যেন একটি চিরন্তনী গল্প

লেখক:

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

বড় সহজ গল্পটি। চিরন্তনী গল্প যেমন হয়। ইংরেজিতে ওইসব গল্পের বিবরণ এভাবে দেয় : ‘বয় মীট্স গার্ল, বয় লুজেস গার্ল, বয় গেটস গার্ল।’ কখনো আবারো হারিয়ে ফেলে, আবারো ফিরে পায়। আমাদের গল্পেও অমনি, তবে মূলত গ্রামীণ জনপদের দেশই তো, সব সময় এমন ঘটে না – অথবা তাই কি?
দুই
নদীর মোহনা নদীর মতোই সরে গেছে – সব কটি নদীকে সঙ্গে নিয়ে। মূল ভূখন্ডে পথের শেষ চিহ্নে দাঁড়ালে দেখা যায় শুধুই বালিয়ারি। উড়ে বেড়াচ্ছে ওলোটপালোট হাওয়ায় বুনো ঘাসের শুকনো ঝোপ। উড়ানির চরই বুঝিবা ধুলায়-ধূসর। পাখি কখনো বসে, কখনো উড়ে যায়। কান পাতলে কলতানও শোনা যাবে বুঝিবা তাদের, অথবা বালুয়ার গান।
ধূসর বালির ওড়াউড়ি কিছু থামলে দেখা যাবে কুটিরশ্রেণি। কখনো পরপর সাজানো, কখনো অর্ধবৃত্তাকার। শণ কি খড়ের চালা, বাঁশের চাটাই কি বাখারির বেড়া। সারিবদ্ধ কুটিরগুচ্ছের সম্মুখে দাঁড়ানো বাঁশ-কাঠ-টিনের একাকী ঘরটি। বুঝি প্রার্থনালয়। মাশবকশ্যানাকাঙ্ক্ষী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুচিন্তার ফল – উন্মূল জনগোষ্ঠীকে পুনরায় মাটিতে বসানোর পরিকল্পনা। হোক বালিয়ারি – বিশ্বাস এমন যে নিয়মিত বারিসিঞ্চনে শেকড় গজাবেই। সরে যাওয়া নদীর বুকই যদিও ওই সিঞ্চনকার্যের ভরসা। মাঝেমধ্যে চরের খাঁড়িতে পানীয় ধরে রাখার চেষ্টাও দেখা যায়।
ঘরের আসবাব – মাটিতে বিছানো চাটাই। পুরনো কাপড়ে সেলাই করা কাঁথাও দেখা যাবে। শিরোধান সর্বদা নিশ্চিত নয়। ফলে এই ঘরে ঢুকেই যে সে বের হয়ে গেছিল, তার কারণ বোঝা যায়। পথরেখার শেষে দাঁড়িয়ে জনবসতির চিহ্ন যখন স্পষ্ট হয়েছিল চোখে, তখনই সে ফিরতি পথের দিকে পা তুলেছিল। বয়স্কা সঙ্গিনী তার কোলে ধরা শিশুটিকে দেখিয়ে দৃঢ়মুষ্টিতে গ্রামীণ কন্যার হাত ধরে হাওয়ায় শিরশির উড়তে থাকা পা-ডোবানো বালির দিকে টেনে নিয়ে যায়।
বালিয়ারের শেষে কিছু শক্ত মাটিও দেখা যায়। সম্ভবত নদীর বাঁক ছিল এখানে। এপারে চর পড়লেও ওপারে শক্ত মাটি কিছু ছিল। জনবসতি তার ওপরেই। আর তা ছাড়া ভিক্ষার অন্নই তো। বাঁধের ঢালু গায়ে খড়কুটোর বাসরঘর বেঁধে কত দম্পতিই তো জীবন কাটায় সেখানে। এ তো রীতিমতো শক্ত মাটির ওপরে বাঁশের বেড়া, খড়ের চালার পাকা বসত। সরকার অনুমোদিত। তবু কন্যার মন ওঠে না। সঙ্গিনী তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায় বালিয়ারি পার হয়ে। বাঁশ-কাঠ-টিনের ঘরটির সামনে শ্রদ্ধেয় যাকে দেখে, তাকে জিজ্ঞাসা করে অবশেষে সন্ধান পাওয়া যায় নিরুদ্দিষ্ট পুরুষের বাসস্থল কোনটি।
অর্ধবৃত্তাকারে সজ্জিত নির্দিষ্ট দোচালাটির সামনে গেলে সেটির বাঁশ-কাঠের দরজা বন্ধ দেখে তারা। এ-রকম ঘটতেই পারে জানা ছিল বলেই পাশের ঘরে গিয়ে গন্তব্য জানায় – নিজেদের পরিচয়ও। বিস্মিত এক নারী বেরিয়ে আসে, দেখে তাদের, তারপর পাশের ঘরের দরজা খুলে দিয়ে ভেতরে বসতে বলে। বলে, এ-রকম কেউ আছে, এ-রকম কেউ আসতে পারে জানা ছিল না তাদের। একই ভেসে যাওয়া, ডুবে যাওয়া গ্রামের মানুষ তারা। বন্ধ ঘরের মালিকের খোঁজ তারাও বহুকাল জানত না। মাত্র কিছুকাল আগেই পথরেখার শেষে এক উদ্ভ্রান্ত পথভ্রষ্টকে দেখে তারা স্বজন বলে চিনতে পারে। রাত্রির আশ্রয়ের আশায় লোকটি এখানে এলে তারা বোঝে, সে গৃহহীন। যেখানে শোয়া যায়, সেটিই তার গৃহ ভেবে লোকটি এখানেই থেকে গেছে।
ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র দেখে নারীকুল। কেননা, কোলের শিশুটি কন্যাসন্তানই। ঢুকেই তারা দেখে, এই ঘর থেকে নিয়ে যাওয়ার মতো কিছু নেই। বোঝে, এতো সহজেই কেন ঘরের দরজা খুলে দিয়েছে।
ঘরে ঢুকে মেঝেয় বিছানো চাটাইয়ের ওপরে বসে তারা। ঘরের কোণে সামান্য কিছু তৈজস দেখে। আর কিছু নয়। সঙ্গে করে আনা ব্যাগটিতে নিজেদের জন্যে কিছু আহার্য থাকলেও কন্যাটির জন্যে মাতৃদুগ্ধই কি সম্বল, এই কথা জিজ্ঞাসা করবার সময় পায় না – সদ্যপরিচিতা নিজ ঘরে দ্রুত ফিরে যায়। বলে, গৃহস্বামী ফেরে এই সময়েই। আজও এই সময়ে ফিরবে। তারা নিশ্চিত।
প্রায় অন্ধকার ঘরের কোণে পাতা চাটাইয়ে বসে তারা। ব্যাগ থেকে একটি কাঁথা বের করে তাতে ঘুমন্ত শিশুটিকে শোয়ায়। অন্ধকার খানিক ঘন হয়ে এলে অন্য কুটিরবাসী এসে একটি কুপি রেখে যায়। আর ওই কুপির দিকে তাকিয়ে কখন নিভে যাবে দপদপ করে জ্বলতে থাকা এই আলো ভাবছে যখন, ঠিক তখনই দরজার ঝাঁপ ঠেলে ঘরে ঢোকে সে। আজানুলম্বিত মলিন প্রায়ছিন্ন পোশাকে দীর্ঘকেশ আশ্মশ্রু পুরুষকে দেখে তারা। বুঝি পুণ্যাত্মা, বুঝি ধর্মাত্মা – তবু তারা দেখে, সে-ই গৃহত্যাগী। শিশুটির মুখও যে কখনো দেখেনি।

তিন
বাপ-মায়ের চোখ এড়িয়ে একদিন এক গ্রামের তনয়া দূর প্রান্তরের সন্ধ্যায় এক ভিনদেশি যুবকের পাশে শুয়েছিল। ফসল কাটা শেষ। ধানক্ষেত থেকে কুড়িয়ে আনা খড়ের বিছানায় আধশোয়া প্রেমিকা প্রেমিকের মুখের দিকে চেয়ে দেখেছিল তার শূন্য দৃষ্টি।
জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কী দ্যাহো তুমি?’
আকাশ, আকাশই দেখে বুঝি লোকটি, বলেছিল। গ্রাম্যবালা সে-কথা বোঝেনি। সে ওই ভূমিহীন কৃষক – তখন দিনান্তের মজুর, পূর্বাপর পরিচয়হীন নিশ্চিহ্ন-অতীত ভিন্ন গ্রামগঞ্জের মুনীষকেই বিয়ে করবে বলে জানিয়েছিল।
কন্যার পিতা অনেক আপত্তি তুলেছিল। বিশেষত, ভিন্ন গ্রামের এক মানুষ বড় রাস্তা থেকে নেমে এই গ্রামের মাঠ দিয়ে যাওয়ার পথে আরেক গ্রামের ঘরজামাইকে এই গ্রামের হবু ঘরজামাই বলে চিহ্নিত করেছিল।
ফলে কন্যার পিতা এক হাঘরে ঘরজামাইকে আবার তার ঘরজামাই করতে রাজি হয়নি। যতই তার একজন মুনীষ কি একজন কামলার দরকার থাকুক না কেন, মেয়েটি তার সুরূপা না-হলেও সুগঠিতা তো ছিলই। তাহলে কেন হাত-পা বেঁধে তাকে দরিয়ায় ছুড়ে দেওয়া?
আবেগী গ্রামবালা সব শুনেও বাপকে বলেছিল, ওই হাঘরের সঙ্গেই তার বিয়ে দিতে। বাপের ক্ষেতখামারে কাজ করবার সময় একবার কেন, অনেকবারই মেয়েটি লোকটিকে দেখেছিল। কখনো কখনো ধান মাড়াইয়ের সময়ে বাড়ির বাইরের আঙিনায় দুপুরের খাবার যে নিয়ে যেতে হয়নি, এমনও নয়। অনেকবারই হয়েছে। ভিন্ন গ্রামের ভিন্ন দেশের মানুষ, গাছতলায় তো আর রাত কাটাতে পারে না, তাই বৈঠকখানার বারান্দায় কি ঠান্ডা-বাদলের দিনে ঘরের ভেতরের চৌকিটিতেও শুয়েছে কখনো। আর সব সময় দুচোখ বন্ধ করেই যে সারারাত কেটেছে, এমন নয়। এমনকি একা একাই যে কেটেছে, এ-কথাই বা নিশ্চিন্তে বলবে কে?
শ্বশুর তার বিরক্তই হয়েছিল বলা যায়। তবু সে-ও তো গৃহস্থ বই কিছু নয়। মেয়েটি ঘরেই থাকবে, পেটেভাতে কাজের লোক বারোমাস – এসব চিন্তাও বোধকরি তার মাথায় ছিল। তা ছাড়া নগদ টাকা দিতে হবে না। শাড়ি, গহনা, কাপড়ও এমন কিছু নয় – এসব ভেবে লোকটিকে ঘরজামাই রেখে দেয়। এই গ্রামে আসার আগে কোথায় ছিল, কী করেছে তার জেনে কাজ কি?
বর্ষার এক প্রত্যুষে ঘরজামাই কাউকে না-জানিয়ে ঘর ছেড়ে যায়। শ্বশুর কন্যাটির বাপান্ত করে চার গ্রামে লোকজন দিয়ে কিছু খোঁজখবর করায়। মেয়েটি মনে মনে কাতর হলেও বাইরে ফুঁসছিল। শেষে তার ভাবনা আর দশজনের পথেই চলতে শুরু করে – সামনে নতুন ফসলের দিন, নিঃসন্দেহে আরও যে দুই ঘর আছে কিংবা হয়তো আরো বেশি, সেসব কোনো ঘরে উঠেছে। অথচ কোন্ ঘরে কেউ জানে না বলে লোকটি নিরুদ্দেশই থাকে।
কিন্তু এতো কথার মধ্যে কারো মনে আসে না যে শরতের নীল আকাশ মেঘের আড়ালে মুখ বাড়িয়ে লোকটিকে ডাকছে, আগেও একবার ডেকেছিল। এটি সেই সময়, যখন লোকটি শুকনো খড়ের বিছানায় ধানকাটা মাঠে শুয়ে থাকতো সারারাত। চোখ খোলা থাকতো নীল চাঁদোয়ার তারার মেলায়। কবে ওই আকাশে নীল ফিরবে।
স্ত্রীর মনে কথাটি এসেছিল। সম্ভবত এ-জন্যেই কখনো প্রদীপনেভানো রাতে বাহির আঙিনার খড়ের মরাইয়ের নিচে সে খুঁজে আসতো – আকাশের দিকে চোখ মেলে কেউ শুয়ে আছে কি না, এবং আশ্চর্য, এক প্রভাতে লোকটিকে সে খড়ের মরাইয়ের নিচে ঘুমুতে দেখেছিল, যদিও ততদিনে ওইরকম দুই হালকা মেঘের কাল পার হয়ে গিয়েছিল।
শ্বশুর তার মুখদর্শন করেনি অনেকদিন। স্ত্রী বাইরের বারান্দায় মাদুর-বালিশ কিছু ছুড়ে দেয়নি। মাটির দাওয়ায় মাথার নিচে দুহাত রেখে দুই রাত কাটানোর পরে সে যখন বিশ্বাস করে যে এই ঘরে জামাই চাই না, তখনই একটি মাদুর আর বালিশ ঘর থেকে উড়ে আসে এবং বালিশ আর মাদুরের উৎসমুখ আবিষ্কার করে কিছু চেষ্টায় লোকটি বালিশ-মাদুরের উৎসস্থলে পৌঁছে যায় দ্রুতই।
কোন্ দেশের কোন্ গ্রামের কোন্ ঘরের বারান্দায় চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখেছে সে এতোদিন জানতে চেয়েছিল তার স্ত্রী। এবং উদ্যত ঝাঁটার মুখে সে বলতে বাধ্য হয়েছিল, ওইসব গ্রামের ঘর নয়, মাটিও নয়; খোলা আকাশ তাকে টেনেছিল।
কার আর কী বলার থাকে তখন?
কিন্তু এসব কোনো যুক্তিই কেউ মানে না, যখন দ্বিতীয়বার এমন ঘটে। দুই ফসলের মৌসুম পার করে দিয়ে আবার এক নীল আকাশের প্রত্যুষে দেখা দেয় যখন সে, তখন তার শ্বশুর কন্যাটির তত্ত্বাবধান করে না আর এবং নিঃসঙ্গ কৃষককন্যা দ্বিতীয় যাত্রাও যে দ্বিতীয় ঘরের দিকেই, এ অভিযোগ করেও তাকে সম্মার্জ্জনী দিয়ে উঠোন থেকে সাফ করে দেয় না। লোকটি যে এই তৃতীয় ঘর থেকে বেরিয়ে চতুর্থ এবং পঞ্চম ঘরেও প্রবেশ করেনি, এ-কথাই বা বলবে কে?
লোকটি অবশ্য ওই একই কথা বলে। খোলা নীল আকাশ কোথায় কোথায় পাওয়া যায়, দেখে বেড়ানোই তার উদ্দেশ্য।
তার স্ত্রী ওইসব কোনো কথাই মানে না। সাবধানী চোখও সরায় না আর। মৌসুমি মুনীষ কি পরিজন কি প্রতিবেশী, সকলকে বলে রাখে কোনোমতে যেন ভিন্ন আকাশের নিচে না-যায় লোকটি। ফাটা মাঠ, পোড়া মাটি, শুকনো নদী, ধূসর ঝরাপাতার এক শেষ রাত্রিতে আস্তে ঘরের দরজা খুললেও সন্তানকামী রমণী সেটি ঠিক টের পায়। নিঃশব্দে পেছন পেছন এসে সীমানার শেষে তরল অন্ধকারে লোকটি যখন প্রান্তরমুখী হয়, তখনই স্ত্রী তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে। কিছু সময় কে জেতে, এই টানাটানির পরে এমন অবস্থা হয় যে লোকটি কিছুতেই তুলে নেওয়া পা নামায় না, আর কৃষাণিও কোনোমতে সন্তানের দাবি ছাড়ে না, নিরুপায় লোকটি তখন আপন স্ত্রীকে – হোক প্রথম কি তৃতীয় অথবা পাঁচজনের একজন, অপহরণ করে।

সারিবাঁধা খুপরির বাইরে দাঁড়ালে সামনে ওই সারিবাঁধা খুপরিই দেখা যায়। বাঁশচাটাইয়ের জঙ্গল পার হয়ে এলে দেখা যায় কর্দমাক্ত নদীর বুক। কাদাবালি, আগাছা, জঙ্গল, কচুরিপানায় আটকে থাকা মৃত পশুদেহ-নিমজ্জিত মসীকৃষ্ণ তরল। বাঁশের সাঁকো পাতা আছে ওই ক্ষীরসমুদ্র পারাপারের জন্য। নদীর তীরে সহস্রজনের কোলাহল। দোকানপাট, বাজার, অট্টালিকার সারি। বিমূঢ় নভোচারী কোনোমতে সন্তানকামী রমণীর গ্রাসাচ্ছাদন করতে পেরেছিল কি না, সেটি বড় কথা নয় – একদিনের জন্যেও আকাশ দেখা যায়নি এই বিবেচ্য। ক্রমে একদিন ঘষা কাচের মতো নগরীর ওপরের ওই আচ্ছাদন অদৃশ্য হয়ে যায় এবং বৃষ্টিধারার বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্দমাক্ত নদীতীর, খাঁড়ি সব ভেসে যায় আর নদী ছুটে এসে বাঁশচাটাইয়ের খুপরির মাঝখানে বুকসমান খাটপালঙ্ক পেতে দেয়। লম্বা টিনের চালায় আরো শতজনের সঙ্গে দুরাত কাটানোর পরে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাওয়া কর্দমাক্ত নদীতীর পার হয়ে অবশেষে শহরের বাইরে চলে আসে তারা, আর ঠিক তখনই সন্তানসম্ভবা পার্শ্ববর্তী পুরুষের হাত টেনে তার নিজ শরীরে দিয়ে বলে, ‘দ্যাহো এইখানে কে?’ এ-কথা শোনার পরেই লোকটি এলোমেলো পা ফেলে যদিবা গ্রামে ফিরে আসে, কিন্তু রাত্রিশেষে আর তাকে দেখা যায় না।

চার
সূর্যের সঙ্গে বাতাসও নেমেছিল। শোঁ শোঁ শব্দ ছিল না। বালুয়ার গানও নয়। বাইরে বেরুলেই দেখা যেতো, মেঘহীন আকাশে তারার মেলা। কিন্তু সেই আকাশ তখন কেউ দেখে না। দিনশেষ আকাশের রাত্রিতে আশ্মশ্রু আপাদপরিধেয় যেন পুণ্যাত্মা ঝুলিকাঁধে লোকটি ঘরে ঢোকে। কুপির আলোয় বাঁশের চাটাইয়ে শোয়া-বসা দলটির ওপরে চোখ পড়ে তার এবং বুঝি সামান্য বিভ্রান্ত, সামান্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে মাটির ওপরে হাঁটু ভেঙে বসে সে। ভালো করে সব মানুষের আকৃতি চোখে এলে সে শিশুটির দিকে হাত বাড়ায়, কিন্তু শিশুটির মা এতো সহজে তাকে ছাড়ে না, পুণ্যাত্মার পোশাকের দিকে তাকায়। তার ঝুলির দিকে তাকায়, শেষে তাকায় তার চোখের দিকে। কোনো নীল আকাশ দেখে না সে সেখানে। সাদা, ঘোলা চোখে আকাশ থাকে না – তাই।

চাটাইয়ের ওপরে তেমনি স্থির হয়ে শোয়া-বসা তারা। পাশের কুটিরে নানা কথা শোনা যায় – লোকটির গলাও স্পষ্ট বোঝা যায়।
মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে লোকটি পাশের ঘরে চলে গেছিল। প্রায় বন্ধ চোখে সন্তানবতী তাকে দেখেছিল। মুখে কোনো কথা ছিল না তার, কোনো প্রশ্ন নয় – এটি কোন্ ঘর, পাঁচ কি ছয়, কিছু নয়।
রাত্রি গভীর হলে পাশের কুটির থেকে শব্দও কম আসে। একসময়ে সবই নিঃশব্দ হয়ে যায়। অন্ধকার ফিকে হয়। চাটাইয়ের ওপরে বসে থাকা একাকী নারী, সঙ্গী বৃদ্ধা, ঘুমন্ত শিশু নেভা কুপির অন্ধকার থেকে যেন ক্রমে অবয়ব ফিরে পায়। অনেক অনেক আগে কুপির আলো শেষ হওয়ার মুখে একবার সে ভেবেছিল, বালুঘরের দরজা খুলে বাইরে যাবে কি – দাঁড়াবে কি লোকটির সামনে, কিন্তু তখনই সাদা ঘোলা চোখের কথা মনে পড়ে যায়। জানে, বাইরে গেলে কাউকে দেখবে না। অস্ফুটে বলে, ‘আর আকাশ দ্যাহো না তুমি।’
ঘরের ঝাঁপ খোলে সে তখন। সঙ্গী বৃদ্ধার হাত ধরে সে-ই এবার টানে। ঘুমন্ত শিশুটিকে কোলে নেয়। তারপর স্থির বালিয়ারি পার হয়ে পথরেখার শেষ চিহ্নর দিকে এগিয়ে যায়।
আকাশ আর মাটি ক্রমে নিজ নিজ সীমা স্পষ্ট করে। বৃক্ষাশ্রিত লতা কি তরুশাখা ক্রমে নিজ নিজ অবয়ব ফিরে পায়। দিগন্তের কৃষ্ণসীমায় মৃদু আলোর রেখা ক্রমে বিস্তার লাভ করে। বৃক্ষবাসী সকলে নানা শব্দে পরস্পরকে জাগরিত করে দিগন্তবিস্তৃত শূন্যে ডানা মেলে দেয়।
বাতাসে সুগন্ধ ভাসে। শিশির কি শিউলির ঘ্রাণ। ঝিলে ফোটা শাপলা কি সুবিলের পদ্ম কি বাড়ির উঠোনে ফুটে থাকা টগর-গন্ধরাজ, তারাও কিছু গন্ধ রাখবে বাতাসে। রাস্তায় উঠে সামনের দিকে তাকালে সে দেখবে, স্পষ্ট হচ্ছে পথরেখা। স্পষ্ট হচ্ছে নীলিমা। তবু সে আকাশের দিকে তাকাবে না।

শেয়ার করুন

Leave a Reply