্যানেলের পর চ্যানেলে পরিক্রমা।

রাজনীতি নিয়ে অনুষ্ঠান হলে ওর মনে হতো, এসব ফালতু ব্যাপার। অন্য চ্যানেলে সামাজিক বিষয় নিয়ে সিরিয়াল হলে ও ভাবত, যতসব বানানো গল্প। যৌবন ও যৌনতা-বিষয়ে অনুষ্ঠান হলে ও বিড়বিড় করত, এসব দেখে রাতের ঘুম নষ্ট। খেলাধুলা সম্প্রচার হলে ও ভাবত, আবার পরের জন্মে খেলব। জীবজন্তু নিয়ে অনুষ্ঠান দেখলে ও নিজের কাছে জানতে চাইত, এই জগতে সবচেয়ে সুন্দর জীব কে? নিজেই উত্তর দিত, আমার বাবা-মা। বড় আদর-যত্নে আমাকে মানুষ করেছিল। তবে আমার জন্ম নেবার কোনো দরকারই ছিল না, অকারণে এই বেঁচে থাকার বোঝা বয়ে চলেছি।

এভাবে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গড়াত। নটা নাগাদ কলিংবেলের শব্দ। বিছানা ছেড়ে নামার সময় শোনা যেত হাঁটু ভাঙার শব্দ Ñ মট্। দরজার বাইরে রাতের খাবারের ডিবে হাতে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে ক্যাটারারের লোক। সকালে দিয়ে যাওয়া খালি ডিবে ফেরত দেবার সময় ও রোজই বলত, কাল একটু সকাল সকাল এসো ভাই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে জল ও চা পান করবার পর পায়চারি করতে করতে ও রোজই আপনমনে বিড়বিড় করত, কাল রাতে ইসবগুলের ভুশি খেয়েছিলাম তো?

মা মারা গেছে শৈশবে। বাবার মৃত্যুবার্ষিকী সাত পেরিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর আত্মীয় ও সামাজিক সম্পর্কগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে এটাই প্রসূনের রোজকার জীবন। ঘরের বাইরে ও অবশ্য আর পাঁচজন নাগরিকের মতো। বাস কেন এত আস্তে চলে, রাস্তায় কেন এত গর্ত – এসব নিয়েও মাথা ঘামায়। অফিসের আচরণও পাঁচজন কেরানির মতো। সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞের সমান মতামত দেয়, অথচ নিজের অফিসের কাজে বাচ্চাদের মতো ভুল করে। প্রসূনের রোজকার এই জীবনযাপনে আলোড়ন তোলার ক্ষমতা রাখত ওর ভাই, অরুণ। অরুণ অনিয়মিত বাড়ি ফিরত, সঙ্গে থাকত সবসময়ের সঙ্গী একটি স্প্যানিশ গিটার। মুখে মদের গন্ধ এবং গালাগাল ও অভিযোগ।

অরুণ কলেজে ঢুকে কবিতা লেখা শুরু করেছিল। তখন ওর প্রিয়তম কবি সুনীল, স্বপ্নের নারী নীরা। তারপর কবছরের জন্য নকশাল-রাজনীতি নিয়ে মাতে, বিনোদ মিশ্রের ব্যক্তিত্বের টানে কমিউনে বসবাস করবার জন্যে ভোজপুর চলে যায়, কলেজের লেখাপড়া শেষ না করেই। ফিরে আসার পর ও রূপান্তরিত মানুষ। ঘরের কোণে কমাস নির্বান্ধব কাটাবার পর একটি আমেরিকান মুভি দেখে ব্রেক ড্যান্সকে জীবিকার পাথেয় ধরে নেয়। তখন কলকাতায় ফাঙ্গাস গজানোর মতো ব্রেক ড্যান্স শেখাবার অনেকগুলো স্কুল। ব্রেক ড্যান্স শিখে মাড়োয়ারি, সিন্ধি, পাঞ্জাবিদের বিয়ের অনুষ্ঠানে নেচে ভালোই রোজগার করত সে-সময় অরুণ। হঠাৎই কলকাতায় গিটার বাজিয়ে স্বরচিত গান গাইবার ব্যাপক চল শুরু হলো। অরুণ ব্রেক ড্যান্স ছেড়ে গিটার তুলে নিল, নিজের ঘরের দরজায় সাঁটল বব ডিলানের ছবি। মদ খাওয়া শুরু করেছিল আরো আগেই। নিজের মায়ের সঙ্গে ওর পরিচয় দেয়ালে টাঙানো ছবি দেখে। এর মধ্যে ওদের বাবাও ছবি হয়ে দেয়ালে মায়ের পাশে ঝোলা শুরু করে দিল। অবিবাহিত এবং সাংসারিক বুদ্ধিজীবী প্রসূন তখন বলেছিল, ‘ভাই! আমি তো একটা চাকরি করি। বাবার রেখে যাওয়া টাকাগুলো দিয়ে তুই একটা ব্যবসা কর।’

 কোনো মহিলা ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বললেই প্রসূনের বুকের খাঁচায় সদ্য জবাই হওয়া মুরগি ডানা ঝাপটায়। তাই নিজে কোনোদিন বিয়ের কথা ভাবেনি। পরিকল্পনা ছিল ব্যবসায় লাভের মুখ দেখলে ও অরুণের বিয়ের ব্যবস্থা করবে। আশা ছিল অবসর-জীবনে ভাইয়ের স্ত্রীর কাছে মোটামুটি যত্ন পাবে, একা থাকার কষ্টও পেতে হবে না। কিন্তু ব্যবসার নামে বাবার জমানো টাকা বরবাদ করতে অরুণ খুব বেশি সময় নেয়নি। টাকা শেষ হয়ে যাবার পর অনিয়মিত হয়ে গেল ওর বাড়ি ফেরা। বাড়ি এলে নিজের ঘরে আটকে থাকত, দিনে দু-একবার মদ-সিগারেট কিনতে যাবার জন্যে দরজা খুলত। মাঝে মধ্যে শোনা যেত তারস্বরে গাওয়া গান। খিদে পেলে টিনের মুড়ি, কৌটোর বাদাম কিংবা প্রসূনের জন্য সদ্য দিয়ে যাওয়া ডিবের মাছ-ভাত কোনো কথা না বলে সাবাড় করে দিত। মদ, সিগারেট কেনার টাকা ফুরিয়ে এলে প্রসূনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলত, ‘বিজনেসে লস হয়ে গেছে। ফ্রেশ ক্যাপিটাল দরকার। বাড়ি ভাগ কর। আমার পোরশান বিক্রি করব।’

দুই

সাময়িক অন্ধত্ব পেতে চাইলে চোখ বন্ধ করাই সহজতম উপায়। কিন্তু চোখ বন্ধ করলে আজকাল প্রসূনের দেখার ক্ষমতা অতি ক্রিয়াশীল হয়। চোখ খোলা অবস্থায় যা আবছা দেখে, চোখ বন্ধ করলে আবছা ভাব কেটে যায়, স্পষ্ট দেখতে পায় সিলিং ফ্যান থেকে অরুণ ঝুলছে। ওর দু-হাত পালোয়ানের মতো ছড়ানো। অরুণের রুগ্ণ ও পলকা বুক, পেট, পা সবই ফোলা ফোলা, যেন মেদ-সমৃদ্ধ। কেবল বাঁ দিকে হেলে থাকা মুখটা অবিকৃত। চোখদুটো ঠেলে বেরুচ্ছে। ওর চোখদুটো সবসময়ে জ্বলজ্বলই করত। ওভাবে কতক্ষণ ঝুলে ছিল অরুণ? কী সুখ ওভাবে ঝুলে পড়ায়? সুখী মানুষ ছাড়া রাতারাতি কারোর শরীরে অমন স্ফীতি হয়, প্রসূন জানত না। মায়ের মৃত্যু ওর মনে নেই। বাবা ভুগে ভুগে কৃশ ও শীর্ণ হয়েই মারা গিয়েছিল। অন্য কোনো মৃত্যু এত কাছ থেকে কখনো দেখেনি ও। এক রাতে প্রসূন অপেক্ষায় ছিল কখন ক্যাটারারের লোক খাবারের ডিবে নিয়ে আসবে। কলিংবেলের শব্দ শুনে টিভির চ্যানেল থেকে চ্যানেলে পরিক্রমা বন্ধ রেখে দরজা খুলেই ও অবাক। অরুণের দু-হাতের আশ্রয়ে একটি সদ্যজাত শিশু এবং সঙ্গে মাথায় ঘোমটা দেওয়া এক মহিলা। 

প্রণাম করার জন্য মহিলাটি সামান্য ঝুঁকতেই প্রসূন আঁতকে বলেছিল, মানে?

আমার স্ত্রী আর মেয়ে। আশীর্বাদ কর দাদা। Ñ ছোট ভাইয়ের মুখে মেঘফাটা জ্যোৎস্নার মতো হাসি।

সেভাবে একটা মশাও মারতে পারে না প্রসূন, টিপ করতে করতে রক্ত খেয়ে মশাটা উড়ে যায়। সেদিন বিনা টিপেই ছোটভাইকে এলোপাথাড়ি মেরেছিল। একটা দুটো নয়, অগুনতি চড়-থাপ্পড়। নকশালদের কমিউন-ফেরত অরুণ বাধা দেয়নি। মার হজম করতে করতে কাতর অনুরোধ করেছিল, ‘আমাকে ঢুকতে না দিলেও আমার বৌ, মেয়েকে ঢুকতে দে দাদা! ওদের যাবার জায়গা নেই।’

‘কেন? যেখানে ছিল সেখানেই রেখে আয়।’

‘সেখানে ফেরা যায় না দাদা!’

‘তাহলে জাহান্নামে রেখে আয়।’

আমি ওকে জাহান্নাম থেকেই নিয়ে এসেছি দাদা। ওখান থেকে পালিয়ে এলে ফেরা যায় না। সোনাগাছির মাসি ওকে হাতের কাছে পেলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে। তোর পায়ে পড়ছি, আমার বৌকে আশ্রয় দে দাদা!’

প্রসূন ওদের বাড়ির চৌকাঠ পেরুতে দেয়নি, কিন্তু গল্পটা শুনে নিয়েছিল। বাল্যে বিক্রি হওয়া এই বেশ্যাকে নিয়ে সোনাগাছি থেকে কমাস হলো পালিয়ে এসেছে অরুণ। দুজনের সংগ্রহে থাকা সোনা ও টাকা শেষ এবং সদ্যজাত বাচ্চাটি ওদের প্রেমের ফসল। প্রসূতি ও বাচ্চা সুস্থ, তাই সরকারি হাসপাতালে থাকার জায়গা নেই। এর আগে যে-বাড়িতে সংসার পেতেছিল সেখানে অনেক ভাড়া বাকি, অতএব ফেরা যাচ্ছে না।

ওরা ফিরে যাবার পর বেশ কবার অ্যান্টিসেপটিক সাবান দিয়ে হাত ধোবার পর প্রসূন ডিবে খুলে খেতে বসেছিল। হাত দিয়ে ভাত চটকাতে গিয়ে আবার উঠে যায়, জল গরম করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়। বাড়ির দেয়াল, মেঝের যেখানে যত পোকা সবই মনে হচ্ছিল প্রথমবার দেখছে। এতসব পোকাও কি বেশ্যাপল্লী থেকে এলো? বুঝতে পারে না। রোগ-সংক্রমণে বড় ভয় ওর। শেষে চামচ ব্যবহার করে রাতের খাওয়া শেষ করেছিল। তারপর থেকে বেশকদিন একরকম আচ্ছন্নতার মধ্যে কেটে যায়, আত্মতৃপ্তিময় আচ্ছন্নতা। ওর ব্যক্তিত্বের এই কাঠিন্য, এতদিন কোথায় ছিল ভেবে অবাক হয়। তবে অফিস ও বাড়ির বাঁধাধরা নিয়ম বদলায় না। অফিসে পৌঁছে তাড়াতাড়ি দু-তিনটে বাংলা দৈনিক পড়ে ফেলার পর তাজা বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞ-মতামত দেওয়া চলতে থাকে। ক্রিকেট, অর্থনীতি, রাজনীতি, কারগিল, রণনীতি, মহিলাবিল, আউটসোর্সিং, জনযুদ্ধ Ñ সবকিছুই ওর ভাবনায় ও বুদ্ধিতে জলের থেকেও বেশি তরল। এসবের ফাঁকে ফাঁকে মনে হতো, কেমন শাসন করলাম বখে যাওয়া ভাইটিকে। আবার কখনো এ-জাতীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আরো কঠোর হবার প্রস্তুতিও নিচ্ছিল মনে মনে। বেঁচে থাকার একটা কারণ খুঁজে পেয়ে ওর মনে তখন বেশ খুশি খুশি ভাব। কদিন পর এক সকালে কলিংবেলের শব্দ শুনে ও দরজা খুলে দেখল সামনে দাঁড়িয়ে অরুণ। সেই পুরানো চেহারায়। উদ্ধত। মদের প্রভাবে টলমল। বুকের কাছে ঝোলানো গিটার। গিটার বাজিয়ে অরুণ তখন গাইছিল, ‘যতসব অপোগণ্ড/ করল আমার জীবনটা লন্ডভন্ড।

কাঠিন্য উধাও, প্রসূন শুনছিল কানেস্তারা পেটানোর শব্দ। কড়া শাসন করবার জন্যে রুখে দাঁড়াবে ভেবেও ওর মনে হলো টিয়াপাখির মতো সবুজ ডানা মেলে দিগন্তে হারিয়ে যেতে পারলেই ভালো হতো। কিন্তু উড়বে কী করে? সামনে ছোটভাই। পথরুদ্ধ। পেছনে দেয়ালের পর দেয়াল। মাথার ওপর সিমেন্ট জমানো ছাদ। গলার স্বর কাঁপা কাঁপা। বলল, ‘ভাই! দ্যাখ এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। পাড়াটাও ভদ্রলোকের। এসব করিস না।’

‘আমি ঔদার্যে বিশ্বাসী, শুকনো ভদ্রতায় নয়। এখানে আমাকে বেমানান মনে হলে বাড়ির অর্ধেক দাম নগদ দিয়ে দে। আর আসব না। নে সব। 

যতসব অপোগণ্ড/ করল আমার জীবনটা লন্ডভন্ড।’ 

অরুণের বিরামহীন আঙুল গিটারের তারে সঞ্চারণশীল, কিন্তু প্রসূন শুনছিল কানেস্তারা পেটানোর শব্দ। ওর দুকান লাল। ভীষণ তাপে গলে যাবে কি? ও ইতর কিংবা অনুদার নয়। ছোটভাইকে ঠকানোর কোনো সংকল্প নেই, ইচ্ছে ছিল অরুণের ভবিষ্যৎকে নিজের প্রয়োজনমতো ছাঁচে ঢালবে। কানেস্তারার শব্দ কানের পর্দা চৌচির করে হৃৎপিণ্ডের ভাল্বগুলো খসিয়ে দেবে মনে হচ্ছিল। কোন প্রয়োজনে এই বেঁচে থাকা – না জানা থাকলেও প্রসূনের মৃত্যুভয় পুরোপুরি ছিল। টিয়া ওর প্রিয়তম পাখি। কানেস্তারা বাজলে টিয়া মেনে নেয় খাদ্য হিসেবে অনেক কিছুই কচি ধানের বিকল্প। প্রসূনের মনে হয়েছিল কোনোভাবে অফিসে পৌঁছাতে পারলেই এ-যাত্রায় বেঁচে যাবে। তাই কথা না বাড়িয়ে ও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অফিসের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছিল। অফিসই বাড়ির বিকল্প এ-রকম সময়ে।

রাস্তায় ঘুমানোর অভ্যেস না থাকলে রাতে একটা বিছানার জন্য বাড়ি ফেরা দরকার। কেননা, টিয়ার মতো গাছের ডালে ঘুমিয়ে রাত কাটাতে শেখেনি প্রসূন। বেশ রাতে বাড়ি ফিরে ও ভেবেছিল মাতালটা দরজা বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে হয়ত। ডাকাডাকি মানেই অশান্তি। টিভির চ্যানেল থেকে চ্যানেলে পরিক্রমা, খাওয়া ও ঘুম Ñ এমন নিয়মেই প্রবাহিত হয়েছিল ওর নিত্যকর্ম। পরদিন সকালে বাড়িময় দুর্গন্ধ নাকে আসতেই অনুমান করে নেয় কোথাও ইঁদুর মরেছে। অন্য কোথাও খোঁজ না পেয়ে অরুণের বন্ধ দরজায় ধাক্কা মারতে হলো। দরজার মুখোমুখি দেয়ালে প্যাস্টেল দিয়ে লেখা, ‘চললাম। আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে তুই রক্ষা কর দাদা!’

তিন

কোনো ভাস্করের প্রাচীন খোদাই যেন। ঝড়, বৃষ্টি ও সময়ের ঝাপটায় মলিন ও অস্পষ্ট। চোখ খোলা রাখলেই বাড়ির সবকটা দেয়ালে প্রসূন দেখতে পায় একটা নিখুঁত ছবি। সিলিং ফ্যান থেকে অরুণ ঝুলছে। টিভির পর্দায়ও একই ছবি। চ্যানেল বদলে কোনো লাভ হয় না। ও চোখ বন্ধ করে এই বিভীষিকা এড়ানোর জন্য। আস্তে আস্তে সব মালিন্য সরে যায়। যেন খোলা চোখে দেখছে, অরুণ ঠিক ওর সামনের সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে। পরিচিত ঘাম ও মদের গন্ধে বাতাস ভারি। দুটো পায়ের আঙুল কাঁপছে, সদ্য ছাল ছাড়ানো খাসির মাংসপেশির মতো। মনে হয়, এখনই দড়ি কেটে নামিয়ে ওর মুখে মুখ ঠেকিয়ে হাওয়া দিলে বেঁচে যাবে। এই শহরে কত নামী নামী ডাক্তার ও হাসপাতাল। কে খাবে জমানো টাকা? ওর তো সারাদিনের বড় খরচ বাইশ বাইশ চুয়াল্লিশ টাকার মাছ-ভাত। চোখ খুলে প্রসূন লাফিয়ে ওঠে। দড়ি কাটার জন্য স্টুল ও ছুরি খোঁজার দরকার হয় না। সামনের দেয়ালে খোদাই হওয়া অরুণকে স্পষ্ট দেখা যায়। 

অফিসের সহকর্মীদের রেখে ঢেকে এই মনোবিকারের ঘটনা বলেছে অনেকবার। সহকর্মীরা বলে, ‘আহাঃ। ছোটভাইটাকে এত ভালোবাসতি সেটা ছেলেটা বুঝল না। ক্ষয়িষ্ণু সমাজের ফসল এরা।’

একদিন এক বয়োজ্যেষ্ঠ সহকর্মী বলেন, ‘তোমার ভাই তো আবার কবিতাও লিখত একসময়। আমি অবশ্য পড়িনি কখনো। কীই-বা পড়ব! আধুনিক বাংলা কবিতা মানে নিকৃষ্ট বাংলা গদ্য, হতাশার ছড়াছড়ি।’

এসব মতামতে প্রসূনের সমস্যার হ্রাসবৃদ্ধি হয় না। ও অফিসে আসবার জন্য আরো সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া শুরু করল। বাড়ি ফেরে সন্ধ্যা পার করে। সারাদিন ফাঁকি দিয়ে ছুটির পর কাজ করা এখন কর্মসংস্কৃতির অঙ্গ। ছুটির পর অফিসে বসে থাকার প্রতিযোগিতায় প্রসূনও নাম লিখিয়েছে, ওর তো বাড়ি ফিরতেই ভালো লাগে না। একদিন সন্ধ্যার পর অফিস থেকে বেরুবার মুখে এক সহকর্মী খুব    আন্তরিকভাবে বলল, এভাবে আর কতদিন কাটাবি প্রসূন? এবার একটা বিয়ে কর। তুই রাজি থাকলে আমি মেয়ে দেখছি।

বিয়ে মানেই কোনো নারীর সঙ্গে সহবাস। ভয়ের আঁচড়ে ওর বুকের ভেতরটা রক্তাক্ত হতে থাকে। মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। ও ঘাড় নেড়ে বলতে চায়, না, আমি বিয়ে করব না।

সহকর্মীর মনে হয় প্রসূন বলছে, হ্যাঁ, এবার আমি বিয়ে করব। সম্বন্ধ দেখা শুরু হয়ে যায়। অনেকে মিলে, যে যার নিজের মতো করে। একজন কোনো সম্বন্ধ নিয়ে এলেই অন্য সহকর্মী কান ভারি করে বলে, একদম দেখতে যাসনে প্রসূন, মেয়েটা ওর খুড়তুতো শালি। মেরি স্টোপসে গিয়ে দুবার পেট পরিষ্কার করিয়েছে। সেকেন্ডবার আমি সঙ্গে ছিলাম। তোর জন্য আমি ভালো মেয়ে দেখে দেবো। বিয়ের পর মন দিয়ে ঘরসংসার করবে, তোর যত্ন নেবে – এমন মেয়েই তো তোর চাই।

ভালো মেয়ের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ দেবার কথা ডিপার্টমেন্টে জানাজানি হয়ে গেল। অন্য সহকর্মী আড়ালে নিয়ে বলল, একদম ওর পাল্লায় পড়িস না প্রসূন! ও শালা বিয়ের ঘটকালি করে দালালি খায়। এই মেয়েটাকে গছাবার জন্য ও অনেক দিন ধরে চেষ্টা করছে। আমার এক বন্ধুর জন্য প্রস্তাব দিয়েছিল। খোঁজ নিয়ে দেখি মেয়েটার মাথায় গন্ডগোল। এর আগে বিয়ে হয়েছিল। বর তাড়িয়ে দিয়েছে।

বিপদসীমা পেরিয়ে যাওয়া নদীর জলের মতো প্রসূনের সমস্যার স্রোত। মাঝে মধ্যে মনে হয় একটা মাথায় এত সমস্যা ধরে রাখা অসম্ভব। মাথার খুলি চৌচির হয়ে ফেটে যাওয়া ফোড়ার পুঁজের মতো বেরিয়ে আসবে ঘিলু। বাড়িতে থাকলে আত্মঘাতী ছোটভাইয়ের ভৌতিক উপস্থিতি। অফিসে এলে বিয়ের বাজারে বাতিল হয়ে যাওয়া মেয়েদের দেখতে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি। রাতে ঘুমের মধ্যে ও স্বপ্নে দেখে মহাকাশের তারাদের স্তিমিত আলোয় আলোকিত ঘরবাড়ি-গাছপালা-ইতর কিংবা উন্নত প্রাণীবিহীন আকাশঘেরা এক বিস্তীর্ণ চরাচর। ও শুনতে পায় কেবল বায়ুপ্রবাহের শব্দ এবং অরুণের আর্তনাদ : ‘আমার নিষ্পাপ মেয়েটাকে তুই রক্ষা কর দাদা!’

আকাশ থেকে ঝরে পড়া কথাগুলো মাটিতে ধাক্কা খেয়ে আবার আকাশে ফিরে যায়। অফিসের কাজে মন বসে না, এদিক-ওদিক তাকায়। কেউ কাগজ ছিঁড়লে ওর আতঙ্ক, কারোর সিগারেট শেষ হয়ে এলে ওর ভয়, কারোর টিফিন খাওয়া শেষ হলেও আড়াল খোঁজে। মনে হয়, যা কিছু বাতিল সবই বুঝি ছোড়া হবে ওর দিকে। বাথরুমে গিয়ে বারবার ময়লা ফেলার পাত্রটা দেখে। ভাবে, এত কম আবর্জনা কেন? আয়নায় নিজের বুক, পিঠ, মাথা দেখতে দেখতে অফিসের অনেকটা সময় কেটে যায়। একটা মাছিও জামায় বসলে ভাবে, কে ফেলল এত ময়লা আমার গায়ে? পচা দুর্গন্ধে গা গোলায়। সবসময়ে রুমাল দিয়ে নাক চাপা। সারাদিন ধরে সহকর্মীরা কত যে আবর্জনা ছোড়ে ওর দিকে! অফিস থেকে বেরুবার সময় সন্তর্পণে পা ঘষে ঘষে এগোয়। বড় ভয়, কেউ না বাথরুমের ময়লা ফেলার পাত্রটা ওর মাথায় চাপিয়ে বলে, এই নাও প্রসূন, এটা তোমার জন্য। 

অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা রাখলে মাথাটা হালকা হয়। প্রসূন বোঝে ও আবার স্বাভাবিক হাঁটছে, লেফট, রাইট, লেফট…। তখন ওর বড় স্বস্তি, খুব আনন্দ। ওদের অফিসের চারপাশে এখন মায়াবী আলো। ল্যাম্পপোস্ট থেকে সোডিয়াম ভ্যাপারের আলো বাতাসের ধোঁয়া ও ধুলোয় ধাক্কা খেতে খেতে রাস্তায় নামে। এদিক-ওদিক বেড়ে ওঠা বনদপ্তরের গাছ। গাছের ডালপালা ছায়া হয়ে নেমে আসে রাস্তায়। ট্রাম বাস ধরার তাড়া নেই। কোনো একসময় গেলেই হলো। কোনোদিন ফুচকা খায় কিংবা শুকনো ঘুগনি, নাহলে কৌটো ঝাঁকিয়ে তৈরি করা দুটাকার ঝালমুড়ি। তারপর সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান। এই রকমই সিগারেট ধরিয়ে লম্বা সুখী টান দিচ্ছিল প্রসূন। একটা ট্যাক্সি গা-ঘেঁষে দাঁড়ায়। বন্ধ দরজার জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ড্রাইভার জানতে চায়, যাবেন?

 লেফট, রাইট, লেফট। গট গট করে এগিয়ে সশব্দে দরজা বন্ধ করে ট্যাক্সিতে উঠল প্রসূন। মিটার ডাউন করার পর ড্রাইভার জানতে চায়, কোথায়?

প্রসূন ভাবছিল, উঠে তো পড়লাম। কিন্তু যাবো কোথায়? বাড়ি? সেখানে এক ভৌতিক বিভীষিকা অপেক্ষা করে আছে। আত্মঘাতী ভাইয়ের স্মৃতির সঙ্গে সহবাস কতদিন আর সম্ভব? বাড়ি যাবো না। ভালো হয় সারারাত ট্যাক্সিটা নিয়ে ঘোরাঘুরির পর কাল সকালে অফিসে ফিরে আসব। কিন্তু অফিস এলেই আবার সহকর্মীদের ইতরামির খোরাক হওয়া। নাঃ! এত আবর্জনার চাপ ও দুর্গন্ধ সহ্য করা অসম্ভব। 

ট্যাক্সি-ড্রাইভার আবার বলে, কী হলো দাদা, কোথায় যাবেন? নাকি সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, গ্রে স্ট্রিটের প্যাসেঞ্জার তুলব? শেয়ারে চলুন। আপনার খরচা কম, আমার লাভ একটু বেশি।

একটু দূরে অন্ধকারে কেউ দেয়াশলাই জ্বালাল সিগারেট ধরাবার জন্য। কলকাতাতেই ওর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। দেয়াশলাইয়ের ক্ষণস্থায়ী আলোতে প্রসূন সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর আদি-মধ্য-অন্ত দেখতে পায়। বলল, শেয়ারে সব কাজ হয় না। আমি একাই যাবো। চলো সোনাগাছি।

তাই বলুন। কোন বাড়ি? লাল কমল? নীলকমল? গীতাঞ্জলি? বাংলাদেশী না মাড়োয়ারি বিল্ডিং?

একটা নিষ্পাপ মেয়েকে খুঁজে বের করতে হবে। মনে হচ্ছে জায়গাটা তোমার চেনা। আমাকে সাহায্য করলে ভালোই বখশিস দেবো।

খানিকটা কেঁপে ট্যাক্সিটা চলা শুরু করল। ড্রাইভার খুব উৎসাহে বলছে, ওখানকার মাসি, পিসি, বাড়িওলা, বাড়িওলি, দালাল, মাস্তান, মাগি Ñ সব আমার চেনা। ওখানে নিষ্পাপ কেউ নেই দাদা। ও টুপি পরবেন না! আপনাদের চাকরিতে যেমন ট্রান্সফার, ওখানেও সে-রকম হয়। এ-বাড়ির মাগিকে ও-বাড়িতে পাঠিয়ে বলে নতুন এসেছে। নথ ভাঙতে দশ হাজার লাগবে।

প্রসূন বলল, আগে তো মেয়েটাকে খুঁজে পাই। 

ড্রাইভার বলছে, দাদা! একটা আবদার করছি। সামনেই রিপাবলিকান স্টোরস। একটা জিনের পাঁইট কিনুন। মিনারেল ওয়াটারের বোতলে পাইল করে দাদা ভাই খেতে খেতে যাই। পেটে জাদু-টোনা না থাকলে মাগিপাড়ার গন্ধটা আমি সহ্য করতে পারি না। 

প্রসূন একটা একশ টাকার নোট বের করে বলল, এতে হবে?

মাকড়সার পা ফেলার মতো হাত বাড়িয়ে ড্রাইভার বলে, আরো পঞ্চাশ দিন। মিনারেল ওয়াটার, চাট, এসবও কিনতে হবে। মেয়েছেলের কাছে যাবেন, টাকা চাপলে চলে? একবার ঘরে ঢুকলে দেখবেন আপনার নিষ্পাপ মাগির কত বাহানা। পাঁচশ টাকার রফা হলে একশ টাকা বাড়তি খরচ। না দিলে কাজ করে মজাই পাবেন না।

প্রসূন আরো দেড়শ টাকা বের করে ড্রাইভারটার মাকড়সার মতো হাতে খুঁজে দেবার সময় বলল, নামছ যখন একটা বেবি ফুডও কিনে এনো।খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আরোহীর মুখটা দেখে ড্রাইভারটা মুখ ফস্কে বলে ফেলল, শালা পাগল!

Published :


Comments

Leave a Reply