যুদ্ধের জাদুঘরে

লেখক:

স্ব প্ন ম য় চ ক্র ব র্তী

অনীশ ওর হোটেলের ব্যালকনিতে বসে সামনের বিরাট ক্যানভাসে মেঘেদের খেলা দেখছিল। কতবার, কতভাবে মেঘ দেখেছে অনীশ, খালি চোখে, দুরবিনে, নিয়োডোলাইডে, রাডারে…। তবু মেঘ দেখতে ভালো লাগে। চাঁদ দেখতে যেমন।
আকাশে মেঘ। কিউমুলাস, হালকা সিরাস। মেঘেদের পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না। যেখানে খুশি চলে যায়। দেশ, সময়, সাম্রাজ্য পালটায়, কিন্তু মেঘ পালটায় না।
সারা পৃথিবীর সিরার্স পেঁজা তুলোর মতো, সারা পৃথিবীর কিউমুলো নিশ্বাস স্তরে স্তরে জমা হয়।
অনীশ ভিয়েতনামে এসেছে। তিনদিনের সেমিনার। গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম, সংক্ষেপে জিপিএসের সঙ্গে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকে মিলিয়ে কী করে আরো ভালো আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া যায় – তাই নিয়ে সেমিনার। অনীশ একজন আবহাওয়াবিদ।
আজ পেপার পড়া নেই। শুধু এনজয়। সেমিনারের কল্যাণে দেশ ঘোরা হয় বেশ। গত বছর ইসরায়েল গিয়েছিল। ইসরায়েল থেকে তখন রকেট ছুটছিল প্যালেস্টাইনে। গাজায় ঘর জ্বলছিল, আর ইসরায়েলের মেঘ ওধারে গিয়ে পানি ঢালছিল। সেবার ইসরায়েলে প্রচুর ইলিশ। একজন বৃদ্ধ ইহুদি বলেছিলেন, ইলিশ মরা মানুষ খেতে ভালোবাসে।
তখন মানুষ মরছিল। গাজা থেকে পালাতে গিয়ে নৌকাডুবিতে মরছিল প্যালেস্টাইনের মানুষজন। মানুষের লাশ সমুদ্রে ভাসছিল। বৃদ্ধ ইহুদি বলেছিলেন, এ-ইলিশ কোসার নয়। কোসার মানে অনীশ জানত, মুসলমানরা যাকে বলে হালাল। মরা মানুষের মাংস কি এই ইলিশে? যে-মানুষ সমুদ্রে ভেসেছে?
ইলিশ মাছ সত্যিই মরা মানুষের মাংস খায় কিনা অনীশ জানে না। তবে ওর জ্যাঠামশাই একবার বলেছিল – কলকাতার যে-কটা ঘাটে ইলিশ আসত, তার পাশেই শ্মশান। রতনবাবুর ঘাট, বাগবাজার ঘাটের পাশেই তো শ্মশান, শোভাবাজারের কাছে নিমতলা। সবাই তো ছাই ফেলে দেয় গঙ্গায়, ওর মধ্যে না পোড়া মাংসও থাকে। ওসব খেতেই ইলিশ আসে।
তখন তো ইলেকট্রিক চুল্লি হয়নি। কিছু ছাই না-হওয়া অবশেষ থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু ওসবের লোভে ইলিশের ঝাঁক আসবে, তখন বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
এখনো দেখছে লাশ। কাগজে ছবি দেখল, সমুদ্রে ভেসে তুরস্কর তীরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে এক বালিকা। নিষ্পাপ মুখে ধর্ম লেখা নেই। পার্টি লেখা নেই।
সায়গন শহরটার নাম এখন হো-চি মিন সিটি। হো-চি মিনের একটা মূর্তিও দেখেছে রাস্তায়।
অনীশ পলিটিক্স করে না। এ নিয়ে ও খুব একটা ভাবে না। আসলে রাজনীতি শব্দটার গায়ে যেন অনেক পানের পিক, গুটখা মেশানো থুথু, এইসব পড়েছে। ওর ছোট ভাইটা রাজনীতি করে। ওকে মনে মনে ঘেন্না করে অনীশ।
কিন্তু খবরের কাজে দেখা এই যে মুখ থুবড়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটা, সমুদ্র যাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, আর বারবার ধুইয়ে দিচ্ছে, যেন ধুইয়ে দিচ্ছে মানুষের পাপ, – এসব নিয়ে ভাবা মানে কি রাজনীতি! মোটেই না। একটা এমনি-মানুষ এসব এমনি এমনিই ভাবতে পারে। বরং রাজনীতির জন্য মানুষের এরকম খারাপ হয় বলেই রাজনীতিটা ভালো লাগে না।
কিন্তু রাজনীতিটা তো মানুষের ভালোর জন্যেই হয়েছিল।
অনীশ মূলত স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র। পরে আবহাওয়াবিদ হয়েছে। রাজনীতি বোঝে না। তবে প্লেটো, অ্যারিস্টটল, মার্কস, গান্ধিজি, মুজিব, আম্বেদকার – এদের কথা তো কিছুটা জানে। ওরাও তো রাজনীতিই করেছিলেন। মানুষের ভালোর জন্যই তো, না কি! যেমন হো-চি মিন দেশটাকে তো উদ্ধার করে দিলো।
সেই ১৮৬০ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত ফরাসিদের দখলে ছিল ভিয়েতনাম। কমিউনিস্ট গেরিলারা লড়াই করে ভিয়েতনামের উত্তরদিকটা মুক্ত করল। এরপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আমেরিকা। এবার অন্য লড়াই। ভিয়েতনামের মানুষের সঙ্গে আমেরিকার। নেতৃত্ব দিলেন হো-চি মিন। কুড়ি বছর যুদ্ধের পর আমেরিকাকে সরে যেতে হলো। সেটা ১৯৭৫ সাল। অনীশ তখনো জন্মায়নি। তবে শুনেছে। বাবা-কাকার কাছে সত্তরের দশক শুনেছে, ১৯৭১ শুনেছে, – বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, আর গ্রাম দিয়ে শহরঘেরা। সত্তরের দশক – মুক্তির দশক। ১৯৭২-এর গু-া লাগানো ভোট, আর কলারওয়ালা পাঞ্জাবি-পাজামা পরাদের তোলা আদায়। অনীশের ভাইয়ের নাম আলোক। স্বরবর্ণের প্রথম অক্ষরে বড় ছেলের নাম রাখা হয়েছিল, দ্বিতীয় অক্ষরে আলোক।
আলোক রাজনীতি করে। ওকে সবাই চেনে। অনীশকে কজন চেনে। আলোকের ছবি রাস্তার মোড়ে। আলোক আলুবাবু নামেই বেশি খ্যাতিমান। গত কয়েক বছরে অভাবনীয় দ্রুতিতে আলোকের উত্থান। আলাদা বাড়ি – মার্বেল মোড়ানো, হোটেলও নাকি আছে একাধিক। বাবার তৈরি একতলা বাড়িটা তিনতলা করে অনীশকে বলেছে, তোর আকাশ দেখতে ভালো লাগে, তুই তিনতলাতে থাকিস।
অনীশের এখন চৌত্রিশ। বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। দিল্লি, ম্যাসাচুসেটস ঘুরে এখন বরাহনগরের স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটে অধ্যাপনা করছে। আবহাওয়ার সঙ্গে সংখ্যাতত্ত্বের নিগূঢ় সম্পর্ক থাকে।
এখানে, হো-চি মিন সিটিতে যে-হোটেলে আছে, তার নাম ওয়ালডর্ফ। আমেরিকান হোটেল। দিন পালটায়। কিন্তু ইতিহাস থেকে যায়। গভীরে। মাটির গভীরে, সমবেত মনের গভীরে, শরীর-গভীরেও থাকে।
পিতামহের মৃত্যুর পর শ্মশান ডোম একটা মালসায় পিতামহের দেহাবশেষ ছাই দিয়েছিল। সেই মালসায় জ্বলজ্বল করছিল একজোড়া চোখের মতো আগুনের ডেলা। পিতামহের ঊরুতে ঢুকে থাকা ব্রিটিশ বুলেট। উনি ছিলেন স্বাধীনতার যোদ্ধা। কাঠের ভেতরে গোপনে থাকা ইতিহাসের গল্প শুনেছিল ওর বাবার কাছে। কাঠ চেরাইকলে নানা জঙ্গলের কাঠ আসে। আসাম, আন্দামান, ছত্তিশগড়…। মালয়েশিয়া-ভিয়েতনাম থেকেও। একটা মোটা লগ চেরাই হচ্ছিল, হঠাৎ কাঠের ভেতর থেকে প্রচ- শব্দ, স্ফুলিঙ্গ, স্পার্ক, ইলেকট্রিক করাতের দাঁত বেঁকে গেল, মেশিন গোঙাতে থাকল, মেশিন থেকে ধোঁয়া বেরোতে থাকল, মেশিন অফ করে বোঝা গেল গাছের ভেতরে ঢুকে আছে। কয়েকটা বুলেট। ওই কাঠ ছিল ভিয়েতনামের। জঙ্গলযুদ্ধের বুলেট ধারণ করেছিল ওই মহাবৃক্ষ। হোটেলের বারান্দায় বসে এইসব সাতকথা ভাবছিল অনীশ। আজ হোটেলের বারান্দা থেকে একটাও লাল পতাকা দেখতে পাচ্ছিল না অনীশ। মানুষ ছুটছে দ্বিচক্র যানে।
আজ সকালে সবাই দানাং গেছে। ওখানে অনেক মজা। প্যারাসোলিং, ওয়াটার স্কুটার, বডি ম্যাসাজ…। অনীশ যায়নি। ও যাবে ওয়ার মিউজিয়ামে। যুদ্ধের জাদুঘর। আর একটা মেয়েও রয়ে গেছে, ওর নাম জুলিয়া। আমেরিকান। ও বলেছিল, দানাংয়ে ভিয়েতনাম দেখা যাবে না, বোঝা যাবে না। ওরকম দানাংয়ের মতো ফানস্পট পৃথিবীজুড়ে আছে। অনীশও একই কথা ভাবে। ব্রেকফাস্ট করেই বের হবে। ব্রেকফাস্টের টেবিলেই দেখা হলো নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে। ও একা ছিল। ও একটু একা থাকা পছন্দ করে। বেশি কথা ও বলে না। ও সুইডিশ। মানে সুইডেনের নাগরিক, কিন্তু বাংলাদেশি।
অনীশ বলল, তুমি দানাং গেলে না নাসির? নাসির বলল, আজ রেস্ট করতে ইচ্ছে করছিল। অনীশ বলল, চলো আমাদের সঙ্গে ওয়ার মিউজিয়ামে। নাসির অনীশের দিকে এক পলক তাকাল। বলল, ইজ ইট অ্যানি স্পেশাল?
অনীশ ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলল। বলল, গেরিলা লড়াইয়ের ইতিহাস বহন করছে এই মিউজিয়াম।
নাসির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাংলায় বলল, ‘থাউক গিয়া।’ নাসির বাংলা বলেনি। অনীশের ‘সঙ্গে ও নয়। এখন হঠাৎ’ বলল।
জোর করা নাগরিকতার ধর্ম নয়। নাসির যাবে না। ওর ইচ্ছা। কেন যাবে না সেটা জিজ্ঞাসা করাও নাগরিকতাবিরোধী। নাগরিক ধর্মে বলা যায় না, ঘরে বসে কী করবে, চলো দোস্ত, চলো।
খাওয়া-দাওয়াটা একসঙ্গেই হলো। এসব হোটেলে ব্রেকফাস্টে অঢেল আয়োজন থাকে। নানা রকমের রুটি, চিজ, সালামি, ফল, মধু, কেক, দুধ…। আজ লাঞ্চ নেই। পেটপুরে যতটা সম্ভব বেশি করে খেয়ে নিতে হবে। গত দুদিন সেমিনারে লাঞ্চ ছিল। বিদেশে, যেসব হোটেলে ফ্রি ব্রেকফাস্ট থাকে এবং দুপুরে লাঞ্চ দেয় না, তখন ব্রেকফাস্ট খাওয়া দেখেই হোটেল ওয়েটাররা বুঝে যায় কে তৃতীয়বিশ্বের লোক।
জুলিয়া একটা জিনস আর একটা সাদা শর্ট শার্ট পরেছে। চুলটা ছোট করে ছাঁটা। নাক একটু ছোট ও চাপা, চোখ দুটোও একটু ছোট, ঠোঁট দুটো ভারি সুন্দর। সব নিয়ে মুখটা খুব মিষ্টি। ওর সঙ্গে তেমন করে আলাপ হয়নি। ও কি চায়নিজ অরিজিন? নাকি কোরিয়ান? ইংরেজি বলে বিশুদ্ধ আমেরিকান অ্যাকসেন্টে। জুলিয়া ওকে অ্যান বলে ডাকছে। অনীশের নাম যজ্ঞবল্ক কিংবা সুবর্ণকান্তি হলে কী ডাকত? নাসিরুদ্দিন, ও তো ন্যাস্।
খাবার তুলে নিচ্ছিল। একটা অদ্ভুত ধরনের ফল দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে উঠল জুলিয়া। ও বয়! হিয়ার ইজ চোয়াম চোয়াম। লিচুর মতোই আকৃতি, কিন্তু সারা গা থেকে সরু সরু শুঁড় বেরিয়েছে। কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে ওর প্লেটে তুলে নিল সাত-আটটা। বলল, আমার দেশের ফল। কতদিন পর দেখলাম।
– তোমার দেশের ফল মানে?
– মানে এ-দেশের ফল। ভিয়েতনামের নিজস্ব ফল। আমার বাবা কত খুঁজে খুঁজে এশিয়ান মার্কেট থেকে নিয়ে আসতেন। আমি ভিয়েতনাম অরিজিন। নাসিরুদ্দিন একটা পেয়ারা নিয়ে মুচকি হাসল। বলল, সুইডেনে রেয়ার পাওয়া যায়। আমার বাবাও খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসতেন।
জুলিয়া কিছুটা স্টিকি রাইস নিল। বিন সেদ্ধ, হ্যাম। অনীশও নিল অনেক কিছু, নাসির মাংসের কোনো পদ নিল না। অনীশ দেখেছে অনেক মুসলমান ঘরে মাংসের পদ খেলেও বাইরে খায় না। হালাল না-ও হতে পারে এই আশঙ্কায়। কেন নিল না জিজ্ঞাসা করাও নাগরিক রীতি নয়। অনীশ সবই নিল লোভীর মতো। চোয়াম চোয়ামও দুটো। জুলিয়া খুশি হলো। জুলিয়া সমস্ত হোটেল এটিকেট ভুলে এক মুঠো ফল হাতের পাতায় সাজিয়ে গন্ধ নিল।
জুলিয়া বলল, একটা গান মনে পড়ছে। দাদুর কাছে ছোটবেলায় শুনতাম। ভিয়েতনামি ল্যাংগুয়েজটা এখনো একটু জানি। বাবা শিখিয়েছিলেন। বাবা আমার সঙ্গে এখনো বলেন প্রায়ই। গানটার কথা ইংরেজিতেও বলল জুলিয়া। বাংলায় অনুবাদ করলে গানটা এরকম –
কতশত ফলে ভরা
আমাদের এই বসুন্ধরা
তাদের মাঝে চোয়াম চোয়াম
সকল ফলের সেরা।
ফলটা মুখে দেওয়ার আগে ফলটার শরীরে হালকা করে চুমো দিলো ও। জুলিয়া বলল, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে আমিও এশিয়ান মার্কেটে যেতাম। বাবা খুঁজে খুঁজে ব্যাম্বু শুট্স কিনত, টুলচাউকা – মানে হোয়াইট ক্যারট কিনত, কেইকে – আর এই চোয়াম চোয়াম। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এই চোয়াম চোয়ামকে হেয়ারি স্ট্রবেরিও বলে, কিন্তু কমই থাকে।
নাসির চুপচাপ এটা-ওটা খাচ্ছিল। জুলিয়ার মতো পেয়ারাটাও নাকের কাছে নিল, গালে ছোঁয়াল। অনীশ তো নিজের দেশেই থাকে, ওর এত রোমান্টিকতা লাগে না।
ওরা সবাই বজ্রবিদ্যুৎভরা মেঘ নিয়ে কাজ করে। অনীশ বর্ষার কালো মেঘ নিয়ে – কালবৈশাখি মেঘ, রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি যে আকাশপানে হানি যুগল ভুরু, মেঘের গুরু গুরু শুনেছিল। জুলিয়ার পেপার ড্রাই থান্ডারস্টর্ম। বজ্রবিদ্যুৎভর্তি মেঘ তৈরি হয়, কিন্তু বৃষ্টিপাতহীন। অ্যারিজোনা-নেভাদা-কলোরাডোতে মিহি বালুর গুঁড়ো যে-মেঘ তৈরি করে, তার ভেতরে বিদ্যুৎ জন্ম নেয়। নাসিরুদ্দিন ভূমধ্যসাগরীয় মেঘ নিয়ে কাজ করে। মেঘের ভেতরের বিদ্যুৎ জন্ম নেওয়ার প্রাথমিক শর্ত হলো ঘর্ষণ। বরফকণার সঙ্গে বরফকণার ড্রাই থান্ডারের ক্ষেত্রে বালুকণার সঙ্গে বালুকণার। ঘর্ষণেই তো স্ফুলিঙ্গ হয়। আদি মানুষ আগুন তৈরির জন্য পাথরে পাথরে সংঘর্ষ ঘটাত। সংঘর্ষের অঙ্ক, সংঘর্ষের নিয়ম নিয়ে চিন্তা করা মানুষগুলো জানে, ধর্ম-সংঘর্ষের অঙ্ক নিরূপণ বড় কঠিন। সংঘর্ষ নিয়ে কাজ করা তিনজন মানুষ – ফেলে আসা ফল নিয়ে কেমন আবেগপ্রবণ…।
অনীশ জুলিয়াকে জিজ্ঞাসা করল – কোথায় থাকতেন তোমার পূর্ব-পুরুষ। ও বলল – শুনেছিলাম সাংগু নামে কোথাও।
– ওখানে কে আছে তোমার।
– জানি না।
– আগে কখনো এসেছ ভিয়েতনামে?
– না।
তোমার বাবার জন্য কয়েকটা ফ্রুটস নিয়ে যেও। বাবা খুশি হবেন।
– বাবাও নেই। বেঁচে থাকলে নিশ্চয় নিয়ে যেতাম।
– তোমার মা?
– আমার মা হিস্প্যানি। মেক্সিকান।
ওই ফলগুলো থেকে লাল দেখে দুটো বেছে নিয়ে টুক করে ব্যাগে ঢোকাল। বলল, মাটিতে পুঁতে দেখব, যদি গাছ হয়। এখন তো ফ্লোরিডায় থাকি, ওখানে অতটা ঠান্ডা নেই। জুলিয়া একটা প্লেটে স্টিকি রাইস তুলে নিল। বিন সেদ্ধ। চপস্টিক। ওর দেশের খাবার খাচ্ছে। জুলিয়ার চোখ টেবিলে সাজানো সালাদ-সম্ভারে স্ক্যান করছে। কী একটা পাতা তুলে নিল। মুখে দিলো, তারপর বলল, নো-ও-ও, দিস ইজ নট দ্যাট, নট দ্যাট।
দিস আর দ্যাট বলতে কী বোঝাতে চায় জুলিয়া অনীশ সেটা কী করে বুঝবে?
বোধহয় চেনা কোনো পাতা খুঁজছে।
অনীশ জিজ্ঞাসা করে, ছোটবেলাটায় বুঝি এখানেই ছিলে?
– নো-নো-নো, নট অ্যাট অল। আমি আমেরিকাতেই জন্মেছি।
– তাহলে স্টেটসে কে সেটল করল, তোমার বাবা? এবার হঠাৎ কালো ছায়া ঘনাল জুলিয়ার মুখে। ও বিষণœমুখে বলল, মাই গ্র্যান্ড পাপা। ডোন্ট আস্ক মি মোর কোয়েশ্চেন, অন আওয়ার ইমিগ্রেশন। শুধু এটুকুই জানতে পারো যে, আমার গ্র্যান্ড পাপা যখন ওদেশে যান, আমার বাবা তখন টোয়েন্টি থ্রি। দ্যাটস অল।
অনীশ বলে, জুলিয়া, তোমার তিনটে দেশ তাহলে। বাবা ভিয়েতনামি, মা মেক্সিকান, মানে তোমার মাদারসল্যান্ড মেক্সিকো, তুমি আমেরিকান। তুমি তিনটে দেশের মধ্যে কোন দেশটাকে ভালোবাসো জুলিয়া?
জুলিয়া বলল, অফকোর্স ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।
অনীশ বলে, ধরো আমেরিকার সঙ্গে ভিয়েতনামের বাস্কেটবল খেলা হচ্ছে। কাকে সাপোর্ট করবে?
– কেন? আমেরিকাকে!
– বেশ, ধরো যুদ্ধ লেগে গেল। আমেরিকা হঠাৎ ভিয়েতনামের এই গভর্নমেন্টকে সরাতে চাইল। ভিয়েতনামের মানুষ আবার আগের মতো গেরিলা লড়াই…
– থামো তো। যত বাজে কথা। বাজে বকো না।
– চলো মিউজিয়াম যাব।
নাসিরুদ্দিন বলল, আমিও যাব। তবে একা। তোমরা যাও।
ফুটপাত পরিষ্কার। কয়েকজন হকার বসেছে। মাথায় টুপি। রাস্তায় প্রচুর স্কুটার আর বাইক। অটোরিকশাকে বলে টুকটুক। ওরা একটা টুকটুক ভাড়া করবে বলে দাঁড়িয়ে আছে।
কাঁধের বাঁকে দুপাশে দুটো ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছে এক ফেরিওয়ালা। ঝুড়ির মধ্যে কলা, কমলালেবু, গায়ে কাঁটাঅলা শসা, কামরাঙা। জুলিয়া হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। ওহ্। ফেইকে ফেইকে। কতদিন পর দেখলাম। প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে হাতে যেটা তুলে নিল সেটা হলো কামরাঙা।
সোনালি রং, বেশ পেকেছে। কামরাঙাটার শরীরে হাত বোলাল ও। গন্ধ নিল। বলল, ওঃ বাবা দেখলে যে কী খুশি হতেন।
একটা এক ডলারের নোট বাড়িয়ে দিলো জুলিয়া। এখানকার টাকার নাম দং। একটা ডলার ভাঙালে ১৬ হাজার দং পাওয়া যায়। একটা কামরাঙার দাম হয়তো দু-হাজার দং হবে। লোকটা বলল, নো চেঞ্জ, নো চেঞ্জ। জুলিয়া ভিয়েতনামিতে কিছু বলল। হয়তো বলল, কিছু ফেরত দিতে হবে না। লোকটা হাসল। হাসিতে
কৃতজ্ঞতা মেশানো থাকলে বেশ বোঝা যায়। এখানে ডলারও চলে। টুকটুক আসছিল না। একজন কে জিজ্ঞাসা করায় জানা গেল, এখান থেকে পাওয়া যাবে না, কিছুটা এগিয়ে গেলে একটা মোনেস্ট্রি আছে, তার সামনে গেলে পাওয়া যাবে। ওরা হাঁটে। অনীশ বলে, চলো, মোনাস্ট্রিটাও দেখে আসি। জুলিয়া সায় দেয়।
অনীশ জিজ্ঞাসা করে, জুলিয়া তোমার কী রিলিজিয়ন?
জুলিয়া বলে, নো রিলিজিয়ন। বাপ বুড্ডিস্ট ছিলেন। বাড়িতে বুড্ডা মূর্তি আছে একটা। মা খ্রিষ্টান। আমি কিছু না।
প্যাগোডায় ঘণ্টা বাজছে। বুদ্ধমন্ত্র লেখা চাকতি ঘুরছে। ধূপের গন্ধের সঙ্গে প্লাস্টিক পোড়া গন্ধও আসছে। ওরা দেখল, প্যাগোডার চত্বরের পাথরের প্রাচীরের গায়ে কয়েকটা খোপ, খোপের মধ্যে বুদ্ধমূর্তি, মূর্তির সামনে টাকা পোড়াচ্ছে দু-তিনজন লোক। কমদামি নোটগুলি প্লাস্টিকেরই হয়। সবচেয়ে কমদামি নোট ১০০ দং। ছোট একটা টফি হয় এতে।
টাকা পোড়াচ্ছো কেন – জিজ্ঞাসা করায় কোনো উত্তর দিলো না লোকটা।
একটা মংক অল্প ইংরেজি জানত। ওকে জিজ্ঞাসা করায় জানা গেল, খারাপভাবে রোজগার করা টাকার একটা অংশ পুড়িয়ে দেয় অনেকে।
জুলিয়া হাসছিল।
অনীশ বলল, হাসছ! এটাও তো মানুষের একটা দিক।
জুলিয়া বলল, হাসছি আমাকে ভেবে। আমি যদি এটা করি, আমাকে তো সবকিছু পুড়িয়ে দিতে হয়। দেন অ্যাই অ্যাম টু বার্ন মাই অ্যাকজিস্ট্যান্স।
ধক্ করে অনীশের সত্তায় ধাক্কাটা লাগল। ওর তিনতলার ঘর, ওর স্টাডি, তার ওগুলো কী তবে? মা-মাটি-মানুষের টাকা তো…। ও তো জানে ওর ভাই কীভাবে…।
কিন্তু জুলিয়া এ-কথা বলল কেন! বেশি উৎসাহ দেখানো ঠিক নয়। পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধ নিয়ে ওরা বাইরে এলো, ওখানে তিন চাকা গাড়ির স্ট্যান্ড।
ফ্রিডম মিউজিয়াম। ঢোকার সময় একটা ছোট দোকানে লাল পতাকা কিনতে পাওয়া যাচ্ছে, লেনিন, হো-চি মিন, আরো কয়েকজনের ছবি, ওদের নাম জানে না অনীশ। একটা ছবির তলায় লেখা ছিল ন গুয়েন ভ্যান ত্রয়।
জুলিয়া একটু জোরে বলে উঠল, ভ্যান ত্রয়, ভ্যান ত্রয়।
তুমি উত্তেজিত হয়ে গেলে কেন?
জুলিয়া বলল, উনি হয়তো আমার ক্ল্যানেরই লোক। হয়তো আমারই কোনোভাবে গ্র্যান্ডফাদার।
মানে!
প্রোগ্রাম শিটে আমার কী নাম লেখা আছে অ্যান! জুলিয়া ভ্যান। ওকে! আমরা আসলে ভ্যান ত্রয়। আমার বাবার নাম ছিল সিকুবা মিচুকি ভ্যান ত্রয়। আমি শুধু ভ্যান রেখেছি। নিজেকে কেটেছি অ্যান।
জুলিয়ার গলাটা ভেঙে আসে।
ঢুকতেই একটা বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমান। ওটা আমেরিকান। গুলি করে নামিয়েছিল ভিয়েতনামি গেরিলারা। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে অহংকার। দীর্ঘ গেরিলাযুদ্ধের ইতিবৃত্ত আর স্মৃতিচিহ্নে ভরা এই মিউজিয়াম। বিভিন্ন চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজ। দিয়েন বিয়েন ফুর যুদ্ধ, ফরাসিদের হেরে যাওয়া, তারপর মার্কিন ফৌজ। ছবিতে, মডেলে – সেসব। হো-চি মিনের পোশাক, ওর ছাতা, টর্চ, চশমা। বিপ্লবীদের সাংকেতিক লিপি, টুপির খাঁজের ভেতরে বহন করা বারুদ এইসব দেখতে দেখতে থমকে গেল একটা সাইকেলের কাছে। একটা সাধারণ সাইকেল, সাইকেলের রডে বাঁধা রয়েছে দুটো বন্দুক। পিছনের ক্যারিয়ারে দড়ি দিয়ে বাঁধা দুটো বালির বস্তা। দুই হ্যান্ডেলের সঙ্গে ঝুলছে দুটো গ্রেনেড। সামনের বাস্কেটে জলের বোতল আর রোল করা এলাকার মানচিত্র। সাইকেলের ওপরে ঝুলছে একটা হেলমেট। কোনো সাইকেল আরোহী নেই, শুধু হেলমেট আছে। হেলমেটের ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে – বল বীর, বল উন্নত মম শির। এর নিচে ভিয়েতনামি ভাষায় কিছু লেখা, ইংরেজিতে – এ ট্যাংক ইন এ বাইসাইকেল। গেরিলারা এরকমভাবেই সাইকেল নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। বালির বস্তা সামনে ফেলে দিয়ে হাতে তুলে নিত বন্দুক। বাস্কেটে রাখা থাকত জল আর শুকনো খাবারের সঙ্গে রাখা থাকত কার্তুজ।
ছবি তোলে অনীশ। সাইকেল-ট্যাংক রেখে জুলিয়ার ছবি তুলতে গিয়ে অনীশ দেখে জুলিয়া কাঁদছে। এরপর আর একটা ফ্রেম। ভিয়েতনামের মেয়েদের কীভাবে জোর করে বাধ্য করা হতো মার্কিন সৈন্যদের জৈবিক খিদে মেটাতে, তার কিছু তথ্য। মাটির মডেলে ভিয়েতনামি মানুষ, যে মেয়েদের সরবরাহ করত, ইনফরমার, যারা ভিয়েতনামি গেরিলাদের খোঁজখবর দিত মার্কিন সৈন্যদের।
ওদের দেখছে, আর স্থানীয় লোকরা উত্তেজিতভাবে কীসব বলছে। অনীশের বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না – ওগুলো গালাগালি। বিদেশিরাও। ওরাও কেউ মৃদু উচ্চারণে বলছে, শিট, কেউ – স্পিট, কেউ বলছে – রাসকেল। অনীশ শুনল, শালা শুয়ারের ছা। অনীশ জিজ্ঞাসা করল, বাঙালি? লোকটা বলল – জি। অনীশ বুঝল বাংলাদেশি। লোকটা বলল, রাজাকার সব দেশেই থাকে। আমরা তো কয়েকটা রাজাকারকে দিছি ফাঁসিতে ঝুলাইয়া। এবার জুলিয়া শব্দ করে কেঁদে উঠল। দুহাতে চোখ ঢাকল। মুখ ঢাকল। মুখ ঘোরাল পেছনে। ছুটছে।
কী হলো বুঝতে পারছে না অনীশ। অনীশও ওর পেছন পেছন। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো জুলিয়া। অনীশ এসে জুলিয়ার হাত ধরল। জুলিয়া হাত ছাড়িয়ে নিল। বলল, লেট মি স্টে অ্যালোন প্লিজ। অনীশ ওর পিছন পিছন ছুটতে ছুটতে বলল, তুমি এরকম করতে পারো না জুলিয়া। তুমি মিউজিয়ামটা দেখবে বলেই আমি দানাং যাইনি। দানাংয়ের কোরানরিফট মিস করেছি, প্যারাসোলিং মিস করেছি… কেন তুমি এমন করছ…। জুলিয়া বলল – সরি অ্যান, ক্ষমা চাইছি। কিন্তু আমি সহ্য করতে পারছি না। এরকম হলো কেন ওর? বুঝতে পারছে না অনীশ। আরো কিছুটা হেঁটে যায়। দুজনই নিশ্চুপ। একটা ছোট লেক। লেকের ধারে বড় ছাতা বসানো। এবং কিছু খাবার ও পানীয়। ডাবও বিক্রি হচ্ছে। জুলিয়া বসল, ওখানে। হাঁপাচ্ছে।
বিক্রি করছিল একজন প্রৌঢ়া, পরনে পাজামা আর ভিয়েতনামি স্কার্ট। সামনে এসে হাসল। জুলিয়ার মুখটা দেখল। জিজ্ঞাসা করল – ফিলিপিনো?
জুলিয়া বলল, নো।
– ইন্দোনেশিয়া?
– নো ম্যাম।
– বাট ইট লুকস্ লাইক ভিয়েতনামিজ। হোয়ার ইউ কাম ফ্রম?
ও বলল, ইন্ডিয়া। আর অনীশের দিকে তাকিয়ে বলল, মাইফ্রেন্ড। ইন্ডিয়া।
বয়স্ক মহিলাটি হাসল, ইন্ডিয়া! ভেরি বিগ কান্ট্রি। ডিফারেন্ত পিউপল।
গ্রিন কোকোনাট?
জুলিয়া বলল, ইয়েস।
– উইথ ফো-গু?
জুলিয়া বলল, ইয়েস ইয়েস।
অনীশ এসবের কিছুই বুঝতে পারছে না। মিথ্যে কথা বলল কেন জুলিয়া?
একটা হাফপ্যান্ট-গেঞ্জি পরা কিশোর টেবিলে দুটো ডাব বসিয়ে গেল। ডাবের তলাটা চেঁচে কেটে নেওয়া, যাতে টেবিলের ওপর বসানো যায়। এরকম ডাব কাটা দেখেনি আগে অনীশ। ডাবের ওপরটাও কাটা হয়েছে গোল করে। ঢোকানো আছে স্ট্র। দুটো ছোট ছোট বোতল। আর একটা প্লেটে কিছু বাদাম ভাজা। জুলিয়া বলল, ফো-গু। বাবার কাছে শুনেছিলাম নামটা। ওখানে পেত না। বাবাদের আড্ডায় শুনতাম ওরা কীভাবে ডাব দিয়ে…।
ডাবের মধ্যে বোতলের তরলটা ঢেলে দিলো জুলিয়া। সবটা। অনীশ বুঝেছে এটা ওদের দেশি কোনো মদ। ও ভয় পেল। ও মেশালো না।
জুলিয়া স্ট্র দিয়ে টেনে নিল এই তরল মেশানো জল। অনীশকে বলল, তুমি খাচ্ছো না?
অনীশ বলল, না, আমি এমনিতেই অ্যালকোহল খুব একটা… আচ্ছা তোমার অনারে একটু নিচ্ছি।
স্ট্র দিয়ে লম্বা টান দিয়ে ডাব কিছুটা খালি করে অনীশের বোতলে যা ছিল নিজের ডাবের ভেতরে ভরে নিল জুলিয়া। বলল, ওহ্ বয়। দ্যাট ফো-গু। মানে স্বর্গের জল। বাবাদের আড্ডায় শুনতাম – হুইস্কি, র‌্যাম, ব্র্যান্ডি – কিছুই ফো-গুর মতো নয়। লম্বা টান স্ট্র-তে। বলল, আমার শরীর দিয়ে বয়ে চলেছে ভিয়েতনাম। গ্রেনেডের শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ১৯৭৩ সালের। আমার কোনো মামার কাঁধ থেকে ছুরি দিয়ে খুবলে বুলেট বের করছে আমার কোনো দিদা। বোমার শব্দ। নাপাম। পেকে যাওয়া ধান গাছগুলো জ্বলছে। জানো অ্যান, আমার শরীরের কোষের ভেতরের ডিএনএর ডাবল হেলিকসের খাঁজে খাঁজে লুকানো রয়েছে ভিয়েতনাম। কিন্তু নিজেকে ভিয়েতনামি বলতে লজ্জা পাই। এইমাত্র তো দেখলে, আমি আমার মায়ের মতো মহিলাটিকে মিথ্যে বললাম। বললাম আমি ইন্ডিয়ান। কিন্তু আই লাভ ভিয়েতনাম। আই হেট আমেরিকা। আই হেট মাই গ্র্যান্ডফাদার। ব্যাগ থেকে কামরাঙাটা বের করে জুলিয়া যেটা ওর ভাষায় কেইকে। কামড়াল, ঠোঁট থেকে রস গড়িয়ে পড়ল, থুঁতনি বেয়ে ওর জামায়। বলছে, সারা গায়ে ভিয়েতনাম মাখছি আমি। আবারো ওই ডাবজল টেনে নিল জুলিয়া। বলল, জাস্ট আই কুড নট স্ট্যান্ড দেয়ার। ওই যে ইনফরমারটার একটা মডেল করেছে মিউজিয়ামে, সবাই বলছিল – স্পিট হিম পি দেয়ার শিট, রাসকেল, মনে হচ্ছিল আমার পূর্বপুরুষকেই বলছিল।
আমার গ্র্যান্ডফাদার ছিল ওরকমই একজন। আমেরিকার দালাল। ইনফরমার। গেরিলাদের খবর পৌঁছে দিত আমেরিকান শিবিরে। রাজাকার মানে আমি জানি। ফেসবুকে বাংলাদেশি বন্ধু আছে আমার। আমার শরীরে বিট্রেয়ারের রক্ত অনীশ। যখন ভিয়েতকং গেরিলাদের কাছে আমেরিকানরা হেরে যায়, আমার গ্র্যান্ডফাদারকে তখন আমেরিকা আশ্রয় দেয়। আমি ওদেশে কোক-পিৎজা-বার্গার খেয়ে বড় হয়েছি। ডলারের গর্ব আমার। এই সুন্দর দেশ, এই মেবং, রাজহাঁস, পায়রা, কেইকে, চোয়াম, আমার বলে ভাবতে পারি না, এদেশে নিজের কী পরিচয় দেব, আমি এই দেশদ্রোহীর রক্ত বহন করা মেয়ে! আমার শরীরে টারবুলেন্স হয় অ্যানিস, থান্ডার হয়, ড্রাই থান্ডার। ভেঙে টুকরো হয়ে যাই।
ওর চোখ থেকে জল পড়ছে।
ওরা চুপ করেই বসেছিল। তখন দুপুর। অনীশ ওই পানীয়টা শেষ করছে।
অক্টোবরের আকাশ। এখানেও শরতের ভাব। ফোন এলো। বাড়ির ফোন। সেমিনার কর্তৃপক্ষই একটা টেম্পোরারি সিমকার্ড দিয়েছিল। অনীশের মায়ের উদ্বিগ্ন গলা। তুই কবে আসবি অনু? আমাদের বিপদ হয়েছে। লোকজন আমাদের বাড়িটা ঘিরে রেখেছে। পুলিশ এসে একবার লাঠি চালিয়েছিল, আবার এসেছে, ইট মারছে। আলোকে খুঁজছে।
আলো কোথায়?
কোথাও আছে। নেতারা জানে। কিন্তু আমাদের খুব ভয় করছে। টিভিতে সব যা-তা বলছে। আমাদের ফ্যামিলির দুর্নাম করছে। যে-ফ্যামিলিতে তোর মতো একটা সায়েন্টিস্ট আছে… অনীশ ওর মায়ের কথার ওপরই বলল – আর যে-ফ্যামিলিতে আলোর মতো একটা পাজি বদমাশ আছে…।
মা ঘাবড়েই গেল যেন। বলল, তুইও বলছিস?
অনীশ বলল, বলব না তো কী করব! একদিনে এরকম হয় নাকি? বাড়ি ঘেরাও করেছে পাড়ার লোকই তো… আমি গিয়ে কী করে আটকাব! পুলিশকে বলো।
ফোনটা রেখে দেয়।
কিউমুলোনিম্বাস মেঘের উৎপত্তির কথাটাই মাকে বলতে যাচ্ছিল অনীশ।
অনেক ঘর্ষণে ঘর্ষণে, ঘাত-প্রতিঘাতে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, আর সেই বিদ্যুৎ সঞ্চয় হয় মেঘে। তারপর বিদ্যুৎ মোক্ষণ হয়। অনীশ মনে মনে বলে, বেশ হয়েছে। নিশ্চয়ই কিছু বড় ধরনের কুকীর্তি করেছে আলো। ওর ছোট ভাই পৌরপিতা। ওর বাবা একসময় বামপন্থী পার্টির ট্রেড ইউনিয়ন করেছে। মূলত মাইনে
বাড়ানো-বোনাস বাড়ানোর আন্দোলন। বামফ্রন্টের রমরমার দিনে বেশি করে বামপন্থীগিরি করেছে, খারাপ সময়ে সরে এসেছে। এখন ওর বাবা নেতা, ছোট ভাইয়ের প্রশ্রয়দাতা। অনীশই বা কী করেছে? ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছে কখনো? সরে এসেছে বাড়িটা থেকে? অন্যায় যে করে আর অন্যায় সে সহে… এটা কি শুধু ইলেভেন ক্লাসের ভাব সম্প্রসারণের জন্যই পাঠ্যবইয়ে ছিল? দেশদ্রোহীর রক্ত কি ওর শরীরেও নেই?
অনীশ নিজের মাথার চুল টেনে ধরে। ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। অনীশের আপস কী করে বোঝাবে জুলিয়াকে? অনীশের নিজস্ব সংঘর্ষ। নিজের কিউমুলাস-বৃত্তান্ত কী করে বোঝাবে জুলিয়াকে?
ওরা ফিরে আসছিল। মিউজিয়ামের সামনে অটোস্ট্যান্ড। দেখল মিউজিয়ামের বাইরের বারান্দায় একা বসে আছে নাসির। মাথা নিচু। সামনে একটি বিধ্বস্ত মার্কিন বিমান। গেরিলাদের বিজয় স্মারক।
বাংলায় কথা শুনল অনীশ। নাসিরের মুখে নয়, সেই বাংলাদেশিদের মুখে। বলছিল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মিউজিয়ামটা আরো সুন্দর করা যায়। এখন তো ইচ্ছা করলে কয়েকটা রাজাকারের ছবিও রাখা যায় সেখানে। ওরা দুজন বিধ্বস্ত বিমান পিছনে রেখে সেলফি তুলল।
অনীশেরও ইচ্ছা হলো ছবি তুলবে। নাসিরকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। নাসির বলল – না, আমি না, আমাকে বাদ দাও। নাসিরের গালে অশ্রুধারা দেখতে পেল অনীশ।
নাসির কাঁদে কেন?
নাসির সুইডিশ পাসপোর্টধারী। নাসির সুইডিশ নাগরিক। অনীশ একবার সুইডেনে গিয়ে দেখেছে অনেক বাংলাদেশির সুইডেনে হোটেলের ব্যবসা আছে। স্বাধীনতার পরে অনেকেই পালিয়ে গিয়েছিল ওইসব দেশে, ওদের অনেকেই রাজাকার ছিল। নাসির, কাঁদো কেন?
বজ্রভরা কিউমুলোনিম্বাস ভেঙেছে ওর শরীর ও সত্তায়।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার