মঞ্জু সরকারের উপন্যাস : সমাজকাঠামোর রূপরেখা

লেখক:

শামীম সাঈদ

সাহিত্যিক কি সমাজতাত্ত্বিক? সম্ভবত তাঁর সমাজবীক্ষা সমাজতাত্ত্বিক অপেক্ষাও অধিক গভীরতর হতে পারে। সমাজতত্ত্ব ‘বিজ্ঞান’ হয়ে উঠতে চায় বিধায় সমাজতাত্ত্বিকের দৃষ্টিভঙ্গি কিছু গ–বদ্ধ থাকে, সাহিত্যিকের তা থাকে না। সাহিত্য-রচয়িতার থাকে একজন মূল্যবোধ বিযুক্ত সমাজবিজ্ঞানী অপেক্ষাও গভীর মনোনিবেশ সচল-সমাজসত্তার অন্তর দেশে। তবু, যদিও, শেষাবধি একজন সমাজতাত্ত্বিকও তাঁর গবেষণায় মূল্যবোধ বিযুক্ত থাকতে পারেন না। সেখানে লেখকের মূল্যবোধ সংযুক্ত সমাজ-মানুষ পাঠের দৃষ্টিভঙ্গি, অনুসন্ধান ও তাঁর অভিজ্ঞতার বয়ান একজন সমাজবিজ্ঞানী অপেক্ষা শ্রেয়তর গণ্য হতে পারে। এই শর্তেই সাহিত্যকে, বিশেষত কথাসাহিত্যকে, সমাজপাঠের তথা সমাজতত্ত্বের মৌল উৎস-ভূমি হিসেবে বিবেচনা করা যায়, দ্বিধামুক্ত যুক্তিপথে। এখানে উদাহরণযোগ্য নমুনা হলো কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের উপন্যাস আবাসভূমি। লেখকের সমাজসচেতনতা নিয়ে আলোচনা নিতান্ত বাহুল্য প্রসঙ্গই, কেননা, সার্বিক সমাজ-রাষ্ট্রিক সচেতনতা ছাড়া লেখক সাহিত্য রচনা করবেন আর তা পাঠকনন্দিত সাহিত্য হবে, তা ভাবাই যায় না। কী উপায়ে লেখক সেই অভিজ্ঞতা ও সচেতনতা অর্জন করেন এই প্রশ্নের মীমাংসা না-ই বা হলো, তবু, তাঁকে (লেখক) তা অর্জন করতেই হয়। এই আলোচনায় উপন্যাসের শিল্পোৎকর্ষ বিচার্যে আসছি না, বরং সামগ্রিক সমাজানুভূতি কতটা বিশ্লেষণমুখী হয়ে লেখকের অভিজ্ঞতায় বাঙ্ময় তা-ই দেখার। সাহিত্যের শিল্প-নন্দনগত উপযোগিতা ছাড়াও এর জ্ঞানতাত্ত্বিক, অভিজ্ঞতাতাত্ত্বিক ও সমাজৈতিহাসিক তথ্যের উৎস হিসেবে যে-উপযোগিতা তাকেই বড় করে দেখা যায়। এবং সত্যিই কলাকৈবল্যবাদ আর এককভাবে সাহিত্যের চূড়ান্ত উপযোগিতার মানদ- হয়ে থাকছে না, এবং কেবল এই শর্তেই সব পাঠকের কাছে উৎরে যাচ্ছে না। সুতরাং সাহিত্যকে অন্যবিধভাবেও উপযোগী হয়ে উঠতে হয় ও হচ্ছে। আর এখানে দ্বিতীয় ধরনের যে উপযোগিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেই উপযোগিতার ভিত্তিতে সাহিত্যকে ‘কাজের সাহিত্য’ হিসেবেও চিহ্নিত করা যেতে পারে এবং পক্ষান্তরে কলাকৈবল্যবাদী কেবল শিল্পনন্দনে উৎকর্ষিত সাহিত্য নিতান্ত ‘অকাজের সাহিত্য’ কিংবা ‘যথেষ্ট কাজের নয়’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে, কাজের সাহিত্য বিচারেই মঞ্জু সরকারের উপন্যাস আবাসভূমির সফলতা বিবেচ্য হতে পারে। এটি একটি যুগান্তরের দলিল। কালের সাক্ষীও। উপন্যাসপটে বর্ণিত ঘটনাকালের পূর্ব ও পরের সমাজ-রাজনৈতিক স্মৃতির সঙ্গে পরিবর্তনশীল পথে সাযুজ্যপূর্ণ কার্যকারণসিদ্ধ অভিজ্ঞতার অনুসৃতি ও ফলের রূপরেখা এই উপন্যাস। আবাসভূমি বাংলাদেশের অতীতকে মনে করিয়ে দেয় আর বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি ফেরায় রাজনৈতিক-সমাজতাত্ত্বিকের কিংবা সংস্কৃতিবিদদের। বাংলাদেশের সমাজকাঠামো বদলের এক দীর্ঘ পথরেখা পূর্বাপর চিহ্ন, নিদর্শন পাওয়া যায় উপন্যাস আবাসভূমিতে। সেদিকটিতে আমাদের অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিবদ্ধ করা বাঞ্ছনীয় নয় কি?

‘সমাজ’ একটি সম্পর্কসূচক সত্তার মানবসংহতিমূলক ধারণা। ‘সমাজ’ মানুষের যাপনের একটি বৈশিষ্ট্যমূলক সত্তাস্বরূপ। অধিকাংশ সমাজতাত্ত্বিক মনে করে থাকেন, সংহত হয়ে একত্রে দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করা মানুষের স্বভাবজ প্রবণতা। কিন্তু সমাজ-সংক্রান্ত এই ধারণাটি স্বতঃসিদ্ধ কিনা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল, কেননা, সমাজসত্তা যখন জটিলসমগ্র, তখন এর ভেতরেই যেহেতু এই আপাত ধারণাকৃত স্বভাবজসংহতিকে ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত তৈরি হয়ে যায়, তখন আর এ-ধারণার স্বতঃসিদ্ধির নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে, মনে করা খুবই যৌক্তিক হতে পারে যে, সংহত হয়ে বসবাস করাটাও মানুষের জন্য শর্তসাপেক্ষ আচরণ। সুতরাং সমাজসত্তা শর্তসাপেক্ষ, স্বভাবজ নয়; এমন যুক্তিসিদ্ধান্তে মন ঝুঁকে যায়। স্বয়ং জটিল সমাজসত্তাই এই ধারণাকে বহু কার্যকারণে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রস্ত্তত। আর সমাজসত্তার বোধ যা যুক্তিতে ধৃত হয় তা আসলে শর্তসাপেক্ষ নানামাত্রিক সম্পর্কে যুক্ত মানবশ্রেণি। সমাজের ধরনটি যেমনই হোক সেখানে মানুষে মানুষে সম্পর্কের অসিত্মত্বও অবশ্যম্ভাবী। সমাজের শ্রেণি, সংগঠন, প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষদের আমত্মঃজালিক সম্পর্কে যুক্ত করে রাখে, এ-ই মূলত সমাজসংগঠন বা সমাজকাঠামো। সমাজকাঠামো রূপায়ণের শর্তগুলোর ভেতরে কোনো অসামঞ্জস্য দেখা দিলে বা ব্যত্যয় হলে সেখানে নানামুখী সামাজিক সংকট দেখা দেয়। এই সংকট মোকাবেলায় মানুষ আবার সংহত হতে সচেষ্ট। এই সমাজ দ্বান্দ্বিকতায় মানুষের সংকটের অসিত্মত্ব প্রায় অপরিহার্য, কেননা, মানুষ নানামুখী সংকটে জীবনরক্ষাকারী সংগ্রামের নিমিত্তে এই পারস্পরিক সম্পর্কে যুক্ত হয়েছে, শক্তি ও সংহতির তাগিদে। সুতরাং সে-সংকটগুলো সামাজিক-প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার। ফলে মানুষেরা সম্পর্কের ভিত্তিতে পরস্পরে সংহত হয়ে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সমাজবদ্ধ হয় – এ-ই মানুষের সমাজবদ্ধতার শর্ত। কিন্তু যখন মানুষের এই সম্পর্কের ভিতরে অসুখ দেখা দেয়, তখন, বলা যেতেই পারে যে, মানুষেরা বিপন্নতার মধ্যে আছে, বিপন্নপ্রায় সমাজজীবন যাপন করছে; তারা যে-কোনো প্রতিকূলতা, বিপদের মোকাবেলায় নাজুক পরিস্থিতিতে বসবাস করছে। এমন উৎকণ্ঠিত পরিস্থিতিতে যদি প্রশ্ন আসে – বাংলাদেশের সমাজকাঠামোর তবে কী হাল? তখন উপন্যাস আবাসভূমি শঙ্কাবাচক বেশ কিছু অনুসন্ধানী জবাব নিয়ে হাজির হয়। আবাসভূমি – যার বয়নে ও বয়ানে বাংলাদেশের মানুষের সমাজসম্পর্কের সংকটের কালোচিহ্ন আঁকা আছে, যা বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতার পূর্বাপর রূপান্তর প্রক্রিয়ার দিকেও ইঙ্গিত করে।

উপন্যাসে বর্ণিত সমাজ-কালবাস্তবতা নিশ্চিতভাবে অতীতের এক দীর্ঘ সমাজ-রূপান্তরের ফল, ফলে এই কালে মানুষের সংকটের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে সমাজচিন্তকদের দৃষ্টিকে অতীতের সমাজ-রূপান্তর প্রক্রিয়ার দিকে টেনে নিয়ে যায় এই উপন্যাসের বাস্তবতা। সমালোচক, গবেষক, পাঠক নির্বিশেষে সবাইকে ইতিহাসমুখীন করতে মননে এক দুর্মর অনুসন্ধিৎসার তাড়না সৃষ্টি করে এই উপন্যাস। এবং উপন্যাসে যে-সংকটটি চিহ্নিত তার যদি যথাযথ শুশ্রূষা না হয় তবে এই মানুষেরা ও ভবিষ্যতের মানুষেরা বা তাদের ভাবী-প্রজন্ম কেমনতর সংকটের ভেতর পতিত হতে যাচ্ছে, তা কার্যকারণসূত্রে অনুমান করা যায়; মানুষের সামাজিক, রাষ্ট্রিক ভবিষ্যৎবিষয়ক কিছু অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। উপন্যাস আবাসভূমিতে গভীর ক্ষতযুক্ত বাংলাদেশে মানুষের সম্পর্কের অসুখটি চিহ্নিত। কোনো একটি সমাজের, দেশের মানুষেরা কতটুকু সুস্থ তা বোঝা যায় সেই মানুষদের সামাজিক সম্পর্কের স্বরূপ দেখে। যে-সমাজে অসুস্থ সামাজিক সম্পর্ক বিরাজ করছে সে-স্থানের মানুষদের সুস্থতা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। এই অসুস্থতা শারীরিক ও মানসিক উভয়বিধ। অসুস্থ সমাজসম্পর্কের ভিত্তিতে কোথাও কোনো সুস্থ ও সংহত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে, এমন ধারণা করা কষ্টসাধ্য। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই সম্পর্কের সংকটকেই সমাজকাঠামোর সংকটরূপে চিহ্নিত করা হয়। কোনো সমাজের কাঠামোটি রূপায়িত হয় সেই সমাজস্থ মানুষের সম্পর্কের ভিত্তিতে, ফলে সম্পর্কের সংকটটি বিশেষ উদ্বেগ জাগ্রত করে। মানুষের সম্পর্কের যে-আমত্মঃজাল, পূর্বেই যাকে বলেছি সমাজসংগঠন বা সমাজকাঠামো, সেই সমাজকাঠামোর আলোচ্যে সমাজকাঠামো বিষয়ে সমাজতত্ত্বে যেসব সংজ্ঞায়ন দৃষ্ট হয়, স্বতন্ত্র সেসব তাত্ত্বিকের সংজ্ঞায়নে মানুষের সম্পর্কটিই প্রধান ও অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে আসে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সম্পর্ক বলি, শ্রেণিসম্পর্ক বলি, জ্ঞাতি-গোষ্ঠী-দল-সম্প্রদায়গত নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক বলি কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সামাজিক অবস্থানগত, ব্যক্তির ভূমিকাভিত্তিক সম্পর্কই বলি – সবাই একটি সামাজিক কাঠামো রূপায়ণের প্রক্রিয়াপথ ও রূপায়িত সমাজকাঠামোর স্বরূপ নির্ধারণ করে দেয়। আবাসভূমি উপন্যাসটি বাংলাদেশের বাস্তব সমাজচিত্রে তেমনই এক সমাজকাঠামোর রূপচিত্রণ করেছে এবং সেখানে সমাজকাঠামোর অন্তস্থ অসুখ কিংবা সংকট বা বাংলাদেশের মানুষদের সম্পর্কের সংকটটি চিহ্নিত করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্কের সংকটটি তর্কাতীতভাবে সংস্কৃতিগত, পরে রাজনৈতিক। একটা সময়ে সামগ্রিক সমাজ-সংস্কৃতি ও ওই সমাজে বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি একে অন্যের প্রভাবক হয়ে দাঁড়ায়। অমোঘ সত্যি যে, সমাজ বিবর্তনে সমাজ-সংস্কৃতিকে আশ্রয় করেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি আংশিকভাবে গণসাধারণের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে পারলেও তা গণসাধারণের সংস্কৃতি দ্বারা নির্দিষ্ট স্থান-কালে আমূল প্রভাবিত হয়েছে, হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সে-দেশের সব জনগণের সংস্কৃতি হয়ে ওঠে না কিংবা গণমানুষের সংস্কৃতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে না। কিন্তু কোনো দেশের কিংবা যে-কোনো সমাজের অর্থব্যবস্থার সঙ্গে রাজনীতির একটি পরিপূরক সম্পর্ক থাকে, আর অর্থব্যবস্থা সামগ্রিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে রাজনীতি ও অর্থনীতির পারস্পরিক প্রভাবাপন্নতার শর্তে ব্যাপক সামাজিক সংস্কৃতির ওপরেও রূপান্তরমুখী প্রভাব পড়ে। সুতরাং অর্থনীতিকে বাহক করা হলে রাজনীতি সংস্কৃতির ওপরে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের  মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন কিংবা বিপর্যয় তার সাংস্কৃতিক (অন্তরালে অর্থব্যবস্থা) পরিবর্তনের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, হচ্ছে। আবাসভূমিতে বর্ণিত সমাজচিত্রে বাংলাদেশের সামাজিক, আর্থ-রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি গতিমুখ ও অদ্বিতীয় গতিপথ চিহ্নিত হয়ে আছে। উপন্যাসে ‘নিচিন্তাপুর’ গ্রামটিই যেন সমগ্র বাংলাদেশ হয়ে বিধৃত হয়ে আছে। আর এর ঠিকুজি নির্ণয়ের কালরেখাটিও সুস্পষ্ট অঙ্কিত হয়ে আছে বাঙালির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পরিসরে।

বাংলাদেশ একটি কাঙিক্ষত সাংস্কৃতিক লক্ষ্যেতে পথে এগোতে চেয়েছিল। সংস্কৃতিকে বাহন করেই একটি রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছিল। এদেশের মানুষের মননে উদারনৈতিক মানবিক সংস্কৃতিচেতনার একটি প্রবাহ তখন ক্রিয়াশীল ছিল। কিন্তু একটি জাতিকে খুব সাবলীলভাবে মাঙ্গলিক-মানবিক মানসে সুদূর ভবিষ্যতে বয়ে নেওয়ার জন্য এই সাংস্কৃতিক বাহনটি কতটুকু শক্তপোক্ত ছিল? এই প্রশ্নটি একালে এসে জাগছে। কিন্তু, প্রশ্নটি একালে জাগলেও এর উত্তরানুসন্ধান করতে হয় অতীতে গিয়ে। তৎকালের বাঙালির যে-সংস্কৃতি ছিল, যাতে সওয়ার হয়ে বাঙালি এগোতে চেয়েছিল, সংস্কৃতির যে-চেহারাটি তখন ছিল, যে-গঠনটি ছিল তার ভেতরেই ছিল বাঙালির স্বপ্নযাত্রায় হোঁচট খাওয়ার কারণ। এই সাংস্কৃতিকবাহনটিকে বিকল করার জন্য সেই সংস্কৃতির ভেতরেই ছিল বিপরীতমুখী ক্ষয়কারী শক্তি। ফলে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুকাল পরেই প্রত্যাশিত সাংস্কৃতিক বাহনটি আর সাবলীলভাবে অগ্রগামী হতে পারেনি। আবাসভূমির নিচিন্তাপুরের আরমান আলী, যে ছিল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক চেতনা লালনকারী, স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রত্যাশিত আদর্শায়িত সংস্কৃতিচেতনার বিপরীত এবং স্বাধীনতাবিরোধী, তাকে যখন ক্ষমতাকাঠামোয় নিয়ন্ত্রকের আসন দখল করতে দেখা যায় তখন বুঝি যে, স্বপ্নে ঘুণ ছিল। আবুল কালামের যৌবনের সাম্যবাদী আদর্শের রাজনীতি মার খেয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালামের স্বপ্নদৃষ্টিতে ঘোর লেগেছে আরমান আলীর আঘাতে। এই দ্বন্দ্বে এদেশের মানুষের সম্পর্কের ভেতরে যে ফাটল রচিত হয় তা প্রায় শুশ্রূষাহীন। আপাতদৃষ্টিতে নিচিন্তাপুরে সাম্প্রদায়িকতার স্পষ্টত কোনো আভাস নেই, কিন্তু আরমান আলীর অসিত্মত্বই পরবর্তীকালে ওপরদৃষ্টিকে (Surface vision) ভুল প্রমাণ করেছে। আমাদের বর্তমান সমাজ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিই নিচিন্তাপুরকে বুঝতে আমাদের সুদূর অতীতমুখী করছে এখন।

বিশ^সভ্যতার ঐতিহাসিককালে হাজার বছরে সাম্রাজ্য বিস্তারমুখী সভ্যতার গতিমুখে মানুষ তার চিরায়ত সম্প্রদায়-চেতনার সঙ্গে ধর্মগুলোকে এমন আত্মঘাতী করে মিশিয়েছে যে, তার নাগপাশমুক্ত হওয়া যেন আর মানুষের সাধ্য নয়। যেখানে মানুষ জ্ঞানচর্চায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হয়েছে, সেখানে তারা জাতিগত সাম্প্রদায়িকতায় ও অঞ্চলভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতায় আত্মঘাতী হয়েছে, হচ্ছে। নিচিন্তাপুরের বাস্তবতার ভেতর দিয়ে ‘বাঙালি’ জাতির ভাগ্যরেখা বুঝতে হলে ইতিহাসে চোখ ফেরাতে হবে নিশ্চয়ই, কেননা, সেই সময়পরিসরেই আছে বাঙালির সংস্কৃতিগত যত অসুখ-বিসুখের নিদর্শন। কিন্তু আপাতত বাঙালি ও বাংলাদেশের কুষ্ঠি গণনার জন্য অতদূরে না গেলেও চলবে। একালের অদূরেই এ-জাতির অস্থিরতার একটি সূচনাবিন্দু পাওয়া যায়। ইংরেজ উপনিবেশের শিকড়। এর আগের আর্য কিংবা মোগল উপনিবেশ প্রসঙ্গ কথাযুক্তির পরিসর কমাতেই এড়ানো উচিত, মনে করছি।

কিন্তু নিকট অতীতে যেতেই হবে, কারণ নিচিন্তাপুরের বাস্তবতা পেরিয়ে, আজ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবির যে আদর্শিক ভিত্তি ছিল, সংস্কৃতিজাত জাতিত্ব ধারণার ‘বাঙালি’ প্রত্যয়টি সেটিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। আর এ-সংশয়টি তৈরি হয়েছিল আসলে পূর্বেই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালেই। সংশয়যুক্ত একটি প্রশ্ন – বাঙালির অহঙ্কার আসলে কিসে? হিন্দুতে,ব নাকি মুসলমানিত্বে? যেখানে বাঙালি শুধুই বাঙালি না হয়ে বাঙালি হিন্দু বা বাঙালি মুসলমান পরিচয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে এবং এই প্রশ্নে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানরা সংখ্যালঘু হিন্দুদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। ফলে এখানে সাংস্কৃতিক সংহতি হয়েছে সুদূরপরাহত। এই পরিস্থিতিই বাঙালিকে সর্বপ্রথম স্থিরতাহীন করে। এই তর্কটি তার সাংস্কৃতিক মানসে প্রোথিত হয়েছিল, সে-মানস নিয়েই উঠে এসেছিল আরমান আলী, যেখানে পরাজিত আবুল কালাম আর সংস্কৃতিজাত ‘বাঙালিত্ব’। বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্কপাঠে এ-বিষয়টিকে এত বড় করে দেখার যে-কারণ তা হলো, মানুষের সম্পর্কের নিয়ামক আরো অন্য যে-কারণগুলো আছে সেগুলোও বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ককাঠামো বদলে প্রভাবক বটে, তবে সাংস্কৃতিক আদর্শেও বিভাজক, সাম্প্রদায়িকতার মতো ব্যাপক, আত্মবিধ্বংসী ও প্রায় প্রতিকারহীন অন্য কোনোগুলোই নয়। এমনকি, আঞ্চলিক যে-সাম্প্রদায়িক মানসিকতা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আছে তাও অত মারাত্মক নয়। নগরায়ণ, অবকাঠামোগত পরিবর্তন, শিল্পবিকাশগত যেসব অর্থনৈতিক প্রভাবক সমাজকাঠামোর স্বরূপ বদলে যে-ভূমিকা রাখে তার ফলে সমাজে বহু শ্রেণির জন্ম হয় বটে, আর তা বরং সমাজকে বহুমুখী বৈচিত্র্যে সুসংহতই করে। সেখানেও শ্রেণি-সংঘাত বিদ্যমান থাকে বটে; কিন্তু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ফলে মানুষের মধ্যে সমাজ-রাজনৈতিক যে-মেরুকরণ ঘটে, সেখানে বহুবৈচিত্র্যের শ্রেণিগুলোও আপাত লীন হতে থাকে, হয়ে যায়; আর সমাজ বিকাশের স্বাভাবিক দ্বান্দ্বিকতার যে-ক্রিয়াকারণ তা ব্যাহত হয়। ফলে অন্য কারণগুলোকে অপেক্ষাকৃত গৌণ করেই দেখছি, তথাপি সেগুলোকে পরবর্তীকালে যথাপ্রসঙ্গে আলোচ্যে আনার অপেক্ষা থাকল।

সামাজিক সম্পর্কেরও মেরুকরণ, আর সেখানে কেবল দুটিই মেরু, বিপরীত প্রান্তে। এই মেরুকরণ প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে মানুষকে বিভাজিত করতে পেরেছিল বলেই ভূগোলের নতুন সীমাচিহ্ন আঁকা হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই যত অঘটন-ঘটন, আর তারপর কেবল ফলে আর প্রতিক্রিয়ার মঞ্চায়ন। এই প্রবণতাতেই বঙ্গভঙ্গের সম্ভাবনা পরিস্থিতিকে এড়ানো যায়নি। এরই অনুবর্ত যেন ১৯৪৬-৪৭-এর দাঙ্গা, ১৯৫৬ ও ’৬২ সালের পাকিস্তানে সংবিধানের বিধিগুলোয় তা ভীষণ চেহারায় উদ্ভাসিত হয়। অবিভক্ত স্বাধীন ভারতের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়, কেননা, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সেখান থেকেই এসেছে। বিশ^সমাজ ও সংস্কৃতিও এই অস্থিরতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেনি। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ১৯৭১ একটি পদক্ষিপ। এই অস্থিরতায় কিছুটা স্থিতি আনয়নের নিমিত্তে। এটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল যদি বৈশি^ক অস্থিরতার হস্তক্ষেপ এড়ানো যেত, কিন্তু তাও অসম্ভবই ছিল বলা যায়। ফলে ’৭১ অংশত সফল হয়েও বৃহদাংশে ঘুণ পুষে সামনে এগিয়েছে। দেশভাগের যে-অস্থিরতা তার ঢেউ স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের নিচিন্তাপুরেও স্থির হয় না।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৪৬-৪৭-এর দাঙ্গার অর্থনীতি ও রাজনীতি নতুন চেহায়ার বিকশিত হতে শুরু করে। ফলে, মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম ব্যর্থ হন, অনায়াস সফল হয় রাজাকার আরমান। বহুদিন ধরেই বাংলাদেশে চলেছে দাঙ্গার অর্থনীতি তথা সাম্প্রদায়িক অর্থনীতির কলাকৌশল। চলেছে দেশের সর্বাঙ্গেই। বলা যেতে পারে যে, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রধানতম প্রবণতা ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, কিন্তু সংস্কৃতির শত্রম্নর বিরুদ্ধে কেবল বন্দুকের মাধ্যমে বিজয় লাভ হয় না, প্রমাণিত হয়েছে। বলা যায়, এই যুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক মুক্তি এসেছিল, ভৌগোলিক স্বাধীনতা এসেছিল, যৎকিঞ্চিৎ অর্থনৈতিক মুক্তিও এসেছিল কেবল; সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে বিজয়টি আসেনি, সেটি সে-সময়েই প্রকাশিত হয়নি, ধরা পড়েছে পরে। সে-সময়ে যুদ্ধ জয় হলেও তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নতুনতর অস্থিরতার জন্ম দিয়েছিল, শেষ রক্ষা হয়নি। তার পরে এসে বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সাল বিশিষ্ট হয়েছিল। তখন বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমা নির্ধারণের ভিত্তিতে স্বাধীন ছিল বটে, কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়েছিল সবেমাত্র। আর অর্থনীতি একটি নিয়তিপথ যা সংশিস্নষ্ট সংস্কৃতির কী হাল তার ধার না-ধেরেই এগোয় নিজস্ব গতিমুখে। সুতরাং সেসব সংকট নিয়ে অর্থনীতি এগোচ্ছিল। ফলে সাংস্কৃতিক ঘুণ থেকেই এগিয়ে চলছিল দুর্বৃত্তায়িত অর্থনীতি। এমন সংকটে সংস্কৃতিভিত্তিক ‘বাঙালি’ জাতিত্বের প্রত্যয়প্রণেতা, জাতির জনকও টিকতে পারেননি। বাঙালিত্বের অহংকার নিয়ে অগ্রযাত্রার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। সাংস্কৃতিক বিপস্নবটা হয়ে ওঠেনি। সুতরাং এই প্রেক্ষাপট থেকেই নিচিন্তাপুরকে বুঝলে, নিচিন্তাপুরের ক্ষমতাকাঠামোকে বুঝলে আরমানের উত্থানের কারণটি বোঝা যাবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখাকে দেখা সম্ভব হবে। আর এটা সম্ভবত বোঝার চেষ্টা করা হয়নি।

বাংলাদেশের সমাজ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্বাপর বিশ্লেষণে যে-সময়কালটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সেই কালটিই উপন্যাস আবাসভূমির পটে জীবন্ত হয়ে আছে। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন-আকাঙক্ষার অভিমুখপথে খাল কেটে কুমির চাষের কাল হলো সেইকাল। উপন্যাসে চিত্রিত অনুমেয় সেই কালটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সত্তরের দশকের শেষার্ধ থেকে নববইয়ের দশকের প্রায় প্রথমার্ধ পর্যন্ত বিশ বছরাধিক কালপরিসরে বিসত্মৃত। ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক বিপস্নবের যে-প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল বাঙালিদের, তার পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটে ’৭১-এ এসে। কিন্তু সফলতাটি রাজনৈতিক মুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গিয়েছিল আর সাংস্কৃতিক সংস্কারটি পূর্ণমাত্রায় সফল হতে পারেনি বিধায় অতীতের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরম্পরার অন্তরের ঘুণ বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামকে ব্যাহত করতে চেষ্টা করেছে বারবার। উপন্যাস আবাসভূমির নিচিন্তাপুরের সমাজচিত্র ও মানুষের সম্পর্কের সংকটের স্বরূপ বিশ্লেষণে সংস্কৃতির অন্তর্ঘুণনজনিত ফলে ধরনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত। রাজাকার আরমানের সামাজিক অবস্থান পরিবর্তন (mobility), তার ক্ষমতাকাঠামোয় দৃঢ় অবস্থানে পুনর্বাসন নিচিন্তাপুর কিংবা বাংলাদেশের জন্য একটি আর্থ-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সম্পর্কের সংকট তৈরি করে। মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম কিংবা নিচিন্তাপুরের তথা বাংলাদেশের অগণিত মানুষের আকাঙক্ষাভঙ্গের সূচনাবিন্দু নিশ্চয় যেন এখানেই নিহিত আছে।

আবাসভূমির আলেখ্য প্রসঙ্গে সাম্প্রদায়িকতাকে এত জোর দিয়ে টেনে আনার প্রাসঙ্গিকতা এড়ানো অবশ্য অনুচিত বিধায় বারবার টানা হচ্ছে, খুবই অপ্রাসঙ্গিকভাবে। এবং আবারো বলতে চাই যে, বিষয়টি তলিয়ে দেখার, কারণ এই প্রাসঙ্গিকতার অনিবার্যতা আছে। বাঙালির দীর্ঘ সহস্র বছরের যে অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থান ছিল, তা আসলে ভাঙতে শুরু করেছিল ধর্মীয়, জাতীয় ও অঞ্চলভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিকীকরণের ফলে। অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শিথিল হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সম্ভাবনাও তারই ফল। এর ফলে দুই বাংলায় ব্যাপকভাবে মানুষের সামাজিক স্থানান্তরণ (Social Migration/ Transition) শুরু হয়। সামাজিক সম্পর্কের এই অন্তরবিচ্যুতিকে আরো বাড়তে দেওয়া রোধ করতে সাংস্কৃতিক কৌশল জরুরি ছিল। তেমন প্রচেষ্টাই হয়েছিল ’৫২ থেকে ৭১-এ। কিন্তু প্রচলিত সাংস্কৃতিক স্রোতের ভেতরে মানুষের সামাজিক সম্পর্কের অবিশ^াসজনিত বিচ্ছিন্নতার প্রবণতাটি ততদিনে অনেক বেশি শক্তিশালী ও বেগময়।

সামাজিক মানুষের স্থানান্তরণ (social transition/ migration) সামাজিক প্রক্রিয়ায় একটি নিয়ত স্বাভাবিক ঘটনা। এর মধ্য দিয়েই মানুষ নতুন স্থানে নতুন সম্পর্কে প্রবেশ করে এবং সংস্কৃতিকরণ (acculturation), আত্মীকরণ (assimilation), উপযোজন (adaptation) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামাজিক গতিশীলতার প্রক্রিয়াকে সচল রাখে। এই গতিশীলতার (dynamics) ভেতরের কারণ যখন সমাজপ্রগতির প্রতিকূল হয় তখন এই গতিশীলতা হয়ে ওঠে পশ্চাৎমুখী। আপাতচোখে সামাজিক স্থানান্তরণের কারণগুলোকে সমাজের অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতই মনে হয়, কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যাবে যে, এই অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতটিও সাম্প্রদায়িকতাজনিত। ব্রিটিশ উপনিবেশে ও এর পরেও ভারতীয় সমাজে সামাজিক স্থানান্তরণে সাম্প্রদায়িক মনস্কতাজনিত সম্পর্কের দূরত্ব ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। যদিও সভ্যতার সুদূরপ্রসারী অতীত থেকে এটাই জানা যায় যে, মানুষের ও সভ্যতার স্থানান্তরণ ও বিকাশের মূলে রয়েছে তাদের নতুন জীবিকার অনুসন্ধান। কিন্তু তার পরবর্তী ইতিহাসে এই জীবিকার তাড়নায় মানুষের দৌড়টির স্থান দখল করে আগ্রাসী, দখলদারিত্ব মনোভাবের সাম্রাজ্যবিস্তারী প্রবণতা। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক তৎপরতায় সাম্প্রদায়িকতাকে খুব কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা গেছে। সুতরাং এই অঞ্চলের মানুষের সামাজিক স্থানান্তরণ সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিকীকরণ একটি চমৎকার লিভার (ষরাবৎ) হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালেও এই স্থানান্তরণের গতি সিত্মমিত হয়নি এবং আরো পরে শিল্পবিকাশে ও পুঁজির সম্প্রসারণের সঙ্গেও মানুষের সাম্প্রদায়িক-মনস্কতা পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছে ও করে চলেছে। সুতরাং দুই বাংলায় যে-জনপ্রবাহের সূচনা হয়েছিল তার কারণটি ছিল রাজনৈতিক কৃত্রিমতা। একদা দুই বাংলায় মানুষের উভয়মুখী প্রবাহের কারণে উভয় বাংলার ভূগোলে জনমিতির পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন পড়েছিল। আর স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভূগোলে সেই জনমিতিক পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়াটিই সচল থাকে।

জনমিতিক পুনর্বিন্যাসজনিত সামাজিক স্থানান্তরণ প্রক্রিয়াটি প্রকটভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে আবাসভূমিতে। এ-উপন্যাসে মানুষের স্থানান্তরণের কারণটি অর্থনৈতিক প্রধানত, এটা ওপরদৃষ্টিতে মনে হয়; কিন্তু, অতীতের সামগ্রিক জনমিতিক পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ার পরোক্ষ প্রভাব এখানে ছিল। কেননা, ওই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিই বদলে দিয়েছিল। ফলে মানুষের স্থানান্তরজনিত  সম্পর্কের যে-সংকট তাও আবাসভূমিতে প্রকটভাবেই চিহ্নিত। এই প্রক্রিয়ায় পারস্পরিক আত্মীকরণ (assimilation) না হলে মানুষের ক্রম-সম্পর্কের সংকটটি ব্যক্তির কিংবা গোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতাবোধকে (alienation) উসকে দিতে পারে। এমন বিচ্ছিন্নতাবোধ ব্যাপকতর হলে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এবং এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ও  রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে যে নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা আবাসভূমিতে যে সমাজরূপান্তর প্রক্রিয়া চিহ্নিত, তেমন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এসেছে। সুতরাং আবাসভূমির সেই চিহ্নটিকে বাংলাদেশের সমাজ-রূপান্তরের (Social Change) কালচিহ্ন বলা যায়। আবাসভূমির নিচিন্তাপুরের সমাজব্যবস্থার নানামুখী পরিবর্তন সেখানকার সমাজকাঠামোতে প্রত্যক্ষ অভিঘাত হানে। আবুল কালাম সেই পরিস্থিতিতে নিচিন্তাপুরে প্রবেশ করেন। আবুল কালামের স্থানান্তরণ হয় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে একটি জেলা থেকে রাজধানী ঢাকায় এবং সেখান থেকে ঢাকার পাশের নারায়ণগঞ্জের ডিএনডি বাঁধাভ্যন্তরে জলাবদ্ধ নিচিন্তাপুরে। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনীতির নয়া বাঁক, সেইসঙ্গে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন সম্পর্কের সংকটের আগুনে ঘি ঢালে। নিচিন্তাপুরে লোক আসে নোয়াখালী, বরিশাল, কুমিলস্না থেকে, যারা জীবিকার জন্য ঢাকায় পাড়ি জমানো লোক; কিন্তু ঢাকার অর্থনৈতিক জীবনে খাপ খাওয়াতে সমর্থ নয়। কিন্তু তারা যখন নিচিন্তাপুরে, নিচিন্তাপুরের মানুষের কাছে তারাই ‘বৈদেশ্যা মানুষ’। জিজ্ঞাসা হতে পারে, এমন পরিস্থিতিকে কীভাবে সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে মেলানো যায়? আমি বলি – কেন নয়? এই তো অঞ্চলগত সাম্প্রদায়িকতার চূড়ান্ত প্রকাশ। নিচিন্তাপুরের মানুষ যেমন, তেমনই বরিশাল, নোয়াখালী, কুমিলস্নার লোকগুলো তাদের জন্মগ্রাম বা অঞ্চলের প্রতি তাদের অন্তরস্থ ভুলতে পারে না। ফলে তারা নিচিন্তাপুরে বসবাস করেও বরিশাল কিংবা নোয়াখালীই তাদের ‘দেশ’। ভূমিভিত্তিক জাতীয়তা চেতনার মূল রয়েছে এই জন্মাঞ্চলের প্রতি আত্মস্থিত গভীর সংযোগ বোধের ভেতর। সম্ভবত, এমন চেতনাবোধ থেকেই এসেছিল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তা’বোধ ও ‘বাংলাদেশি নাগরিকতা’র বোধ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের উন্মেষ হয়েছিল সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবোধে। সুতরাং এই স্থানিক জাতীয়তার ভেতর যে বহুস্থানিক জাতীয়তার বিদ্যমানতা তা জাতীয় ও সামাজিক সংহতিকে ব্যাহত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তা দিয়ে এমন সংহতির সংকট অপনোদিত করা সম্ভব ছিল। জন্মস্থানের প্রতি আত্মসমাহিত অনুভবটি সাংস্কৃতিক বিনিময় কিংবা সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের অন্তরায় হয়েছে, হয়-ই। এই সমস্যাটি যে কেবল নগরকেন্দ্রিক মানুষের সচেতনতার অংশ তা নয়, এটা ততদিনে বাংলার গ্রামে গ্রামে, প্রত্যন্ত কোণে বিস্তার লাভ করেছে। ফলে, বাংলাদেশজুড়েই মানুষের সম্পর্কের সংহতি সংকটে পড়েছে। উপন্যাস আবাসভূমি সেদিকে সমাজতাত্ত্বিকের দৃষ্টি ফেরায়।

স্থানান্তরণজনিত সম্পর্কের সমস্যাটির সঙ্গে যখন ধর্মবিশ্বাসভিত্তিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শগত মেরুকরণ ঘটে, তখন এর শুশ্রূষা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে থাকে, অন্যথায় এটি সামাজিক গতিশীলতার (social dynamics) সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ পরিস্থিতিই। এখন যদি নিচিন্তাপুরের কথা আলোচ্যে আনা যায় তবে কী দেখব? সেখানকার পরিস্থিতিটা কী, অনুমেয়? নিচিন্তাপুরের মানুষদের পারস্পরিক সাংস্কৃতিক আত্মীকরণে অরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াটি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছে। নিশ্চিতভাবেই সেখানে এখন সেই রাজনৈতিক বিভাজনটিই প্রকট, যা এখন সমগ্র বাংলাদেশের মানুষেরই সম্পর্কের রূপাবয়ব জানিয়ে দিচ্ছে। ’৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী আরমান স্বাধীনতার পরে ক্ষমতা কাঠামোয় দৃঢ় হয়, যদিও তখনই তার রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রকাশটি সে করে না, কিন্তু নববই-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ধীরে-ধীরে যে ধর্মীয় উগ্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে তার পেছনে আরমানদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা আমাদের চোখ এড়ায় না। বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক সম্পর্কের যে-কারণগুলো প্রধানরূপে চিহ্নিত তার মধ্যে যেমন সাম্প্রদায়িক চেতনার (ধর্মীয় ও আঞ্চলিক বা ভূমিভিত্তিক) প্রভাব, অর্থনীতির নয়া মোড় তথা শিল্পায়ন ও পুঁজির বিকাশের পথে নগরায়ণের প্রভাব ও গ্রামগুলোরও নগরমানস গঠন যা মূলত সমাজ বিকাশের ধারায় স্বাভাবিক প্রবণতাই বটে। স্বাভাবিক প্রবণতায় সমাজ বিকশিত হলে যে-কোনো পরিবর্তনের ধারাতেই পরিবর্তিত সমাজকাঠামো বা সামাজিক সম্পর্কটি একটি নির্দিষ্ট ধরন (প্যাটার্ন) পেয়ে যায়। কেননা, সেখানে সাংস্কৃতিক একটি প্রকরণ তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই দ্বিবিধ কারণ ক্রিয়াশীল থাকায় সমাজকাঠামোর একটি সুনির্দিষ্ট ধরন স্থায়ী হতে পারেনি এবং পারছে না। এখানে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের দুটি মেরুতে মানুষেরা যখন বিভাজিত তখন সমাজকৃত অন্যান্য সম্পর্কসূত্রও ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র পরিসরে ক্রিয়াশীল রয়েছে (অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো বিশেষ উল্লেখ্য), ফলে সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট প্রকরণ স্থিরকৃত হচ্ছে না।সম্পর্কের ভেতরের আস্থার সংকটটি মানুষকে একা করে দিচ্ছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বোধে। প্রতিষ্ঠিত সামাজিক মূল্যবোধগুলো যখন মানুষের সম্পর্কের আস্থার ভিত্তি হতে পারছে না, তখন ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো তার আস্থার স্থানটি থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। ফলে সাংস্কৃতিক টানাপড়েনটি মানুষের সম্পর্কের অসুখরূপে প্রকটিত হয়ে আছে। আবাসভূমি এমনই একটি আভাসবিধৃত ক্যানভাস।

সমাজ পরিবর্তনের স্বাভাবিক ধারাটি কীভাবে নিচিন্তাপুরের মানুষের তথা বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্কের সংকটটিকে জিইয়ে রেখেছে দেখব। দেখব সাংস্কৃতিক টানাপড়েনের স্বরূপটিও। নিচিন্তাপুরের মানুষের সঙ্গে স্থানান্তরিত মানুষগুলোর (কালামসহ অনেকেই) সম্পর্ক বহু বছরেও কাছের হতে পারে না। সম্পর্কের এই সংকটের পেছনে রাজনৈতিক কারণগুলো গভীরে কাজ করেছে বটে, কিন্তু প্রত্যক্ষে থেকেছে সমাজ-অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাব। স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্ভিক্ষ যেমন মানুষদের অস্থির করেছে, তাদের উৎপাটিত করেছে জন্মভূমিমূল থেকে, তেমনই নিচিন্তাপুরের মানুষদের কাছে বহিরাগতরা সমাজ স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতিযোগী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছে। ফলে তারা কাছের হতে পারেনি। পারস্পরিক অবিশ^াসের প্রবণতায় তা হওয়া খুব সহজও ছিল না, কেননা, সেখানে ব্যক্তি, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থগত নতুন সমীকরণ, নতুন অর্থনীতির গতিমুখ তৈরি করেছে। আর এই পারস্পরিক অবিশ^াস জিইয়ে রাখা কারো-কারো জন্য লাভজনক হয়েছে, যা স্থানিক ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্র দখলেও লিভার হিসেবে কাজ করেছে। একদিকে যেমন ঢাকার নিম্নবিত্তের মানুষ সংগ্রামে পরাস্ত হয়ে নিচিন্তাপুরে যায় আবার নিচিন্তাপুরের মানুষকেও সংগ্রামের পথে ঢাকামুখী হতে হয়। সেখানকার মানুষগুলোর মধ্যকার বনেদি যাপনমূলক অর্থনৈতিক-পেশাভিত্তিক সম্পর্কগুলোও ভেঙে যায়। ডিএনডি বাঁধ সেখানে স্থায়ী জলাবদ্ধতার মাধ্যমে নিচিন্তাপুরের কৃষি-কাঠামোকেও বিনষ্ট করে। ফলে, কৃষি-উৎপাদনহীন মানুষগুলো জীবিকার জন্য শহরমুখী হলে, সেখানে তারা মুখোমুখি হয় বিচিত্র শঠতার। এদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসে একদল সুযোগসন্ধানী, দালাল শ্রেণির মানুষ যারা স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সচেষ্ট। এই সুযোগটাও আসে অর্থনৈতিক পরিবর্তনশীলতার মধ্য দিয়ে। ঢাকাকে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা, নিচিন্তাপুরের উপশহর হয়ে-ওঠার প্রত্যাশা এবং সেখানকার কৃষিভূমির নিষ্ফলা হওয়া সেখানকার ভূমি-ব্যবস্থাপনায় নতুন মোড় দান করে। কৃষি-উৎপাদনে ভূমির কোনো প্রয়োজনীয়তা না থাকলে পতিত ভূমির উৎকৃষ্ট উপযোগ তৈরি হয় নয়া বসতির জন্য, শহর সম্প্রসারণের ও শিল্পায়নের স্থান সংকুলান করতে। ফলে জমির দাম বাড়ে হু-হু করে। এই প্রবণতায় দালাল শ্রেণির হাতে যেমন নতুন আগত লোকেরা ঠকে, তেমনি তাদের বহু বছরের প্রতিবেশীকেও তারা ঠকাতে পিছপা হয় না। ফলে সম্পর্কের ভেতরের অবিশ^াসটি অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করে। সম্পর্কের সঙ্গে ভাঙে সেখানকার সমাজে প্রচলিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। মূল্যবোধের সঙ্গে-সঙ্গে নিচিন্তাপুরের মানুষের নৈতিকবোধ ও অপরাপর মানবিকবোধগুলোও তিরোহিত হতে থাকে। আত্মস্বার্থতাড়িত নিচিন্তাপুরের মানুষ যে-কারণে ধানক্ষেতের ভেতর কোনো বিপদগ্রস্ত, বিপন্ন মানুষকে ফেলে দিব্য চলে যেতে পারে কাজের সন্ধানে। সুসংহত সমাজকাঠামো সামাজিক নিরাপত্তার পূর্বশর্ত নিশ্চয়ই। কিন্তু আমত্মঃসম্পর্কহীন এই মানুষগুলো কেমন অনিরাপদ হয়ে ওঠে! তারা যেমন রাস্তায়, তেমনি বাসাবাড়িতেও অনিরাপদ ও একা। ফলে এমন পরিস্থিতিতে

সামাজিক নিয়ন্ত্রণের (social control) কোনো উপকরণই আর কার্যকর থাকে না। নিচিন্তাপুর গ্রামে সমাজ-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে আমদানি হয় সন্ত্রাসের মতো গভীর সামাজিক অসুখের। সামাজিক সংহতির তীব্র সংকটে চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতাবোধের শিকার হয় নিচিন্তাপুরের মানুষ, কেবল নয়া বসতির আবুল কালামেরাই নয়, স্থানীয় খালেক মাতবর, সালু ও জামালরাও। ভাসমান শ্রমজীবী মানুষ যারা সকালে শহরে যায় ও সন্ধ্যায় ফিরে আসে তাদের বাইরেও কৃষিপেশার বৃহদংশ মানুষ

কৃষি ভুলে নতুন পেশার সঙ্গে উপযোজিত হয়, উদ্ভব হয় ব্যবসাসহ বিচিত্র পেশার ও শ্রেণির মানুষ। এই উপযোজনও নিচিন্তাপুরের সমাজসম্পর্কের ওপরে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে, সেখানেও শঠতার মাধ্যমে অধিক সুবিধাভোগের প্রবণতা লক্ষণীয়। ফলে নিচিন্তাপুর তথা বাংলাদেশের মানুষের বনেদি কৃষিভিত্তিক সম্পর্ককাঠামো তথা সমাজকাঠামো ভেঙে যায় আর নতুনতর শিল্পবিকাশোন্মুখ সমাজে নতুন সম্পর্ককাঠামোটিও স্থায়ীরূপ নিতে পারে না। নিচিন্তাপুর যেমন, তেমনি পুরো বাংলাদেশই বহুমুখী দুর্নীতির আধার হয়ে ওঠে। ১৯৭৫ সাল-পরবর্তী বাংলাদেশে সমাজ-সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এক উলটো রথের যাত্রা শুরু হয়। নিশ্চিতভাবেই তা বাংলাদেশের মানুষের বহুদিনের লালিত কাঙিক্ষত সমাজগঠনের বিপরীত যাত্রা। বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ স্বাধীনতা-সংগ্রামের রক্তক্ষয়ী অবদানকে এই ‘বিপরীত প্রবাহ’ ব্যর্থতার স্মারক হিসেবে ইতিহাসে এঁকে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা।

সমাজ-সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রক্রিয়া একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে খেলা হয়েছে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক খেলা। স্বাভাবিকতায় সমাজের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রিয়াশীলতার কার্যকারণ সূত্রেই তা নিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রগতিশীল থাকে। এবং তা দীর্ঘ কালপরিক্রমার ব্যাপার। কিন্তু যখন কোনো সমাজের সংস্কৃতিকে হঠাৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে, পরিকল্পিতভাবে বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলে তখন তা যে দুরভিসন্ধিমূলক নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। বাংলাদেশে এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের, বাঙালির একটি সুনির্দিষ্ট প্রকরণ তৈরি হতে দেয় না। বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ধারাটিকে রক্ষা করতে যে দীর্ঘ প্রচেষ্টা, তা ’৫২ থেকে ’৭১-এর কালব্যাপ্তিতে প্রকাশ্যে রাজনৈতিকভাবেই করা হতে থাকে এবং ’৭১-এর রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক স্বাধীনতা লাভের পরে তা আরো সহজ হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তা হতে পারেনি। এখানে সমাজ পরিবর্তনের দ্বিমুখী রাজনীতি ক্রিয়াশীল থেকেছে। উপন্যাস আবাসভূমি যে-কালব্যাপ্তিকে চিত্রিত করেছে সেই সময়খ– বাংলাদেশের তৎকালের শাসনপ্রধান জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ডেকে নিয়ে বলেছিলেন – ‘আসুন, আমরা আমাদের সংস্কৃতি তৈরি করি’ (সূত্র : ওয়াহিদুল হকের প্রবন্ধ সংকলন চেতনা ধারায় এসো)। এটি কি ভীষণ অদ্ভুত ও দুরভিসন্ধিমূলক প্রস্তাব নয়? এটি নিঃসংশয়ে ’৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পরিপন্থী প্রবণতা ও প্রচেষ্টা। এর দীর্ঘ সময়কালের প্রেক্ষাপট পূর্বেই আলোচিত হয়েছে। এ সময়কালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সাম্প্রদায়িক বীজের উদ্গত বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা ও ফলশ্রম্নতি। নিচিন্তাপুরের আরমানও যেন এই পরিপ্রেক্ষিতেই শুষ্কচুলে তেল পেতে তাজা হয়ে উঠেছে। বাঙালির কিংবা বাংলাদেশের মানুষের যে নতুন সংস্কৃতি তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হলো, তাতে প্রশ্ন এই যে, বাংলাদেশের মানুষ কি তবে সংস্কৃতিহীন ছিল এতদিন? এতদিনের স্বীকৃত বাঙালি সংস্কৃতির তবে কী হলো? প্রকৃত সত্য হলো যে, সহস্রাধিক বছর পূর্বকাল থেকে বিভিন্ন নামের আবরণে বাংলাদেশ নামের এই ভূখ–র মানুষের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের সংস্কৃতি নির্মিত হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের সংস্কৃতিভিত্তিক আত্মপরিচয় ‘বাঙালি’। ফলে সেই প্রস্তাবটি যে একটি জাতির জন্য কী গভীর ষড়যন্ত্রমূলক তা প্রায় অকল্পনীয়, তথাপি তা বাংলাদেশেরই সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই শত্রম্নটিও প্রকৃতপক্ষে অনেক আগেই চিহ্নিত হয়েছিল বলেই দীর্ঘ এক সংগ্রামের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আর নিচিন্তাপুরের সমাজকাঠামোও সেই গভীর ষড়যন্ত্রের বাইরে থাকা সম্ভব ছিল না। ফলে, নিচিন্তাপুরই বাংলাদেশের রূপক হয়ে ওঠে। কেননা, নিচিন্তাপুরের সমাজ-রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোর যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয় তা এই ষড়যন্ত্রপ্রসূতই। সেখানে দেখি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের বিরোধিতাকারী মানবতাবিরোধী রাষ্ট্র পাকিস্তানের দোসর ‘রাজাকার’খ্যাত আরমান ক্ষমতাকাঠামোতে সদর্পে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, কিন্তু বিপরীতে গণমানুষের মুক্তিকামী, সাম্যবাদী রাজনীতির চর্চাকারী মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম সেই রাজাকারের কাছে অপদস্থ হচ্ছে। অন্যদিকে আরমান নিচিন্তাপুরের সমাজ-রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান  নিয়ন্ত্রণকারী হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষক। এসব ক্রিয়াকা–র আড়ালে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সাম্প্রদায়িক, সাম্রাজ্যবিস্তারী রাজনৈতিক শক্তি যে ক্রিয়াশীল ছিল তাও জানা হয়েছে।

পুনরুল্লেখ্য, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে এই উপমহাদেশীয় অঞ্চলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশের পর পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে তখন সবেমাত্র বাংলাদেশও পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশোন্মুখ একটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্র স্বয়ং পুঁজির বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এটি স্বতঃসিদ্ধ যে, পুঁজিব্যবস্থার প্রধান ও একমাত্র ন্যায়নীতি বা ব্যবসায়িক নৈতিকতার মূল কথা হলো ‘মুনাফা’। সুতরাং ঢাকার শিল্পপতি তার পুঁজির সুরক্ষায় ও মুনাফার প্রক্রিয়াকে নিশ্চিত করতে নিচিন্তাপুরের সন্ত্রাসীদের ওপরেই নির্ভর করে, দোসর করে রাজাকার আরমানকে। এভাবেই পুঁজি কেবল মুনাফাকে মূলনীতি করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ, আদর্শ ও নীতিগুলোকে জলাঞ্জলি দিতে পারে। সামাজিক, রাজনৈতিক মেরুকরণে এখানে সংস্কৃতিগত আদর্শকে কাজে লাগানো হয়নি, বরং কাজে লাগানো হয়েছে ধর্ম ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কজনিত অনুভূতিকে। সামাজিক বিভাজন (সমাজ সম্পর্কেরও নিশ্চয়ই) তৈরিতে যে হাতিয়ারগুলোকে কাজে লাগানো হয়েছিল তার মধ্যে ধর্ম অন্যতম প্রধান ছিল। সেটি ছিল জাতির সঙ্গে এক কুৎসিততম প্রতারণা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আধার থেকেই। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে পুঁজির মালিক আরো বেশি ধনবান হবে আর অপর পক্ষে অধিকাংশ জনগণ হবে সম্পদহীন, চরম দরিদ্র, সর্বহারা, সামাজিক উদ্বাস্ত্ত, এটাই দস্ত্তর। কিন্তু এই দুর্বৃত্তরা কেবল পুঁজি নয়, রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চরম প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে। ভাঙে মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্কের, পারস্পরিক বিশ^াসের ভিত-বন্ধনও। যদিও রাজনীতির প্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষদের সংহত হতে দেখা গেছে বেশ কয়েকবারই। কিন্তু তাতে সামাজিক সম্পর্কের অসুখে কোনো শুশ্রূষা হয়নি। বরং সামাজিক বিভাজন নতুন মোড় নিয়েছে। মানুষেরা পরিচিত হয়েছে রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে। সেখানে অর্থনৈতিক কারণে কিংবা যাপনজনিত কারণে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সামাজিক সংহতি আর তৈরি হয়নি। মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় হয়েছে তার যাবতীয় সুবিধা অর্জন ও অসুবিধা ভোগের নিয়ামক। ফলে সম্পর্কের সংকটটিই বাংলাদেশের সমাজকাঠামোতে প্রধানতম সংকট হিসেবে এখনো চিহ্নিত হয়ে আছে।

বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্কের সংকটের আরেকটি কারণস্বরূপ হলো মানুষের ভূমিবিচ্যুত হওয়া, শিকড়বিহীন জনসমষ্টির সামাজিক অবস্থান ও সমাজবাস্তবতা। এই বাস্তবতা সাংস্কৃতিক পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়াকেও বিপদে ফেলে দেয়। সাংস্কৃতিক পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়ায় সংস্কৃতিকরণ (acculturation) ও সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণে (assimilation) শত বছর কিংবা হাজার বছরের পর্যায় পাড়ি দিতে হয়, তা মানববংশপরম্পরায় হয়। সেখানে সতত স্থানান্তরিত, উন্মূল মানুষের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণটি কীভাবে হবে! বড়জোর তারা সংস্কৃতিগতভাবে উপযোজিত হতে পারে। কিন্তু, সাংস্কৃতিক উপযোজন (adaptation) প্রক্রিয়াটি অপেক্ষাকৃত স্বল্পকালিক এবং মনে রাখতে হবে উপযোজন প্রক্রিয়াটি অবশ্যই স্বতঃস্ফূর্ত নয়। যখন কেউ কোনো স্থান-কালের সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে উপযোজিত হতে চায়, তখন সে অবশ্যই বাধ্য হয়ে এই পদক্ষিপ নেয়। কখনো এই বাধ্যবাধকতা আসে অপর কারো কাছ থেকে, হতে পারে তা শাসক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে, সমাজের কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের কাছে থেকে। সুতরাং বলাই যায় যে, উপযোজন প্রক্রিয়ায় দমন-পীড়নের (coercion) একটি ব্যাপার অবশ্যই থাকে। এটি সামাজিক প্রক্রিয়ার একটি অপসৃতি। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণেও উপযোজিত হতে বাধ্য হতে পারে মানুষ। কিন্তু তাও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নয়। নিচিন্তাপুরে কোনোটাই ঘটা সহজ ছিল না, কেননা, এই প্রক্রিয়াগুলোয় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হতে হয় প্রথমত। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে কিংবা গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে আদান-প্রদান হতে হয়। এই

আদান-প্রদানে নানামাত্রিক প্রতিবন্ধকতা বিরাজ করছিল সেখানে। শুধু যে নিচিন্তাপুরেই এমন হয়েছিল তা নয়, বরং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেই এই পরিস্থিতি বিরাজ করেছে। এবং বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজে যেসব সমস্যা সামাজিক সংকট হিসেবে মানুষের ও সমাজচিন্তকগণের মাথাব্যথার কারণ বলে গণ্য, তা সব এই পরিস্থিতি থেকেই উদ্ভূত বলা যায়। এই প্রক্রিয়ায় অর্থনৈতিক পরিবর্তনগত পরিস্থিতি একটি বড় অনুঘটক। আবার বাংলাদেশের সমাজকাঠামোর নবরূপায়ণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণবাদমূলক (সম্প্রদায়গত আদর্শের রাজনীতির প্রভাব এড়িয়ে তা মোটেও নয়) (economic determinism) ব্যাখ্যাও খুব সহজেই খেটে যায়। দ্রম্নত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্বৃত্তায়ন মানুষের সম্পর্কের বিনির্মাণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে প্রভূতভাবে। এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সারা দেশেই সামাজিক স্থানান্তরণ (social migration) প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা নতুনতর ভূমিব্যবস্থাপনার সম্মুখীন করে শাসক গোষ্ঠীকে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা, নোয়াখালীর দুর্ভিক্ষ, পাহাড়ি জনপদের মানুষদের জনমিতিক-রাজনৈতিক কর্মকা–র পরিপ্রেক্ষিতে শাসকের ভূমিকা ও তার ফলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সংকটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সমস্যার কারণগুলোর আপাত ভিন্নতা চোখে পড়লেও এগুলোর প্রত্যেকটির মধ্যে আমত্মঃসম্পর্কমূলক সাযুজ্য আছে। প্রত্যেকটি স্থানেই ভূমির মালিকানা, ভূমির বৈশিষ্ট্য কিংবা ভূমির অনুৎপাদনশীলতা কারণ হিসেবে দেখা দেয়, এগুলো অনিবার্যই মানুষের স্থানান্তরকরণের অন্যতম মুখ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আবারো বলছি, এই সমস্যাগুলোর মধ্যে থেকেও মানুষের সামাজিক সম্পর্কের সাংস্কৃতিক সহমর্মিতা গড়ে ওঠা স্বাভাবিক ছিল, বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু তা হয়নি। সঙ্গে ক্ষমতাকাঠামোকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া মানুষদের উন্মূল করেছে ব্যাপকভাবে। পাহাড়ি মানুষদের উপজাতীয় কিংবা আদিবাসী সাম্প্রদায়িক অনুভূতির অনুসৃতিকে প্রতিরোধ করতে শাসকের ভূমিকায় দেশে ব্যাপকভাবেই মানুষের স্থানান্তরণ ঘটেছিল পাহাড়ে। এমন বহুবিধ কারণ নিহিত এখানে। স্থানান্তরণ রাজনৈতিক কারণে ও অর্থনৈতিক কারণেও। এই স্থানান্তরণ কেবল শহর-গ্রামের টানাপড়েন নয় মোটেই, তা আঞ্চলিকতারও। এই টানাপড়েন নিচিন্তাপুরেও দৃষ্ট হয়েছে। নিচিন্তাপুরের ক্ষমতাকাঠামোর পালাবদল, রাজনীতির গণেশ উলটানো, স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন সবাই মানুষদের জন্য মাঙ্গলিক, সংহতিপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রকরণ তৈরিতে প্রতিবন্ধক হয়েছে। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি অর্থনীতি ভেঙে পড়া ও ভূমিকেন্দ্রিক, ভূমিব্যবসাভিত্তিক নয়া অর্থনীতি ভীষণভাবে উন্মূল করেছে নিচিন্তাপুরের মানুষদের ও সেখানে স্থানান্তরিত হয়ে আসা মানুষদের। জলাবদ্ধ ভূমি সমস্যা কেবল নিচিন্তাপুরের নয়, বাংলাদেশের ভূমিবৈচিত্র্যে এমন জলাবদ্ধ ভূমির বহু এবং বিপুল অসিত্মত্ব রয়েছে যার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে বাংলাদেশের সমাজ পরিপ্রেক্ষিতে। এমন প্রেক্ষিতে যারা নিচিন্তাপুরের আদি বাসিন্দা তারা যেমন নতুন করে উন্মূল হয়েছে, তেমনই যারা বাইরে থেকে গিয়ে সেখানে বসতি স্থাপন করেছে তাদেরও শিকড় বড়ই অগভীর, এবং বরং বলাই ভালো যে, তারা প্রকৃতপক্ষে তখনো মূলহীনই থেকে গেছে। কেননা, নিচিন্তাপুরের আদি বসবাসকারীদের সঙ্গে তাদের আমত্মঃসংযোগ কিংবা অন্তরসংযোগ কোনোটিই হয়ে ওঠেনি। এই প্রতিবন্ধকতা পারস্পরিক। এই পরিস্থিতির অবসান হওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিপরীত বৈরী শক্তি, উলটো স্রোত ক্রিয়াশীল থাকায় খুব দ্রম্নতই সব পরিস্থিতির বদল হতে থাকে, বদল হয়েছে, ফলে সম্পর্কের সংকটটি কাটেনি আর। আর বাংলাদেশের সমাজকাঠামোরও একটি সুনির্দিষ্ট প্রকরণ (pattern) এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। আর সাম্প্রদায়িক সমীকরণে ও রাজনৈতিক মেরুকরণে মানুষের সম্পর্কের যে-মেরুকরণ হয় তাও কোনো সমাজের স্বাভাবিক কাঠামো দান করতে পারে না, কেননা, সমাজ এমন সরল মেরুকরণে থাকে না কখনো। সমাজ বহুবৈচিত্র্যময় এক জটিল সত্তা। এখানে বহুশ্রেণির অসিত্মত্ব বিদ্যমান। মার্কসীয় দুই শ্রেণির (শাসক ও শাসিত কিংবা প্রলেতারিয়েত ও মালিকপক্ষ) মেরুকৃত সমাজকাঠামোর প্রকল্পটিও সর্বজনস্বীকৃত হতে পারেনি। বৈচিত্র্যময় স্বার্থের বহুশ্রেণিবিভাজিত সমাজই হলো সমাজবিকাশের স্বাভাবিক অবস্থা। সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ সমাজ সম্পর্কের বৈচিত্র্যকে লীন করতে পারে না শেষ পর্যন্ত, কিন্তু বৈচিত্র্যময় সম্পর্কগুলোর ভেতরে বিশ^াসের, আস্থার যে-বন্ধনটি থাকতে হয়, রাজনৈতিক-সাম্প্রদায়িকতার আত্মঘাতী সংঘাতগুলো সেই বন্ধনটিকে বিনষ্ট করে। বাংলাদেশেও তাই হয়েছে, হচ্ছে এবং তা দ্রম্নতই রূপান্তরশীলতার ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে বিধায় বাংলাদেশের সমাজকাঠামোর স্বরূপটি নির্ণয় করা সহজ নয়। 

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার