সমরেশ মজুমদার
-
নিবেদন
কয়েকবছর আগে কোলকাতা থেকে কয়েকজন লেখক, প্রকাশক ঢাকায় গিয়েছিলাম। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। উনি যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন তখন ওঁর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। জেনেছিলাম, বাংলা সাহিত্যের খবরাখবর উনি ভালো রাখেন। সেবার আমাদের ঢাকায় যাওয়ার একটিই উদ্দেশ্য ছিল। কোলকাতায় আমাদের নতুন বই বের হতেই তিনদিনের মধ্যে সেগুলোর পাইরেট এডিশন ঢাকা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম সেগুলোতে ঢাকার বাংলাবাজারের বেনামি ঠিকানা ছাপা হতো। পরে সেটি বদলে গেল। কোলকাতার বইয়ের হুবহু ছাপতে লাগলেন পাইরেটরা। এমনকি কোলকাতায় প্রকাশকদের নাম-ঠিকানাও। একই বই একাধিক পাইরেট ছাপছেন। সেসব বই নিয়ে তাঁরা চলে যেতেন বিভিন্ন জেলার দোকানে। আইনসংগত বই জেলার দোকানদার যখন শতকরা চল্লিশ শতাংশ কমিশনে পেতেন তখন পাইরেটরা ষাট শতাংশ কমিশন তাঁদের বাকিতে দিয়ে আসতেন। একই বই নিয়ে চার-পাঁচজন পাইরেট একই দোকানদারের কাছে যেতেন। দোকানদার অবস্থা বুঝে একষট্টি, বাষট্টি শতাংশ কমিশন আদায় করে বই নিতেন। সেই বইয়ের দাম মাসখানেক বাদে পাইরেটরা পেতেন। যেহেতু লেখককে কিছু দেওয়ার দায় নেই, বিজ্ঞাপনের খরচ নেই, একবার ফিল্ম করিয়ে নিলে আবার কম্পোজের জন্যে পয়সা লাগছে না, তাই ওই কমিশন দেওয়ার পরও পাইরেটদের লাভ হয়। ফলে ন্যায্য দামে আইনসংগতভাবে ভারত থেকে নিয়ে আসা বই বিক্রি বন্ধ হয়ে গেল। তার ওপর আরও একটি সমস্যা তৈরি হতো। ধরা যাক, আমার কোনো লেখা কোলকাতা বা ঢাকার কাগজে ছাপা হয়েছে, বই হবার আগে আমি পরিমার্জনা করব বলে ঠিক করেছি, দেখলাম সেটি পাইরেটরা ছেপে ফেলেছেন। তখনও আমি ঠিক করিনি কোলকাতার কোন প্রকাশককে বইটা ছাপতে দেবো। ওঁরা নিজেদের পছন্দমতো কোলকাতার কোনো প্রকাশকের নাম-ঠিকানা ছেপেছেন, এমনকি উৎসর্গও করে দিয়েছেন আমার হয়ে এমন কাউকে যাকে আমি চিনি না। প্রচ্ছদও ওঁদের শিল্পীদের দিয়ে আঁকানো। প্রথম যিনি এই কাণ্ডটি করতেন তাঁকে অনুসরণ করতেন অন্য পাইরেটরা। তারপর কলকাতা থেকে যখন আসল বইটি বের হলো তখন সেগুলোই পাইরেটরা ছাপতেন। অর্থাৎ একই বইয়ের দুরকম প্রচ্ছদ ওঁদের কল্যাণে দেখা গেল। ইতিমধ্যে ঢাকার একটি দৈনিক সমীক্ষা করে খবর ছাপলো, আমার গর্ভধারিণী উপন্যাস নাকি পাইরেটরা এক লাখ কপি বিক্রি করেছেন। এ-ও মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম, উপন্যাসের অনেক পাতা না ছেপে তার সারাংশ নিজেরাই লিখে ছেপে ওঁরা খরচ বাঁচাচ্ছেন, তখন মনে হলো এর প্রতিবাদ করা দরকার। যেহেতু বাংলাদেশ সরকার বার্ন কনভেনশনে সই করেনি এবং আমাদের ক্ষেত্রে ঢাকায় গিয়ে মামলা করা সম্ভব নয়, তাই ঠিক করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করব, ওই কুকর্ম বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে। কলকাতা থেকেই ওঁর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চেয়েছিলাম, পেয়েছিলামও। দলে ছিলেন প্রখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আমি, আনন্দ পাবলিশার্সের বাদল বসু এবং মিত্র ও ঘোষের সবিতেন্দ্রনাথ রায়। দুপুর তিনটের সময় আমরা সংসদ ভবনে পৌঁছালাম। আগে থেকেই জানানো ছিল বলে ঠিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পৌঁছাতে অসুবিধে হয়নি। তখন সংসদ চলছিল। এবং তার মধ্যেই সময় বের করে প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন। আমরা মূল বই এবং তার পাইরেটেড কপি তাঁর টেবিলে রেখে বক্তব্য জানালাম। উনি হেসে সেক্রেটারিকে বললেন, বইগুলো আলাদা না রেখে মিশিয়ে দিতে। তারপর বললেন, ‘আপনারা বললেন, হুবহু নকল করছে পাইরেটরা, কিন্তু আমি বলে দিতে পারি কোনটা নকল কোনটা আসল।’ তারপর কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে দুটো বই তুলে ধরে বললেন, ‘এটা আসল, এটা নকল।’ আমরা জানালাম উনি ঠিক বলেছেন। উনি হাসলেন, ‘তাহলে বলুন, বাঙালি আর কিছু না পারুক, নকল করতে সেরা।’ এটা প্রশংসা না নিন্দা, আমরা বোঝার চেষ্টা করলাম। সুনীলদা অনুরোধ করলেন, যদি এটা বন্ধ করা যায় তার ব্যবস্থা নিতে। উনি সেক্রেটারিকে বললেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যাপারটা জানান।’ এইসময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘরে ঢুকে অভিমানী গলায় প্রধানমন্ত্রীকে জানালেন, গতকাল তিনি সংসদে যে-বক্তৃতা দিয়েছেন তার অংশবিশেষ বিটিভি দেখিয়েছে, ফলে মানুষ তাঁর বক্তব্য বুঝতে পারেনি। ওঁদের এই আলোচনার সময় আমাদের থাকা উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী আমাদের বললেন, একবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে গিয়ে শুনলাম তিনি ঘরে নেই। একজন আমলা জানালেন, ‘ব্যাপারটা খুবই অন্যায়, তবে কি জানেন, আমাদের অনেক বৈদেশিক মুদ্রা বেঁচে যাচ্ছে। যেহেতু পাইরেটদের জন্যে বাজারে বই পাওয়া যাচ্ছে – তাই আর ডলার দিয়ে বই আমদানি করতে হচ্ছে না। তবু বলব, ব্যাপারটা খুব খারাপ।’ আমরা গেস্টহাউসে ফিরে এলাম হতাশ হয়ে। বুঝলাম, এতে কোনো লাভ হলো না। আমরা যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি, তা বিটিভি প্রচার করেছিল। সন্ধের পর এক ভদ্রলোক এলেন আমার কাছে। বললেন, ‘প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জনাব এরশাদ আমাদের সঙ্গে ওই বিষয়ে কথা বলতে চান।’ এই কারণে তিনি আমাদের আগামীকাল সকালে নাস্তার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমি বললাম, ‘এ-তো ভালো কথা। কিন্তু সবাইকে জানাই,…
