নাদিন গরডিমার, দুটি উপন্যাস, নানা প্রসঙ্গ

লেখক:

সরকার মাসুদ

 

নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির সূত্রে নাদিন গরডিমার নামটির সঙ্গে আজ সকলেই পরিচিত। ধারণা করি,
প্রাগ্রসর পাঠকদের অনেকেই তাঁর এক বা একাধিক রচনার স্বাদ নিয়েছেন। ফকনার,
কেনজাবুরো, সালমান রুশদি প্রমুখের মতো জটিলতার শিল্প বয়ন করেননি গরডিমার। তিনি সোজা
কথা মোটামুটি সহজভাবেই বলতে চেয়েছেন এবং বলতে পেরেছেনও অনেকখানি সাফল্যের সঙ্গে।

দক্ষিণ আফ্রিকার গোড়া থেকেই শ্বেতাঙ্গরা
সংখ্যালঘু। তা সত্ত্বেও এ সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরু কৃষ্ণাঙ্গদের বিভিন্ন অধিকার
থেকে বঞ্চিত করে আসছিল সুদীর্ঘকাল। এ-বঞ্চনা কেবল অমানবিক বা নিষ্ঠুর নয়, রীতিমতো
অনৈতিকও। গায়ের রংকে কেন্দ্র করে মানুষে-মানুষে এ জাতীয় ভেদ সৃষ্টি দক্ষিণ
আফ্রিকার কূটরাজনৈতিক পরীক্ষার ফল বলেই মনে হয়। কালো মানুষ শুধু তার কালোত্বের
কারণে অনেক সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করতে পারবে না, এটা আসলে কোনো যুক্তিই নয়।
অথচ এ খোঁড়া যুক্তির ওপর ভর করে শ্বেতাঙ্গ শাসকগণ যুগ-যুগ ধরে ঠকিয়েছে
কৃষ্ণাঙ্গদের। কখনো কখনো তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠলে শাসকগোষ্ঠী নির্মমভাবে দমন করেছে
কালো মানুষদের। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই নিষ্ঠুর জুলুম ও অমানবিক নিয়মের শৃঙ্খলে
বন্দি থাকতে হয়েছে তাদের।
গরডিমার ছেলেবেলা থেকেই লক্ষ করেছেন, শুধুই
শ্বেতাঙ্গ হওয়ার জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা তিনি পেয়ে আসছেন এবং বেশ কিছু অধিকার কেবল
‘সাদা’দের জন্যই সংরক্ষিত। কিন্তু এ-ব্যবস্থা রীতিমতো অন্যায় ও অনৈতিক। লেখক বেড়ে
উঠতে উঠতে খেয়াল করেছেন, কালো মানুষরাই তার দেশের আদিবাসী। দক্ষিণ আফ্রিকার
মাটি-পানি-আলো-বাতাসের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সরাসরি এবং তা সুপ্রাচীন। অথচ
শ্বেতাঙ্গদের আরামদায়ক নিরুপদ্রব জীবনযাপনের জন্য ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা
হয়েছে কালো মানুষদের ব্যাপকভাবে বঞ্চিত করেই। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্যই মূলত
‘সাদা’রা ‘কালো’দের রাজনৈতিক অধিকার ভোগের সুযোগ রাখেনি। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটির
ওপর যাদের দাবি সুসংগত, যারা এ-মাটির আদিম সন্তান – আদি বাসিন্দা, সেই আদিবাসী
নিগ্রোরা ইয়োরোপ থেকে আগত শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে সংখ্যায় অনেকগুণে বেশি ছিল। তা
সত্ত্বেও শাসকদের অন্যায়-আমানবিক আইন-কানুন ও সেসবের নির্যাতনমূলক প্রয়োগের ফলে ওই
নিগ্রোরাই হয়ে পড়েছিল সংখ্যালঘুদের মতো। কিন্তু তারা অবদমিত হয়নি, প্রতিবাদ
অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। যদিও তা করতে গিয়ে অসংখ্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে বেঁচে
থাকতে হয়েছিল তাদের। কথাসাহিত্যিক গরডিমারের সাহিত্যপাঠের আগে এ-রাষ্ট্রিক পরিস্থিতিটির
কথা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।
কিছুকাল আগে পড়া লেখকের দুটি উপন্যাসের কথা আমরা
এখানে বলবো। তার আগে সাধারণভাবে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। গরডিমার তাঁর গল্পের
মানুষজনকে পরিবেশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে উপস্থিত করে থাকেন। ফলে ইতিহাসকেও
অন্য চেহারায় আমরা দেখতে পাই। জীবন সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাসসমূহকে তিনি প্রকাশ করেন
উপন্যাসের ভেতর দিয়ে। তিনি অবশ্যই মানবতাবাদী; কিন্তু এটুকু বললে তাঁকে মোটামুটিও
বোঝা যাবে না। তিনি একই সঙ্গে ভবিষ্যৎদ্রষ্টাও। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর দুর্মর
আশাবাদ। এ কারণে তিনি কল্পনা করতেন, একদিন শ্বেতসন্ত্রাসের অবসান ঘটবে এবং
কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের মানবিক-রাষ্ট্রিক অধিকার ফিরে পাবে।

গরডিমারের লেখার অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে, তিনি
ক্ষোভাত্মক বিষয় নিয়ে লিখেছেন কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। কোনোরকম তিক্ততাও নেই।
যেন সৃষ্টিকর্তার মতো নির্লিপ্ত-নির্বিকার এক প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। যেন তিনি বলতে
চান, জীবন এমনই। সৃষ্টি, ধ্বংস, উদ্বেগ আশা আর সংগ্রামশীলতার ভেতর দিয়েই এগিয়ে যায়
জীবন। কিন্তু ভীষণ অনভিপ্রেত ঘটনার কিংবা অনাচারক্লিষ্ট মানুষের প্রতি তাঁর
সহানুভূতি গভীর। ঘটনার চেয়ে ভাবনা তাঁর গল্প-উপন্যাসে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জীবনভাবনার
অনবদ্যতাই তাঁর লেখায় চিরকালীনতার স্বাদ এনে দিয়েছে।
নাদিন গরডিমার নিজে শ্বেতাঙ্গ। তিনি সাদা
মানুষদের কথা লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। কৌতূহলের বিষয়, ওই শ্বেতাঙ্গদের জীবনকথা তিনি
লিখেছেন কালো মানুষদের জীবনধারার পরিপ্রেক্ষিতে। দক্ষিণ আফ্রিকা, লেখা বাহুল্য, মূলত
কালো মানুষের দেশ। বহু জাতের নিগ্রোর বসবাস সেখানে। বুয়র, জুলু, ভারতীয়সহ আরো অনেক
জাতি-গোষ্ঠীর মানুষও আছে সেদেশে। বেদনার কথা, শ্বেতাঙ্গরা সংখ্যায় খুব কম হলেও
দেশের শাসনব্যবস্থায় মাতবরি করে আসছে দীর্ঘকাল। আর কেবল সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েই
ক্ষান্ত হয়নি, সিংহাসন অটল রাখার গরজে যথেচ্ছ নিপীড়নও চালিয়েছে। এখন অবশ্য অবস্থার
অনেকখানি পরিবর্তন হয়েছে। তা সত্ত্বেও শ্বেতাঙ্গরা কৌশলে সুযোগ-সুবিধার সিংহভাগই
ভোগ করে চলেছে। একটি ছোট উদাহরণ দেবো। দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দলের মধ্যে নিগ্রো
কতজন? এক বা দুজন। অথচ আপন যোগ্যতায় জাতীয় দলে স্থান পাওয়ার মতো বেশ কিছু
কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় সেখানে আছে এবং সবসময়ই থাকে। এটা অবশ্যই অস্বাভাবিক অবস্থা।
গরডিমার তাঁর উপন্যাসের ভেতর দিয়ে শুধু যে নিপীড়িত-নিগৃহীত কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর
জীবনযাতনার কথা বয়ান করেছেন তা নয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের অস্তিত্বের
অস্বাভাবিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কেননা সাদা-কালোর অধিকারভেদকে সেখানে এমন
অমানবিক ও নির্মম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যার তুলনা বিশ্বের অন্য কোথাও নেই।
নাদিন গরডিমারকে আমার খুব ঠান্ডা মাথার এবং
সূক্ষ্ম বিচারবোধসম্পন্ন লেখক মনে হয়েছে। তিনি লেখায় সংঘর্ষের বর্ণনা দেন না,
এমনকি তাঁর ক্ষুব্ধ মনের অবস্থাও সরাসরি প্রকাশ করেন না। তিনি বরং কৌশলে
প্রতিবাদের বিষয়টি তুলে ধরেন। সেজন্যে প্রতীকের আশ্রয় নেন। আর এ সবকিছুকেই তিনি
উপস্থাপিত করেন গভীর মমতার সঙ্গে। এখন আমরা দুটি উপন্যাসের ভিত্তিতে লেখকের
জীবনদর্শন তুলে ধরার চেষ্টা করবো। উপন্যাস দুটি হচ্ছে – এক. The Conservationist (সংরক্ষণবাদী);
দুই. July’s
People
(জুলাইয়ের লোকজন)।
গরডিমার-রচিত উপন্যাসসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে The Conservationist। এর কেন্দ্রীয়
চরিত্র মেহরিন একজন শ্বেতাঙ্গ সংরক্ষণবাদী। অগাধ সম্পদের মালিক সে। গ্রামে
(ট্রান্সভাল নামের জায়গায়) তার চারশো একর জমির খামার এবং শহরে একটি বিলাসবহুল
ফ্ল্যাট আছে। আছে অনেক দোকানপাট। সে মাঝে মাঝে বিদেশ ভ্রমণ করে এবং আনন্দ-ফুর্তির
ভেতর জীবন কাটায়। মেহরিনের ব্যক্তিগত জীবন কিন্তু মসৃণ নয়। তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে
আলাদা থাকে। তার ছেলেটি বিদেশে পড়াশোনা করে এবং পিতার সঙ্গে তার সম্পর্ক মূলত
অর্থনৈতিক। মেহরিনের বয়স পঞ্চাশের নিচে। মেয়েরা তার প্রতি খুবই আকর্ষণ অনুভব করে।
সে এখন এক বামপন্থী মহিলার সঙ্গে থাকে। এ নতুন সঙ্গিনী তাকে ভালোবাসে কিনা তা
স্পষ্ট নয়। তবে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ, সন্তানের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক এসব নিয়ে সে
বিচলিত নয়। সে শুধু ভাবে, কীভাবে সে তার ধন-সম্পদ রক্ষা করবে। ট্রান্সভালের বিশাল
খামারটি দেখাশোনা করে জ্যাবয়াস নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ। খামারসংলগ্ন মসলা-খামারের
দোকান চালায় কতিপয় ভারতীয় কর্মচারী আর খামারের কৃষিকাজ সম্পন্ন করে কয়েকশো বুয়র।

মেহরিনের জীবন মোটামুটি নিশ্চিন্ত-নিরুদ্বেগ।
খামার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে শত শত নিগ্রো তাদের পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেলেও
সেই খামারেই তাদের বিরাট অংশের কর্মসংস্থান হয়েছে। সেজন্য মেহরিন এরকম ভেবে খুশি
থাকে যে, নিগ্রোরা নিজেদের স্বার্থেই তার বিরুদ্ধে যাবে না; তার ক্ষতি করতে পারবে
না। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে সে বিরাট ক্ষতির মুখোমুখি হয়। বন্যায় তার ফসল
ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়। আর একবার আগুনে পুড়ে যায় ক্ষেতের দশ আনা শস্য। কৃষ্ণাঙ্গ
কর্মচারীরা সকলে মিলে ওই কৃষিজমি পুনরায় আবাদযোগ্য করে তোলে। আবার শস্যের সম্ভারে
ভরে ওঠে খামার। কিন্তু নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিজ্ঞতায় ঝানু হতে হতে
কৃষ্ণাঙ্গরা ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। সেটাই একসময় বিস্ফোরণ হয়ে
দেখা দেয়। মেহরিন এক নিগ্রো যুবতীকে গাড়িতে তুলে নিয়ে একদিন তার খামারবাড়িতে ঢোকে
এবং মেয়েটিকে ভোগ করে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে যখন নিগ্রো-অধ্যুষিত এলাকার ক্ষেতের
পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন কিছু কৃষ্ণাঙ্গ যুবক তার ওপর চড়াও হয় এবং তাকে মেরে ফেলে।
গল্পের শেষাংশে মৃত্যু। শুরুতেও মৃত্যুদৃশ্য। প্রতীক খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে The Conservationist উপন্যাসে। কেননা
প্রতীকের ভেতর দিয়েই লেখক প্রতিবাদকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন।

বইয়ের শুরুতেই দেখি, এক ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে
জমির কিনারে। খামার তৈরির উদ্দেশ্যে জমি দখল করায় যেসব নিগ্রো বাস্ত্তচ্যুত হয়ে
দূরে চলে গিয়েছিল এ-লাশ তাদেরই একজনের। পুলিশ লাশটি শনাক্ত করতে না পেরে যেখানে
সেটা পড়ে ছিল সেখানেই মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখে। লোকটি যেখান থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল লাশ
হয়ে সেখানেই ফিরে আসে। প্রতীকী অর্থে সে তার জমির অধিকার ফিরে পায়। অন্যদিকে গরিব
কৃষ্ণাঙ্গদের জমি দখল করে ধনাঢ্য হয়েছিল মেহরিন। তাকে কবর দেওয়া হয় তার খামার
এলাকার বাইরে। এক্ষেত্রে প্রতীকী ব্যঞ্জনা হচ্ছে, যে ভূসম্পদে তার অধিকার ছিল না,
সেখানে তার শেষ আশ্রয় জুটলো না। মেহরিনের মৃত্যুর মাধ্যমে লেখক দক্ষিণ আফ্রিকার
শ্বেতাঙ্গ শাসনের অবসানের কথাই ইঙ্গিতে বলেছেন।

July’s
People
(জুলাইয়ের লোকজন) উপন্যাসে আবার
দেখি অন্য এক বাস্তবতা। এমন একটি কাহিনি বলা হয়েছে এখানে যা  বাস্তবে সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। গল্পে দেখা যায়,
স্বাধীনতা অর্জনের উদ্দেশ্যে নিগ্রোরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। লড়াইয়ে
শ্বেতাঙ্গরা পরাজিত হচ্ছে এবং পালানোর পথ খুঁজছে। সব জায়গায় প্রতিশোধের আগুন
জ্বলছে দাউদাউ করে। বড় শহরগুলোতে সংঘর্ষের প্রকোপ বেশি। জোহানেসবার্গ, কেপটাউন,
প্রিটোরিয়া, প্রভৃতি শহরের এয়ারপোর্টগুলো উপচে পড়েছে সাদা মানুষে, যারা পালিয়ে
বাঁচতে চাইছে। কিন্তু পালানো খুবই কঠিন, কেননা চারদিকে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। রেডিও,
টেলিভিশন স্টেশন এখন নিগ্রোদের দখলে।

মরিন স্মেইলস তার স্ত্রী ব্যাম ও বাচ্চাদের নিয়ে
প্রিটোরিয়া ত্যাগ করতে পারেনি। যে-কোনো মুহূর্তে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায়    ভীত-সন্ত্রস্ত তারা গৃহেই বন্দি হয়েছিল।
জুলাই তাদের কৃষ্ণাঙ্গ চাকর।
এ-পরিস্থিতিতে জুলাই শ্বেতাঙ্গ পরিবারটিকে তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে
আত্মগোপন করে থাকার পরামর্শ দেয়। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর স্মেইলস পরিবার এক গভীর
রাতে তাদের ল্যান্ডরোভারে চড়ে বসে। চরম বিপদের সম্ভাবনার ভেতর জুলাইয়ের জোগানো
সাহস ও সহযোগিতার ওপর ভর করে তারা ছশো কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। অবশেষে
নিগ্রো-অধ্যুষিত একটি ছোট্ট গ্রামে তারা আশ্রয় নেয়।

জুলাইদের বাড়িটা মাটির তৈরি। সেখানে টয়লেট বা
স্নানাগার নেই। গোসল, মলমূত্র ত্যাগের মতো কাজগুলো তারা সম্পন্ন করে থাকে জঙ্গলে
বা নদীতে। তাদের খাদ্যাভ্যাসও ভিন্ন ধাঁচের। যা হোক আধুনিক সভ্যতার
সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র পরিবেশে এসে পড়াটাকে স্মেইলসরা বিধিলিপি হিসেবে মেনে
নেয়, যেহেতু তাদের সামনে বিকল্প কিছু ছিল না। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে
নিতে, অভাবিত লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত হতে হতে এ-সাদা মানুষগুলো উপলব্ধি করে যে, তাদের
নিজেদের মানবিক সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন ঘটছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভেতর,
বাবা-মায়ের সঙ্গে বাচ্চাদের সম্পর্কের ভেতর নতুন মাত্রা যোজিত হচ্ছে। নিগ্রো
সমাজের জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে তারা এও লক্ষ করে, কৃষ্ণাঙ্গদের শুধু
নিজেদের পরিবারের মধ্যকার নয়, এক গোত্র থেকে আরেক গোত্রের মধ্যকার সম্পর্ক,
রীতিনীতির বৈচিত্র্য শ্বেতাঙ্গ সমাজব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। জীবনাচরণে ও
কর্মক্ষেত্রে নিগ্রোরা অনেকখানি স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। আজ্ঞাবহ বলতে যা বোঝায়
তারা ঠিক সেরকম নয়।

উপন্যাসের শেষে জুলাইয়ের শ্বেতাঙ্গ প্রভুর স্ত্রী
পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অস্বস্তিকর গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা
করলেও মহিলা আসলে ভেতরে ভেতরে হাঁপিয়ে উঠেছিল। কিন্তু পালিয়ে সে কোথায় যাবে?
কতদূরইবা যেতে পারবে? তবু বেদনাবিহবল, নিয়তিতাড়িত সে মাঠ পেরিয়ে, মাটির ঢিবি
ডিঙিয়ে এগোয়। বালুমাটি, পাথুরে পথ, চড়াই-উতরাই শেষে সে নদীতে এসে নামে। বুকপানি
পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে থমকে দাঁড়ায়!

উপন্যাসটি পড়তে পড়তে – বিশেষ করে এর প্রথম অংশ –
আমার মনে পড়ে গেছে আলব্যেয়র কামুর কথা। কামুর The Pleague উনপ্যাসে
প্লেগ-আক্রান্ত শহরটি থেকে বাইরে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটা করা হয় যাতে
আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে রোগটি বাইরে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ছড়াতে না পারে। এর
ফলে নিদারুণ এক সংকটের সৃষ্টি হয়। যারা এখনো সুস্থ আছে তাদের প্লেগে আক্রান্ত
হওয়ার ভয়, অন্যদিকে পালিয়ে যেতে না পারার ব্যর্থতা – দুয়ে মিলে যে টেনশনের আবহ
সৃষ্টি করেছেন কামু তা বিশ্বসাহিত্যে অতুল। গরডিমার বর্ণিত প্রিটোরিয়ার শ্বেতাঙ্গ
পরিবারটিও সমজাতীয় রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির শিকার।

নাদিন গরডিমার ইতিবাচক অর্থে পরিবর্তনকামী লেখক।
খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায়, তিনি সমন্বয়বাদীও বটে। তিনি কল্পনা করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার
শাসনভার নিগ্রোদের হাতে ন্যস্ত। শ্বেতাঙ্গরা সেখানে বাস করতে পারবে যদি তারা
‘কালো’দের শাসনব্যবস্থা মেনে নেয়। The Conservationist উপন্যাসের
প্রসঙ্গে আবার আসি। পাঠকের কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রয়োজনে লেখক
কিছু কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। যেমন, তিনি কৃষি খামারের কর্মীদের বিবরণ দিয়েছেন
মেহরিনের স্মৃতি থেকে। মেহরিনের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত থেকেই তারা নিজেদেরকে
প্রকাশ করেছে। কোনো অবস্থাতেই মানুষ একা থাকতে পারে না। মেহরিনও পারেনি। সে
শ্বেতাঙ্গ হয়েও কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে মিলেমিশে থেকেছে। একসঙ্গে কাজ করতে করতে
নিগ্রোরাও মেহরিনের সত্তার সঙ্গে অনেকখানি মিশে গেছে। গরডিমার সুকৌশলে, খুব
সতর্কতার সঙ্গে পার্থক্য বজায় রেখেও সাদা-কালোর ভেতর সমন্বয় ঘটিয়েছেন। তিনি কোনো
অবস্থায়ই বিবাদ ও বৈরিতাকে সমর্থন করেননি। চেয়েছেন উভয়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
চেয়েছেন, সাদা মানুষরা কালো মানুষদের উন্মূলতার বেদনা বুঝুক; যদিও জানেন, তা
সুদূরপরাহত।

July’s
People
-কে মনে হয়েছে একটি দুঃসাহসী রচনা, যার ভেতর দিয়ে  লেখক এক সম্ভাব্য সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে
চেয়েছেন। সেটা হচ্ছে, দক্ষিণ আফ্রিকার নিগ্রোরা তাদের আদিভূমির অধিকার একদিন ফিরে
পাবে। গরডিমার বলেছেন, মানুষ যখন কোনো কিছুতে আচ্ছন্ন থাকে তখন তারা ঘুম আর
জাগরণের একটা মাঝামাঝি অবস্থায় থাকে। এ হচ্ছে সেই অস্পষ্ট মানসিক অবস্থা যার
অভিজ্ঞতার আলোয় শ্বেতাঙ্গ মানুষরা নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে বুঝতে শিখেছে। অবারিত
গ্রাম-প্রকৃতির ভেতর এসে স্মেইলসরা নতুন অনুভূতির স্বাদ পেয়েছে। আপন মনের ভিন্ন
বাস্তবতা ও নৈসর্গিক নির্জনতাকে আবিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছে তারা। বাতাসের বা
পাখির উড়ে যাওয়ার শব্দের ভেতর দিয়ে, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীর চলাচলের মধ্যেও যে
নির্জনতার অনুভব টের পাওয়া যায় তা মানবস্বভাবের খুব ভেতরের জিনিস। এগুলো সূক্ষ্ম
বিষয়, কিন্তু মনোযোগী পাঠকের মনে তা নিশ্চয় দাগ কাটবে। ভিন্ন পরিস্থিতিতে এবং
পরিবেশে মানুষের সামাজিক ভূমিকা কত আশ্চর্যজনকভাবে পালটে যায় তার উজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত এ-উপন্যাস। প্রিটোরিয়ায় জুলাই তার প্রভু কিংবা প্রভুপত্নীর নির্দেশমতো
কাজ করতো। জুলাইয়ের গ্রামের বাড়িতে নতুন জীবনের মধ্যে এসে পড়ায়, দেখা যাচ্ছে, সেই
প্রভুই কাজকর্ম করছে তাদের ভৃত্যের নির্দেশ মোতাবেক! এটা তারা করতে বাধ্য হচ্ছে,
কারণ তারা নিরুপায়।

ভাষার ক্ষেত্রে জটিলতার শিল্প তার আরাধ্য না হলেও
নাদিন গরডিমারের উপন্যাসশৈলী ঠিক সরল নয়। ব্রিটিশদের কিংবা আমেরিকানদের মতো ইংরেজি
তিনি লেখেন না। গদ্যটি তাঁর স্বরুচিনির্ণীত। শ্বেতাঙ্গদের ভাষা ছাড়াও ভারতীয়দের
এবং নিগ্রোদের বিভিন্ন গোত্র-সম্প্রদায়ের ভাষা প্রযুক্ত হয়েছে তাঁর লেখায়।
সিনট্যাক্সের ভেতর এসব শব্দের ব্যাখ্যা মেলে অধিকাংশ সময়েই। সেজন্যে বুঝতে অসুবিধা
হয় না। হেমিংওয়ে ও অন্য কারো কারো মতো গরডিমারের কথা সাহিত্য সংলাপনির্ভর নয়। তাঁর
রচনা বিবরণমূলক এবং মাঝে মাঝে কবিতার আভায় ঋদ্ধ। এ বর্ণনা আবার নানারকম। ঘটনা বা
কাজের বর্ণনা তো আছেই। আরো আছে আচরণের বর্ণনা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বর্ণনা, এমনকি
মানসিক অবস্থার বর্ণনাও। বিবরণের মধ্যে হঠাৎ দেখা যায়, চরিত্ররা এসে কথাবার্তা
বলছে। এটাও তাঁর গদ্যের একটা বৈশিষ্ট্য।

শেয়ার করুন

Leave a Reply