কাঠগড়ায় কদম আলি

লেখক:

Kath gorai Kadam ali

হাসনাত আবদুল হাই

ঘরভর্তি লোক, দাঁড়াবার জায়গা নেই, এত মানুষের ভিড়, তার মধ্যেই গায়ে গা লাগিয়ে, ঠেসাঠেসি করে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে লোকজন, ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে যেতে পারত অনেকেই, কিন্তু শরীরের সঙ্গে প্রায় লেপ্টে থাকায় কেউ পড়ছে না, বেশ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন একে অন্যকে ধরে আছে দুহাত দিয়ে, বুক আর পিঠ লাগিয়ে। এমন ঘরে কখনো আসেনি কদম আলি। সে বেশ হতভম্বের মতো হয়ে গিয়েছে, মুখে কথা নেই, কোনো সাড়াও বের হচ্ছে না। শুধু জোরে-জোরে নিশ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। আরো অনেকেই জোরে-জোরে নিশ্বাস ফেলছে। যেন হাঁফাচ্ছে সবাই। খুব মেন্নত করলে যেমন হয়। ঘামে গায়ের জামা-কাপড় লেপ্টে আছে, ঘামের ঝাঁঝালো গন্ধে ঘর ভরে যাচ্ছে। একটা ফ্যান ঘুরছে ঘড়ঘড় শব্দ করে, গরম বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে ঘরের চারকোনায়, ধুলো উড়ছে পাতলা ময়দার মতো। নানারকমের শব্দ হচ্ছে ঘরটায়, মুখের কথা, গলার কাশি, পায়ের জুতোর ঘসটানি। বেশ একটা কান বুজিয়ে দেওয়া ঝড়ো হাওয়ার মতো কোলাহল। উত্তেজিত, অধৈর্য, ক্রুদ্ধ, মারমুখী, হতাশ, বেপরোয়া, বিস্ফোরক সব ধরনের শব্দ মিশে তৈরি একটা শব্দের বোমা।

হঠাৎ শব্দটা মিইয়ে আসে, কোলাহলের গলা কেউ চেপে ধরে। অস্ফুটে ঘড়ঘড় শব্দ বের হয়। একটু পর স্পষ্ট স্বরে কেউ হাঁক দিয়ে কথা বলে। সবাইকে সতর্ক করে দেয় প্রায় হুঙ্কায় দিয়ে। সিলিং ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দ জোরে-জোরে বাজে। কদম আলি ঘরভর্তি মানুষ দেখে। লম্বা ঢোলা কালো পোশাকই বেশি। চকচক করে কালো পোশাকের পিঠ। হাতের কালো কাপড় ঝিলিক দিয়ে ওঠে শূন্যে ঝুলে থাকা ইলেকট্রিক বাল্বের আলোয়। মুখের, গলায় বসে সেই কাপড় চকচক করে।  কালো পোশাকের মানুষগুলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঠেলাঠেলি হয়, ধাক্কা লাগে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। কাপড়ে ঘষা খেয়ে সরাৎ-সরাৎ শব্দ হয়। চাপাস্বরে।  উত্তেজিত হয়ে কথা বলে কেউ-কেউ। জমাটবাঁধা মানুষের শরীরগুলো এবার সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। জায়গা করে নিয়ে এগোতে চায়।

অনেকক্ষণ পর, কতক্ষণ মনে নেই, কদম আলির ডাক আসে। তার নাম ধরে ডাকে একজন। প্রথমটায় চমকে ওঠে সে। এতগুলো লোকের সামনে,

অনেক মানুষের ভিড়ে তার নাম ডাকার জন্য সে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করে। তখন নিজেকে খুব সাধারণ একজন বলে মনে হয় না। সে বেশ ধীরে-সুস্থে সামনে এগিয়ে যায়। চৌকোনা কাঠের খোপের ভেতর দাঁড়ায়। কোমর পর্যন্ত কাঠের নিচের ভেতর থাকে, ওপরটা খোলা। সে তার দুহাত লম্বা করে রাখা কাঠের ওপর রাখে। বেশ পুরনো কাঠ,  রংচটা, মানুষের হাত লেগে চকচক করছে। কাঠ না, নরম কিছু মনে হচ্ছে। কদম আলিকে যা বলা হয় সে তাই বলে। যাহা বলিব সত্য বলিব। এই কথা সে তিনবার বলে। তারপর তাকে বলা হয়, তুমি কী অপরাধ করেছো তা জানো?

জি।

এই অপরাধ শাসিত্মযোগ্য তা তুমি জানো?

জি।

সেদিন আর কোনো কথা হয় না। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কদম আলি চারদিকে তাকায়। দু-একজন তার দিকে তাকাচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু তাতে সে হতাশ হয় না। মন খারাপ করে না একটুও। তার যা বলার সে বলতে পেরেছে। এতেই সে খুশি। কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় সে কিছুক্ষণ চারদিক দেখে। ঘরভর্তি কালো পোশাকের মানুষ ব্যস্ত হয়ে নড়ছে, চড়ছে। সে তাদের দিকে হাসিমুখে তাকায়। তার দিকে বেশিক্ষণ তাকানোর কারো সময় নেই। তাতে তার কিছু আসে-যায় না। সে তার কথা বলতে পেরেছে। একটু পর তার কোমরের দড়িতে টান পড়ে। সে কাঠগড়া থেকে নেমে আসে। একটু খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটে, মুখের চোয়ালের ব্যথাটা চনমন করে ওঠে। যে-লোকটা দড়ি টানছিল সে হাঁক দিয়ে বলে, এই ব্যাটা জোরে পা চালা। এখানেই দিন কাবাড় করবি নাকি? বলে সে তার হাঁটুতে একটা লাথি মেরে বারান্দায় যায়। সেখানে ভিড় একটু কম। কদম আলি খাকি লেবাসপরা লোকটাকে দেখে। দয়ামায়াহীন, কাঠখোট্টা মানুষ। সে তার দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসে। লোকটা তার হাসি দেখে খেঁকিয়ে ওঠে। আরেকটা লাথি মারার জন্য পা তোলে। তুলুক। এই একদিনে হাত-পায়ের মার খাওয়া তার গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। সে পেটে হাত দেয় একবার, কারো চোখে না পড়ে সেইভাবে। পেটে হাতের স্পর্শ তাকে আরাম দেয়। সে বড় সুখ বোধ করে। পেটটা এখনো ভরা।

 

এক

বড় ছেলে কদিন রেখেছিল তার সংসারে। তারপর টাকা-পয়সা শেষ হয়ে গেলে বলেছিল, যাও। পথ দেখো গিয়া। আমি তোমারে বহায়া-বহায়া খাওয়াইতে পারুম না।

শুনে কদম আলি চোখে অন্ধকার দেখে। ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, আমি তোর বাপ। এই বুড়া বয়সে কই যামু?

কই যাইবা সে তুমিই তা জানো। আমার এহানে থাকতে পারবা না। দেখছো তো আমার অবস্থা। নিজেরই চলে না।

আমার সব টাকা দিলাম। অফিস থেকে যা পালাম সবই দিলাম তোরে। তুই ব্যবসা করবি কইলি। তার কী হইলো?

কিছু হইলো না। ব্যবসা ফেইল। লোকসান। তোমার টাকা কোনো কাজে লাগলো না। ব্যবসা কী সোজা কথা। অ্যাহন পথ দেহো।

কই যামু বাপ?

সে তুমিই জানো। আমার এহানে জায়গা নাই। বুঝলা। তারপর বললো, মমিনার বাড়ি যাও। সে থাকবার দিতেও পারে।

মাইয়ার কাছে যামু? এইডা কেমুন দেখাইবো বাপ?

ঠেলায় পড়লে সবই ঠিক দেখাইবো। বড় ছেলে বলে। যাও সেহানে। দেহ কী কয়? না হইলে কালুর বাড়ি যাও।

কালু তার ছোট ছেলে। দুই বউ নিয়ে থাকে। কদম আলি বলে, তার বড় সংসার। এমনিতেই চলে না। আমারে থাকতে দিবো ক্যামনে?

গিয়াই দেহো না। আগে থাকতেই এসব কইয়া কাম কী? যাও, বেলা থাকতি বার হইয়া পড়ো। বড় ছেলে তাকে প্রায় ঠেলে বার করে দেয়।

মমিনার বাড়ি যায় কদম আলি। থাকার কথা বলতে বেশ লজ্জা পায়। বগলে কাপড়ের পুঁটলিটা ঠেসে ধরে বলে, তোরে দেখতে আইলাম। কেমন আছিস মা?

মমিনা কাছে এসে পা ধরে সালাম করে। তারপর বলে, কদিন থাহো। বেড়ায়া যাও। কতদিন পর আইছো। বুড়া হইয়া গেছো একেবারে।

কদম আলি মুখের খোঁচা-খোঁচা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলে, হ্যাঁ বুড়া হইয়া গেছি। পঁয়ত্রিশ বছর চাকরি করলাম। কম সময় তো না।

মমিনা বলে, কী করবা অ্যাহন, কোথায় থাকবা ঠিক করছো?

শুনে চমকে যাবার মতো হয় কদম আলির। তারপর হেসে বলে, কিছু ঠিক করি নাই। তোদের দেইখা যাই। তারপর দেখা যাইবো কী করি। নাতি-নাতনিদের ডাক। দেহি তাদের। কতদিন পর আইলাম।

রাতের বেলা মমিনার স্বামী বলে, কতদিন থাকবো কইছে কিছু বুড়া?

কয়েকদিন থাকবো। দেখতে আইছে।

হ। দেহো কয়দিন য্যান কয় মাসে গিয়া না ঠেকে।

মমিনা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলে, আমার বাপ হেই রকমের মানুষ না। কারো বোঝা হইয়া থাকবো না।

মেয়ের বাড়ি থাকতেই কদম আলির অফিসের স্যারের কথা মনে পড়ে। সে ওই স্যারের পিয়ন ছিল অনেক দিন। তিনি রিটায়ারে যান তার তিন বছর আগে। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, কদম আলি, এই নাও আমার ঠিকানা। দরকার পড়লে এসো।

ঠিকানা নিয়ে শহরে স্যারের বাড়ি খুঁজে বার করে কদম আলি। যে-লোকটা দরজা খুলে সামনে দাঁড়ায় তাকে দেখে চিনতে পারে না সে। দারুণ বাজখাই চেহারা। হেঁড়ে গলায় জিজ্ঞেস করেন, কী চাই?

কদম আলি হাতের কাগজটা দেখিয়ে বলে, স্যার দিছিলেন। তিনি নাই?

লোকটা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কাগজটা দেখে নিয়ে বলে, না নাই।

কোথায় গেলেন? এইটা তো তার ঠিকানা। আমি আগে একবার আইছিলাম।

লোকটা এবার রেগে যায়। ক্রুদ্ধস্বরে বলে, বললাম এখানে নাই, তারপরও কথা বলছো। তুমি তো বেশ বেয়াড়া লোক দেখছি। এত কথা বলার সময় আছে নাকি আমার? অ্যা?

তখন ভেতর থেকে এক মহিলার গলার স্বর শোনা যায়। কার সঙ্গে কথা বলছো?

লোকটা ভেতরের দিকে না তাকিয়ে বলে, আর বলো না। সাতসকালে এসে বিরক্ত করছে।

কে? কী চায়? বলতে-বলতে মহিলা দরজার কাছে এসে দাঁড়ান। তাকে দেখে কদম আলির মুখ হাসিতে ভরে যায়, যেন তার পা মাটিতে দাঁড়াবার জায়গা পায়। সে বেশ উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে, খালাম্মা আমাকে চিনছেন? আমি কদম আলি। স্যারের পিয়ন ছিলাম। তিনি আইতে কইছিলেন।

তার কথা শুনে মহিলার মুখ কালো হয়ে যায়। তিনি শুকনো গলায় বলেন, এ-বাড়িতে ওই নামে কেউ থাকে না। তুমি ভুল ঠিকানায় এসেছো। বলে তিনি দরজা বন্ধ করে দেন।

কদম আলি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে

অনেকক্ষণ থেকে দেখছিল পাশের পান-সিগারেটের দোকানের মালিক। সে দরজার সামনে থেকে সরে আসার পর ডাক দিলো। সব শুনে বলল, সে লম্বা কেচ্ছা। কেলেঙ্কারি কইতে পারো। ওই লোকটা তোমার স্যারের বউরে ভাগায়া বিয়ে করছে। অ্যাহন বউয়ের বাড়িতেই থাকে। বউ তোমার স্যারেরে দিয়া বাড়িটা লিখায়া নিছিল।  বজ্জাত মাইয়া মানুষ।

স্যারের ছেলেমেয়ে, হেরা কই? তারা কিছু কয় না? কদম আলির চোখের পলক পড়ে না।

পান দোকানের মালিক বলে, সব বিদেশ। কোনো খবর নেয় না।

আর স্যার? স্যার গেল কই?

পানের দোকানদার বলে, হুনছি বুড়াদের আশ্রমে থাহে। তেজকুনিপাড়া। খোঁজ নিয়া দেখতে পারো। বড় ভালা মানুষ ছিলেন। কোনোদিন কর্জ করেন নাই। এমুন মানুষটারে কষ্ট দিলো বউটা। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মানুষ চেনা ভার। দুর্দিনেই মানুষ চেনা যায়। নাও, একটা পান নিয়া যাও। একটা বনরুটি দিমু? মুখ দেইখা মনে হয় সকাল থিকা কিছু খাও নাই।  থাক-থাক। পয়সা দিতে হইবো না। কি কইলা নাম? কদম আলি। যাও কদম ভাই তেজকুনিপাড়ায় গিয়া খোঁজ করো।

 

দুই

ভাঙা, পলেস্তারা-ওঠা একতলা দালানের বারান্দায় বসে স্যার খবরের কাগজ পড়ছিলেন। তাকে দেখে প্রায় লাফ দিয়ে উঠলেন। উঠে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, কদম আলি। এই ঠিকানা বার করলা কেমন করে?

কদম আলি বলল, আপনার বাড়ির ঠিকানায় গেছিলাম। পাড়ার পান-সিগারেটের দোকানদার ঠিকানা দিলো। শুনে স্যার বললেন, হ। সবই তাহলে শুনেছো।

কদম আলি মাথা নেড়ে সায় দিলো।

স্যার বললেন, কপাল। বুঝলা কদম আলি, সবই কপাল। শেষ জীবনে এমন হবে তা কি ভাবতে পেরেছি? কদম আলি চারিদিকে তাকিয়ে বলে, এখানে কেমুন আছেন স্যার? কোনো অসুবিধা হয় না তো?

শুনে হঠাৎ উদাস হয়ে যান তার স্যার। বলেন, আছি এক রকম।  দিন কেটে যাচ্ছে। অন্য বোর্ডারদেরও কমবেশি আমার মতো অবস্থা। আত্মীয়-স্বজন দেখাশোনা করে না। শেষ জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কোনো রকমে চলছে। তারপর হাসিমুখে বলেন, আমাদের মধ্যে বেশ একটা ভাব হয়ে গিয়েছে। গল্পগুজব করে সময় কেটে যায়। শুধু অসুখ হলেই বিপদে পড়ি। তা তোমার কথা বলো দেখি। রিটায়ারের পর কী করছো? কোথায় থাকছো?

সব শুনে তিনি লজ্জায় পড়ে যান। তারপর বলেন, তোমাকে সাহায্য করি তেমন অবস্থা নেই আমার। দেখতেই পাচ্ছো নিজ চোখে। নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হলো। একা-একা থাকছি। পুরনো কানেকশন সব ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তোমাকে যে কারো কাছে পাঠাব তার উপায় নেই। তারপর কী ভেবে বললেন, এখানে একজন পিয়ন ছিল। বাপের অসুখের কথা শুনে গ্রামে গিয়েছে। সে যে পর্যন্ত না আসে তুমি তার জায়গায় কাজ করতে পারো। খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

কদম আলি সেই থেকে তেজকুনিপাড়ায় বৃদ্ধাশ্রমে পিয়নের কাজ করছে। রোজ সকালে চা-নাশতা দিয়ে স্যারকে খবরের কাগজ পড়তে দেয়। পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বলে, আজকের খবর কী স্যার? স্যার মুখ তুলে তাকান তার দিকে। কাগজে কী লিখছে?

স্যার বলেন, আজকের হেডলাইন খবর হলো জাপানে বড় রকমের ভূমিকম্প হয়েছে। অনেকে মারা গিয়েছে।

কদম আলি বলে, আমাদের দেশেও সেদিন হইয়া গেল। তবে মানুষ মরে নাই।

স্যার বলেন, খুব চিন্তার কথা। ঘন-ঘন ভূমিকম্প হচ্ছে। কবে যে কী হয়।

আরেকদিন সকালে কদম আলি বলে, আজ কাগজে কী লিখছে স্যার?

পহেলা বৈশাখের প্রস্ত্ততি নেওয়া হচ্ছে। ইলিশ মাছের দাম আকাশছোঁয়া। এক কেজি দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা।

এত দাম দিয়ে কারা কেনে? কদম আলি প্রশ্ন করে। স্যার বলেন, যাদের টাকা আছে। এদেশে অনেকের হাতে টাকা আছে কদম আলি। আরেকদিন সকালে নাশতা পরিবেশন শেষ করে কদম আলি এসে দাঁড়ায় স্যারের পাশে। জিজ্ঞেস করে, আজকের খবর কী স্যার?

স্যার বলেন, তাপপ্রবাহে শিশুদের অসুখ বাড়ছে। হাসপাতালে ভিড়।

কদম আলি বলে, হ্যাঁ স্যার কদিন থেইকা খুব গরম পড়ছে।

আজকের খবর কী স্যার?

আজকের খবর হলো নতুন জেলখানা উদ্বোধন হচ্ছে।

নতুন কেন? পুরানটার কী হইলো? কদম আলি প্রশ্ন করে।

পুরনোটায় জায়গা হচ্ছিল না। চার হাজার কয়েদির জায়গায় রাখা হচ্ছিল আট হাজারের ওপর। নতুনটায় আট হাজার বন্দি রাখা যাবে।

কারা যাইবো নতুনটায়?

যারা হাজতি-কয়েদি, যারা শাস্তি ভোগ করছে তারা।

কদম আলি খবরের কাগজে ছবি দেখে বলে, খুব নতুন বিল্ডিং দেখা যায়।

স্যার বলেন, হ্যাঁ। নতুনই তো। মাত্র শেষ হলো।

কদম আলি বলে, কয়েদিদের আর থাকনের কষ্ট হবে না। তাদের খাবারের কী ব্যবস্থা হবে?

স্যার অন্য খবর পড়ছিলেন। অন্যমনস্কের মতো বললেন, জেলে কাজ করাবে শাসিত্ম অনুযায়ী। কয়েদিরা ফ্রি খাওয়া পাবে।

কয়েকদিন পর পুরনো পিয়ন এসে গেল। স্যার কদম আলিকে ডেকে বললেন, তোমার তো আর এখানে থাকা-খাওয়া চলবে না। পুরনো লোক এসে গিয়েছে। কদম আলি মুখ কাঁচুমাচু করে বলে, স্যার, আমি কোথায় যামু?

আমি কী করে বলব, আমার তো জানাশোনা কেউ নেই। তুমি চেষ্টা করে দেখো। এরপর ভেবে বলেন, কিছুদিন এখানে থাকতে হয়তো পারবা। লুকিয়ে-লুকিয়ে। কিন্তু খেতে পারবে না। খাবার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে।

 

তিন

কারওয়ান বাজারে এক রেসেত্মারাঁর মালিকের সঙ্গে পরিচয় ছিল কদম আলির। সেখানে একটা কিছু কাজ পাওয়া যাবে, কাজ না পাওয়া গেলেও বাকিতে কিছুদিন খাওয়া যাবে ভেবে গেল সে সেখানে। তখন দুপুরবেলা। গিয়ে দেখে অনেক মানুষের ভিড়। হইচই। পুলিশ ঘোরাফেরা করছে। ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে কদম আলি দেখল রেসেত্মারাঁ, সবজির দোকান, পান-সিগারেটের দোকান, মস্ত বড় আড়ত, সব মেশিনের গাড়ি দিয়ে ভাঙা হচ্ছে। রাস্তায় গড়াগড়ি যাচ্ছে রুটি, ভাঙা ডিম, সবজি, সিগারেটের প্যাকেট, কাঠের তক্তা। মালিক যারা দুহাত তুলে মাফ চাইছে, মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধ করতে বলছে। ঘড়ঘড় শব্দে মেশিনের গাড়ি চলছে। লোকজন দাঁড়িয়ে দেখছে, টেলিভিশন থেকে ছবি তোলা হচ্ছে। খবরের কাগজের

লোক ছবি তুলছে, কাগজে ঝটপট লিখছে। কদম আলি রেসেত্মারাঁর মালিককে দেখে চিনতে পারল। সে হাউমাউ করে কাঁদছে। দেখে তারও কান্না পেল। শুনল লোকজন বলাবলি করছে, বেআইনিভাবে তৈরি দোকানপাট। তাই ভাঙা হচ্ছে। এখানে পাকা দালান উঠবে। কদম আলি হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকল। পুলিশ এসে ধমক দিয়ে সরে যেতে বলল। লোকজন যাচ্ছে না, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখছে। এমন কা- তো হরহামেশা হয় না। এত দিনের পুরনো দোকানপাট। হঠাৎ করে ভাঙা হবে তা কেউ ভাবতে পারেনি।

কদম আলি পাশের লোককে বলে, এরা অ্যাহন যাইব কই?

লোকটা তার দিকে না তাকিয়ে বলে, হ্যারাই জানে।

কদম আলি বলে, হ্যাদের নাকি অন্য জায়গা দেওয়া হইছে?

লোকটা বিরক্ত হয়ে বলে, কইতে পারি না।

কদম আলি রাস্তায় পড়ে থাকা ভাত, ডাল, মাছ, মাংসের তরকারি দেখে বলে, আহারে এত খাওয়া নষ্ট হইলো। কত লোকে খাইতে পারত।

শুনে পাশের লোকটা কিছু বলে না। মেশিনের গাড়িটা তাদের দিকে আসতে দেখে তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়ায়। বসিত্মর ছেলেরা উত্তেজিত হয়ে হইচই করে। তারা মেশিন গাড়ির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। গল্পে শোনা দৈত্যের মতো মনে হয়। সামনের অংশটা যখন ওঠে-নামে মনে হয় গিলে খাবে। অথবা তছনছ করে দেবে লোহার তৈরি হাত দিয়ে। দুপুরের গনগনে রোদে লোকজন ঘামে আর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দোকানপাট ভাঙার দৃশ্য দেখে।

 

চার

কদম আলি তার স্যারকে বলে, বাড়ি ছাইড়া আইলেন ক্যান? নিজের বাড়ি।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্যার বলেন, সে বড় লম্বা ইতিহাস। তুমি শুনে কী করবা?

কদম আলি বলে, নিজের বাড়ি থুইয়া এইহানে ভাঙা বাড়িতে পইড়া আছেন কেমুন দ্যাহায়। আমার খারাপ লাগতাছে।

হু। কদম আলি, সংসারটা অদ্ভুত জায়গা। বোঝা যায় না। এতদিনের বউ। পুরনো বন্ধু। তারাই যে শত্রম্ন হয়ে যাবে তা জানতে পারি নাই।

কিছুই টের পান নাই?

না। সরল মনে বিশ্বাস করেছি। নিজের স্ত্রী। পঁয়ত্রিশ বছরের বিয়ে করা বউ। তার মনে যে এমন ছিল কী করে বুঝব? বুঝতে দেয় নাই। আর বন্ধুটারেও চিনতে পারি নাই। মুখে এত মিষ্টি কথা। মনে হয়েছে আপনজন।

কদম আলি স্যারের পিঠ টিপতে-টিপতে বলে, আপনি বড় সরল।

হ্যাঁ। সরল। আর বোকা। এমন মানুষের সংসারে জায়গা নেই। বুঝলা কদম আলি।

 

পাঁচ

কদম আলির খুব খিদে পেয়েছে। কারওয়ানবাজারে দোকান-পাট ভাঙার পর সে খাবারের দোকানের খোঁজে হেঁটেছে। মনমতো কোনো দোকান চোখে পড়েনি। তার চেনা কমিরুদ্দির রেসেত্মারাঁ থাকলে এতক্ষণ বাকিতে খাওয়া হয়ে যেত। তার দেশের মানুষ। খাতির করেই খাওয়াতো সে। অফিসে চাকরির সময় সে তার একটা ছোটখাটো উপকার করেছিল। সে-কথা ভোলে নাই। কিন্তু সে এখন রাস্তার ফকির। নিজেই দুবেলা খাবে কী তার ঠিক নেই। ভাবতে-ভাবতে কদম আলি হাঁটতে থাকে। একটি গাড়ি এসে চাপা দিতে দিতে চলে যায়।

রাস্তার পাশে রেসেত্মারাঁটা দেখে সে থেমে যায়। মাঝারি আকারের। বেশ খদ্দের যাওয়া-আসা করছে। বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে ভাত-তরকারির বড়-বড় হাঁড়ি। ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। তিন-চারজন ছোকরা খাবারের থালা, বাটি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। দূর থেকেও তরকারির গন্ধ পাচ্ছে সে। গন্ধটা নাকে যেতেই তার ভেতরের খিদেটা বেড়ে গেল। সে ধীরপায়ে রেসেত্মারাঁর ভেতরে ঢুকল। তার চেহারা আর পোশাক দেখে মালিক বলল, কী চাই? তার স্বরে তাচ্ছিল্য। সে ভেতরে যেতে-যেতে বলল, ভাত খামু।

শুনে মালিক অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর একটা বেয়ারাকে ডেকে বলল, দ্যাখ তো কী চায়?

কদম আলি একটা খালি টেবিল দেখে বসল। হাতদুটো রাখল টেবিলের ওপর। শার্টের কোনা দিয়ে মুখের ঘাম মুছল। কাজের ছেলেটা কাছে এলে সে গম্ভীর স্বরে বলল, ভাত দে।

কী কইলা? মুখ সামলাইয়া কথা কও। ভাত দে। কথার কী ছিরি। চাকর পাইছো নাহি। ছেলেটা মুখ খিঁচিয়ে বলে।

কদম আলি শান্ত হয়ে বলে, ভাত দাও। ভাত খাব। ছেলেটা বলে, ভাতের লগে কী খাইবা?

কদম আলি কিছু না ভেবে মুখস্থের মতো বলে, ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, যা-যা আছে সব।

আররি বাবা। জবর ক্ষুধা নিয়া আইছো দেহি। লগে টাহা আছে তো?

কদম আলি বলে, যা কইলাম শুনছো তো? অ্যাহন প্যাঁচাল না পাইরা খাবার আনো। দেরি কইরো না। বুঝতেই পারছো জবর ক্ষেধা পাইছে। হু। যাও।

ছেলেটা অর্ডার দেওয়া সব খাবার নিয়ে আসে। কদম আলি চেটেপুটে খায়। অনেকেই তার খাওয়া দেখে। সে কারো তোয়াক্কা করে না। একমনে খেয়ে যায়।

ছেলেটা বিল নিয়ে এলে সে ঢেঁকুর তুলে বলে, টাকা নাই।

টাকা নাই? হালার পুতে কয় কী? হুনছেন ওস্তাদ? পেট পুইরা খাইয়া অ্যাহনে কয় টাহা নাই।

শুনে মালিকসহ বয়-বেয়ারা ছুটে আসে তার দিকে। সবাই মিলে বেধড়ক কিল-ঘুষি দিতে থাকে। মালিক দুই হাত দিয়ে বেঞ্চ থেকে টেনে তোলে তাকে। পুরনো জামা ফড়ফড় করে ছিঁড়ে ফেলে। তারপর চলতে থাকে কিল-ঘুষি, লাথি, থাপ্পড়। মার খেতে-খেতে কদম আলি মাটিতে পড়ে যায়। তার ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে। নাক দিয়েও রক্ত বেরিয়ে আসছে গলগল করে।

দোকানের খদ্দেররা খাবার বন্ধ করে কদম আলির মার-খাওয়া দেখতে থাকে। বাইরে থেকে লোকজন এসে জড়ো হয়। সবাই বলাবলি করে, চোর ধরা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশ আসে। কদম আলির তখন মুমূর্ষু অবস্থা। পায়ের শব্দ শুনে সে চোখ খোলে। পুলিশ দেখে তার মুখে হাসি ফোটে। এখন কোনো চিন্তা নেই কদম আলির। r

 

 

 

যদি

 

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

 

এক

জ্যোৎস্নার রাত্রি এখন নয়। ঘষা কাচের আকাশে যে আলোর আভাস তাতে রাত্রির সীমানা বোঝা যায় না। সাবধানী কেউ হয়তো ওই সময়কেই গভীর রাত্রি ভেবে পথ থেকে সরে যাবেন।

সুহৃদবর্গ আমাকে ওইরকম কথাই বলেছিলেন। ‘দ্যাখো কিছু বলা তো যায় না, রাত্রির রাস্তায় না-ইবা চলাফেরা করলে।’

আমি হেসে বলি, ‘দিনের রাস্তায়ই-কি হেঁটে বেড়ানোর সুবিধে খুব?’

‘না, তা নয়। তবুও দ্যাখো কোনোমতে দিনযাপনের কাজকর্ম সেরে এই যে এসে ঘরে ঢুকি আর বেরোই না। দরজাও বন্ধই থাকে।’

আমি বলি, ‘বন্ধ দরজা খোলা খুব কঠিন কাজ নয়, সে তো জানোই।’

তাঁদের মুখে আর কোনো কথা আসে না।

‘অপছন্দের কারো ঘরে ঢোকা যদি আটকাতে না-পারো তাহলে দরজা দিয়ে লাভ কী?’ বলে আমি না-আলো না-আঁধারের ওই পথে নেমে যাই।

কিছু যায়-আসে না।

দুই

বেঁচে থাকতেই হয়। আর সেজন্যে যা করা দরকার তা না-করলে চলবে কেন। আর তাই এক সময়ের উঁচু গলা নিচু করতেই হয়। কালি শুকানো কলমে যদি লেখা না-পড়ে, না-পড়ুক, নতুন কলম আর কেনা হয় না। এসব কথা খুব সাদামাটা।

 

তিন

কোনোমতে আমি তাঁর চোখে পড়ি না। অনেক রকম চেষ্টা করেও নয়। তাই তিনি যদি আমাকে দেখেন সেই চেষ্টা।

লেজটাকে কি দুপায়ের ফাঁকে লুকবো না নাড়তে থাকবো, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে, ভাবার পুরো সময় মিলল না। আমি ততোক্ষণে তার সামনে। বসবো

নাকি বসবো না। তিনি কিছু লিখছেন। একটু বাঁকলে দেখতে পেতাম তিনি কী লিখছেন। তা মনে হলো এ-রকম করা অভদ্রতা।

আমি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে সামনের পায়ের থাবা তুলে নাক-টাক চুলকোলাম খানিক। একটা বড়ো নীল রঙের মাছি আমার লেজটাকে কামড়াবে বলে ক্রমাগত মহড়া দিচ্ছে, আমি লেজটাকে একটু-একটু নাড়তে থাকি। এতে বিনয়প্রকাশের সঙ্গে-সঙ্গে মাছিটাকেও লক্ষ্যভ্রষ্ট করার আনন্দ পাওয়া যায়।

লেখা শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে তাঁর সমস্ত মুখ হাসিতে ভরে গেল। আমি ফটাফট শব্দ করে লেজ নাড়তে থাকি। এরকম করে লেজ নেড়ে নাকি অনেকেরই মোক্ষ মিলেছে, তাই আমিও অনেক ঠকে অবশেষে সনাতন পদ্ধতি নিলাম।

আরে বসুন, বসুন, বলে তিনি বেশ ব্যস্ত হয়ে ক্রিং করলেন। দু-কাপ চা দিতে বলো, এই যে সিগারেট চলে তো, অনেকদিন আপনাকে দেখিনি, এইসব কথা আমাকে বলে তিনি আমার ভবিষ্যৎ কর্মাবলির একটি বিসত্মৃত বিবরণ চাইলেন। আমি তাঁর মুখের দিকে চেয়ে, আপনার কাছেই এসেছি, আমার চিঠি মানে দরখাস্ত পেয়েছেন তো, বলে সমস্ত আবেগ গলায় ঢেলে দিই।

ও হ্যাঁ, তা দেখুন আপনার যোগ্যতা সম্পর্কে তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আসলে আপনি অনেক বেশি যোগ্য, আমাদের জন্যে ঠিক – আর তাছাড়া এই ব্যাপারটা একটু অন্যরকম আর কি।

আমি বেশ শব্দ করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লেজটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। সিগারেট ধরিয়ে দু-চার টান দিয়ে বেশ খানিকটা কেশে নিয়ে বললাম, মানে এই রকম সিগারেট খেয়ে অভ্যেস নেই তো। আচ্ছা তাহলে আসি।

তিনি আবার হাসলেন।

আমি উঠে হাত বাড়িয়ে বললাম, বড়ো ভুল হচ্ছে আপনার, আমার হাতটায় নাড়া দিলেন না।

তিনি তাড়াতাড়ি আমার হাতটা ধরলে আমি বললাম, আরো একটা ভুল হচ্ছে, বলবেন তো যে, আমাকে কাজটা দিতে না-পেরে আপনি কী ভীষণ দুঃখিত।

তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাই তো, ভয়ানক দুঃখিত।

আমি বললাম, আবার, কই বললেন না যে, যে-কোনো প্রয়োজন হলেই যেন আপনার কাছে আসি।

অবশ্যই আসবেন, অবশ্যই আসবেন বলে তিনি একটু উঁকিঝুঁকি দিলেন এই জন্যে না-কি যে, লেজটাকে এখনো রেখেছি কিনা। আমি উঠে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে বললাম, কী দেখছেন, ওটা ফেলে দিয়েছি। ওটার আর দরকার নেই।

কিন্তু কিছুকাল পরেই বুঝি, বড় বেশি কথা বলে ফেলেছি।

নতুন কলম কিনে কাগজের পৃষ্ঠা ভরালেও দেখি কারো নজরে পড়ে না। নিজের ভেতরে যে-আগুন আছে তা দিয়েই সবাইকে জ্বালাবো ভেবে আগুনের খোঁজ করতে গিয়ে দেখি সে-সব কোনকালে নিভে গেছে। তাই বাধ্য হয়েই আবার তাদের কাছে গেলাম। এবার লেজটাকে অনেক লম্বা করে নিই। অনেক দূর থেকে সেটিকে নিশানের মতো উঁচু করে তুলে ধরে নাড়তে থাকি।

তারপর ঘরের ভেতরে না-ঢুকে বাইরের দরজায় ঘুরঘুর করি। ভেতরে খুব খাওয়া-দাওয়া হচ্ছিল। আমি দরজার বাইরে বসে সামনের দু-পায়ের থাবা একত্র করে ঘষতে থাকি আর গলার মধ্যে বেশ একটা ঘড়ঘড় আওয়াজ তুলি। তারপরে বেশ মার্জিত, রুচিমাফিক পদ্ধতিতে মাথা নিচু করে লেজটাকে নাড়তে-নাড়তে ঘরে ঢুকলে একটা হাড় ঠক্ করে মেঝেতে পড়ে যায়। আমার হুমড়ি খেয়ে পড়া কাতর মুখ দেখে তিনি বললেন, আচ্ছা, আপনি যখন এতো করে বলছেন, তাছাড়া আপনার ব্যবহার খুবই প্রশংসাযোগ্য। সুযোগটা না-হয় আপনাকে দেওয়াই যাক।

তিনি তখন ভালো করে চারদিক দেখার জন্যে চোখ টান করলে আমি ভয়ানক হেসে গলে যাই। দু-চারবার সারা মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে শেষে বলি, না, না। ভুলিনি। এই যে দেখুন কতো বড় লেজ। আর দেখুন, কী সুন্দর করে নাড়তে পারি। আর যদি দয়া করে মাথার রোঁয়ার মধ্যে আঙুল চালিয়ে দিতেন তাহলে দেখতে পেতেন গলার ঘড়ঘড় আওয়াজটাকেও কতো মিঠে করে তৈরি করে রেখেছি।

 

চার

এই আর কি! এইভাবেই দিন কেটে যায়; গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত এমনি করেই কাটিয়ে দিই।

গরমে বেশি কষ্ট পাই না। যতোক্ষণ অফিসে থাকি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র চলতেই থাকে। রাতে শোবার সময়ও পাখা ঘোরে বিছানার ওপরে।

বর্ষায় বর্ষাতি গায়ে দিই। ছাতাও আছে। তাছাড়া অফিসের গাড়িতে যাতায়াত। রোদে-বাদলে বেশি ছোটাছুটি করতে হয় না। অফিস-সময়ের বাইরে কোথাও যেতে হলে রিকশা কি সিএনজি কোনোটিই দুর্লভ নয়। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে রিকশাওয়ালা পর্দা বের করে দেয়। সেটিতে যদি খানিক ছেঁড়াও থাকে মোটে বিরক্ত হই না।

শীতের সময় গায়ে লেপ দিতে পারি। তোশক যথারীতি বিছানো থাকে। নারকেলি ছোবড়ার জাজিম এখন অনেক দূরের কথা। স্প্রিংয়ের জাজিম চালু আজকাল।

বাজারে মাছ-আনাজপাতি পাওয়া যায় ভালোই। শহরজুড়ে সুপারশপের ছড়াছড়ি। বাজারের মাছে শুনি ফরমালিন। সুপারশপের কাঁচাবাজারের মাল সব খাঁটি, এই শুনি।

ফলমূলও অমনই। দিব্যি রসে ভরা টকটকে, নানারকম ফল। দেশি-বিদেশি। অবশ্য শুনি নানারকম স্বাস্থ্যহানিকর পদার্থে ডোবানো সেসব। শুনি শতশত মণ ফল ইত্যাদি নষ্টও করে ফেলা হয় এই জন্যে। সেসব তো আর চোখে দেখা যায় না। তাই যেমন ভালো মনে হয় কিনি ফলমূল, আনাজপাতি – ঘরে ভালো করে ধুয়ে নিই।

কেবল বসন্তটা ঠিক তেমন করে উপভোগ করা যায় না। মানে লেপটেপ গায়ে দিতে হয় না, প্রথম রাতে একটু গরমই লাগে, শেষরাতে শীত-শীত করে। অবশ্য কোকিলের ডাক এই সময়ের একটি নির্বাচিত বিষয় – তা পার্কের দিকে গেলে হয়তো সেটি শোনাও যায়। তবে শুনি আজকাল নাকি বর্ষাকালেও ওই নচ্ছার পাখি ডাকাডাকি করে।

যেদিন বাসায় যেতে ভালো লাগে না, সেদিন চীনে রেসেত্মারাঁয় ঢুকে পড়ি। শুনি সব দেশেই চীনে রেসেত্মারাঁ আছে আর ওইসব রেসেত্মারাঁর খাবার নাকি ওই দেশের স্বাদ মেটানোর মতো করেই তৈরি হয়। আমরা এতো ভাবি না। বাইরে খাওয়াটাই বড় কথা।

টেলিভিশনের বাজার বড় রমরমা। হাজারো চ্যানেল আর অনুষ্ঠানের ভিড়ে ভালোটি খুঁজে নেওয়া বড় শক্ত – সকলেই এমন বলেন। তাই টেলিভিশন তেমন দেখি না। ভিডিও ইত্যাদি দেখবার নানারকম যন্ত্র আজকাল। সিনেমা হলে গিয়ে তাই আর ছবি দেখা হয় না। মাঝে মাঝে নানারকম ফিল্ম সোসাইটি ইত্যাদি বিদেশি দুঁদে পরিচালকের ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করলে সেখানে যাই।

গান শোনার অভ্যাস আছে। নানা যান্ত্রিক মাধ্যম আছে সেসব শোনবার। সারা বছরজুড়েই যেন নানা সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন হয় শহরে। সেসব জায়গায় মাঝে মাঝে যাই।

বই পড়ি। যদিও আগের মতো নয়। তবুও হালফিল পশ্চিমা সাহিত্যের খবর রাখি। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সেসব নিয়ে কথাবার্তাও বলি।

লেখাটেখার চর্চা একসময় ছিল। এখনো একেবারে ছাড়িনি। কিছু-কিছু লেখা মাঝে-মাঝে ছাপাও হয়। কিছু সাহিত্যিকের সঙ্গে মুখচেনা আলাপও আছে। দু-চারজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও আছে। মাঝে-মাঝে দেখা হলে কে কেমন লিখছে এইসব মতামতের বিনিময় হয়।

এই আর কী। বেশ ভালোই আছি। কেবল মাঝে-মাঝে বাইরে

গোলযোগ হলে, কি মিটিং-মিছিল হলে নানা জায়গায় নানা রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। গাড়ি কি রিকশা কি সিএনজি ঘুরিয়ে নিয়ে অন্য পথ দিয়ে যেতে হয়। অথবা যানবাহন ছেড়ে দিয়ে ঘরেই ফিরে আসি আবার।

নানারকম বন্ধ হয় শহরে, এই যাকে ‘হরতাল’ ইত্যাদি বলা হয়। এইসব সময়ে গাড়ি-বাস ইত্যাদি কম চলে, অথবা কখনো কখনো চলেও না। সিএনজি কি রিকশা অবশ্য সর্বদাই পাওয়া যায়। যাতায়াতের অসুবিধা খুব একটা হয় না। অবশ্য চোখ খোলা রাখতে হয়। বেশি ঝুঁকির অঞ্চল দিয়ে চলাফেরা করা ঠিক নয় বুঝে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করি।

রাজনৈতিক, সামাজিক নানা কর্মকা–র কথা জানি। কাগজেও পড়ি সেসব। এক সময়ে সেসবে আগ্রহ ছিল। যাতায়াতও ছিল নানা সভা কি সেমিনারে। এখন আর সেসবে যাই না।

বন্ধুবান্ধব একসময়ে যারা খুব কাছাকাছি ছিল, এখন নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। নিকটতম শহরটি থেকে সাগর-পার অবধি। চিঠিপত্র লেখার চল আজকাল নেই। ই-মেইল কি সরাসরি টেলিফোন করলে যোগাযোগ হয়। ঘনিষ্ঠ দু-চার বন্ধু এখনো আছে শহরে। তাদের সঙ্গেই কিছু-কিছু সময় কাটে এখনো।

বন্ধুরা স্ত্রীসঙ্গে অভ্যস্ত। নিজেও আমি এমন কিছু অনভ্যস্ত নই। তবুও পাকাপাকি কোনো ব্যবস্থা এখনো হয়নি। বিবাহকে মোহমুদগর এবং শক্তিশেল এই উভয়বিধ আখ্যায় ভূষিত করে সুহৃদজন নিয়মিত নানা পরামর্শ দেয়। সবই শুনি আমি।

 

পাঁচ

সারাদিন ঘরে বসে থাকা বড় সুখের নয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন দুটি হলেও কখনো-কখনো কর্মস্থলে যাওয়া বড় কঠিন হয়ে পড়ে। অফিসের গাড়ি না এলে অন্য কোনোভাবে যাওয়ার চেষ্টা করি। যাওয়া অসম্ভব হয় না প্রায় কখনোই।

আজ অমন কিছু নয়। ছুটির দিনই। তাই সারাদিন ঘরে বসে না থেকে কোথাও যাওয়া যাক ভেবে রাস্তায় নামি।

কিন্তু যাবো কোথায়? রাস্তায় নেমে তাই কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকি। সময় কাটানোর নানা পথের কথা তো জানা আছেই, কিন্তু সেসবে আর মন টানে না। অন্তত এই মুহূর্তে নয়।

আর তখনই সাংসারিক জীবনের কথা মনে আসে। বিবাহের প্রস্তাবটি আবারো সামনে আসে। এখনো প্রৌঢ় নই – একেবারে খারাপ দেখাবে না। অনেককাল ধরেই আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে সে। স্বামীগৃহে সুখী জীবন কাটাচ্ছে, দেখতে চায় তার অগ্রজা। তাকেও কিছু একটা বলা প্রয়োজন।

কিন্তু ওইসব কোনো কিছুই দুরূহ সমস্যা নয়। হ্যাঁ বা না যে-কোনো দিকেই যাওয়া চলে। তাই এই মুহূর্তে মন থেকে সে-চিন্তাও সরিয়ে দিই।

কী করা তাহলে এখন?

আকাশে সারাদিন মেঘ ছিল আজ। ঘন, কালো মেঘই ছিল আজ সারাদিন। বেরোনোর আগে একবার ভেবে দেখা উচিত ছিল মনে এলেও আর ঘরে ফিরে যেতে চাই না। বৃষ্টির আয়োজন স্পষ্ট বুঝেও।

সামনে একটি রিকশা পেয়ে তাতেই উঠে বসি এবং কোথাও যাওয়ার নেই বুঝে কাছেই যে বন্ধুর বাসা সেদিকেই যেতে বলি রিকশাকে। রিকশাওয়ালা চেনা ঠিকানায় আমাকে পৌঁছে দিয়ে চলে গেল। আকাশে তখন মেঘ আরো ঘন, কালো। হাওয়া উঠে আসে। বৃষ্টির দু-চারটি ফোঁটাও বুঝি পড়ে।

বন্ধুর বাসায় কেউ ছিল না। রাস্তায় আবার নামার মুখে বৃষ্টির কয়েকটি বড় ফোঁটা বুঝি মাথায়ও পড়ে। রাস্তায় নেমে কাছাকাছি কোনো রিকশা চোখে পড়ে না। সিএনজিও নয়। এই জন্যেই বুঝি সবাই গাড়ি কেনে, ভাবি। একটা গাড়ি হয়তো কেনাও যায়। অতো টাকা হাতে নেই। তবুও হয়ে যাবে একরকম করে।

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে বৃষ্টির ধারায় যখন বেগ এসেছে প্রায় তখন কাছের দোকানে আশ্রয় নিই ভাবতেই একটি রিকশা পেয়ে যাই।

খানিকদূর যেতেই বৃষ্টির ধারা প্রবল হয়। রিকশাওয়ালা বৃষ্টির ধারা সইতে না-পেরে একটি গাছের নিচে রিকশা থামিয়ে তাড়াতাড়ি গাছের গোড়ায় চলে যায়।

আমি রিকশায়ই বসে থাকি। পস্নাস্টিকের পর্দায় ঢাকা যদিও, তবু শরীরের দুপাশ, পোশাক সমেত, বৃষ্টির ধারায় ভিজে যেতে থাকে। আমি বসে থাকি। নির্লিপ্ত মুখে কোনো রেখা দেখা যায় না, সম্ভবত। ভাবি, এমন তো নয় যে, এই পোশাক ভিজে গেলে কোনো অসুবিধে হবে। তাহলে বৃথা উদ্বেগ কিসের জন্যে।

বৃষ্টির বেগ কমে আসার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি, আর তখনই হঠাৎ মনে হয়, যদি বৃষ্টির বেগ না-কমে? যদি বৃষ্টি না থামে! r

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার