প্রান্তিকের কণ্ঠস্বর : মহাশ্বেতা দেবী

লেখক:

বদরুন নাহার

বাংলা সাহিত্যে বিষয়ের বহুমাত্রিকতা ও দেশজ আখ্যানের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন মহাশ্বেতা দেবী। তিনি ইতিহাস থেকে রাজনীতি থেকে যে-সাহিত্য রচনা শুরু করেন, তা শোষিতের আখ্যান নয় বরং স্বদেশীয় প্রতিবাদী চরিত্রের সন্নিবেশ বলা যায়। প্রতিবাদী জীবন ও সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র ঘরানার লেখক তিনি। সামাজিক দায়বোধ থেকেই তিনি তাঁর সেই উপেক্ষিত ইতিহাসের নায়কদের তুলে আনেন। এ-প্রসঙ্গে তিনি অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের ভূমিকায় বলেছিলেন – ‘লেখক হিসাবে, সমকালীন সামাজিক মানুষ হিসাবে, একজন বস্ত্তবাদী ঐতিহাসিকের সমস্ত দায় দায়িত্ব বহনে আমরা সর্বদাই অঙ্গীকারবদ্ধ। দায়িত্ব অস্বীকারের অপরাধ সমাজ কখনোই ক্ষমা করে না। আমার বীরসা-কেন্দ্রিক উপন্যাস সে অঙ্গীকারেরই ফলশ্রুতি।’

মহাশ্বেতা দেবী আজীবন সংগ্রামী চিন্তা চর্চা করেছেন এবং দেশ ও মানুষ সর্বপ্রকার শোষণমুক্ত হবে সেই লক্ষ্যে সাহিত্য রচনা করে চলেছেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন। তাঁর সংগ্রাম চলেছে সাহিত্যচর্চা এবং জীবনচর্চার মাধ্যমে। পারিবারিকভাবেই তিনি এক সাহিত্যবেষ্টিত পরিমন্ডলে বড় হয়েছেন এবং সাহিত্যকেই জীবনে বেছে নিয়েছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে দুটি কবিতা উপহার দিয়েছিলেন।

মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে বাংলাদেশের এক খ্যাতনামা পরিবারে। তাঁর বাবা মনীশ ঘটক বিশিষ্ট সাহিত্যিক এবং চাচা ঋত্বিক ঘটক ভারতের চলচ্চিত্রের এক ব্যতিক্রমী প্রতিভার শ্রদ্ধেয়জন। ঢাকার ইডেন স্কুলের মন্টেসরিতে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীকালে মেদেনীপুরে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩৬ সালে তিনি পড়াশোনা করতে শান্তিনিকেতনে যান। এ-সময় মাত্র দুই বছর শান্তিনিকেতনে কাটালেও তা ছিল তাঁর জীবনের উলেস্নখযোগ্য সময়। তখনই তাঁর লেখালেখির শুরু। ১৯৩৯ সালে তিনি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন, তখন খগেন্দ্রনাথ  সেন-সম্পাদিত রংমশাল পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর রবীন্দ্রনাথ-সম্পর্কিত রচনা ‘ছেলেবেলা’। ১৯৩৯ সালে তিনি কলকাতায় চলে আসেন, সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ১৯৪২ সালে আশুতোষ কলেজে ভর্তি হন।

১৯৪৩-এ পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় মহাশ্বেতা দেবী প্রথম বর্ষে পড়েন এবং কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রী সংগঠন ‘Girls Student Association’ এবং দুর্ভিক্ষ ত্রাণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির মিটিংয়ে যোগ দিতেন, পার্টির মুখপত্র Peoples War, জনযুদ্ধ বিক্রি করতেন এবং সে-পত্রিকার নিয়মিত পাঠকও ছিলেন। তবে পার্টির মেম্বার না হয়ে এভাবেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মূলত তখন থেকেই তাঁর কর্মীসত্তার বিকাশ, যা পরবর্তীকালে তাঁর জীবনে আরো প্রকট হয়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে মহাশ্বেতা ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে, বিএ পড়তে। ১৯৪৬ সালে আবার কলকাতায় ফিরে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ পাশ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমএ ভর্তি হন। কিন্তু তখন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পড়াশোনা ব্যাহত হয়। ১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট নাট্যকার এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসার-জীবন ছিল দারিদ্র্য-পরিবেষ্টিত, এ-সময়ে মহাশ্বেতা দেবী রং-সাবান, রঙের গুঁড়া ফেরি করেন, ছাত্র পড়ানো শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে তাঁর একমাত্র পুত্র নবারুণ ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। তাঁদের সংসার-জীবন পনেরো বছরের বেশি টেকেনি। কিন্তু মহাশ্বেতা দেবী নিজেই পরবর্তীকালে বিজন ভট্টাচার্য সম্পর্কে বলেন – ‘Bijan has shaped my talent and given it permanent form. He has made me into what I am today.’

তিনি সুমিত্রা দেবী ছদ্মনামে সচিত্র ভারত পত্রিকায় ফিচার এবং গল্প লেখা শুরু করেন। যদিও ১৯৪৯ সালে ইনকাম ট্যাক্সে কেরানির চাকরি পান, কিন্তু সে-চাকরি তাঁর করা হয় না। এরপর তিনি কেন্দ্রীয় সরকারে পোস্টাল অডিটে আপার ডিভিশন ক্লার্কের চাকরি নেন। কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক সন্দেহে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন, পরবর্তীকালে পুনর্বার চাকরিতে বহাল হলেও তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সরকারি চাকরিতে ফেরেননি।

দীর্ঘ পড়াশোনা বিরতির পর ১৯৬৩ সালে তিনি প্রাইভেটে ইংরেজিতে এমএ পাশ করেছেন এবং ১৯৬৪ সালে তিনি ইংরেজি অধ্যাপনায় প্রবেশ করেন বিজয়গড় জ্যোতিষ রায় কলেজে। ইতিমধ্যে তাঁর প্রথম বই ঝাঁসীর রানী (১৯৫৬) সালে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে তিনি লেখাকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ইতিহাস তাঁর সাহিত্যজীবনে সব সময়ই গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। তিনি মনে করতেন, ইতিহাসের মুখ্য কাজই হচ্ছে একইসঙ্গে বাইরের গোলমাল, সংগ্রাম ও সমারোহের আবর্জনা এবং ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জনবৃত্তকে অন্বেষণ করা, অর্থ ও তাৎপর্য দেওয়া। এর মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে সমাজনীতি ও অর্থনীতি, যার মানেই হলো লোকাচার, লোকসংস্কৃতি, লৌকিক জীবনব্যবস্থা। তাঁর প্রথমদিকের সাহিত্যকর্মে এই প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। তিনি ঐতিহাসিক পটভূমিকায় খুদাবক্স ও মোতির প্রেমের কাহিনি নিয়ে ১৯৫৬ সালে নটী উপন্যাসটি লেখেন। এছাড়া প্রথম পর্যায়ে তিনি লোকায়ত  নৃত্য-সংগীতশিল্পীদের নিয়ে লিখেছেন মধুরে মধুর (১৯৫৮), সার্কাসের শিল্পীদের বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে লেখেন প্রেমতারা (১৯৫৯)। এছাড়া যমুনা কী তীর (১৯৫৮), তিমির লগন (১৯৫৯), রূপরাখা (১৯৬০), বায়োস্কোপের বাক্স (১৯৬৪) প্রভৃতি উপন্যাস। মহাশ্বেতা দেবী নিজের লেখা সম্পর্কে নিজেই সমালোচক হয়ে উঠেছেন কখনো কখনো, ইতিহাস চর্চা আর সমাজ সচেতনতায় দৃঢ় হয়ে ওঠেন বলেই যেন তাঁর প্রথম পর্বের দুটো উপন্যাস তিমির লগন ও রূপরাখাতে ব্যক্তির সুখ-দুঃখ যখন কোনো সামাজিক তাৎপর্য বহন করে না বলে মনে করেছেন, তখন তিনি এ-সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেন – ওই বই দুটো আর ছাপবেন না। আবার অন্যদিকে গভীর সামাজিক তাৎপর্য থাকার জন্য, প্রথম প্রকাশের কুড়ি বছর পরেও ‘বিষয়বস্ত্তর চিরকালীনতা ও প্রয়োজনীয়তা আজও’ রয়েছে বলে মহাশ্বেতা দেবী মনে করেন, মধুরে মধুর…আজকের পাঠকের কাছে বইটি থাকা দরকার। ‘দু-অর্থে। আমার লেখার বিবর্তনের সাক্ষ্যে এবং ব্যক্তি সংগ্রামের যাথার্থ্যে।’

১৯৬২ সালে বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। সংসার ভেঙে গেলেও ছেলের জন্য খুব ভেঙে পড়েছিলেন। সে-সময় তিনি অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করতেও গিয়েছিলেন, চিকিৎসকদের চেষ্টায় বেঁচে যান। হাজার চুরাশির মা উপন্যাসে তিনি ছেলে থেকে বিচ্ছিন্ন হবার যন্ত্রণার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন বলে জানান। এরপর তিনি অসিত গুপ্তকে বিয়ে করেন ১৯৬৫ সালে,  কিন্তু সেই সংসারও ১৯৭৬ সালে ভেঙে যায়। নিঃস্বঙ্গ জীবন, বিচ্ছেদ-বিরহ-বেদনায় তিনি নিজেকে সঁপে দেন লেখা এবং শিক্ষার ব্রতে। তাঁর পরিবর্তিত জীবনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সাহিত্যকর্মেও যে পরিবর্তন এসেছিল, এ-প্রসঙ্গে মহাশ্বেতা দেবী জীবন ও দর্শন নিয়ে কল্যাণ মৈত্রের সঙ্গে আলাপচারিতায় সেই সন্ধিক্ষণকে কাটিয়ে ওঠা প্রসঙ্গে বলেন – ‘… স্রেফ লিখে। হাজার চুরাশির মা লিখেছিলাম ওই সময়েই। উপন্যাসটা পড়লে বোঝা যাবে। আর ওই সময় আমি অসম্ভব ঘুরে বেড়াতে লাগলাম – তার একমাত্র কারণ ছিল এটাই। মনের একটা কষ্টকে চাপতে চেষ্টা করছি। হয়তো এটাই আমার জীবনে একটা টার্নিং পয়েন্ট। ওই সময় দিনে চোদ্দো-পনেরো ঘণ্টা কাজ করেছি।… এদিকে আমি কোয়ালিটি রাইটিংয়ের দিকে মন দিলাম, অন্যদিকে আদিবাসীদের মধ্যে কাজ শুরু করলাম। এই দিকটা অবশ্যই আমার লেখাকে সমৃদ্ধ করতে শুরু করেছিল। একটা না দেখা ওয়ার্ল্ড, কেউ জানে না, বোঝে না। তার সমস্ত অনুভূতিগুলি ক্ষোভ-দুঃখগুলি আমার লেখার সঙ্গে খুব মিশে যাচ্ছিল।’

এভাবেই যেন মহাশ্বেতা দেবী স্বপ্রকৃতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯৬-এর ডিসেম্বরে ঢাকায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে আলাপে –  ‘আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ঝাঁসীর রানী ১৯৫৬ সালে। বইটি লিখে আমি টাকা পেয়েছিলাম। সেই থেকে আমি প্রফেশনাল লেখাতে বিশ্বাসী। লেখা আমার প্রফেশন, আমার আর কোনো জীবিকা নেই। মাঝখানে ক’বছর কলেজে পড়িয়েছিলাম, সতেরো শ’ টাকা মাইনে হতো, মনে হলো যে মহাপাপ করেছি, তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিলাম। আমি যেন নিজের গুরুত্ব ভুলে যাচ্ছি। আসলে লেখাই আমার জীবিকা ছিল। আমি বিশ্বাস করি, খুব কমিটেড, খুব অল্প লোকের মধ্যে দাম থাকবে।’

এরপর তিনি ষাটের দশকের মাঝামাঝি এসে যে-উপন্যাসগুলো লেখেন, তাকে তাঁর দ্বিতীয় পর্বের সাহিত্যকর্ম বলা যেতে পারে।  এ-সময় তিনি আলোচিত কিছু উপন্যাস লেখেন। এগুলোর মধ্যে অাঁধার মানিক (১৯৬৬), কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু (১৯৬৬), হাজার চুরাশির  মা  মা (১৯৭৪) উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে তিনি রাজনৈতিক চেতনার ও ইতিহাস-আশ্রিত কাহিনী যেমন লিখেছেন, তেমনি তাঁর্োদিবাসীকেন্দ্রিক উপন্যাসের সূচনাও ঘরে এ সময়। হাজার চুরাশির মা এ-সময়ে লেখা তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস হলেও কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসটি একটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস এবং আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসের শুরুও এ-উপন্যাস থেকে বলা যায়।

উপন্যাসসাহিত্যে রাজনীতি এসেছে পূর্ণ অবয়বে, যেখানে তিনি রাজনৈতিক অন্ধকার দিকগুলোকেও উপন্যাসের শৈলীতে নিয়ে এসেছেন। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক উপন্যাস হাজার চুরাশির মা (১৯৭৪)। এই উপন্যাসকে তাঁর সাহিত্যের বাঁক পরিবর্তনের সূচনা বলে মনে করা হয়। এ-সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন-সাহিত্য ও দর্শনের নতুন সত্তার প্রকাশ ঘটে। ঘরে ফেরা (১৯৭৯) উপন্যাসেও রাজনৈতিক অন্তঃবিশ্লেষণের ভিন্ন প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এ-সময় তিনি ছোটগল্পেও এই ভাবধারার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। 

মহাশ্বেতা দেবী মনে করেন, সাহিত্য শুধু হৃদয়গ্রাহ্যতা নয়, মস্তিষ্কগ্রাহ্যতাও চাই। তিনি আরো জানান, পাঠক-সমালোচককে আজ এ-কথা বুঝতে হবে যে আমি যা-যা লিখেছি তার মধ্য দিয়ে এটাই বলতে চেয়েছি যে, যা-যা ঘটেছে তা শুধু আজই ঘটছে না, চিরকালই ঘটে আসছে।, তাঁর মতে, লেখকের কাজ হলো ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে সেই ঘটনাবলিকে স্থাপন করা। তিনি প্রায়শ একথাও বলে থাকেন যে, তিনি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ। মহাশ্বেতা দেবী দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছেন যে জনমানুষের সঙ্গে, তাদের বড় একটি অংশ হলো আমাদের প্রান্তিক দলিত জনগোষ্ঠীর গোত্রভুক্ত। সত্তরের মাঝামাঝি সময়ে মহাশ্বেতা দেবী তাঁর সাহিত্যকে উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রতিবাদী আখ্যান থেকে আরো গভীরে নিয়ে গেলেন, আর বাংলা সাহিত্যে নিয়ে এলেন একেবারে সভ্য সমাজের মানুষের বিচরণের বাইরের জগৎ। ইতিহাস অনুসন্ধানে তিনি চলে গেলেন একেবারে প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে। ইতিহাস, রাজনীতি ও উপকথাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় প্রান্তিক আদিবাসীদের জীবনসংগ্রামের কথ্য ইতিহাসকে নিয়ে এলেন সুসভ্য নাগরিকদের পাঠ্যে। তাঁর এই মানসদৃষ্টি নিছক সমাজতাত্ত্বিক নয়, বরং সমাজ মনস্তাত্ত্বিকের। তাঁর সাহিত্যের প্রেক্ষাপটেও এই বিশ্লেষিত দৃষ্টির প্রতিফলন হয়। ব্রাত্যজনের দলিত হবার ইতিহাসকে সুরক্ষার সংগ্রামে ব্যপ্ত হয়ে ওঠেন মহাশ্বেতা দেবী। অরণ্যচারী জনগোষ্ঠীর মুখে মুখে ঘুরে ফেরা জীবন ও ঐতিহ্য থেকে সেই জাতিসত্তার যে ইতিহাস তিনি রচনা করেন, যা তাঁর সাহিত্য জীবনের তৃতীয় পর্ব বলা যায়। এ-সময় তাঁর লেখায় সাব-অলটার্ন ভাবধারার উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। মহাশ্বেতা অন্ত্যজ আদিবাসীদের চোখ দিয়ে জীবনকে ব্যাখ্যা করেন। তাদের পুরাণকথার ভেতর দিয়ে ইতিহাস তুলে আনেন, তা ছিল আধিপত্য বিস্তারকারী হেজিমনি (hegemonic) শ্রেণির নয়, বরং শোষিত দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। প্রান্তিক কণ্ঠস্বরকে তুলে এনেছেন মূলস্রোতের মানুষের সাহিত্যে। যা নিচের দিক থেকে ইতিহাসকে দেখবার ইঙ্গিত বহন করে, ওপরের দিক থেকে নয়। যা সাব-অলটার্ন স্টাডিজের অংশ হয়ে দেখা দেয়। মার্কসবাদে সাব-অলটার্ন শব্দটির ব্যবহার পুরনো। আন্তেনিও গ্রামশির (১৮৯১-১৯৩৭) তাঁর বিখ্যাত কারাগারের নোটবুক বইটিতে এ-সম্পর্কিত আলোচনার অবতারণা করেন। গ্রামশির মতে, কৃষকদের পক্ষে কলম ধরতে হবে বুদ্ধিজীবীদের। মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক, ভৌগোলিক পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিবর্তনের ধারায় সে-দেশীয় আদিবাসী জীবনের পরিবর্তনকে বর্ণনা করেন। পাহাড়ি অরণ্য জীবনের সঙ্গে ফুটে ওঠে পরিবেশের বিপন্নতার চিত্র, যা আজকের পৃথিবীকেও বিচলিত করে, সেই আখ্যান সাহিত্যে রূপ দিয়ে আদিবাসী জীবনে ঘটে যাওয়া উলগুলান (১৯০০), কোলহান (১৮৩৫) এবং হুলকে (১৮৫৫-৫৬) নিয়ে আসেন। একের পর এক আদিবাসীদের নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন তিনি। তাঁর আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলোর হলো : কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু (১৯৬৭), অরণ্যের অধিকার (১৯৭৫), চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর (১৯৮০), সুরজ গাগরাই (১৯৮৩), টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথা (১৯৮৭), ক্ষুধা (১৯৯২) এবং কৈবর্ত খণ্ড (১৯৯৪) প্রভৃতি। উল্লিখিত উপন্যাসগুলো ছাড়াও আরো বেশ কিছু উপন্যাসে মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসী প্রসঙ্গ এনেছেন, তবে তা বিচ্ছিন্নভাবে। এছাড়া তিনি আদিবাসীদের নিয়ে প্রচুর ছোটগল্পও লিখেছেন, গল্পগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ্য – শালগিরার ডাকে (১৯৮২), ইটের পরে ইট (১৯৮২), হরিরাম মাহাতো (১৯৮২), সিধু কানুর ডাকে (১৯৮৫) প্রভৃতি। এই সব গল্প-উপন্যাসে তিনি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামরিক নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে যেমন আদিবাসী প্রতিবাদী চরিত্র চিত্রিত করেছেন, তেমনি এদেশীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার শোষণের প্রতি প্রতিবাদ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরে তুলে ধরেছেন। সাব-অলটার্ন উত্তরাধুনিকতারই এক স্টাডিজ। সেক্ষেত্রে বলা যায়, পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্রে সাব-অলটার্ন আসার আগে থেকেই মহাশ্বেতা তাঁর নিজের মতো করে সাব-অলটার্ন চর্চা করেছেন। কারণ সাব-অলটার্ন স্টাডিজ সংকলন প্রথম প্রকাশিত হয়, ১৯৮২ সালে। সাব-অলটার্ন গবেষকদের মধ্যে অন্যতম – জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, ডেভিড হার্ডিম্যান, রণজিৎ গুহ, শাহিদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক প্রমুখ।
রণজিৎ গুহর মতে, উচ্চবর্গ বলতে বোঝাতে চেয়েছেন যারা ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষে প্রভুশাসনের অধিকারী ছিল। এদের অবস্থানকে তিনি দুই স্থান থেকে দেখেছেন। প্রথমত দেশি, দ্বিতীয়ত বিদেশি। এরা আবার দুই ধরনের, সরকারি ও বেসরকারি। সরকারি বলতে ঔপনিবেশিক অভারতীয় কর্মচারী ও ভৃত্য। বেসরকারি বলতে অভারতীয় শিল্পপতি, বণিক, অর্থ ব্যবসায়ী, খনির মালিক, নীলকুঠি, চা-কফি বাগানসহ এইসব সম্পত্তির মালিক, খ্রিষ্টান মিশনারির যাজক, পরিব্রাজক এমনকি ভারতীয় জমিদার-জোতদার শ্রেণি। অন্যদিকে এই ব্যক্তিবর্গকে বাদ দিলে যারা থাকে তাদেরই নিম্নবর্গ বলে গণ্য করেছেন রণজিৎ গুহ। তিনি নিুবর্গের ইতিহাস হিসেবে যে-ব্যাখ্যা টানেন তাতে সাঁওতালদের একটি বিখ্যাত যুদ্ধ সিধু-কান্হুর পূজার কথা উল্লেখ করেন।
এই তাত্ত্বিকদের আলোচনার আগেই মহাশ্বেতা দেবীর কথাসাহিত্যে শোষক আর শাসকশ্রেণির যে-দ্বন্দ্ব এবং চরিত্র পরম্পরায় যারা উঠে এসেছে তা সাব-অলটার্ন তাত্ত্বিকদের নিুবর্গ ও উচ্চবর্গের শ্রেণিকরণের ব্যাখ্যায় স্থাপন করলে যথার্থ হবে। মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক সাহিত্য নির্মাণের ক্ষেত্রে ঘটনার নাটকীয়তার চেয়ে মানব-চরিত্রের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন। তাঁর আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক সাহিত্য রচনার বেশিরভাগ প্রধান চরিত্র সেই শ্রেণি থেকে উঠে আসা মানুষ। অরণ্যের অধিকারে বীরসা মুন্ডা, ধানী মুন্ডা, সুগানা, করমি, কোমতা, সালী ও ডোনকা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর উপন্যাসটিতে চোট্টি মুন্ডা, ধানী মুন্ডা, দুখিয়া, হরমু ও পাহানসহ অসংখ্য চরিত্র মুন্ডা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। এছাড়া কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যুতে বন্দ্যঘটী গাঞি, সুরজ গাগরাইয়ের সুরজ গাগরাই, নান্দি কালু সুমরাই প্রমুখ আদিবাসী মানুষ। টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথার বিখিয়া প্রভৃতি চরিত্র উল্লেখ্য।
তাঁর এই সাহিত্যকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ধীমান দাশগুপ্ত বলেন – ‘বাংলা সাহিত্যে রিয়ালিজমের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবক্তা এবং রূপকার মানিক বন্দ্যোপ্যাধ্যায় – সেই রিয়ালিজমের বিশেষ একটি ধারার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার হলেন মহাশ্বেতা দেবী। … মহাশ্বেতার সাহিত্যিক ক্ষেত্রটিকে, তাই বলা যায়, মানিকের রিয়ালিজম, সতীনাথের ফর্মালিজম এবং তারাশঙ্করের এক্সপ্রেশনিজমের এক একীভূত ক্ষেত্র। আমার বিচারে মানিক বা তারাশঙ্করের চেয়েও সতীনাথের সঙ্গে মহাশ্বেতার আত্মীয়তা যেন অধিক।…সতীনাথের মতোই মহাশ্বেতাও ‘শ্রেণী বিভক্ত বর্ণবিচ্ছুরিত যৌনতাশাসিত ধর্মসাপেক্ষ প্রাদেশিকতা-নির্ভর’ এক ভারতবর্ষের লেখক।
মহাশ্বেতা দেবী বাংলা উপন্যাসে দলিত শ্রেণির মানুষজনের সর্বাধিক উপস্থিতি ঘটিয়েছেন। Oral tradition-এ যেই আদিবাসীদের ঐতিহ্য, যাদের প্রকৃতপক্ষে লিপি অনুপস্থিত বলে লোককথা, মিথ এবং উপকথার লিখিত রূপ পাওয়া যায়নি। জনজীবন থেকে এগুলো সংগ্রহ করে তাকে আখ্যানকাব্যের বিবরণ ও কথকতায় সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন মহাশ্বেতা দেবী এবং সেই কথাসাহিত্যে কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদের স্বর। সাব-অলটার্ন স্টাডিজের অন্যতম বিশ্লেষক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক প্রশ্ন তুলেছিলেন – ‘দলিতরা কি কথা বলতে পারে?’ তাঁর এই প্রশ্নের উত্তর আমরা মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসের বীরসা, চোট্টি, সুরুজ গাগরাই, কোসিলা প্রমুখ চরিত্রের মাঝে খুঁজে পাই, যারা ভিন্ন ভিন্ন আখ্যানে কথা বলে ওঠে। মহাশ্বেতা দেখিয়েছেন কোন অবস্থায় দলিতরা কথা বলে। কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু উপন্যাসে তিনি অন্ত্যজ চুয়াড় যুবক থেকে একেবারেই শিল্পী নির্মাণের লক্ষ্যে তাঁর কবিকে উপস্থাপন করেন। যার মাঝে লেখক সেই সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে চিত্রিত করেন, উপন্যাসের কবির ভাষায় সংলাপে তা ফুটে ওঠে – ‘যুবক বলেছিল জন্মকালে সভের মত আমিও রক্তের দলা মাত্র ছিলাম। সে অবস্থায় নাম আসে না। নাম আসে পরে। ঈশ্বর মানুষ সির্জায়, মানুষ নাম সির্জায়। নাম বস্ত্রের মত, আভরণ অলঙ্কারের মত হে, অঙ্গে তুললে তবে ওঠে। অধম এ নাম সে ভাবে নিয়েছে, মহাজন হে, অবধান কর।’
রাজা তাঁকে রাজকবি বলে মানসম্মান দেবেন। কত ভূমি, কত সোনা, কত গাইবলদ, কবির সর্বাঙ্গে সোনার গহনা। সুখসমৃদ্ধির আশা এমনই কুহকিনী হয়ে কবির অঙ্গে নাচন তুললেও মহাশ্বেতা তার ভেতরের কবির অহংকারও সমভাবে তুলে ধরেন। তাই তো প্রেমিকাকে কবি শোনায় যে-কথা – ‘লিখবেন তিনি, অজস্র পুঁথি লিখবেন! দামুন্যার মুকুন্দরামের কী আর ক্ষমতা! কৃষ্ণদাস কবিরাজের কী বা খ্যাতি! চণ্ডীদাস প্রেমের কথা কী লিখতে পারে। কবি বন্দ্যঘটী গাঞি তাদের চেয়ে, তাদের সকলের চেয়ে বড়ো হবেন।’
কবি যখন তাঁর স্বপ্নে কাছাকাছি কুহকাচ্ছন্ন তখনই ঘটে বিনা মেঘে বজ্রাঘাত। একদল অরণ্যবাসী, অন্ত্যজ চুয়াড় সভায় এসে কবিকে নিজেদের লোক বলে দাবি করে। চুয়াড়দের রাজা মারা গেছে, কবির আসল নাম হচ্ছে কলহন। সে চুয়াড়দের শ্রেষ্ঠ পুরুষ, তারা তাকে রাজা বানাতে ফিরিয়ে নিতে এসেছে। অন্যদিকে ভীমাদল রাজ্যে শুরু হয় কবির এই আত্মপরিচয় গোপন করে কবি খ্যাতি পাবার বিষয়ে তোলপাড়। শূদ্র হয়ে কলম হাতে নেবার জন্য কবির মৃত্যুদণ্ড স্থির হয়। এদিকে চুয়াড়ের রাজা না হলে চুয়াড়রা কবিকে হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে মারতে চায়, অন্যদিকে মিথ্যা ব্রাহ্মণ হওয়ার জন্য রাজদরবারে ফাঁসির আদেশ। এখানে মহাশ্বেতা যেন সাব-অলটার্ন বিষয়টিকেও প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলেন। প্রকৃতপক্ষে দলিতদের কণ্ঠস্বর বলতে আমরা কী বুঝবো সে-বিষয়টিকেও ভাবনার মধ্যে ফেলে দেন।
মহাশ্বেতা দেবীর বিশিষ্টতা এই যে, তিনি বাংলা সাহিত্যে সর্বাধিক আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস রচনা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসের ইতিহাস থেকে চরিত্র নির্মাণ করেন। আর এক্ষেত্রে আদিবাসী সংগ্রামের এবং ভারতীয় সংগ্রামের ইতিহাস থেকে বিপ্লবী এবং বীরের চরিত্র নিয়ে আসেন। যা বাংলা সাহিত্যের সংগ্রামী চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে। তিনি যেমন ইতিহাস থেকে চরিত্র নিয়ে উপন্যাস রচনা করেন, তেমনি তাঁর রচিত উপন্যাসের চরিত্ররা যেন ইতিহাস হয়ে যায়। এক্ষেত্রে শুরুতেই আমরা স্মরণ করতে পারি অরণ্যের অধিকার উপন্যাসটির কথা। এই উপন্যাসের নায়ক বীরসা মুন্ডাকে মহাশ্বেতা দেবী এনেছেন ভারতীয় দলিত সংগ্রামের ইতিহাস থেকে। এক্ষেত্রে মহাশ্বেতা দেবী নিজেই গ্রন্থটির ভূমিকায় বলেছেন – ‘এই উপন্যাস রচনায় সুরেশ সিং রচিত Dust storm and Hanging mist বইটির কাছে আমি সবিশেষ ঋণী। সুলিখিত তথ্যপূর্ণ গ্রন্থটি ছাড়া বর্তমান উপন্যাস রচনা সম্ভব হতো না।’ সুরেশ সিংয়ের বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। যে-বইটি পাঠের পর মহাশ্বেতা তাঁর অরণ্যের অধিকার রচনা করেন ১৯৭৫ সালে। কিন্তু সুরেশ সিংয়ের বই দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে। যে দ্বিতীয় সংস্করণে সুরেশ সিং বইটির নাম দেন Birsa Munda and His Movement-1874-1901। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় এস. সিং উলে�খ করেন মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসের কথা। তিনি বলেন – ‘She (mahasweta) was instrumental in making me revise the work substantially and produce a new edition.’
এই পারস্পরিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, মহাশ্বেতা দেবী যে ইতিহাস বইটির সেই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে উপন্যাস রচনা করেছিলেন; সেই ইতিহাস বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের পূর্বে সুরেশ সিং মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসটি পাঠ করে নিয়েছিলেন। ফলে তিনি মহাশ্বেতার সৃষ্ট বীরসাকে মনে রেখেই তার দ্বিতীয় সংস্করণে সংশোধন এবং সংযোজন করেন। ইতিহাস-গবেষণা ও উপন্যাস রচনার এমন পারস্পরিক সমন্বয় খুব একটা ঘটে না। এ থেকে বলা যায় যে, মহাশ্বেতা দেবী ইতিহাস থেকে এমন চরিত্র নির্মাণ করেন, যা নিজেই ইতিহাস হয়ে যায়।
ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে দলিত মানুষের স্থান দেননি ভারতীয় সরকার এমনকি ইতিহাসবিদগণ। এ-প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক ড. আহমেদ শরীফকেও আক্ষেপ করতে দেখা যায় তাঁর ‘বাংলার সংস্কৃতি প্রসঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধে। তিনি উপেক্ষিত এসব দলিত মানুষের কথা টেনে এনে বাংলার অসম্পূর্ণ ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যারা এই দেশের অধিবাসীন – সেই হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল, বাগদি – যারা শূদ্র, অস্পৃশ্য – তাদের কথা তো বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা হয়নি; তাদের কোন অস্তিত্বও তো আজ পর্যন্ত স্বীকৃত হয়নি। বাঙালির ইতিহাস পূর্ণ অবাঙালি বহিরাগতের বিবরণ দিয়ে। বিদেশী-বিভাষী বিজাতি-বিধর্মী যারা এখানে পরাক্রান্ত হয়ে এসেছে, যারা এখানে ধর্ম নিয়ে এসেছে, তাদেরই রাজত্বের কথা – তাদেরই বিদ্যাবুদ্ধির কথা – তাদের জ্ঞান-গৌরবের কথা, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা আমরা আমাদের বলে দাবি করে গর্বে বুক স্ফীত করছি। যেমন একালের মুসলমানেরা বই লেখে, বই মুখস্থ করে এবং মনে করে যে, তুর্কি মোগলেরা তাদের স্বগোত্র। তারা ভাবে ফিরোজ শাহ, শের শাহ, আকবর, আওরঙ্গজেব, সিরাজদ্দৌলা তাদের স্বজাতি, স্বগোত্র; এবং তাদের শাসনকে নিজেদের রাজত্ব মনে করে গর্বে গর্বিত হতে চাই। স্বদেশের, স্বজাতির আসল পরিচয় গোপন করে নানা কাল্পনিক কাহিনী দিয়ে মন ভরাতে চাই। আজকাল যে কথাটি স্বীকৃত হতে যাচ্ছে, অর্থাৎ আমরা যদি অস্টিক-মঙ্গোলদের বংশধর হই, তাহলে সেই অস্টিক-মঙ্গোলেরা চিরকাল এদেশে ছিল নির্জিত, নিপীড়িত। তাদের অধিকাংশ মানুষ এখনও নিুবিত্তের অস্পৃশ্য। তারা কখনও মানুষ হিসাবে স্বীকৃত হয়নি। তাদের মধ্যে যারা বনে-জঙ্গলে পালিয়ে গেছে তারা সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া ইত্যাদি।’
কিন্তু সাহিত্যিক হিসেবে মহাশ্বেতা দেবী সেই অলিখিত ইতিহাসের লেখক হয়ে ওঠেন তাঁর সৃষ্টকর্মের মাধ্যমে। তিনি বীরসার উলগুলানের তাৎপর্যময় ব্যাখ্যা করেন, কারণ তিনি স্বাধীন ভারতে বসে পরাধীন ভারতের ইতিহাস লিখেছেন। যখন দেখছেন স্বাধীন ভারতেও মুন্ডারীরা ভূমিহীন হয়ে পড়ছে, তাই তিনি ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তাদের জাগাতে চান। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন – ‘শ্রেণী অস্বীকার করলেই ইতিহাস থেকে শ্রেণী মুছে যেতে পারে না। সোভিয়েত পতনের ফলে যেমন মার্কসিজম মিথ্যা হয়ে যায় না।’
যে-কারণে উপন্যাসের উপসংহার লিখে সংগ্রামকে প্রবহমান রাখেন মহাশ্বেতা দেবী। সেই কারণেই তিনি মুন্ডা বিদ্রোহ নিয়ে আসেন স্বাধীন ভারতে এবং লেখেন চোট্টি মুন্ডা ও তার তীর নামের উপন্যাস। তাই বীরসার কথা সবাইকে জানাতে চান তিনি। অরণ্যের আদিবাসী মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে অরণ্যের জীবনের সঙ্গে এক করে, প্রকৃতি-মানুষ-জীবন সংগ্রামের পরম্পরা রচনা করেন, দেশীয় চেতনার উন্মেষ মেখে। মহাশ্বেতার উপন্যাস পড়তে পড়তে আমরা আমাদের প্রকৃতি, আমাদের আদি ইতিহাস আর জনগোষ্ঠীর কথা ভাবব, সেই ভাবনা সেই দ্যোতনা সৃষ্টি করে প্রান্তিক এক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের আত্মার সংযোগ ঘটাবার সংগ্রামে লিপ্ত হন মহাশ্বেতা দেবী। এখানেই ঔপন্যাসিকের জয় তিনি ইতিহাসের আদিবাসী বীরকে সামনে এনে তৎকালীন পরাধীন সকল ভারতবাসীর সামনে শ্রেণিসংগ্রামের বীজকে ছড়িয়ে দিলেন। ফলে মুন্ডা জনগোষ্ঠী থেকে যে-বিপ�বীর জন্ম হয়েছিল, মহাশ্বেতা দেবী সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের বীরের কাতারে এনে তাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। উপন্যাসকে বৃহৎ ব্যাপ্তির মাঝে প্রতিষ্ঠা করে বাংলা সাহিত্যের নতুন বীরের আখ্যানকে সংযুক্ত করলেন। নতুন ইতিহাসের সূত্রপাত ঘটে সেই সব মানুষের জীবনে। মহাশ্বেতা দেবীর এই বীরের কাহিনি শুধু বীরসা চরিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসে আরো বীর চরিত্র আমরা পেয়েছি। যেমন – চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীরের চোট্টি একজন বীর তীরন্দাজ। সুরজ গাগরাইয়ের সুরজ চরিত্রটিতেও বীরের উপস্থিতি দেখতে পাই। বীরসার চরিত্রটি যেমন ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সত্যি ঘটনা নিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনি সুরজ গাগরাই উপন্যাসটির চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও তিনি সত্যি ঘটনা অবলম্বনে চরিত্র তৈরি করেছেন। এ-বিষয়ে তিনি নিজেই বলেছেন – ‘সুরজ গাগরাই অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। সুবর্ণরেখা নদী বাঁধ প্রকল্প সত্যি, ব্যাপক আদিবাসী মালিকানা জমি অধিগ্রহণ সত্যি। ওই বড়ো প্রকল্পের অঙ্গ খড়কাই নদী বাঁধ প্রকল্প। খড়কাই বাঁধ সংঘর্ষ সত্যি, তা ১৯৮২/১৯৮৩-তে ঘটে। ওই সংঘর্ষের নেতা ছিলেন, চাইবাসার কাছাকাছি ইলিয়াগড় নিবাসী গঙ্গারাম কালুরিয়া। তিনি সেনাবিভাগে ছিলেন। শর্ট সার্ভিস কমিশন-এর পর, অথবা ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন।’
অতএব দেখা যাচ্ছে যে ১৯৮২-৮৩-তে ঘটে যাওয়া সুবর্ণরেখা বাঁধ প্রকল্পবিরোধী নেতা গঙ্গারাম কালুরিয়া-ই মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসের নায়ক হয়ে যান সুরজ গাগরাই নামে। শুধু বীরসা মুন্ডা আর সুরজ গাগরাই চরিত্রটিই নয়, মহাশ্বেতা দেবীর ক্ষুধা উপন্যাসটির চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া সত্যি ঘটনা থেকে চরিত্র নিতে দেখা যায়। তিনি ক্ষুধা উপন্যাস লেখা প্রসঙ্গে বলেন – ‘আশির দশকে বিহারের তরুণ সাংবাদিকরা ‘মানাতুর মানুষখেকো’ লিখে পাঠক ও প্রশাসনকে কাঁপিয়ে দেয়। মানাতুর জমিদার, (নামটা লিখব না) মৌয়ার… সিং তাঁর নিজস্ব চিড়িয়াখানায়, খাঁচায় বন্দি চিতাবাঘকে, তাঁর বনডেড্ লেবার বা ভূমিদাসদের মাংস মাঝে মাঝে খাওয়াতেন।… ঘটনা সত্যি। একটি নতুন মা ও তার শিশুকে বাঘের খাঁচায় ছুড়ে ফেলার ঘটনা যে সত্যি তা মালিকেরা বা ভূমিদাসরাই বলে ।… ডালটনগঞ্জে যে সাংবাদিকের ঘরে থাকতাম সে ঘর, ওই শিবাজী ময়দান, গান্ধী হলো, পালামৌয়ের পথঘাট, সেদিনের তরুণ বুদ্ধিজীবী সহসাথিরা জানে ‘ক্ষুধা’র ও প্রতিটি অক্ষর সত্যি।’
অর্থাৎ কৌয়ার, তেতরি ভূঁইন ও কসিলা চরিত্রগুলোও তিনি বাস্তব ঘটনা থেকে নিয়েছিলেন। তাই বলা যায়, ঘটে যাওয়া ঘটনা যেমন ইতিহাস, তেমনি সে-ইতিহাস থেকে সংগৃহীত চরিত্রগুলো নিয়ে মহাশ্বেতার রচিত উপন্যাসও আর এক ইতিহাস হয়ে যায়।
তাঁর সাহিত্যের এ-কৃতি সম্পর্কে মহাশ্বেতা দেবী সম্পর্কে ১৯৯৭ সালে শঙ্খ ঘোষ লিখেন – ‘…আমাদের ভব্যসমাজের সেই গণ্ডিটাকে উড়িয়ে দিতে চাওয়াটাই হলো মহাশ্বেতাদির ব্যক্তিজীবনের আর রচনাজীবনের সবচেয়ে বড়ো কাজ।… ‘মহাশ্বেতাদির মতো সত্যভাবে কেউই আমরা বলতে পারি না যে সমস্ত কিছু পিছুটান ভাসিয়ে দিয়ে সেই নিচুতলারই সহপথিক আমার জীবন। সাহিত্যজগতে সে-কথা বলতে পারেন ওই একজন, ভব্যসমাজের রীতি-না-মানা ওই একজন, বলতে পারেন যে তিনি ‘বর্ণ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের নিপীড়িত দুঃখী সংগ্রামী মানুষের আপনজন।… আমাদের সাহিত্য সমাজে এই একজন আছেন, সত্য অর্থে যাঁকে যে কোনো অঞ্চলে অভ্যর্থনা জানানো যায় Ñ শুধু পণ্ডিতজনের সেমিনার ঘরে নয় – অবোধজনের পথে পথে মাদল বাজিয়ে।’
মহাশ্বেতা দেবীর দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে তিনি সাহিত্য ও জীবনকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন। তাঁর সাহিত্যে বাস্তব জীবনের শৈলী স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিল্পসম্মতভাবে। সেই আখ্যান ইতিহাসের হোক কিংবা বর্তমান সময়ের। লেখক হিসেবে তিনি যেমন প্রতিবাদী তেমনি ব্যক্তি জীবনেও তিনি এক প্রতিবাদী। মধ্য সত্তরের দশক থেকে আশির দশক আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের পক্ষে প্রচুর কলাম লিখেছেন তিনি। ১৯৯২ সালে মহাশ্বেতা দেবী জেনেভা মহিলা সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানে তিনি ভারতবর্ষের কৃষক সমাজকে দলিত আদিবাসী ও উপজাতিদের মতোই অসহায় বলে উপস্থাপন করেন।
বাবা মনীশ ঘটক মারা যাবার পর বিকল্পধারার লিটল ম্যাগাজিন বর্তিকা সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন মহাশ্বেতা দেবী ১৯৮০ সালে। নতুন করে বর্তিকা লিটল ম্যাগাজিনের স্বতন্ত্রতার সঙ্গে সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসী ও কৃষক সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে কাজ করেন। বিশেষ সংখ্যাগুলোতে তিনি আদিবাসী মুন্ডা, লোধা-শবর, সাঁওতাল, হরিজনসহ অসংখ্য সংখ্যা প্রকাশ করেন গ্রাম সমীক্ষা হিসেবে। এভাবে তিনি আদিবাসীদের খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠেন। লোধাদের স্বীকৃতি চেয়েও তিনি দীর্ঘদিন সংগ্রাম করেন। তিনি প্রত্যক্ষভাবে গ্রামে গ্রামে হেঁটে তাদের সচেতন করার কাজ করেছেন। এইভাবে শুধু শিল্প-সৃষ্টির জন্য নয়, অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, মূলধারার মানুষের সচেতন সহানুভূতি আদায়ের লক্ষ্যে তিনি সাহিত্য রচনা করেন। মহাশ্বেতা দেবী অসংখ্য আদিবাসী সংগঠন গঠন করেন এবং নানা সংগঠনের সঙ্গে কার্যকরী সদস্য হয়ে তাদের অধিকার আদায়ে কাজ করে যান, যার সংখ্যাও প্রায় ২০টি।
আদিবাসী-উন্নয়নের কাজে এবং ভিন্ন ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে মহাশ্বেতা দেবী যে প্রভূত সময় ব্যয় করেন, তাতে তাঁর লেখালেখির কাজে অনেক সময় ব্যাঘাত ঘটে। তাতে কি সামগ্রিকভাবে বাংলা সাহিত্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তরে মহাশ্বেতার স্পষ্ট জবাব –
বাংলা সাহিত্য ক্ষতিগ্রস্ত হল কি না হল, তা আমার বয়েই গেল। তার জন্য আমি কিছুমাত্র ভাবিত নই। আমার জীবিতকালে চেষ্টার দ্বারা যদি যাবজ্জীবন জেলে-থাকা বন্দিদের মুক্ত করতে পারি, অঞ্জলী সরকার যে কেরালায় বন্দি ছিল যদি তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, যদি আদিবাসী-সমাজের সেবায় আমি এইভাবে জীবন কাটাতে পারি তাতে আমার সাহিত্যের ক্ষতি হলেও আমার কিছু এসে যায় না। কারণ মানুষের জন্য কাজ না করে আমার উপায় নেই। প্রত্যেক মানুষেরই উচিত কর্মময়তার মধ্যে থাকা। মানুষের জন্যে কিছু যে না করে সে খুব ছোট হয়ে যায়। শুধু নিজের জন্য বাঁচার কোনো মানে হয় না।
ছেলেবেলা থেকে তাঁর মানসপটে যে-মানবিকতার চিত্র সংস্থাপিত হয়েছিল তা ক্রমেই নানা রূপে বিকশিত হয় তার কর্মময় জীবনে ও সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে। তিনি বাংলা সাহিত্য জগতে যে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তা হলো জীবনের জন্য সাহিত্য। প্রতিবাদী তিনি সব অর্থেই। রাজনীতিকে তিনি কাছ থেকে দেখেছেন এবং উপলব্ধি করেছেন মানব জীবনে এর প্রকৃত কার্যকরী ভূমিকাহীনতাকে। মধ্যবিত্ত জীবন ও রাজনৈতিক আখ্যান সংবলিত সাহিত্য রচনা, ইতিহাস থেকে সাহিত্য রচনা করতে করতে তাই তিনি একেবারে ভিন্ন মানুষের পাশে। সেখানে তিনি দিলেন শারীরিক পরিশ্রম এবং মেধাবৃত্তি। সাহিত্য ও জীবনকে এক সমান্তরালে এনেছেন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতার মতো তাঁর সাহিত্য জীবনের ব্যতিক্রমী এবং অনন্য শিল্পের প্রকাশ ঘটল আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক সাহিত্য রচনায়। ভারতবর্ষের অস্থির সময়ের কর্মী এবং দায়বদ্ধ লেখক হিসেবে মহাশ্বেতা দেবীর জীবন ও সাহিত্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনবদ্য দলিল হয়ে থাকবে। যেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে ইতিহাস, আদি ভারতীয় মানুষজন, রাজনীতি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি দেশের পরিবর্তনের সফলতা ও বিফলতার স্বরূপ।
এ-কথা নিঃসন্দেহে স্বীকৃত যে, বাংলা সাহিত্যে এক ম্যারাথন লেখক মহাশ্বেতা দেবী। তাঁর সাহিত্যকর্ম ইংরেজি, জার্মান, জাপানি, ফরাসি এবং ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। এছাড়া অনেকগুলো বই ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে; যেমন – হিন্দি, অসমীয়া, তেলেগু, গুজরাতি, মারাঠি, মালয়ালম, পাঞ্জাবি, ওড়িয়া এবং আদিবাসী হো ভাষা। ১৯৭৯ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান অরণ্যের অধিকার উপন্যাসটির জন্য। ‘ভুবনমোহিনী দেবী পদক’, ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য স্বর্ণপদক’, ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মশ্রী পদক’ পান। এছাড়া ‘জগত্তারিণী পুরস্কার’, বিভূতিভূষণ স্মৃতি সংসদ পুরস্কার, ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার’, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-প্রদত্ত ‘লীলা পুরস্কার’ও লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে ‘ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কার পান আদিবাসীদের মাঝে কাজ করার জন্য। ১৯৯৮ সালে সাম্মানিক ডক্টরেট রবীন্দ্রভারতী অর্জন করেন। ‘ভারতীয় ভাষা পরিষদ সম্মাননা ২০০১’ সালে অর্জনসহ আরো অনেক পুরস্কার পেয়ে সম্মানিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি কলকাতা আকাদেমির প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত আছেন। বিগত কয়েক সাল ধরে নোবেল পুরস্কারের জন্য সাহিত্যিকদের তালিকায় উঠে আসছে মহাশ্বেতা দেবীর নাম।

তথ্যসূত্র
১. কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু (১৯৬৭), মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র-০৬, সম্পাদনা : অজয় গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০২।
২. অরণ্যের অধিকার (১৯৭৭), মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র-০৮, সম্পাদনা : অজয় গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৩।
৩. চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর (১৯৮০), মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র-০৯, সম্পাদনা : অজয় গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৩।
৪. সুরজ গাগরাই (১৯৮৩), মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র-১২, সম্পাদনা : অজয় গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৩।
৫. টেরড্যাকটিল, পূরণ সহায় ও পিরথা (১৯৮৯), মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র-১৫, সম্পাদনা : অজয় গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৪।
৬. ক্ষুধা (১৯৯২), মহাশ্বেতা দেবী রচনাসমগ্র-২০, সম্পাদনা : অজয় গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৮।
৭. কৈবর্ত খণ্ড (১৯৯৪), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৪।
৮. অচ্যুত গোস্বামী, বাংলা উপন্যাসের ধারা, কল্লোল বুক সেন্টার (ফজলুল হক সৈকত), ঢাকা, ২০০৪।
৯. তপোধীর ভট্টাচার্য, উপন্যাসের সময়, এবং মুশায়েরা, কলকাতা, ১৯৯৯।
১০. নির্মল ঘোষ মহাশ্বেতা দেবী : অপরাজেয় প্রতিবাদী মুখ, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৯৮।
১১. নিতাই বসু, ‘মহাশ্বেতা দেবী : ব্রাত্য জীবনের সংগ্রামী কথাকার’, মহাশ্বেতা, সম্পাদনা : তাপস ভৌমিক, কোরক, কলকাতা, ২০০৩।
১২. শঙ্খ ঘোষ, ‘মহাশ্বেতা দেবী/ গণ্ডি ভাঙা মানুষ’, সানন্দা, জানুয়ারি ১৯৯৭।
১৩. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস স্মারকগ্রন্থ (সমীরণ মজুমদার-সম্পাদিত), অমৃতলোক সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, ১৯৯৭।
১৪. মহাশ্বেতা দেবী, ‘মহাশ্বেতা দেবী, এক অকথিত জীবন ও দর্শন নিয়ে আলাপচারিতায় কল্যাণ মৈত্র’, আমার সময় (সম্পাদনা : বব রায়) কলকাতা, ২০১০।
১৫. ক্যানভাস, সম্পাদক : কানিজ আলমাস, বর্ষ ৪ সংখ্যা ৮, ঢাকা, মার্চ ২০০৯।
১৬. কোরক, সম্পাদক : তাপস ভৌমিক, বর্ষ ১৬, শারদীয় সংখ্যা, কলকাতা, ১৯৯৩।
১৭. জনপদপ্রয়াস, সম্পাদক : বিকাশ শীল, পঞ্চম বর্ষ, তৃতীয়-চতুর্থ সংখ্যা, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০৩।
১৮. Gayatri Chakravarty Spivak (translated and introduced) Mahasweta Devi, Chotti Munda and his Arrow, Seagull Book Pvt. Ltd, Calcutta, 2002.

 

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার