শিশু-নাটকের উদ্ভব ও বিকাশ

লেখক:

মোনালিসা দাস

Monalisha

যাকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগ, সেখানে শিশুদের জন্য রচিত ছড়া, গল্প, ধাঁধা, রূপকথা, লোকগাথা, লোকগীতিকা ইত্যাদি ছিল ঠিকই, কিন্তু তা ছিল মৌখিক এবং শ্রম্নতিবাহিত। তখন শিশুকে ভোলানোর জন্য রচিত হয়েছে ছড়া ও গান। ছোটরা, বিশেষ করে, বালক-বালিকারা ঘরে ও বাইরে খেলা করার সময় এক ধরনের খেলার ছড়া গড়ে উঠেছে মুখে-মুখে। এভাবে যে শিশু-কিশোর সাহিত্যের সৃষ্টি তা যখন মুদ্রণের যুগে এসে পৌঁছল তখন সেগুলো মুদ্রিত হলো বিভিন্নজনের চেষ্টায়।

চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় সাহিত্যে যা কিছু মুদ্রিত হয়েছে সবই বড়দের জন্য। ছোটদের জন্যও যে আলাদা করে কিছু লেখার প্রয়োজন আছে – এত মূল্য দেয়নি ছোটদের। প্রাপ্তবয়স্কের পৃথিবীতে শিশুদের জন্য স্বতন্ত্রভাবে মনোযোগ দেওয়ার চেতনা তৈরি হয়নি।

ইউরোপে সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে প্রথম নিও-ক্লাসিক্যাল যুগের দর্শনবিদরা ছোটদের কথা একটু ভাবতে শুরু করেন। এই যুগেই প্রথম ছোটদের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা ও আনন্দের ব্যবস্থা করা উচিত, এই ভাবনা দেখা দিলো। ইংরেজ দর্শনবিদ জন লক (John Locke, 1632-1704) ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশ করলেন তাঁর বই অ্যান এসে কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং। এই গ্রন্থেই আছে তাঁর তত্ত্ব ‘ট্যাবুলা রাসা’ অর্থাৎ শূন্য পাতা (বস্ন্যাংক সেস্নট)। তিনি বললেন, জন্মের পরই মানুষ অর্থাৎ শিশুদের মন থাকে সাদা পাতার মতো। অভিভাবকদের কর্তব্য হলো সেই পাতায় যথার্থ ধারণাগুলোকে উৎকীর্ণ করে দেওয়া, যাতে তাদের ভবিষ্যৎ ভালো হয়। তিনি লিখেছিলেন সেই অমোঘ বাক্য – ছোটদের শেখাতে হবে জোর না করে, আনন্দের মধ্য দিয়ে –

‘Children may be cozened into a knowledge of the letters; be taught to read, without perceiving it to be anything but a sport, and play themselves into that which others are whipped for.’

আরো আশ্চর্য যে, তিনি ছোটদের জন্য ছবিসহ বই তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ছোটদের বইয়ের সঙ্গে ছবির ধারণার সেই বোধহয় সূত্রপাত।

উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ইউরোপে শুরু হয় শিশুসাহিত্যের স্বর্ণযুগ। তার প্রধান কারণ প্রকৃতপক্ষেই শিশুদের স্বতন্ত্র ব্যক্তিরূপে অনুভব করার মানসিকতা দেখা দেয় এই সময়ে। সেইসঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব, সর্বশিক্ষার প্রসার, কাগজ এবং মুদ্রণব্যবস্থার উন্নতি, ছবির সঙ্গে রং ব্যবহার করার প্রযুক্তি ইত্যাদি পরিস্থিতিও ছিল।

এই ধারাবাহিকতায় এক আশ্চর্য সংযোজন হল লিউইস্ ক্যারলের (Lewis Carroll; প্রকৃত নাম  Charles Lutwidge Dodgson, 1832-98) অ্যালিসের কাহিনি। বইটির প্রকাশ ইংল্যান্ডে ১৮৮৫-তে। ইতালীয় লেখক কার্লো কালোদি (Carlo Callodi, প্রকৃত নাম Carlo Loresurize, 1826-90)-রচিত ফ্যান্টাসি-উপন্যাস দি অ্যাডভেঞ্চার অব পিনোক্কিও প্রকাশিত হয় ১৮৮৩-তে। রাডইয়ার্ড কিপলিং (1885-1936) তাঁর জঙ্গল বুক প্রকাশ করেন ১৮৯৪-তে এবং জেমস ব্যারির (James Barrie, 1860-1937) লেখা পিটার অ্যান্ড ওয়েনডি প্রকাশিত হয় ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে। ছবি দেওয়া হতো এই বইগুলোর সঙ্গে প্রায়ই। শিশুমনের উপযোগী লেখা ও ছবি-সংবলিত এই বইগুলোর মাধ্যমেই সমৃদ্ধ শিশুসাহিত্যের প্রকাশ ঘটতে থাকে। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে শিশুসাহিত্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

বাংলা সাহিত্যেও উনিশ শতক থেকেই কিছু পৃথক মনোযোগ দিতে দেখা যায় শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে। তার উজ্জ্বল প্রকাশ তৎকালীন শিশু-কিশোর পত্রিকাগুলো। ছোটদের জন্য প্রকাশিত পত্রিকাগুলোতে ছড়া, ছোটগল্প, গান, ছবি, ধাঁধা এমনকি দু-একটি নিবন্ধও প্রকাশিত হতে শুরু করল। তবে উল্লেখ্য, সেখানে নাটক ছিল না বললেই চলে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শিশুসাহিত্যের দিকে বাঙালি মনীষীদের সচেতনতার প্রমাণ পাওয়া যায় ছোটদের জন্য প্রকাশিত পত্রিকা পরিকল্পনা থেকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলো –

১. প্রমদাচরণ সেন-সম্পাদিত সখা (প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি,   ১৮৮৩)

২. ভুবনমোহন রায়-সম্পাদিত সাথী (প্রথম প্রকাশ মার্চ, ১৮৯৩)

৩. শিবনাথ শাস্ত্রী-সম্পাদিত মুকুল (প্রথম প্রকাশ আষাঢ়, ১৩০২ বঙ্গাব্দ, ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দ)

৪. জ্ঞানদানন্দিনী দেবী-সম্পাদিত বালক (প্রথম প্রকাশ মার্চ, ১৮৮৫)

উনিশ শতকের শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর ধারা যখন বিশ শতকেও প্রবাহিত হয়েছে তখন সবাই ছোটদের উদ্দেশে রচিত বিভিন্ন শ্রেণির লেখা সম্পর্কে সচেতন থেকেছেন। কিন্তু নাটক সেখানে ছিল না বললেই চলে। তার কারণ সহজেই বোঝা যায়, নাটক রূপবন্ধের পূর্ণতা মঞ্চ প্রয়োগসাপেক্ষে। ছোটদের জন্য লেখা যত সহজ তাদের জন্য নাটকের আয়োজন করা সেই তুলনায় দুরূহ। সেজন্যই বাংলা শিশু-নাটকের প্রকৃত উদ্ভব ঘটেছিল খানিক পরে। এ-কাজও প্রথম করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ, আরো অনেক কিছুর মতোই। বাংলায় প্রথম শিশু-নাটক প্রকাশিত হয় বালক পত্রিকার পৃষ্ঠায়। নাটকটি মুকুট

মুকুট অভিনীত হয়েছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি বাংলা সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সূচনা করেছিল পর্বান্তর। শিশুদের জন্য নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রেও ঠাকুরবাড়ির পরিম-ল ও রবীন্দ্রনাথের অগ্রণী ভূমিকা স্মরণযোগ্য।

ছোটদের জন্য লেখা রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলোর আলোচনার আগে আমরা শিশু-নাটকের বৈশিষ্ট্যগুলো বুঝে নিতে চাই। এক-কথায় শিশু-নাটক হল শিশুদের মনোবিকাশের সহায়ক নাটক। শিশু-নাটক সম্পূর্ণ আলাদা একটি শিল্প, যা নিজ ধর্মের কারণেই অন্যান্য নাটকের থেকে স্বতন্ত্র।

ডেভিড উডের থিয়েটার ফর চিলড্রেন গ্রন্থে এ-সম্পর্কে নির্দেশ আছে –

 Theatre for children is a separate art form with qualities that make it quite distinct from adult theatre. It is not simplified adult theatre; it has its own dynamics and its own rewards. Quality theatre for children is valuable in that it opens the door for children to a new world of excitement and imagination.

ওই গ্রন্থে তিনি শিশুদের নাট্যের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের প্রতিও আলোকপাত করেছেন। যেমন শিশুনাট্যে আনন্দই মুখ্য বিষয়। সঙ্গে থাকবে মজার উপাদান। শিশুরা কল্পনার জগতে বিচরণ করতে ভালোবাসে। শিশুমাত্রই কল্পনাপ্রবণ। নাটকের বিষয় ও চরিত্ররা যেন তার কাল্পনিক বিশ্বে ডানা মেলতে সাহায্য করে। শিশুর সহজাত চাহিদা, ঘটনার হঠাৎ পরিবর্তন। শিশু-নাটকে পরিমিত ভয় বা উত্তেজনার পরিবেশ থাকতেই পারে। তাতে নাটকটি দেখে বা পড়ে শিশু রোমাঞ্চিত হতে পারে। মিথ বা পৌরাণিক কাহিনিকে নতুনভাবে উপস্থাপিত করে শিশু-নাটক লেখা হলে শিশুদের কাছে তা সহজেই গ্রহণীয় হতে পারে। শিশু চায়, কাক, পুতুল, কুকুর, বেড়াল, পাখি, পেঁচা, হাঁস, সিংহ, শেয়াল, হরিণ ইত্যাদি জীবজন্তু তার সঙ্গে কথা বলুক। রাম, রাবণ, জাম্বুবান, হনুমান সবাই তাদের মতো আচার-আচরণ করুক। এক্ষেত্রে ছেলেবেলার রূপকথা বা ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমির গল্প বলার ধরনটি মনে আসে। শিশু-নাটকে ন্যায়-অন্যায়, সৎ-অসতের দ্বন্দ্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনার আকস্মিকতা, ইঙ্গিতধর্মিতা ও সংলাপের ব্যঞ্জনধর্মিতার প্রয়োগ এই নাটকে থাকা চলবে না। উদ্ভট চরিত্র, উত্তেজনায় পরিবেশ ভূত-প্রেত, রাক্ষস-খোক্কস ইত্যাদি এই নাটকে বেশি করে দেখালে ভালো হয়। শিশু-নাটকে শিশুমনের উপযোগী বিতর্ক থাকতেই পারে। অর্থাৎ ছোটদের জন্য লেখা নাটকের আলাদা একটা রূপরেখা আছে। আর একটি কথা, ছোটদের নাটকের মূল লক্ষ্য বিনোদন বা আনন্দদান হলেও শিশুর সর্বাঙ্গীণ বিকাশের জন্য তিলোত্তমা শিল্প-নাট্যের ক্ষমতা অপরিসীম। শিশু-শিক্ষার ক্ষেত্রেও শিশু-নাটকের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অতুলনীয়। বস্ত্তত শিশু-শিক্ষার সঙ্গে শিশু-নাটকের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, রবীন্দ্রনাথ অন্তত তাই মনে করতেন। জন লক্ বোধহয় তাঁর গ্রন্থে এ-কথাই বলতে চেয়েছিলেন।

ছোটদের সাহিত্যচর্চার জন্য জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে আত্মপ্রকাশ করে বালক পত্রিকা (বৈশাখ, ১২৯২ বঙ্গাব্দ, ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ)। সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে ঠাকুরবাড়ির অনেক ক্ষেত্রেই অভিনব ও অগ্রবর্তী পদক্ষিপ রয়েছে। এক্ষেত্রেও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ছোটদের জন্য মূলত এই কাগজের প্রকাশ-পরিকল্পনা। সে-সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনস্মৃতিতে লিখছেন – ‘বালকদের পাঠ্য একটি সচিত্র কাগজ বাহির করিবার জন্য মেজবৌঠাকুরানির বিশেষ আগ্রহ জন্মিয়াছিল। তাঁহার ইচ্ছা ছিল সুধীন্দ্র, বলেন্দ্র প্রভৃতি আমাদের বাড়ির বালকগণ এই কাগজে আপন আপন রচনা প্রকাশ করে।’২ এই মাসিক পত্রিকাটি সম্পাদনের দায়িত্বে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বৌদিদি জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। বালক পত্রিকায় চবিবশ বছরের তরুণ রবীন্দ্রনাথ ছোটদের অভিনয়োপযোগী নাটক লেখা শুরু করলেন। বালক পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে রবীন্দ্রনাথের ছোটদের জন্য লেখা নাটকগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। যেমন – রোগের চিকিৎসা (জ্যৈষ্ঠ), পেটে ও পিঠে (আষাঢ়), ছাত্রের পরীক্ষা (শ্রাবণ), অভ্যর্থনা (ভাদ্র), চিন্তাশীল (আশ্বিন ও কার্তিক), ভাব ও অভাব (অগ্রহায়ণ), রোগীর বন্ধু (পৌষ), খ্যাতির বিড়ম্বনা (মাঘ), আর্য ও অনার্য  চৈত্র)। ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সূক্ষ্মবিচার (বৈশাখ, ১২৯৩), আশ্রমপীড়া (কার্তিক), পুরুবাক্য (চৈত্র), একান্নবর্তী (বৈশাখ, ১২৯৪ বঙ্গাব্দ)। এই নাটকগুলো পরবর্তীকালে হাস্যকৌতুক নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯০৭ সালে। অমেত্ম্যষ্টি সৎকাররসিক নাটক দুটি হাস্যকৌতুকে সংযোজিত হয়। ঠাকুরবাড়ির ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে বাড়িতে তাদের মতো করে নাটক মঞ্চস্থ করত। মূলত তাদের অভিনয়ের জন্য এবং ছোটদের চাহিদা মেটানোর জন্যই রবীন্দ্রনাথ এই ক্ষুদ্র নাটকগুলো রচনা করেছিলেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ এগুলোকে হেঁয়ালি নাট্য বলার পক্ষপাতী ছিলেন। এ-প্রসঙ্গে তিনি আমাদের জানিয়েছেন,

এই ক্ষুদ্র কৌতুকনাট্যগুলি হেঁয়ালিনাট্য নাম ধরিয়া ‘বালক’ ও ‘ভারতী’তে বাহির হইয়াছিল। য়ুরোপে শারাড (Charade) নামক একপ্রকার নাট্যখেলা প্রচলিত আছে, কতকটা তাহারই অনুকরণে এগুলি লেখা হয়।… এই হেঁয়ালিনাট্যের কয়েকটি বিশেষভাবে বালকদিগকেই আনন্দ দিবার জন্য লিখিত হইয়াছিল। ‘শারাড’ কথাটির উৎপত্তি ফ্রান্সে। ‘শারাডে’র অভিধানগত সংজ্ঞা হলো –

১. a word represented in riddling verse or by picture, tableau, or dramatic action.৫

২. a game in which some of the players try to guess a word or phrase from the actions of another player who is not allowed to speak.এখানে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের প্রতিধ্বনিই শোনা যায়। আধুনিক থিয়েটারে শিশুকে থিয়েটারমুখী করার জন্য নানা ধরনের থিয়েটার-পেস্ন বা নাট্যখেলার কথা বলা হয়ে থাকে। নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ সেখানে পথিকৃৎ।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর চোদ্দোটি কৌতুক-নাটকের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিমানুষের ক্ষয়, পতন, বিকৃতিকে বিবৃত করেছেন। ছাত্রের পরীক্ষা নাটকে কৌতুকের জারকরসে জারিত হয়েছে শিক্ষার অসারতা,গুরু-শিষ্যের কৃত্রিম সম্পর্কের নিষ্ফলতা। রবীন্দ্রনাথ চিরকালই বেত হাতে শিক্ষাদানপদ্ধতির বিরোধী ছিলেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, সামরিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে কখনো প্রকৃত শিক্ষা হয় না। আনন্দদানের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীকে সঠিকভাবে শিক্ষিত করে তোলা যায়। তেমনি শিক্ষক কালাচাঁদবাবু, ছাত্র মধুসূদন ও অভিভাবক – এই তিনটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রাণহীন শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি কটাক্ষ করা হয়েছে।

‘সিরাজদ্দৌলাকে কে কেটেছে?’ – কালাচাঁদবাবুর এই প্রশ্নের উত্তরে মেধোর সহজ উত্তর ‘পোকায়’। ‘উদ্ভিদ কাকে বলে?’ প্রশ্নের উত্তরে সে জানায় – ‘যা মাটি ফুঁড়ে উঠে।’ উদাহরণ হিসেবে বলে ‘কেঁচো।’ এভাবে সে মজার উত্তর দিয়ে কালাচাঁদবাবুর বেত্রাঘাতের প্রতিশোধ তুলতে চেয়েছে। কালাচাঁদবাবু ধৈর্যচ্যুত হয়ে মেধোর উত্তর শুনে আরো প্রহার করেছেন। বোঝা যায়, তিনি প্রকৃত শিক্ষাদানে অপারগ। ছাত্র মেধোর বুদ্ধির তারিফ করতে তিনি পারেননি। তা ছাড়া শিক্ষককে জব্দ করার মধ্যে ছাত্রের যে চিরকালীন আনন্দ তাই এখানে ফুটে উঠেছে। রোগের চিকিৎসা নাটকের কেন্দ্রে আছে মেধোর মতো আর একটি কিশোর-চরিত্র হারাধন। সাহেব ডাক্তারের বাড়ি থেকে হারাধন রোজ হাঁসের ডিম চুরি করার হেপা এড়াতে হাঁসটাকেই চুরি করে বসে। হাঁসকে পেটের মধ্যে লুকিয়ে বাবাকে জানায়, পেটের ব্যামোর ফলে তার পেট ফুলে গেছে। বাবা ব্যাপারটি বুঝতে পেরে তাকে নীতিশিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ-ব্যাপারে তাকে সাহায্য করে সাহেব ডাক্তার। তিনি রোগীর ব্যামো বুঝতে পেরে হারাধনের পেট কাটতে উদ্যত হন। ভয়ে হারাধন পেট ফুলে যাওয়া এবং ক্যাঁক-ক্যাঁক শব্দ করার রহস্য ফাঁস করে। হারাধনের শুভ বোধোদয়ের মধ্য দিয়ে নাটক শেষ হয়। মধুসূদন, হারাধনের মতো আর এক কিশোর তিনকড়ির দেখা পাই – পেটে ও পিঠে নাটকে। পেটুক ও চতুর তিনকড়ি ছোট্ট বনমালীকে বোবা বানিয়ে সন্দেশ কেড়ে খেয়েছে। উপরন্তু পিঠে চপেটাঘাত করে বনমালীকে শিখিয়েছে ‘পেটে খেলে পিঠে সয়’। নাটকের শেষে সেই তিনকড়ি বনমালীর বাবার কাছে নানা গল্পগুজব করে গোগ্রাসে পিঠে খেয়েছে। তারপর শয্যাগত হলে পিসিমার কিল হজম করে সে শিখেছে – ‘পিঠে খেলে পেটে সয় না।’ এ-নাটকেও মজা আছে, আছে আনন্দ। মধুসূদন, হারাধন, তিনকড়ি তিনজনই যে পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের ‘ছেলেটা’ কবিতার আদলে সৃষ্ট হয়েছে। ওই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ অম্বিকে মাস্টারের মুখ দিয়ে বলেছিলেন – ছেলেটার মনের কথা ঠিক-ঠিক করে তিনি লিখতে পারেননি। অথচ নাটকগুলোতে সেই ছেলেরাই নায়ক হয়ে উঠেছে। তার কারণ তিনি শিশুর মনের মধ্যে বাসা বাঁধতে চেয়েছেন – ‘খোকার মনের ঠিক মাঝখানটিতে/ আমি যদি পারি বাসা নিতে।’ শিশুর ভাবনা, শিশুর কল্পনা, শিশুর স্বপ্ন, শিশুর আকাঙক্ষা তাঁর মনকে বারবার নাড়া দিয়েছে। ফলে তাঁর কবিতা, চিঠিপত্র, গান, গল্প, নাটক প্রহসন প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিশুরা এসেছে ঘুরে-ফিরেই। তিনি
মনে-প্রাণে চেয়েছিলেন, নাটক যেন শিশু-শিক্ষার অঙ্গ হয়ে ওঠে। তাই শান্তিনিকেতনে পৌষমেলায় বা বসন্ত-উৎসবে তিনি শিশুদের নিয়ে নাটক করতেন। তাঁর সময়ে তাঁর মতো করেই তিনি শিশুনাট্যের কথা ভেবেছিলেন। সেই ভাবনার মধ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনার প্রভাব ছিল। তাঁর হাস্য-কৌতুকগুলো শিশুর সহজ, সরল, সতেজ মনকে উজ্জীবিত করে।

রবীন্দ্রনাথ শিশু-নাটক রচনার যে-পথ আবিষ্কার করেন, সেই পথ ধরেই হাঁটা শুরু করলেন পরবর্তী শিশু-নাট্যকাররা। এই তালিকায় প্রথমেই রয়েছেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি শিশুদের জন্য মূলত পালাধর্মী নাটিকা রচনা করেন। তাঁর অন্তরে এক শিশু খেলা করত। তাই তাঁর সাহিত্যসৃষ্টিতে ঐতিহাসিক পা–ত্য নেই, রয়েছে প্রাণের সঙ্গে মানবিক ও মানসিক সেতুবন্ধ। আট-দশ বছর ছবি আঁকা বাদ দিয়ে মজে গেলেন নতুন এক খেলায়। সে-খেলা নাটক লেখা, নাটক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। নাটকের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন ‘পালা’ শব্দটি, যেমন – উড়োনচণ্ডীর পালা, মউর ছালের পালা, ঘোড়া হাতের পালা ইত্যাদি। অবন ঠাকুরের এই নাটকগুলোতে তিনি আনন্দদানের মাধ্যমে শিশুদের নীতিকথা যেমন শুনিয়েছেন, তেমনি চলিতভাষার মাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-রসিকতা সৃষ্টি করেছেন।

ঠাকুরবাড়ির মেজবধূ সতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী দুটি শিশু-নাটক লিখেছেন। তাঁরই সম্পাদিত বালক পত্রিকায় সাতভাই চম্পা (৬ জুন, ১৯১০) ও টাক ডুমাডুম্ ডুম (২০ সেপ্টেম্বর, ১৯১০) নাটক দুটি। একটি উপকথা অবলম্বনে রচিত, অপরটি নাপিত ও শেয়ালের গল্পের নাট্যরূপ। মজাদার সংলাপ ও ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি শিশুমনের উপযোগী নাটকই রচনা করেছেন।

ঠাকুরবাড়ির পরেই যে-পরিবার শিশু-সাহিত্য তথা শিশু-নাটককে এগিয়ে নিয়ে যেতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে সেটি হলো মশুয়ার রায়চৌধুরী পরিবার। এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ্য নাম, সুকুমার রায়। কিন্তু তাঁর এই প্রয়াসে যিনি রসদ জুগিয়েছিলেন তিনি হলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, তাঁর পিতা, যিনি স্বমহিমায় শিশু মনোরাজ্যে বিরাজ করেছিলেন। ভুবনমোহন রায়-সম্পাদিত সাথী পত্রিকায় উপেন্দ্রকিশোরের বেচারাম-কেনারাম নামে একটি সচিত্র নাটিকা প্রকাশিত হয় (১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে)। তাঁরই অনুপ্রেরণায় শিশু-সাহিত্যের জগতে পা রেখেছিলেন সুকুমার রায়। ছোটদের নাট্যজগতে আলোড়ন-সৃষ্টিকারী এক নাম। প্রথম নাটক রামধনবধ রচিত হয় ১৯০৫ সালে। বঙ্গভঙ্গের আমলে লেখা নাটক। যেখানে ভারতবিদ্বেষী এক ইংরেজ সাহেব কীভাবে পাড়ার ছেলেদের কাছে জব্দ হল তাই বলা হয়েছে। এর পরের ঘটনা তো আমাদের সবারই জানা। পরবর্তী শিশু-নাটকগুলো হল ঝালাপালা (১৯০৯), লক্ষ্মণের শক্তিশেল (১৯০৯), অবাক জলপান (১৯২১) ইত্যাদি। সুকুমার রায়ের নাটক ননসেন্স সাহিত্যরূপে সাধারণত পরিচিত। তিনি নিজেই বলেছেন – ‘বলব যা মোর চিত্তে লাগে/ নাই বা তার অর্থ হোক/ নাই বা বুঝুক বেবাক লোক।’ কিন্তু তাঁর সব রচনাই যে নিতান্ত অর্থহীন বা ‘আবোলতাবোল’ তা কিন্তু নয়। তাঁর সাহিত্যের মূল লক্ষ্মণ কিন্তু সমাজমুখিতা। তাঁর নাট্যসাহিত্য সম্পর্কেও এ-কথা সত্য।

নাট্যসাহিত্যে লীলা মজুমদার এক অবিস্মরণীয় নাম। শিশুনাট্যের গতিকে তাঁর নাটক আরো বেগবান করে তুলেছিল। লীলা মজুমদারের লঙ্কা দহন পালা, বকবধ পালা, বালী সুগ্রীব কথন শিশু-নাটক হিসেবে চূড়ান্তভাবে সফল। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯৬৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের দুটি শিশু-নাটক আকাদেমি পুরস্কার লাভ করে। তার মধ্যে একটি লীলা মজুমদারের বকবধ পালা। অন্যটি শৈলেন ঘোষের অরুণ-বরুণ-কিরণমালা।৬

বাংলা শিশু ও কিশোর নাট্য সাহিত্যের জগতে যে-পথ দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই পথকেই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, মশুয়ার রায়চৌধুরী পরিবারের উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, লীলা মজুমদার প্রমুখ ছাড়াও সুন্দর করে গড়ে তুলেছিলেন এমন কয়েকজন সাহিত্যিক প্রতিমুহূর্তে স্মরণযোগ্য। নিম্নে কিছু নাটকের একটি সংক্ষিপ্ত ও নির্বাচিত তালিকা উল্লেখ করার চেষ্টা হলো। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নির্বাচিত নাট্যকার ও নাটকগুলো –

 

নাট্যকার                                      শিশু-নাটক

মন্মাথ রায়                    মরা হাতি লাখ টাকা

বুদ্ধদেব বসু    ধারে বিক্রি নেই

সুনির্মল বসু    আনন্দনাডু

সুকান্ত ভট্টাচার্য  অভিযান

শিবরাম চক্রবর্তী প–ত বিদায়

বিমল ঘোষ    যারা মানুষ নয়

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়              ভাড়াটে চাই

নীরেন্দ্র গুপ্ত    ছেলেবেলা

মোহিত চট্টোপাধ্যায়               ভূত

শৈলেন ঘোষ   পিলপিলি সাহেবের টুপি

সুনীল জানা    হবু গবুর পালা

স্বপন বুড়ো    বৈশাখী পূর্ণিমা

নির্মলেন্দু গৌতম সেই বইটি

মনোজ মিত্র    রাজার পেটে প্রজার পিঠে

শুভেন্দু মাইতি  যাদুর তুলি

বরেন গঙ্গোপাধ্যায়               হিং টিং ছট

রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী                প্রমিথিউস বন্দী হলেন

হরলাল বর্ধন   পুতুলের বিয়ে

সমীর চট্টোপাধ্যায়                অঙ্কমালার দেশে

বিজয় দেব    সিংহ ও মেষ শাবক

বিধায়ক ভট্টাচার্য মহাপূজা

অন্নদাশঙ্কর রায় জনরব

হীরেন চট্টোপাধ্যায়               পুতুল সোনার খোঁজে

অনুপম দত্ত    জলের তলায়

আশিসকুমার মুখোপাধ্যায়           হাসির লড়াই

অজিতকৃষ্ণ বসু  হোমিওপ্যাথি হলধর ঢোর

সৌমিত্র বসু    মুড়কির হাঁড়ি

পিনাকী গুহ    ভালো কাজের পালা

 

শিশু-নাটক শিশু-শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম। তাই শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, পৃথিবীর সর্বত্র শিশু-নাটক নিয়ে কাজ হচ্ছে এবং একাধিক
শিশু-নাটক রচিত হচ্ছে। তা নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এমনকি নাটকে শিশু-শিক্ষার বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করে শিশু-নাটককে আবশ্যিক পাঠ্য বিষয় করার দাবি উঠেছে। বাংলাদেশ ও পৃথিবীর কয়েকটি দেশের নাটকের একটি নির্বাচিত ও সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে –

 

লেখকের নাম  নাটকের নাম  দেশ

জুবাইদা গুলশান আরা      নিঝুম দ্বীপের গল্পকথা বাংলাদেশ

রবিউল আলম আকাশ পাড়ের আগন্তুক   বাংলাদেশ

রফিকুল হক  বই বই হইচই বাংলাদেশ

ফজল-এ-খোদা নাটক নাটক  বাংলাদেশ

বেগম মমতাজ হোসেন      আঁধার রাজ্যের রাজা বাংলাদেশ

প্রদীপ দেওয়ানজী          মন ভালো চশমা    বাংলাদেশ

মমতাজউদ্দিন আহমেদ      তরুকে নিয়ে নাটক  বাংলাদেশ

গ্রেগ ম্যাকাট  হাত বাড়ালেই বন্ধু (অনুবাদ) অস্ট্রেলিয়া

পি. আকংখিম্ চালের পিঠে (অনুবাদ)   ব্রহ্মদেশ

বাওলি      ছোট্ট ভালস্নুক আর তিন সঙ্গী চীন

হরজোনা উইরোসয়েতৃষ্ণ     (অনুবাদ) ইন্দোনেশিয়া

বহেরাজ গরীবপুর         ঘুড়ি (অনুবাদ)    ইরান

মিচিও কাতো  যখনকার যা (অনুবাদ)   জাপান

হেরানী ইসমাইল সুকী      কেমন জব্দ (অনুবাদ)    মালয়েশিয়া

শিব অধিকারী একটি কচ্ছপ ও তার বাঁশী নেপাল

রেনে ও ভিলানুয়েবা       (অনুবাদ) ফিলিপিন্স

ই ইয়ং জুন   কিশোর সিদ্ধার্থ (অনুবাদ) রিপাবলিক অব             কোরিয়া

জেসি উই    দুই ফড়িং (অনুবাদ)    সিঙ্গাপুর

লীলা একনায়েক          মৎস্য রাজার আজব স্বপ্ন   শ্রীলংকা

থানটিকাতাপ্পাদিত         (অনুবাদ) থাইল্যান্ড

অন্য গ্রহের মাণিক জোড়

(অনুবাদ)

আলকাতরার পুতল (অনুবাদ)

ছায়া ও কায়া (অনুবাদ)

 

শিশুরা যাতে নাটকের মধ্য দিয়ে শিক্ষালাভ করতে পারে সে-ব্যাপারে বাংলা শিশু-নাটকের লেখকরা প্রায় সর্বত্র নজর দিয়েছেন। বিষয়ের জন্য তাঁরা দ্বারস্থ হয়েছেন কখনো লোককথা, কখনো উপকথা, কখনো রূপকথার কাছে। সামাজিক অসংগতিকেও তাঁরা দেখেছেন এবং দেখাতে চেয়েছেন শিশুদের। কল্পনা ও বাস্তবের জগৎটিকে ছোটদের সামনে খুলে দেওয়ার জন্য নাটকের বিষয় কখনো-কখনো বড়দের বৌদ্ধিকতার ধার ঘেঁষে গেছে।

শিশু-নাটকগুলোকে বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে শিশু-নাটকের বিষয় পালটে যেতে থাকে। অনেক শিশু নাট্যকারই মনে করতে থাকেন, আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। ছোটবেলা থেকে যদি তাদের সমসাময়িক পরিবেশ ও সমাজ-সম্পর্কে সচেতন করে তোলা যায়, শিশু-নাটকের মাধ্যমে তাদের মন ও মনন গড়ে তোলা যায় তা হলে তারা সমাজের শত্রম্ন-মিত্র, ন্যায়-অন্যায়কে সহজেই বুঝে উঠতে পারবে।

সেই কারণেই হয়তো বিশ শতকের সূচনালগ্ন থেকেই প্রায়শ শিশু-নাটকের ক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। কিন্তু পরিবারতান্ত্রিকতা, সেইসঙ্গে রাজনৈতিক নাগপাশের ফণায়িত দংশন শিশু-নাটকে শিশুদের বিকাশের প্রধান হাতিয়ার হতে বাধা দান করলেও শেষ পর্যন্ত তা সেই নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে চেষ্টা করেছে, করছে। সেক্ষেত্রে হয়তো শুধু শিশু-কিশোর নয়, তাদের অভিভাবকদেরও মনোরঞ্জন করতে চেয়েছেন নাট্যকার-প্রযোজকরা। তাই শিশু-নাটক এখন ট্র্যাডিশন হয়ে উঠেছে।

ট্র্যাডিশনই হোক বা দায়বদ্ধতাই হোক বর্তমানে একাধিক থিয়েটার দলও শিশু-নাটক মঞ্চস্থ করার বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষিপ নিচ্ছে। ফলে শিশু-নাটক রচনার ক্ষেত্রে শুরুতেই তাকে মঞ্চস্থ করার যে অন্তরায়ের কথা উল্লেখ করেছিলাম, তাকে এখন কাটিয়ে তোলা যাচ্ছে। শুধু ফ্যাশন বা স্ট্যাটাস কখনই যে ভালো শিল্পের মাপকাঠি হতে পারে না, এ-সচেতনতায় যে-দোলা লেগেছে তার প্রমাণ হিসেবে আমরা শিশু-কিশোর নাটকের উৎকর্ষসাধনে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শিশু-নাট্যচর্চাকারী দলগুলোর কথা তো উল্লেখ করতেই পারি। স্বাধীনতাপূর্ব যুগে শিশু-নাটকের যে-শিখাটি প্রজ্বলিত হয়েছিল, সেই শিখা থেকে হাজার-হাজার দীপ জ্বলে উঠেছিল স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে। তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি একাধিক নাট্যকার ও সাহিত্যিকদের শিশু-নাটক রচনা করার প্রয়াসে। শুধু তাই নয়, গড়ে উঠল জেলায়-জেলায় অসংখ্য শিশু-নাটকের দল। ফলে শিশু-নাটকের চাহিদাও বেড়ে গেল। দলের চাহিদা মেটাতে অনেকেই তুলে নিলেন কলম। বিষয়ের অভিনবত্ব ও বৈচিত্র্য যেমন দেখা গেল, তেমনি আঙ্গিক নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হলো। ফলে ছোটদের নাটক এখন দারুণ জনপ্রিয়। অলকা দাস-সম্পাদিত নাট্যচিন্তা ফাউন্ডেশনের ছোটোদের নাটক (২০০৫) বইয়ের ভূমিকায় বলা হয়েছে, ‘থিয়েটার বা নাটকের প্রতি ছোটদের আগ্রহ বা টান অপরিসীম। নাটক করতে ভালোবাসে না এমন বাচ্চা খুবই কম।’ এই বিশ্বাসকে মাথায় রেখেই এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে আমরা আশা করব আমাদের সন্তানরা নাটককে মাধ্যম করে শিক্ষা দেবে নৈতিকতার, মানুষ হওয়ার। নাটক থেকে শিশুরা নেবে সততা উদারতা, সাহসিকতা ও প্রসন্নতার দীক্ষা। আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে আত্মবোধ, সংকীর্ণতা থেকে উদারতার, যাবতীয় ক্লিষ্টতা
থেকে আনন্দে – যেন এই নাটকের ছোট-ছোট দর্শকরা উত্তীর্ণ হওয়ার প্রেরণা খুঁজে পায়। আর সেই পথে পরশপাথর হয়ে থাকুক শিশু-নাট্যকারদের কলম।

 

তথ্যসূত্র

১.                           Locke, John, Some thoughts concerinng education, Edited by Charles W. Elliot, Vol. XXXVIII, Part-1, The Harvard Classics, New York, P. F Collier and Son, 1909-14.

২. চক্রবর্তী, সুমিতা, ছবি-কবিতা ভাষার অতীত ভাষ্য, নতুন কবি সম্মেলন, শারদীয় ২০১৪, কলকাতা, পৃ ১৭৩।

৩. Ward David (With Janet Grant), Theatre for Children, A guide to writing, adapting, directing, and acting, Ivan R. Mar. 1999, Chicago, p 5.

৪.                           উদ্ধৃতাংশটি গৃহীত ‘স্বাধীনতা-পূর্ব যুগে শিশুনাট্যসাহিত্য’ প্রবন্ধ থেকে, অপূর্ব দে, বলাকা, বাঙালির শিশুসাহিত্য প্রাক্-স্বাধীনতাপর্ব, কলকাতা, পৃ ৭৪।

৫.                           Webster’s Seventh New Collegiate Dictionary.

৬.                           An Encyclopaedia Britannica Company.

৭. অংশটি গৃহীত ‘স্বাধীনতা-পূর্ব যুগে শিশুনাট্যসাহিত্য’ প্রবন্ধ থেকে, অপূর্ব দে, বলাকা, বাঙালির শিশুসাহিত্য প্রাক্-স্বাধীনতা পর্ব, কলকাতা, পৃ ৮৪

৮.                           দাস অলকা, ছোটোদের নাটক, ভূমিকা অংশ, নাট্যচিন্তা ফাউন্ডেশন, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০১৫

 

গ্রন্থঋণ

১.                           The Oxford Companion to the Theatre, Edited by Phyllis Hastnooll, Fourth Edition, Oxford University Press-1983.

২. Garrett E. Henry, Statistics in Psychology and Education, Paragon International Publishers, New Delhi, Twelfth Indian Reprint-2009.

৩.                           Gijubhai-Divasvapna, NBT, Fifth Reprint, 2006.

৪.                           Woolfalk Anita, Educational Psychology, Dorling, Kino Ersley (India Pvt. Ltd.) Pearson Education in South Asia, 2006।

৫.                           মজুমদার, লীলা সম্পাদিত, অবন ঠাকুরের ছোটদের সম্ভার, এশিয়া পাবলিশিং কোম্পানি, ১৯৭৯।

৬.                           চন্দ, তীর্থংকর, শিশুনাট্যের সন্ধানে, আবহমান উধারবন্দ, কাছাড়া, আসাম, বইমেলা, ১৯৯৯।

৭. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ, শিক্ষা সম্পর্কিত প্রবন্ধাবলী, ১২৫তম রবীন্দ্রজয়মত্মী উপলক্ষে সুলভ সংস্করণ, ষষ্ঠ খ-।

৮.                           বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবাজী, বাংলা শিশুসাহিত্যের ছোট মেয়েরা,  গাঙচিল ‘মাটির বাড়ি’, ওঙ্কার পার্ক, ঘোলাবাজার, কলকাতা, ১ আষাঢ়, ১৪১৪।

৯.                           কুরোয়ানাগি তেৎসুকো, তোত্তো-চান, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া, এ-৫, গ্রিন পার্ক, নয়াদিল্লি-২০০০।

১০.                          বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপ, ব্রাত্যজীবনের বর্ণমালা (বারবনিতা আর পথশিশুর খ-জগৎ), সেরিবান, বাখরাহাট, দ. ২৪ পরগনা-৭৪৩৩৭৭, ডিসেম্বর, ১৯৯৯।

১১.                           সেনগুপ্ত, স্বাতীলেখা, নাটক শেখার খেলা, নান্দীকার প্রকাশনা, কলকাতা, ১৩ আশ্বিন, ১৪১২।

১২.                           সেন, অমর্ত্য, শিশুশিক্ষার ভূমিকা, গাঙচিল, ‘মাটির বাড়ি’, ওঙ্কার পার্ক, ঘোলাবাজার, কলকাতা-১১১, জানুয়ারি, ২০১২।

১৩.                          দাস, অলকা-সম্পাদিত ছোটদের নাটক, কলকাতা, ২০০৫।

১৪.                           আজকের প্রতিভাস পত্রিকা, শিশু-কিশোর বিশেষ সংকলন, পায়রাডাঙা, নদিয়া।

১৫.                          কোরক সাহিত্য পত্রিকা, শারদ ২০১৩ (বাংলা নাটক ও নাট্যমঞ্চ), কলকাতা।

১৬. বলাকা, বাঙালির শিশু-সাহিত্য প্রাক্-স্বাধীনতা পর্ব, কলকাতা, ২০১৫। 

শেয়ার করুন

Leave a Reply