স্বকৃত নোমান
-

নিথুয়া মংমা
আসুন, জ্যৈষ্ঠের এই বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় আমরা নিথুয়া মংমার গল্প শুনি। গল্পটি শুধু নিথুয়া মংমার নয়, সুশাং নকরেকেরও। এক বাসন্তী জ্যোৎস্নার রাতে, যখন শিমুল ফুলের মনমাতানো ঘ্রাণ আসছিল জানালাপথে, সুশাংয়ের মনে পড়ে গিয়েছিল নিথুয়া মংমার কথা। বহুদিন আগে, এমনই এক বাসন্তী জ্যোৎস্নার রাতে, নিথুয়া মংমাকে সুশাং দেখতে পেয়েছিল শিমুলতলায় – আহত, রক্তাক্ত দশায়। সুশাং বুঝতে পারছিল না এই হাতি সেই হাতি কি না, যে এসেছিল মেঘালয়ের দুর্গম পাহাড় থেকে। একা নয়, পালের সঙ্গে। পাহাড় থেকে কোনো হাতি কখনো একা আসে না, আসে পালে পালে। কোনো পালে থাকে আটটি, কোনো পালে তেরোটি, আর কোনো পালে কুড়ি-পঁচিশটি। এসে ধান খেয়ে যায়, ফলফলাদি খেয়ে যায়, গাছগাছড়া ঘরদোর তছনছ করে দিয়ে যায়, এমনকি মানুষকেও হতাহত করে। সেবার যে-পালটি এসেছিল, তারা লিয়াং রিছিলের বাড়িতে হানা দিয়ে ধান-চাল সব সাবাড় করে, হাঁড়ি-পাতিল কাঁথা-বালিশ চেয়ার-টেবিল সব ছিত্তিসান করে রাতারাতি আবার ফিরে গিয়েছিল। শুধু ফিরতে পারেনি একটি একদন্তী হাতি। দলছুট হয়ে ঢুকে পড়েছিল বালিজুরি বাজারে। গজারিবনের ভেতর দিয়ে জিন্দাপীরের টং হয়ে চলে গিয়েছিল নকশিবাজার। বাঙালিদের ধাওয়া খেয়ে আবার ঢুকে পড়েছিল গজারিবনে। বনপথ ধরে চলে যেতে পারত উত্তরের পাহাড়ে তার স্বজনদের কাছে, যদি না ফের আচিকদের ধাওয়া খেত। ধাওয়া খেয়ে উঠে পড়েছিল গজনী-ঝিনাইগাতী সড়কে। এবার শুধু ধাওয়াই খেল না, শিকার হলো নৃশংস হামলারও। লাঠিসোটা-ধামা-যাত্থা-বল্লম নিয়ে মানুষ হামলা চালায় তার ওপর। খবর পেয়ে যাত্থাটা নিয়ে সুশাং নকরেকও ছুটে গিয়েছিল। ততক্ষণে আহত হাতিটা ঢুকে পড়েছিল শালবনের গহিনে। সন্ধ্যায় হাটে গিয়েছিল সুশাং। ফিরতে ফিরতে রাত। আটটা-নটা হবে বুঝি। তার পা ধরে আসছিল। সারাদিন হাতির পিছে ছুটতে ছুটতে জিরানোর সময় পায়নি। ভেবেছিল খেয়েই শুয়ে পড়বে। বাড়ির ঘাটায় শিমুলগাছটার কাছাকাছি এসে দেখে রাস্তার ওপর পড়ে আছে মস্ত এক গাছের গুঁড়ি। সুশাং ভেবে পাচ্ছিল না গুঁড়িটা কে এনে রাখল এখানে! কয়েক পা এগিয়ে তার ভ্রম ভাঙে। না, গাছের গুঁড়িটুড়ি কিছু নয়, যেন তেরপলে ঢাকা বালির স্তূপ। কী কাণ্ড! রাস্তার ওপর এভাবে কেউ বালি রাখে! সুশাং আরো কয়েক পা এগোয়। আবারো তার ভ্রম ভাঙে। এবার মনে হয়, তেরপলে ঢাকা বালি নয়, যেন কালো মাটির একটা টিলা গজিয়েছে। তার ধন্দ লাগে। সে কি পথ ভুল করে ফেলল! বাড়ির পথে না গিয়ে অন্য কোনো পথে চলে এলো! এই ভরা পূর্ণিমায় কোনো দেও-দানো কি তার পথ ভুলিয়ে দিলো! কিন্তু এই যে শিমুলগাছ। হ্যাঁ, শিমুলগাছই তো। এই গাছ তো তারই বাড়ির গাছ। ওই যে দেখা যাচ্ছে উঠানের কোনায় খড়ের গাদা। এ তো তারই বাড়ির গাদা। ভয়ে ভয়ে সুশাং আরো কয়েক পা এগোয়। এবার সে আঁতকে ওঠে। গুঁড়ি নয়, তেরপলে ঢাকা বালি নয়, এমনকি টিলাও নয় – গোটা রাস্তা দখল করে শুয়ে আছে মস্ত এক হাতি! মৃত অজগরের মতো শুঁড়টা পড়ে আছে শেকড়ে। নকগুবা নকগুবা! আতঙ্কে সুশাংয়ের কলিজা শুকিয়ে যায়। সে চিক্কুর দিতে চেয়েছিল, চিক্কুর দিয়ে মান্দি জড়ো করতে চেয়েছিল, অথচ গলাটা এতটাই কাঠ হয়ে গিয়েছিল যে, কোনো স্বরই বেরোচ্ছিল না। সদাইয়ের থলেটা নিয়ে সে গাদার বাঁশের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। ক্রমে তার ভয় কেটে যায়। তার বদলে জ¦লে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। যেন সেই পুরনো আগুনে কেউ তুষ মেরে দিয়েছে। আগুনটা নেভানোর উপায় খোঁজে সুশাং। ঘরে গিয়ে মংরেংটা নিয়ে আসার কথা ভাবে। এই সুযোগ সুশাং, এই সুযোগ। ধারালো মংরেংয়ের এক কোপে দ্বিখণ্ডিত করে দাও তোমার শত্রুর শুঁড়। শত্রু, কেননা হাতি তার পুত্রহন্তা। মাত্র সাত বছর বয়সে তার বেটা সীমন নকরেক নিহত হয়েছিল বুনো হাতির আক্রমণে। বৈশাখ মাস ছিল তখন। সূর্যদেবতা মিসি সালজং নেমে এসেছিলেন শিলংচূড়ায়। তার তেজে ঘামছিল জগৎ-সংসার। পুবের ছড়ায় পাড়ার ছেলেপিলেদের সঙ্গে হুটোপুটি করছিল সীমন। হঠাৎ মংমা মংমা বলে শোর করে ওঠে সবাই। মূর্ছা খেতে খেতে নেংটা-মোংটা সবাই ছুট দেয়, শুধু সীমন ছাড়া। হাঁটুজলে সে দাঁড়িয়ে থাকে একা। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে বাঁকা দাঁতের বিশাল মংমাটির শুঁড়ের দিকে। এতদিন সে মংমার কথা শুনেছে, কিন্তু কখনো দেখেনি। কল্পনায় মংমার যে-ছবি এঁকেছিল, বাস্তবে মংমা তার চেয়েও বিশাল। সেই বিশালতা হরণ করে নিয়েছিল তার বুদ্ধি। তার মনে হচ্ছিল, আকাশ থেকে মংমার রূপ ধরে নেমে এসেছে রাক্ষস নাওয়াং কিংবা শক্তিদেবতা গোয়েরা। খানিক পর,…
