সত্তার গভীরে যে-অস্তিত্ব

লেখক:

মোবাশ্বির আলম মজুমদার

 

জাগে বল্কলে নীলস্বপ্ন মথুরা বিষজ্বালা

উদ্দীপিত শৈশব পুড়ে ছাই

নিশ্ছিদ্র নির্জনতা-ঝরে পলেস্তারা সন্ধ্যার বাদামি আবছায়া

– কবির মনি, মৃত্তিকা মন্ত্র

 

গ্রাম, শহরের মানুষ চেনা আছে মনসুর-উল-করিমের। একটি সত্য মাথায় চেপে ছুটে গেছেন আবার গ্রামে। রাজবাড়ীতে, যে-মাটির কোল ঘেঁষে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শৈশবে সেখানে কোনো নগর ছিল না। সে-মাটির কাছে আবার ফিরে গেছেন। অতীত, বর্তমান আর শেকড়ের বন্ধনকে মনে রেখে মনসুর-উল-করিম ক্যানভাস গড়েন।

আশির দশকে মনসুর-উল-করিম মানুষের অস্থিমজ্জায় শক্তির আরাধনা করেছেন। সে-সময়ে তাঁর ছবির শিরোনাম ছিল ‘উৎস’। মাটি-মানুষ আর মানুষের শক্তিকে ক্যানভাসে হাজির করেছেন। রঙের দ্যুতি ছিল না। নির্দিষ্ট রং বেছে নিয়ে ক্যানভাসে বুনট তৈরি করে জমিন গড়তেন। এবারের প্রদর্শনীর কাজের ধরন ভিন্ন। বুনটের আধিক্য নেই। রঙের নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে বহুবর্ণ ব্যবহার করেছেন। বহুবর্ণ বলতে মেটে হলুদ, লাল, বান্ট সিয়েনা রঙের কথা বলা যায়।

প্রদর্শনীর পঁয়তাল্লিশটি কাজের মাধ্যম ক্যানভাসে তেলরং। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘ইপোক’ বা ‘কাল’। মনসুর-উল-করিম এ-প্রদর্শনীর কাজগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময় বা কালের বলে চিহ্নিত করেছেন। একাল-সেকাল দুকালকে যুক্ত করেছেন কোনো-কোনো কাজে। প্রকৃতির যে আরাধনা পূর্বের কাজে দেখা যেত এবারের কাজের বিষয়ে সে-আভাস দেখা যায় না। এখানে বিষয়ে প্রতীক উঠে এসেছে। বিন্দু-বিসর্গ, রেখার কাটাকুটির দেখা মেলে। একটি সময়ের কথা বলতে গিয়ে মনসুর-উল-করিম মাটির গন্ধ অনুভব করেন। পেরিয়ে-যাওয়া সময়ের ধূসর বর্ণ অনুভবে আনেন। বর্ণ প্রলেপ ক্যানভাসে ফর্মের মাধ্যমে বিভাজন, চিত্রতলে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে। নন্দননির্ভর ক্যানভাসের স্থানে একটি ব্যক্তিক গল্প বলার ঢং তৈরি হয়েছে। এতে দর্শক খুঁজে পান মনসুর-উল-করিমের নতুন শিল্পভাষা। কিছু কাজে রোমান্টিক অতীন্দ্রিয় অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায়। যেমন – ইপোক-২, ৩। প্রকৃতির স্বচ্ছ আলোর সঙ্গে অমত্মঃপুরের মিল দেখান দুটি কাজে। অনুভবের সঙ্গে-সঙ্গে ছবিতে কোনো নির্দিষ্ট ভোর আর সন্ধ্যার কথা মনে করিয়ে দেন। জ্যামিতি, ছন্দায়িত দুরন্তরেখার ছুটে চলা ক্যানভাসকে অস্থিরতা দিয়েছে। দর্শকের কাছে এ-ক্যানভাস পাঠ সহজবোধ্য না হতে পারে। কিন্তু ছবির সামনে দাঁড়িয়ে এক চেনা জগৎ থেকে রঙের আলোয় মেশা ভোরের দিকে যেতে হবে।

ক্যানভাসের একটি নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করে নিয়ে তাতে লাল অথবা কালো রঙের প্রয়োগ ছিল আগের ছবিতে। তা থেকে মনসুর-উল-করিম বেরিয়ে এসে পুরো ক্যানভাসে রঙের আভা ছড়িয়ে দিয়েছেন। এতে রেখা রঙের গায়ে চঞ্চল হয়েছে। দর্শকের কাছে দ্যুতিময় এসব ক্যানভাস আশা জাগাতে পারে। নির্দিষ্টকাল নিয়ে আঁকা সব ছবি আরো দুবছর আগে চট্টগ্রামের স্টুডিওতে আঁকা। সে-সময় তিনি শিক্ষকতার দীর্ঘ তিন দশক পার করেছেন। সময়টি ছিল টানাপড়েনের। মানসিক টানাপড়েন, সোনালি সময়, প্রিয় শিক্ষার্থী, শিক্ষায়তন ছেড়ে দেওয়ার যে কষ্টের সময়, সেটি তিনি ক্যানভাসে হাজির করেন। এ-গল্প অনেক কষ্টের নয়, কোনো-কোনো ক্যানভাস আনন্দের সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। বর্ণ, রেখার গতি, ক্যানভাসে জ্যামিতিক বিভাজন সব মিলিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কাল অতিক্রমের বর্ণনা দর্শককে আনন্দ দেয়। দুটি ভাগে মনসুর-উল-করিমের কাজকে ভাগ করা যায়। প্রথমত, উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে গড়া ছবি; দ্বিতীয়ত, কম উজ্জ্বল বা শীতল রঙের ব্যবহারে গড়া ক্যানভাস। উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার করা ক্যানভাসের বেশ কিছু রংকে তিনি বেছে নিয়েছেন, রংগুলো হলো – আলট্রামেরিন বস্নু, লেমন ইয়েলো, কমলা, লাল। এসব রঙের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি রংকে বাছাই করে তিনি পুরো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দিয়েছেন। রেখা, আর বিন্দুবিসর্গ মিলিয়ে ক্যানভাসে উলস্নম্ব ও আড়াআড়ি বিভাজন দৃষ্টিকে পুরো ছবিতে ছড়িয়ে দেন। আলো-ছায়ার সঙ্গে মনসুর-উল-করিম সখ্য গড়েছেন অনেক আগেই। তাঁর কাজে আলোর উপস্থিতি দেখা যাবেই। কখনো ছবির নির্দিষ্ট অঞ্চল জুড়ে তীব্র আলো উপস্থাপন করেন। এরকম আয়োজনের বিষয়টি তিনি প্রকৃতি থেকে নেন। প্রকৃতিতে সকালের নরম আলো, দুপুরের উজ্জ্বল রোদ, বিকেলের নরম রোদের পার্থক্য আছে। তিনি সকালের রোদকেই পছন্দ করেন। ক্যানভাসে আলো আর ছায়ার মাঝে রেখা, আকৃতি অবস্থান করে। মনসুর-উল-করিমের কাজের বিষয়বৈচিত্র্য এখানেই। তাঁর মূল আরাধনা প্রকৃতি। প্রকৃতির কাছ থেকে ধার নিয়ে তিনি ক্যানভাস গড়েন। এ-প্রদর্শনীতে আরেক রকম কাজ হলো, নির্দিষ্ট একটি, দুটি রং বেছে নিয়ে কাজ করা। রংগুলো হল গাঢ় ছাই রং, কালো, বান্ট সিয়েনা। অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল রঙের ব্যবহার কাজগুলোকে বিশেষত্ব দিয়েছে। ইপোক-৮ ও ৯, ইপোক-২০ নং কাজের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। ইপোক-৮ কাজটি বর্গাকৃতির ক্যানভাসে করা।

পুরো ক্যানভাসে ধূসর রঙের প্রলেপ দেখা যায়। রঙের প্রলেপ ভেদ করে আড়াআড়ি ও উলস্নম্ব বুনট রেখা চলাচল করেছে। ছবির কেন্দ্রে চারটি লাল রঙের রেখা অবস্থান করছে। লাল রঙের রেখা আর ছন্দ ক্যানভাসের নিচের দিকে ছুটছে। এটি শিল্পীর অনুভবের শূন্যতা। পুরো ক্যানভাস আমাদের শোকগ্রস্ত বার্তা দেয়। একরঙা জমিনে স্বচ্ছ রঙের প্রয়োগ জমিনের গায়ে বুনটের উপস্থিতি বিশেষ ভাষা তৈরি করেছে। বাস্তবতার বাইরে বিমূর্ততার একটি প্রকাশভঙ্গি মনসুর-উল-করিম চর্চা করে আসছেন অনেক আগেই। বাস্তব, প্রাকৃতিক, অতিপ্রাকৃতিক, অতিবাস্তবতা চর্চায় মনসুর-উল-করিম দীর্ঘ সময় ধরে নিরীক্ষা করছেন। কাল বা ইপোক-১৬ ছবিতে আমরা মানুষের অবয়বের দেখা পাই। গাঢ় লাল রঙের ক্যানভাসে একপাশে মেটে হলুদ রঙের আধিক্য। ক্যানভাসের মাঝের অংশ জুড়ে চৌকোনো আকৃতির ভেতরে মানবীর অবয়ব দেখা যায়। ক্যানভাসে জানালা, ত্রিকোণ, এলোমেলো রেখার চলাচল পুরো ছবিতে একাত্ম হয়ে আছে। লাল রঙের ব্যবহার দর্শকদের দৃষ্টিতে উষ্ণতা তৈরি করে।

জীবনবোধের চূড়ায় এসে একজন শিল্পী কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করেন, সেটি দেখা যায় মনসুর-উল-করিমের কাজে। ব্যক্তিক ভাবনা, প্রকৃতি, মানুষ, সমাজচেতনায় মনসুর-উল-করিম ধারণ করেন নন্দনভাবনা। ক্যানভাসে রঙের দ্যুতি ছড়িয়ে তিনি জানান দেন মানুষের অন্তর্গত শক্তির কথা। গ্যালারি টোয়েন্টি ওয়ানে গত ৩০ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে ১৪ অক্টোবর। r

শেয়ার করুন

Leave a Reply