দেশটা তোমার না

লেখক:

সু শা ন্ত ম জু ম দা র

ফুটপাতের বাজার থেকে কেনা পায়ের কেড্স টেকসই আর কদিন! সস্তার দুরবস্থা জেনেও মাসছয় চলার মতো অনুমান করে পায়ের মাপে একজোড়া কিনে নিই। উদ্দেশ্য, প্রাতঃভ্রমণে ব্যবহার। পুরনো কেড্স জোড়ার অবস্থা শোচনীয়। নতুন কেড্স না-হলে নয়। কিন্তু মাস যেতে না যেতে নতুন কেড্সের পাশ খানিক খুলে গেল – হাঁটার জন্য ঝুঁকিময়। বুঝি, যে-কোনো সময় পুরো খুলে সোল জুতো থেকে আলাদা হয়ে যাবে। চলতি রাস্তায় তখন বিড়ম্বনা। দুর্ভোগ এড়াতে কেড্স মেরামতে যখন সুযোগ হয়, দেখি মুচি আগেই তার ডেরায় ফিরে গেছে। কোনো-কোনো বিকেলে দেখি বাক্সপেটরা তার গোছানো, লোকটা হাওয়া। ছুটিছাটার দিনে কেড্স পরে মুচির সামনে মন্থর চালে চক্কর দিই। আমার পায়ের দিকে একবারও নজর তার উড়ে আসে না। আমার চেহারা তার পরিচিত হলেও কেন পাত্তা দেবে? সামনে দাঁড়ানো মানুষ, কেউ ঝুঁকে, কারো হাত কোমরে। মনে হয়, এলাকার সব মানুষের জুতো-স্যান্ডেল নষ্ট, কে কার আগে সেলাই করে নেবে। আমার মতো গা-বাঁচানো মানুষের ফাঁক-ফোকরে ঢোকা হয় না। সকালে অফিসে বেরোনোর মুখে ছোট ছেলেকে বলি : যা বাবা, পাশের গলিপথের মাথায় এক মুচি বসে, সেলাই-ফোঁড়াই, আঠা যা লাগানোর করে আন, কেড্স জোড়ার ব্যবস্থা একটা কর। কিসের কী – ছেলে কথা কানে তোলে না। তার ভাব – তোমার জিনিস তুমি বোঝো।
দুশ্চিন্তা-অন্তের সুযোগ শেষাবধি এসে যায়। অফিস থেকে ঘণ্টাদুই আগে বের হওয়ায় এমন মওকা মেলে। ইস্টার্ন প্লাস মার্কেটের পেছনের অতিরিক্ত নষ্ট রাস্তা ধরে রোজ আমি বাসায় যাই-আসি। দক্ষিণাংশের ঠিক দেয়ালঘেঁষে টিঅ্যান্ডটির টেলিফোন বক্স দাঁড়ানো। তার পাশের ফালি জায়গায় মুচি একজন বসে। দেখি, তার সামনে এখন মানুষ নেই। মনোযোগের সঙ্গে সে লেডিস স্যান্ডেল সেলাই করছে। জানি না, আজ কোন খেয়ালে মর্নিংওয়াকের কেড্স পরেই আমি বেরিয়েছি। মুচির সামনে পা বাড়িয়ে ফ্লুট বাজানো স্বরে বলি : ‘সেলাই হবে তো।’ মুচি হাতের কাজ স্থগিত করে তার শক্তপোক্ত কালো শরীরের মুখ তুলে জ্বলজ্বলে দৃষ্টি ধরে একজোড়া পুরনো স্যান্ডেল এগিয়ে দেয়। – ‘এইডা পরে জোতা খোলেন। সেলাই কইরা রাখুম। অখন যান গা, ঘুইরা আহেন। কাজকাম থাকলে শ্যাষ করেন।’ বলে কী! আমার মধ্যে অসম্মতি জেগে ওঠে – ‘অতো সময় নেই। কাজ যদি করেন এখুনি।’ মুচি আপত্তি করে না – ‘দ্যান দেখি।’ কেড্স থেকে পা বের করে আনি। দেখি, পায়ের চামড়া ফ্যাকাসে হয়ে আছে। মুক্ত পা-জোড়ায় ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ লাগতেই নিচ থেকে শিরশির একটা অনুভূতি ওপর মুখে উঠে আসে। তার প্রভাবে হুট করে অস্বস্তি আমার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের ভর রাখতে দেয়ালের উদ্দেশে হাত এগিয়েও তা নাকচ করে দিই। হাতের কাজ সরিয়ে রেখে কেড্সের চারপাশ টিপে টেনে কাজের মাত্রা মুচি বুঝে নিতে চায়। কেড্সের ভেতরে সে হাত ভরে সুকতলা টেনে বের করে আনে। পরে মুচি মাথা নাড়ে – ‘শুধু সেলাইয়ের কাম নয়। সল্যুশন লাগবো।’ কেড্সের সোলের হাঁ হয়ে যাওয়া ফাঁকে কাঠির মতো কিছু একটা ঢুকিয়ে মুচি সল্যুশন লাগায়। জুতো মেরামতের এমন পদ্ধতি আমি আগেও দেখেছি। বুঝতে পারি, শুকানোর পর চেপে লাগিয়ে চারপাশ সে সেলাই করবে। অসুবিধা হলেও হতে পারে, বেশি টাইটের কারণে কেড্স আর পায়ের মাপে না থাকলে পরতে কষ্ট হয়। কাজ করতে-করতে আমার লক্ষ্যে চিবুক তোলে মুচি – ‘সস্তা জোতার সোল কদিন বাদে ফাইটা যায় গা। পরে আপনে সোল বদলাইয়া নিয়েন। উপার ঠিক আছে।’ আমার কোনো সাড়া না পেয়ে আবার সে মুখ খোলে – ‘দ্যাখচেন, আমার পিছে সোল ঝুলাইন্নো। পোলায় বানাইছে। ও বহুত ভালা সোল বানায়। জোতায় লাগাইয়া নিয়েন। দামে কম পড়বো।’
যাতায়াতে আমি দেখেছি মুচি একজন অনেকদিন ধরে এখানে বসে। তার চেহারা-ছবি, বয়স তন্নতন্ন করে লক্ষ করিনি। এবার মুচির ওপর আতিপাতি নজর টেনে অনুমান করি, আমার চেয়ে বয়সে কিছু বড় হবে সে। তার মাথার চুল পাতলা হয়ে এসেছে। শরীরের চামড়া প্রতিদিনের রোদের তাপে ঝলসানো। গোলগলার রংজ্বলা টিশার্ট গায়ে। আসল রং কবেই মুছে গেছে। তার আঙুলগুলো লম্বা, নখ কালচে। মুখময় কদিনের না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি।
আমার চাহনি কখন যেন মুচি খেয়াল করেছে। কেড্সে সল্যুশন লাগানো শেষ করে প্রশ্ন ও উত্তর একইসঙ্গে সে চালু করে। – ‘দ্যাহেন কী? এইখানে বইতাছি আডারো বচ্চর। আপনেরে চিনি আমি।’ এবার তার নিশ্চিত কণ্ঠ – ‘রাস্তার ওইপার ক্লিনিকের গলিতে থাহেন। আপনে তো হিন্দু। এই দ্যাশে হিন্দু আমরা আর কয়জন, কমতে কমতে যা আছে, মিলমিশ না থাকলেও একজন আরেকজনরে চিন্না রাহি।’ মুহূর্তে তার কণ্ঠ মনে হলো ধার দেওয়া।
অবাক হয়ে জমে যাই আমি। যাওয়া-আসার পথে নজর কখনো উড়ে গেলে মুচিকে দেখেছি আপনমনে কাজ করতে – ব্যস, ওই পর্যন্ত। চেহারা চিনে রাখার মতো করে দেখা হয়নি বলে চোখ বুজে মুখটা এর কিছুতেই ধরতে পারব না। আমার সম্পর্কে এ-মানুষের দেখি সব কিছু মুখস্থ। হিন্দু শব্দটা এমনভাবে সে উচ্চারণ করল খানিক যেন ওজন আছে।
আমরা আর কয়জন, মানে মুচি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বোঝাচ্ছে – পুরনো সেই গোলমেলে হিসাব। অসহায়, মানসিকভাবে ধ্বস্ত এক হিন্দু তার মতো আরেক হিন্দুকে চেনাজানার মধ্যে টেনে এনে আশ্রয় নেয়, খেদ, দুঃখকষ্ট, বঞ্চনা, প- ভাগ্যের আদান-প্রদান করে। দেশ স্বাধীনের আগে পাকিস্তান আমলে সংখ্যালঘুদের ঘোর সন্দেহের সঙ্গে শত্রু ভাবা হতো। বহুজনের বিষয়-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয় অ্যানিমি প্রপার্টির নামে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ ভারতের চক্রান্ত এমন ধুয়ো তুলে পাকিস্তানে হিন্দুরাই দোষী, অতএব মার শালাকো। হলো কী! বাঙালি এই প্রথম বুঝল, ধর্ম নয়, পূর্ববাংলার মানুষ মাত্রই পাকিস্তানের শত্রু। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরাও দুশমন। ধুর, জুতো মেরামতে এসে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পুরনো তত্ত্বের খোঁড়াখুঁড়ি খামোকা। মাথা কী গোল্লায় গেছে! মুচি আমার কেড্সের চারপাশ সেলাই করছে। তার প্রতিটি আঙুলের মাথা একটু বেশি কালো এবং খরখরে।
ওই দ্যাখো, নাড়া পেয়ে আমার ভাবনার মধ্যেও ফোঁড় পড়ছে। কৌতূহল, কি জিজ্ঞাসা শাসনে রাখা এখন মুশকিল। ঠোঁট থেকে অবাধ্য প্রশ্ন যেন খসে যায় – ‘আপনি আগের মতো এখনো কি সমস্যায় আছেন?’
– ‘থাকুম না ক্যান?’ পালটা প্রশ্নের সঙ্গে মুচি ক্ষোভ-বিরক্তি-দুরবস্থা-তাড়না সব উজাড় করে দিতে রাস্তার সামনে আশপাশে দৃষ্টি উড়িয়ে দেয় – তার কথা কেউ শুনতে পাবে কিনা। পথচারীরা ব্যস্ত, নিজের খেয়ালে যে-যার মতো হেঁটে যাচ্ছে। মুচির এমন সতর্কতা সাফ বলে দিচ্ছে, তার কাছের মানুষকেও সে বিশ্বাস করে না, তার থেকে মোটেই সে নিরাপদ নয়। এবার আমার উদ্দেশে মুখ তুলে হাতের কাজ সে স্থগিত রাখে – ‘পাকিস্তানকালে কেডা শত্তুর কেডা দোস্ত চিনন সহজ আছিল, হিন্দু মাত্রই দুশমন। অক্ষণ বহুত খারাপ অবস্থা। অ্যাক শালারেও চিননের উপায় নাইক্কা। খালি ছোঁক- ছোঁক, কখন খাবলা মারে। সর্প হইয়া দংশন করে ওঝা হইয়া ঝাড়ে।’
– ‘আপনি থাকেন কোথায়?’
এবার আমার মুখের ওপর মুচি এমন ধারাল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে যেন ঠিক প্রশ্ন আমি করিনি। সে আমাকে জানে, কোথায় থাকি জানে, তা হলে আমি তার ঠাঁই-পরিসর-ঠিকানা সম্পর্কে কেন অবগত নই! সে হিন্দু, তার ধারণামতে একই ধর্মবিশ্বাসী, পরস্পর জানাশোনা কেন তবে নিবিড় না?
এ-সময় মুচির প্রতিদিনের অস্থায়ী অবস্থান-লাগোয়া মার্কেটের পেছন গেটে ডিউটি করা গার্ডটা সামনে এসে দাঁড়ায়। তাকে দেখে মুচির গলায় মুহূর্তে অভ্যস্ত মুরব্বিয়ানা ফুকরে ওঠে – ‘দুফুরে খাইছোস?’
পেটে হাত বুলানোর পর গার্ডের মুখে জেগে ওঠে হালকা হাসি। মুচি এবার শান্তির উপায় বাতলে দেয় – ‘তয় যা গা। তোর টুলে রেস্ট নে গে।’
বোঝা গেল, আশপাশের বাসাবাড়ি, কি মার্কেটে যারা কাজ করে তাদের সঙ্গে মুচির মাখামাখি আছে। প্রায় পুরোদিন নিজের সেলাই-ফোঁড়াই করতে-করতে গোপন ও খোলামেলা অনেক কিছু মুচি দেখে-শোনে; অতএব এই মানুষটা থেকে খোঁজখবরের কথা চালাচালি করে যথেষ্ট বোধ-বুদ্ধি তারা জমা করছে। মুচি বয়সে বড়, খাটুয়েদের সঙ্গে নির্দোষ তুই-তোকারি সম্বোধনে তার দাবি আছে। এদের ভালো-মন্দের ব্যাপারে সে হয়তো পরামর্শ দিয়ে থাকে। হতে পারে হুকুমের চাকর, মার্কেটের কর্মচারীরা মুচিকে আপনজন মনে করে।
– ‘এই যে গার্ডটা এলো, সে কি ধর্মে মুসলমান?’
আমার জানার জবাবে অস্ফুট একফোঁটা শব্দ শুনি – ‘হয়’।
– ‘গায়ে-গতরে খাটা এসব মানুষকেও কি আপনি ভয় পান?’
– ‘রাখ্খেন আপনের জাল কথার প্যাঁচ।’ মুচি রুখে ওঠে। – ‘ভালা মানষির মুখ দ্যাকতাছেন, সুযোগ পাইলে এরা ছাড়বোনি। চাষাভুষো, কুলি-কামিন-মজুর, রিকশাঅলা, যারা ফুটপাতে ঘুমায়, সক্কলে লুডপাডে ওস্তাদ। একাত্তরে আমাগো বাড়িঘর-দরজা লুড করছে কারা? বিল্ডিং-উল্ডিংয়ের লোক? এরাই। রাজাকার, পাকবাহিনীর আশকারায় বিহারিরা মানুষ খুন করছে। ওই বিহারি হারামজাদারা আছিল রংমিস্ত্রি, কি মেকানিক। গাড়িগুড়ির টায়ার পালটাইতো। যাগো দ্যাহেন সব গুলান বজ্জাত, খুঁত বাইর কইরা হিন্দুগো ছোবল দ্যায়, কামড়ায়-কাটে।’
এতক্ষণে জানা গেল, মুচির নাম লালচান দাস। গোপীবাগ মন্দিরের পাশে হিন্দু মহল্লায় সে থাকে। বাড়ি বাজিতপুর।
জুতো-স্যান্ডেল মেরামতে আগে সে লালবাগে বসত। ওখানের অবস্থা খারাপ হলে এই এলাকায় সে চলে আসে।
– ‘অবস্থা খারাপ মানে?’
আমার কৌতূহলে লালচান সত্যি বিরক্ত হয়। ঢাকায় বাস করেও কোথাকার কী রকম অবস্থা, কত মন্দ-নষ্ট-অকেজো-নোংরা আমার জানা নেই কেন? নির্ঘাত আমি আস্ত একটা নাদান।
– ‘ধুর মশায়!’ ধমকের সুর লালচানের কণ্ঠে। – ‘লালবাগে মারপিট তো লাইগা থাহে। খালি গ্যাঞ্জাম। এ-ওর মাথা ফাটায়। রক্তারক্তি। বহুত মস্তান ওইহানে। চাঁদাবাজি। রাস্তার মানুষ হইয়াও শান্তি নাইক্কা। কী আর করুম, প্যাটে তো দানাপানি চাই। আইয়া পড়ছি এহানে।’
লালচানের মনের থলি-ঝুলি উজাড় করা জবানিতে জানা গেল, এখানে তার শ্রমস্থলের পিঠঘেঁষা যে বহুতল মার্কেট, ওপরে অফিস, দশতলা নির্মাণের আগে পুরনো টেলিফোন বক্সের ফাঁকে হাঁটু ভাঁজ করে এলাকার জুতো-স্যান্ডেল রং ও সেলাই সে করে আসছে। তখন তার ছেলেটা ছিল ছোট। এখন সে যুবক শক্তসোমত্ত। লালচানের দাবি : জুতোর সোল তৈরি করতে-করতে সে বেশ পটু হয়েছে।
– ‘তা লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা -।’
আমার মুখের বাক্য থামিয়ে দিতে লালচান হাত তোলে। তার তালুর চামড়া এই বয়সেও টাইট, যেন মেশিনে টেনে সেট করা। সন্তান পালনের দায়িত্ব এবার সে ঘোষণার মতো করে বলে – ‘কেডায় কয়, শিখাই নাই। চেষ্টার কমতি রাখি নাই। ও পড়ছে তো, লেখ্যাপড়া জানে।’
– ‘কতদূর পড়েছে?’
এর কোনো জবাব না দিয়ে নিজের কথায় মুখর থাকে লালচান। – ‘ঘুষমুষ দিমু ক্যামনে, সামোর্থ নাইক্কা, তাই চাকরি কন আর গোলামি কন, পোলারে ওই কামে দ্যাই নাই। বাপ-দাদার আদি কামেই আছে। পোলারে বিয়া করাইছি। দুই নাতি অক্ষণ।’
– ‘চাকরির জন্য ঘুষ দিতে, চাকরি করলে ঘুষ খেতে হবে কেন?’ কোটরে চোখজোড়া যথাসম্ভব বড় করে লালচান এমন তীক্ষè ফোকাস মারে যে, হইজনমে এমন আজব কথা সে কখনো শোনেনি। আমাকে সে দিনদুনিয়ার হালহকিকতের সামান্য এক টুকরোও না-জানা একটা উদ্ভট প্রাণী ভাবছে। এবার সে দৃঢ় স্বরে রায় দেয় – ‘ঘুষ না খাইলে অপিসার হওন যায় না।’
– ‘বলেন কী!’
আমার কণ্ঠ থেকে বিস্ময় ঝরে পড়ছে দেখে লালচান ভুরু ভাঁজ করে – ‘আপনি মনে কয় বহুত চালু। ভাজা মাছডাও য্যান উলটাইয়া খাইতে জানেন না। সব জাইন্না-শুন্না না জাননের ভাব করতাছেন। নাকি আকাশ-উকাশ থাইকা খইসা পড়ছেন!’
আমি তার ব্যঙ্গ গায়ে মাখি না – ছেলে কি পরিবার নিয়ে আপনার সঙ্গে আছে?’
– ‘কই থাকবো? সাহেব-সুবো হইলে পর আলাদা হইতো। আমরা কামের লোক। মাইনষির পা মেরামত করি। ছোডোলোকের কাম। আমাগো ভাগাভাগি, দলাদলি নাইক্কা। আপনে কুলীনবাবু হইলে দলাদলিতে আছেন। আমরা নাই। আপনেদের এক পাও এই পার আরেক পাও বর্ডারের ওই পার।’
দ্যাখো, লালচান আমাকে কুলমর্যাদার অধিকারী ভেবে এই সুযোগে পুরনো আমলের ধরে রাখা অসার জাতপাতের বুদ্ধিভ্রষ্ট খেপামি আমার ওপর ছুড়ে মারছে। মুশকিল, তিরিক্ষি স্বভাবের এমন বদমেজাজির রাগ-বিরক্তি-মনের ঝাল নিয়ে কোনো কলহ চলে না। আমি তার মন ঘোরাতে বলি : ‘বুঝলাম, এখন এই পারে আপনার অবস্থা কী?’
সম্ভবত আমার প্রশ্ন লালচান বোঝেনি। কিংবা মনোযোগ ফের কাজে থাকায় জিজ্ঞাসা কান ফসকে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে কথা বলার নেশায় মুখ নিজের থেকে সে সচল করে – ‘আপনের ওই পারে তো প্রদীপ বহে। ওরে রাইখ্যা আমারে দিয়া জোতার কাম করণের কারণ কী?’
বড় রাস্তার পাশ কেটে বাঁয়ে ছোট একটা রাস্তা ঢুকেছে ভেতরে। সামান্য এগিয়ে চারতলার পুরনো ঠান্ডা রংশূন্য একটা বিল্ডিংয়ের খোপের মতো তিন রুমে আমার বাস। চিপা রাস্তার মুখে টেবিল-টুল পেতে ফোনের ফ্লেক্সিলোডের যুবক আমাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তার পাশে দেয়ালঘেঁষে বসে এক মুচি। কখনো সে নিয়মিত নয়। এখন দেখা গেল তো পরক্ষণে সে নেই – তার বাক্সটা পড়ে আছে। খেয়ালিগোছের মুচির নাম প্রদীপ, আমার তা জানা নেই। একই জীবিকার জোয়ান লালচানের জ্ঞাতি হতে পারে ভেবে জানতে চাই – ‘ওকে চেনেন আপনি?’
লালচানের মুখে আমোদজনক হাসির আভাস – ‘চিনুম না ক্যান? আমাগো বাড়ি থাইকা মাইল ছয় দূরে ওগো বাড়ি। ঢাকায় আমি গোপীবাগ, ও মানিকনগরে থাহে।’ লালচানের গলা থেকে এবার ঘোলা রহস্য উঠে আসে – ‘ও জানি কেমুন, তাই না!’ মুচি প্রদীপ যেন কেমন এর অর্থ দাঁড়ায় সে তার মতো না। হয়তো আলাদা রকমের। দুজনের প্রভেদ-পার্থক্য যাই থাক তা জানার জন্য আমার আগ্রহ হবে কেন? আমার কি কাজে লাগবে? লালচানের কথা আমি গ্রহণ করি না। বরং আবারো তার কাছে আমি আগের নাছোড় বন্ধ প্রশ্নটা পেশ করি – ‘পুরনো যে-সমস্যা ছিল, মানে থাকাথাকি-বসবাস নিয়ে, এখনো কি সেই বিপদ-আপদ আছে কিনা।’
– ‘কী যে কন!’ ভাবখানা লালচানের জীবনযাপনে, কি অভিজ্ঞতায় এত সমস্যার স্তূপ যা বললেও ফুরাবে না। সে ধাঁধা-সরানো নিশ্বাস ফেললে আমার মনে হলো, লালচান বুঝি মনে করছে – অবোধ, মাথা গুলিয়ে যাওয়া মানুষটা বলে কী! কেড্স মেরামত করতে আসা খাটো-মোটা এই লোকটা আদৌ কি ভালো আছে? দুজনই একই সমস্যায় ঝাঁঝরা; আর সে বলে বসবাস দিন গুজরানে বালামুসিবত আছে কিনা। লালচানের বয়সী চিবুক খানিক ঝুলে গেলে নিমেষে বুঝি ধন্দে পড়ে – ‘আপনে হিন্দু না!’
লালচানের জিজ্ঞাসায় আমি কোনো একটা উত্তরের জন্য প্রাণান্তকর খাবি খাই। যদি বলি, হিন্দু পরিবারে আমি জন্মেছি মাত্র, ধর্ম আমার কাছে ভ্রান্তি তো কর্কশ ধমক দিয়ে লালচান আমার কেড্স জোড়া সামনের সরু পচা ড্রেনের ভেতর হয়তো ছুড়ে ফেলে দেবে। ভদ্রতা বজায় রেখে তা না করলেও শতেক প্রশ্ন সে করবে। তার উত্তর সব আমার জানা নেই। তা বাদে এই ধর্ম-টর্ম আমাকে দারুণ বিব্রত করে।
– ‘আপনে হিন্দু হইলে আমার মতো সোমস্যায় আছেন। নিন্দা-গঞ্জনা, নির্যাতন কন, অপছন্দ কন, ঘেন্না-পিত্তি সব আমাগো। আপনেরে আমেরে অ্যাক মুসলমানেও বিশ্বাস করে না। মালাউন কয়। কয় না? বুকে হাত দিয়া সোত্য কনছেন দেহি।’
লালচান রেগে গেছে। গোঁয়ারগোবিন্দের এই রাগের হলকায় আমি ক্রমশ সিদ্ধ হতে থাকি। তুচ্ছতাচ্ছিল্য-অবহেলা সহ্য করা নগণ্য মানুষটার বহুদিনের মনোব্যাধি নিরাময়ের উপায় আমার জানা নেই। আমার পুস্তকি বিদ্যা বলে, মালাউন মানে অভিশপ্ত, কাফের, বিতাড়িত। ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোককে কোনো-কোনো মুসলমান বলে। মালাউন আরবি শব্দ। ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের সময় আরবে হিন্দু তখন ছিল না। আচ্ছা, এক সনাতন ধর্মবিশ্বাসীর কাছে এক মুসলমান আরেক ধর্মের ইনসান, তা হলে হিন্দুর কাছে এই সৃষ্টবান্দা কী? সহসা মাথায় এমন প্রশ্ন উদয় হলে আমি নিজেই প্যাঁচে পড়ে যাই। না, কাউকে অভিশপ্ত, সত্য প্রত্যাখ্যানকারী, ধর্ম অস্বীকারকারী বলা ন্যায্য নয়। যদি সে স্রষ্টায় বিশ্বাসী হয়, তবে কে ঈমানদার, কে মুরতাদ তা বিচার করবেন সৃষ্টিকর্তা, মানুষ নয়। এখন কীভাবে লালচানকে বোঝাই – বাজে বকা কোনো আহম্মকের মুখে মালাউন শুনে তার মন খারাপ বা ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ নেই।
লালচানের মন ঘোরাতে ভাবি – অন্য কথা বলি। না, ঠোঁট বুজে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই মানুষটা রাস্তায় বসতে-বসতে সম্ভবত বাচাল হয়েছে – প্যাঁচালপাড়া-বকবক সে ভালোবাসে। আবার যদি তার বাগ্বিস্তার শুরু হয় তবে আমার কেড্স মেরামত হতে সময় লাগবে। একবার হাত গুটিয়ে নেবে, একবার হাত সে চালু রাখবে। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে সময় দেখি। আর বিশ মিনিট পরে আমাকে ইনসুলিন নিতে হবে, তারপর খাওয়া। এই বাক্যবাজের পাল্লায় গুলতানি করে সময় ব্যয় হলে আমার ব্লাডসুগার কমতে থাকবে। তখন পকেটের চকোলেট চুষতে হবে।
– ‘আপনের পোলামাইয়া কয়জন?’
দেখো কা-, লালচান নিজের ভেতরের চাপে আবার সরব হয়েছে। নিরুপায় আমি, মুখের আঠা সরিয়ে উত্তর আমাকে দিতে হয় – ‘দুই ছেলে।’
– ‘লেখ্যাপড়া করতাছে?’
– ‘করছে তো।’
– ‘হইবে কী? এই দ্যাশে হিন্দুগো চাকরি-উকরি নাই।’
শুনে আমার স্বর দ্রুতই শীতল হয়ে অস্ফুট আর্তনাদসহ ভেঙে পড়ে – ‘নাই!’ লালচানের মুখের ভাঁজ মিলিয়ে যেতে থাকে। আস্ত একটা নির্বোধ ভেবে এবার বুঝি চোখে চশমা, জামা-প্যান্ট পরা এই আমাকে পুরোপুরি সে নস্যাৎ করে দেয়। তার ঠেসবাক্য থেকে রেহাই পেতে পেছনে নজর উড়িয়ে ভ্যানগাড়িতে বিক্রি করা তরিতরকারি দেখতে থাকি। লালচানের গলার আওয়াজে মুখ ঘোরাই।
– ‘আমাগো পোলাপানে কামউম পায়, তয় দামি চাকরি না – গোলামি কওন যায়। সস্তা, ছোডো, কেরানি-উরানির কাম। পয়সা নাইকা। কেউ ইজ্জতও করে না। সর্বক্ষণ ডরে ডরে কলম খুআইয়া হাত গায়েব কইরা রাহে। জলপানি কন, আর মালপানি কন, কামাইন্নোর সাহস ভি নাই।’
এত নিরাশ-নাখোশ খেদোক্তি আমি বহুদিন শুনিনি। লালচানের জীবনাভিজ্ঞতা অনেক তিক্ত কষ্টের যে, আমার সঙ্গে মিলবে না। জুতো-স্যান্ডেলের মুচির কাজে এই জন্মে সে শ্রমের মর্যাদা পায়নি। মানুষ বলে গণ্য না হতে হতে তার মধ্যে অবহেলার বোধ, কায়ক্লেশ ভোগান্তি, অসন্তোষের বিষয় হয়ে উঠেছে। বঞ্চিতজনের নৈরাশ্য রোজরোজ শুকিয়ে শক্ত ইট-পাটকেল হওয়ায় কথা সে ছুড়ে মারার মতো করে বলে। উপরন্তু, লালচান সংখ্যালঘু হওয়ায় সর্বক্ষণ হীনমন্যতায় ভুগছে। তার ধারণা, এ-কারণেও তাকে কোণঠাসা, নিচু অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। সংখ্যাক্ষুদ্র হিসেবে কখনো কখনো আমাকেও সংকুচিত হতে হয়। কথার মারপ্যাঁচে মনে করিয়ে দেওয়া হয় – তুমি সমানকুলের লোক না। তখন মাথার দৌড়, কি প্রবোধ দিয়ে স্থির থাকতে বা হুঁশ-টনক ধরে রাখতে চেয়েও পারি না, মন ও মতি দুই-ই টলে যায়। লালচানের তো মাথা গুলিয়ে ফেলারই কথা। খেটে-খাওয়া মানুষ, সে কত আর ছদ্মভদ্রতা দেখাতে যাবে! বামুন-কায়েতের আপস তার মধ্যে কত আর ক্রিয়া করবে!
লালচানের কেড্স মেরামত শেষ। কেড্সের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে এবার সে টেনে-টেনে দেখে – উপযুক্তমতো সল্যুশন দিয়ে সেলাই হয়েছে কিনা। জানি না, এমন যতেœ কারো জুতো-স্যান্ডেলের ফাটা জোড়া দিতে কত সময় সে নিয়েছে। কেড্সদুটো নিজের সামনে পাশাপাশি সাজিয়ে লালচান তার চিবুক তোলে। – ‘আপনেরে অ্যাই রাস্তাদে যাইতে-আইতে দেহি। আজ নাগাল পাইয়া আপনের টাইম খরচা করচি। করুম কি কন? মনের কষ্ট কওনের মনুষ্যি পাই না। আশপাশে কেবল শয়তান-ট্যাটনে ভরতি। শোনেন, আমার সাবালক পোলার উলটা গীত। কদিন আগে তারে কাম থেইকা তুইল্যা, বাঁয়ে ওই যে বিল্ডিং দেখতাছেন, ওর আন্ডারগ্রাউন্ডে ফেলাট মাইনষের গাড়ি থাহে, অ্যাক শালার পুতে পোলাডারে দিয়া তার গাড়ি ধোয়ামোছা করাইছে। বিষয় কী? এইখানে বসতে হইলে মাগনা কাম দিতে হইবে। শুইন্না আমি গেলাম চেইতা। পোলায় মুখে আঙুল চাইপা আমারে চুপ থাকনের ইশারা দ্যায়। ইশ্কুলে কেলাস-উলাস করচে, তো মাঝেমইদ্যে আপনাদের মতো বইয়ের ভদ্র ভাষায় বাতচিত করে। কয়, বাবা সংগ্রামের সময় আমাদের নিয়ে তুমি দেশ ছাড়ো নাই। এদেশে থাকার নিয়ত নিয়ে মরতে মরতে থাকলে। যুদ্ধ, কত রক্ত, মৃত্যু দেখলে – সব বৃথা। এখন পরিস্থিতি উলটা – দেশটা তোমার না। তোমার তো তিনকাল গেছে। আমাদের নিয়ে খামোখা ফাল দিয়ো না।

শেয়ার করুন

Leave a Reply